ইটভাটা থেকে নির্গত বিষাক্ত ধোঁয়ায় ধ্বংস করছে পরিবেশ-প্রতিবেশ 

 

মো.আলতাফ হোসেন ঃঃ   

উদ্ভিদ ও প্রাণী ওতোপ্রতভাবে জড়িত এবং এদের সমাবেশই হলো জীববৈচিত্র্য। ভূপৃষ্টে উদ্ভিদ, প্রাণী, অণুজীব ও এদের জড় পরিবেশ নিজেদের মধ্যে এবং পরস্পরের মধ্যে ক্রিয়া-বিক্রিয়ার গতিময় পদ্ধতি হলো ইকোসিস্টেম বা পরিবেশতন্ত্র। কিন্ত পরিবেশ দূষণের অন্যতম একটি কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ইটভাটার বিষাক্ত ধোঁয়া। যুগ যুগ ধরে মানুষ নিজের ব্যক্তিস্বার্থে মজে ও জীবনের উন্নয়নের জন্য পরিবেশের ওপর নির্মম অত্যাচার চালিয়েছে। মানুষের অপতৎপরতা, বিশেষ করে বিজ্ঞানের উন্নতির পর থেকে দ্রুতগতিতে বিস্তার লাভ অজস্র ছোট-বড় প্রাণী, গাছগাছালি ও প্রাকৃতিক সম্পদের বিনাশ সাধন করেছে। এসবের অবশ্যম্ভাবী ক্ষতির প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে। মানুষের নৈতিক অধঃপতনই পরিবেশ-সংকটের বড় কারণ।

ইটভাটার বিষাক্ত কালো ধোঁয়া ও বর্জ্যে বিপন্ন হচ্ছে পরিবেশ। এতে ভাটার আশপাশের এলাকা, নদী, শহরাঞ্চল ও গ্রামীণ জনপদের জনস্বাস্থ্য মারাত্মক হুমকির মুখে। পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, ইটভাটা সৃষ্ট দূষণে বয়স্ক ও শিশুরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইটভাটার কালো ধোঁয়ার কারণে মানুষের ফুসফুসের সমস্যা,শ্বাসকষ্ট ও ঠান্ডাজনিত নানা রোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বাতাসে অক্সিজেন ব্যতীত অন্যান্য গ্যাস ও ধূলিকণার পরিমাণ বৃদ্ধি পেলে বায়ু দূষিত হয়।পৃথিবীর সব প্রাণী শ্বাস-প্রশ্বাসের সময় অক্সিজেন গ্রহণ ও কার্বন ডাইঅক্সাইড ত্যাগ করে। অপর দিকে বৃক্ষরাজি কার্বন ডাইঅক্সাইড গ্রহণ ও অক্সিজেন ত্যাগ করে। পৃথিবীতে প্রতিনিয়ত জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও নির্বিচারে সবুজ বৃক্ষ নিধন করার কারণে বৃক্ষ হ্রাস পাচ্ছে। তাই পরিবেশের সবটুকু কার্বনডাই অক্সাইড বৃক্ষরাজি শোষণ করতে পারছে না। ফলে বাতাসে কার্বনডাই অক্সাইড এর মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়াও শিল্প-কারখানা, ইট ভাটার চিমনি এবং মোটরযান হতে নির্গত- ধোঁয়া, ধোঁয়াশা, বর্জ্য, এগজোস্ট গ্যাস, গ্রিন হাউস গ্যাস ইত্যাদি দ্বারা বায়ু দূষিত হচ্ছে। মানুষের শ্বাস গ্রহণের সময় দূষিত বায়ু দেহের মধ্যে প্রবেশ করে রক্তের মাধ্যমে প্রবাহিত হয়ে যকৃত, অগ্নাশয় ও বৃক্কে ক্রমান্বয়ে জমা হয়। এর ফলে বমি, মাথাব্যথা, বুকব্যথা, নাক-মুখ জ্বালা, এজমা, এলার্জি, স্নায়ুবিক দুর্বলতা, মানসিক অস্থিরতা, ক্যান্সার ইত্যাদি জটিল রোগের সৃষ্টি হয়।

