ইসলামে ব্যক্তি স্বাধীনতার অধিকার পূর্ণরূপে স্বীকৃত এবং সংরক্ষিত

 

মো.আলতাফ হোসেন ঃঃ
দাসপ্রথা পৃথিবীর একটি প্রাচীন ও নিন্দনীয প্রথা। দাসপ্রথা একটি অনুমোদিত সামাজিক ও আইনানুগ ব্যবস্থা। এ ব্যবস্থায় বাজারে মানুষের আনুষ্ঠানিক বেচা-কেনা চলতো এবং ক্রীত ব্যক্তি ক্রেতার ব্যক্তিগত সম্পত্তি রূপে কাজ করতে বাধ্য থাকতো। প্রাচীন ও মধ্যযুগের প্রায় সব শাসন ব্যবস্থাতেই দাস প্রথার প্রচলন ছিলো। গবাদিপশুর ন্যায় মানুষেরও কেনা বেচা চলতো। অন্যান্য প্রায় সকল দেশের মতো বাংলায়ও প্রাচীনকাল হতেই দাস প্রথা প্রচলিত হয়ে আসছিলো। শুধু আইন পুস্তক ও প্রশাসনিক গ্রন্থেই নয়, এ প্রথা সব ধর্মেও স্বীকৃতি ছিলো। মেগাস্থিনিস উল্লেখ করেন যে,পাটলিপুত্রের রাজার নিরাপত্তার দায়িত্ব ক্রীতদাসীদের ওপর ন্যস্ত ছিলো। সব ধর্মীয় পুস্তকেই ক্রীত দাস-দাসীদের সাথে সদ্ব্যবহারের উপদেশ দেওয়া আছে।

প্রাচীনকালে এবং মধ্যযুগে সমাজে মানুষ কেনা বেচার একটি প্রথা ছিলো। যা দ্বারা বিভিন্ন মূল্যের বিনিময়ে মানুষ কেনা যেতো। এই প্রচলিত প্রথাটিকেই দাস প্রথা বলা হয়ে থাকে। দাস অথবা দাসী বর্তমান বাজারের পণ্যের মতই বিক্রি হতো। বতমানে যেমন পণ্য বেচা কেনার বাজার আছে অতীতেও দাসদাসী বিক্রি অথবা ক্রয় এর জন্য আলাদা বাজার ছিলো। তখন দাসদাসী আমাদানী এবং রপ্তানীতে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন হতো এবং এটা দেশের অর্থনীতিতে প্রভাব পড়তো। সাধারণত দাসদাসীরা আফ্রিকান হতো। আফ্রিকান দাস এর মধ্যে হাবশি ও কাফ্রির চাহিদা ছিলো বেশি। বাংলায় এসব দাসদাসী ৫ থেকে ৭ টাকায় কেনা যেতো এবং স্বাস্থ্যবান দাস প্রায় ২০ থেকে ২২ টাকায় কেনা যেতো। দাসদের দিয়ে ২ ধরনের কাজ করানো হতো কৃষি কাজ এবং গার্হস্থ্য কাজ। তখন সমাজে গুটি কয়েক দাস রাখা একটি সামাজিক মযাদার্র ব্যাপার ছিলো। তাছাড়া উচ্চ বিত্তরা তাদের দাসদের দিয়ে বিভিন্ন কৃষি কাজ করাতেন। যেমন: হালচাষ, সেচ এর পানি,মাটি উর্বর করানো,গবাদী পশু পালন, তাদের রক্ষনাবেক্ষণ ইত্যাদি কাজ করতো। দাসীদের সাধারণত রাখা হতে যৌন লোভ-লালসা পূরণ করার জন্য। তাদের উপপত্নি করে রাখা হতো এবং তাদের সন্তানদেরও দাস রুপে রাখা হতো বা বিক্রি করা হতো। ব্রিটেনের সরকার এই দাস প্রথা নিরুৎসাহিত করে এবং ১৮৪৩ সালে অ্যাক্ট ফাইভ আইন দ্বারা দাসদাসী আমদানী ও রপ্তানী সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়।
