অহংকার হলো শেষ অপরাধ যা সকল মহত্ব আবৃত করে পাপকে পরিপূর্ণ করে

মো.আলতাফ হোসেন ঃঃ
মানুষ নিজেকে অন্যদের থেকে শ্রেষ্ঠ ও উত্তম বলে মনে করলেই যেনো মনের মধ্যে এক ধরনের আনন্দের হাওয়া বয়ে যায়। এমন আনন্দ হাওয়ার কারণে মন ফুলে ফেঁপে উঠে; এটাই অহংকার। অহংকার শব্দটির প্রতিশব্দটা হচ্ছে: আত্মাভিমান অহমিকা ও গর্ব। আর যে গর্ব করে সে নিজেকে ধ্বংস করে। গর্ব অজ্ঞতা থেকে আসে এবং স্বল্প জ্ঞান যার সেই গর্ব করে। লোভী ও অহংকারী মানুষকে আল্লাহ সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করে। অহংকার কিংবা আত্ম-স্বার্থের মতোই স্বার্থ থাকতে কখনোই মুক্তি হবে না। কোনো মানুষ যখন নিজকে অন্য কোনো মানুষের তুলনায় উত্তম, উন্নত, ক্ষমতাধর কিংবা বড় মনে করে অথবা কাউকে কোনোভাবে নিজের তুলনায় ছোট বা হেয় মনে করে তার এই মানসিকতাকে অহংকার বলে। এটি একটি মানসিক অনুভূতি বা আত্মিক রোগ। তবে এটা মানুষের কাজের মাধ্যমে এর প্রকাশ ঘটে। সুতরাং অহংকার ইবলিসি চরিত্র।

মানুষের সকল মানবীয় গুণের বহিঃপ্রকাশ হলো মহত্ত্ব। এইসব মানবীয় গুণাবলি দিয়েই মানুষেরা অন্যান্য প্রাণী থেকে নিজেকে আলাদা করেছে। ঘুম ভাঙলে সকাল, আর না ভাঙলে পরকাল। অহেতুক এতো অহংকার বা দাপট কেনো? মানুষ নিজের অবস্থান নিয়ে অনেক গর্ব এবং অহংকার করে থাকে কিন্তু ভেবে দেখেও না যে, তাঁর যা অবস্থান রয়েছে তার পেছনে যে কার না কারো অবদান আছে। অহংকারী ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষেই অকৃতজ্ঞ, কৃতঘ্ন ও গর্বিত কুলাঙ্গার। খুব ‘বেশি অহংকার’- কখনোই ভালো হয় না। তিন ধরনের মানুষ অনেক বেশি ‘অহংকার’ করে থাকে। বেশি শিক্ষিত হলে, বেশি সুন্দর হলে, হঠাৎ করেই তারা বড়লোক হলে। পক্ষান্তরে মূর্খ জ্ঞানীকে চিনতে পারে না, কেননা সে মূর্খ। তাই তো সামাজিকভাবে কে জ্ঞানী আর কে মূর্খ বুঝা কঠিন। শুধুই এই সমাজে লক্ষ্য করা যায় দাম্ভিকতা কিংবা অহংকারের বেড়াজালে সাধারণ মানুষ।

খোদপসন্দী অর্থাৎ নিজেকে নিজে ভালো মনে এটাও অহংকারেরই একটি শাখা। তবে অহংকার ও খোদপসন্দীর মধ্যে প্রভেদ হচ্ছে এই যে, অন্যের তুলনায় নিজেকে বড় মনে করাকে অহংকার বলে। আর অন্যের দিকে লক্ষ্য না করে কেবল নিজেকে মহতি গুণের মালিক বলে ধারণা করা এবং আল্লাহ প্রদত্ত গুণাবলীকে নিজস্ব সম্পদ মনে করতঃ তা হস্তচ্যুত হয়ে যাওয়ার ব্যাপারে কোনোরূপ ভয় না করাকে খোদপসন্দী বা আত্মগৌরব বলে। তাসাওউফের ভাষায় একে ‘উজব’ বলা হয়। খোদপছন্দী ব্যাপারে কোরআন ও হাদীসে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কোরআন মাজীদে এরশাদ হয়েছে, অতএব তোমরা আত্মপ্রশংসা করবে না , কে মুক্তাকী এ সম্পর্কে তিনিই সম্যক জানেন। (সূরা নাজম, ৫৩ঃ ৩২) ।

