ইসলামের একজন বিশ্বস্ত নবী হযরত লুত (আ.)

 

মো.আলতাফ হোসেন ঃঃ
আল্লাহ তা’য়ালা যুগে যুগে সত্য দ্বীনসহ অসংখ্য নবী-রাসুল প্রেরণ করেছেন। যাদের প্রেরণের মূল লক্ষ্যই ছিলো এ জমিনে তাঁর ইবাদাত তথা দাসত্ব মানুষ শিখানো। মানুষকে সকল প্রকার অন্যায় জুলুম অত্যাচার থেকে ফিরিয়ে সঠিক জীবন দর্শন দেখানো। তাই প্রত্যেক নবি-রাসূলই আল্লাহ তা’য়ালা এ মিশন বাস্তবায়নে নিজেদের এবং উম্মতের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণ কামণায় দোয়া করেছেন। আল্লাহ তা’য়ালা পৃথিবীর বুকে অসংখ্য নবী-রাসূল পাঠিয়েছে। কোরানে বর্ণিত ২৫ জন নবী-রাসূলের একজন হলো হযরত লুত (আ.)।
লুত ইবনে হারান যিনি সচরাচর হযরত লুত (আ.) নামে অভিহিত। বাইবেল এবং কোরআনে উল্লেখিত আল্লাহ প্রেরিত একজন পয়গম্বর যাকে সদোম ও গোমোরাহ নামক শহরদ্বয়ের অধিবাসীদের নবী হিসেবে নিযুক্ত করা হয়েছিলো। তিনি ছিলেন নবী ইব্রাহিম (আ.) এর আপন ভাতিজা। ইব্রাহিম (আ.) এর সঙ্গে তিনি কেনানে চলে আসেন। সেখানেই তার উপর নবুয়াতের দায়িত্ব অবতীর্ণ হয়।

নবী হযরত লূত (আ.) ছিলেন হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর ভাতিজা। চাচার সাথে তিনিও জন্মভূমি ‘বাবেল’ শহর থেকে হিজরত করে বায়তুল মুক্বাদ্দাসের অদূরে কেন‘আনে চলে আসেন। আল্লাহ লূত (আ.)-কে নবুয়ত দান করেন এবং কেন‘আন থেকে অল্প দূরে জর্ডান ও বায়তুল মুক্বাদ্দাসের মধ্যবর্তী ‘সাদূম’ অঞ্চলের অধিবাসীদের পথ প্রদর্শনের জন্য প্রেরণ করেন। এ এলাকায় সাদূম, আমূরা, দূমা, ছা‘বাহ ও ছা‘ওয়াহ নামে বড় বড় পাঁচটি শহর ছিলো। কোরআন মাজীদ বিভিন্ন স্থানে এদের সমষ্টিকে ‘মু’তাফেকাহ’ (নাজম ৫৩/৫৩) বা ‘মু’তাফেকাত’ (তওবাহ ৯/৭০,হাক্বক্বাহ ৬৯/৯) শব্দে বর্ণনা করেছে। যার অর্থ ‘জনপদ উল্টানো শহরগুলি’। এ পাঁচটি শহরের মধ্যে সাদূম ছিল সবচেয়ে বড় এবং সাদূমকেই রাজধানী মনে করা হতো। হযরত লূত (আ.) এখানেই অবস্থান করতেন। এখানকার ভূমি ছিলো উর্বর ও শস্য-শ্যামল। এখানে সর্বপ্রকার শস্য ও ফলের প্রাচুর্য ছিলো। এসব ঐতিহাসিক তথ্য বিভিন্ন তাফসীর গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। ‘সাদূম’ সম্পর্কে সকলে একমত। বাকী শহরগুলির নাম কি, সেগুলির সংখ্যা তিনটি, চারটি না ছয়টি, সেগুলিতে বসবাসকারী লোকজনের সংখ্যা কয়শত, কয় হাযার বা কয় লাখ ছিল, সেসব বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। এগুলি ইস্রাঈলী বর্ণনা, যা কেবল ইতিহাসের বস্তু হিসাবে গ্রহণ করা যায়। কোরআন ও হাদিসে শুধু মূল বিষয় বস্তুর বর্ণনা এসেছে, যা মানবজাতির জন্য শিক্ষণীয়। উল্লেখ্য যে,হযরত লূত (আ.) সম্পর্কে পবিত্র কোরআনের ১৫টি সূরায় ৮৭টি আয়াতে বর্ণিত হয়েছে।