মূলত দাস ব্যবসার কেন্দ্রস্থল ছিলো পশ্চিম আফ্রিকার উপকূলীয় অঞ্চল যেটা বিস্তৃত ছিলো সেনেগাল থেকে অ্যাঙ্গোলা পর্যন্ত। দাস ব্যবসার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলো ছিলো বেনিন, টোগো এবং নাইজেরিয়ার পশ্চিম উপকূলে। তাই এলাকাগুলোকে দাসের উপকূল বলা হতো। যুদ্ধবন্দী, অপরাধী, ঋণগ্রস্ত ও বিদ্রোহীদেরকে স্থানীয় আফ্রিকানদের কাছ থেকে দাস হিসেবে কিনে নিতো ইউরোপীয় দাস ব্যবসায়ীরা। এছাড়া অনেক সাধারণ মানুষকেও দাস ব্যবসায়ীরা অপহরণ করে দাস হিসাবে বেচে দিতো। মোট ৪৫টি ছোট বড় জাতিগোষ্ঠি থেকে দাস ধরে আনা হতো। এদের বেশিরভাগই ছিলো আদিবাসী বা আফ্রিকার স্থানীয় সংস্কৃতির অনুসারী।

দাসত্ব বলতে কোনো মানুষকে জোরপূর্বক শ্রম দিতে বাধ্য করা এবং এক্ষেত্রে কোনো মানুষকে অন্য মানুষের অস্থাবর সম্পত্তি হিসেবে গণ্য করাকে বোঝায়। কাউকে তার ইচ্ছার পরিবর্তে দাস করা যেতে পারে। এটি হতে পারে তার আটক,জন্ম,ক্রয় করা সময় থেকে। দাসদের অনুমতি ব্যতিরেকে স্থান বা মালিককে ত্যাগ করা,কাজ না করার বা শ্রমের মজুরি পাবার অধিকার নেই। কিছু সমাজে নিজের দাসকে হত্যা করা আইনসঙ্গত, এবং অন্যান্য স্থানে এটি একটি অপরাধ হিসেবে বিবেচিত।
দাসত্ববিরোধ আন্তর্জাতিক সংগঠন অ্যান্টি-স্ল্যাভেরি ইন্টারন্যাশনাল দাসত্বের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে একে ‘জোরপূর্বক শ্রম দেওয়া’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। এই সংজ্ঞা অনুযায়ী,বর্তমান বিশ্বে এখনো ২ কোটি ৭০ লক্ষ দাস রয়েছে। এই সংখ্যা ইতিহাসের যে-কোনো সময়কার দাসের সংখ্যার তুলনা বেশি। এমন কী প্রায় ৪০০ বছরের ইতিহাসে আফ্রিকা থেকে আমেরিকায় আনা আফ্রিকান দাসের মোট সংখ্যাও এর প্রায় অর্ধেক। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা জোরপূর্বক শ্রম দেওয়াকে দাসত্ব হিসেবে ধরে না। তাদের হিসাব অনুযায়ী এখনো বিশ্বের ১ কোটি ২০ লক্ষ মানুষ জোরপূর্বক শ্রম, দাসত্ব, ও দাসত্ব সংশ্লিষ্ট প্রথার কাছে বন্দী। এই দাসের বেশির ভাগই ঋণ শোধের জন্য দাসে পরিণত হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠী মহাজনদের কাছ থেকে অর্থ ধার নিয়ে পরবর্তী অর্থ শোধ দিতে না পারায় দাসে পরিণত হয়েছে। এদের মধ্যে কিছু আছে যারা কয়েক প্রজন্মের জন্য দাস। মানুষ পরিবহন মূলত হয়ে থাকে নারী ও শিশুদের যৌন ব্যবসায় খাটানোর জন্য।এটিকে বর্ণনা করা হয়েছে ‘ইতিহাসের সর্ববৃহৎ দাস বাণিজ্য’ হিসেবে। অবৈধ মাদকদ্রব্য পরিবহনে ব্যবহার করার কারণে একই সাথে এটি বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল অপরাধ ক্ষেত্র।

