ইসলামের এক ধৈর্যশীল বান্দা ও নবী হযরত আইয়ুব (আ.)

 

মো.আলতাফ হোসেন ঃঃ
আল্লাহ তা’য়ালা মানব জাতির হেদায়েত এবং পথপ্রদর্শনের লক্ষ্যে সর্বযুগে প্রত্যেক জাতির কাছে নবী-রাসূলদের প্রেরণ করেছেন। সম্মানিত নবী-রাসূলগণ প্রত্যেকেই ছিলেন কর্মঠ,সৎকর্মশীল এবং নিজ হাতে উপার্জনকারী। গোটা মানবজাতির জন্য তারা ছিলেন পথপ্রদর্শক এবং আদর্শ। তারা ছিলেন জগতের একেকজনন শ্রেষ্ঠ মানব। তাদের জীবনাচার কেমন ছিলো,তাদের আদর্শ,অভ্যাস,পেশা ও কাজকর্ম সম্মন্ধে অবগতিলাভ করার ভেতরে মানবজাতির জন্য নিঃসন্দেহে শিক্ষনীয় বিষয় রয়েছে। নবী-রাসুলগণকে প্রেরণের উদ্দেশ্য বর্ণিত হয়েছে কোরআনুল হাকিম। আল্লাহ তা’য়ালা যুগে যুগে সত্য দ্বীনসহ অসংখ্য নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন। যাদের প্রেরণের মূল লক্ষ্যই ছিলো এ জমিনে তাঁর ইবাদাত তথা দাসত্ব মানুষ শিখানো। মানুষকে সকল প্রকার অন্যায় জুলুম অত্যাচার থেকে ফিরিয়ে সঠিক জীবন দর্শন দেখানো। তাই প্রত্যেক নবী-রাসূলই আল্লাহ তা’য়ালা এ মিশন বাস্তবায়নে নিজেদের এবং উম্মতের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণ কামনায় দোয়া করেছেন। আল্লাহ তা’য়ালা পৃথিবীর বুকে অসংখ্য নবী-রাসূল পাঠিয়েছে। কোরানে বর্ণিত ২৫ জন নবী-রাসূলের মধ্যে হযরত আইয়ুব (আ.)অন্যতম।

আইয়ুব ইসলামের একজন নবী। মুসলমানদের পবিত্র গ্রন্থ কোরআনে তাঁর নাম উল্লেখ রয়েছে। ইবনে কাছীরের বর্ণনা অনুযায়ী তিনি নবী ইসহাক এর দুই জমজ পুত্র ঈছ ও ইয়াকূবের মধ্যে পুত্র ঈছ-এর প্রপৌত্র ছিলেন। আর তার স্ত্রী ছিলেন ইয়াকুব-পুত্র নবী ইউসুফ-এর পৌত্রী ‘লাইয়া’ বিনতে ইফরাঈম বিন ইউসুফ। বিপদে ধৈর্য ধারণ করায় এবং আল্লাহর পরীক্ষাকে হাসিমুখে বরণ করে নেওয়ায় আল্লাহ কোরআন শরীফে আইয়ুবকে ‘ধৈর্যশীল’ ও ‘সুন্দর বান্দা’ হিসাবে প্রশংসা করেছেন।