অহংকার হলো বোকার ধর্ম। নিজের পছন্দনী অর্থাৎ নিজের ইলিম ও ইবাদতকে স্বীয় ভেবে মনে মনে গর্বিত ও আনন্দিত হওয়া মনের একটি জঘন্য ব্যাধি। মূর্খতা এই ব্যাধির একটি বড় কারণ।পবিত্র কোরআন শরীফে আল্লাহ তা’য়ালা বলেন- কখনো অহংকারবশত মানুষকে অবজ্ঞা করো না, মাটিতে গর্বিতভাবে পা ফেলো না। উদ্ধত অহংকারীকে নিশ্চয়ই আল্লাহ অপছন্দ করেন। ( সূরা লোকমান- আয়াত ১৮) মহান আল্লাহ তায়ালা যিনি জমিনকে যাবতীয় বস্তু হতে নিচু করে বা নত করে সৃষ্টি করেছেন। মানুষ সৃষ্টির অন্যতম উপাদান হচ্ছে এই মাটি। কাজেই অহংকারী হয়ে আত্মগৌরবে কখনোই মাটিতে চলাফেরা করা উচিত নয়।

অহংকার এর একটি শাখা আত্মগৌরব। অহংকার ও আত্মগৌরব এর মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। অহংকার হলো নিজেকে অন্যের তুলনায় বড় মনে করা। অন্যকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করা, নিকৃষ্ট মনে করা। আর ইবলিশ শয়তানই ছিলো দুনিয়াতে প্রথম অহংকারী। আর আত্মগৌরব হলো অন্যের দিকে লক্ষ্য না করে শুধুমাত্র নিজেকে মহতি গুনের মালিক বলে ধারণা করা এবং আল্লাহ তা’য়ালা প্রদত্ত গুণাবলিকে নিজের সম্পদ মনে করা। মহান রাব্বুল আলামিন প্রদত্ত গুণ নিজ থেকে হারিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে আল্লাাহ তা’য়ালাকে ভয় না করা আত্মগৌরবের অন্তর্গত।

আল্লাহ তা’য়ালা কোরআনুল কারিমের আত্মগৌরব বা খোদপসন্দী না করার ব্যাপারে নির্দেশ প্রদান করেছেন। কোরআনে এসেছে- অতএব তোমরা নিজেদের পবিত্রতার বড়াই কোরো না (বিনয়ী হও)। কে আল্লাহ-সচেতন তা তিনি ভালোভাবেই জানেন। (সুরা নজম : আয়াত ৩২)।

রাসূলে কারীম (সা.) খোদপসন্দী বা আত্মগৌরব করতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেন এ সবই মানুষের ধ্বংসের কারণ। হাদিসে এসেছে- ‘প্রবৃত্তির অনুগামী হওয়া, কৃপণতার অনুগত হওয়া এবং আত্মপ্রশংসায় লিপ্ত হওয়া, এগুলো হচ্ছে ধ্বংসাত্মক বদ-অভ্যাসসমূহের অন্তর্গত। তবে এ সবের মধ্যে শেষটি (‘ধ্বংসাত্মক বদ-অভ্যাস’) হচ্ছে সবচেয়ে জঘন্য।’ (বায়হাকি, মিশকাত)

নবী করিম (সা.) বলেন, তিনটি প্রবৃত্তির মানুষের দ্বীনদারী জীবনকে ধ্বংস করে দেয়। ১. কৃপণতা , ২. লোভ , ৩. আত্মগৌরব। তিনি আরো বলেন, তোমরা পাপ না করলেও আমি তোমাদের ব্যাপারে এমন একটি জঘন্য বিষয়ের আশঙ্কা করি যা পাপের চেয়েও বেশি মারাত্মক। তাহলো আত্মদাম্ভিকতা অর্থাৎ নিজের কাজ ও গুণাবলীকে সর্বোত্তম বলে মনে করা। একবার উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়েশা (রা.) কে লোকজন জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে, মানুষ কখন পাপ কাজে প্রবৃত্ত হয়? জবাবে তিনি বলেছিলেন, যখন মানুষ নিজেকে পুন্যবান ও নেক আমলকারী বলে ভাবতে শুরু করে। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাঃ বলেছেন দুটি বিষয় দ্বারা মানুষের সর্বনাশ হয়ে থাকে। একটি হচ্ছে আত্মদাম্ভিকতা, আর অপরটি হচ্ছে মহান আল্লাহ তা’য়ালার রহমত থেকে নিরাশ হয়ে যাওয়া।

