ঈমানের প্রথম বুনিয়াদ হলো তাওহীদ

 

মো.আলতাফ হোসেন ঃঃ
তাওহীদ আরবি শব্দ। তাওহীদ শব্দের অর্থ একত্ববাদ। ইসলামী পরিভাষায় তাওহীদ হলো সৃষ্টি ও পরিচালনায় আল্লাহকে এক ও অদ্বিতীয় হিসেবে বিশ্বাস করা, সকল ইবাদাত-উপাসনা কেবলমাত্র আল্লাহর জন্য করা, অন্য সবকিছুর উপাসনা ত্যাগ করা, আল্লাহর সুন্দর নামসমূহ ও সুউচ্চ গুণাবলীকে তাঁর জন্য সাব্যস্ত করা এবং দোষ ত্রুটি থেকে আল্লাহকে পবিত্র ও মুক্ত ঘোষণা করাকে বোঝায়।

তাওহীদ ৩ প্রকার হলো- ১. তাওহীদুল রুবুবিয়্যাহ : একমাত্র স্রষ্টা, রিযিকদাতা, সবকিছুর একমাত্র নিয়ন্ত্রণকারী হিসেবে বিশ্বাস করা। ২. তাওহিদুল উলুহিয়্যাহ : ইবাদতের ক্ষেত্রে আল্লাহকে একক নির্ধারণ করা। যেমন : সালাত, নযর-মানত, দান-সদকা ইত্যাদি। যাবতীয় ইবাদত এককভাবে আল্লাহর উদ্দেশ্যে করার জন্যই সমস্ত নবী-রাসূলগণকে প্রেরণ করা হয়েছে, আসমানি কিতাবসমূহ নাযিল করা হয়েছে। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন,‘‘আর ইবাদত করো আল্লাহর, শরিক করো না তাঁর সাথে অপর কাউকে’’। (সূরা নিসা : ৩৬) ‘‘আমি প্রত্যেক উম্মতের মধ্যেই রাসূল প্রেরণ করেছি এই মর্মে যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো এবং তাগুত থেকে নিরাপদ থাকো’’। (সূরা নাহল : ৩৬) ৩. তাওহিদুল আসমা ওয়াস সিফাত : সমস্ত সুন্দর-সুন্দর নাম ও গুণাবলি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা.) আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করেছেন সেগুলোকে কোনো প্রকার পরিবর্তন,অস্বীকৃতি ও ধরণ-গঠন নির্ধারণ ছাড়াই সাব্যস্ত করা ও মেনে নেয়া। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন,‘আল্লাহর অনেক সুন্দর-সুন্দর নাম আছে, সেই নামের মাধ্যমে তোমরা তাকে ডাক।’ (সূরা আরাফ : ১৮০) ‘‘আল্লাহ্ তিনি ব্যতীত কোনো উপাস্য ইলাহ নেই। সব সৌন্দর্যমন্ডিত নাম তাঁরই।’ (সূরা ত্বহা : ০৮) ‘বলুন, তিনি আল্লাহ্, এক। আল্লাহ্ অমুখাপেক্ষী। তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং কেউ তাঁকে জন্ম দেয়নি এবং তাঁর সমতুল্য কেউ নেই’’। (সূরা ইখলাস : ০১-০৪)

