অস্তিত্ব হারিয়ে দখলের কবলে খরস্রোতা মিনহাজ নদী

 

মো.আলতাফ হোসেন ঃঃ
নদীমাতৃক দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বেশ সুপরিচিত। দক্ষিণ এশিয়ায় অন্তর্গত বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ। শাখা-প্রশাখাসহ প্রায় ৩১০ টি নদ-নদী বিপুল জলরাশি নিয়ে ২৪,১৪০ কিলোমিটার জায়গা দখল করে দেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। বাংলাদেশের অধিকাংশ এলাকাই শত শত নদীর মাধ্যমে বয়ে আসা পলি মাটি জমে তৈরি হয়েছে। নদীমাতৃক বাংলাদেশে অসংখ্য নদনদীর মধ্যে অনেকগুলো আকার এবং গুরুত্বে বিশাল। এসব নদীকে বড় নদী হিসেবে উল্লেখ করা হয়। বৃহৎ নদী হিসেবে কয়েকটিকে উল্লেখ করা যায় এমন নদীসমূহ হচ্ছে: পদ্মা, মেঘনা, যমুনা,ব্রহ্মপুত্র,কর্ণফুলি, শীতলক্ষ্যা, গোমতী ইত্যাদি। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড বা “পাউবো” বাংলাদেশের নদীগুলোকে সংখ্যাবদ্ধ করেছে এবং প্রতিটি নদীর একটি পরিচিতি নম্বর দিয়েছে। এর ফলে তাদের হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে নদীর সংখ্যা এখন ৪০৫ টি। পাউবো কর্তৃক নির্ধারিত দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদী (১০২টি), উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের নদী (১১৫টি), উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নদী (৮৭টি), উত্তর-কেন্দ্রীয় অঞ্চলের নদী (৬১টি),পূর্ব-পাহাড়ি অঞ্চলের নদী (১৬টি) এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের নদী (২৪টি) হিসেবে বিভাজন করে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের আওতাধীন নদী ও শাখা নদীর সংখ্যা প্রায় ৪ হাজার এর বাইরেও ১৮ হাজার থেকে ২২ হাজার শাখা ও উপনদী রয়েছে। সে হিসেবে বাংলাদেশে নদীর সংখ্যা দাঁড়ায় ২৬ হাজার। নগরায়ন,দখল-দূষণ ও ভরাটের কারণে দেশের নদ-নদী বিলুপ্তির পথে। বিলুপ্তির পথে খরস্রোতা মিনহাজ নদী।
মিনহাজ নদী বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খুলনা জেলার একটি নদী। নদীটির দৈর্ঘ্য ১৭ কিলোমিটার, গড় প্রস্থ ১২০ মিটার এবং নদীটির প্রকৃতি সর্পিলাকার। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড বা “পাউবো” কর্তৃক মিনহাজ নদীর প্রদত্ত পরিচিতি নম্বর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদী নং ৮০।
মিনহাজ নদীটি খুলনা জেলার পাইকগাছা উপজেলার চাঁদখালি ইউনিয়নের চাঁদখালি বিলাঞ্চল হতে উৎপত্তি লাভ করেছে। অতঃপর এই নদীর জলধারা একই জেলার দাকোপ উপজেলার তিলডাঙ্গা ইউনিয়ন পর্যন্ত প্রবাহিত হয়ে শিবসা নদীতে নিপতিত হয়েছে। ক্ষুদ্রাকৃতির এই নদীটি এখন অনেকটাই মৃত। ভাটির দিকে পানির প্রবাহ দৃষ্ট হলেও এনদীর উজানের অংশের অনেকটাই ইতোমধ্যে শুকিয়ে গেছে।