আত্মগৌরব এর কারণে নানা বিধ অনিষ্ট ঘটনা সংঘটিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। যেমন- নিজের দোষ ধরা পড়ে না। অতীতের পাপের কথা স্মরণ হয় না, স্মরণ হলেও পাপ মাফ হয়ে গেছে বলে মনে করা। কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পরিমাণ কমে যাওয়া। আত্মপ্রশংসার লিপ্ত হওয়া। নিজেকে পাপমুক্ত খুব পবিত্র মনে করে অপরের মতামতকে গুরুত্ব না দেওয়া। এর বাইরে আরো নানা রকমের অনিষ্ট ঘটনা করতে থাকে। এ ধরনের মন মানসিকতার কারনে পরস্পরের সাথে হিংসা-বিদ্বেষ ঝগড়া মারামারি তথা অশান্তির সৃষ্টি হয়।
আর নিজেকে উচ্চ মনে করা এবং অন্যাকে তুচ্ছ মনে করার নামই অহমিকা। আত্মগরিমা প্রতারণার শামিল। অহংকার ফেরেস্তাকেও নিকৃষ্ট করে দেয়। যার কোনো কিছু নেই সেই বেশি অহংকার করে। অহংকারের পথ অনেক সময় কবরের দিকে পরিচালিত করে।
সমগ্র পৃথিবীতে আজ অবধি যতো সত্য কথাগুলো আছে তার মধ্যে অন্যতম সত্যি কথা অহঙ্কার পতনের মূল আর মানুষের নায্য চাহিদা থেকে বঞ্চিত করা। এটা আসলে আত্মার মারাত্মক মরন ব্যাধি।

একটি বিরক্তিকর ঝামেলার নাম মানুষের অহংকার। অহংকারী মানুষ খুব জঘন্য স্বভাবের হয়। যতক্ষণ নিজ স্বার্থ ততোক্ষণ পতন”। অহংকারী মানুষ ভাবে, ‘আমার কী নেই’, ‘আমি কী না হতে পারতাম’, আমি কী না করতে পারি’, ‘আমাকে কে কী করবে’, ‘কার এত সাহস’ নিজের এমন দাপট দেখানো ও সার্থকতা খোঁজার কারণ হলো, তার সামান্য টাকা হয়েছে, তার কিছু ক্ষমতা আছে; কিছু লোক তাকে চেনে, সমীহ করে ইত্যাদি। কিন্তু মনুষ্যত্বের দাবি হলো- মমত্ব, আন্তরিকতা; যা সামাজিক আস্থা ও জান্নাতি সুখের বাহন। বস্তুত অহংকার একটি অনৈতিক ও ক্ষতিকর বিষয়। এর মাধ্যমে চরম ও চূড়ান্তভাবে কিছুই লাভ করা যায় না; বরং মানুষের ঘৃণা ও অশ্রদ্ধার পাত্র হতে হয়। কিন্তু মানুষ একবার বিভ্রান্ত হলে আর ফিরে আসে না এবং সবার হয় না ফেরার সময় ও সুযোগ। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তুমি কি বধিরকে শোনাতে পারবে? অথবা যে অন্ধ ও যে ব্যক্তি স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে আছে, তাকে কি পারবে সৎ পথে পরিচালিত করতে?’ (যুখরুফ : আয়াত ৪০)।এ প্রসঙ্গে নবী করিম (সা.) এরশাদ করেন, প্রবৃত্তির অনুগামী হওয়া, কৃপণতার অনুত হওয়া এবং আত্মপ্রশংসায় লিপ্ত হওয়া, এগুলো হচ্ছে ধ্বংসাত্মক বদ অভ্যাসমূহের অন্তর্ভূক্ত। তবে এসবের মধ্যে শেষোক্তটি হচ্ছে সবচেয়ে জঘন্য।

