আল্লাহ ও বান্দার মধ্যকার এক স্থায়ী অঙ্গিকারের নাম ঈমান

 

মো.আলতাফ হোসেন ঃঃ
ঈমান অর্থ বিশ্বাস । ইসলামি শরীয়তের সকল বিষয়গুলো মনেপ্রাণে বিশ্বাস করা, মুখে স্বীকার করা ও মেনে চলা বা কাজে প্রকাশ করার নাম ঈমান। আর যার ঈমান আছে তাকে বলা হয় মু’মিন। মু’মিন হওয়ার প্রথম শর্ত হলো কালিমা পাঠ করা, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুুল্লাহ। এক আল্লাহর প্রতি পরিপূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করা, তার প্রেরিত কিতাব সমূহ, নবী রাসূলগন, ফেরেশতাগন, মৃত্যু, কিয়ামত ও আখিরাত এবং তকদীর এর উপর বিশ্বাস করার নাম ঈমান।

ইসলামকে শুধু সত্য ও সুন্দর জানা বা বলার নাম ঈমান নয়। কারণ, হক ও সত্যকে শুধু জানা বা মুখে বলা ঈমান সাব্যস্ত হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। ঈমান তো তখনই হবে যখন এই সত্যকে মনেপ্রাণে কবুল করবে এবং এর সম্পর্কে অন্তরে কোনো দ্বিধা থাকবে না। ইসলাম তো ‘আকীদা’ ও ‘শরীয়ত’-এ দুইয়ের সমষ্টির নাম। এ দুটোর বিশ্বাস এবং মেনে নেওয়ার দ্বারাই ঈমান সাব্যস্ত হতে পারে। ‘শরীয়ত’ অর্থ, দ্বীনের বিধিবিধান ও ইসলামী জীবনের নবী-আদর্শ, কোরআন যাকে মু’মিনের জন্য উসওয়ায়ে হাসানা সাব্যস্ত করেছে।

ইমান শব্দটি আমনুন মূল ধাতু থেকে নির্গত। যার অর্থ -বিশ্বাস করা, আস্থা স্থাপন করা,স্বীকৃতি দেওয়া,নির্ভর করা, মেনে নেওয়া ইত্যাদি। ইসলামি পরিভাষায়, শরিয়তের যাবতীয় বিধি-বিধান অন্তরে বিশ্বাস করা,মুখে স্বীকার এবং তদনুযায়ী আমল করাকে ইমান বলে।ইমানের পরিচয় সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সা.)বলেন- ইমান হচ্ছে আল্লাহ,তাঁর ফেরেশতাকুল কিতাবসমূহ, রাসূলগণ, পরকাল এবং ভাগ্যের ভালো -মন্দের(ভালো -মন্দ আল্লাহ তা’য়ালার পক্ষ থেকেই হয়) প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা।(মুসলিম)

কালেমার প্রথম অংশ হলো ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’। এ কথা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করা, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, কোনো উপাস্য নেই। তিনি একক, অদ্বিতীয়। তিনি সব পারেন, সব করেন। সব ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব একমাত্র তাঁরই অধীন। তিনি সব ধরণের দুর্বলতা, ক্রু’টি থেকে সম্পূণরূপে মুক্ত ও পবিত্র। সামান্য থেকে সামান্যতম বিষয়েও সবাই তার মুখাপেক্ষী, কিন্তু তিনি কারও মুখাপেক্ষী নন- এমন বিশ্বাস লালন করা। কালেমার দ্বিতীয় অংশ হলো ‘মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’। হযরত মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর রাসূল। তিনি সর্বশেষ নবী। মানুষের হেদায়েতের জন্য মহান আল্লাহ কর্তৃক প্রেরিত সর্বশেষ পয়গম্বর। তাঁর পরে আর কোনো নবী অথবা রাসূল আসবেন না- এ কথাও মনেপ্রাণে বিশ্বাস করা এবং মেনে নেয়া।

