আত্মরক্ষায় কারাতে

 

মোঃ আলতাফ হোসেন ঃঃ
আত্ম নিয়ন্ত্রণ,শৃঙ্খলা,নিয়মাবর্তিতা,অপরকে সম্মান করা ফুনাখুশির কারাতের মূল দর্শন। আর জাপানি কারাতে গুরু গিচিন ফুনাখুশি উদ্ভাবিত যার নাম মার্শাল আর্ট বা কারাতে। কারাতে বা মার্শাল আর্ট এর উৎপত্তির সঠিক ইতিহাস জানা না গেলে ও বিশেষজ্ঞদের ধারণা তিব্বত থেকে আদি কারাতের উৎপত্তি। বিশেষজ্ঞদের মতে, কারাতে জাপান হয়ে ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন দেশে পৌঁছায়। তবে এটা নির্দিধায় বলা যায় যে, আধুনিক কারাতের জন্ম দক্ষিন জাপানের অকিওহানা দ্বীপ থেকে। জাপানই কারাতকে সর্বাদিক জনপ্রিয় করার জন্য এটিকে খেলা হিসেবে প্রচার করেছে।এই খেলার জন্য খেলোয়াড়দের যথেষ্ট পরিমানে শারীরিক শক্তি অর্জন করতে হয়। এই খেলা শুধু মাত্র আত্মরক্ষামূলক নয়, এই খেলার লক্ষ্য হলো প্রতিপক্ষের আক্রমই প্রতিহত কারাসহ পাল্টা প্রতিঘাত করে শত্রুকে কাহিল করা। সুস্থ থাকার উপায় হিসেবে ওজন কমানোর জন্য মার্শাল আর্ট, কুংফু ও কারাতে খুব জনপ্রিয় ব্যায়াম। ডাব্লিউকেএফ(ওয়াল্ড কারাতে ফেডারেশন) কারাতে সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা। যার বিধি বিধান দ্বারা বিভিন্ন দেশের কারাতে ফেডারেশনের খেলা পরিচালিত হয়। অলিম্পিক, কমনওয়েলথ, এশিয়ান ও সার্ক গেমসে কারাতে ইভেন্ট অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। গত সার্ক গেমসে কারাতে ইভেন্টে আমাদের মার্শাল হিরো অর্থাৎ কারাতেবিদরা একাধিক স্বর্নপদক অর্জন করে দেশের সুনাম বৃদ্ধি করেছে। কারাতে ও কুংফু ইস্টাইলগত পার্থক্যের কারণে একসাথে প্রতিগোগিতা অনুষ্ঠিত হয় না। ডাব্লিউকেএফ-এর অফিসিয়াল ইস্টাইলের মধ্যে ০৪টি স্টাইল অন্তর্ভুক্ত করেছে।

সিতুরিও, সোতোকান-রিও,গুজারিও,উদা-রিও। কারাতে প্রতিযোগিতা দুটি গ্রুপে অনুষ্ঠিত হয়। কুমিতি (লড়াই) কাতা। কাতা বলতে, বুঝায় আত্মরক্ষামূলক কলাকৌশলের পূর্ব প্রস্তুতি বা কলাকৌশলের সম্মিলিত প্রশিক্ষণ। কাতা প্রতিযোগীতা জুনিয়র গ্রুপ ও সিনিয়র গ্রুপ এ দুই ভাগে হয়ে থাকে। কুমিতি বা লড়াই- প্রতিযোগীতা হয়ে থাকে ওজন শ্রেণিতে। বেল্ট অর্জন বা গ্রেডিং প্রত্যেকটি বেল্ট এর ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট সিলেবাস সম্পন্ন করার পর পরীক্ষার মাধ্যমে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদেরও বেল্ট প্রদান করা হয়। বেল্টের ধাপ গুলো হলো-সাদা,হলুদ,কমলা,সবুজ,নীল,বাদামী ও ব্লাক। প্রত্যেকটি স্টাইলই এই সাতটি বেল্টে উর্ত্তীণ হওয়ার পর ব্লাকবেল্ট প্রদান করা হয়। ব্লাকবেল্ট ডিগ্রী অর্জনের পরের ধাপ ড্যান, ব্লাকবেল্ট ১ম ড্যান থেকে ১০ পর্যন্ত হয়ে থাকে। এর মধ্যে ও অনেকে গ্রান্ডমাস্টার উপাধি অর্জন করে। কুমিতি বা লড়াই প্রতিযোগিতা তিনটি স্তরে হয়ে থাকে; ফুল কন্ট্রাক্ট,সেমিকন্ট্রাক্ট নন-কন্ট্রাক্ট। ডাব্লিউকেএফ, এ নন-কন্ট্রাক্ট ভিত্তিতেই খেলা পরিচালিত হয়ে থাকে। কারাতে শিখার মাধ্যমে গুরুজনদের ভক্তিশ্রদ্ধা শরীর ও মনকে সতেজ করে। আত্মরক্ষার মাধ্যমে শত্রুমুক্ত হওয়া এবং মুক্তচিন্তা ও বুদ্ধি বৃদ্ধির বিকাশ ঘটার মাধ্যমে আত্মবিশ্বাসী হওয়া যায়। আজ কাল কারাতেসহ খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে-শিশু কিশোররা। প্রচন্ত প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে বাচ্চাদের আরো যোগ্য প্রতিযোগিতা-হিসেবে গড়ে তোলার দিকেই নজর দিচ্ছে অভিভাবক মহল। মাঠের স¦ল্পতার দরুন ও কম্পিউটার গেমকেই বাচ্চাদের বিনোদনের একমাত্র মাধ্যম হয়ে উঠেছে। এর ফলে মেধায় শানিত হলেও খেলাধুলার অভাবে শারীরিকভাবে অপরিশ্রমী হয়ে উঠেছে। শরীরকে সুস্থ ও সবল রাখতে খেলাধুলার কোনো বিকল্প নেই। আর সে খেলাধুলা যদি হয় মার্শাল আর্ট তা হলেই তো আর কোনো কথাই নেই। কারাতে বা মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষণের পূর্বে কিছু ব্যায়াম করে নিলে ভালো হয়। কারণ যে কোনো খেলাধুলার পূর্বেই ওয়ার্ম আপ এবং ব্যায়াম করার প্রয়োজন হয়। অনেকেই ব্যায়াম শুরু করার আগে ওয়ার্ম আপ করেন না। কিন্তু এটি শরীরের জন্যে খুবই ক্ষতিকর বা বিপজ্জনক। কারণ ব্যায়ামের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ওয়ার্ম আপ। ওয়ার্ম আপ এর মাধ্যমে শরীর ও মন দুটোকেই ব্যায়ামের জন্যে তৈরী করা হয়। বিভিন্ন খেলার জন্যে ওয়ার্ম আপ কিংবা ব্যায়ামের ধরণ আলাদা আলাদ। কারাতে একটি দীর্ঘ মেয়াদী প্রশিক্ষণ। তাছাড়া কঠোর অনুশীলনের মাধ্যমেই শিক্ষার্থীকে প্রতিটি ধাপ এগোতে হয়। তাই কারাতে প্রতিক্ষণের পূর্বে শিক্ষার্থীকে কিছু ওয়ার্ম আপ এবং ব্যায়াম করে নিতে হয়। যাতে শরীর নমনীয় হয় এবং মন সতেজ থাকে। শরীর যত নমনীয় হবে প্রশিক্ষণার্থীর জন্য ততো ভাল হবে অনুশীলনে। কারাতে ব্যায়াম কিছুক্ষণ করার পর মূল কার্যক্রমে অর্থাৎ আজকের লেসন শুরু করা যেতে পারে। গত নবম পর্বে ছিল উল্কাগিরী অর্থাৎ সাইড কিক। আজ দশম পর্বে থাকছে মাউশিগিরী।

মাউশিগিরী: মাউশিগিরী শুরু করার পূর্বে আগের লেসন গুলো করে নিলে ভাল হয়। আগের লেসন শেষ হলে মাউশিগিরীর জন্য প্রস্তুত হবে প্রশিক্ষণার্থী। ঠিক আগের মতই যে কোন লেসন শুরু করার পূর্বে কিবাডাসি পজিশনে থাকতে হবে। আর কিবাডাসি পজিশনে আসার পূর্বে সালাম, বো করে তার পর কিবাডাসি পজিশনে আসতে হবে প্রশিক্ষাণার্থীকে। দুই হাত মুষ্টিবদ্ধ অবস্থায় কোমরে থাকবে দুই হাটুর উপর ভর করে । হাটু দুটি ভাঙ্গা অবস্থায় পরিমাণ মতো একটু ফাক করে দাঁড়াতে হবে যাতে বডি সোজা অবস্থায় থাকে এবং হাটুর উপর বডির ব্যালেন্স থাকে। এ অবস্থাকে কিবাডাসি পজিশন বলে। প্রথমে ডান পায়ে মাউশিগিরী মারার সময় কোমরে থাকা মুষ্টিবদ্ধ হাত দুটি ক্রস করে ঠিক সায়মন সখি পজিশনে থাকবে সেই সাথে ডান পা টি বাম পায়ে টাচ করে পিছনের দিকে চলে যাবে। বাম হাতটি বাম হাটুর উপর এবং ডান হাতটি ডান কোমড়ে থাকবে। এখান থেকে হোইস শব্দের মাধ্যমে মাউশিগিরী মারতে হবে। মাউশিগিরী মারার সময় প্রশিক্ষণার্থীর হাত দুটো আর্টফুল অবস্থায় থাকবে। অর্থাৎ বাম হাতের উপরে থাকবে ব্লক অবস্থায়। একই সাথে ডান পায়ের পাতা দিয়ে সজোরে কিক বা লাথি মারতে হবে। আর এভাবে কিবাডাসি থেকে সরাসরি ঘুরিয়ে লাথি বা কিক করাকে মাউশিগিরী বলে। মাউশিগিরী কিক বা লাথির মধ্যের এটা চতুর্থ। ইতি পূর্বে কিঙ্গারী, উসাঠাকিরী,উল্কাগিরী করা হয়েছে। এ পর্বে থাকছে মাউশিগিরী । প্রথামে ডান পায়ে মাউশিগিরী করা হয়েছিল এবার বাম পায়ে একি কায়দায় মারতে হবে মাউশিগিরী। মারার পূর্বে সায়মন সখি পজিশন থেকে আবার কিবাডাসি পজিশনে আসতে হবে। কিবাডাসি পজিশন থেকে এবার বাম পা টি ডান পায়ে টাচ করে সোজা পিছনের দিকে চলে যাবে একই সাথে ডানা হাতটি থাকবে হাটু ভাঙ্গা ডান পায়ের উপর এবং বাম হাতটি থাকবে বাম কোমড়ে মষ্টিবদ্ধ অবস্থায় অর্থাৎ সায়মন সখি পজিশনে। এবার বাম পায়ে মাউশিগিরী ঠিক ডান পায়ে যে ভাবে মারা হয়েছিল একই কায়দায় মারতে হবে। মাউশিগিরী মারার সময় অবশ্যই প্রশিক্ষণার্থীকে হোইস শব্দ করে মারতে হবে। এবার মারার সময় বাম হাতটি ডান হাতের উপরে আর্টফুল অবস্থায় অর্থাৎ ব্লক অবস্থায় থাকবে একই সাথে বা পা টি ঘুরিয়ে সজোরে পায়ের পাতা দিয়ে কিক বা লাথি মারতে হবে। শিক্ষার্থীকে মনে রাখতে হবে যে, যত বার মাউশিগিরী মারবে ডান পা অথবা বাম পা ততোবারই হোইস শব্দের মাধ্যমে মারতে হবে এবং বডি ও পায়ের পাতা আর্টফুল অবস্থায় একই সমান্তরাল ভাবে থাকবে । এভাবে পা বদল করে একাধিক বার মাউশিগিরী করে নিলে ভাল হয়। কারণ যত বেশি অনুশীলন করবে শিক্ষার্থী ততো বেশী পারফেক্ট হবে তার প্রতিটি লেসন। মাউশিগিরী অনুশীলনের মাধ্যমে হাত ও পায়ের কৌশল রপ্ত হয় এবং বিশেষ করে পায়ের শক্তি বৃদ্ধিতে মাউশিগিরীর জুরি নেই। সেই সাথে একজন প্রতিযোগী মাউশিগিরী ব্যবহারের মাধ্যমে তার প্রতিপক্ষকে অতি সহজেই ঘায়েল করতে পারবে। হাতের চেয়ে পায়ের শক্তি কয়েকগুণ বেশি। শুধু তাই নয় হাতের চেয়ে পা দ্বারা আঘাত করলে অর্থাৎ মাউশিগিরী মারলে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা সহজ হয়। কারণ মাউশিগিরীর মাধ্যমে বেশ দূরুত্ব নিয়ে প্রতিপক্ষকে কিক বা লাথি মারা যায় যা হাতের পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ হাতের চেয়ে পায়ের শক্তিই শুধু বেশি নয় দূরুত্বের দিক থেকে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে ও কার্যকর ভুমিকা রাখতে সক্ষম মাউশিগিরী অনুশীলনের মাধ্যমে।

লেখকঃ সাবেক জাতীয় ক্রীড়াবিদ (কারাতে ব্লাক বেল্ট ১ম ড্যান) সভাপতি শারীরিক
শিক্ষাবিদ সমিতি,চেয়ারম্যান গ্রিন ক্লাব,গবেষক,শিক্ষক,সাংবাদিক ও কলামিস্ট