আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের একটি কার্যকর উপায় হলো তাওয়াক্কুল

 

মো.আলতাফ হোসেন ঃঃ
‘তায়াক্কুল’ অর্থ আল্লাহর ওপর ভরসা করা। যে সমস্ত গুণে গুণান্বিত হলে মানুষ আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের সৌভাগ্য অর্জন করতে পারে তায়াক্কুল সে সব গুণের মধ্যে অন্যতম।

তাওয়াক্কুল একটি আরবি শব্দ। তাওয়াক্কুল এর অর্থ ভরসা করা, নির্ভর করা। তাওয়াক্কুল আলাল্লাহ অর্থ হলো আল্লাহর ওপর ভরসা করা। ইসলামে তাওয়াক্কুল একটি ইবাদাত (উপাসনা)। আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো উপাস্যের ওপর তাওয়াক্কুল করা শির্ক হিসেবে গণ্য হয়।
আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল রাখা মু’মিনদের একটি বৈশিষ্ট্য। আল্লাহ তাঁর রাসূল-কেও তাঁর ওপর তাওয়াক্কুল করতে নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুলকারীকে আল্লাহ ভালোবাসেন। সুতরাং আল্লাহর ভালোবাসা লাভের একটি কার্যকর উপায় হলো তাওয়াক্কুল। আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুলকারীর সাহায্যের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।

ইসলামে তাওয়াক্কুল হলো,মানুষ কল্যাণকর বিষয় অর্জনের জন্য সাধ্যমত চেষ্টা করবে আর ফলাফলের জন্য আল্লাহর ওপর ভরসা করবে এবং তাকদিরের উপর বিশ্বাস রাখবে। তাওয়াক্কুল অর্থ সর্বশক্তিমান আল্লাহ তা’য়ালার ওপর নিভর্রতা, সোপর্দ, ভরসা ও সমর্পণ করা। মানুষের চলমান জীবনে পদে পদে আপদ-বিপদ, সমস্যা, সংকট, দুর্যোগ, অভাব, প্রাকৃতিক বিপর্যয়, বিবিধ রোগব্যাধি, কষ্টে কষ্টে দিশেহারা হয়ে নৈরাশ্যের মধ্যে হাবুডুবু খাওয়া যেমন অপরাধ, তেমনি পাপের ভাগীদার হওয়া অবশ্যম্ভাবী।

‘তাওয়াক্কুলের’ অর্থ হলো আল্লাহকে নিজের অভিভাবক নিযুক্ত করা এবং তাঁর উপর পূর্ণভাবে ভরসা করা। অভিভাবক তাকেই বলে যিনি তাঁর অধীনস্ত লোকের কল্যাণের কথা চিন্তা করেন এবং অকল্যাণ হতে বাঁচিয়ে রাখেন। হাত-পা গুটিয়ে ঘরে বসে থাকার নাম আল্লাহর ওপর ভরসা (তাওয়াক্কুল) নয়, বরং আল্লাহর দেয়া সুযোগ সুবিধা ও উপায় উপকরণসমূহ কাজে লাগিয়ে ফলাফলের জন্য তাঁর উপর নির্ভর করার নামই হচ্ছে তাওয়াক্কুল। তাওয়াক্কুল অবলম্বন প্রসঙ্গে আল্লাহ তা’য়ালা এরশাদ করেনঃ ‘‘আর তোমরা একমাত্র আল্লাহর ওপর ভরসা করো, যদি তোমরা মু’মিন হও। (সূরা মায়িদা- আয়াত ৫ঃ ২৩) আল্লাহ তা’য়ালা আরো এরশাদ করেন, ‘‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওয়াক্কুলকারী লোকদেরকে ভালোবাসেন। (সূরা আলে ইমরান, আয়াত-৩-১৫৯) তিনি আরো এরশাদ করেন, আর যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর তায়াক্কুল কওে তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। (সূরা আলাক, আয়াত ৬৫ঃ ৩)