খাদ্যের উৎস,অর্থনৈতিক উন্নয়ন, চিত্তবিনোদন এবং পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য রক্ষায় বৃক্ষের গুরুত্ব অপরিসীম। বৃক্ষ থেকে আমরা বিভিন্ন প্রকার ফল, মিষ্টি রস, ভেষজ দ্রব্য, কাঠখড়িসহ অনেক মূল্যবান সম্পদ পাই। বিভিন্ন প্রকার ফল উৎপাদনে বৃক্ষের যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে।ফল শারীরিক ও মানসিক পরিপূর্ণতা বিকাশ লাভে সহায়তা করে। বিভিন্ন প্রকার কাঠের ওপর ভিত্তি করে দেশে আসবাবপত্র তৈরির বৃহৎ শিল্প, যেমন- বনজ শিল্প, হাতিল, আকিজ, নাভানা, অটোবি ইত্যাদি এবং কাঠমিস্ত্রিদের দ্বারা ক্ষুদ্র ফার্নিচার শিল্প গড়ে ওঠেছে। মানুষসহ অধিকাংশ প্রাণীর খাদ্যের প্রধান উৎস বৃক্ষ। বৃক্ষ পশুপাখি, কীটপতঙ্গ ও অণুজীবের আশ্রয়স্থল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু নির্বিচারে ইটভার জন্য বন নিধনের কারণে বিভিন্ন জাতের উদ্ভিদ ও পশুপাখি বিলুপ্তির পথে এবং ইটভাটার কালো ধোঁয়ায় বিপন্ন পরিবেশ।

অজীব উপাদান,যেমন- মাটি, পানি, আলো, বাতাস, জলাশয়, হাওর, নদ-নদী, সাগর-মহাসাগর, পাহাড়-পর্বত, হিমবাহ, মরুভূমি, বায়ুমন্ডল, বারিমন্ডল, মেঘমালা, চন্দ্র, সূর্য ইত্যাদি এবং সজীব উপাদান, যেমন- উদ্ভিদ, প্রাণী,অণুজীব ইত্যাদির সমন্বয়ে সৃষ্টি হয়েছে প্রাকৃতিক পরিবেশ। অর্থাৎ প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট উভয় পরিবেশের সমন্বয়েই সৃষ্টি হয়েছে আমাদের এ সুন্দর পরিবেশ। একটি ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশের জন্য অজীব ও জীব প্রতিটি উপাদন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভৌতিক, রাসায়নিক ও জৈবিক কারণে এ উপাদানগুলোর মধ্যে যে কোনো একটির ব্যাপক পরিবর্তন ঘটলে সামগ্রিক পরিবেশের ওপর এর বিরূপ প্রভাব পড়ে এবং পরিবেশ দূষণ হয়। মানুষের অসচেতনতা এবং অনিয়ন্ত্রিত আচরণের কারণেই পরিবেশ দূষণ হচ্ছে ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে। মানবসৃষ্ট বিভিন্ন কারণে উৎপাদিত ক্ষতিকারক পদার্থ, যেমন- গ্রিন হাউস গ্যাস, ইগজোস্ট গ্যাস, তেজস্ক্রিয় পদার্থ, শিল্পকারখানার রাসায়নিক বর্জ্য, আর্সেনিকযুক্ত বর্জ্য, পারদ, ক্যাডমিয়াম, সিসা, বালাইনাশক, আগাছানাশক, ধোঁয়া, ধোঁয়াশা, ধূলিকণা, ময়লা-আর্বজনা ইত্যাদি মারাত্মকভাবে পরিবেশ দূষণ করে।

