ঈদের মহিমান্বিত রজনীতে আল্লাহর নৈকট্য লাভ ও সেতু বন্ধনের মহাসুযোগ

 

মো. আলতাফ হোসেনঃ
ঈদ বিশ^ মুসলমানের সার্বজনিন উৎসব। প্রতিটি জাতি গোষ্ঠি ও সম্প্রদায়ের আনন্দ উৎসব উদ্-যাপনের নির্দিষ্ট দিবস রয়েছে; মহান আল্লাহ্ তা’আলা মুসলমানদের আনন্দ উদ্যাপনের জন্য দু’টি দিবস দান করেছেন। এ দিবসে বিশ^ মুসলিম সকল ভেদাভেদ তুলে গিয়ে শামিল হয় আনন্দের বিশেষ মোহনায়। ঈদের আগমনে আনন্দিত হয় না, এমন মুসলমান খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।

ঈদ অর্থ: উৎসব, পুনরাগমন, পুনরাবৃত্তি, বার বার ফিরে আসা, আনন্দ ইত্যাদি। উৎসবের এ বিশেষ দিবস যেহেতু প্রতিবছর আমাদের মাঝে নতুনভাবে ফিরে আসে, তাই একে ঈদ বলা হয়। ঈদের রাত শুধু আনন্দ উৎসবের রাতই নয় বরং আল্লাহ্র নৈকট্য অর্জন ও সেতুবন্ধনের রাতও এটি। সহীহ হাদিস শরীফ সমূহে বছরে যে পাঁচটি রাতকে অতি মর্যাদাপূর্ণ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে এর মধ্যে ঈদুল ফিতর পূর্ববর্তী রাত অন্যতম। ঈদ আমারে মাঝে আনন্দের বার্তা যেমন নিয়ে আসে, তেমনি নিয়ে আসে আল্লাহ্র নৈকট্য লাভের মহাসুযোগ। বিশেষত ঈদের রাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ফজিলতমন্ডিত। অথচ ইবাদতের কথা ভুলে আমরা নেমে পড়ি রাস্তায়, ছুটে বেড়াই শপিং মল থেকে শপিং মলে। কেউ বা আবার বাড়িতে, দোকানে কিংবা বন্ধুদের আড্ডাস্থলে হাই ভলিউমে মিউজিক ছেড়ে ঈদকে স্বাগত জানাই। অথচ মহান আল্লাহ্ তা’আলা এ রাতকে শবে বরাত ও শবে কদরের মতোই সর্বোচ্চ ফজিলত দিয়ে মহিমান্বিত করেছেন। পুরস্কার হিসেবে রেখেছেন তাঁর স্বীয় মুমিন বান্দাদের জন্য।

হযরত মুয়াজ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সাঃ) ইরশাদ করেন; যে ব্যক্তি পাঁচটি রাত জেগে থাকবে, তার ওপর জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যাবে। যেমন ১৫ শাবানের রাত, ঈদুল ফিতরে রাত, ৮ জিলহজে¦র রাত, ৯ জিলহজে¦র রাত ও ঈদুল আজহার রাত।

নবী করিম (সাঃ) ইরশাদ করেন, যে দুই ঈদের রাতে সওয়াবের নিয়তে ইবাদত করবে, তার অন্তর সেদিন মরবে না, যেদিন অন্যদের অন্তর মরে যাবে। (ইবনে মাজাহ)হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে ওমর (রা.) সম্পর্কে বর্ণিত আছে, তিনি দুই ঈদের রাত জেগে থেকে ইবাদত বন্দেগীতে কাটিয়ে দিতেন। হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ (রা.) আদি বিন আরতকে বললেন, চারটি রাতকে খুবই গুরুত্ব দেবে। যেমন- ১. রজবের রাত, শবে বরাত, ঈদুল ফিতরের রাত ও ঈদুল আজহার রাত। আল্লাহ্ তা’আলা এসব রাতে অশেষ রহমত বর্ষণ করেন (তালখিসুল খাবির)। ঈদের রাতটি (চাঁদ রাত) মুমিনদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি রাত। এ রাতকে ইবাদতের মাধ্যমে জীবন্ত রাখার ফলে মুমিনের জন্য জান্নাত ওয়াজিব হওয়ার সুসংবাদ রয়েছে। তাই এই রাতে অনর্থক কোনো কাজে লিপ্ত না হয়ে তার যথাযথ মর্যাদা দেয়াই একজন প্রকৃত মুমিনের জন্য বাঞ্ছনীয়। হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী করিম (সা.) কে বলতে শুনেছি যে আল্লাহ্ তা’আলা চার রাতে সব ধরনের কল্যাণের দরজা খুলে দেন। যেমন- ঈদুল ফিতরের রাত, ঈদুল আজহার রাত, ১৫ শাবানের রাত (এ রাতে সব প্রাণীর জীবন ও জীবিকা নির্ধারণ করা হয়) ও আরাফার রাত। আর তা এভাবে ফজরের আজান পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। (তারিখে বাগদাদ) শুধু ঈদের রাতই নয় ঈদ পরবর্তী সময়েও আল্লাহ্ তা’আলা তাঁর প্রিয় বান্দাদের জন্য আরো কিছু উপহার রেখেছেন। হযরত আবু আইয়ুব (রা.) সূত্রে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি রমজানের রোজা রাখবে অতঃপর শাওয়ালে আরো ৬টি রোজা পালন করবে, সে যেনো যুগভর রোজা রাখলো (সহিহ মুসলিম: ১১৬৪)
অন্য হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, যে ব্যক্তি রমজান মাসের রোজা ও শাওয়ালের ৬টি রোজা রাখলো, সে যেনো পুরো ১ বছর রোজা রাখলো। (মুসনাদে আহমাদ: ১৪৭১০)