দাসত্বের ইতিহাস অতীত থেকে বর্তমান পর্যন্ত বিভিন্ন সংস্কৃতি, জাতি এবং ধর্মজুড়ে বিস্তৃত। অবশ্য দাসদের সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং বৈধ অবস্থান বিভিন্ন সমাজে এবং বিভিন্ন স্থানে ভিন্ন ভিন্ন ছিলো।আদিম সমাজে দাসপ্রথার প্রচলন বিরল ছিলো কারণ এই প্রথা সামাজিক শ্রেণীবিভাগের কারণে তৈরি হয়। দাসপ্রথার অস্তিত্ব মেসোপটেমিয়াতে প্রায় ৩৫০০ খৃস্টপূর্বে প্রথম দেখতে পাওয়া যায়। অন্ধকার যুগ থেকে মধ্যযুগ পর্যন্ত ইউরোপে অধিকাংশ এলাকাতেই দাসপ্রথার প্রচলন ছিলো। ইউরোপে বাইজেন্টাইন-উসমানিদের যুদ্ধ এবং উসমানিদের যুদ্ধের ফলশ্রুতিতে অনেক খৃস্টান কৃতদাসে পরিণত হয়। ওলন্দাজ, ফরাসি, স্পেনিশ,পর্তুগিজ, ব্রিটিশ, আরব এবং কিছু পশ্চিম আফ্রিকান রাজ্যের লোকেরা আটলান্টিক দাস বাণিজ্যে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছিলো। ডেভিড ফোর্সথি লেখেন, “ঊনিশ শতকের শুরুর দিকে আনুমানিক প্রায় তিন চতুর্থাংশ লোকেরাই দাসপ্রথার বন্ধনে আবদ্ধ ছিলো।” ইউরোপের মধ্যে সর্বপ্রথম ১৪১৬ সালে রাগুসা নামক দেশ দাসপ্রথা নিষিদ্ধ করে। আধুনিক যুগে নরওয়ে এবং ডেনমার্ক সর্বপ্রথম ১৮০২ সালে দাসদের বাণিজ্য বন্ধ করে।
ঊনিশ শতকের শেষার্ধ্ব থেকে পুরো দুনিয়ায় দাস ব্যবসা বিলুপ্ত হতে শুরু করলেও, দাসপ্রথার ইতিহাস অতি প্রাচীন। এই বর্বর প্রথাকে উচ্ছেদ করার জন্য আন্দোলন-সংগ্রামও চলে এসেছে অনেকদিন ধরে। সেই আন্দোলন ও সংগ্রামের ফলশ্রুতিতে, দুনিয়া থেকে ধীরে ধীরে বিলুপ্তি ঘটে দাসপ্রথার। এই অমানবিক প্রথার অবসানকে চিহ্নিত করতে এবং প্রথাটির বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রামের নায়কদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে, জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৯৪৮ থেকে প্রতিবছর ২৩ আগস্ট পালিত হয় আন্তর্জাতিক দাসপ্রথা বিলোপ দিবস।