রাসূল (সা.) বলেন, আল্লাহ তা’য়ালার প্রতি যেরূপ তাওয়াক্কুল করা উচিত তোমরা যদি তার প্রতি সেরূপ তাওয়াক্কুল করতে পার, তবে তিনি তোমাদের রিযিক দান করবেন, যেম পশু-পক্ষীকে রিযিক দিয়ে থাকেন। পশু-পক্ষীরা সকালে ক্ষুধার্ত অবস্থায় নিজ নিজ অবস্থান থেকে বেরিয়ে যায় এবং দিন শেষে পূর্ণ উদয়ে তৃপ্ত হয়ে নিজ নিজ বাসস্থানে ফিরে আসে।

তাওয়াক্কুলের নীতি অবলম্বনকারী ব্যক্তি কখনো হতাশ হয় না। আশা ভঙ্গ হলে মুষড়ে পড়ে না। বিপদ-মুসীবত, যুদ্ধ-সংকটে ঘাবড়ে যায় না। যে কোনো দুর্বিপাক, দুর্যোগ, সঙ্কট, বিপদ-মুসীবতে আল্লাহ তা‘য়ালার ওপর দৃঢ় আস্থা রাখে। ঘোর অন্ধকারে আশা করে উজ্জ্বল সুবহে সাদিকের। যত যুলুম, অত্যাচার, নির্যাতন-নিপীড়নের ঝড়-তুফান আসুক, কোনো অবস্থাতেই সে আল্লাহ ব্যতীত কাউকে ভয় করে না। নবী করিম (সা.) বলেন, ‘আমরা তো কেবল তোমাদের মতই মানুষ, কিন্তু আল্লাহ তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা অনুগ্রহ করেন। আর আল্লাহর অনুমতি ছাড়া তোমাদের কাছে প্রমাণ নিয়ে আসার সাধ্য আমাদের নেই। আর কেবল আল্লাহর ওপরই মু’মিনদের তাওয়াক্কুল করা উচিত’।

হযরত ইব্রাহিম (আঃ) কে যখন কাফিরগণ চড়কে বেঁধে নমরূদেও অগ্নিকুন্ডে নিক্ষেপ করছিলো, তখন তিনি বলেছিলেন, আল্লাহই আমার সাহায্যও জন্য যথেষ্ট এবং তিনিই আমার উত্তম কর্মনির্ধারক। ফলে আল্লাহ তা’য়ালা আগুনের প্রতি নির্দেশ দেন, হে আগুন! তুমি ইব্রাহিমের প্রতি শান্তি-দায়ক ঠান্ডা হয়ে যাও। (সূরা আম্বিয়া, ২১-৬৯) (সুবহানাল্লাহ) মহান আল্লাহর ওপর তায়াক্কুল করলে, তার বিনিময় এরূপই হয়ে থাকে। যেসব বিষয়ে আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ ক্ষমতা রাখে না সেসব বিষয়ে ভরসা করা। যেমন-অলৌকিক সাহায্য ও নিরাপত্তার জন্য মৃত বা অনুপস্থিত কারো ওপর ভরসা করা। এ প্রকারের ভরসা বড় শির্ক হিসেবে গন্য।

বাহ্যিক উপায় উপকরণের ওপর নির্ভর করা। যেমন-কারো ঐ ক্ষমতার উপর ভরসা করা, যা আল্লকে দিয়েছেন। এ প্রকারের ভরসা অবৈধ ও ছোট শির্ক হিসেবে গণ্য। কাউকে কোনো কাজে নিযুক্ত করা। যে জন্য তাকে নিযুক্ত করা হলো, তা অর্জনের ব্যাপারে তার ওপর ভরসা না করে আল্লাহর ওপর ভরসা করা। এটা ইসলামে বৈধ। যদি আল্লাহ তোমাদেরকে সাহায্য করেন তবে তোমাদের ওপর বিজয়ী কেউ নেই। আর যদি তিনি তোমাদেরকে লাঞ্ছিত করেন তবে কে এমন আছে যে, তোমাদেরকে এর পরে সাহায্য করবে? আর আল্লাহর ওপরই যেনো মু’মিনগণ তাওয়াক্কুল করে। (সূরা আল,ইমরান-৩:১৬০)