ইসলামি শরীয়তের পরিভাষায় ঈমানের অর্থ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ইমামগণের বিভিন্নধর্মী সংজ্ঞা পরিলক্ষিত হয়। সেগুলো হলো ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেছেন, ‘আন্তরিক বিশ্বাস ও মৌখিক স্বীকৃতিই হলো ঈমান’। ইমাম গাজ্জালি (রহ.) বলেছেন, ‘রাসূল (সা.) -এর আনীত সকল বিধি-বিধানসহ আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করাই হচ্ছে ঈমান’। ইমাম শাফেয়ী, মালেক ও আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) -এর-মতে, অন্তরের বিশ্বাস, মৌখিক স্বীকৃতি এবং আরকানসমূহ (ইসলামের বিধি-বিধান) কাজে পরিণত করার নাম ঈমান।

ঈমান অহীর মাধ্যমে জানা সকল সত্যকে সত্য বলে বিশ্বাস করার নাম। অজ্ঞতা-অনুমান আর কল্পনা-কুসংস্কারের কোনো অবকাশ ঈমানে নেই। ঈমান ঐ সত্য সঠিক আকীদাকে স্বীকার করার ও সত্য বলে বিশ্বাস করার নাম, যা আসমানী ওহীর দ্বারা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত, যে অহী ‘আল কোরআনুল কারীম’ এবং ‘আস্সুন্নাতুন নাবাবিয়্যাহ’ রূপে এখনো সংরক্ষিত আছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত সংরক্ষিত থাকবে।

ঈমানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রোকন হলো কোনো বিষয়কে শুধু আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি আস্থার ভিত্তিতে সন্দেহাতীতভাবে মেনে নেয়া ও বিশ্বাস করা। সচক্ষে প্রত্যক্ষ করার পর ঈমান আনার আর কী থাকে? চোখে দেখা বিষয়কে কে অস্বীকার করে? ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ও দৃশ্যমান বস্তুসমূহ বা সাধারণ বিবেক বুদ্ধি দ্বারা বোঝা যায় এমন বিষয়সমূহ ঈমানের বিষয়বস্তু হতে পারে না। এসব তো মানুষ এমনিতেই মেনে নেয়। এতে ঈমান আনা না আনার প্রশ্নই অবান্তর। দেখা বিষয়ে বিশ্বাস স্থাপনের নাম ঈমান নয়। মু’মিনকে তো এজন্য মু’মিন বলা হয় যে, সে না দেখা বিষয় শুধু আল্লাহ বা তাঁর রাসূলের সংবাদের ওপর ভিত্তি করে মেনে নিয়েছে ও বিশ্বাস করেছে।

ঈমান তো অটল ও দৃঢ় বিশ্বাসের নাম। ঈমান অবিচল বিশ্বাসের নাম সংশয় ও দোদুল্যমানতার মিশ্রণও এখানে হতে পারে না। সংশয়ই যদি থাকল তাহলে তা ‘আকীদা কীভাবে হয়’? বিশ্বাস যদি দৃঢ়ই না হল তাহলে তা ঈমান কীভাবে হয়’? পবিত্র কোরআন মাজীদের এরশাদ-‘‘তারাই মুমিন যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনে, পরে সন্দেহ পোষণ করে না এবং জীবন ও সম্পদ দ্বারা আল্লাহর পথে জিহাদ করে তারাই সত্যনিষ্ঠ।’’ (সূরা আল; হুজুরাত- ১৫) সংশয় ও দোদুল্যমানতা কাফির ও মুনাফিকের বৈশিষ্ট্য, মু’মিনের নয়। এরশাদ হয়েছে, যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসে ঈমান আনে তারা নিজ সম্পদ ও জীবন দ্বারা জিহাদে অব্যাহতি পাওয়ার প্রার্থনা তোমার নিকট করে না। আল্লাহ মুত্তাকীদের সম্বন্ধে সবিশেষ অবহিত। তোমার নিকট অব্যাহতি প্রার্থনা শুধু ওরাই করে যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসে ঈমান আনে না এবং যাদের চিত্ত সংশয়যুক্ত। ওরা তো আপন সংশয়ে দ্বিধাগ্রস্ত।( সূরা আত তাওবা- ৪৪-৪৫)