হযরত আইয়ুব (আ.) ছিলেন রোমের অধিবাসী এবং মহান আল্লাহর নবী হযরত ইব্রাহিম (আ.) এর বংশধর। হযরত ইব্রাহিম (আ.) এর পুত্র হযরত ইসহাক আলাইহিস সালাম। হযরত ইসহাক (আ.) এর পুত্রের বংশধর হযরত আইয়ুব (আ.)। হযরত আইয়ুব (আ.) যেখানে বসবাস করতেন তাওরাতে তা বোসরা নামে উল্লেখ করা আছে। হযরত আইয়ুব (আ.) ছিলেন সে সময়ে বিশাল ধন সম্পদের মালিক। যাবতীয় সকল ধরনের সম্পত্তি তার কাছে ছিলো। বিশাল পরিমান জমি-জমা,গৃহ-পালিত পশু এবং দাস-দাসী ছিলো। সম্পদ ছাড়াও পরিবার পরিজন ও প্রচুর সন্তান নিয়ে সুখে ছিলেন তিনি কিন্তু জীবনের সত্তর বছর বয়সে এসে মহান আল্লাহর কঠিন পরীক্ষায় একে একে তিনি সব হারাতে শুরু করেন। একে একে তাকে আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া প্রতিবেশিরা ছেড়ে চলে যান,কেউ তার পাশে আসেনি তাই এক পর্যায়ে শহরের বাইরে একটি আস্তাকুড়ের পাশে আইয়ুব (আ.)কে আশ্রয় নিতে হয়। তার এই বিপদে শুধু মাত্র একজন তাকে ছেড়ে যায় নি,তিনি মহান আল্লাহর প্রিয় বান্দা হযরত আইয়ুব (আ.) এর স্ত্রী। তিনি হযরত আইয়ুব (আ.) এর পাশে থেকে তার প্রতিটি কাজ করে দেন,সেবা-পরিচর্চা করেন।
হযরত আইয়ূব (আঃ) ছবরকারী নবীগণের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় এবং অনন্য দৃষ্টান্ত ছিলেন। আইয়ুব (আ.) এর স্ত্রী ছিলেন ইয়াকূব-পুত্র ইউসুফ (আঃ)-এর পৌত্রী ‘লাইয়া’ বিনতে ইফরাঈম বিন ইউসুফ। কেউ বলেছেন,‘রাহমাহ’। তিনি ছিলেন স্বামী ভক্তি ও পতিপরায়ণতায় বিশ্বের এক অতুলনীয় দৃষ্টান্ত। হযরত আইয়ুব আলাইহিস সালামের স্ত্রী বিবি রহমত। আল্লাহ তা’য়ালা তাঁকে পৃথিবীর নারীসহ সব মানুষের জন্য ধৈর্য ও ত্যাগের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বানিয়েছেন। তিনি স্বামীর সেবায় এমন ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছেন যে আল্লাহ তাকে ইসলামের ইতিহাসে প্রসিদ্ধ করেছেন। বিবি রহিমা হিসেবেই তিনি সর্বাধিক পরিচিত।

হযরত আইয়ুব (আ.) এর মহান আল্লাহভক্তি ও মহান আল্লাহর প্রতি অসীম কৃতজ্ঞতার কারণে শয়তান হিংসা করতো। শয়তান মহান আল্লাহর নেককার বান্দাদের পথভ্রষ্ট করতে পারে না,কোনো নবীর ওপর কোনো ক্ষমতা রাখতে পারে না। তাই শয়তান মহান আল্লাহর নবী আইয়ুব (আ.) এর ক্ষতি করতে না পেরে ঈর্ষান্বিত ছিলো। মহান আল্লাহ তা’য়ালার কাছে হযরত আইয়ুব (আ.)তাঁর অবস্থার কথা বলতে গিয়ে বলেন,‘শয়তান তো আমাকে যন্ত্রণা ও কষ্টে ফেলেছে।’ (সূরা সাদ:৪১) শয়তান মহান আল্লাহর নেককার বান্দা ও নবীগণের সঙ্গে ধোঁকা দেয়ার চেষ্টা করে, যা হযরত মুসা (আ.), হযরত ইউসুফ (আ.)সহ অনেক নবীগণের সঙ্গে হয়ে এসেছে। আইয়ুব (আ.) শুধু মাত্র প্রাচুর্যের মধ্যে নয়, দু:খ, কষ্ট ও অভাবের মধ্যেও মহান আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ ছিলো এবং তাকে স্মরণ করেছে। শয়তানের ধোঁকা ছিলো দু:খ, কষ্টের মধ্যে মহান আল্লাহর প্রিয় বান্দা আল্লাহকে ভুলে যাবে এবং তাঁর স্মরণ করা থেকে বিরত থাকবে কিন্তু হযরত আইয়ুব (আ.) আল্লাহ তায়ালার এই ঈমানি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। হযরত আইয়ুব (আ.) মহান আল্লাহ তা’য়ালার কাছে এই দু:খ, কষ্ট থেকে মুক্তি চেয়ে দোয়া করেছেন। পবিত্র কোরান শরীফে বর্ণিত, হযরত আইয়ুব আলাইহিস সালাম মহান আল্লাহকে বলেন,‘আমি দুঃখকষ্টে পড়েছি, আর আপনি তো সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু।’ (সূরা আম্বিয়া:৮৩)