তাওয়াক্কুল তো এমন সত্তার ওপর করা উচিত, যিনি চিরঞ্জীব। তিনি হলেন আল্লাহ। আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো ওপর তাওয়াক্কুল করা জায়েয নয়। তাওয়াক্কুল একটি ইবাদত। যেমন, আল্লাহ এ আয়াতে তাঁর ওপর তাওয়াক্কুল করতে আদেশ করেছেন। এটা শুধু আল্লাহর জন্যই নিবেদন করতে হয়। যদি কেউ এমন কথা বলে, ‘চিন্তা নেই, আল্লাহর রাসূল শাফা‘আত করে আমাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তির ব্যবস্থা করবেন।’ তাহলে সে আল্লাহর রাসূলের ওপর তাওয়াক্কুল করে শির্ক করলো। এমনিভাবে যদি কেউ বলে আমি আব্দুল কাদের জিলানীর ওপর ভরসা রাখি। তাহলে সে শির্ক করলো। তাওয়াক্কুল-ভরসা একমাত্র আল্লাহর ওপরই করতে হবে।

‘‘মু’মিন তো তারা, যাদের অন্তরসমূহ কেঁপে উঠে যখন আল্লাহকে স্মরণ করা হয়। আর যখন তাদের ওপর তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করা হয় তখন তা তাদের ঈমান বৃদ্ধি করে এবং যারা তাদের রবের ওপরই ভরসা করে।’’ (সূরা আল আনফাল, আয়াত: ২)
আল্লাহ তা‘য়ালার ওপর তাওয়াক্কুল হলো তাওহীদের একটি গুরত্বপূর্ণ অংশ। আল্লাহ তা‘য়ালা বলেছেন: ‘‘আর মু’মিনগণ যখন সম্মিলিত বাহিনীকে দেখল তখন তারা বলল, ‘আল্লাহ ও তাঁর রাসূল আমাদের যে ওয়াদা দিয়েছেন এটি তো তাই। আর আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সত্যই বলেছেন’। এতে তাদের ঈমান ও ইসলামই বৃদ্ধি পেল।’’ (সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ২২) ‘‘যাদেরকে মানুষেরা বলেছিলো যে, ‘নিশ্চয়ই লোকেরা তোমাদের বিরুদ্ধে একত্র হয়েছে। সুতরাং তাদেরকে ভয় করো’ কিন্তু তা তাদের ঈমান বাড়িয়ে দিয়েছিলো এবং তারা বলেছিলো, ‘আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং তিনি কতই না উত্তম কর্মবিধায়ক’! অতঃপর তারা ফিরে এসেছে আল্লাহর পক্ষ থেকে নিআমত ও অনুগ্রহসহ। কোনো মন্দ তাদেরকে স্পর্শ করে নি এবং তারা আল্লাহর সন্তুষ্টির অনুসরণ করেছিলো। আর আল্লাহ মহা অনুগ্রহশীল।’’ (সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৭৩-১৭৪)

সূরা আনফালের উল্লেখিত আয়াতে ঈমানদারদের তিনটি গুণাগুণ আলোচিত হয়েছে যথা (১) যদি আল্লাহকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তার অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে। (২) যখন তাঁর আয়াত বা বাণী তিলাওয়াত করে অথবা শুনে তখন এতে তার ঈমান বৃদ্ধি পায়। ঈমান আরো দৃঢ় হয়। (৩) তারা আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে। পরবর্তী আয়াতে আরো দু’টি গুণ উল্লেখ করা হয়েছে। তাহল, সালাত কায়েম করে এবং যাকাত আদায় করে- আল্লাহর পথে দান-সদকা করে। সূরা আনফালের দুই ও তিন নম্বর আয়াতে ঈমানদারদের গুরুত্বপূর্ণ এ পাঁচটি গুণ উল্লেখ করা হয়েছে। চার নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, যাদের এ গুণগুলো আছে তারাই সত্যিকার মু’মিন। তাদের জন্য রয়েছে তাদের রবের কাছে মর্যাদা, ক্ষমা ও সম্মানজনক জীবিকা।