হযরত লূত (আ.) এর স্ত্রী কোরআনে সীমালঙ্ঘনকারীদের অন্তর্ভুক্ত হিসেবে বর্ণিত হয়েছে। কোরআনের বর্ণনা অনুযায়ী সডোম ও গোমরাহ অঞ্চলের অধিবাসীদের সঙ্গে তার মৃত্যু হয়। বাইবেলেও লুত (আ.) এর কাহিনী পাওয়া যায়। তবে জেনেসিস,১৯ অধ্যায় (আয়াত ৪-৯) এর অতিরিক্ত কিছু কাহিনী (তার কন্যাদের সংশ্লিষ্ট) নির্ভরযোগ্য তথ্যসূত্রের (অর্থাৎ বাইবেলের তথা জেনেসিসের নির্ভেজাল সংস্করণ) অভাবে বিতর্কিত হয়ে আছে। তাই লভ্য বাইবেলের (জেনেসিস, ১৯ অধ্যায়) বর্ণনা ইসলামে সর্বাংশে গ্রহণ করা হয়নি।

হযতর লূত (আ.)-এর কওম আল্লাহর ইবাদত ছেড়ে শিরক ও কুফরীতে লিপ্ত হয়েছিলো। দুনিয়াবী উন্নতির চরম শিখরে উন্নীত হওয়ার কারণে তারা সীমা লঙ্ঘনকারী জাতিতে পরিণত হয়েছিলো। পূর্বেকার ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতিগুলির ন্যায় তারা চূড়ান্ত বিলাস-ব্যসনে গা ভাসিয়ে দিয়েছিলো। অন্যায়-অনাচার ও নানাবিধ দুষ্কর্ম তাদের মজ্জাগত অভ্যাসে পরিণত হয়ে গিয়েছিলো। এমনকি পুংমৈথুন বা সমকামিতার মত নোংরামিতে তারা লিপ্ত হয়েছিলো,যা ইতিপূর্বেকার কোন জাতির মধ্যে পরিদৃষ্ট হয়নি। জন্তু-জানোয়ারের চেয়ে নিকৃষ্ট ও হঠকারী এই কওমের হেদায়াতের জন্য আল্লাহ লূত (আঃ)-কে প্রেরণ করলেন। কোরআনে লূতকে ‘তাদের ভাই’ (শো‘আরা ২৬/১৬১) বলা হলেও তিনি ছিলেন সেখানে মুহাজির। নবী ও উম্মতের সম্পর্কের কারণে তাঁকে ‘তাদের ভাই’ বলা হয়েছে। তিনি এসে পূর্বেকার নবীগণের ন্যায় প্রথমে তাদেরকে তাওহীদের দাওয়াত দিয়ে বললেন,‘আমি তোমাদের জন্য বিশ্বস্ত রাসূল।অতএব তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আমার আনুগত্য কর। আমি এর জন্য তোমাদের নিকটে কোনরূপ প্রতিদান চাই না। আমার প্রতিদান তো বিশ্বপ্রভু আল্লাহ দিবেন’ (শো‘আরা ২৬/১৬২-১৬৫)। অতঃপর তিনি তাদের বদভ্যাসের প্রতি ইঙ্গিত করে বললেন,‘বিশ্ববাসীর মধ্যে কেন তোমরাই কেবল পুরুষদের নিকটে (কুকর্মের উদ্দেশ্যে- আ‘রাফ ৭/৮১) এসে থাক’? ‘আর তোমাদের স্ত্রীগণকে বর্জন কর, যাদেরকে তোমাদের জন্য তোমাদের পালনকর্তা সৃষ্টি করেছেন? নিঃসন্দেহে তোমরা সীমা লঙ্ঘনকারী সম্প্রদায়’ (শো‘আরা ২৬/১৬৫-১৬৬)। জবাবে কওমের নেতারা বলল, ‘হে লূত! যদি তুমি (এসব কথাবার্তা থেকে) বিরত না হও, তাহ’লে তুমি অবশ্যই বহিষ্কৃত হবে’। তিনি বললেন,‘আমি তোমাদের এইসব কাজকে ঘৃণা করি’ (শো‘আরা ২৬/১৬৭-১৬৮)। তিনি তাদের তিনটি প্রধান নোংরামির কথা উল্লেখ করে বলেন,‘তোমরা এমন অশ্লীল কাজ করছ, যা তোমাদের পূর্বে পৃথিবীর কেউ কখনো করেনি’। ‘তোমরা কি পুংমৈথুনে লিপ্ত আছ, রাহাজানি করছ এবং নিজেদের মজলিসে প্রকাশ্যে গর্হিত কর্ম করছ’? জবাবে তাঁর সম্প্রদায় কেবল একথা বলল যে, আমাদের উপরে আল্লাহর গযব নিয়ে এসো,যদি তুমি সত্যবাদী হও’। তিনি তখন বললেন, ‘হে আমার পালনকর্তা! এই দুষ্কৃতিকারী সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে তুমি আমাকে সাহায্য কর’ (আনকাবূত ২৯/২৮-৩০; আ‘রাফ ৭/৮০)।