নিজেকে পছন্দ করা, নিজেকে,বিজ্ঞতম মনে করা এবং অন্যের মতামতের প্রতি কোনো গুরুত্বারোপ না করাতে বিভিন্ন ধরণের অকল্যাণ নিহিত রয়েছে। এ ধরণের মন-মানসিকতার কারণেই পরস্পরের মধ্যে হিংসা বিদ্বেষ, মারামারি ইত্যাদি সংঘটিত হয়ে থাকে। কাজেই নিজের কাজ ও রায়কে নির্ভুল না ভেবে অন্যের রায়ের প্রতিও গুরুত্ব প্রদান করা উচিত। হাদিসে আছে, তোমরা তোমাদের নিজেদের রায়কে সন্দেহযুক্ত মনে করবে। এই নীতির অনুসরণ ব্যতীত সুন্দর ও আদর্শ সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব নয়। প্রিয় নবীর ঘোষণায় তা হলো মানুষের ধ্বংসের অন্যতম কারণ আর এগুলোই হলো খোদপসন্দী বা আত্মগৌরব। সুতরাং আত্মগৌরব বা খোদপসন্দী থেকে নিজেদের বিরত রাখতে হবে। এ কারণেই কোরআন এবং হাদিসে আত্মগৌরব বা খোদপসন্দী থেকে নিজেদেরকে বিরত রাখতে তাগিদ দেয়া হয়েছে। আমাদের উচিত নিজের মতামত, গুণ বা কাজকে প্রাধান্য না দিয়ে অন্যের ভালো কাজ,গুণ ও মতামতকে সম্মান করা। আর কিতাবের নসিহত অনুযায়ী, নিজেদের রায় বা মতামতকে সন্দেহযুক্ত মনে করা। যখনই মানুষ এ রীতির অনুসরণ করবে তখনই সুন্দর ও আদর্শ সমাজ প্রতিষ্ঠা লাভ করবে। সর্বত্র বিরাজ করবে সুখ ও শান্তি।

হযরত মুফয়ান সাওরি (র.) বলেন, যে ব্যক্তি নিজেকে অপরের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ও উৎকৃষ্ট মনে করে যে অহংকারী। হযরত যাহাবি (র.) বলেন, বিনয়ী মূর্খ অহংকারী আলেমের চেয়ে মহত্তর। আল্লাহ তা’য়ালা দুনিয়াতে সবাইকে তার নিয়ামত- ধন সম্পদ, ক্ষমতা, মেধা ও যোগ্যতা সমানভাবে দেন না। তার এই নিয়ামত কাউকে দেন আবার কাউকে দেন না। ক্ষেত্রবিশেষ কমবেশি করে দেন। মানুষের উচিত হলো- আল্লাহ প্রদত্ত নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। মানুষ যখন আল্লাাহর নিয়ামতের কথা ভুলে এটাকে নিজের সম্পদ মনে করে, তখনই অহংকারের সূত্রপাত হয়। আর এই অহংকারের কারণে আল্লাহ তা’য়ালার সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়।

কোরআন কারিমে ও হাদিসে অহংকারী মানুষের পরিণতি ও শাস্তি প্রসঙ্গে বর্ণনা রয়েছে। আল্লাহ তা’য়ালা কোনো অহংকারীকে ভালোবাসেন না ও পছন্দ করেন না। অহংকার প্রসঙ্গে কোরআনে কারিমের বিভিন্ন স্থানে এরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ এমন লোককে পছন্দ করেন না, যে বড় হওয়ার গৌরব করে ও অহংকার করে।’ -সুরা আন নিসা: ৩৬

কোরআন পাকের অন্যত্র আরও এরশাদ হয়েছে, ‘মানুষের দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে রেখে কথা বলো না এবং পৃথিবীতে গর্বের সঙ্গে চলবে না। নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো বড়াইকারী ও অহংকারীকে পছন্দ করেন না।’ -সুরা লোকমান: ১৮ অহংকারীর সর্বশেষ পরিণতি হলো জাহান্নাম। কেননা সে অহংকারের মাধ্যমে আল্লাহ তা’য়ালার অধীনতা থেকে নিজেকে মুক্ত করে বেপরোয়া হয়ে যায়। নিজকে অনেক বড় ও ক্ষমতাবান এবং শক্তিশালী মনে করে এবং মানুষকে অবজ্ঞা ও তুচ্ছতাচ্ছিল্য মনে করে।
অন্য হাদিসে আরও এরশাদ হয়েছে, হযরত নবী করিম (সা.) এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘অহংকারী ও অহংকারের মিথ্যা ভানকারী ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।’ -সুনানে আবু দাউদ