আজকের দিনে সারা দুনিয়াজুড়ে যে সম-অধিকার, মানবাধিকারের মতো ব্যাপারগুলো এতো আলোচিত বিষয়, সেই পথে বিশ্ববাসীকে অনেকটাই এগিয়ে দিয়েছিলো দাস প্রথার বিলোপের মতো মহা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারটি। আন্তর্জাতিক দাসপ্রথা বিলোপ দিবসের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে মানবপাচার, যৌনদাস, জবরদস্তিমূলক শিশুশ্রম, বলপ্রয়োগে বিয়ে ও যুদ্ধে শিশুদের ব্যবহার বন্ধে সচেতনতা বাড়ানো। ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, ১৭৯১ সালে বর্তমান হাইতি ও ডমিনিকান রিপাবলিকান অঞ্চলে প্রথমে দাসপ্রথার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু হয়। পরবর্তীতে ব্রিটেন ১৮০৭ সালে এবং যুক্তরাষ্ট্র ১৮০৮ সালে তাদের আফ্রিকান দাসদের মুক্তি দেয়। এরপর যুক্তরাজ্য ১৮৩৩ সালে, ফ্রান্স ১৮৪৮ সালে এবং যুক্তরাষ্ট্র ১৮৬৫ সালে আইন করে দাসপ্রথা নিষিদ্ধ করে। তারপরেও এখনো বিশ্বের এক কোটি ২০ লাখ মানুষ জোরপূর্বক শ্রম, দাসত্ব ও দাসত্ব সংশ্লিষ্ট প্রথার কাছে বন্দি রয়েছে।

‘ইসলামের প্রথম মুয়াজ্জিন বিলাল ইবনে রাবাহ, যিনি প্রাথমিক জীবনে একজন ইথিয়োপীয় ক্রীতদাস ছিলেন,ইসলাম গ্রহণের ফলে নির্যাতিত হওয়ার সময় নবী মুহাম্মাদ এর নির্দেশে আবু বকর তাকে দাসত্ব হতে মুক্ত করেন। এটি সিয়ারে নবী নামক ফারসি গ্রন্থের একটি চিত্রাঙ্কন, যেখানে মক্কা বিজয়ের দিন কাবাগৃহের উপরে উঠে বিলালের আযান দেয়ার দৃশ্যকে চিত্রায়িত করা হয়েছে।
মুসলমানদের ধর্মগ্রন্থ কোরআনের সূরা নাহলে দাসদের সম্পর্কে বলা হয়েছে,আর আল্লাহ্ জীবনোপকরণে তোমাদের মধ্যে কাউকে কারো উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। যাদেরকে শ্রেষ্ঠত্ব দেয়া হয়েছে তারা তাদের অধীনস্থ দাস-দাসীদেরকে নিজেদের জীবনোপকরণ হতে এমন কিছু দেয় না যাতে ওরা এ বিষয়ে তাদের সমান হয়ে যায়। তবে কি তারা আল্লহ্র অনুগ্রহ অস্বীকার করছে? ইসলাম ধর্ম দাসত্বের বাস্তবতাকে সরাসরি অস্বীকার না করে, এর অস্তিত্বকে স্বীকারের মাধ্যমে দাস-দাসীদের তাঁদের প্রাপ্য মানুষের অধিকার প্রদানে উৎসাহ দেয়। এবং তা মানুষকে দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করাকে উত্তম কাজ বলে মনে করে।
ইসলাম মূলত অধিকারভুক্ত অসহায় মানুষদের দাস-দাসী হিসেবে বিবেচনা করতে বাধা প্রদান করে। ইসলাম মনে করে, তাঁদের পরিচয়ে হবে পোষ্য। সেটা পোষ্য ভাই, পোষ্য সন্তান ইত্যাদি হতে পারে।