খুলনা জেলা (জাহানাবাদ নামেও পরিচিত) হলো বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি প্রশাসনিক এলাকা। অবস্থানগত কারণে এটি বাংলাদেশের একটি বিশেষ শ্রেণীভুক্ত জেলা।এটি খুলনা বিভাগে অবস্থিত। খুলনা জেলার উত্তরে যশোর ও নড়াইল জেলা; দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর; পূর্বে বাগেরহাট জেলা এবং পশ্চিমে সাতক্ষীরা জেলা রয়েছে। খুলনা জেলায় রয়েছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নদী। এখানকার নদীগুলো হচ্ছে রূপসা নদী, ভৈরব নদ, শিবসা নদী, পশুর নদী, কপোতাক্ষ নদ, নবগঙ্গা নদী, চিত্রা নদী, পশুর নদী, আঠারোবাঁকি নদী, ভদ্রা নদী, বুড়িভদ্রা নদী, শৈলমারী নদী, কাজিবাছা নদী, ডাকাতিয়া নদী, শাকবাড়িয়া নদী, কাঁকরী নদী, ঝপঝপিয়া নদী, তেলিগঙ্গা-ঘেংরাইল নদী, অর্পণগাছিয়া নদী, কুঙ্গা নদী,মারজাত নদী, মানকি নদী, বল নদী, নলুয়া নদী, ঘনরাজ নদী। জেলার অন্যান্য নদীর মতো দখল দূষণে হারিয়ে যাচ্ছে মিনহাজ নদীটি।
খুলনার পাইকগাছার বহুল আলোচিত মিনহাজ নদী থেকে অবৈধ নেট-পাটা অপসারণ করা হয়েছে। উল্লেখ্য, উপজেলার গড়ইখালী, চাঁদখালী ও লস্কর ইউনিয়নে অবস্থানরত ২’শ ৫১ একর আয়তনের মিনহাজ নদী দিয়ে কয়রা ও পাইকগাছা উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নের পানি নিষ্কাসন হয়ে থাকে। অত্র এলাকার হাজার হাজার বিঘা চিংড়ী ঘেরের চিংড়ী ও ফসল উৎপাদনের অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে মিনহাজ নদী। কিন্তু বদ্ধ জলমহল হিসাবে নদীটিকে ইজারা দেয়ার কারণে পানি সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যহত হয়। বিশেষ করে মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির অনুকূলে ইজারা দেয়া হলেও সমিতির নিকট থেকে অসংখ্য ব্যক্তিরা সাব লীজ নিয়ে খন্ড খন্ড করে নেট-পাটা বসিয়ে মাছ চাষ করায় পানি সরবরাহ বিঘ্নিত হয়। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে পানি নিষ্কাসন ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ২ বছর আগে চাঁদখালী ও লস্কর ইউনিয়ন সহ কয়েকটি ইউনিয়নে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। কয়েক মাস তলিয়ে থাকায় কোটি কোটি টাকার সম্পদ ও ফসলের ক্ষতি হয়।
নদ-নদী,খাল-বিল, সাগর-অরণ্যানী বেষ্টিত খুলনা বিভাগ। চির চঞ্চলা, উচ্ছ্বলময়ী পদ্মা (গঙ্গা) কুষ্টিয়ার পশ্চিম-উত্তর পাশ ঘেঁষে পাবনা, রাজবাড়ি, মানিকগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, ফরিদপুর, শরিয়তপুর ও মাদারীপুর জেলার সীমানা নির্দেশ করে চাঁদপুরের নিকট মেঘনার সাথে মিলিত হয়ে মিলিত স্রোত মেঘনা নাম ধারণ করে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে। কুষ্টিয়া জেলার তালতলায় পদ্মা নদী হতে সৃষ্ট গড়াই বা গৌরী নদী মধুমতি নাম ধারণ করে মাগুরা ও নড়াইল জেলার সাথে