নিজ কওমের প্রতি হযরত লূত (আ.)-এর দাওয়াতের ফলশ্রুতি মর্মান্তিক রূপে প্রতিভাত হয়। তারা এতই হঠকারী ও নিজেদের পাপকর্মে অন্ধ ও নির্লজ্জ ছিলো যে,তাদের কেবল একটাই জবাব ছিলো,তুমি যে গযবের ভয় দেখাচ্ছ, তা নিয়ে আস দেখি? কিন্তু কোনো নবীই স্বীয় কওমের ধ্বংস চান না। তাই তিনি ছবর করেন ও তাদেরকে বারবার উপদেশ দিতে থাকেন। তখন তারা অধৈর্য হয়ে বলে যে,‘এদেরকে তোমাদের শহর থেকে বের করে দাও। এই লোকগুলি সর্বদা পবিত্র থাকতে চায়’ (আ‘রাফ ৭/৮২; নমল ২৭/৫৬)। তারা আল্লাহভীতি থেকে বেপরওয়া হয়ে অসংখ্য পাপকর্মে নিমজ্জিত হয়ে পড়ে। কোরআন তাদের তিনটি প্রধান পাপ কর্মের উল্লেখ করেছে। (১) পুংমৈথুন (২) রাহাজানি এবং (৩) প্রকাশ্য মজলিসে কুকর্ম করা (আনকাবূত ২৯/২৯)। বলা বাহুল্য, সাদূমবাসীদের পূর্বে পৃথিবীতে কখনো এরূপ কুকর্ম কেউ করেছে বলে শোনা যায়নি। এমনকি অতি বড় মন্দ ও নোংরা লোকদের মধ্যেও কখনো এরূপ নিকৃষ্টতম চিন্তার উদ্রেক হয়নি। উমাইয়া খলীফা অলীদ ইবনে আবদুল মালেক (৮৬-৯৭/৭০৫-৭১৬ খৃঃ) বলেন,কোরআনে লূত (আ.)-এর সম্প্রদায়ের ঘটনা উল্লেখ না থাকলে আমি কল্পনাও করতে পারতাম না যে, কোন মানুষ এরূপ নোংরা কাজ করতে পারে’। তাদের এই দুষ্কর্মের বিষয়টি দু’টি কারণে ছিলো তুলনাহীন। এক- এ কুকর্মের কোনো পূর্ব দৃষ্টান্ত ছিলো না এবং একাজ সম্পূর্ণ নতুনভাবে তারা চালু করেছিলো। দুই- এ কুকর্ম তারা প্রকাশ্য মজলিসে করত,যা ছিলো বেহায়াপনার চূড়ান্ত রূপ।