রাজধানীর বায়ু দূষণের জন্য ৫৮ ভাগই দায়ী ইটভাটা। বৈধ-অবৈধভাবে গড়ে ওঠা এসব ভাটা থেকে নির্গত বিষ ধ্বংস করছে পরিবেশ-প্রতিবেশ। কৃষিজমির মাটি দিয়ে ইট তৈরি করায় আবাদি জমি নষ্ট হবার পাশাপাশি কমছে বনাঞ্চল। আবার ইটপ্রস্তুত খাত দেশের গ্রিনহাউজ গ্যাসের সবচে’ বড় উৎস হওয়ায় হুমকির মুখে পড়ছে মানুষের খাদ্যচক্র। আকাশ দখল নিয়েছে বিষাক্ত কালো ধোঁয়া। অবস্থা এমনই যে, ফাগুন মাসের রৌদ্রোজ্জ্বল দুপুরকে শিশিরভেজা পৌষের সকাল ভেবে ভুল করতে পারেন অনেকে! নভেম্বর থেকে এপ্রিল শুষ্ক মৌসুমে ইটভাটার আশপাশের এলাকাগুলোর দৃশ্য এমনই বিষন্ন দেখায়। দেশের উন্নয়নের সঙ্গে বাড়ছে নগরায়ণ। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ইটভাটার সংখ্যা। কিন্তু ইটের উৎপাদনকে সচল রাখতে যেভাবে পরিবেশের বিপর্যয় ঘটছে তার চিত্র ভয়াবহ।

সারাদেশে ১০ হাজারেরও অধিক ইটভাটা রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪ হাজারই অবৈধ।পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই অবৈধভাবে এসব ভাটায় ইট পোড়ানো হচ্ছে। এ ছাড়া ইটভাটায় নিম্নমানের জ্বালানি ব্যবহারের ফলে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। ২০১৩ সালের ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী সিটি করপোরেশন এলাকায় ইটভাটা স্থাপন নিষিদ্ধ। তারপরও রাজধানীর আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে শত শত ইটভাটা। এর মধ্যে রাজধানীর গাবতলীর পর আমিন বাজার এলাকা থেকে শুরু করে সাভার পর্যন্ত রাস্তার আশপাশে অনেক ইটভাটা গড়ে উঠেছে। সাভার উপজেলায় নতুন-পুরাতন মিলে দুই শতাধিক ইটভাটা রয়েছে। যার অর্ধেকেরই পরিবেশের কোনো ছাড়পত্র নেই। আর অর্ধশত ইটভাটার কাস্টম এক্সাইজ অ্যান্ড ভ্যাটের লাইসেন্স নেই। এসব ভাটার কালো ধোঁয়ায় ওই এলাকার বাতাস দূষিত হচ্ছে।

গবেষণা অনুসারে শুষ্ক মৌসুমে ঢাকা শহরের বস্তুকণা দ্বারা বায়ুদূষণের জন্য ইটভাটা ৫৮ শতাংশ দায়ী। এ ছাড়া সড়ক ও মাটি থেকে সৃষ্ট ধুলা দ্বারা ১৮ শতাংশ, যানবাহনের জন্য ১০ শতাংশ, বিভিন্ন জিনিসপত্র পোড়ানোর জন্য ৮ শতাংশ ও অন্যান্য কারণে ৬ শতাংশ বায়ু দূষিত হচ্ছে। গবেষণার ফলাফলে পরিবেশ অধিদপ্তর ইট তৈরির অদক্ষ পদ্ধতি ব্যবহার না করে পরিবেশবান্ধব জ্বালানিসাশ্রয়ী আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের সুপারিশ করেছে। রাজধানী ঢাকাকে ঘিরে গড়ে ওঠা ইটভাটাগুলোর দূষণ শীত মৌসুমে বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। ঢাকা জেলায় সাড়ে ৫০০ ইটভাটা রয়েছে, যার প্রায় অর্ধেকেরই পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেই। ইটভাটার দূষণে রাজধানীবাসী নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।