ফরিদপুর ও গোপালগঞ্জ জেলার সীমারেখা নির্দেশ করে বলেশ্বরের সাথে মিলিত হয়েছে। বলেশ্বর নদী বাগেরহাটের সাথে পিরোজপুর জেলার সীমানা নির্ণয় করে আরো দক্ষিণে প্রবাহিত হয়ে হরিণঘাটা নামে সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েয়ে। সোনাই, ইছামতি, কালিন্দি, হাড়িয়াডাঙ্গা ও রায়মঙ্গল নদী,যশোরের শার্শা,সাতক্ষীরার কলারোয়া,দেবহাটা,কালিগঞ্জ,শ্যামনগর ও সুন্দরবনের সাথে ভারতের মধ্যকার আন্তর্জাতিক বিভাজন রেখা অতিক্রম করে হারিয়ে গেছে সুন্দরবনের গহীন অরণ্যে ও বঙ্গোপসাগরে।
ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে খুলনার পাইকগাছা মিনহাজ নদী। কপোতাক্ষ, শিবসা ও মিনহাজ নদী বেষ্টিত পাইকগাছা উপজেলা। কয়েক বছর আগেও খুলনার সাথে ব্যবসায়িক ও যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম ছিল এই নদীগুলো। কপোতাক্ষ ও শিবসা নদী সরু নালায় পরিণত হলেও নিজের অস্তিত্বের সংকট নিয়ে নিভু নিভু করছে মিনহাজ নদী। নদীর প্রায় অংশ ভরাট হয়ে গেছে।
এক সময়ের খরস্রোতা নদী মিনহাজ আজ মৃতপ্রায়। নাব্যতা হারিয়ে নদীটি এখন অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। দুপাশে চর পড়ে প্রায় খালে পরিণত হয়েছে নদীটি। অথচ এককালে সেটি ছিল টাঙ্গাইলের অর্থনীতির প্রাণ সঞ্চালক।
নৌপথে যাতায়াত ছাড়াও পণ্য নিয়ে বড় বড় নৌকা ও জাহাজ চলতো ধলেশ্বরী নদী দিয়ে। বৃটিশ শাসনামলে এই নদী দিয়েই কলকাতা পর্যন্ত চলতো যাত্রী ও পণ্যবোঝাই নৌকা-জাহাজ। ভারত ভাগের পরও নদীটি দিয়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে চলতো নৌযান।
নাব্যতা হারিয়ে অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়েছে খুলনার বেশিরভাগ নদ-নদী। এরমধ্যে ১৬টি নদীর বিভিন্ন স্থান খনন না করলে এসব নদী দিয়ে নৌযান চলাচল করতে পারবে না। জানা গেছে, খুলনা বিভাগের ৭৮টি নদীর মধ্যে খুলনার হাড়িয়া, ময়ূর, হামকুড়া, কচা, শেলা ও বাগেরহাটের ভোলা, হাওড়া,সড়া, চুনা, যমুনা, রামসাগর, সাতক্ষীরার সোনাই, কুষ্টিয়ার টেকা, নড়াইলের চিত্রা, মাদারীপুরের নিম্ন কুমার, মরাগাঙ ভদ্রাসহ ২৫টি নদী এরই মধ্যে মরে গেছে। এছাড়াও ১০টি নদী শুকিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। তিনদশক আগেও এসব নদী দিয়ে এ অঞ্চলের পণ্য ও যাত্রী আনা-নেয়া করত। তবে এখন আর এসব নদীতে বড় কোন নৌযান চলাচল করে না। শুকিয়ে যাচ্ছে মিনহাজ নদী।
বাংলার সৌন্দর্য তার প্রাকৃতিক পরিবেশের জন্য। নদীকে উপেক্ষা করে বাংলাদেশের কোনো সৌন্দর্য কল্পনা করা যায় না। আর এ পরিবেশের জন্য সবচেয়ে বড় উপাদান নদী। উপনদী-শাখানদী-খাল-বিলে ঘেরা এ দেশের জমির উবর্রতা শক্তির মূলেও রয়েছে নদী। দেশের মধ্যে প্রবহমান অধিকাংশ নদীই আজ দখলের শিকার। জল ও জীবনের ঐকতান একাকার হয়ে যেনো বয়ে গেছে দেশের বিভিন্ন নদী। গতি প্রকৃতি হারিয়ে এখন মরণ দশা অনেক নদীর। মৃত নদীর তালিকায় চলে যাচ্ছে এক সময়ের খরস্রোতা মিনহাজ নদী। সময়ের বিবর্তনে পাল্টে যাচ্ছে এর ধরণ। ধমনীতে যেমন রক্ত প্রবাহ জরুরি তেমনি দেশকে বাঁচাতে হলে সে দেশের বুকের ভেতর নদী প্রবাহ জরুরি। জেলার বুক চিরে বয়ে যাওয়া এক সময়ের প্রবল স্রোতে আর গভীর জলরাশির মিনহাজ নদী আজ নিজের স্বাভাবিক গতিপথ হারিয়েছে। এভাবেই আপন ধারায় চলে যেতে শুরু করেছে দেশের ঐতিহ্যবাহী নদীগুলো। দখলের শিকার এমনি একটি নদীর নাম মিনহাজ নদী। একসময় এদেশের মানুষের জীবিকার উৎস ছিলো নদী। এই নদীগুলো কৃত্রিম কারণে ও সময়ের ধারায় আজ বিপর্যয়ের সম্মুখিন। দেশ এখন মরুকরণের পথে। এভাবে চলতে থাকলে দেশ অচিরেই বসবাসের অযোগ্য হবে। যেসব অঞ্চল ভাসতো পানিতে আজ সেখানে শুরু হয়েছে পানির জন্য হাহাকার।
পৃথিবীর ইতিহাস খুঁজতে গেলে দেখা যায় প্রায় সকল বড় বড় মানবসভ্যতা গড়ে ওঠেছিলো নদী তীরে। নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে নগর, বন্দর, শহর, গ্রাম, জেলেপাড়া, বাণিজ্যকেন্দ, প্রভৃতি। এই নদীকে ঘিরেই ছিলো আদিকালের যাতাযাতের সকল ব্যবস্থা। জাহাজে, নৌকায় চড়ে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত মানুষ ঘুরে বেড়িয়েছে। কৃষি, মৎস্য, জেলেদের পেশা এবং সংস্কৃতির পাশাপাশি মানুষের নিত্যদিনের কাজের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাকৃতিক সম্পদ সকল কিছুর একমাত্র উৎস ছিল নদী। নদী আজ দখল, দূষণ আর ভরাটের প্রতিযোগিতায় বিপন্ন; অনেকাংশে বিলুপ্ত। দখল ও দৌরাত্মের কারণে নিস্ব দেশের অনেকাংশ নদ-নদী। বিপন্ন হয়ে মরতে বসেছে একসময়ের খরস্রোতা মিনহাজ নদীটিও।
হাজার হাজার বছর নদ-নদীকে কোনো মানুষের রক্ষা করার প্রয়োজন হয়নি। আজ তারা অগণিত শত্রুর দ্বারা আক্রান্ত। নদ-নদী দখল আর নদীর পার কেটে বালু উত্তোলন যেকোনো অপরাধই শাস্তিযোগ্য।নদী ছিলো আপন বেগে পাগলপারা। তাকে আক্রমণ বা বাধা দেওয়ার সাধ্য ছিলো না কারও। নদ-নদী ছিলো অজাতশস্ত্র,কালের বিবর্তনে হারিয়েছে এসব নদীর নাব্যতা। দেশ এখন মরুকরণের পথে। কিছু নদী টিকে থাকলেও অপদখলে চলে যাচ্ছে। নদীমাতৃক বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে রাখতে নদীভিত্তিক সমস্যার সমাধান করতে হবে দীর্ঘমেয়াদিভাবে। এ দেশের বেশির ভাগ মানুষের জীবন, জীবিকা ও সার্বিক উন্নতি নির্ভর করে নদীর ওপর। এ কারণে নদী সমস্যাকে অত্যধিক গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ দেশের নদী বাঁচলে,মানুষ বাঁচবে। অর্থাৎ দেশের মধ্যে প্রবহমান অন্যান্য নদ-নদীর মতো মিনহাজ নদীকে বাঁচানোই এখন সময়ের দাবি।

লেখকঃ সাবেক জাতীয় ক্রীড়াবিদ(কারাতে ব্লাক বেল্ট ১ম ড্যান),সভাপতি শারীরিক শিক্ষাবিদ সমিতি,
চেয়ারম্যান গ্রিন ক্লাব,শিক্ষক, গবেষক,সাংবাদিক ও কলামিস্ট