আল্লাহ তা’য়ালা অহংকারের শাস্তি শুধুমাত্র আখেরাতে নয় দুনিয়াতেও দিয়ে থাকেন। আগেকার অনেক জাতি ধন-সম্পদ ও শাসনক্ষমতা নিয়ে অহংকার ও বাড়াবাড়ি করার কারণে আল্লাহ তা’য়ালা দুনিয়াতে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করেছেন। এ প্রসঙ্গে কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘এমন কতো জনপদ আমি ধ্বংস করে দিয়েছি, সেখানকার লোকেরা ধন-সম্পদের অহংকার করতো। এই যে তাদের বাড়িঘর পড়ে আছে, যেখানে তাদের পর কম লোকই বসবাস করেছে। শেষ পর্যন্ত আমি (এ সবেরই) ওয়ারিশ হয়েছি।’ -সুরা আল কাসাস: আয়াত ৫৮।

কোরআন ও হাদিসে পূর্ববর্তী বিভিন্ন সম্প্রদায় ধ্বংসের ইতিহাস বর্ণিত হয়েছে। পূর্ববর্তী অনেক শাসক ও ক্ষমতাধররা অহংকার করায় আল্লাহ তাদের সমুচিত শিক্ষা দিয়েছেন। তাদের এসব করুণ পরিণতির ইতিহাস বিশ্ববাসীর জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। তাইতো ফেরাউন, কারুণ ও নমরুদের মতো নামগুলোকে আজও মানুষ ঘৃণার চোখে দেখে।

যেকোনো মানুষ যারা দামি ও মূল্যবান পোশাক পরিধান করে অহংকার প্রকাশ করে থাকে। তাদের বিষয়ে হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি অহংকারবশত স্বীয় বস্ত্র মাটির ওপর দিয়ে টেনে চলে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা’য়ালা তার দিকে তাকাবেন না। তখন হজরত আবু বকর (রা.) বলেন, আমার লুঙ্গি অসতর্ক অবস্থায় ঢিলা হয়ে পায়ের গিরার নিচে চলে যায়, যদি না আমি তা ভালোভাবে বেঁধে রাখি। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, তুমি তা অহংকারবশত করো না।’ -সহিহ বোখারি

অহংকার মানুষের ইবাদতকে নষ্ট করে দেয়। অহংকার থেকে বাঁচতে আল্লাহ প্রদত্ত ধন-সম্পদ, জ্ঞান যোগ্যতাকে আল্লাহ প্রদত্ত দয়া, রহমত ও নিয়ামত ভেবে তার শোকরিয়া আদায় করতে হবে। আর যে ব্যক্তি এসব নিয়ামত পাননি তার জন্য মহান রবের দরবারে দোয়া করতে হবে, যাতে আল্লাহ তাকেও এ সব নিয়ামত দান করেন। আর এ মানসিকতা পোষণ করতে হবে, আমি যে ইবাদত-বন্দেগি করছি তা অল্লাহ প্রদত্ত নিয়ামতের তুলনায় অতি নগণ্য। কাজেই আমার তৃপ্ত হওয়ার কিছু নেই। আল্লাহ প্রদত্ত এ নিয়ামত যেকোনো মুহূর্তে ছিনিয়ে নিতে পারেন, তিনি একজন বাদশাকে স্বল্প সময়ের ব্যবধানে ফকিরে পরিণত করতে পারেন। আমাদের সব নিয়ামত আল্লাহর দান। আর এ নিয়ে গর্ব করার অর্থদানকারীর দানের অবজ্ঞা করা। অতএব আমাদের সর্বদা সাবধান থাকতে হবে। যাতে কখনো সম্পদ, শক্তি, ক্ষমতা, শিক্ষা, সৌন্দর্য, পেশা বা অন্য কোনো নিয়ামতের কারণে অহংকার না করি, অন্যকে হেয়প্রতিপন্ন না করি। অনু বা জাররা পরিমাণ অহংকার থাকলে সে জান্নাতে যাবে না।