এ সম্পর্কে সহীহ বুখারীর হাদিসে বলা হয়েছে,আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, মুহাম্মাদ বলেন,তোমাদের কেউ যেনো না বলে,তোমার প্রভুকে আহার করাও,তোমার প্রভুকে পান করাও। আর যেনো অধিকারভুক্তরা এরূপ না বলে, আমার মনিব, আমার অভিভাবক। তোমাদের কেউ যেনো এরূপ না বলে,আমার দাস,আমার দাসী। বরং বলবে, আমার বালক, আমার বালিকা, আমার খাদিম। আর যদি দাস-দাসীর সাথে খারাপ আচরণ করা হয়, তাহলে ইসলাম নির্দেশ প্রদান করে যে,কাফফারা স্বরূপ উক্ত দাস বা দাসীকে মুক্ত করে দিতে হবে। এ সম্পর্কে সহীহ মুসলিম এর হাদিসে বলা হয়েছে,”ইবনে ওমর বলেন, আমি রাসূল (সা.) কে বলতে শুনেছি,যে ব্যক্তি তাঁর ক্রীতদাসকে চড় মারলো কিংবা প্রহার করলো তার কাফফারা তাঁকে মুক্ত করে দেয়া।
দাস-দাসী মুক্ত করার ব্যাপারে ইসলাম যে শরী‘য়ত সম্মত পদ্ধতি প্রণয়ন করেছে, ক. উৎসাহ প্রদানের মাধ্যমে মুক্তি দান; খ. কাফ্ফারা প্রদানের মাধ্যমে মুক্তি দান; গ.লিখিত চুক্তির মাধ্যমে মুক্তি দান; ঘ. রাষ্ট্রীয় তত্ত্ববধানে মুক্তি দান; ঙ. সন্তানের মা (উম্মুল অলাদ) হওয়ার কারণে মুক্তি দান; চ. নির্যাতনমূলক প্রহারের কারণে মুক্তি দান।

ইসলামে দাসত্ব প্রথার ব্যাপারে জানা কথা হলো, ইসলাম মনিবের জন্য বৈধ করে দিয়েছে যে, তার নিকট যুদ্ধ বন্দীদের থেকে কিছু সংখ্যক দাসী থাকতে পারবে এবং সে এককভাবে তাদেরকে উপভোগ করতে পারবে; আর ইচ্ছা করলে সে কখনো কখনো তাদের মধ্য থেকে কাউকে বিয়ে করতে পারবে; আর আল-কোরআনুল কারীম এই ধরনের ব্যবস্থাকে স্বীকৃতি দিয়েছে, যেমন আল্লাহ তা‘য়লা বলেন:“আর যারা নিজেদের যৌন অংগকে রাখে সংরক্ষিত, নিজেদের স্ত্রী বা অধিকারভুক্ত দাসীগণ ছাড়া,এতে তারা হবে না নিন্দিত।” (সূরা মু’মিনূন:৫-৬)
ইসলাম ক্রীতদাসের ন্যায়বিচার লাভের অধিকারকে নিশ্চিত করে। বিশ্বে যেখানে দাসদের ওপর চলছিলো ইচ্ছামত অত্যাচার, নিপীড়ন; দাসদের হত্যা করাও যখন ছিলো আইনসিদ্ধ, সেই সময় ইসলাম ঘোষণা করে কঠোরতম সতর্কবাণী, কেউ কোনো ক্রীতদাসকে হত্যা করলে তাকেও হত্যা করা হবে, কেউ কোনো ক্রীতদাসের অঙ্গহানি ঘটালে তারও অঙ্গহানি ঘটানো হবে। ইসলাম দাস-দাসীদের জৈবিক চাহিদা পূরণের অধিকার নিশ্চিত করেছে এবং নিজের দাস-দাসীদের বিবাহ দিয়ে দেওয়াকে মুনিবের জন্য দায়িত্ব হিসেবে নির্ধারণ করেছে। ইসলামে দাসীদের পতিতাবৃত্তিতে নিযুক্ত করা কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে।
যে কয়টি কারনে মানুষকে দাসে পরিণত করা হতো তা ছিলো-১. অভাবের তাড়নায় পিতা-মাতা তাদের সন্তানদের বিক্রি করে দাস-দাসীতে পরিণত করতো,