ঈমান সত্যের সাক্ষ্যদান এবং আরকানে ইসলাম পালনের নাম। অন্তরের বিশ্বাসের সাথে মুখেও সত্যের সাক্ষ্য দেওয়া ঈমানের অন্যতম রোকন। হাদীস শরীফে আছে, আল্লাহর রাসূল (সা.) রবীয়া গোত্রের প্রতিনিধিদলকে এক আল্লাহর ওপর ঈমান আনার আদেশ করে জিজ্ঞাসা করেছিলেন-তোমরা কি জান ‘এক আল্লাহর ওপর ঈমান’ কাকে বলে? তারা বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, (এক আল্লাহর ওপর ঈমান আনার অর্থ) এই সাক্ষ্য দেওয়া যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য মাবুদ নেই। মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল। আর সালাত কায়েম করা, যাকাত আদায় করা, রমযানের রোযা রাখা ও গণীমতের এক পঞ্চমাংশ প্রেরণ করা।(সহীহ বুখারী, হাদীস :৫৩ কিতাবুল ঈমান, আদাউল খুমুসি মিনাল ঈমান)

আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বাণী পৌছার পর তা গ্রহণ করতে বিলম্ব করার কোনো অবকাশ নেই। আল্লাহ তা’য়ালা কোরআন মাজীদের শুরুতেই মু’মিনের গায়েবে বিশ্বাস করার এই গুণ-বৈশিষ্ট্যের প্রশংসা করে বলেছেন, আলিফ লাম মীম, এটি সেই কিতাব এতে কোনো সন্দেহ নেই। এটা হিদায়াত এমন ভীতি অবলম্বনকারীদের জন্য। যারা অদৃশ্য জিনিসসমূহে ঈমান রাখে এবং সালাত কায়েম করে এবং আমি তাদেরকে যা কিছু দিয়েছি তা থেকে (আল্লাহর সন্তোষজনক কাজে) ব্যয় করে এবং যারা ঈমান রাখে আপনার প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তাতেও এবং আপনার পূর্বে যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তাতেও এবং তারা আখিরাতে পরিপূর্ণ বিশ্বাস রাখে। এরাই এমন লোক, যারা তাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে সঠিক পথের উপর আছে এবং এরাই এমন লোক, যারা সফলতা লাভকারী। (সূরা বাকারা- ১-৫)
ঈমান আনার অনিবার্য অর্থ,বান্দা নিজেকে আল্লাহর কাছে সমর্পণ করবে। তাঁর প্রতিটি আদেশ শিরোধার্য করবে। আল্লাহর প্রতি ঈমান আর আল্লার বিধানে আপত্তি একত্র হতে পারে না। রাসূলের প্রতি ঈমান আর তাঁর আদর্শের ওপর আপত্তি, কোরআনের প্রতি ঈমান আর তার কোনো আয়াত বা বিধানের ওপর আপত্তি কখনো একত্রিত হয় না।

মু’মিনের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সমর্পণ আর ইবলীস ও তার অনুসারীদের বৈশিষ্ট্য বিপরীত যুক্তি। এখন তো শুধু আপত্তি বা বিপরীত যুক্তিই নয়, রাসূল, কোরআন ও ইসলামের প্রতি প্রকাশ্য বিদ্রোহকারীকেও মুসলমান মনে করা হয়। কারো প্রতি ঈমান, অতপর তার বিরুদ্ধতা এ দুটো একত্র হওয়া অসম্ভব হলেও ‘অসহায়’ ইসলামের ব্যাপারে বর্তমানের ‘বুদ্ধিজীবী’দের কাছে তা পুরাপুরিই সম্ভব। বুদ্ধিমান মানুষমাত্রই জানেন, ইসলাম বিহীন তথা সমর্পণ বিহীন ঈমানের কথা কল্পনাও করা যায় না। আর না তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে। এ তো ঈমানের সাথে সরাসরি বিদ্রুপ ছাড়া আর কিছুই নয়।