অহংকার হলো শিশুর অজ্ঞতার মতো। মানুষদের প্রতি অবজ্ঞা, অবহেলা, তুচ্ছজ্ঞান। মানুষদের প্রতি দুর্ব্যবহার করা, ছোট করার চেষ্টা করা। যদি এটি কোনো লোকের বক্তব্য বা আচরণের মাধ্যমে অথবা কোনো ইঙ্গিতের মাধ্যমে, কোনো লেনদেনের মাধ্যমে বোঝা যায়, তাহলে বুঝতে হবে তাঁর মধ্যে অহংকার রয়েছে। সেটা আপনার মধ্যে থাকলে আপনিই সেটা বুঝতে পারবেন।

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘জান্নাত ও জাহান্নাম পরস্পর বির্তকে লিপ্ত হবে। জান্নাত বলবে, কী ব্যাপার? আমার ভেতর মানবগুলীর শুধু দুর্বল ও নিরীহ লোক ছাড়া কেউ প্রবেশ করবে না আর জাহান্নাম বলবে, আমাকে তো স্বেচ্ছাচারী ও অহংকারীদের দিয়েই ভর্তি করা হচ্ছে। আল্লøাহ তাদের বিরোধ মিটিয়ে দিয়ে বলবেন, ‘ওহে জান্নাত! তুমি আমার রহমতের নির্দশন। যাকে ইচ্ছা তাকে আমি তোমায় দিয়ে প্রদান করে থাকি। আর ওহে জাহান্নাম! তুমি আমার শাস্তির প্রতিক। তোমার মাধ্যমে যাকে ইচ্ছা তাকে শাস্তি দিয়ে থাকি। তবে তোমাদের দু’জনকেই পূর্ণরূপে ভর্তি করা হবে।’ (মুসলীম)

ইসলামের দৃষ্টিতে অহংকার একটি কবিরা গুণা। অহংকার মানুষকে জাহান্নাম পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দেয়। আল্লাহ ত’য়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই যারা আমাদের আয়াতসমূহে মিথ্যারোপ করে এবং তা থেকে অহংকারবশে মুখ ফিরিয়ে থাকে, তাদের জন্য আকাশের দুয়ারসমূহ উন্মুক্ত করা হবে না এবং তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যতক্ষণ না সুইয়ের ছিদ্রপথে উষ্ট্র প্রবেশ করে। এভাবেই আমরা পাপীদের বদলা দিয়ে থাকি।’ (সূরা আরাফ ৭/৪০)। নবী করিম (সা.) বলেন, ‘কে জাহান্নামী, আমি কী তা তোমাদেরকে জানাবো না? জাহান্নামী হলো সে, যে নির্মম হৃদয়ী, রুঢ়স্বভাবী, অবাধ্যচারী এবং অহংকারী দাম্ভিক।’ (বুখারী ও মুসলীম)

বুখারী শরীফে বর্ণিত এক হাদিসে রাসূল (সা.) বলেন, ‘হাশরের দিন আল্লাহ তিন প্রকারের মানুষের দিকে ফিরেও তাকাবেন না, তাদেরকে পাপ থেকে পবিত্রও করবেন না, বরং তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। (সেই তিন প্রকারের মানুষ হচ্ছে-) পায়ের গোড়ালীর নিচে ঝুলিয়ে পোশাক পরিধানকারী, দান বা অনুগ্রহ করে খোটাদানকারী এবং মিথ্যা শপথ করে দ্রব্য সামগ্রী বিক্রয়কারী।’ গোড়ালির নীচে ঝুলিয়ে পোশাক পরিধান করা অহংকারের নিদর্শন। এ জন্যই রাসূল (সা.) বলেন, ‘যার পরিধেয় বস্ত্র গোড়ালির নীচে গড়াবে সে জাহান্নামে যাবে।’