২. ঋণগ্রস্থ ব্যক্তি ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে দাসে পরিণত হতো, ৩. অভাবী লোকেরা অভাবের তাড়নায় ধনী ব্যক্তিদের দাস-দাসীতে পরিণত হয়ে যেতো,৪. শক্তিশালীরা অপহরনের মাধ্যমে কাউকে বন্দি করে দাস-দাসীতে পরিণত করতো,৫. যুদ্ধ-বিগ্রহের মাধ্যমে বন্দিরা দাস-দাসীতে পরিণত হতো, ইসলাম এসে কেবলমাত্র যুদ্ধ বিগ্রহের মাধ্যমে বন্দিদের দাসে পরিণত করার বিধানটি চালু রেখে বাকি সবগুলোকে নিষিদ্ধ করে দিয়েছে। আবার সেই যুদ্ধ বিগ্রহও কিন্তু ইসলামকে রক্ষার জন্যে শরীয়ত সম্মত যুদ্ধ। ইসলামী জেহাদ যে কয়টি উদ্দেশ্যে করা হয়, তাহলো- ১.ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা জন্যে, ২. আগ্রাসন রোধের জন্য,(আল-কোরআন,২:১৯০) ৩. মজলুম মুসলিমদের পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের সাহায্য করার জন্যে, (আল-কোরআন, ৪:৭৫) ৪. তাগুত অথবা জালিমের বিরুদ্ধে রুখে দাড়ানোর জন্যে,(আল-কোরআন, ৪:৭৬)
৫.ফিতনা দূরীভূত করা এবং দ্বীনকে পরিপূর্ণ করার জন্যে,(আল-কোরআন,৮: ৩৯)

ইসলামে দাস প্রথাটা চালু রয়েছে মুলতঃ যুদ্ধ বন্দি থেকে। যুদ্ধ বন্দিদের সম্পর্কে ইসলামের বিধান হলো: ১. বন্দীকে দাস-দাসী বানানো যাবে,
২. বন্দিকে অর্থের বিনিময়ে ছেড়ে দেয়া যাবে, ৩. বন্দিরা ঈমান আনলে তাদের মুক্ত করে দিতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) এর আবির্ভাবের আগে দাস-দাসীদের কোন ধরণের অধিকার ও সম্মান ছিলো না। মনিবরা তাদের সঙ্গে অত্যন্ত নির্মম ব্যবহার করতো। সকলের দৃষ্টিতেই তারা ছিলো অবহেলার পাত্র। রাসূলুল্লাহ (সা.) দাস-দাসীদের অধিকার ও সম্মান প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। পৃথিবীর ইতিহাসে দাস-দাসীদের অধিকার ও সম্মান প্রতিষ্ঠায় এত বেশি ভূমিকা অন্য আর কারো নেই। এ বিষয়টি সুস্পষ্ট করার জন্য কয়েকটি দৃষ্টান্ত ও মহানবী (সা.) এর মহৎ বাণীগুলো তুলে ধরা হলো- এক হাদিসে কুদসীর মধ্যে এসেছে: ‘আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, ‘আমি কিয়ামতের দিন তিন শ্রেণির মানুষের প্রতিপক্ষ। আর আমি যার প্রতিপক্ষ হব, তাকে পরাজিত করবই। তন্মধ্যে এক ব্যক্তি হলো এমন, যে আমার নামে প্রতিশ্রুতি দেয় এবং শপথ করে, অতঃপর তা ভঙ্গ করে। আরেক ব্যক্তি হলো যে স্বাধীন ব্যক্তিকে বিক্রি করে, অতঃপর তার বিনিময় ভক্ষণ করে। আর তৃতীয় আরেক ব্যক্তি হলো যে ব্যক্তি কোনো শ্রমিক নিয়োগ করে,অতঃপর তার থেকে পুরাপুরি কাজ আদায় করে নেয়, কিন্তু তার পারিশ্রমিক প্রদান করে না।’ (সহীহ বুখারী, কিতাবুল বুয়া, বাব নং- ১০৬, হাদিস নং- ২১১৪)