কেয়ামত সংঘটিত হবার পর হাশরের ময়দানে যা ঘটবে, তার কিছু চিত্র আল্লাহ আহকামুল হাকেমীন তাঁর রাসূল মুহাম্মাদ (সা.)কে দেখিয়েছেন। হাশরের ময়দানে উম্মতের সংখ্যার বিচারে মুহাম্মাদ (সা.) এর উম্মত সংখ্যাগরিষ্ঠ হবেন। হাদীসে এসেছে তিনি উম্মাতের সংখ্যাধিক্য নিয়ে গর্ব করবেন।অনেক নবী এমন হবেন, যাদের কোনো অনুসারী থাকবে না। এটাকে তাদের ব্যর্থতা বলে গণ্য করা হবে না। কারণ, তারা উম্মাতের হিদায়াতের জন্য যথাসাধ্য মেহনত করেছিলেন। ফলাফল তো তাদের আয়ত্বে ছিলো না। উম্মতে মুহাম্মাদীর থেকে সত্তর হাজার লোক বিনা হিসাবে ও বিনা শাস্তিতে জান্নাতে যাবে। কারণ, তারা তাওয়াক্কুলের পরীক্ষায় প্রথম স্থান লাভ করেছে। তাদের তাওয়াক্কুলের প্রকাশ ছিলো এমন যে, তারা কারো ঝাড়-ফুঁক করে নি। ঝাড়-ফুঁকের জন্য কারো কাছে যায় নি। তারা অশুভ লক্ষণে বিশ্বাস করে নি। অন্য বর্ণনায় আরেকটি গুণের কথা আছে। আর তা হলো, তারা আগুনের ছ্যাকা দেয় নি। ইসলাম কোনো কিছুকে অশুভ লক্ষণ মনে করা অনুমোদন করে না। মানুষের সমাজে অনেক অশুভ লক্ষণের ধারনা আছে। যেমন, কালো বিড়ালকে অশুভ ভাবা হয়। তের সংখ্যাকে অশুভ ধরা হয়। কোনো কোনো তারিখকে অশুভ বলে গণ্য করা হয়। কখনো কখনো পশু পাখির হাক ডাককে অশুভ ধারনা করা হয় ইত্যাদি। যত প্রকার অশুভ লক্ষণ বলে মানুষ ধারণা করে, সব ইসলাম বাতিল করে দিয়েছে। ঝাড়-ফুঁক দু ধরণের। শরী‘আত অনুমোদিত ঝাড়-ফুঁক আর শরী‘আত পরিপন্থী ঝাড়-ফুঁক। যে সকল ঝাড়-ফুঁক কোরআন বা সহীহ হাদিস অনুযায়ী হবে তা জায়েয। আর যা এর বাহিরে হবে তা শির্ক বলে বিবেচিত হবে। যারা জায়েয ঝাড়-ফুঁক-কেও পরিহার করে চলে এ হাদিসে তাদের প্রশংসা করা হয়েছে । না জায়েয ঝাড়-ফুঁকতো শুধু তাওয়াক্কুলেরই খেলাফ নয়। তা তাওহীদেরও খেলাফ। এ হাদিসে যে ঝাড়-ফুঁককে তাওয়াক্কুলের খেলাফ বলা হয়েছে তাহল জায়েয ঝাড়-ফুঁক। আর না জায়েয ঝাড়-ফুঁক করলে তো তাওয়াক্কুল দূরের কথা ঈমানই থাকে না।
কোনো নেককার আলিম, বুযুর্গ ব্যক্তিকে ‘আমার জন্য দো‘আ করুন’ বলা না জায়েয নয়। সাহাবায়ে কেরাম রাসূলুল্লাহ (সা.)কে এ রকম বলেছেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) চলে যাওয়ার পর সাহাবীগণ এ রকম বলতেন। যেমন, উমর (রা.) আব্বাস (রা.)কে বলেছিলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) জীবিত থাকাকালে আমরা দো‘আ করার সময় তার উসীলা নিতাম। মানে তাকে দো‘আ করতে বলতাম। এখন তিনি নেই। আমরা আপনার উসীলা নিচ্ছি, বৃষ্টির জন্য আপনাকে দো‘আ করতে অনুরোধ করছি।