পবিত্র আল কুরআনের ৪টি সূরার ৮টি আয়াতে নবী আইয়ুব (আ.) এর কথা এসেছে। সূরাগুলো হচ্ছে নিসা,আয়াত-১৬৩, আন‘আম ৮৪, আম্বিয়া ৮৩-৮৪ এবং ছোয়াদ ৪১-৪৪। আল কোরআনের ২১ নম্বর সূরা আম্বিয়ার ৮৩-৮৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন,‘আর স্মরণ কর আইয়ুবের কথা,যখন তিনি তার পালনকর্তাকে আহবান করে বলেছিলেন, আমি কষ্টে পতিত হয়েছি এবং আপনি সর্বোচ্চ দয়াশীল’। ‘অতঃপর আমি তার আহবানে সাড়া দিলাম এবং তার দুঃখ-কষ্ট দূর করে দিলাম। তার পরিবারবর্গকে ফিরিয়ে দিলাম এবং তাদের সাথে তাদের সমপরিমাণ আরও দিলাম আমার পক্ষ হতে দয়া পরবশে। আর এটা হলো ইবাদতকারীদের জন্য উপদেশ স্বরূপ’। সূরা ছোয়াদের ৪১ ও ৪২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘আর তুমি বর্ণনা কর আমাদের বান্দা আইয়ুবের কথা। যখন সে তার পালনকর্তাকে আহবান করে বলল, শয়তান আমাকে (রোগের) কষ্ট এবং (সম্পদ ও সন্তান হারানোর) যন্ত্রণা পৌঁছিয়েছে’ (ছোয়াদ ৩৮/৪১)।‘(আমরা তাকে বললাম,) তুমি তোমার পা দিয়ে (ভূমিতে) আঘাত কর। (ফলে পানি নির্গত হলো এবং দেখা গেল যে,) এটি গোসলের জন্য ঠান্ডা পানি ও (পানের জন্য উত্তম) পানীয়’ (ছোয়াদ ৩৮/৪২)। ‘আর আমরা তাকে দিয়ে দিলাম তার পরিবারবর্গ এবং তাদের সাথে তাদের সমপরিমাণ আমাদের পক্ষ হতে রহমত স্বরূপ এবং জ্ঞানীদের জন্য উপদেশ স্বরূপ’ (ছোয়াদ ৩৮/৪৩)।‘(আমরা তাকে বললাম,) তুমি তোমার হাতে একমুঠো তৃণশলা নাও। অতঃপর তা দিয়ে (স্ত্রীকে) আঘাত কর এবং শপথ ভঙ্গ করো না (বরং শপথ পূর্ণ কর)। এভাবে আমরা তাকে পেলাম ধৈর্যশীল রূপে। কতই না চমৎকার বান্দা সে। নিশ্চয়ই সে ছিলো (আমার দিকে) অধিক প্রত্যাবর্তনশীল’ (ছোয়াদ ৩৮/৪৪)।
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, আইয়ুব একদিন নগ্নাবস্থায় গোসল করছিলেন। এমন সময় তাঁর উপরে সোনার টিড্ডি পাখির দল এসে পড়ে। তখন আইয়ুব সেগুলিকে ধরে কাপড়ে ভরতে থাকেন। এমতাবস্থায় আল্লাহ তাকে ডেকে বলেন,হে আইয়ুব! আমি কি তোমাকে এসব থেকে মুখাপেক্ষীহীন করিনি? আইয়ুব বললেন, তোমার ইজ্জতের কসম! অবশ্যই তুমি আমাকে তা দিয়েছ কিন্তু তোমার বরকত থেকে আমি মুখাপেক্ষীহীন নই’।

ইসলামের নবী হযরত আইয়ুব (আ.) মহান আল্লাহ তা’য়ালার নবী এবং অত্যন্ত প্রিয় বান্দা ছিলেন। যে সমন্ত নবীগণ মহান আল্লাহর ওহী পেয়েছিলেন তাদের মধ্যে হযরত আইয়ুব (আ.) একজন। পবিত্র কোরান শরীফে হযরত আইয়ুব আলাইহিস সালামের চরম দু:খ, কষ্ট এবং ধৈর্য্য পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার বর্ণনা এসেছে। মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেন,‘এবং স্মরণ কর,আইয়ুবের কথা, যখন সে তার প্রতিপালককে আহবান করে বলেছিল, আমি দু:খ-কষ্টে পড়েছি। তুমি তো দয়ালুদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু। তখন আমি তার ডাকে সাড়া দিলাম। তার দু:খ-কষ্ট দূরীভূত করে দিলাম,তাঁকে তার পরিবার-পরিজন ফিরিয়ে দিলাম এবং তাদের সঙ্গে তাদের মতো আরো দিয়েছিলাম। আমার বিশেষ রহমতরূপে এবং ইবাদতকারীদের জন্যে উপদেশস্বরূপ।