গবেষকরা বলছেন, ইট ভাটার চিমনী থেকে যে ধোঁয়া বের হয় তাতে সালফার ডাই অক্সাইড ও কার্বন মনো অক্সাইড থাকে। এর ফলেই আমসহ যেকোনো ফসলেই ব্লাকটিপ রোগ সৃষ্টি হয়। অনেক সময় যদি ব্লাকটিপ না হয় তাহলে আমের আকৃতি ছোট বা কাঙ্খিত হয় না। সালফার ডাই অক্সাইড ও কার্বন মনোঅক্সাইডের প্রভাবে এ রোগ হয়। তাই গবেষকরা বলছেন, আম বাগানের পাশে ইটভাটা না রাখাই ভালো। আর যদি থাকে তাহলে অবশ্যই আড়াই থেকে তিন কিলোমিটার দূরে ও সুউচ্চ চিমনী ব্যবহার করতে হবে। পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ (ক্লিন এয়ার অ্যান্ড সাসটেইনেবল এনভায়রনমেন্ট) প্রকল্পের গবেষণা দেখা যায়, ঢাকার বায়ুদূষণের জন্য ইটভাটা প্রায় ৬২ শতাংশ দায়ী। এ ছাড়া সড়ক ও মাটি থেকে সৃষ্ট ধুলার মাধ্যমে ১৭ শতাংশ, যানবাহনের কারণে ৯ শতাংশ, বিভিন্ন জিনিসপত্র পোড়ানোর ফলে ৭ শতাংশ ও বিবিধ কারণে ৫ শতাংশ বায়ু দূষিত হচ্ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাতাসে ভাসমান ধূলিকণা বেশি আছে এমন শহরের তালিকায় ঢাকার অবস্থান তৃতীয়। শুধু ঢাকার বায়ুদূষণের জন্য বছরে জিডিপির ১ শতাংশ ক্ষতি হচ্ছে। মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার এক পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, ঢাকার বাতাসে দূষণের মাত্রা গত ১০ বছরে ৮৬ শতাংশ বেড়েছে। এরই মধ্যে রাজধানীর বায়ুদূষণ রোধে পরিবেশ অধিদপ্তরকে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার নির্দেশও দিয়েছেন হাইকোর্ট। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সূত্রে জানা গেছে, অনেক ইটভাটায় উচ্চ মাত্রার সালফার ব্যবহার করা হয়। সালফারের পরিমাণ যাচাই না করে এসব ইটভাটায় কয়লা ব্যবহার করতে দেওয়ায় বায়ু দূষিত হচ্ছে। এ ছাড়া অনেক ভাটায় টায়ার ও প্লাস্টিক ব্যবহার করা হয়। এতেও অনেক কার্বন ডাই-অক্সাইড তৈরি হচ্ছে। ইটের রঙ সুন্দর দেখাতে ক্ষতিকর কেমিক্যাল ব্যবহার হয়। এতে ইটভাটা এলাকার টিনের ঘরে মরিচা ধরে নষ্ট হচ্ছে। ধান, অন্যান্য সবজি ও গাছের ক্ষতি হচ্ছে। এর ফলে শ্বাসকষ্ট থেকে শুরু করে ঠান্ডাজনিত রোগ, শ্বাসনালির ক্ষতসহ নানা ধরনের মারাত্মক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগতে হচ্ছে শিশু ও বয়স্কদের।

প্রতিবছরের মতো এবারও রাজধানীর আশপাশের ইটভাটাগুলোতে মৌসুমের শুরুতেই ইট পোড়ানো শুরু হয়েছে। ইটভাটার বিষাক্ত কালো ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ছে রাজধানীর বাতাসে। রাজধানীর বায়ুদূষণের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী ঢাকার আশপাশের ইটভাটা। অধিকাংশ ইটেরভাটা অবৈধভাবে পরিচালিত হচ্ছে। এগুলোর পরিবেশগত ছাড়পত্র যেমন নেই, তেমনি পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিও গ্রহণ করেনি। এসব ইটভাটা মারাত্মক বায়ুদূষণের বড় উৎস।

নরওয়েভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এনআইএলইউর সহায়তায় পরিবেশ অধিদপ্তরের গবেষণায় ঢাকা শহরের বায়ুর গুণগত মানের এই চিত্র উঠে এসেছে। রাজধানী ঘিরে থাকা তুরাগ, বসিলা, মিরপুর ব্রিজ, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, আশুলিয়া, আমিনবাজার, মিরপুর বেড়িবাঁধ, বালু নদীর আশপাশ, ফতুল্লা, শ্যামপুর, পাগলা ও বুড়িগঙ্গা নদীর ওপারে গড়ে ওঠা ইটভাটাগুলোর বিষাক্ত কালো ধোঁয়া ঢাকায় প্রবেশ করছে। কম উচ্চতার চিমনিতে ইট পোড়ানো হচ্ছে। বেশিরভাগ ইটাভাটাতেই অবৈধ ড্রাম চিমনি বসানো। ঢাকায় এখন উত্তর, উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে বাতাস প্রবাহিত হচ্ছে। পরিবেশ অধিদপ্তর ইট তৈরিতে পরিবেশবান্ধব জ্বালানিসাশ্রয়ী আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের তাগিদ দিলেও আমলে নিচ্ছেন না ইটভাটার মালিকরা।

ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন নিয়ন্ত্রণ আইন অমান্য করে পঞ্চগড়ে শতাধিক ইটভাটায় উৎপাদন চলছে। এক শ্রেণীর অসাধু প্রভাবশালী ব্যক্তি কাঁচা টাকার লোভে আবাদি জমি নষ্ট করে জনবসতিপূর্ণ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সংলগ্ন এলাকায় অবৈধ ভাবে ইটভাটা গড়ে তুলেছেন। এসব ইটভাটার বিষাক্ত কালো ধোঁয়া, গ্যাস ও ধুলায় বিনষ্ট হচ্ছে আমাদের জীববৈচিত্র্য,চিরচেনা প্রকৃতি-পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য। ইটভাটার দূর্ষিত বাতাসে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে বায়ুমন্ডল। নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষ।

গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ ও পলাশবাড়ীতে ইট ভাটার বিষাক্ত ধোঁয়ার কারণে নষ্ট হয়ে গেছে শতাধিক বিঘা জমির ধান এবং এলাকার বিভিন্ন গাছের আম,কাঠালসহ উঠতি ফসল। ফসল হারিয়ে চরম ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষক। গাইবান্ধায় প্রায় দুই থেকে আড়াইশ ইট ভাটা গড়ে উঠেছে। এর বেশিরভাগই লাইসেন্সবিহীন। সরকারি নিয়ম-নীতি না মেনে গড়ে ওঠা এসব ভাটার কারণে ক্ষতির মুখে পড়েছে এলাকার কৃষি ও পরিবেশ। এরই মধ্যে জেলার গোবিন্দগঞ্জের কোমরপুরে এম আর বি ইটভাটা, নাকাই কলেজ পাড়ার এম এ এন ইট ভাটা ও পলাশবাড়ীর এমবিডি ইট ভাটার বিষাক্ত ধোয়ায় এক থেকে দেড় শ’ বিঘা জমির ধান চিটা হয়েছে। এ ছাড়াও নষ্ট হয়েছে বিভিন্ন ধরণের উঠতি ফসল ও গাছের আম-কাঁঠাল।

বগুড়ার ধুনট উপজেলায় শতাধিক কৃষকের প্রায় ৩০০ বিঘা জমির বোরো ধান ইটভাটার ধোঁয়ায় নষ্ট হয়ে গেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ব্যাপারে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা উপজেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।  দেখা গেছে, চারদিকে খাদুলী, কুড়িগাতি, উজালশিং, গোবিন্দপুর ও জোলাগাতী গ্রাম। এর মাঝখানে প্রায় ৫০০ মিটার এলাকায় তিন ফসলি জমিতে দীর্ঘদিন ধরে ৮টি ইটভাটা গড়ে উঠেছে। ইটভাটাগুলো হলো- একতা, ফাইভ স্টার, বস, গ্রামীণ, আদর্শ, বন্ধু, বি.বি.সি ও দিগন্ত। এর বেশিরভাগই লাইসেন্সবিহীন। সরকারি নিয়ম-নীতি না মেনে গড়ে ওঠা এসব ভাটার কারণে ক্ষতির মুখে পড়েছে এলাকার কৃষি ও পরিবেশ। চলতি বছরের জন্য তাদের ভাটায় ইট পোড়ানো কার্যক্রম কয়েক দিন আগে বন্ধ করার পর হঠাৎ ভাটার চিমনি দিয়ে বিষাক্ত এবং দুর্গন্ধযুক্ত ধোঁয়া বের হতে থাকে। প্রথম দিকে ক্ষয়ক্ষতি তেমন বোঝা না গেলেও ধীরে ধীরে কৃষকেরা দেখতে পান তাদের সবুজ খেতের ধানগাছ ধোঁয়ার কারণে লালচে হয়ে গেছে। পাতা কুঁকড়ে গেছে। ধানের শিষ পরিণত হয়েছে চিটায়। শুধু ধান নয়, নষ্ট হয়েছে অন্যান্য ফসলও।