নবী করিম (সা.) এর বাণী ও হাদীস নিয়ে গবেষণা করার বৈধতা প্রমাণিত হলো রাসূলুল্লাহ (সা.) এর জীবদ্দশায় সাহাবায়ে কেরাম তাঁর কথা ও বাণী নিয়ে আলোচনা ও গবেষণা করেছেন। রাসূল (সা.) তাতে বাধা দেননি বরং সেই সত্তর হাজার লোক কারা হবে, তা প্রথমে বলেন নি। বিষয়টি গোপন রেখে তাদের গবেষণা ও চিন্তা-ভাবনা করতে উৎসাহিত করেছেন। যে সকল ঝাড়-ফুঁক বৈধ, তাহল, কোরআনের আয়াত, হাদিসে বর্ণিত কোনো দো‘আ দ্বারা ঝাড়-ফুঁক করা। কেউ এ রকম ঝাড়-ফুঁক করলে কোনো গুনাহ হবে না। যদি কেউ ঝাড়-ফুঁকের জন্য আসে তখন তাকে বৈধ পন্থায় ঝাড়-ফুঁক না করে ফিরিয়ে দেওয়াও ঠিক হবে না। ভালো কাজে সাহাবায়ে কেরাম প্রতিযোগিতা করতেন। কেউ পিছনে থাকতে চাইতেন না।

আল্লাহর রাসূল সা: কিভাবে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করতেন। তিনি তার জীবনে বিভিন্ন উপায় এবং বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করেছেন। কৌশলগুলো তিনি বৈধভাবে, বৈধ উপায়ে করেছেন। যেমনÑ তার হিজরতের ঘটনা থেকে জানা যায়, রাতের অন্ধকারে সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে তিনি হযরত আবু বকর (রা:) কে সাথে নিয়ে মক্কা থেকে বের হয়েছিলেন। তিনি তো দিনের বেলায় বের হননি। এটা তার সর্বোচ্চ সাবধানতা অবলম্বন করার একটি উদাহরণ। মক্কা থেকে মদিনা উত্তর দিকে। অথচ তিনি বের হওয়ার সময় দক্ষিণ দিকে রওনা হয়েছিলেন। যাতে কেউ বুঝতে না পারে যে, তিনি মদিনায় চলে যাচ্ছেন। তিনি তো আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে ঘরে বসে থাকেননি।

সূরাতুল রা’দ এর ১১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, ‘আল্লাহর সাহায্যের প্রধানতম শর্ত হচ্ছে চেষ্টা করা। আল্লাহ তা’য়ালা ততক্ষণ পর্যন্ত একটা জাতির ভাগ্যের পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ পর্যন্ত না সেই জাতি তার নিজের ভাগ্য নিজে পরিবর্তন করে। নিজের ভাগ্যের পরিবর্তনের জন্য আগে নিজেদের চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। তারপর ভরসা করতে হবে আল্লাহর ওপর।

তাওয়াক্কুলের নীতি অবলম্বনকারী ব্যক্তি কখনো হতাশ হয় না। আশা ভঙ্গ হলে মোসড়ে পড়ে না। বিপদ-মুসীবত, যুদ্ধ-সংকটে ঘাবড়ে যায় না। যে কোনো দুর্বিপাক, দুর্যোগ, সঙ্কট, বিপদ-মুসীবতে আল্লাহ তা’য়ালার ওপর দৃঢ় আস্থা রাখে। ঘোর অন্ধকারে আশা করে উজ্জ্বল সুবহে সাদিকের। যত জুলুম, অত্যাচার, নির্যাতন-নিপীড়নের ঝড়-তুফান আসুক, কোনো অবস্থাতেই সে আল্লাহ ব্যতীত কাউকে ভয় করে না।

তাই আল্লাহ তা’য়াালার ওপর তাওয়াক্কুল হল তাওহীদের একটি গুরত্বপূর্ণ অংশ। কোরআনের আলোকে তাওাক্কুল “আর মু’মিনগণ যখন সম্মিলিত বাহিনীকে দেখল তখন তারা বলল, ‘আল্লাহ ও তাঁর রাসূল আমাদের যে ওয়াদা দিয়েছেন এটি তো তাই। আর আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সত্যই বলেছেন’। এতে তাদের ঈমান ও ইসলামই বৃদ্ধি পেলো।” (সূরা আহযাব: ২২) “যাদেরকে মানুষেরা বলেছিল যে, ‘নিশ্চয়ই লোকেরা তোমাদের বিরুদ্ধে একত্র হয়েছে। সুতরাং তাদেরকে ভয় করো’। কিন্তু তা তাদের ঈমান বাড়িয়ে দিয়েছিলো এবং তারা বলেছিলো, ‘আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং তিনি কতোই না উত্তম কর্মবিধায়ক’! অতঃপর তারা ফিরে এসেছে আল্লাহর পক্ষ থেকে নিআমত ও অনুগ্রহসহ। কোনো মন্দ তাদেরকে স্পর্শ করেনি এবং তারা আল্লাহর সন্তুষ্টির অনুসরণ করেছিলো। আর আল্লাহ মহা অনুগ্রহশীল।” (সূরা আলে ইমরান : ১৭৩-১৭৪) ৩। “আর তুমি ভরসা কর এমন চিরঞ্জীব সত্তার উপর যিনি মরবেন না।” (সূরা আল ফুরকান: ৫৮) “আর আল্লাহর ওপরই মু’মিনদের ভরসা করা উচিত।” (সূূরা ইবরাহীম : ১১)

আল্লাহ পাক পবিত্র কোরআনে এরশাদ করেন, অর্থাৎ আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। এ জন্যই মহান স্রষ্টা আল্লাহ পাকের রহমত কামনায় মোনাজাত করা অপরিহার্য। আল্লাহ পাক বলেছেন, ‘‘অর্থাৎ তোমরা যদি প্রকৃত মু’মিন (বিশ্বাসী) হও, তাহলে কায়মনে অতি তাওয়াক্কুলের সঙ্গে মহান আল্লাহর প্রতি সম্পূর্ণ সমর্পণ করে দাও। আল্লাহ তা’য়ালা সবকিছু আনজাম করে দেবেন। এ ছাড়া আল্লাহ পাক আরও বলেছেন,‘‘আল্লাহ তা’য়ালা সেসব লোককে ভালোবাসেন, যারা সম্পূর্ণ আল্লাহর ওপর নির্ভরশীল।
হযরত মুহাম্মাদ (সা.) বলেছেন, কোনো মানুষ যদি অšন্তর-হৃদয় দিয়ে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে, নিঃসন্দেহে তিনি তার সমুদয় কাক্সিক্ষত মনের আশা পূরণ করে দেন।

তিনি আরও বলেছেন, অর্থাৎ মহান স্রষ্টার ওপর যে সবর ও তাওয়াক্কুল করে আল্লাহই তার জন্য যথেষ্ট। এক আল্লাহ পাকই তার যথেষ্ট। তাওয়াক্কুল সম্পর্কে মহান রাব্বুল আলামিন পবিত্র কোরআনে অসংখ্য আয়াত অবতীর্ণ করেছেন। তাওয়াক্কুল কী ধরনের তার প্রমাণ-নিদর্শন দেখলে হতবাক হতে হয়।

হযরত ইব্রাহিমকে (আ.) যখন নরপিশাচ নমরুদের ভয়ঙ্কর আগুনে নিক্ষেপ করার জন্য চরকিতে বসানো হলো, তখন তিনি বলেন, ‘‘অর্থাৎ সর্বশ্রেষ্ঠ ভরসা, তাওয়াক্কুল একমাত্র আল্লাহই। তিনিই আমার জন্য যথেষ্ট। হযরত ইব্রাহিম (আ.) চরকি থেকে নিক্ষিপ্ত হয়ে যখন শূন্যে মাঝপথে ছিলেন, তখন হযরত জিবরাইল (আ.) এলেন। তিনি বললেন, ‘আপনার কোনো ভয়সংকুল, আতঙ্কিত মনে হয় কি? আপনি মহাসমস্যা, সংকটে আছেন বলে মনে হয়? তখন আল্লাহর নবী হযরত ইব্রাহিম (আ.) বললেন, ‘আমি একমাত্র মহান স্রষ্টার ওপর তাওয়াক্কুল হয়ে আছি। তারই ওপর ভরসা করে আছি। তিনিই আমার জন্য যথেষ্ট।