দীর্ঘ সময়ে বিপদ আপদ দু:খ,কষ্ট ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেলেও হযরত আইয়ুব (আ.) ঈমান হারাননি। সর্বদা মহান আল্লাহকে স্মরণ করেছেন। হযরত আইয়ুব (আ.) আঠার বছর যাবত মুসীবতে আবদ্ধ ছিলেন। এতটা কষ্ট ও মুসীবতে পড়েও সবসময় তিনি মহান আল্লাহর জিকিরে মসগুল থাকতেন। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন,‘নি:সন্দেহে আমি তাকে (আইয়ুবকে) ধৈর্যশীল পেয়েছি; কতো উত্তম বান্দা ছিলো সে; নিশ্চয় সে ছিলো প্রত্যাবর্তনশীল।’(সূরা সোয়াদ: ৪৪) মহান আল্লাহ তা’য়ালার এই কঠিন পরীক্ষায় হজরত আইয়ুব (আ.) উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে হযরত আইয়ুব (আ.) সিজদায় লুটিয়ে পরেন এবং যতক্ষণ পর্যন্ত পরিত্রাণ না পাচ্ছেন ততক্ষণ সিজদা না ছাড়ার নিয়ত করেন। মহান আল্লাহ তা’য়ালা তাঁর দোয়া কবুল করে নেন। হজরত আইয়ুব আলাইহিস সালাম সুস্থ হয়ে ওঠেন এবং তিনি তার সহায়-সম্পত্তি ও সন্তান-সন্ততি পুনরায় ফিরে পান।

