আল্লাহর গোপন তত্ত্বের দৃঢ়মনা বন্ধু হযরত নূহ (আ.)

 

মো.আলতাফ হোসেন ঃঃ
নবী-রাসূলরা আল্লাহর মনোনীত ও প্রেরিত পুরুষ।পৃথিবীর বুকে আল্লাহর একত্ববাদের প্রতিষ্ঠা ও তাঁর দ্বীন প্রচারের জন্য আল্লাহ তাঁদের নির্বাচিত করেছেন। পৃথিবীতে আল্লাহ তা’য়ালা অসংখ্য নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন। তাঁদের ভেতর ২৫ জনের নাম পবিত্র কোরআনে উল্লেখ আছে। নবী রাসূলদের মধ্যে ১৮ জনের নাম সূরা আনআমের ৮৩ থেকে ৮৬ নম্বর আয়াতে একত্রে বর্ণিত হয়েছে এবং বাকিদের নাম অন্যত্র এসেছে। প্রথম মানুষ আদম (আ.)-এর মাধ্যমে পৃথিবীতে নবী আগমনের ধারাক্রম শুরু হয় এবং মহানবী মুহাম্মাদ (সা.) এর মাধ্যমে তা শেষ হয়। ঐতিহাসিকরা কোরআন-হাদিসে বর্ণিত নবী-রাসূলদের আগমনের একটি ধারাক্রম বর্ণনা করেন। এই ধারাক্রম যতটা না কোরআন-হাদিস নির্ভর তার চেয়ে বেশি ইতিহাস-আশ্রিত। তবে কোরআনের আয়াত থেকেও নবী-রাসূলদের (আ.) ধারাক্রম সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

আল্লাহর প্রেরিত পুরুষদের ভেতর প্রথম রাসূল নূহ (আ.)। আল্লাহ তা’য়ালা তাঁকে সর্বপ্রথম শরীয়ত দান করেন। আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত,এক দীর্ঘ হাদিসে এসেছে,কেয়ামতে দিশাহারা মানুষ নূহ (আ.)-কে বলবে, আপনি পৃথিবীতে প্রেরিত প্রথম রাসূল। আপনি আমাদের জন্য সুপারিশ করুন। (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৪৩১২)।

হযরত নূহ (আ.)-এর প্রকৃত নাম আব্দুল গাফফার। নূহ তাঁর উপাধি। নূহ অর্থ হলো অধিক ক্রন্দনকারী। তিনি আল্লাহর ভয়ে অধিক ক্রন্দন করতেন বলে তাঁর উপাধি হয় নূহ এবং এ নামেই তিনি সমধিক প্রসিদ্ধি লাভ করেন। নূহ (আ.)-এর স্ত্রীর নাম নায়েলা। নূহ (আ.)-এর ৪ পুত্র সন্তান যথাক্রমে হাম,সাম, ইয়াফাস ও কেনান। হযরত নূহ আ.) এর জন্ম বর্তমান ইরাকের মুছেল নগরীর উত্তর প্রান্তে। নূহ (আ.) এর প্রকৃত নামের ব্যাপারে নানা মত লক্ষ্য করা যায়। কেউ কেউ বলেছেন তাঁর প্রকৃত নাম ছিলো আবদুল গাফফার। আবার কারো মতে,‘ইয়াশকুর’। অনেক পন্ডিতদের মতে,তাঁর প্রকৃত নাম ছিলো আবদুল জব্বার। কেউ কেউ তাঁর নাম ইদ্রীস ছিলো বলেও মত প্রকাশ করেন। হযরত নূহ (আ.) তাঁর উম্মতের গুণাহের জন্য অধিক কাঁদতেন বিধায় তাঁর নাম হয় নূহ (আ.)।

আবু উমামা (রা.) এর বর্ণনা মতে, আদম (আ.) এর আগমনের এক হাজার বছর পর নূহ (আ.) এর আগমন হয়। (সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস : ১৪/৪০)। ঐতিহাসিকদের মতে,নূহ (আ.) এর জাতির নাম ছিলো রাসিব। তারাই পৃথিবীতে প্রথম শিরক ও মূর্তিপূজার প্রচলন করে। আধুনিক যুগের ইতিহাস গবেষকদের ধারণা, খ্রিস্টপূর্ব দুই থেকে চার হাজার বছর আগে নূহ (আ.) এর আগমন হয়।

মানুষ এক আল্লাহর একত্ববাদ ছেড়ে নানা জিনিসের পূজা করাসহ ইসলামের নানা বিধান অস্বীকার করা শুরু করে। বিশেষ করে হযরত নূহ (আ.) এর উম্মতদের থেকে প্রবলভাবে এই কাজের সূত্রপাত ঘটে। ওয়াদ, সুওয়া‘,ইয়াগূছসহ নানা গোত্রের মানুষ কবর এবং মানুষের মূর্তি বানিয়ে তাদের পূজা করা শুরু করে। কালক্রমে তাদের কাছ থেকেই আরবদের নিকট মূর্তিপূজার উপস্থিতি ঘটে। নূহ আ. এর কওম নানাবিধ সামাজিক অনাচারে মগ্ন হয়ে গিয়েছিলো। এই জাতিকে গোমরাহী থেকে মুক্ত করার জন্যই আল্লাহ নূহ (আ.)কে প্রেরণ করেছিলেন।

পবিত্র কোরআনের একাধিক স্থানে নূহ (আ.)-এর বর্ণনা এসেছে। তিনি তাঁর মূর্তিপূজারি জাতিকে সাড়ে ৯০০ বছর ইসলামের দাওয়াত দেন কিন্তু খুব সামান্য সংখ্যক মানুষই তা গ্রহণ করে। অতঃপর তাদের অবাধ্যতার জন্য আল্লাহ মহাপ্লাবনের মাধ্যমে সেই জাতিকে ধ্বংস করে দেন। তাদের পরিণতি সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে,‘আমি নুহকে তার জাতির কাছে প্রেরণ করেছিলাম। সে তাদের মধ্যে ৫০ বছর কম এক হাজার বছর অবস্থান করে। অতঃপর মহাপ্লাবন তাদের গ্রাস করে। কারণ তারা ছিলো সীমালঙ্ঘনকারী।’(সূরা : আনকাবুত,আয়াত-১৪)

আল্লাহ পাক যুগে যুগে হেদায়েত ও সত্য দ্বীনসহ নবী রাসূল পাঠিয়েছেন,যাতে দ্বীনকে পৃথিবীর অন্য সকল প্রকার মতবাদের ওপর বিজয়ী করা যায়। সুরা তাওবা-৩৩ আয়াতে আল্লাহ পাক বলেন,আল্লাহই তার রাসূলকে হেদায়েত (বাস্তবায়নের পথ)ও সত্য দ্বীন (দ্বীন মানে জীবন বিধান) সহকারে পাঠিয়েছেন যাতে তিনি একে সকল প্রকার বিধানের ওপর বিজয়ী করেন,মুশরিকরা তা যতোই অপছন্দ করুক না কেনো। পৃথিবীতে মহান আল্লাহ অসংখ্য নবী রাসূল পাঠিয়েছেন কিন্তু নবীদের প্রকৃত সংখ্যা সম্পর্কে সম্পূর্ণ সঠিক তথ্য কারো কাছেই নেই। এ ব্যাপারে হযরত আবুজার গিফারী (রা.) বর্ণিত রাসূল (সা.)-এর এ সংক্রান্ত হাদীসই আমাদের একমাত্র সম্বল। ঐ হাদীসের তথ্য অনুসারে নবীদের সংখ্যা ১ লক্ষ ২৪ হাজার এবং ৩১৫ জন হলো রাসূল। (মিশকাত হা/৫৭৩৭,সিলসিলা ছহীহাহ হা/২৬৬৮)
ইসলাম ধর্মে যে ৭টি বিষয়ের ওপর বিশেষ করে ঈমান আনতে বা বিশ্বাস স্থাপন করতে বলা হয়েছে তার মাঝে একটি হলো এই যাবতীয় আসমানী কিতাব, যা সরাসরি আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হয়েছিলো। ইসলাম ধর্মমতে,পৃথিবী সৃষ্টির পর থেকে সর্বমোট আসমানী কিতাব পাঠানো হয়েছে ১০৪টি। তার মধ্যে ৪টি হলো প্রধান আসমানী কিতাব ও বাকি ১০০টি সহিফা। প্রধান চারটি আসমানী কিতাব হলো: তাওরাত,যা অবতীর্ণ হয় আল্লাহর বাণীবাহক হযরত মুসা (আ.)-এর ওপর,যাবুর,যা অবতীর্ণ হয় আল্লাহর বাণীবাহক হযরত দাউদ (আ.)-এর ওপর,ইঞ্জিল,যা অবতীর্ণ হয় আল্লাহর বাণীবাহক হযরত ঈসা (আ.)-এর উপর এবং কোরআন সর্বশেষ এবং পরিপূর্ণ আসমানী কিতাব,যা অবতীর্ণ হয় আল্লাহর বাণীবাহক মুহাম্মাদ-এর ওপর। যাঁদের ওপর আসমনী কিতাব নাযিল হয়েছে তাঁরাই কেবলমাত্র রাসূল। কোরআনে উল্লিখিত সকল রাসূলই নবী কিন্তু সকল নবী রাসূল নয়। মুসলিমরা বিশ্বাস করে আল্লাহ্ কর্তৃক প্রেরিত সকল পয়গম্বর সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

মহান আল্লাহ তা‘য়ালা আল-কোরআনের ২৯টি সূরায় হযরত নূহ (আ.)-এর ঘটনা তুলে ধরেছেন। কোনো কোনো সূরায় একাধিকবারও বর্ণিত হয়েছে। একটি সূরা তো পূর্ণাঙ্গভাবে তাঁর ও তাঁর জাতি প্রসঙ্গেই অবতীর্ণ হয়েছে। সূরাটির নাম‘নূহ’। স্বীয় জাতির সঙ্গে নূহ (আ.)-এর যে ঘটনা ঘটেছিলো তা এক বিরাট কাহিনী,যা বহুবিধ শিক্ষা ও অভিজ্ঞতায় পরিপূর্ণ। সে কারণ উক্ত কাহিনী বিশেষ গুরুত্ব লাভে সক্ষম হয়েছে। এটি নানা বৈশিষ্ট্যমন্ডিতও বটে। কারণ: (১) নূহ (আ.) ছিলেন মানব জাতির জন্য প্রথম রাসূল। আর যিনি প্রথম হন তার কিছু বৈশিষ্ট্যও থাকে। (২) নিজ জাতির মধ্যে সুদীর্ঘকাল তাঁর অবস্থান ছিলো। (৩) তিনি ‘উলুল আযম’ বা দৃঢ়মনা রাসূল ছিলেন। (৪) কোরআনে বেশি মাত্রায় তাঁর প্রসঙ্গ আলোচিত হয়েছে। ২৯টি সূরার ৪৩ স্থানে তাঁর কথা এসেছে। বলা চলে কোরআনের এক চতুর্থাংশ সূরায় প্রসঙ্গটি স্থান পেয়েছে।

হযরত নূহ (আ.) প্রায় ৯৫০ বৎসর কালেমার দাওয়াত দিয়েছেন। এই দীর্ঘ সময়ে মাত্র ৭০-৮২ জন লোক আল্লাহ পাকের ওপর ঈমান এনেছেন। বাকি লোকেরা ঈমানতো আনেনি বরং নূহ (আ.) কে তিরস্কার করেছিলো। নূহ (আ.) ক্লান্ত শ্রান্ত হয়ে অবশেষে আল্লাহ পাকের নিকট তাঁর কওমের ওপর আযাব নাজিলের জন্য দোয়া করেন। আল্লাহ পাক তার দোয়া কবুল করেন। হযরত নূহ (আ.) যখন তাঁর জাতিকে কুফর শিরক ও খোদাদ্রোহিতা থেকে ফেরাতে ব্যর্থ হলেন, তখন তিনি তাদের ধ্বংসের জন্য আল্লাহর নিকট দোয়া করেন।
পবিত্র কোরআন সে বক্তব্যটি উল্লেখ করেছে। মহান আল্লাহ বলেন: নূহ আমাকে বললো,হে আমার মালিক, আমি আমার জাতিকে দিবস রজনীতে, কালে-বিকালে সাড়ে নয়শ’বছর দাওয়াত দিয়েছি। তারা আমার শোনেনি, বরং শিরক ও কুফরীতে লিপ্ত থেকেছে। যতোই দীনের দাওয়াত দিয়েছি,তাদের অবাধ্যতার মাত্রা বেড়ে গিয়েছে। এবার আমি বলছি,আপনি তাদের নির্মূল করে দিন। আযাব পাঠিয়ে ধ্বংস করে দিন। নতুবা এরা এতোই খারাপ হয়ে গেছে যে,নিজেরা তো হেদায়াত পাবেই না,বরং এদের থেকে জন্ম নেয়া পরবর্তী প্রজন্মও কাফের মুশরিকই হবে। এরপর কওমে নূহকে আল্লাহ জলোচ্ছ্বাস,বন্যা দিয়ে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করে দেন। কেবল একটি নৌযানে অল্প কিছু ঈমানদার হযরত নূহ (আ.) এর সাথে দুনিয়ায় থেকে যায়। (আল কোরআনের সূরা নূহ এর ২৬-২৭ নং আয়াতের ভাবার্থ)।
হযরত নূহ (আ.) এর নৌকাটি ৭ তলা বিশিষ্ট করে তৈরি করা হয়েছিলো। প্রথম তলায় আদম (আ.)-এর তাবু, ২য় তলা মোমেনগণকে নিয়ে নূহ (আ.),৩য় তলায় পাখিকুল,৪র্থ তলায় হিংস্র জন্তু,৫ তলায় পশুকূল, ৬ষ্ঠ তলায় সকল বস্তু,৭ম তলায় বীজ, ঘাস এবং ফলমূল রাখা হয়েছিলো। রজব মাসের দুই তারিখ থেকে মরহম মাসের ১০ তারিখ পর্যন্ত তিনি ৬ মাস ৮ দিন নৌকায় ছিলেন। পরে এই নৌকা জুদী পর্বতে ভিড়ে। তৌরাতে এ পর্বতের নাম আরারাত পর্বত। প্রাচীন ইতিহাসে উল্লেখিত আছে যে, নূহ (আ.)-এর নৌকার ভগ্নাবশেষ এখনো ইরাকে অনেকের কাছে রক্ষিত আছে। নৌকা থেকে অবতরণ করে পুনরায় নূহ (আঃ) দুনিয়ায় আবাদ শুরু করেন। তাঁর ছেলে সাম-এর বংশধরের আরবে আজমে এবং পশ্চিমে মরক্কোতে গিয়ে শহর গড়ে তোলে। জাম এর বংশধররা হিন্দুস্থানে এবং উয়াফেসের বংশধররা তুর্কীস্থানে গিয়ে বসতি স্থাপন করে।

যেহেতু ঐ সময়ে নূহ (আঃ)-এর জাতি ব্যতীত আর কোন মানবগোষ্ঠীর বসতি ধরাবক্ষে ছিলো না এবং তাদের মধ্যে কতিপয় লোক যারা নূহ (আ.)-এর ওপর ঈমান এনেছিলেন তারা ব্যতীত গোটা জাতি আল্লাহকে অস্বীকার করেছিলো আর রাসূলের প্রতি হঠকারিতা দেখিয়েছিলো, সেহেতু আল্লাহ নূহ ও সেই ক’জন মুমিনকে রেখে সেদিনের পৃথিবীর গোটা মানবজাতিকে ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। ফলে সত্যের পথে আপতিত বাধাবিঘ্ন প্রতিরোধকারী স্বল্প সংখ্যক হকের ঝাঞ্জাবাহকদের খাতিরে আল্লাহ তা‘য়ালা কাফিরদের ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। যদিও তারা ছিলো সংখ্যাগুরু। সে সময়ে রিসালাতের পতাকা বাহকরা ছাড়া যে আর কেউ বেঁচে ছিলেন না তার প্রমাণ আল্লাহর বাণী-‘তোমরা তাদের সন্তান, যাদের আমি নূহের সাথে কিশতীতে তুলে ছিলাম’ (ইসরা ১৭/৩)।