ইটভাটার চিমনি থেকে আর ধূসর কিংবা বিষাক্ত কালো ধোঁয়া বের হওয়ার দৃশ্য চোখে পড়ে না। সড়কে নেই অবৈধ উপায়ে তৈরি করা ইট নেওয়ার বাহনগুলোর দাপট। জমি থেকে টপসয়েল বা উর্বর মাটি কেটে বিক্রিও কমে গেছে। গ্রামীণ জনপদ আর বনবাদাড়ের প্রাণিকুলে ফিরে এসেছে স্বস্তি গাজীপুর মহানগরসহ জেলার বিভিন্ন জায়গায় অবৈধভাবে গড়ে ওঠা ৩৩৫টি ইটভাটা ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর এমন পরিবেশ বিরাজ করছে। শুধু মহানগরেই অবৈধভাবে গড়ে ওঠা ১৭৪টি ইটভাটার সবক’টি বন্ধ করে দিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। একই সঙ্গে জেলার বিভিন্ন উপজেলার ১৬১টি ইটভাটা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

নেত্রকোনায় ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইনের যথাযথ প্রয়োগ না হওয়ায় এক শ্রেণির অধিক মুনাফালোভী ব্যবসায়ী নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে যত্রতত্র বিশেষ করে লোকালয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সংলগ্ন এলাকা ও ফসলি জমিতে অবৈধ ভাবে গড়ে তুলছে ইট ভাটা। এসব ইট ভাটায় নেই কোনো সরকারি অনুমোদন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র। ইট ভাটার বিষাক্ত কালো ধোঁয়া, গ্যাস ও ধুলায় জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে। হারিয়ে যাচ্ছে জীব-বৈচিত্র্য, বিনষ্ট হচ্ছে আমাদের চির চেনা প্রকৃতি ও পরিবেশ।

মানিকগঞ্জ জেলায় রয়েছে একাধিক অবৈধ ইটভাটা। এসব ইটভাটায় লাইসেন্সবিহীন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের মেয়াদোত্তীর্ন ছাড়পত্র দিয়ে চালিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া ইটভাটার বিষাক্ত ধোঁয়ায় গ্রামকে গ্রাম হচ্ছে পরিবেশ নষ্ট। তার বোধগম্য হচ্ছে না, কোনো প্রকার প্রতিকার মিলছে না কি করে এমন জায়গায় ভাটা করার অনুমতি মিলতে পারে। এসব ইটভাটা একাধিকবার অপসারণ করে দেওয়ার পরও চালিয়ে যায়। এগুলোর পরিবেশগত ছাড়পত্র যেমন নেই, তেমনি পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিও গ্রহণ করেনি। এসব ইটভাটা মারাত্মক বায়ুদূষণের উৎস।

আমের জেলা খ্যাত চাঁপাইনবাবগঞ্জ, চারিদিকে সবুজের সমারহ। তবে এ সবুজের মাঝে যেন বিষফোঁড়ার মতো গড়ে উঠেছে যত্রতত্র ইটভাটা। অপরিকল্পিত এসব ইট ভাটার কালো ধোঁয়ায় দিন দিন বিবর্ণ হচ্ছে সবুজের সমারহ। আম বাগানে দেখা দিচ্ছে ব্লাকটিপ রোগ। শুধু আম-ই নয়, ইট ভাটার পাশের আশপাশের অন্য গাছপালা ও জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। জীববৈচিত্র্য পৃথিবীতে প্রাণের এবং মানব উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহসহ প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় প্রধান অবদান রাখে। প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নÑউভয় ক্ষেত্রেই বন ও বনাঞ্চলের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। কিন্তু নির্বিচারে বন ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস, মনুষ্যসৃষ্ট দাবানল, উপর্যুপরি একের পর ঘূর্ণিঝড়ের আঘাত,পঙ্গপালের ধ্বংসাত্মক আক্রমণ এবং বিশ্বব্যাপী নির্বিচারে প্রাণের বাসস্থান ধ্বংসের ফলে ঝুঁকিতে জীববৈচিত্র্য। ইটভাটার কারণে বনভূমি ধ্বংস করার কারণে বন ও বন্যপ্রাণী হুমকির মুখে পড়েছে। এ কারণে আজকের পৃথিবীর পরিবেশ ও প্রতিবেশ মারাত্মক ঝুঁকির সম্মুখিন।