কোনো ব্যক্তি বা বিষয়ের প্রতি ঈমান তখনই হতে পারে যখন তার ওপর থাকে পূর্ণ আস্থা, অন্তরে তাঁর প্রতি থাকে ভক্তি ও শ্রদ্ধা। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল, তাঁর নাযিলকৃত আসমানী কিতাব, তাঁর বিধান ও শরীয়ত এবং তাঁর দীনের সকল নিদর্শনের সাথে মু’মিনের সম্পর্ক ঐ আস্থা-বিশ্বাস এবং ভক্তি-শ্রদ্ধারই সম্পর্ক। যার প্রতি বা যে বিষয়ে ঈমান আনা হয়েছে তার প্রতি বা ঐ বিষয়ে আস্থা-বিশ্বাস এবং ভক্তি-ভালবাসাই হচ্ছে ঈমানের প্রাণ। চিন্তা-ভাবনা এবং আমল ও আলোচনার দ্বারা একে শক্তিশালী করা এবং গভীর থেকে গভীরতর করা প্রত্যেক মু’মিনের ঈমানী দায়িত্ব।

ইসলাম, ইসলামের নবী ও ইসলামের নিদর্শন ও ইসলামের বিধানসমূহের প্রতি ভালোবাসা ও ভক্তি-শ্রদ্ধা ঈমানের অপরিহার্য অংশ, যা ছাড়া ঈমান কল্পনাও করা যায় না। আর এইসব বিষয়কে অবজ্ঞা, বিদ্রুপ করা, বিদ্বেষ পোষণ করা, এমনকি অপ্রীতিকর মনে করাও কুফরী ও মুনাফিকী। এই মানসিকতা পোষণকারীদের ঈমান-ইসলামের সাথে বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নেই।

বিদ্বেষ ও ঈমান একত্র হওয়া অসম্ভব। যার প্রতি ঈমান থাকবে তার প্রতি ভালোবাসাও থাকবে। পক্ষান্তরে, যার প্রতি বিদ্বেষ ও শত্রুতা থাকবে তার প্রতি ঈমান থাকতে পারে না। অন্তরের বিদ্বেষ সত্ত্বেও যদি মুখে ঈমান প্রকাশ করে তবে তা হবে মুনাফিকী।
হে মু’মিনগণ! তোমাদের মধ্যে কেউ দ্বীন হতে ফিরে গেলে নিশ্চয়ই আল্লাহ এমন এক সম্প্রদায় আনবেন, যাদেরকে তিনি ভালবাসেন এবং যারা তাঁকে ভালবাসেন; তারা মু’মিনদের প্রতি কোমল ও কাফিরদের প্রতি কঠোর হবে; তারা আল্লাহর পথে জিহাদ করবে এবং কোনো নিন্দুকের নিন্দার ভয় করবে না। এটা আল্লাহর অনুগ্রহ, যাকে ইচ্ছা তিনি দান করেন এবং আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ। তোমাদের বন্ধু তো আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও মু’মিনগণ, যারা বিনত হয়ে সালাত কায়েম করে ও যাকাত দেয়। কেউ আল্লাহ তাঁর রাসূল এবং মু’মিনদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করলে আল্লাহর দলই তো বিজয়ী হবে। (সূরা আল-মাইদা- ৫৪-৫৫)

ঈমান একটি একক এতে বিভাজনের অবকাশ নেই। এটি ঈমান-সংক্রান্ত এক গুরুত্বপূর্ণ নীতি, যা পুরোপুরি স্পষ্ট ও স্বীকৃত হওয়ার পরও অনেককে উদাসীনতা প্রদর্শন করতে দেখা যায়। ঈমান সাব্যস্ত হওয়ার জন্য ইসলামের সকল অকাট্য বিধান ও বিশ্বাসকে সত্য মনে করা এবং কবুল করা অপরিহার্য। এর কোনো একটিকে অস্বীকার করা বা কোনো একটির উপর আপত্তি তোলাও ঈমান বরবাদ হওয়ার জন্য যথেষ্ট। যেমন অজু হওয়ার জন্য অজুর সবগুলো ফরয পালন করা জরুরি, কিন্তু তা ভেঙ্গে যাওয়ার জন্য অজুভঙ্গের সবগুলো কারণ উপস্থিত হওযয় জরুরি নয়। যে কোনো একটি কারণ দ্বারাই অজু ভেঙ্গে যায়। তদ্রুপ ঈমান তখনই অস্তিত্ব লাভ করে যখন ইসলামের সকল অকাট্য বিধান ও বিশ্বাস মন থেকে কবুল করা হয়। পক্ষান্তরে, এসবের কোনো একটিকেও অস্বীকার করার দ্বারা ঈমান নষ্ট হয়ে যায়। আর অবজ্ঞা ও বিদ্রুপ তো এতই ভয়াবহ যে, তা শরিয় দলীলে প্রমাণিত ছোট কোনো বিষয়ে প্রকাশিত হলেও সাথে সাথে ঐ ব্যক্তির ঈমান শেষ হয়ে যাবে এবং তার ওপর কুফরের বিধান আরোপিত হবে।