আরেক হাদিসে এসেছে,‘তিন শ্রেণির মানুষের সালাত (নামাজ) আল্লাহ তা’য়ালা কবুল করবেন না; এক ব্যক্তি হলেন যিনি কোনো সম্প্রদায়ের ইমামতি করেন,অথচ ওই সম্প্রদায়ের লোক তাকে অপছন্দ করে। আরেক ব্যক্তি হলো যে সালাতের ওয়াক্ত অতিবাহিত হলে সালাত আদায় করতে আসে এবং তৃতীয় আরেক ব্যক্তি হলো যে স্বাধীন ব্যক্তিকে ধরে গোলামে পরিণত করে।’ (আবূ দাউদ, সালাত অধ্যায়, বাব নং- ৬৩, হাদিস নং- ৫৯৩ ; ইবনু মাজাহ, কিতাবু ইকামাতিস সালাত ওয়াসসুন্নাতু ফীহা, বাব নং- ৪৩, হাদিস নং- ৯৭০; তারা উভয়ে আবদুর রহমান ইবন যিয়াদ আল-ইফরিকীর বর্ণনা থেকে বর্ণনা করেন) ‘তোমরা যুদ্ধবন্দীকে মুক্তি দাও, ক্ষুধার্ত ব্যক্তিকে খাবার দান কর এবং রুগ্ন ব্যক্তিকে সেবা কর।’ (সহীহ বুখারী, কিতাবুল জিহাদ ওয়াস সিয়ার, বাব নং- ১৬৮, হাদিস নং- ২৮৮১)
দাস-দাসীদের মানুষ হিসেবেই গণ্য করা হতো না। মনিবের মনোবাঞ্চনা পূরণই ছিলো তাদের একমাত্র কাজ। এমন এক অবস্থা থেকে ইসলাম তাদের পূর্ণ মানবিক অধিকারে ফিরিয়ে এনেছিলো। তাদের মানুষ হিসেবে মুনিবের সমমর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছিলো। রাসুলুল্লাহ (সা.) বিদায় হজে¦র ভাষণে ঘোষণা করেছিলেন, ‘স্মরণ রেখো! তোমাদের অধীনস্থ দাস-দাসীরা অসহায়, নিরাশ্রয়। সাবধান! তাদের ওপর কখনো জুলুম করবে না, তাদের অন্তরে আঘাত দেবে না। তোমাদের মতো তাদেরও একটি হৃদয় আছে। ব্যথা দিলে কষ্ট পায় আর আনন্দে আপ্লুত হয়। তোমরা যা খাবে, তাদেরও তা-ই খাওয়াবে, তোমরা যা পরবে, তাদেরও তা-ই পরাবে।’
নারীদের মধ্যে তোমাদের অধিকারভুক্ত দাসী ব্যতীত সকল সধবা তোমাদের জন্য নিষিদ্ধ, তোমাদের জন্য এ হল আল্লাহর বিধান। উল্লিখিত নারীগণ ব্যতীত আর সকলকে বিবাহ করা তোমাদের জন্য বৈধ করা হলো; এই শর্তে যে,তোমরা তাদেরকে নিজ সম্পদের বিনিময়ে বিবাহের মাধ্যমে গ্রহণ করবে, অবৈধ যৌন-সম্পর্কের মাধ্যমে নয়।অতঃপর তোমরা তাদের মধ্যে যাদের (মাধ্যমে দাম্পত্যসুখ) উপভোগ করবে, তাদেরকে নির্ধারিত মোহর অর্পণ কর। মোহর নির্ধারণের পর কোনো বিষয়ে পরস্পর রাযী হলে তাতে তোমাদের কোনো দোষ হবে না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ,প্রজ্ঞাময়।