নিয়ামতপুরে সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে অতিরিক্ত মুনাফার লোভে ইটভাটায় কয়লার পরিবর্তে ইট পোড়াতে কাঠ-খড়ি প্রধান জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ঘন জনবসতিপূর্ণ এলাকা এবং কৃষি জমির ওপর স্থাপিত এসব ভাটা মালিকরা নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে প্রতিনিয়ত দূষিত করছে পরিবেশ ও ক্ষতি করছে কৃষি জমির। ফলে ভাটার ক্ষতিকারক প্রভাবে চলতি বোরো মৌসুমের শুরুতে ভাটার পার্শ্ববর্তী ফসলি জমিতে কৃষকরা তাদের ফসল রক্ষা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছেন।

ইটভাটাগুলোতে অবাধে পোড়ানো হচ্ছে জ্বালানি কাঠ।এতে উজাড় হচ্ছে গাছপালা। অধিকাংশ ইটভাটায় পরিবেশগত ছাড়পত্র ও জেলা প্রশাসনের লাইসেন্স ছাড়াই চলছে ইট পোড়ানো কার্যক্রম। ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন নিয়ন্ত্রণ আইনে (২০১৩) নিষেধ থাকা সত্ত্বেও বেশির ভাগ ভাটাই স্থাপন করা হয়েছে বা হচ্ছে লোকালয় তথা মানুষের বসতবাড়ি, গ্রাম-গঞ্জ, শহর-বন্দরের অতি সন্নিকটে, কৃষি জমিতে, নদীর তীরে, পাহাড়ের পাদদেশে। ইটভাটায় ব্যবহার করা হচ্ছে আবাদি জমির উপরিভাগ, নদীর তীর এবং পাহাড়ের মাটি, যা আইনে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কাঠ ও অত্যন্ত নিম্নমানের কয়লা পোড়ানো এবং স্বল্প উচ্চতার ড্রাম চিমনি ব্যবহার করায় ইটভাটাগুলোতে নির্গত হচ্ছে প্রচুর পরিমাণে কালো ধোঁয়া। সে ধোঁয়া বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে চার পাশে। ফলে পরিবেশ বিপর্যয়সহ জনস্বাস্থ্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে।

আইন না মেনে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের কড্ডা, ইসলামপুর, বাইমাইল ও কোনাবাড়ী এলাকায় চলছে অবৈধ দেড় শতাধিক ইটভাটা। বেশির ভাগ ইটভাটা গড়ে উঠেছে স্কুল-কলেজ-মাদরাসা ও আবাসিক এলাকার আশপাশে। ভাটাগুলোর বিষাক্ত কালো ধোঁয়া ও বর্জ্যে বিপন্ন হচ্ছে পরিবেশ। ছড়িয়ে পড়েছে রোগ-ব্যাধি। সারা দেশে ইট তৈরিতে আধুনিক প্রযুক্তির পরিবর্তে ব্যবহৃত হচ্ছে ১২০ ফুট উচ্চতার স্থায়ী চিমনি বা সম্পূর্ণ অবৈধ ড্রাম চিমনিবিশিষ্ট ইটভাটা। অবৈধ ইটভাটা বন্ধে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।

পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও উন্নয়নের স্বার্থে ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপনের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ২০১৩ সালের ২০ নভেম্বর ‘ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩’ সংসদে পাস করা হয়। পরিবেশ অধিদপ্তর ২০১৪ সালের ১৭ জুলাই তারিখের গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে আইনটি ওই বছরের ১ জুলাই থেকে কার্যকর করে। এই আইনের আওতায় জ্বালানি সাশ্রয়ী, উন্নত প্রযুক্তিসম্পন্ন জিগজ্যাগ কিলন, ভার্টিক্যাল স্যাফট ব্রিক কিলন, হাইব্রিড হফম্যান কিলন, টানেল কিলন, বা অনুরূপ কোনো ভাটা স্থাপন/পরিচালনা করা যাবে বলা হয়েছে। আইন কার্যকর হওয়ার পর কোনো ব্যক্তি আবাসিক, সংরক্ষিত বা বাণিজ্যিক এলাকা; সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা বা উপজেলা সদর; সরকারি বা ব্যক্তিমালিকানাধীন বন, অভয়ারণ্য, বাগান বা জলাভূমি, কৃষি জমি, প্রতিবেশগত সঙ্কটাপন্ন এলাকা, ডিগ্রেডেড এয়ার শেড এলাকার সীমানার অভ্যন্তরে কোনো ইটভাটা স্থাপন করতে পারবেন না। নিষিদ্ধ এলাকার সীমানার অভ্যন্তরে ইটভাটা স্থাপনের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তর, বা জেলা প্রশাসক কোনো আইনের অধীন কোনোরূপ অনুমতি বা ছাড়পত্র বা লাইসেন্স প্রদান করতে পারবে না। আইন কার্যকর হওয়ার পূর্বে, ছাড়পত্র গ্রহণকারী কোনো ব্যক্তি যদি নিষিদ্ধ এলাকার সীমানার মধ্যে বা নির্দিষ্ট দূরত্বের মধ্যে বা স্থানে ইটভাটা স্থাপন করে থাকেন, তা হলে তিনি, আইন কার্যকর হওয়ার দুই বৎসর সময়সীমার মধ্যে, ওই ইটভাটা, যথাস্থানে স্থানান্তর করবেন, অন্যথায় লাইসেন্স বাতিল হয়ে যাবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতাল ও ক্লিনিকের মধ্যে ইটভাটা স্থাপন করিতে পারিবে না। অথচ বর্তমানে দেশের অধিকাংশ ইটভাটাই এ আইন অমান্য করে স্থাপিত এবং ইট তৈরি করছে।

পরিবেশ নির্দিষ্ট কোনো দেশ বা জাতির সম্পদ নয়, পরিবেশ সবার সম্পদ এবং এর বিপর্যয় নির্দিষ্ট কোনো এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং মানবজাতির বিপর্যয় হিসেবে গণ্য হয়। মানবসভ্যতার উন্নয়ন, প্রগতি ও উৎকর্ষের নামে মানুষ নানা কালে নানা কারণে পরিবেশকে বিপর্যস্ত করেছে। মানুষের সঙ্গে পরিবেশের যে আন্তসম্পর্ক ইসলাম স্থাপন করেছিলো, তা-ও চরমভাবে অবজ্ঞা করা হয়েছে। সে জন্যই পরিবেশ-সংকটে মানব সৃষ্ট কারণগুলোকে আজ ব্যাপকভাবে দায়ী হচ্ছে। তাই পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা দরকার।

জীববৈচিত্র্য রক্ষা,প্রকৃতির সুরক্ষা নিশ্চিত করা,জীববৈচিত্র্য ধ্বংসরোধে জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ সংরক্ষণ আইন বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করাসহ প্রাণ ও প্রকৃতি তথা জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় বিভিন্ন রাষ্ট্র কর্তৃক প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি রক্ষা এবং তার বাস্তবায়নে নাগরিকদের সোচ্চার হতে হবে। সর্বোপরি পৃথিবীতে মানবজাতিকে টিকে থাকতে হলে প্রকৃতিপ্রদত্ত বাস্তুতন্ত্র ও জীববৈচিত্র্যকে সুরক্ষা করেই বাঁচতে হবে।

 

লেখকঃ গবেষক,সাবেক জাতীয় ক্রীড়াবিদ,

চেয়ারম্যান গ্রীণ ক্লাব, মানিকগঞ্জ,সাংবাদিক ও কলামিস্ট