অশ্লীল কথাবার্তা সমাজের পারস্পরিক সম্প্রীতির সুন্দর ও মধুর বন্ধন তিক্ত হয়

মো.আলতাফ হোসেন ঃঃ
অশ্লীল কথাবার্তাও আখলাকে সায়্যিআর অন্তর্ভুক্ত । গালি দেয়া পাপের কাজ। গালিগালাজ করা কোনো সুস্থ মানসিকতার পরিচয় নয়। মুদ্রাদোষ বা অভ্যাসবশত অনেকেই কথায় কথায় গালি দেন, অনেকেই হাসি-তামাশা ও ঠাট্টাচ্ছলেও অন্যকে গালি দিয়ে বসেন এসবের কোনোটিই ঠিক নয়। অন্যকে কটু কথা বলা বা গালি দেওয়া কোনো মু’মিনের কাজ হতে পারে না। কারণ একজন মু’মিন রাগান্বিত হলেও মার্জিত ভাষায়, ভদ্র ও সংযতভাবে কথা বলবে। । ইসলাম এসেছে মানুষকে ভালো বানানোর জন্য। তাই যারা ইসলামের শিক্ষা গ্রহণ করে তারা হয় ভদ্র ও শালীন। কোনো ধরনের অশ্লীল কথা কোনভাবেই একজন মু’মিন বলতে পারে না। কিন্তু কিছু মানুষ রাগান্বিত হলে অন্যকে অশ্লীল ও গালি বাক্যবাণে নাজেহাল করে।
কাম-প্রবৃত্তি তাড়িতো হয়েও মানুষ অশ্লীল কথা বলে। আবার ক্রোধের বশীভূত হয়েও লোকেরা এ ধরণের কথাবার্তা বলে থাকে। কোনো অবস্থাতেই অশ্লীল কথাবার্তা ও গালিগালাজ করা জায়িয নেই। নবী করিম (সা.): প্রকৃত ঈমানদার ব্যক্তি কারো প্রতি র্ভৎসনা ও লা’নত করে না এবং সে কোনো অশালীন এবং অশ্লীল কথাও বলে না।
হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেন, তুমি রূঢ়- ব্যবহার এবং অশালীন আচরণ বা কথাবার্তা বর্জন করবে।
মন্দ ও খারাপ কথার দ্বারা মানুষের চারিত্রিক অবক্ষয় হয়। বন্ধু-বান্ধব একত্রে বসে আড্ডায়, দোকান-পাটের আড্ডায়, হাসি ও ঠাট্টার ছলে অশ্লীল কথা-বার্তায় মেতে ওঠে। অথচ অশ্লীল কথা-বার্তায় মানুষ মারাত্মক অন্যায় ও গোনাহের কাজে জড়িয়ে পড়ে। অশ্লীল কথা-বার্তা কোনো অবস্থাতেই বৈধ নয়। আর কোনো ঈমানদারের পক্ষে অন্যায় কাজ করাতো দূরের কথা অশ্লীল কথা বলা বা কারো প্রতি গালিগালাজ করা, বিদ্রুপ বা হাসি ঠাট্টা করা সম্ভব নয়। নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘প্রকৃত ঈমানদার ব্যক্তি কারো প্রতি অভিশাপ ও লানত করে না এবং সে কোনো অশালীন এবং অশ্লীল কথাও বলে না। (তিরমিজি)
ইসলামের দৃষ্টিতে অন্যকে গালি দেওয়া সম্পূর্ণ হারাম। আর তা যদি হয় বিনা অপরাধে, তাহলে তা আরো জঘন্য অপরাধ। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, যারা বিনা অপরাধে ঈমানদার পুরুষ ও নারীদের কষ্ট দেয়, তারা অবশ্যই মিথ্যা অপবাদ ও স্পষ্ট অপরাধের বোঝা বহন করে। (সুরা আহজাব, আয়াত : ৫৮)
আল্লাহ তা’য়ালা কুরআন কারিমে মানুষকে সুন্দর ও উত্তম কথা বলার নির্দেশ দিয়েছেন। এরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা মানুষের সঙ্গে উত্তম ও সুন্দর কথা বলো। (সুরা বাক্বারা : আয়াত ৮৩) অর্থাৎ মানুষের সঙ্গে কথা-বার্তায় খারাপ বা মন্দ কথা বল না। সুন্দর ও উত্তম কথার দ্বারা বাক্য বিনিময় করো। এ কারণে নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘কোনো মুমিনকে গালি দেয়া ফাসেকি এবং তার সঙ্গে ঝগড়া বা লড়াই করা কুফরি। (বুখারি)
হযরত আনাস (রা.) বলেন, নবী করিম (সা.) গালিগালাজকারী, অশালীনভাষী এবং অভিশাপকারী ছিলেন না। আমাদের কারো প্রতি নারাজ হলে তিনি কেবল এটুকু বলতেন যে, ‘তার কি হলো! তার কপাল ধূলিময় হোক।’ (বুখারি) শুধু তাই নয়, তিনি আরো বলেছেন, ‘তুমি রূঢ় (কঠিন ও কর্কশ) ব্যবহার এবং অশালীন আচরণ বা কথাবার্তা ছেড়ে দিবে। (বুখারি)
মুসলিম উম্মাহর উচিত হলো- ইচ্ছায়, অনিচ্ছায়, জেদের বশবতী হয়ে, হাসি-ঠাট্টার ছলে বা অন্য যে কোনো কারণেই হোক অশ্লীল ও মন্দ কথা না বলা। এ প্রসঙ্গে বিশ^ নবীর ছোট্ট একটি হাদিসই আমাদের জন্য যথেষ্ট। আর তা হলো ‘প্রকৃত মুসলমান সেই ব্যক্তি, যার কথা ও হাত থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ থাকে। (বুখারি)
নবী করিম (সা.) সমগ্র বিশ্বের জন্য অনুকরণীয় আদর্শ। বিশ্ব নবীর জীবনে কখনো এ সব খারাপ গুণের সমাবেশ ঘটেনি। তিনি ছিলেন উদার ও উন্নত চরিত্রের অধিকারী। উম্মতের মুহাম্মাদির চরিত্র হবে তাঁর আদর্শ ও চারিত্রিক গুণাবলীর অধিকারী।
বিশ্ব নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) শত জুলুম-নির্যাতনের সম্মুখীন হওয়া সত্ত্বেও কাউকে কখনো মন্দ কথা বলেননি, অভিশাপ দেননি।
আল্লাহ তা’য়ালা মুসলিম উম্মাহকে তাঁদের জবান দ্বারা কোনো মানুষকে অন্যায়, মন্দ ও অশ্লীল ভাষায় কথা বলা থেকে বিরত রাখুন।
অশ্লীল কথাবার্তা চারিত্রিক খারাপ গুণের অন্তর্ভূক্ত। হাসি-ঠাট্টার ছলে, কাম-প্রবৃত্তি তাড়িতো হয়ে মানুষ অশালীন কথাবার্তা বলে। আবার কেউ কেউ ক্রোধের বশীভূত হয়েও অশ্লীল কথাবার্তা ও বাক্য বিনিময় করে। যা কোনো অবস্থাতেই বৈধ নয়। অশালিন কথাবার্তা সম্পর্কে নবী করিম (সা.) এর কিছু বক্তব্য তুলে ধরা হলো- বিশ্বনবী বলেন, ‘মুমিনকে গালি দেয়া ফিসক এবং তার সঙ্গে লড়াই করা কুফরি। (বুখারি) তিনি আরো বলেন, ‘প্রকৃত ঈমানদার ব্যক্তি কারো প্রতি ভৎসনা ও লানত করে না এবং সে কোনো অশালীন এবং অশ্লীল কথাও বলে না। (তিরমিজি)
হযরত আনাস (রা.) বলেন, নবী করিম (সা.) গালিগালাজকারী, অশালীনভাষী এবং অভিসম্পাতকারী ছিলেন না। আমাদের কারো ওপর তিনি নারাজ হলে কেবল এটুকু বলতেন যে, ‘তার কি হলো! তার কপাল ধূলিময় হোক।’ (বুখারি)
রাসূলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেছেন, ‘মুসলিমকে গালি দেওয়া ফাসেকি যা আল্লাহর অবাধ্য আচরণগুলোর মধ্যে একটি। (বুখারি, হাদিস : ৬০৪৫, ৭০৭৬; তিরমিজি, হাদিস : ১৯৮৩)। তাই আমাদের উচিত মানুষের সঙ্গে মার্জিত ভাষায় কথা বলা, ঝগড়া এড়িয়ে চলা। কেউ খারাপ ব্যবহার করলেও নিজেকে সংযত রাখা। কারণ এ ধরনের পরিস্থিতিতে বাগিবতন্ডায় লিপ্ত হলে তা লড়াই ঝগড়ায় গড়ানো স্বাভাবিক। কিন্তু হাদিসে এ ধরনের ঝগড়া-ফ্যাসাদে লিপ্ত হওয়ার ব্যাপারে কঠোর হুঁশিয়ারি এসেছে।
হাদিস শরিফে এরশাদ হয়েছে, ‘কবিরা গুনাহগুলোর একটি হলো নিজের মা-বাবাকে অভিশাপ করা।’ জিজ্ঞেস করা হলো, ‘আল্লাহর রাসূল! মানুষ নিজের মা-বাবাকে কিভাবে অভিশাপ করে?’ তিনি বললেন, ‘যখন সে অন্যের বাবাকে গালাগাল করে, তখন সে নিজের বাবাকেও গালাগাল করে থাকে। আর যে অন্যের মাকে গালি দেয়, বিনিময়ে সে তার মাকেও গালি দেয়।’ (বুখারি, হাদিস : ৫৯৭৩, তিরমিজি, হাদিস : ১৯০২)
হজরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিস, রাসূল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি তার (কোনো মুসলিম) ভাইয়ের সম্মান নষ্ট করেছে অথবা কোনো বিষয়ে জুলুম করেছে, সে যেন আজই (দুনিয়াতে) তার কাছে (ক্ষমা চেয়ে) হালাল করে নেয় ।ওই দিন আসার আগে, যেদিন দিনার ও দিরহাম কিছুই থাকবে না। তার যদি কোনো নেক আমল থাকে, তবে তার জুলুমের পরিমাণ অনুযায়ী তা থেকে নিয়ে নেওয়া হবে। আর যদি তার কোনো নেকি না থাকে, তবে তার সঙ্গীর পাপরাশি তার (জালেমের) ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে।’ (বুখারি, হাদিস : ২৪৪৯; মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ৯৩৩২)
আমাদের সবার উচিত এ ধরনের অশ্লীল কাজ ত্যাগ করে মহান আল্লাহর দরবারে তওবা করা। মানুষকে সম্মান করা। সে যে-ই হোক, ভালো মানুষ কখনো গালি দেয় না। দিতেই পারে না। কারো প্রতি রাগান্বিত হলেও সে খারাপ ভাষা ব্যবহার করে না। ভালো মানুষের রাগ প্রকাশের ভঙ্গিটাও হয় সুন্দর ও সংযত। পক্ষান্তরে মন্দ মানুষ যখন রাগান্বিত হয় তখন সে ভুলে যায় ভদ্রতা এবং তার আসল রূপ বের হয়ে পড়ে। সে তখন গালি দিতে থাকে। সে প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করতে চায়, কিন্তু নিজেই পরাস্ত হয়ে যায়। কেননা, সবাই তাকে অভদ্র বলে চিনে ফেলে। গালি আমাদের সমাজের এক মারাত্মক ব্যাধি। গালি সম্বন্ধে নবী করিম রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, এমন দুই ব্যক্তি, যারা একে অপরকে গালমন্দ করল, তখন ওই গালির পাপ সে ব্যক্তির ওপরই পতিত হবে, যে প্রথমে গালি দিয়েছে যে পর্যন্ত না নির্যাতিত ব্যক্তি সীমা অতিক্রম করে।
এই হাদিসের আলোকে বোঝা যায় যে, গালির সূচনাকারী ব্যক্তি অত্যাচারী এবং দ্বিতীয় ব্যক্তি অত্যাচারিত। আর অত্যাচারিত ব্যক্তি ওই পরিমাণ প্রতিশোধ গ্রহণ করতে পারে যে পরিমাণ সে নির্যাতিত হয়েছে। তবে এক্ষেত্রে গালি দ্বারা গালির প্রতিশোধ গ্রহণ না করাই উত্তম। অন্যথায় উত্তম ও অধমের প্রভেদ থাকবে না। এতে বোঝা যায় যে, কোনো মন্দ কাজের জবাব ভালো দ্বারা দেয়াই উত্তম। নবী সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মু’মিন ও মুনাফিকের পরিচয় দিয়ে বলেছেন-চারটি বৈশিষ্ট্য যার মধ্যে পাওয়া যাবে সে প্রকৃত মুনাফিক। আর যার মধ্যে কোনো একটা পাওয়া যাবে তার মধ্যে মুনাফিকের একটি বৈশিষ্ট্য পাওয়া গেলো, যে পর্যন্ত না সে তা পরিত্যাগ করে। সেই বিষয়গুলো এই যে, যখন তাকে বিশ্বাস করা হয় সে বিশ্বাস ভঙ্গ করে। যখন কথা বলে তো মিথ্যা বলে। যখন অঙ্গিকার করে তো অঙ্গিকার ভঙ্গ করে এবং যখন বিবাদ-বিসম্বাদে উপনীত হয় তখন অন্যায় পথ অবলম্বন করে। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩৪; সহিহ মুসলিম, হাদিস : (১০৬)
বিলাল ইবনুল হারিস আল-মুজানি (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল (সা.)-কে বলতে শুনেছি, তোমাদের মধ্যে কোনো ব্যক্তি কখনো আল্লাহ তা’য়ালার সন্তুষ্টির কথা বলে, যার সম্পর্কে সে ধারণাও করে না যে তা কোথায় গিয়ে পৌঁছবে, অথচ আল্লাহ তা’য়ালা তার এ কথার কারণে তাঁর সঙ্গে মিলিত হওয়ার দিন পর্যন্ত তার জন্য স্বীয় সন্তুষ্টি লিখে দেন। আবার তোমাদের মধ্যে কোনো ব্যক্তি কখনো আল্লাহ তা’আলার অসন্তুষ্টির কথা বলে, যার সম্পর্কে সে চিন্তাও করে না যে তা কোন পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছবে। অথচ এ কথার কারণে আল্লাহ তা’য়ালা তাঁর সঙ্গে মিলিত হওয়ার দিন পর্যন্ত তার জন্য অসন্তুষ্টি লিখে দেন। (তিরমিজি, হাদিস : ২৩১৯)
অন্য হাদীসে আছে, মুমিন কখনো দোষারোপকারী, অভিশাপকারী, অশ্লীল ও গালিগালাজকারী হয় না। (জামে তিরমিজি হাদীস : ২০৪৩) এমনকি ইসলামের মাহাত্ম দেখো। মক্কার কাফিরেরা নবীজীকে কত কষ্ট দিল, সাহাবীদেরকে কষ্ট দিলো কিন্তু যখন আল্লাহ তা’য়ালা ম’ুমিনদের বিজয় দান করলেন তখন কাফিরদের প্রতি বিন্দুমাত্রও জুলুম করা হয়নি। তাদের জান-মাল, ইজ্জত সম্পূর্ণ নিরাপদ ছিলো।
নবী করিম (সা.) তাদের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছিলেন এবং মু’মিনগণ আল্লাহর আদেশের অনুগত ছিলেন। ইসলামের সৌন্দর্য হলো এমন কথা, কাজ ও বিষয় পরিহার করা যা নিরর্থক। অর্থাৎ যেসব কথা, কাজ ও বিষয়ে দুনিয়া ও আখেরাতের কোনো ফায়দা নেই তা পরিহার করা। গালি দেয়ার ফলে দুনিয়া ও আখেরাতের কোনো উপকার হয় না বরং ক্ষতিই সাধিত হয় তাই আমাদের উচিত গালির অভ্যাস পরিত্যাগ করার। কেননা রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কোনো মুসলমানকে গালি দেয়া ফাসেকি। বোখারি ও মুসলিম জিহ্বার সংযত ও পরিমিত ব্যবহার সমাজ, পরিবারে ও রাষ্ট্রে শান্তি আসে।
জিহ্বার ব্যবহার প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যখন আদম সন্তান ভোরে ঘুম থেকে উঠে তখন তার অঙ্গসমূহ জিহ্বাকে বিনয়ের সঙ্গে বলে আমাদের সম্পর্কে আল্লাহকে ভয় কর। কেননা আমরা তোমার সঙ্গে জড়িতো কুরআন মজীদে আল্লাহ তা’আলা মুমিনদেরকে বলেছেন,(তরজমা) যারা পবিত্র মসজিদ থেকে তোমাদেরকে বাধা প্রদান করেছিলো, সেই সমপ্রদায়ের শত্রুতা যেন তোমাদেরকে সীমালঙ্ঘনে প্ররোচিত না করে। সৎকর্ম ও খোদাভীতিতে একে অন্যের সাহায্য কর। পাপ ও সীমা লঙ্ঘনের ব্যাপারে একে অন্যের সহায়তা করো না। আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা কঠোর শাস্তি দাতা। (সূরা মাইদা : ২) এটাই হচ্ছে ইসলামের শিক্ষা। এই শিক্ষাই আমাদের জন্য অনুসরণীয়। কেননা, এর চেয়ে উত্তম শিক্ষা আর হতে পারে না। আজকের আধুনিক শিক্ষা আজ পর্যন্ত এই পর্যায়ে উন্নীত হতে পারেনি। এজন্য কোনো শিক্ষিত মানুষকেও যদি দেখি তিনি তার প্রতিপক্ষকে অন্যায়ভাবে দোষারোপ করছেন এবং বিভিন্ন মন্দ উপাধী ব্যবহার করে তাকে হেয় করার চেষ্টা করছেন তবে তার ওই কাজটা আমরা বর্জন করব। তিনি শিক্ষিত বা ভদ্র বলেই তার অভদ্র আচরণকে আমরা অনুসরণ করবো না। সুতরাং তুমি ঠিক থাকলে আমরাও ঠিক থাকব। আর তুমি বাঁকা হলে আমরা ও বাঁকা হয়ে পড়ব। কিন্তু জিহ্বা যেহেতু মনের মুখপাত্র তাই সব অঙ্গের কার্যকলাপ জিহ্বা দ্বারা প্রকাশ পায়। সে জন্য অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা, মন্দ কথা, খারাপ উক্তি ও গালি থেকে বিরত থাকা কর্তব্য। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে নীরব থেকেছে সে মুক্তি পেয়েছে। (তিরমিজি)

রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘কোনো ব্যক্তির ইসলামের অন্যতম সৌন্দর্য হলো অর্থহীন কথা বা কাজ ত্যাগ করা।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৩১৮)
আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, ‘অবশ্যই সফলকাম হয়েছে মুমিনরা, যারা নিজেদের নামাজে বিনয়ী, যারা অসার কার্যকলাপ বা অনর্থক কথাবার্তা থেকে বিরত থাকে।’ (সুরা মু’মিনুন, আয়াত : ১-৩)
মানুষকে আনন্দ দেওয়ার উদ্দেশ্যেও অনর্থক কথা বলার অনুমতি নেই। পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘আর মানুষের মধ্য থেকে কেউ কেউ না জেনে আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য বেহুদা কথা খরিদ করে, আর তারা সেগুলোকে হাসিঠাট্টা হিসেবে গ্রহণ করে; তাদের জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাকর শাস্তি।’ (সুরা : লোকমান, আয়াত : ৬)
রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘মুমিন কখনো দোষারোপকারী, অভিশাপদাতা, অশ্লীলভাষী ও গালাগালকারী হয় না।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২০১৩) অতএব আমাদের সবার উচিত, সব ধরনের অনর্থক কথা ও কাজ বর্জন করা। মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে মনোনিবেশ করা। মাধুর্যপূর্ণ ভাষা দিয়ে মুহূর্তেই কারও মন জয় করা যায়। আবার কর্কশ ভাষা অন্যের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটাতে পারে। অশ্রাব্য ও কুরুচিপূর্ণ ভাষা এবং অহেতুক বাচালতা যেকোনো সমাজে নিন্দনীয়।
রাসূল (সা.) বলেন, ‘ব্যক্তির জীবনে ইসলামের সৌন্দর্য প্রকাশ পায় তার অহেতুক কথা ও কাজ ছেড়ে দেওয়ার মাধ্যমে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৩১৮)
একজন সত্যিকার মুমিন বান্দার মৌলিকত্ব ফুটে ওঠে চিন্তা-আদর্শ, মননশীলতা, চলন-বলন ও সর্বোপরি জীবনের সামগ্রিকতায়। তাই জীবনাচারে মার্জিতভাব, বাক্য ব্যবহারে পরিমিতিবোধ বজায় রাখা প্রতিটি মুমিনের অপরিহার্য কর্তব্য। সাহাবি মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) একবার রাসূলের কাছে জানতে চাইলেন, ‘আমরা কি নিজেদের কথার জন্য জবাবদিহির মুখোমুখি হব?’ রাসূল (সা.) উত্তর দিলেন, ‘ওহে জাবালের পুত্র! তোমার কথায় অবাক হতে হয়, জিহ্বার কারণেই তো (বহু) মানুষকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৬১৬)
কথার মাধ্যমে ভাববিনিময় মানুষের জীবনের অপরিহার্য অনুষঙ্গ। ইসলাম মুখ তালাবদ্ধ করে রাখতে বলেনি। বরং নম্রভাবে ও বিনয়ের সঙ্গে কথা বলতে আদেশ দিয়েছে। নিজেকে প্রভু দাবিদার ফিরাউনের কাছে হযরত মুসা (আ.) ও হারুন (আ.)-কে যখন পাঠানো হয়, তখন আল্লাহ তা’য়ালা তাদের আদেশ দিয়েছিলেন, ‘তোমরা তার সঙ্গে নম্র ভাষায় কথা বলবে। (এতে) হয়তো সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা ভয় পাবে।’ (সুরা ত্বহা, আয়াত : ৪৪)