হযরত আইয়ুব আ:-এর পুরো বর্ণনা ও আলোচনায় কয়েকটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণÑ ১. হযরত আইয়ুব (আ:) এর অসুস্থতার ব্যাপারে কুরআনে আর কোনো বিবরণ পাওয়া যায়নি, হাদিসের বিশাল ভান্ডারেও এ বিষয়ে আর কিছু জানা যায়নি। তবে পরিস্থিতি বলে, রোগটি অনেক ভয়ানক, ক্ষতিকর আর এটি যে সংক্রমণ জাতীয় ছিলো তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কারণ এর ফলে অসুস্থ ব্যক্তিকে নবীর আ: পবিত্র স্ত্রী ছাড়া সবাই সংক্রমণের ভয়ে ছেড়ে চলে গিয়েছিলো। এটাও স্পষ্ট যে রোগের কারণে তাঁকে নির্জন ও নিঃসঙ্গ থাকতে হয়। ইসরাইলি রেওয়ায়েতে আরো অনেক কিছু বলা হয়েছে কিন্ত সেগুলোর ওপর আমরা নির্ভর করতে পারি না। ২.আমরা জানি যে রোগ শোক আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে কিন্তু এখানে তিনি কেন বললেনÑশয়তান আমাকে যন্ত্রণা ও কষ্টসহকারে স্পর্শ করেছে। মূলত এটিই নবীগণের কথার আদব ও শিষ্টাচার; যা কিছু ভালো তার জন্য নবীগণ মহান আল্লাহর দিকে সেটাকে সম্পৃক্ত করে দেন, অন্য দিকে যখন মন্দ কিছু তাদের স্পর্শ করে তখন সেটিকে তারা নিজেদের দিকে নিক্ষেপ করেন। আমরা করি বিপরীত। অসুস্থ হলে আমরা আল্লাহকে দোষারোপ করি এবং নিজেদেরকে অভিসম্পাত দিতে থাকি। শয়তানকে দোষারোপ করার আরেকটি কারণ হলো তার এমন কঠিন মুসিবতকালে আত্মীয় স্বজন ও প্রতিবেশীরা সবাই তাকে ছেড়ে গেলে শয়তান ক্রমাগত তাঁকে দুশ্চিন্তাগস্ত করে তোলে, আল্লাহ সম্পর্কে ভুল বোঝাতে থাকে এবং দুঃখ বিলাপ করতে উদ্বুদ্ধ করতে থাকে। এটা আমাদের ক্ষেত্রেও ঘটে থাকে। ৩. অসুস্থতার চূড়ান্ত কষ্টে পৌঁছেও তিনি হতাশ হয়ে পড়েননি, তিনি ধৈর্যহারাও হননি। না তিনি সারাক্ষণ উহ আহ করেছিলেন আর না চিৎকার করেছিলেন। এমনকি আল্লাহর কাছে প্রার্থনার আকারে যা বলেছিলেন সেটাও অনের বড় শিক্ষণীয়। তিনি বলতে পারতেন- আল্লাহ আমার কঠিন বিমার হয়েছে, আমার শরীর থেকে পচে পচে গোশত খসে পড়ছে। এক অনিরাময়যোগ্য বিপদগ্রস্ততার শিকার হয়েছি। আমাকে তুমি রক্ষা করো এবং তোমার পক্ষ থেকে শিফা নসিব করো। কমপক্ষে এতটুকু তো বলাই যেত কিন্তু তিনি কী বললেন? তিনি বললেনÑ আমি দুঃখকষ্টে পড়েছি। আপনি দয়াবানদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ দয়ালু। ভাবুন,একজন নবী দীর্ঘ আঠারো বছর কঠিন রোগে শয্যাশায়ী, অথচ আল্লাহকে যখন বলছেন কোনো অভিযোগ নেই,কোনো অনুযোগ নেই,কষ্ট কাতরতা কিছু নেই। কত নরম সুর,কত ইমোশানাল, কনভিনসিং ও শালীন দোয়া। ৪. রোগ যতই কঠিন ও অনিরাময়যোগ্যই হোক, সুস্থতাও আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে। মুমিন এ জন্য রোগে শোকে হতাশ হয় না। এটা মনে প্রাণে বিশ্বাস করে যে তাদেরকে নিঃসন্দেহে উদ্ধারও করবেন। আইয়ুব (আ:)-কেও আল্লাহ সুস্থতা দান করেছেন এবং সেটা ছিলো খুবই সাধারণ উপায়ে। ৫. অসুস্থার দরুন আইয়ুব (আ.)-এর যেসব সন্তানাদি ও আত্মীয়স্বজন চলে গিয়েছিলেন তারা সবাই আবার ফিরে আসেন। আবার পাড়া-পড়শীর আগমনে সব যেন প্রাণ খুঁজে পায়। মৃত পরিবার আবার জেগে উঠে শত কোলাহলে। কোনো কোনো তাফসিরে লিখেছেÑ এমনকি যারা এই আঠারো বছরে মৃত্যুবরণ করেছিলেন আল্লাহ পাক তাদেরও ফিরিয়ে আনেন এবং প্রত্যেক পরিবারে আরো অধিক সন্তানাদি দান করেন। ৬. আইয়ুব আ:-এর স্ত্রী এমন কঠিন অবস্থায়ও আইয়ুুব (আ.)কে ছেড়ে যাননি। স্বামীর অসুস্থতায় তিনিও সমান পেরেশান ছিলেন। এতদসত্ত্বেও কেন তাকে একশ’ বেত্রাঘাত করা হলো। সুবহানাল্লাহ, আল্লাহর বিজ্ঞতা যে কত বড়, সেটা ভাবার ক্ষমতাও আমাদের নেই। ঘটনাটি হলোÑপূর্বেই বলেছি শয়তান খোদ নবী আ: ও তাঁর স্ত্রীকে এমন কঠিন অবস্থায় নানাভাবে কুমন্ত্রণা দিয়ে যাচ্ছিল। নবী হওয়ার কারণে আইয়ুব (আ:) তা আমলে নেননি,কিন্তু তার পেরেশান স্ত্রী কোমল মনে সরল বিশ্বাসে শয়তানকে একপর্যায়ে বিশ্বস্তভাবে। এতে আইয়ুব আ: রাগ করেন এবং রাগের বশে শপথ করে বসেন যে, সুস্থ হলে তিনি তাকে এক শ’ বেত্রাঘাত করবেন। এটি ছিলো স্বামীসুলভ শাসন। এখন তো সেই শপথ বাস্তবায়নের সময় এসেছে। মুফাসসিরিনগণ লিখেন যে, এক দিকে নিঃসঙ্গ সময়ে স্ত্রীর নিরলস সেবা, তার অবিরাম পেরেশানি ও অতুলনীয় বিশ্বস্ততা এবং বিপরীতে শপথ পরিপালন আইয়ুব আ:-কে দ্বিধার মধ্যে ফেলে দেয়। তখন আল্লাহ তাকে এক শ’টি তৃণখন্ডকে একজোট করে একবারের জন্য স্পর্শ করতে আদেশ দেন,যাতে তিনি আঘাতও না পান আবার শপথও রক্ষা পায়। স্ত্রীগণের প্রতি স্বামীদের শাসন থাকবে তবে তা কতটুকু কী হবে এখানে তার নির্দেশনা আছে। ৭. সবশেষে আল্লাহ বলেন, নিশ্চয়ই আমি তাকে অর্থাৎ আইয়ুব আ:-কে ধৈর্যশীল পেয়েছি। তিনি এত বড় একটি পরীক্ষা ঈমানের পরাকাষ্ঠায় উত্তীর্ণ হতে সক্ষম হলেন। আল্লাহ আরো বলেন,অতি উত্তম বান্দা সে। নিশ্চয়ই সে অতিশয় আল্লাহ অভিমুখী।