“ইসলামই আল্লাহর কাছে একমাত্র মনোনীত দ্বীন। (সূরা আল-ইমরানঃ ১৯) আর এটা জানা বিষয় যে, ইসলাম আকীদাহ, ঈমান ও বাহ্যিক আমলের সমষ্টি। এককভাবে ঈমানের উল্লেখ হলে ইসলামকে তার ভিতরে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। দু’টি একসাথে উল্লেখ হলে ঈমানের অর্থ হবে অন্তরে বিশ্বাস করার বিষয়সমূহ আর ইসলামের অর্থ হবে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বাহ্যিক আমলসমূহ। এই জন্যই পূর্ববর্তী যুগের কোনো কোনো আলেম বলেছেন, ইসলাম প্রকাশ্য বিষয় এবং ঈমান গোপনীয় বিষয়। কারণ তা অন্তরের সাথে সংশ্লিষ্ট। আপনি কখনো দেখতে পাবেন যে, মুনাফেক ব্যক্তি নামায পড়ছে, রোযা রাখছে এবং সাদকা করছে। এই ব্যক্তি প্রকাশ্যভাবে মুসলমান কিন্তু মু’মিন নয়। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন,“মানুষের মধ্যে কিছু মানুষ এমন আছে, যারা বলে আমরা আল্লাহর ওপর এবং পরকালের ওপর ঈমান আনয়ন করেছি; অথচ তারা মু’মিন নয়”। (সূরা বাকারাঃ ৮)

যা মূলতই তাওহীদের পরিপন্থী তা এই যে, কোনো ব্যক্তি আল্লাহকে বাদ দিয়ে এমন জিনিষের উপর পরিপূর্ণভাবে ভরসা করলো, বাস্তবে যার কোনো প্রভাবই নাই। মুসিবতে পড়ে কবর পূজারীরা এমনটি করে থাকে। এটি বড় শির্ক। যারা এ ধরণের শির্কে লিপ্ত হবে তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শির্ক করবে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন। তার ঠিকানা জাহান্নাম। আর জালেমদের জন্য কোনো সাহায্যকারী থাকবে না।” (সূরা মায়িদাঃ ৭২)

ওযু করার পর কিছু কাজ করলে যেমন ওযু নষ্ট হয়ে যায়, ঠিক তেমনি ঈমান আনার পর কিছু কথা, কাজ ও বিশ্বাস আছে, যা সম্পাদন করলে বা পোষণ করলে ঈমান নষ্ট হয়ে যায়। ঈমান ভঙ্গের কারণগুলো মূলত ৩ প্রকার। বিশ্বাসগত, কর্মগত এবং উক্তিগত। ইমামুদ দাওয়াহ শাইখ মুহাম্মাদ ইবনু আবদিল ওয়াহহাব (রহ.) এগুলোকে দশটি পয়েন্টে সাজিয়েছেন। ১. আল্লাহর সঙ্গে শিরক করা। ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সঙ্গে অংশীদার করা ক্ষমা করেন না। তা ব্যতীত অন্যান্য অপরাধ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন; এবং যে কেউ আল্লাহর সঙ্গে শিরক করে সে এক মহাপাপ করে।’ (সুরা নিসা-৪৮) ‘কেউ আল্লাহর সঙ্গে শিরক করলে অবশ্যই আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করবেন এবং তার আবাস জাহান্নাম। আর জালিমদের জন্য কোনো সাহায্যকারী নেই।’ (সুরা মায়িদা,৭২) ২. আল্লাহ এবং বান্দার মধ্যে কাউকে মধ্যস্থতাকারী বানানো। ‘তারা আল্লাহকে ব্যতীত যার ইবাদাত করে তা তাদের ক্ষতিও করতে পারে না, উপকারও করতে পারে না। তারা বলে, এরা আল্লাহর নিকট আমাদের সুপারিশকারী। বলো, তোমরা কি আল্লাহকে আকাশরুলি ও পৃথিবীর এমন কিছুর সংবাদ দিচ্ছ, যা তিনি জানেন না? তিনি মহান, পবিত্র এবং তারা যাকে শরিক করে তা হতে তিনি ঊর্ধ্বে।’ (সূরা ইউনুস, ১০ : ১৮) ৩. মুশরিক-কাফিরদের কাফির মনে না করা। ৪. নবী (সা.) এর ফয়সালার তুলনায় অন্য কারও ফয়সালাকে উত্তম মনে করা। ৫. মুহাম্মাদ (সা.) আনীত কোনো বিধানকে অপছন্দ করা। ৬. দীনের কোনো বিধান নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করা। ৭. জাদু করা। ৮. মুসলিমদের বিরুদ্ধে মুশরিকদের সমর্থন ও সহযোগিতা করা। ৯. কাউকে দীন-শরিয়তের ঊর্ধ্বে মনে করা। ১০. দীন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া। ‘যে ব্যক্তি তার প্রতিপালকের নিদর্শনাবলি দ্বারা উপদিষ্ট হয়েও তা হতে মুখ ফিরিয়ে নেয় তার অপেক্ষা অধিক অপরাধী আর কে? আমি অবশ্যই অপরাধীদের শাস্তি দিয়ে থাকি।’ (সূরা সাজদা- ২২)

পৃথিবীতে মানুষের চলার জন্য আল্লাহ তা’য়ালা যে সমস্ত নেয়ামত সৃষ্টি করেছেন, তার জন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা উচিৎ। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা এই যে, তিনি যেনো আমাদের সকলকে ধ্বংসের হাত হতে রক্ষা করেন এবং আমাদের ও আমাদের মু’মিন ভাইদেরকে তাঁর প্রতি জন্য ঈমান এবং তাঁর উপর ভরসার বলে বলিয়ান করেন এবং এমন সব উপায় উপকরণ গ্রহণ সহজ করেন যা তাঁর পক্ষ থেকে অনুমদিত ও মনোনীত।

ঈমান আল্লাহ ও বান্দার মাঝের সেতুবন্ধন। ঈমান হ্রাস পেলে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কও হ্রাস পায়। আর ঈমান বৃদ্ধি পেলে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কও বৃদ্ধি পায়। বিভিন্ন কারণে বান্দার ঈমানে প্রভাব পড়ে। ঈমান বৃদ্ধির বিভিন্ন আমল পবিত্র কোরআনে ও হাদিসে বলা হয়েছে। কোরআন তেলাওয়াত করা : কোরআন তেলাওয়াত করলে ঈমান বাড়ে। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, ‘যখন তাদের সামনে কোরআনের আয়াত তেলাওয়াত করা হয়, তখন তাদের ঈমান বৃদ্ধি পায়।’ (সুরা আনফাল : ২) সাহাবাদের জীবনী চর্চা করা, আল্লাহর জিকির করা, দুর্বল ঈমানের সুস্থতার জন্য যিকির খুবই উপকারী। আল্লাহর যিকির অন্তরে ঈমানের বীজ বপন করে। আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে চিন্তাভাবনা করা,আল্লাহর জন্য বন্ধুত্ব ও শত্রুতা, মু’মিনদের সঙ্গে সম্পর্ক ও বন্ধুত্ব রাখা আর কাফিরদের সঙ্গে শত্রুতা রাখা ও সম্পর্কচ্ছেদ করা। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, ‘নিঃসন্দেহে তোমাদের বন্ধু হচ্ছেন কেবলমাত্র আল্লাহ, রাসুলুল্লাহ (সা.) ঈমানদারেরা নামাজ কায়েমকারী জাকাত আদায়কারী এবং রুকু আদায়কারী।’ (সুরা মায়িদা : ৫৫)। বিনম্রতা ও লজ্জাশীলতা, হাদিসে লজ্জাকে ঈমানের অঙ্গ বলা হয়েছে।
ঈমান মুসলমানের কাছে প্রাণের চেয়েও প্রিয়। ঈমানদার সকল কষ্ট সহ্য করতে পারে, মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে পারে, কিন্তু ঈমান ছাড়তে পারে না। ঈমানই তার কাছে সবকিছু থেকে বড়। ঈমান শুধু মুখে কালেমা পড়ার নাম নয়, ইসলামকে তার সকল অপরিহার্য অনুষঙ্গসহ মনেপ্রাণে কবুল করার নাম। আর একারণে মু’মিনকে হতে হবে সুদৃঢ়, সত্যবাদী ও সত্যনিষ্ঠ। মু’মিন কখনো শৈথিল্যবাদী হতে পারে না। কুফরির সাথে যেমন তার সন্ধি হতে পারে না তেমনি মুরতাদ ও অমুসলিমদের সাথেও বন্ধুত্ব হতে পারে না।

ঈমান আল্লাহ ও বান্দাদের মধ্যকার এক স্থায়ী অঙ্গিকারের নাম। ঈমানে কোনো মেয়াদ নেই। যখনই ঈমানের সম্পদ পাওয়া গেলো তখন থেকেই এর পুষ্টি ও বর্ধন, শক্তি ও সংস্কারে মগ্ন থাকা জরুরি। সবসময় সতর্ক থাকা চাই, এমন কোনো কথা বা কাজ যেন প্রকাশিত না হয়, যা ঈমান নষ্ট করে। আর আল্লাহর দরবারে তাঁর শেখানো দু’আ করতে থাকা চাই- হে আমাদের প্রতিপালক! সরল পথ প্রদর্শনের পর তুমি আমাদের অন্তরকে সত্যলংঘনপ্রবণ করো না এবং তোমার নিকট হতে আমাদেরকে করুণা দাও, নিশ্চয়ই তুমি মহাদাতা।( সূরা আলে ইমরান ৩ : ৮)

সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো ঈমান। ঈমানের বিপরীত কুফর। ঈমান সত্য, কুফর মিথ্যা। ঈমান আলো, কুফর অন্ধকার। এই ঈমান রক্ষার জন্য সর্বাগ্রে জানতে হবে ঈমান কী? কোন বিষয়গুলো ঈমানবিধ্বংসী। কী কী কাজে ঈমান চলে যায়। কোন কাজে ঈমান থাকে এবং আরও মজবুত হয়। রাসূল (সা.) সতর্ক করে গেছেন এমন একটি যুগ সম্পর্কে, যে যুগে বিভক্তি দেখা দেবে। ফেতনা-ফ্যাসাদ প্রবল হবে। দাঙ্গাহাঙ্গামা বেড়ে যাবে। অশ্লীলতা, নির্লজ্জ বেহায়াপনা ব্যাপক আকার ধারণ করবে। আর তখন ঈমানের ওপর টিকে থাকা একজন মু’মিনের জন্য বেশ কঠিন। প্রত্যেক মু’মিনের সর্তক থাকা জরুরি- সমাজের বিভিন্ন ফেতনা-ফ্যাসাদ ও বিভ্রান্তি কবলে পড়ে ঈমান হারানো কিংবা ঈমানের দিক দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। আল্লাহ যেনো আমাদের ঈমানের সৌভাগ্য থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বঞ্চিত না করেন।

শরীয়তের পরিভাষা অনুযায়ী ঈমান আর ইসলাম এক বিষয় নয়। ইসলাম হচ্ছে, মুসলমানের বাহ্যিক নেকআমল যেমন নামাজ, রোজা, হজ্জ ইত্যাদি। ঈমান হচ্ছে, দীনের মৌলিক আকীদা বিশ্বাসগুলো। সকল শরীয়তবেত্তা একমত যে, ইসলাম তথা বাহ্যিক আমলগুলো সঠিকভাবে হওয়ার তুলনায় খাঁটি ইমানের অধিকারী হওয়া জরুরি। আর খাঁটি ঈমানের মূলে রয়েছে তাওহীদ বা একত্ববাদের বিশ্বাস।

লেখকঃ সাবেক জাতীয় ক্রীড়াবিদ,সভাপতি শারীরিক শিক্ষাবিদ সমিতি,
চেয়ারম্যান গ্রিন ক্লাব,গবেষক,সাংবাদিক ও কলামিস্ট