আল্লাহ তা’য়ালা পৃথিবীতে অগণিত নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন। তাঁরা হলেন পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি। পৃথিবীতে আল্লাহ তায়ালা মিশন বাস্তবায়ন করার জন্যই নবী-রাসূলদের পাঠিয়েছেন। তাদের পাঠানোর উদ্দেশ্য হলো-১. আল্লাহর বাণী পৌঁছানো : নবী-রাসূলদের কাজ হলো আল্লাহর নাজিলকৃত বিধান মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া। আল্লাহ তা’য়ালা এরশাদ করেনÑ ‘হে রাসূল! আপনাদের প্রতিপালকের নিকট থেকে আপনার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে তা প্রচার করুন, যদি না করেন তবে তো আপনি তাঁর বার্তা প্রচার করলেন না’ (সূরাঃ মায়িদা,আয়াত-৬৭)। ২. সত্যের দিকে আহ্বান : নবী-রাসূলদের প্রধান কাজ হলো সত্য ও ন্যায়ের দিকে আহ্বান। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন- ‘বলুন! এটাই আমার পথ। আমি (মানুষকে) আল্লাহর দিকে ডাকব’ (সূরা ইউসুফ-১০৮)। অন্যত্র ইরশাদ করেন, ‘আর তার কথার চেয়ে কার কথা অধিক সুন্দর যে (মানুষকে) আল্লাহর দিকে ডাকে এবং নেক কাজ করে, আর বলে আমি মুসলিম’ (সূরা ফুসসিলাত-৩৩)। আরো ইরশাদ করেনÑ ‘হে আমার জাতি! আমার কী হলো, আমি তোমাদের ডাকছি মুক্তির দিকে আর তোমরা আমাকে ডাকছ দোজখের দিকে’ (সূরাঃ গাফির-৪১)। ৩. জ্ঞান-বিজ্ঞান শিক্ষা দান : জ্ঞান হলো আলো। নবী-রাসূলরা মানুষদের নির্ভুল ও ওহি প্রদত্ত জ্ঞান-বিজ্ঞান শিক্ষা দিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন,‘আল্লাহ মুমিনদের ওপর বিরাট অনুগ্রহ করেছেন যে, তাদের নিজেদের মধ্য থেকেই নবী পাঠিয়েছেন, যে তাদের নিকট তাঁর আয়াত পাঠ করেন, তাদেরকে পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করেন এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেন, যদিও তারা আগে ছিল স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে’ (সূরা আলে ইমরান-১৬৪)। ৪. দ্বীনকে বিজয়ী করা : পৃথিবী আল্লাহর, ফলে পৃথিবীতে আইন চলবে একমাত্র আল্লাহর। এ লক্ষ্যে নবী-রাসূলরা কাজ করেছেন। আর এ পথে তাঁরা আজীবন পরিশ্রম করেছেন। আল্লাহ তা’য়ালা এরশাদ করেন,‘তিনি ওই সত্তা যিনি তাঁর রাসূলকে হিদায়াত ও সত্য দ্বীন দিয়ে পাঠিয়েছেন, যাতে সব বাতিল ধর্মের ওপর ইসলামকে বিজয়ী করতে পারে’ (সূরা সফ-৯)। ৫. জান্নাতের সুসংবাদ দান এবং জাহান্নামের ভয় প্রদর্শন করা : আল্লাহ তা’য়ালা নবী-রাসূলদের জান্নাতের সুখ-শান্তির সুসংবাদদাতা এবং জাহান্নামের কঠিন আজাবের ভয় প্রদর্শনকারী হিসেবে পাঠিয়েছেন। আল্লাহ তা’য়ালা এরশাদ করেন-‘আর আপনার নিকটাত্মীয়দেরকে জাহান্নামের ভয় দেখান’ (সূরা শুয়ারা-২১৪)। অন্যত্র এরশাদ করেন,‘শাস্তির আগমন দিন সম্পর্কে ওদের সতর্ক করুন’ (সূরা ইব্রাহিম-৪৪)। অন্যত্র এরশাদ করেন-‘সত্যসহ আপনাকে সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে পাঠিয়েছি’ (সূরা ফাতির-২৪)। অন্যত্র ইরশাদ করেনÑ সমস্ত মানুষ ছিলো একই উম্মতভুক্ত। অতঃপর আল্লাহ নবীদের সুসংবাদদাতা ও সর্তককারী হিসেবে পাঠান’ (সূরা বাকারা-২১৩)। ৬. আল্লাহর ইবাদত করার ও তাগুতকে বর্জন করার নির্দেশ দান : আল্লাহ মানবজাতিকে তাঁর ইবাদত করার ও তাগুতকে বর্জন করার নির্দেশ দেয়ার জন্য নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন। যেমন আল্লাহর বাণী-‘আল্লাহর ইবাদত করার ও তাগুতকে বর্জন করার নির্দেশ দেয়ার জন্য আমি প্রত্যেক জাতির কাছে রাসূল পাঠিয়েছি। (সূরাঃ নাহল-৩৬)
যে কয়েকটি মহাবৈপ্লবিক ঘটনা মানব ইতিহাসের গতিধারা পাল্টে দিয়েছিলো নূহ (আ.)-এর সময়ের মহাপ্লাবন এর অন্যতম। এই ঘটনা ছিলো মানবজাতির জন্য একটি দৃষ্টান্ত ও শিক্ষা। যা পৃথিবীতে এক নতুন সভ্যতার জন্ম দিয়েছিলো। আল কোরআনের একাধিক স্থানে নূহ (আ.)-এর সময়ের মহাপ্লাবনের বর্ণনা এসেছে। নূহ (আ.)-এর জাতি ঠিক কোন স্থানে বসবাস করতো সে ব্যাপারে কোরআন-হাদিসে স্পষ্ট কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না। তবে কোরআনের একটি আয়াত থেকে ধারণা পাওয়া যায়,নূহ (আ.)-এর জাতি বর্তমান ইরাকের মসুলের নিকটবর্তী কোনো এলাকায় বসবাস করতো। পবিত্র কোরআনের সে আয়াতে বলা হয়েছে,‘বলা হলো,“হে জমিন তোমার পানি চুষে নাও,হে আসমান তুমি ক্ষান্ত হও। পানি (প্রচন্ড ঢেউ) প্রশমিত হলো। আল্লাহর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলো। নৌকা জুদি পর্বতে স্থির হলো। বলা হলো, অত্যাচারী সম্প্রদায় কতই না দূরে।”(সূরা ঃ হুদ ঃ আয়াত- ৪০)

জুদি পর্বতের তুর্কি নাম কুদি বা কুর্দি। ইরাক, ইরান,তুরস্ক ও সিরিয়ার সীমান্ত জুড়ে বিস্তৃত এই পর্বতমালা। সেই হিসাবে কোরআনের ব্যাখ্যাকার ও বেশির ভাগ ঐতিহাসিকের মত নূহ (আ.)-এর জাতি উত্তর ইরাকে বসবাস করতো। যার বর্তমান নাম মসুল। তবে আধুনিক যুগের কোনো ঐতিহাসিকের দাবি,নূহ (আ.)-এর জাতি তুরস্কে বসবাস করতো। কেননা তুরস্কের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে নূহ (আ.)-এর নৌকার ধ্বংসাবশেষ পাওয়ার দাবি করছে দেশটি। ব্যাবিলনের প্রাচীন নিদর্শনাবলিতে বাইবেলপূর্ব যেসব প্রাচীন শিলালিপি ও প্রস্তুরফলক পাওয়া গেছে, সেসব থেকেও এর সত্যতা প্রমাণিত হয়। বলা হয়,ইরাকের মসুল নগরীর আশপাশেই তাদের আবাসস্থল ছিলো। মসুলের উত্তরে ইবনে ওমর (রা.) দ্বীপের আশপাশে ও আর্মেনিয়া সীমান্তে অবস্থিত আরারাত পর্বতের ধারে নুহ (আ.)-এর বিভিন্ন নিদর্শন এখনো চিহ্নিত করা হয়। নখচিওয়ানের অধিবাসীদের মধ্যে আজও এ কথা প্রচলিত আছে যে, এ শহরের ভিত্তিস্থাপন করেছিলেন নূহ (আ.)। (সিরাতে সরওয়ারে আলম)

হযরত আদম (আ.) থেকে নূহ (আ.) পর্যন্ত দশ শতাব্দীর ব্যবধান ছিলো। যার শেষদিকে ক্রমবর্ধমান মানবকুলে শিরক ও কুসংস্কারের আবির্ভাব ঘটে এবং তা বিস্তৃতি লাভ করে। ফলে তাদের সংশোধনের জন্য আল্লাহ নূহ (আ.)-কে নবী ও রাসূল করে পাঠান। তিনি সাড়ে নয়শত বছরের দীর্ঘ বয়স লাভ করেছিলেন এবং সারা জীবন পথভোলা মানুষকে পথে আনার জন্য দাওয়াতে অতিবাহিত করেন কিন্তু তাঁর কওম তাঁকে প্রত্যাখ্যান করে। ফলে আল্লাহর গজবে তারা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। এরপরে আরও কয়েকটি কওম আল্লাহর অবাধ্যতার কারণে পরপর ধ্বংস হয়। এভাবে পৃথিবীতে আদি যুগে ধ্বংসপ্রাপ্ত ৬টি জাতির ঘটনা কোরআনের বিভিন্ন স্থানে বর্ণিত হয়েছে এবং কোরআনের মাধ্যমেই জগদ্বাসী তাদের খবর জানতে পেরেছে। যাতে মুসলিম উম্মাহ ও পৃথিবীবাসী তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে। উক্ত ৬টি জাতি হলো-কওমে নূহ,‘আদ, ছামূদ, কওমে লূত,মাদইয়ান ও কওমে ফেরাঊন। অবশ্য কোরআনে এ তালিকায় কওমে ইব্রাহিমের কথাও এসেছে (তওবাহ ৯/৭০)। যদিও তারা একত্রে ধ্বংস হয়নি। তবে ইবরাহীমের ভাতিজা লূত-এর কওম একত্রে ধ্বংস ও নিশ্চিহ্ন হয়েছিলো।
পৃথিবীতে আল্লাহর যতো গজব নাজিল হয়েছিলো নূহ (আ.) এর সময়ের মহাপ্লাবন এর অন্যতম। এই ঘটনা ছিলো মানবজাতির জন্য একটি মহা দৃষ্টান্ত ও শিক্ষা। যা পৃথিবীতে এক নতুন সভ্যতার জন্ম দিয়েছিলো। আল কোরআনের একাধিক স্থানে নূহ (আ.) এর সময়ের মহাপ্লাবনের বর্ণনা এসেছে। পূর্ববর্তী আসমানি গ্রন্থেও গুরুত্বের সঙ্গে নূহ (আ.) মহাপ্লাবনের ইতিহাস বিবৃত হয়েছে। কোরআনের বর্ণনা মতে, নূহ (আ.) এর জাতি আল্লাহ ও তাঁর নবীর প্রতি সীমাহীন ঔদ্ধত্য প্রকাশ করায় আল্লাহ তাদের সমূলে ধ্বংস করেন। তার আগে তিনি নূহ (আ.)-কে প্রকাশ্য এক নৌকা তৈরির নির্দেশ দেন। নূহ (আ.) এর জাতি নৌকা তৈরিসহ মুমিনদের প্রস্তুতি দেখে হাসাহাসি করে এবং তাতে বাধা প্রদানের চেষ্টা করে। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ অবাধ্যদের ডুবিয়ে হত্যা করেন এবং মুমিনদের রক্ষা করেন।মুমিনদের সঙ্গে পশু-পাখিদেরও আল্লাহ রক্ষা করেন। নূহ (আ.)-এর চার পুত্র ছিলো-সাম,হাম,ইয়াফিছ ও ইয়াম অথবা কেনান। অবিশ্বাসীদের দলভুক্ত হওয়ায় নূহ (আ.) এর প্রথম তিনজন পুত্র ঈমান আনেন কিন্তু শেষোক্ত জন কাফের হয়ে প্লাবনে ডুবে মারা যায়।

মানুষ প্রথমে হেদায়তের উপরই ছিলো,অতপর তারা পরস্পরে বিরোধ করে,ফলে তাদেরকে শিক্ষাদীক্ষা ও আখেরাতের ভয় প্রদর্শনের জন্য আল্লাহ তা’য়ালা নবী রাসূল প্রেরণ করেন। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, “তিনিই নিরক্ষরদের মধ্য থেকে একজন রসূল প্রেরণ করেছেন,যিনি তাদের কাছে পাঠ করেন তার আয়াতসমূহ,তাদেরকে পবিত্র করেন এবং শিক্ষা দেন কিতাব ও হিকমত। ইতিপূর্বে তারা ছিলো ঘোর পথভ্রষ্টতায় লিপ্ত।” (সূরাঃ জুম’আ,আয়াত-২) কিন্তু লোকজন রাসুলদের দাওয়াতে দু’ভাগ হয়ে যায়,একদল রাসূলদেরকে বিশ্বাস করেন,তাদের উপর ঈমান আনেন, অন্যদল তাদেরকে মিথ্যারোপ করেন, তাদের প্রেরিত বিষয়ে অস্বীকার করেন।তারা সীমালঙ্ঘন করে নবী রাসুলদেরকে মিথ্যারোপ করেন। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, সকল মানুষ একই জাতি সত্তার অন্তর্ভুক্ত ছিলো।অতঃপর আল্লাহ তা’য়ালা পয়গম্বর পাঠালেন সুসংবাদদাতা ও ভীতি প্রদর্শনকরী হিসাবে। আর তাঁদের সাথে অবর্তীণ করলেন সত্য কিতাব,যাতে মানুষের মাঝে বিতর্কমূলক বিষয়ে মীমাংসা করতে পারেন। বস্তুতঃ কিতাবের ব্যাপারে অন্য কেউ মতভেদ করেনি;কিন্তু পরিষ্কার নির্দেশ এসে যাবার পর নিজেদের পারস্পরিক জেদবশতঃ তারাই করেছে, যারা কিতাব প্রাপ্ত হয়েছিলো। অতঃপর আল্লাহ ঈমানদারদেরকে হেদায়েত করেছেন সেই সত্য বিষয়ে,যে ব্যাপারে তারা মতভেদ লিপ্ত হয়েছিলো। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা,সরল পথ বাতলে দেন।” (সূরাঃ বাকারা,আয়াত-২১৩)
প্রত্যেক নবী তার স্বীয় সম্প্রদায়ের নিকট একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য এসেছেন, তাদের যা উপযোগী তা নিয়ে ও তাদেরকে পবিত্র করতে। যে ব্যক্তি কোনো একজন রাসুলকে অস্বীকার করলো সে যেনো সব রাসুলকেই অস্বীকার করলো,অতঃএব যে ঈসা (আ.) এর ওপর ঈমান আনলনা, সে মূলত মূসা (আ.) এর উপরও ঈমান আনেনি,আর মুহাম্মাদ (সা.) এসেছেন ঈসা ও মূসা (আ.) এর শরিয়তকে রহিত করতে। আল্লাহ তায়া’লা বলেন,“আমি আপনার প্রতি অবতীর্ণ করেছি সত্যগ্রন্থ,যা পূর্ববতী গ্রন্থ সমূহের সত্যায়নকারী এবং সেগুলোর বিষয়বস্তুর রক্ষণাবেক্ষণকারী। অতএব,আপনি তাদের পারস্পারিক ব্যাপারাদিতে আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন,তদনুযায়ী ফয়সালা করুন এবং আপনার কাছে যে সৎপথ এসেছে, তা ছেড়ে তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করবেন না।’’(সূরাঃ মায়েদা,আয়াত-৪৮)

সকল নবী রাসূলের দাওয়াতের মুল বিষয় তাওহীদ বা আল্লাহর একত্ববাদ। নবীগণ ছিলেন মহান আল্লাহর পুত পবিত্র দূত। তাঁরা দিকভ্রান্ত মানুষকে আলোর পথ দেখিয়েছেন। বলে দিয়েছেন অনন্ত জান্নাতের পথ। জান্নাতের নিয়ামত অসীম। মানুষ যা কল্পনাও করতে পারবে না তার চেয়ে ঢের নিয়ামত সেখানে। মহান আল্লাহর এসব নবীগণ তাঁর নির্দেশ অনুযায়ী উম্মতের মাঝে দ্বীনের কাজ করেছেন। অবশেষে মহান আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন।

ইবনে আববাস (রা.) বলেন,তিনি চল্লিশ বছর বয়সে নবুয়ত প্রাপ্ত হন এবং মহাপ্লাবনের পর ষাট বছর জীবিত ছিলেন। ফলে সুদীর্ঘকাল যাবত তিনি নবী হিসাবে শিরকে নিমজ্জিত হঠকারী কওমকে দাওয়াত দেন। প্লাবনের পর তাঁর সাথে নৌকারোহী মুমিন নর-নারীদের মাধ্যমে পৃথিবীতে নতুনভাবে আবাদ শুরু হয় এবং তাদেরকে তিনি সত্যের পথে পরিচালিত করেন। এ কারণে তাঁকে ‘মানব জাতির দ্বিতীয় পিতা’ বলা হয়।

আল্লাহর গোপন তত্ত্বের দৃঢ়মনা বন্ধু হযরত নূহ (আ.) হযরত নূহ (আ.) হলেন আবুল বাশার ছানি বা মানবজাতির দ্বিতীয় পিতা। কারণ তাঁর সময় সারা পৃথিবী বন্যায় প্লাবিত হয়। কোরআন অনুসারে,নূহ (আ.) সাড়ে নয়শত বছরের দীর্ঘ বয়স লাভ করেছিলেন এবং সারা জীবন মানুষকে সঠিক পথে আনার জন্য কাজ করেন। কিন্তু তাঁর জাতি তাকে প্রত্যাখ্যান করে। ফলে তাঁর জাতি ভয়াবহ বন্যায় ধ্বংস হয়ে যায়। আদম (আ.) ৯৬০ বছর বেঁচে ছিলেন এবং নূহ (আ.) ৯৫০ বছর জীবন পেয়েছিলেন। নূহ (আ.) এর পুরুষানুক্রমিক বয়স তাঁর ন্যায় দীর্ঘ ছিলো না। উল্লেখ্য যে,আদম ও নূহ (আ.) এর দীর্ঘ বয়স আল্লাহর বিশেষ দান ও তাদের মুজেযা স্বরূপ ছিলো। হযরত নূহ (আ.) এর কবর নিয়ে বিভিন্ন উক্তি রয়েছে। লেবানন,জর্ডান,ইরাক এবং তুরস্কের কোথাও অবস্থান রয়েছে বলে উল্লেখ আছে। হযরত নূহ (আ.) এর কবর মসজিদে হারাম মতান্তরে বিকা শহরে অবস্থিত বলে জানা যায়। যেটি বর্তমানে ‘কারক-ই নুহ’ নামে পরিচিত। সেখানে একটি মসজিদও নির্মাণ করা হয়েছে। (কোরআনুল কারীম,তাফসীর ইবনে কাসীর,কুরতুবী)

লেখকঃ গবেষক,সাবেক জাতীয় ক্রীড়াবিদ,
চেয়ারম্যান গ্রিন ক্লাব,মানিকগঞ্জ,সাংবাদিক ও কলামিস্ট