দাসত্ব সম্পর্কে হাদিসে বলা হয়েছে, আবু হুরাইরা বলেন,নবী মুহাম্মাদ বলেছেন: যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানকে দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করবে, তাঁর প্রতিটি অঙ্গের বিনিময়ে আল্লাহ তাঁর প্রতিটি অঙ্গকে দোযখের আগুন থেকে রক্ষা করবেন। তাছাড়া সহীহ মুসলিম এর হাদিসে বলা হয়েছে,মুহাম্মাদ বলেন, হে আবুজর! তোমাদের মধ্যে বর্বর যুগের ভাবধারা রয়ে গেছে। তাঁরা (দাস) তোমাদের ভাই। আল্লাহ পাক তাঁদের তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন। তোমরা যা খাবে, তাঁদেরকে তাই খেতে দেবে। তোমরা যে বস্ত্র পরবে, তাঁদেরকেও তাই পরতে দেবে। তোমরা তাঁদের ওপর এমন কোনো কাজের বোঝা চাপাবে না,যা বহন করতে তাঁরা অপারগ হয়। যদি তোমাদের দেয়া কোনো কাজ করতে তাঁরা অসমর্থ হয় তাহলে তোমরা তাঁদের কাজে সাহায্য করবে।
ইসলাম দাস প্রথাকে মুক্ত করেই ক্ষান্ত হয়নি। বরং তাদেরকে স্বাধীন মানুষের সমানই মর্যাদা দিয়েছে। বিশ্ব মানবতার দূত হযরত মুহাম্মাদ (সা.) তাঁর নিজ ফুফাতো বোন যয়নব (রা.)কে বিবাহ দিয়েছিলো তাঁরই মুক্ত দাস সাহাবী জায়েদের সাথে। বেলাল (রা.) ছিলেন হযরত আবু বকর (রা.) এর মুক্ত দাস। তাঁকে মুসলমানের প্রথম মুয়াজ্জিন নিযুক্ত করা হয়। হযরত ওমর (রা.) তাঁর নাম বলার সময় মান্যবর বেলাল বলে উচ্চারণ করতেন।

দুনিয়ার সবচাইতে ঘৃণ্য একটি প্রথা হলো দাসপ্রথা। ইসলাম মানবজাতির জন্যে শান্তির পয়গাম। ইসলামই সর্বপ্রথম দাস মুক্তির পয়গাম নিয়ে এসেছে। কোনো স্বাধীন ব্যক্তির ক্রয়-বিক্রয় ইসলামে সরাসরি নিষিদ্ধ। কোরআনে দাস মুক্তির কথা থাকায় নতুন করে দাসপ্রথা চালু রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ে। জীবনের সকল পর্যায়ের সকল শ্রেণির জন্যেই শান্তির বার্তা শোনায় ইসলাম। ইতিহাসের এক পর্যায়ে যে দাস প্রথার উদ্ভব হয়েছিলো তা বাস্তব উপায়ে বিলুপ্ত করার ব্যবস্থা নিয়েছিলো। জাতি,ধর্ম,বর্ণ নির্বিশেষে মানবজাতির মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করাই ইসলামের নীতি। ঘৃনিত দাস প্রথা বিলোপে এটিই মূলত কার্যকর ব্যবস্থা। ইসলাম আসলে একেবারে দাসপ্রথাকে রোহিত করেনি তবে দাস মুক্ত করার ব্যাপারে বা আজাদ করে দেয়ার ব্যাপারে অনেক উৎসাহিত করেছে। ইসলামে ব্যক্তি স্বাধীনতার অধিকার পূর্ণরূপে স্বীকৃত এবং সংরক্ষিত। কোরআনে একটি আয়াতে দু’টি ভালো গুণের কথা বলা হয়েছে-“অভুক্তদের খাবার খাওয়ানো যেমন ভালো কাজ তেমনি দাস মুক্ত করে দেয়াও ভালো কাজ।

লেখকঃ সাবেক জাতীয় ক্রীড়াবিদ,সভাপতি শারীরিক শিক্ষাবিদ সমিতি
চেয়ারম্যান গ্রিন ক্লাব,শিক্ষক,গবেষক,সাংবাদিক ও কলামিস্ট