যে বান্দা শত আনন্দের মাঝেও আল্লাহ্ তা’আলাকে ভুলে না; বরং ইবাদত তথা নামাজ, যিকির কুরআন তেলাওয়াত, দু’আর মাধ্যমে অশ্রুসিক্ত নয়নে মহান স্রষ্টার দরবারে হাজির হয় দয়াময় আল্লাহ্ তাকে মাগফিরাতের চাঁদরে আবৃত করে জিন্দেগীর গুনাহসমূহ মাফ করে দেন এবং তার জন্য ঘোষণা করেন চির শান্তির নীড় জান্নাতের সুসংবাদ। হযরত আবু উমামা (রা.) বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ্ তা’আলার সন্তুষ্টি অর্জনের আশায় দুই ঈদের রাতে জাগরণ (ইবাদত বন্দেগী) করবে, তার ক্বালব ওই কিয়ামতের দিনও মরবে না, যেদিন (ভয়ঙ্কর ও ভীবিষিকাময় পরিস্থিতির কারণে মানুষের অন্তর সমূহ মারা যাবে (ইবনে মাজাহ)

এছাড়াও আরো অসংখ্য হাদিস দ্বারা ঈদের রাতের ফজিলত ও তাৎপর্য অকাট্যভাবে প্রমাণিত। সঙ্গত কারণেই মুমিনের জীবনে ঈদের রাতের গুরুত্ব অপরিসীম। তাই প্রত্যেক মুমিনের কর্তব্য হলো, ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আজহা তথা উভয় ঈদের রাতে জাগ্রত থেকে নামাজ যিকির, তেলাওয়াত ও দু’আর মাধ্যমে মহান প্রভুর সন্তুষ্টি সাণ্নিধ্য ও মাগফিরাত কামনা করা। দয়াময় প্রভুর কুদরতি কদমে অশ্রু বিসর্জন দিয়ে নিজের অপরাধ সমূহ মর্জনা করে নেয়া এবং কলুষমুক্ত অবস্থায় ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মাধ্যমে সবাইকে নিয়ে ঈদের আনন্দ উদ্যাপন করা।

ঈদের রাতের আরেকটি বড় প্রাপ্তি হলো এ রাতে দোয়া কবুল করা হয়। কোনো দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। বরং আল্লাহ্ তা’আলার দরবারে তা’ সরাসরি কবুল হয়। তাই আমরা আমাদের ইবাদতের সঙ্গে সঙ্গে ঈদের রাতে আল্লাহ্ তা’আলার কাছে আমাদের প্রয়োজনগুলো চাইতে পারি। আল্লাহ্ তা’আলার কাছে ক্ষমা কামনা কবরের আজাব থেকে মুক্তি, জাহান্নামের আগুন থেকে রেহাই নিয়ে পরদিন সকালে একেবারে নিষ্পাপ শিশুর মতো পবিত্র ঈদের মাঠে আল্লাহ্র পুরস্কার গ্রহণ এবং প্রতিদান লাভের শ্রেষ্ঠ সুযোগ অন্য কোনো রাতে আছে কি? নেই। সুতরাং এই দুনিয়ার যাবতীয় কল্যাণ লাভ এবং মঙ্গল কামনা করা সেই সঙ্গে কামনা করে জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভের এই তো মহা সুযোগ!
বেশির ভাগ মানুষই অজ্ঞতা বা অবহেলার দরুন এ মহান সওয়াব থেকে বঞ্চিত হয়। আল্লাহ তা’আলা মুসলিম উম্মাহকে ঈদুল ফিতরের মহিমান্বিত রজনীতে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য ইবাদত বন্দেগী করে আল্লাহর নৈকট্য লাভ ও সেতু বন্ধনের মহাসুযোগ তৈরি করে দিন । – আমিন

লেখকঃ সাবেক জাতীয় ক্রীড়াবিদ(কারাতে ব্লাক বেল্ট ১ম ড্যান),সভাপতি শারীরিক শিক্ষাবিদ সমিতি,চেয়ারম্যান গ্রিন ক্লাব, গবেষক,শিক্ষক,সাংবাদিক ও কলামিস্ট