বস্তুতঃ মানুষ যখন দেখে যে, সে কারু মুখাপেক্ষী নয়, তখন সে বেপরওয়া হয়’ (আলাক্ব ৯৬/৬-৭)। সাদূমবাসীদের জন্য আল্লাহ স্বীয় নেয়ামত সমূহের দুয়ার খুলে দিয়েছিলেন কিন্তু তারা তার শুকরিয়া আদায় না করে কুফরী করে এবং ধনৈশ্বর্যের নেশায় মত্ত হয়ে বিলাস-ব্যসন, কাম-প্রবৃত্তি ও লোভ-লালসার জালে এমনভাবে আবদ্ধ হয়ে পড়ে যে,লজ্জা-শরম ও ভালো-মন্দের স্বভাবজাত পার্থক্যবোধটুকুও তারা হারিয়ে ফেলে। তারা এমন প্রকৃতি বিরুদ্ধ নির্লজ্জ কাজে লিপ্ত হয়, যা হারাম ও কবীরা গোনাহ তো বটেই,কুকুর-শূকরের মত নিকৃষ্ট জন্তু-জানোয়ারও এর নিকটবর্তী হয় না। তারা এমন বদ্ধ নেশায় মত্ত হয় যে,হযরত লূত (আ.)-এর উপদেশবাণী ও আল্লাহর গযবের ভীতি প্রদর্শন তাদের হৃদয়ে কোন রেখাপাত করেনি। উল্টা তারা তাদের নবীকেই শহর থেকে বের করে দেবার হুমকি দেয় এবং বলে যে, ‘তোমার প্রতিশ্রুত আযাব এনে দেখাও, যদি তুমি সত্যবাদী হও’ (্আনকাবূত ২৯/২৯)। তখন হযরত লূত (আ.) বিফল মনোরথ হয়ে আল্লাহর সাহায্য কামনা করলেন। ফলে যথারীতি গযব নেমে এল। উল্লেখ্য যে, বর্তমান বিশ্বে মহামারী আকারে যে মরণ ব্যাধি এইড্সের বিস্তৃতি ঘটেছে, তার মূল কারণ হলো পুংমৈথুন,পায়ু মৈথুন ও সমকামিতা। ইসলামী শরী‘আতে এই কুকর্মের একমাত্র শাস্তি হলো উভয়ের মৃত্যুদন্ড (যদি উভয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে একাজ করে)।

মাবতার অগ্রদূত হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেন,অভিশপ্ত ঐ ব্যক্তি, যে লূতের কওমের মত কুকর্ম করে। অন্যত্র তিনি বলেন, আল্লাহ তা‘আলা ঐ ব্যক্তির প্রতি ফিরে তাকাবেন না,যে ব্যক্তি কোন পুরুষ বা নারীর মলদ্বারে মৈথুন করে’।তিনি বলেন,আমি আমার উম্মতের জন্য সবচেয়ে (ক্ষতিকর হিসাবে) ভয় পাই লূত জাতির কুকর্মের’। এইড্সের আতংকে ভয়ার্ত মানবজাতি শেষনবীর উক্ত বাণীগুলির প্রতি দৃষ্টি দিবে কি?