অহংকার, দাম্ভিকতা আখিরাতে জওয়াবদিহিতার ভয়ে ভীত হয়ে ছেড়ে দেওয়া ঃ কিয়ামতের দিন প্রত্যেকের আমলনামা তার হাতে দিয়ে আল্লাহ বলবেন, ‘তোমার আমলনামা তুমি পাঠ কর। আজ তোমার হিসাব নেওয়ার জন্য তুমিই যথেষ্ট।’ (ইসরা ১৭/১৪)। অতঃপর যখন তারা স্ব স্ব আমলনামা দেখবে, তখন সেই সময়কার অবস্থা সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘সেদিন উপস্থিত করা হবে প্রত্যেকের আমলনামা। অতঃপর তাতে যা আছে তার কারণে তুমি অপরাধীদের দেখবে আতঙ্কিত। এ সময় তারা বলবে, হায় দুর্ভোগ আমাদের! এটা কেমন আমলনামা যে, ছোট-বড় কিছুই বাদ দেয়নি, সবকিছুই লিখে রেখেছে। তারা তাদের কৃতকর্মসমূহকে সম্মুখে উপস্থিত দেখতে পাবে। বস্তুত তোমার প্রতিপালক কারও প্রতি জুলুম করেন না।’ (কাহাফ ১৮/৪৯)।

অহংকার মানুষের একটি আত্মিক রোগ। এ সত্য বাক্যটি চিরন্তন। মানুষের জন্য অহংকার করার মতো কিছু নেই। কেননা সে তার রোগ-শোক, বার্ধক্য-জরা কিছুকেই প্রতিরোধ করতে পারে না। শতবার ওষুধ খেলেও আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া তার রোগ সারে না। শত চেষ্টায়ও আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া তার বিপদ দূরীভূত হয় না। ফলে সে একজন অসহায় ব্যক্তি ছাড়া কিছুই নয়। সুতরাং তার উচিত সর্বদা নিরহংকার ও বিনয়ী থাকা। তবে আবার অতিরিক্ত বিনয় অহংকারের মধ্যে গণ্য। অহংকার, লোভ, হিংসা মানুষকে ধ্বংস করে। ধ্বংসের কারণ অহংকার আর উত্তেজনা মানুষকে পতনের দিকে ধাবিত করে। এ রোগ কম বেশি প্রায় প্রতিটি নারী-পুরুষের মধ্যেই থাকে। তারপরও আল্লাহর পথের পথিক মু’মিন ব্যক্তি নিজ আত্মার সঙ্গে সংগ্রাম করে দমন করে রেখেছে এ দুরারোগ্য ব্যাধি। এটা খুবই সুন্দর যে তুমি অহংকারের উর্ধ্বে থাকবে এবং এটি করা গর্বের ব্যাপার।

অহংকার হলো শেষ অপরাধ যা সকল মহত্ব আবৃত করে পাপকে পরিপূর্ণ করে। সুতরাং অহংকার, দাম্ভিকতা,অহমিকা, খোদপসন্দী বা আত্মগৌরব থেকে নিজেকে সবসময় বিরত রাখতে হবে। তা না হলে আল্লাহ তাকে লাঞ্ছিত,অপমানিত ও অপদস্ত করে কঠিন শাস্তি প্রদান করবেন। আল্লাহ পবিত্র কোরআনে এরশাদ করেন ‘‘আল্লাহ শক্তিতে প্রবলতর ও শাস্তিদানে কঠোরতর’’ (সূরা আন্-নিসা,আয়াত-৮৪)। এ কারণেই পবিত্র কোরআন এবং হাদিসের আত্মগৌরব থেকে নিজেদেরকে বিরত রাখার ব্যাপারে তাগিদ দেয়া হয়েছে। কোনো মানুষরই আত্ম-গৌরব বা অহংকার করার মতো কিছুই নেই। কারণ আত্মগৌরব বা অহংকার শুধুমাত্র আল্লাহর। হাদিসে কুদসিতে বর্ণিত আছে,‘‘অহংকার হলো আমার (আল্লাহর) চাঁদর; বরত্ব আমার পরিধেয় বস্ত্র, আর যে ব্যক্তি এ দু’টি নিয়ে টানা-হেঁচড়া করলে আমি তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবো’’।

লেখকঃ গবেষক,সাবেক জাতীয় ক্রীড়াবিদ,
চেয়ারম্যান গ্রীণ ক্লাব, মানিকগঞ্জ,সাংবাদিক ও কলামিস্ট