আরেক হাদিসে রাসূল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি আমাকে তার জিহ্বা ও লজ্জা স্থানের নিশ্চয়তা দিতে পারবে, আমি তাকে জান্নাতের নিশ্চয়তা দিতে পারব।’ (বুখারি, হাদিস : ৪০৩৮)
তাই ইসলামী জীবন ব্যবস্থায় কথাবার্তা, বাক্যালাপ, আচার-আচরণ ও সামগ্রিক জীবনযাত্রায় মহানবী (সা.)-এর আদর্শ হোক প্রতিটি মুমিনের অনুসরণীয়। আমাদের উচিত কারো সঙ্গে এমন ব্যবহার করে ফেললে তার কাছে ক্ষমা চেয়ে নেওয়া। কারণ কারো সাথে এমন আচরণ হলো সরাসরি আল্লাহর অবাধ্য আচরণ এবং যাকে কটু কথা বলছি তার প্রতি একধরনের জুলুম। কঠিন কেয়ামতের দিন ক্ষুদ্র একটি জুলুমও মানুষকে জাহান্নামে ঠেলে দিতে পারে।
মহানবী (সা.) মানবজাতির অনুকরণীয় মহান উদার, বিনয়ী ও নম্র ব্যক্তিত্ব। তিনি উত্তম চরিত্র ও মহানুভবতার আধার। অবিস্মরণীয় ক্ষমা, মহানুভবতা, বিনয়-নম্রতা, সত্যনিষ্ঠতা প্রভৃতি চারিত্রিক গুণ দিয়েই তিনি বরাবর আরব জাতির আস্থাভাজন হয়েছিলেন। তিনি যে সৎচরিত্রের অধিকারী ছিলেন, তা সকলে একবাক্যে অকপটে স্বীকার করেছে। তিনি মানুষকে সদাচরণ, উত্তম ব্যবহার ও সততার মাধ্যমে প্রভাবিত করতে সক্ষম হয়েছেন। তার চারিত্রিক গুণাবলি সম্পর্কে আল্লাহ তা’য়ালা ঘোষণা করেছেন, ‘নিশ্চয়ই আপনি সুমহান চরিত্রে অধিষ্ঠিত।’ (সুরা আল-কালাম, আয়াত: ৪)
ইসলামি শরিয়াতে গালিগালাজ,মন্দ ও অশ্লীল কথাবার্তা বিনিময় সম্পূর্ণ নিষেধ এর কারণ হলো, গালিগালাজের সময় সীমা লঙ্ঘন হয়ে যায়। একজনে যদি কারো বাবকে গালি দেয় তবে অপরজন তার বাবা-মাসহ সকলেকে গালি দেয়। এভাবে সীমা লঙ্ঘন হয়ে পড়ে মারামারি উপকরণ হয়ে যায়। অশালীন ও অশ্লীল কথা বলতে যারা অভ্যস্ত লোকেরা তাদেরকে ঘৃণা করে কেউ তাদের সাথে মেলামেশা করতে চান না। গালমন্দ করা অভদ্রতা ও সভ্যতার পরিপন্থী কাজ। অধিকন্তু এতে অন্য মানুষের কষ্ট হয়। কোনো মুসলমানকে এমনকি কোনো মানুষকে কষ্ট দেওয়া নিষিদ্ধ। কারণ গালিগালজ, মন্দ কথা ও অশ্লীল কথা বলার সময় সীমা লংঘন হয়। কুরআন হাদিস বিরোধী বাক্য-বিনিময় হয়। এক জন অন্য জনের দোষ বর্ণনা করে, বাবা-মা তুলে খারাপ কথা বলে। এমনকি পরস্পরে মারাত্মক কলহে জড়িয়ে পড়ে। অশালীন কথাবার্তার ফলে মানুষের মনে জেদ ও ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। ফলশ্রতিতে রক্তপাত হয়। অশ্লীল কথাবার্তা সমাজের পারস্পরিক সম্প্রীতির সুন্দর ও মধুর বন্ধন তিক্ত হয়, অহংবোধের সৃষ্টি হয়, নম্রতা-ভদ্রতার সীমা লংঘিত হয়।

লেখকঃ গবেষক,সাবেক জাতীয় ক্রীড়াবিদ,
চেয়ারম্যান গ্রীণ ক্লাব, মানিকগঞ্জ,সাংবাদিক ও কলামিস্ট