নবী জগতের এক উজ্জ্বল নাম হলো নবী হযরত আইয়ুব আঃ। ধনে-সম্পদে-সন্তান সন্ততিতে কোনো প্রকার অভাব ছিলো না আইয়ুব নবীর। দুনিয়াবি শান্তির সকল প্রকার বিষয় আল্লাহ দান করেছিলেন হযরত আইয়ুব নবীকে। শয়তান হাজারভাবে চেষ্টা করে নবী হযরত আইয়ুব (আ.) কে ধোঁকায় ফেলতে না পেরে মহান আল্লাহকে বললেন,“আইয়ুব (আ.) এর কোনো অভাব নাই, তাঁর পুত্র কন্যা সম্পদ সবই আছে। আরামের জন্য তাকে তুমি অগণিত সম্পদ দিয়েছ; তাইতো সে তোমার ভক্ত। না হয় তোমার ইবাদত করতো না।”আল্লাহ বলেছিলেন,“আমার প্রকৃত ঈমানদার বান্দাকে তুমি কখনও পথভ্রষ্ট করতে পারবে না।”

আজ থেকে হাজারো বছর আগে বর্তমানে জর্ডান নামক দেশে সুরান নামক একটি সম্প্রদায়ের মানুষরা বসবাস করতো আর আল্লাহ সেই সম্প্রদায়ের মানুষের হেদায়েতের জন্য একজন নবি প্রেরণ করলেন যাকে সবাই হযরত আইয়ুব আঃ নামেই চেনে। হযরত আইয়ুব (আঃ) ছিলেন খুব ধ্বনি,সুপুরুষ এবং সেই জাতির সর্দার,উনার ৭ ছেলে এবং ৭ মেয়ে ছিলো। আইয়ুব (আ.) এর সম্মান এবং মর্যদা এতটাই ছিলো যে রাস্তা দিয়ে যেখানেই যেতেন সবাই তাঁকে দেখে দাঁড়িয়ে সালাম দিতো। বলেছিলেন আল্লাহ যাকেই বেশি ভালোবাসেন তাকে ধৈর্য দিয়ে পরিক্ষা করেন। আল্লাহ তাঁর বান্দা হযরত আয়ুব (আঃ) কে পরিক্ষা করেছিলেন। হযরত আইয়ুব (আ.) তাঁর ধৈর্য্যের জন্য সুপরিচিত। তাঁর অপার ধৈর্য্য ক্ষমতার বর্ণনা পবিত্র কুরআনেও উল্লেখ রয়েছে। খ্রিষ্টানরাও তাকে নবী হিসাবে অনুসরণ করে। হযরত আইয়ুব (আ.) এর কবরটি ওমানের সালালাহ শহরের ধোফর অঞ্চলের পাহাড়ে অবস্থিত বলে জানা গেছে। আরেক বর্ণনা অনুযায়ী হযরত আইয়ুব (আ.) এর মরদেহ তুরস্কের উর্ফায় অবস্থিত। দুরেজ সম্প্রদায় দাবি করে লেবাননের চুফ জেলায় অবস্থিত।

লেখকঃ সাবেক জাতীয় ক্রীড়াবিদ,সভাপতি শারীরিক শিক্ষাবিদ সমিতি
চেয়ারম্যান গ্রিন ক্লাব,শিক্ষক,গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট