ইসলামের ‘খাত্বীবুল আম্বিয়া’ নবী হযরত শোয়ায়েব (আ.)

 

মো.আলতাফ হোসেন ঃঃ
আল্লাহ তা’য়ালা মানব জাতির হেদায়েত এবং পথপ্রদর্শনের লক্ষ্যে সর্বযুগে প্রত্যেক জাতির কাছে নবী-রাসূলদের প্রেরণ করেছেন। সম্মানিত নবী-রাসূলগণ প্রত্যেকেই ছিলেন কর্মঠ,সৎকর্মশীল এবং নিজ হাতে উপার্জনকারী। গোটা মানবজাতির জন্য তারা ছিলেন পথপ্রদর্শক এবং আদর্শ। তারা ছিলেন জগতের একেকজনন শ্রেষ্ঠ মানব। তাদের জীবনাচার কেমন ছিলো,তাদের আদর্শ,অভ্যাস,পেশা ও কাজকর্ম সম্মন্ধে অবগতিলাভ করার ভেতরে মানবজাতির জন্য নিঃসন্দেহে শিক্ষনীয় বিষয় রয়েছে। নবী-রাসুলগণকে প্রেরণের উদ্দেশ্য বর্ণিত হয়েছে কোরআনুল হাকিম। আল্লাহ তা’য়ালা যুগে যুগে সত্য দ্বীনসহ অসংখ্য নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন। যাদের প্রেরণের মূল লক্ষ্যই ছিলো এ জমিনে তাঁর ইবাদাত তথা দাসত্ব মানুষ শিখানো। মানুষকে সকল প্রকার অন্যায় জুলুম অত্যাচার থেকে ফিরিয়ে সঠিক জীবন দর্শন দেখানো। তাই প্রত্যেক নবী-রাসূলই আল্লাহ তা’য়ালা এ মিশন বাস্তবায়নে নিজেদের এবং উম্মতের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণ কামনায় দোয়া করেছেন। আল্লাহ তা’য়ালা যুগে যুগে সত্য দ্বীনসহ অসংখ্য নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন।যাদের প্রেরণের মূল লক্ষ্যই ছিলো এ জমিনে তাঁর ইবাদাত তথা দাসত্ব মানুষকে শিখানো। মানুষকে সকল প্রকার অন্যায় জুলুম অত্যাচার থেকে ফিরিয়ে সঠিক জীবন দর্শন দেখানো। তাই প্রত্যেক নবী-রাসূলই আল্লাহ তা’য়ালা এ মিশন বাস্তবায়নে নিজেদের এবং উম্মতের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণ কামনায় দোয়া করেছেন। যেভাবে দোয়া করেছেন হযরত শোয়ায়েব (আ.)। কোরানে বর্ণিত ২৫ জন নবী-রাসূলের মধ্যে হযরত শোয়ায়েব (আ.) অন্যতম।
শোয়ায়েব নামের অর্থ আল্লাহ তা’য়ালার অনুগ্রহপ্রাপ্ত।তিনি হযরত ছালেহ (আ.) এর বংশোদ্ভূত নবী ছিলেন।অবশ্য তাঁকে ইব্রাহিম (আ.)-এর বংশোদ্ভূত নবীও বলা হয়ে থাকে। হযরত শোয়ায়েব (আ.)-এর পিতা ফাহমিল। ফাহমিলের পিতা এছজার এবং তার পিতা মাদইয়ান। ইব্রাহিম (আ.)এর পুত্র মাদইয়ানের নামে জনপদটি পরিচিত হয়েছে। হযরত শোয়ায়েব (আ.) এই জনপদে প্রেরিত হয়েছিলেন। তিনি হযরত মূসা (আ.)-এর শ^শুর ছিলেন। কওমে লুতের ধ্বংসের অনতিকাল পরে কওমে মাদইয়ানের প্রতি তিনি প্রেরিত হন। চমৎকার বাগ্মিতার কারণে তিনি নবীদের মধ্যে সেরা বাগ্মী নামে খ্যাত ছিলেন। কোথাও কোথাও ‘আছহাবুল আইকাহ’ বলা হয়েছে যার অর্থ জঙ্গলের বাসিন্দারা। মাদইয়ান ছিলেন হাজেরা ও সারাহর মৃত্যুর পর হযরত ইব্রাহিম (আ.) আরব বংশোদ্ভূত কেনআনি স্ত্রী ইয়াক্কতিনের ছয়টি পুত্রের মধ্যে জ্যেষ্ঠ পুত্র। হযরত শোয়াইব (আ.) সম্পর্কে পবিত্র কোরআনের ১০টি সূরায় ৫৩টি আয়াত রয়েছে। তন্মধ্যে সূরা আল-আরাফ ৮৫-৯৩, হুদ ৮৪-৯৫,আল হিজর ৭৮-৭৯,আশ-শোয়ারা ১৭৬-১৮৯,আল-আনকাবুত ৩৬-৩৭। ১০টি সূরায় ৫৩টি আয়াত রয়েছে। আল্লাহর গজবে ধ্বংসপ্রাপ্ত ছয়টি জাতির মধ্যে পঞ্চম হলো আহলে মাদইয়ান। মাদইয়ান লুত সাগরের নিকটবর্তী সিরিয়া ও হিজাজের সীমান্তবর্তী একটি জনপদের নাম। যা অদ্যাবধি পূর্ব জর্দানের সামুদ্রিক বন্দর মোআনের অদূরে বিদ্যমান রয়েছে।
আল্লাহর গযবে ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রধান ৬টি প্রাচীন জাতির মধ্যে পঞ্চম জাতি হলো‘আহলে মাদইয়ান’। ‘মাদইয়ান’ হলো লূত সাগরের নিকটবর্তী সিরিয়া ও হিজাযের সীমান্তবর্তী একটি জনপদের নাম। যা অদ্যাবধি পূর্ব জর্ডনের সামুদ্রিক বন্দর ‘মো‘আন’ এর অদূরে বিদ্যমান রয়েছে। কুফরী করা ছাড়াও এই জনপদের লোকেরা ব্যবসায়ের ওজন ও মাপে কম দিত,রাহাজানি ও লুটপাট করত। অন্যায় পথে জনগণের মাল-সম্পদ ভক্ষণ করত। ইয়াকূত হামাভী (মৃঃ ৬২৬/১২২৮খৃঃ) বলেন, ইব্রাহিম-পুত্র মাদইয়ানের নামে জনপদটি পরিচিত হয়েছে। হযরত শোয়ায়েব (আ.) এদের প্রতি প্রেরিত হয়েছিলেন। ইনি হযরত মূসা (আ.)-এর শ্বশুর ছিলেন। কওমে লূত-এর ধ্বংসের অনতিকাল পরে কওমে মাদইয়ানের প্রতি তিনি প্রেরিত হন (হূদ ১১/৮৯)। চমৎকার বাগ্মিতার কারণে তিনি ‘খাত্বীবুল আম্বিয়া’ (নবীগণের মধ্যে সেরা বাগ্মী) নামে খ্যাত ছিলেন।
আহলে মাদইয়ান-কে পবিত্র কুরআনে কোথাও কোথাও ‘আছহাবুল আইকাহ’ বলা হয়েছে। যার অর্থ ‘জঙ্গলের বাসিন্দাগণ’। এটা বলার কারণ এই যে, এই অবাধ্য জনগোষ্ঠী প্রচন্ড গরমে অতিষ্ট হয়ে নিজেদের বসতি ছেড়ে জঙ্গলে আশ্রয় নিলে আল্লাহ তাদেরকে সেখানেই ধ্বংস করে দেন। এটাও বলা হয় যে, উক্ত জঙ্গলে ‘আইকা’ বলে একটা গাছকে তারা পূজা করতো। যার আশপাশে জঙ্গল বেষ্টিত ছিলো। মাদইয়ান ছিলেন হাজেরা ও সারাহর মৃত্যুর পরে হযরত ইব্রাহিমের আরব বংশোদ্ভূত কেন‘আনী স্ত্রী ক্বানতূরা বিনতে ইয়াক্বত্বিন এর ৬টি পুত্র সন্তানের মধ্যে জ্যেষ্ঠ পুত্র। উল্লেখ্য যে,হযরত শোয়ায়েব (আ.) সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের ১০টি সূরায় ৫৩টি আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। হযরত শোয়ায়েব (আ.)-এর দাওয়াত : ধ্বংসপ্রাপ্ত বিগত কওমগুলোর বড় বড় কিছু অন্যায় কর্ম ছিলো। যার জন্য বিশেষভাবে সেখানে নবী প্রেরিত হয়েছিলেন। শোয়ায়েব-এর কওমেরও তেমনি মারাত্মক কয়েকটি অন্যায় কর্ম ছিলো,যেজন্য খাছ করে তাদের মধ্য থেকে তাদের নিকটে শোয়ায়েব (আ.)-কে প্রেরণ করা হয়। তিনি তাঁর কওমকে যে দাওয়াত দেন, তার মধ্যেই বিষয়গুলোর উল্লেখ রয়েছে। যেমন আল্লাহ বলেন,৮৫-৮৭)-‘আমি মাদইয়ানের প্রতি তাদের ভাই শোআয়েবকে প্রেরণ করেছিলাম। সে তাদের বলল, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর। তিনি ব্যতীত তোমাদের কোন উপাস্য নেই। তোমাদের কাছে তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে সুস্পষ্ট প্রমাণ এসে গেছে। অতএব তোমরা মাপ ও ওযন পূর্ণ কর। মানুষকে তাদের মালামাল কম দিয়ো না। ভূপৃষ্ঠে সংস্কার সাধনের পর তোমরা সেখানে অনর্থ সৃষ্টি করো না। এটাই তোমাদের জন্য কল্যাণকর, যদি তোমরা বিশ্বাসী হও’।‘তোমরা পথে-ঘাটে এ কারণে বসে থেকো না যে,ঈমানদারদের হুমকি দেবে,আল্লাহর পথে বাধা সৃষ্টি করবে ও তাতে বক্রতা অনুসন্ধান করবে। স্মরণ কর, যখন তোমরা সংখ্যায় অল্প ছিলে, অতঃপর আল্লাহ তোমাদেরকে আধিক্য দান করেছেন এবং লক্ষ্য কর কিরূপ অশুভ পরিণতি হয়েছে অনর্থকারীদের’।‘আর যদি তোমাদের একদল ঐ বিষয়ের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে যা নিয়ে আমি প্রেরিত হয়েছি এবং আরেক দল বিশ্বাস স্থাপন না করে,তবে তোমরা অপেক্ষা কর যে পর্যন্ত না আল্লাহ আমাদের মধ্যে মীমাংসা করে দেন। কেননা তিনিই শ্রেষ্ঠ ফায়ছালাকারী’ (সূরা-আ‘রাফ ৭/৮৫-৮৭)।
হযরত শোয়ায়েব (আঃ) একথাও বলেন যে,‘(আমার এ দাওয়াতের জন্য) আমি তোমাদের কাছে কোন প্রতিদান চাই না। আমার প্রতিদান বিশ্বপালনকর্তাই দেবেন’ (শু‘আরা ২৬/১৮০)। তিনি বললেন,তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর ও শেষ দিবসের আশা রাখ। তোমরা পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি করো না’(আনকাবূত ২৯/৩৬)। শোয়ায়েব (আ.)-এর দাওয়াতের ফলশ্রুতি:হযরত শোয়ায়েব (আ.)-এর নিঃস্বার্থ ও আন্তরিকতাপূর্ণ দাওয়াত তাঁর উদ্ধত কওমের নেতাদের হৃদয়ে রেখাপাত করল না। তারা বরং আরও উদ্ধত হয়ে তাঁর দরদ ভরা সুললিত বয়ান ও অপূর্ব চিত্তহারী বাগ্মীতার জবাবে পূর্ববর্তী ধ্বংসপ্রাপ্ত কওমের পাপিষ্ঠ নেতাদের ন্যায় নবীকে প্রত্যাখ্যান করল এবং ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ ও তাচ্ছিল্য করে বলল, ‘তোমার সালাত কি তোমাকে একথা শিখায় যে, আমরা আমাদের ঐসব উপাস্যের পূজা ছেড়ে দিই, আমাদের পূর্ব পুরুষেরা যুগ যুগ ধরে যে সবের পূজা করে আসছে? আর আমাদের ধন-সম্পদে ইচ্ছামত আমরা যা কিছু করে থাকি,তা পরিত্যাগ করি? তুমি তো একজন সহনশীল ও সৎ ব্যক্তি’ (হূদ ১১/৮৭)।অর্থাৎ তুমি একজন জ্ঞানী, দূরদর্শী ও সাধু ব্যক্তি হয়ে একথা কিভাবে বলতে পার যে, আমরা আমাদের বাপ-দাদার আমল থেকে চলে আসা দেব-দেবীর পূজা ও শেরেকী প্রথা সমূহ পরিত্যাগ করি এবং আমাদের আয়-উপাদানে ও রূযী-রোজগারে ইচ্ছামত চলা ছেড়ে দেই। আয়-ব্যয়ে কোন্টা হালাল কোন্টা হারাম তা তোমার কাছ থেকে জেনে নিয়ে কাজ করতে হবে এটা কি কখনো সম্ভব হতে পারে? তাদের ধারণা মতে তাদের সকল কাজ চোখ বুঁজে সমর্থন করা ও তাতে বরকতের জন্য দোয়া করাই হলো সৎ ও ভালো মানুষদের কাজ। ঐসব কাজে শিরক ও তাওহীদ,হারাম ও হালালের প্রশ্ন তোলা কোন ধার্মিক ব্যক্তির কাজ নয়। দ্বিতীয়তঃ তারা ইবাদাত ও মু‘আমালাতকে পরস্পরের প্রভাবমুক্ত ভেবেছিলো। ইবাদত কবুলের জন্য যে রূযী হালাল হওয়া যরূরী,একথা তাদের বুঝে আসেনি। সেজন্য তারা ব্যবসা-বাণিজ্যে হালাল-হারামের বিধান মানতে রাযী ছিলো না। যদিও ছালাত আদায়ে কোন আপত্তি তাদের ছিলো না। কেননা দেব-দেবীর পূজা সত্ত্বেও সৃষ্টিকর্তা হিসাবে এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস ও স্বীকৃতি সবারই ছিলো (লোকমান ৩১/২৫)।
পবিত্র কোরআনের বর্ণনা অনুসারে আল্লাহর নির্দেশিত পথ অনুসরণ না করায় কয়েকটি জাতি রাতারাতি ধুলায় মিশে গেছে। আল্লাহর গজব বর্ষিত ৬টি জাতি নিয়ে লিখেছেন আন্দালিব আয়ান মাদইয়ান সম্প্রদায়। হযরত শোয়ায়েব (আ.) প্রেরিত হয়েছিলেন মাদইয়ান সম্প্রদায়ের কাছে। তিনি ছিলেন হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর তৃতীয় স্ত্রী কাতুরার ঘরের পুত্র মাদইয়ানের বংশধর। ধারণা করা হয়,বর্তমান সিরিয়ার মুয়ান নামক স্থানে কওমে শোয়ায়েব (আ.)এর বসবাস ছিলো। মাদইয়ানবাসী পার্থিব লোভ-লালসায় মত্ত হয়ে পারস্পরিক লেনদেনের সময় ওজনে কম দিয়ে মানুষের হক আত্মসাৎ করত। দুর্নীতি, রাহাজানি, ছিনতাই,ধর্ষণ ও মজুদদারির মতো জঘন্য অন্যায় কাজ তাদের সমাজের মধ্যে বিষবাষ্পের মতো ছড়িয়ে পড়ে। এসব পাপে তারা এমনভাবে লিপ্ত ছিলো যে,তারা কখনো মনে করত না যে, এসব কাজ অত্যন্ত জঘন্য বা গর্হিত। বরং তারা এসবের জন্য গর্ববোধ করত। মাদইয়ান সম্প্রদায়কে সুপথে পরিচালিত করার জন্য আল্লাহ তা’য়ালা শোয়ায়েব (আ.)-কে তাদের কাছে পাঠান। হযরত শোয়ায়েব (আ.) সর্বপ্রথম তাদের তাওহিদের দাওয়াত দিলেন। তিনি তাদের বললেন,‘হে আমার সম্প্রদায়,তোমরা আল্লাহ তা’য়ালার ইবাদত কর,যিনি ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই।’তাওহিদের দাওয়াত দেওয়ার পরপরই হযরত শোয়াইব (আ.) তাদের ওজনে কম দেওয়ার জঘন্য মানসিকতাকে ত্যাগ করার উপদেশ দিলেন। আর মাদইয়ানের (অধিবাসীদের) প্রতি আমি তাদের ভাই শোয়াইবকে প্রেরণ করেছি। সে বলল,’হে আমার জাতি,তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো। তিনি ছাড়া তোমাদের অন্য কোনো উপাস্য নেই। তোমাদের কাছে তোমাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট নির্দেশাবলি এসে গেছে। সুতরাং তোমরা পরিমাপ ও ওজন পূর্ণ করো এবং মানুষকে তাদের দ্রব্যাদি কম দিয়ো না। আর পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তাতে বিপর্যয় সৃষ্টি কোরো না। তোমরা যদি মুমিন হয়ে থাক,তবে এটাই তোমাদের জন্য উত্তম। তোমরা পথেঘাটে এই উদ্দেশ্যে বসে থেকো না যে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসীদের হুমকি দেবে এবং তাদের আল্লাহর পথে চলতে বাধা দান করবে,আর তাতে বক্রতা (বিরূপ অর্থ) অনুসন্ধান করবে। আর সেই সময়কে স্মরণ করো,যখন তোমরা সংখ্যায় অল্প ছিলে। অতঃপর আল্লাহ তোমাদের (জনবল বা অর্থ-সম্পদ) বৃদ্ধি করে দিয়েছেন। আর এটাও লক্ষ করো যে বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের পরিণাম কী হয়েছিলো! শোয়ায়েব (আ.) বললেন) আমি যা নিয়ে প্রেরিত হয়েছি, তার ওপর যদি তোমাদের একদল ইমান আনে এবং অন্য দল ইমান না আনে,তবে ধৈর্য ধারণ করো যে পর্যন্ত আল্লাহ আমাদের মধ্যে ফয়সালা করে না দেন,আর তিনিই তো শ্রেষ্ঠ ফয়সালাকারী। (সুরা:আরাফ, আয়াত : ৮৫-৮৭)
কওমে শোয়ায়েব-এর ধর্মীয় ও সামাজিক অবস্থা এবং দাওয়াতের এই বিষয়গুলি প্রতীয়মান হয় যে,প্রথমতঃ তারা আল্লাহর হক ও বান্দার হক দু’টিই নষ্ট করেছিলো। আল্লাহর হক হিসাবে তারা বিশ্বাসের জগতে আল্লাহকে বাদ দিয়ে সৃষ্টির পূজায় লিপ্ত হয়েছিলো কিংবা আল্লাহর সঙ্গে অন্যকে শরীক করেছিলো। তারা আল্লাহর ইবাদত ছেড়ে দিয়েছিলো। দুনিয়াবী ধনৈশ্বর্যে ও বিলাস-ব্যসনে ডুবে গিয়ে তারা আল্লাহর সত্তা ও গুণাবলী এবং তাঁর হক সম্পর্কে গাফেল হয়ে গিয়েছিলো। সেই সাথে নিজেদের পাপিষ্ঠ জীবনের মুক্তির জন্য বিভিন্ন সৃষ্ট বস্তুকে শরীক সাব্যস্ত করে তাদের অসীলায় মুক্তি কামনা করত। এভাবে তারা আল্লাহ ও তাঁর গযবের ব্যাপারে নিঃশংক হয়ে গিয়েছিলো। সেকারণ সকল নবীর ন্যায় শোয়ায়েব (আ.) সর্বপ্রথম আক্বীদা সংশোধনের জন্য‘তাওহীদে ইবাদত’-এর আহবান জানান। যাতে তারা সবদিক থেকে মুখ ফিরিয়ে স্রেফ আল্লাহর ইবাদত করে এবং সকল ব্যাপারে স্রেফ আল্লাহর ও তাঁর নবীর আনুগত্য করে। তিনি নিজের নবুয়তের প্রমাণ স্বরূপ তাদেরকে মু‘জেযা প্রদর্শন করেন। যা স্বয়ং প্রতিপালকের পক্ষ হ’তে ‘সুস্পষ্ট প্রমাণ’ রূপে তাঁর নিকটে আগমন করে। দ্বিতীয়তঃ তারা মাপ ও ওযনে কম দিয়ে বান্দার হক নষ্ট করত। সেদিকে ইঙ্গিত করে শোয়ায়েব (আ.) বলেন, ‘তোমরা মাপ ও ওযন পূর্ণ কর এবং মানুষের দ্রব্যাদিতে কম দিয়ে তাদের ক্ষতি করো না’ (আ‘রাফ ৭/৮৫)।
বিভিন্ন নবীর কাহিনী পরম্পরায় আলোচ্য আয়াতগুলোতে হযরত শোয়ায়েব (আ.) এবং তাঁর জাতির ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে। ‘মাদইয়ান’-এর পরিচিতি : হযরত শোয়ায়েব (আ.) প্রেরিত হয়েছেন মাদইয়ান শহরে। এ শহর এখনো পূর্ব জর্দানের সামুদ্রিক বন্দর ‘মায়ানের’ অদূরে বিদ্যমান। ইবনে ইসহাকের বর্ণনা মতে, হযরত শোয়ায়েব (আ.) ছিলেন ইব্রাহিম (আ.)-এর পুত্র মাদইয়ানের বংশধর। তাঁর বংশধরও মাদইয়ান নামে খ্যাত। যে জনপদে তারা বাস করতো তাও মাদইয়ান নামে অভিহিত হয়েছে। হযরত শোয়ায়েব (আ.)-এর আমল ছিলো হয়রত মুসা (আ.)-এর আমলের সামান্য আগে। হযরত শোয়ায়েব (আ.)-কে তাঁর চমৎকার বাগ্মিতার কারণে ‘খতিবুল আম্বিয়া’ বলা হয়। মানুষের জীবনে ও আল্লাহর যমীনে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য আল্লাহর নির্দেশে নবী রাসূলদের মাধ্যমেই দাওয়াত পরিচালিত হয়েছে। আমাদের নবী (সা.) পর্যন্ত সকল নবীর কাজের সূচনা হয়েছে দাওয়াতের মাধ্যমে। পবিত্র কুরআনে বিভিন্ন নবীর দাওয়াত সম্পর্কে বলা হয়েছে:’হে নবী আমি তোমাকে সাক্ষী করে পাঠিয়েছি,তোমাকে বানিয়েছি জান্নাতের সুসংবাদদাতা ও জাহান্নামের সতর্ককারী। আল্লাহর অনুমতিক্রমে তুমি হচ্ছো আল্লাহর দিকে আহ্বানকারী ও সুস্পষ্ট প্রদীপ।'(সূরা আল আহযাব-৪৫-৪৬)। ‘হে বস্ত্র আচ্ছাদনকারী,উঠো আর সতর্ক কর এবং তোমার রবের শ্রেষ্ঠত্বে ঘোষণা দাও।’ (সূরা মুদ্দাসের ১-৩)।
মাদইয়ান শহরের অধিবাসীদের অপরাধ : মাদইয়ান শহরের অধিবাসীরা আল্লাহর সৃষ্ট বস্তুর পূজায় লিপ্ত ছিলো। তাই শোয়ায়েব (আ.) প্রথমেই তাদের তাওহিদের দাওয়াত দেন। দ্বিতীয়ত, তারা মাপজোখে হেরফের করত এবং অন্যায়ভাবে মানুষের ধনসম্পদও কেড়ে নিত। তারা ব্যবসায়ী কাফেলাগুলোর সম্পদ লুট করতো। সেই অধঃপতিত মাদায়েনবাসীকে সুপথে আনার জন্য শোয়ায়েব (আ.)-কে নবী বানিয়ে পাঠানো হয়েছিলো। শোয়ায়েব (আ.)-এর হাতে বহু মোজেজাও আল্লাহ তা’য়ালা প্রকাশ করেছেন। এসব মোজেজা প্রদর্শনের সঙ্গে সঙ্গে তিনি তাদের এ কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে একসময় তোমরা জনসংখ্যায় খুব কম ছিলো। এরপর আল্লাহ তা’য়ালা তোমাদের গোত্রের জনসংখ্যা বাড়িয়ে দিয়েছেন এবং বিত্তবৈভবেও সমৃদ্ধি দিয়েছেন। সুতরাং তোমাদের উচিত আল্লাহর প্রতি ইমান আনা, ওজন সঠিকভাবে দেওয়া, ন্যায়নিষ্ঠার পথ অনুসরণ করে মানবসমাজের শান্তি ও সংহতি রক্ষা করা।
কাফিরদের জন্য সামান্য অবকাশ : শেষ আয়াতে একটি সন্দেহ নিরূপণের বিষয় আলোচিত হয়েছে। মাদইয়ান শহরের কাফিররা বলত, ‘আমরা তো মুমিন ও কাফিরদের মধ্যে কোনো পার্থক্য খুঁজে পাচ্ছি না। যারা ইমান আনেনি, তারাও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের মধ্যে জীবন যাপন করছে। তাদের পথ যদি আল্লাহর পছন্দ না হতো, তবে তাদের তিনি এমন সুখের জীবন দেবেন কেনো?’ এর উত্তর দেওয়া হয়েছে এভাবে যে কাফিরদের বর্তমানের ক্ষণস্থায়ী সুখ-সমৃদ্ধি দেখে ধোঁকায় পড়া উচিত নয়। মানুষের জীবনের পরম পরিণতির ব্যাপারে আল্লাহর ফয়সালা কী হয় সে জন্য অপেক্ষা করতে হবে। যারা সত্য ও ন্যায়ের অনুসারী,তাদের জীবনের চূড়ান্ত পরিণতি সাফল্যের। আর যারা অসত্য ও অন্যায়ের অনুসারী, তাদের জীবনের চূড়ান্ত পরিণতি ব্যর্থতার। আল্লাহ তা’য়ালা কাফিরদের প্রথমে সামান্য অবকাশ দিয়ে তারপর তাদের সমূলে ধ্বংস করে দেন। এ ধারা চলমান।
শোয়ায়েব সৌধ জর্ডানে চমৎকারভাবে সংরক্ষিত রয়েছে। এটি মাহিস শহর থেকে ২ কিমি (১.২ মা) পশ্চিমে অবস্থিত যা ‘ওয়াদি শুয়াইব’ নামে পরিচিত। তবে, ইসলামী মতানুসারে আরো দুটি স্থানের কথা জানা যায় যেগুলো সিনাই উপদ্বীপ এবং ঐতিহাসিক প্যালেস্টাইনে অবস্থিত। দ্রুজদের দ্বারা চিহ্নিত শোয়ায়েব (আ.) অপর একটি সৌধ রয়েছে নিম্ন গ্যালিলি অঞ্চলের হিট্টিন-এ। প্রতি বছর ২৫ এপ্রিল এখানে দ্রুজরা মিলিত হয়ে তাদের সম্প্রদায়ের বিষয়াবলী নিয়ে আলোচনা করে।
ধ্বংসকান্ডের পর হযরত শোয়েব (আ.)তাঁর কওমের মধ্যে আবার বারো বছরকাল ধর্ম প্রচার করছিলেন।তাঁর কওমটি এভাবেই ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ফলে মাঝে মাঝে প্রায় তিনি আল্লাহর দরবারে অতিমাত্রায় কাঁদতেন। কাঁদতে কাঁদতে তাঁর দুটি চক্ষু অন্ধ হয়ে গেছে। একদিন ফেরেস্তা জিব্রাইল (আ.)এসে বললেন,হে আল্লাহর নবী! আপনি কেনো এতো কাঁদছেন বলুন।যদি আপনি আপনার চক্ষুর জন্য কাঁদেন,তবে আল্লাহ তা’য়ালা তা ভালো করে দিবেন। আর যদি অন্য কোনো ইচ্ছা থাকে তাও পুরা করে দিবেন। যদি দোযখের ভয়ে কেঁদে থাকেন,তবে কান্না বন্ধ করুন। কেনোনা আল্লাহ আপনার জন্য দোযখ হারাম করে দিয়েছেন।আর যদি কোনো পার্থিব উদ্দেশ্য সাধনের আকাঙ্খায় কাঁদেন,তবে কাঁদা বন্ধ করুন। কেনোনা আপনার যেকোনো আকাঙক্ষা আল্লাহ পুরণ করে দিবেন। হযরত শোয়ায়েব (আ.) বললেন,ভাই জিব্রাইল! ও সব কিছু আমি চাইনা। আমি শুধু আল্লাহ তা’য়ালার দিদার কামনা করি।আল্লাহ তা’য়ালা যেনো আমার এ ইচ্ছা পূর্ণ করেন। ফেরেস্তা হযরত জিব্রাইল (আ.) হযরত শোয়ায়েব (আ.) এর এর আকাঙক্ষার কথা আল্লাহর দরবারে জানালেন,আল্লাহ তা’য়ালা তাঁকে বললেন,জিব্রাইল!তুমি শোয়েবকে জানিয়া দাও রোজ কিয়ামতে আমি তাঁর ইচ্ছা পূরণ করবো। ফেরেস্তা হযরত জিব্রাইল (আ.) আল্লাহ তা’য়ালার এ ওয়াদার কথা হযরত শোয়েব (আ.)কে জানিয়ে দিলেন। এ শুনে হযরত শোয়ায়েব (আ.) অনেক আনন্দিত হলেন এবং তাঁর মনের চিন্তা দূর হয়ে গেলো। কিছুদিন পর হযরত মুসা (আ.) হযরত শোয়ায়েব (আ.) এর নিকট আগমন করে কিছুদিন তাঁর সাহচর্জে অবস্থান করে বিদায় হয়ে গেলেন। কথিত আছে যে, হযরত শোয়ায়েব (আ.) অন্ধ অবস্থায় বারো বছর জীবিত ছিলেন। তাঁর মোট আয়ুষ্কাল ছিলো দু’শত বিশ বছর। হযরত মুসা (আ.)তাঁর নিকট বিদায় নেওয়ার পর সাত বছর চার মাস জীবিত ছিলেন। কোনো কোনো লেখকের মতে,হযরত মুসা (আ.) এর নবুয়ত লাভের চার বছর পরে হযরত শোয়ায়েব (আ.) পরলোগমন করেন। তাঁর দাফন কাজ সমাধা হয়েছিলো শাম-এর কোনো জায়গায়।

লেখকঃ সাবেক জাতীয় ক্রীড়াবিদ,সভাপতি শারীরিক শিক্ষাবিদ সমিতি
চেয়ারম্যান গ্রিন ক্লাব,শিক্ষক,গবেষক,সাংবাদিক ও কলামিস্ট