আল্লাহর ওপর ভরসা সম্পর্কে হাদীস : হযরত আনাস (রা.) হতে বর্ণিত, এক ব্যক্তি বলল, হে আল্লাাহর রাসূল! আমি কি উট বেঁধে রেখে আল্লাহর ওপর ভরসা করব, না বন্ধনমুক্ত রেখে? তিনি বললেন, উট বেঁধে নাও, অতঃপর আল্লাহর ওপর ভরসা কর। (তিরমিযি)
তাওয়াক্কুলের বাস্তবায়ন এবং বৈধ উপায়-উপকরণ অবলম্বন করার সাথে সাথে হৃদয়কে মহান আল্লাহর সাথে সম্পৃক্ত করার জন্য এ উদাহরণটি উল্লেখযোগ্য: রাসূলুল্লাহ (সা.) হিজরতের সময় মদিনার দিকে যাওয়ার জন্য মক্কা থেকে উল্টা দিকে গমন করেন। আর তা ছিলো রাতের আঁধারে। অত:পর তাঁরা ‘ছওর’নামক গুহায় আত্মগোপন করেন।

আবু বকর (রা.) নবী (সা.) এর হিজরতের ঘটনা বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেন, আমরা যখন ‘গারে ছওরে’ ছিলাম তখন আমি উপর দিকে দৃষ্টি দিয়ে দেখলাম মুশরেকদের পা আমাদের মাথার ঠিক উপরেই। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! তাদের কেউ যদি নিজের পায়ের দিকে তাকায় তাহলেই আমাদেরকে দেখতে পাবে। তখন তিনি আমাকে বললেন, “আমাদের দুইজন সম্পর্কে তোমার ধারণা কি হে আবু বকর! আল্লাহ আমাদের তৃতীয় জন। অর্থাৎ আমাদের সাহায্যকারী।” (বুখারী ও মুসলিম)

সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করবে, সে অকল্পনীয়ভাবে তার মর্যাদা লাভ করবে, তার ফলাফল ভোগ করবে। আর সে হবে সর্বাধিক উন্মুক্ত হৃদয়ের মানুষ, সবচাইতে সুখি মানুষ। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে তার জন্য তিনিই যথেষ্ট।’(-সূরা ত্বালাক: ৩) তাওয়াক্কুলের ফল কিন্তু অতি উত্তম। আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করলে মন শান্ত থাকে, মনে প্রশান্তি আসে। যেটাকে বলা হয় পিস অব মাইন্ড। আমরা বলতে পারি, আল্লাহ তো রাজাধিরাজ। তিনি যা ইচ্ছা তা-ই করতে পারেন। এটাই মু’মিনের জন্য পিস অব মাইন্ড, প্রশান্তি। তাই আমাদের আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। একজন ঈমানদার মানুষ ভালো ও কল্যাণকর বিষয় অর্জনের জন্য সকল ব্যাপারে নিজের সাধ্যমত চেষ্টা করবে, সার্বিক প্রচেষ্টা চালাবে আর ফলাফলের জন্য আল্লাহ তা‘য়ালার ওপর ভরসা করবে, তাঁর প্রতি আস্থা ও দৃঢ় ইয়াকীন রাখবে। বিশ্বাস রাখবে যে, আল্লাহ যা লিখে রেখেছেন ফলাফল তা-ই হবে। আর তাতেই রয়েছে কল্যাণ চূড়ান্ত বিচার ও শেষ পরিণামে। বাহ্যিক দৃষ্টিতে যদি আমরা তা অনুধাবন না-ও করতে পারি। এটাই তাওয়াক্কুলের মূলকথা।

মূলকথা সব কিছুই আল্লাহর নিয়ন্ত্রনে । জীবনের সর্বক্ষেত্রে সব সময় আল্লাহর ওপর ভরসা খুবই জরুরি। তাই সর্বাবস্থায় আল্লাহর ওপর নির্ভরশীল হওয়া এবং তাঁর ওপরই তায়াক্কুল করা সকলের কর্তব্য। কেননা, যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে, আল্লাহ তার জন্য যথেষ্ট হয়ে যান।

লেখকঃ গবেষক,সাবেক জাতীয় ক্রীড়াবিদ,
চেয়ারম্যান গ্রীণ ক্লাব, মানিকগঞ্জ,সাংবাদিক ও কলামিস্ট