হযরত লূত (আ.) আল্লাহ তা‘য়ালার এক সম্মানিত নবী। তিনি সেই সব নবীদের একজন, যার উম্মতরা কোনদিনও ঈমান আনেনি। হযরত লূত (আ.)-এর জাতি যে কেবল ঈমান আনেনি,তা নয় বরং তাঁর জাতির লোকেরা ছিলো সে কালের সবচেয়ে পাপিষ্ঠ লোক। হযরত লূত (আ.) সেই সব নবীদেরও একজন,যাদের জাতিকে আল্লাহ ইসলামের বিরোধিতা করার কারণে ধ্বংস করে দিয়ে ছিলেন। হযরত নূহ (আ.), হযরত হূদ (আ.) এবং হযরত সালিহ (আ.)-এর জাতির মতোই লূত (আ.)-এর জাতিকেও আল্লাহ ধ্বংস করে দিয়ে ছিলেন। হযরত লূত (আ.) ছিলেন মহান নবী হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর ভাতিজা। হযরত ইব্রাহিম (আ.) যখন নিজ দেশ ‘ইরাকে আল্লাহর দীন প্রচার শুরু করেন, সেখানে শেষ পর্যন্ত মাত্র দু’জন লোক তাঁর প্রতি ঈমান এনেছিলেন। তাঁদের একজন তাঁর স্ত্রী সারাহ। অপরজন তাঁরই ভ্রাতুষ্পুত্র লূত। তিনি যখন ‘ইরাক থেকে হিজরত করতে বাধ্য হন,তখন কেবল এ দু’জন লোকই তাঁর হিজরতের সাথী হন। লূত (আ.) বাইবেলে উল্লেখিত লোট। আল কোরআনে তিনি একজন বিশিষ্ট পয়গম্বর রূপে উল্লিখিত; কিন্তু বাইবেল হাগ্গাদা এবং খ্রীস্টান ধর্মযাজকদের নিকট তিনি সেইরূপ মর্যাদা লাভ করেননি। হযরত লূত (আ.) এইরূপ প্রসিদ্ধি কোআনেই প্রথম।আল-কোরআনে লূত (আ.)-এর ধর্ম প্রচারে প্রবল বিরোধিতার জন্য সাদোমবাসীদের উপর যে গজব নাজিল হয়েছিলো তার উল্লেখ করে অবাধ্য লোকদের সতর্ক করে দেয়া হয়েছে। নূহ (আ.), হূদ (আ.), সালিহ (আ.), ইব্রাহিম (আ.) হযরত মূসা (আ.) প্রমুখের ন্যায় হযরত লূত (আ.) ও হযরত মুহাম্মদ (স.)-এর পূর্বগামী নির্বাচিত নবীদের অন্যতম। হযরত লূত (আ) কোরআন মজীদে উল্লিখিত ২৫ জন মহান নবীর অন্তর্ভুক্ত এবং ৬ : ৮৩-৮৬ আয়াতে যে ১৮ জন নবীর নাম উক্ত হয়েছে, তিনি তাঁহাদেরও অন্তর্ভুক্ত।

হযরত লূত (আ.)-এর নাফরমান কওমের শোচনীয় পরিণতি বর্ণনা করার পর দুনিয়ার অপরাপর জাতিকে সতর্ক করার জন্য আল্লাহ পাক এরশাদ করেন,‘(জনপদ উল্টানো ও প্রস্তর বর্ষণে নিশ্চিহ্ন ঐ ধ্বংসস্থলটি) বর্তমান কালের যালেমদের থেকে খুব বেশী দূরে নয় (হূদ ১১/৮৩)। মক্কার কাফেরদের জন্য উক্ত ঘটনাস্থল ও ঘটনার সময়কাল খুব বেশী দূরের ছিলো না। মক্কা থেকে ব্যবসায়িক সফরে সিরিয়া যাতায়াতের পথে সর্বদা সেগুলো তাদের চোখে পড়ত কিন্তু তা থেকে তারা শিক্ষা গ্রহণ করতো না। বরং শেষনবী মুহাম্মাদ (সা.)-কে অবিশ্বাস করত ও তাঁকে অমানুষিক কষ্ট দিতো। আনাস (রা.) হতে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেন, যখন আমার উম্মত পাঁচটি বিষয়কে হালাল করে নেবে, তখন তাদের উপর ধ্বংস নেমে আসবে। (১) যখন পরস্পরে অভিসম্পাৎ ব্যাপক হবে (২) যখন তারা মদ্যপান করবে (৩) রেশমের কাপড় পরিধান করবে (৪) গায়িকা-নর্তকী গ্রহণ করবে (৫) পুরুষ-পুরুষে ও নারী-নারীতে সমকামিতা করবে। কওমে লূত-এর বর্ণিত ধ্বংসস্থলটি বর্তমানে ‘বাহরে মাইয়েত বা ‘বাহরে লূত অর্থাৎ ‘মৃত সাগর বা ‘লূত সাগর নামে খ্যাত। যা ফিলিস্তীন ও জর্ডান নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চলে বিশাল অঞ্চল জুড়ে নদীর রূপ ধারণ করে আছে। যেটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে বেশ নীচু। এর পানিতে তৈলজাতীয় পদার্থ বেশী। এতে কোন মাছ, ব্যাঙ এমনকি কোন জলজ প্রাণী বেঁচে থাকতে পারে না। এ কারণেই একে ‘মৃত সাগর বা ‘মরু সাগর বলা হয়েছে। সাদূম উপসাগর বেষ্টক এলাকায় এক প্রকার অপরিচিত বৃক্ষ ও উদ্ভিদের বীজ পাওয়া যায়,সেগুলো মাটির স্তরে স্তরে সমাধিস্থ হয়ে আছে।

সেখানে শ্যামল-তাজা উদ্ভিদ পাওয়া যায়,যার ফল কাটলে তার মধ্যে পাওয়া যায় ধূলি-বালি ও ছাই। এখানকার মাটিতে প্রচুর পরিমাণে গন্ধক পাওয়া যায়। নেট্রন ও পেট্রোল তো আছেই। এই গন্ধক উল্কা পতনের অকাট্য প্রমাণ। আজকাল সেখানে সরকারী প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের পক্ষ হতে পর্যটকদের জন্য আশপাশে কিছু হোটেল-রেস্তোঁরা গড়ে তোলা হযেছে কিন্তু এ ঘটনা থেকে শিক্ষা হাছিলের জন্য কোরআনী তথ্যাদি উপস্থাপন করে বিভিন্ন ভাষায় উক্ত ঘটনা লিপিবদ্ধ করে তা থেকে উপদেশ গ্রহণের জন্য পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করাই হত সবচাইতে জরূরী বিষয়। আজকের এইড্স আক্রান্ত বিশ্বের নাফরমান রাষ্ট্রনেতা,সমাজপতি ও বিলাসী ধনিক শ্রেণি তা থেকে শিক্ষা গ্রহণে সক্ষম হত। কেননা এগুলি মূলতঃ মানুষের জন্য শিক্ষাস্থল হিসাবে আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত হয়েছে।

নবী এবং রাসূলগণের শিক্ষা ও আদর্শের প্রতি যারা মিথ্যারোপ করেছিল এবং পাপাচারী কাওম বলে খ্যাতি অর্জন করেছিল, তাদের মধ্যে অন্যতম ছিল হযরত ইব্রাহিম (আ.) ও হযরত লুত (আ.) এর কাওম। বিশেষ করে হযরত লুত (আ.)-এর কাওমের লোকেরা ছিলো যৌনাচারী। তারা অবাধে শুধু নারী-পুরুষই নয়,বরং পুরুষে পুরুষেও যৌনকর্ম সম্পাদন করত। ঢালাওভাবে যৌনাচারের প্রবল স্রোতে তারা ছোট-বড় নির্বিশেষে গা ভাসিয়ে দিয়ে ছিলো।তারা হযরত ইব্রাহিম (আ.) ও হযরত লুত (আ.) কে মিথ্যাবাদী বলে প্রচার-প্রপাগান্ডা চালিয়ে ছিলো। এ প্রসঙ্গে আল কোরআনে ঘোষণা করা হয়েছে, ‘আর ইব্রাহিমের কওম ও লুতের কওম (পাপাচারী ও যৌনাচারীতে) নিমগ্ন ছিলো।’ (সূরা আল হাজ্জ : আয়াত ৪৩)।

হযরত লুত (আ.) তার কাওমকে যে সদুপদেশ দিয়েছিলো এবং তার কাওমের লোকেরা যে প্রতি উত্তর দিয়েছিলো এবং তাদের ওপর যে আযাব নাজিল হয়েছিলো তা সবিস্তারে আল কোরআনে বিবৃত হয়েছে। এরশাদ হয়েছে এবং লুতকেও আমি নবী রূপে প্রেরণ করেছিলাম। সে তার কাওমকে বলল, তোমরা এমন নিকৃষ্ট কর্ম করে চলেছ যা তোমাদের আগে পৃথিবীতে কেউ করেনি। তোমরা যৌনতৃপ্তি পূরণের জন্য নারীদের ছেড়ে পুরুষদের কাছে গমন করছ,আসলে তোমরা সীমালঙ্ঘনকারী কওমে পরিণত হয়েছো। লুতের কাওমের লোকদের একথা ছাড়া কোনো উত্তর ছিল না যে, তারা বলল, তাকে তোমাদের আবাসভূমি হতে বের করে দাও। তারা পবিত্রতা পছন্দকারী শ্রেণির মানুষ। সুতরাং আমি লুত ও তার পরিবার পরিজনকে মুক্তি দিলাম তার স্ত্রীকে ছাড়া। কেননা সে ছিলো পশ্চাদবর্তী দলের অন্তর্ভূক্ত। আমি তাদের প্রতি পাথর বৃষ্টি বর্ষণ করেছিলাম। তাই,লক্ষ্য কর যে,পাপীদের পরিণাম কি দাঁড়িয়ে ছিলো। (সূরা আল আ’রাফ : আয়াত ৮৩-৮৪)।

পবিত্র কোরআনে বর্ণিত ২৫ জন নবীর মধ্যে ইসলামের একজন নবী যাকে সমকামিতায় লিপ্ত থাকা স্বীয় জাতির সতর্ককারী হিসেবে আল্লাহ তা’য়ালা নিয়োজিত করেছিলেন। সমকামিতা ত্যাগ না করায় তারা আল্লাহর আযাবে সমূলে ধ্বংস হয়েছিলো। পবিত্র কোরআনে ১৫,২৬,২৯ এবং ৬৬ নম্বর সূরাসমূহের বিভিন্ন অংশে হযরত লুত (আ.) এর কাহিনী বর্ণনা করেন। হযরত লুত (আ.) এর জাতি পার্থিব উন্নতির চরম উৎকর্ষে পৌছে যাওয়ার কারণে বিলাসিতার অতিশয্যে সীমালঙ্ঘনের দিক দিয়ে তাদের পূর্বের গযবপ্রাপ্ত জাতিগুলোকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিলো। হযরত লুত (আ.) এর জাতি ব্যভিচার ও অজাচার তো করতোই,তার উপর সমকামিতার মত চরম সীমালঙ্ঘনও তারাই প্রথম শুরু করে, যা তাদের পূর্বে কেউ কখনো করে নি; উপরন্তু, তারা এর ফলে বিন্দুমাত্র অনুতপ্ত না হয়ে গর্ব ভরে তা সমাজে প্রকাশ করে বেড়াত এবং প্রকাশ্যে ও নির্লজ্জভাবে এসব নিষিদ্ধ কাজগুলো করতো। আল্লাহ তা’য়ালা তাই লুত (আ.)কে তার জাতির জন্যে সতর্ককারী নবী মনোনীত করলেন এবং আল্লাহকে ভয় করে তাদের এসব কাজ থেকে বিরত থাকতে বলার নির্দেশ দিলেন। হযরত লুত (আ.) দীর্ঘ সময় ধরে সতর্ক করার পরও যখন তাদের পরিবর্তন হল না তখন আল্লাহ তা’য়ালা চূড়ান্ত বিপর্যয়ের মাধ্যমে সমগ্র এলাকা উলটিয়ে দেন,আকাশ থেকে একাধারে বৃষ্টি ও পাথর বর্ষণ করে সমগ্র জাতিকে সমুলে নিশ্চিহ্ন করে দেন। বর্ণিত আছে,বর্তমান মৃত সাগর বা ডেড সি হলো হযরত লুত (আ.) এর জাতির সেই বাসস্থান যেখানে তাদের ধ্বংস করা হয়েছিলো।

লেখকঃ সাবেক জাতীয় ক্রীড়াবিদ,সভাপতি শারীরিক শিক্ষাবিদ সমিতি
চেয়ারম্যান গ্রিন ক্লাব,শিক্ষক,গবেষক,সাংবাদিক ও কলামিস্ট