তাওহীদের শাব্দিক অর্থ একত্ববাদ। পারিভার্ষিক অর্থ আল্লাহ তা’য়ালাকে সত্তাগত ও গুণগত দিক দিয়ে একক জেনে তাঁরই ইবাদত করা। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, ‘আপনি যদি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন, নভোমন্ডল ও ভূ-মন্ডল কে সৃষ্টি করেছে? তারা অবশ্যই বলবে, আল্লাহ্। বলুন, সকল প্রশংসাই আল্লাহর। বরং তাদের অধিকাংশই জ্ঞান রাখে না।’ (সূরা লুকমান : ২৫) ‘যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহ তা’য়ালার জন্য, যিনি সকল সৃষ্টি জগতের পালনকর্তা।’ (সূরা ফাতিহা : ০২] ‘আল্লাহ্ই তোমাদের সৃষ্টি করেছেন, অত:পর রিযিক দিয়েছেন, এরপর তোমাদের মৃতু্যু দেবেন, এরপর তোমাদের জীবিত করবেন। তোমাদের শরীকদের মধ্যে এমন কেউ আছে কি, যে এসব কাজের মধ্যে কোনো একটিও করতে পারবে? তারা যাকে শরিক করে, আল্লাহ তা থেকে পবিত্র ও মহান।’ (সূরা রুম : ৪০)
বিশ^ মানবতার দূত নবী হযরত মুহাম্মদ (সা:) তাঁর সাহাবিগণকে সর্বপ্রথম মানুষকে তাওহীদের প্রতি আহ্বান জানানোর শিক্ষা দেন। যেমন, মুয়ায (রা.)-কে ইয়ামেনের গভর্ণর করে পাঠানোর সময় রাসূল (সা.) বলেছিলেন : ‘সেখানের অধিবাসীদেরকে আল্লাহ ব্যতিত কোনো ইলাহ নেই এবং আমি (মুহাম্মদ) আল্লাহর রাসূল- এ কথার সাক্ষ্যদানের দাওয়াত দিবে। যদি তারা এ কথা মেনে নেয়, তাহলে তাদেরকে জানিয়ে দিবে, আল্লাহ তাদের ওপর প্রতিদিন ও রাতে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরজ করেছেন। তারা যদি এ কথা মেনে নেয়, তবে তাদেরকে জানিয়ে দিবে, আল্লাহ তাদের সম্পদের ওপর সাদকা (জাকাত) ফরজ করেছেন। তাদের মধ্যকার (নিসাব পরিমাণ) সম্পদশালীদের নিকট থেকে (জাকাত) উসুল করে তাদের দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করে দেওয়া হবে।’ (সহিহ বুখারি : ১৩১০ (ই.ফা))
তাওহীদের বিপরীত ধারণা হলো শিরক। ইসলামে শিরক হলো আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো উপাসনা করা। সাধারণত বিভিন্ন মূর্তি, পাথর, গাছ, নক্ষত্র, ফেরেশতা, জ্বিন, মৃতব্যক্তি ইত্যাদি বস্তু ও জীবের ইবাদত বা উপাসনা করা হয়। এসব উপাস্যকে ভয়-ভীতি, আশা-আকাঙ্খার সাথে ডাকা, বিপদে তাদের কাছে সাহায্য, আশ্রয়, উদ্ধার প্রার্থনা করা, তাদের নামে যবাই ও মানত করা ইত্যাদি কর্মকান্ড শিরকের অন্তর্ভুক্ত।

ইসলামে ঈমানের সর্বপ্রথম ও সর্বপ্রধান বিষয় হলো তাওহীদ। অর্থাৎ মু’মিন বা মুসলিম হতে হলে একজন মানুষকে সর্বপ্রথম আল্লাহ তা’য়ালার একত্ববাদে বিশ্বাস আনতে হবে।ইসলামের সকল শিক্ষা ও আদর্শ তাওহীদের ওপর প্রতিষ্ঠিত।দুনিয়াতে যতো নবি-রাসূল এসেছেন সকলেই তাওহীদের দাওয়াত দিয়েছেন। তাওহীদ প্রতিষ্ঠা করার জন্য নবি-রাসূলগণ আজীবন সংগ্রাম করেছেন। তাওহীদে হিদায়াত ও নিরাপত্তা লাভে আল্লাহ্ তা’য়ালা এরশাদ করেন : ‘যারা ঈমান এনেছে এবং শিরকের সাথে মিলায়নি, তাদের জন্য রয়েছে নিরাপত্তা এবং তারাই হিদায়াত প্রাপ্ত।’ (সূরা আন-আম : ৮২)

ইতবান ইবনু মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলবে তার জন্য আল্লাহ জাহান্নাম হারাম করে দিবেন।’ (সহিহ বুখারি : ৪২৫, সহিহ মুসলিম : ৩৩) আনাস ইবনু মালিক (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)কে আমি বলতে শুনেছি, বরকতময় আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, ‘হে আদম সন্তান! যতক্ষণ আমাকে তুমি ডাকতে থাকবে এবং আমার হতে (ক্ষমা পাওয়ার) আশায় থাকবে, তোমার গুণাহ যতো অধিক হোক, তোমাকে আমি ক্ষমা করব, এতে কোনো পরওয়া করবো না। হে আদম সন্তান! তোমার গুণাহের পরিমাণ যদি আসমানের কিনারা বা মেঘমালা পর্যন্তও পৌছে যায়, তারপরও তুমি আমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করো, আমি তোমাকে ক্ষমা করে দেবো, এতে আমি পরওয়া করবো না। হে আদম সন্তান! তুমি যদি সম্পূর্ণ পৃথিবী পরিমাণ গুণাহ নিয়েও আমার নিকট আসো এবং আমার সঙ্গে কাউকে অংশীদার না করে থাকো, তাহলে তোমার কাছে আমিও পৃথিবী পূর্ণ ক্ষমা নিয়ে হাজির হবো।’ (সহিহ তিরমিজি : ৩৫৪০, সহিহাহ : ১২৭ ও ১২৮) জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) এরশাদ করেছেন : ‘যে আল্লাহর সাথে কোনো প্রকার শিরক করা ব্যতীত (তাওহীদের ওপর) মৃত্যুবরণ করবে, অবশ্যই সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যে শিরকের ওপর মৃত্যুবরণ করবে, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।’ (সহিহ মুসলিম : ৯৩)

ঈমানের প্রধান ও অপরিহার্য শর্ত হলো তাওহীদ। মু’মিন হতে হলে নিরঙ্কুশভাবে আল্লাহর একাত্মবাদে বিশ্বাস করতে হবে। সর্বশক্তিমান আল্লাহকে তাঁর নামে, গুণে, বৈশিষ্ট্যে ও কাজে এককভাবে বিশ্বাস করা এবং সমস্ত ইবাদত একমাত্র তাঁরই জন্য করার নামই তাওহীদ। তাওহীদ শব্দের আভিধানিক অর্থ- এক করা, একক ও অদ্বিতীয় সাব্যস্ত করা, একত্ববাদ প্রতিষ্ঠা করা। শরিয়াতের পরিভাষায় তাওহীদের অর্থ হলো- আল্লাহ্কে (০) তাঁর সুমহান জাত (সত্তা) সর্বসুন্দর নাম ও সিফাতে (গুণরাজি-বৈশিষ্ট্যে) এবং তাঁর অধিকার, কর্ম ও কর্তৃত্বে এক, একক ও অদ্বিতীয় ষোষণা ও সাব্যস্ত করা, এবং এসব ক্ষেত্রে নিজের কথা, কাজ ও বিশ্বাসের দ্বারা আল্লাহ্র একত্ব অক্ষুন্ন রাখা। এ ক্ষেত্রে কোনো ব্যত্যয় হলে বান্দার কোনো ইবাদতই আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। আল কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘বলো, তিনি আল্লাহ এক, অদ্বিতীয়।’ (সূরা ইখলাস : ১)। অর্থাৎ মহান আল্লাহ এক বা একক সত্তার অধিকারী। সাধারণ অর্থে তাওহীদ হচ্ছে এক করা, এক বানানো, একত্রিত করা, একাত্মের ঘোষণা দেওয়া বা একাত্মে বিশ্বাস করা। আল্লাহ তা’য়ালাকে এক ও অদ্বিতীয় সত্তা হিসেবে মনে-প্রাণে বিশ্বাস করাকেই তাওহিদ বা একাত্মবাদের মূল কথা। আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয় এবং তিনিই একমাত্র সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, রিজিকদাতা। তিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। আল্লাহর কোনো শরিক নেই। তিনি ছাড়া আর কেউ ইবাদত, উপাসনার যোগ্য নয়। আল্লাহ তা’য়ালাই একমাত্র সত্তা, যার কাছে মনের আকুতি পেশ করা হয়, প্রয়োজন মেটানোর জন্য সাহায্য প্রার্থনা করা হয়। তিনি ছাড়া কেউই নেই সাহায্য করার। আল্লাহর প্রতি এরূপ বিশ্বাসই হলো তাওহিদ। বিশ্বাস করতে হবে তিনি রাজত্ব, সৃষ্টি, ধনসম্পদ ও কর্তৃত্বের অধিপতি। এ ক্ষেত্রে তাঁর কোনো অংশীদার নেই। এককভাবে তিনিই প্রভু। ইবাদত, আনুগত্য, আশা-ভরসা, সাহায্য ও ফরিয়াদের ক্ষেত্রে অন্য কাউকে তাঁর সঙ্গে অংশীদার করা যাবে না। তিনি মহান গুণাবলির অধিকারী, তার সাদৃশ্য কোনো কিছুই নয়। তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা। পবিত্র কোরআনে এ বিষয়টি বার বার স্পষ্ট করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের প্রকৃত ইলাহ অবশ্যই এক ও একক।’ (সূরা আস-সাফফাত : ৪)।

আল্লাহ এক এবং তিনি ছাড়া আর কোনো মাবুদ নেই এই তত্ত্বকে তাওহিদ বা একাত্ববাদ বলা হয়। নামাজ, রোজা, জাকাত, হজসহ সব ইবাদতের মূল লক্ষ্য তাওহিদের এই শিক্ষাকে ধারণ করা। তাকে নিরঙ্কুশভাবে জীবনের সর্বক্ষেত্রে পরস্ফুিট করা। আল্লাহ এক এবং তার কোনো শরিক নেই এটি হলো ইসলামের মূল শিক্ষা। এ শিক্ষা প্রদানের জন্য আল্লাহ বিভিন্ন সময়ে মানব জাতির জন্য রসূল পাঠিয়েছেন। তারা মানুষকে আল্লাহমুখী অর্থাৎ মহান স্রষ্টার প্রতি আনুগত্যশীল হওয়ার দাওয়াত দিয়েছেন। সব নবী বা রসুলের মূল বক্তব্য ছিলো ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া আর কোনো মাবুদ নেই।

ইসলাম একাত্ববাদবিরোধী যে কোনো ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করে। কাউকে আল্লাহর সমকক্ষ, কাউকে আল্লাহর সন্তান ভাবার কোনো অবকাশ নেই। ইসলামে পুরোপুরিভাবে নিষিদ্ধ। এ বিষয়ে পবিত্র কোরআনের সূরা আল আম্বিয়ার ২২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যদি আল্লাহ ব্যতীত বহু মাবুদ থাকতো তবে উভয়ই ধ্বংস হয়ে যেতো।’ পবিত্র কোরআনের এ বক্তব্য বাস্তবতার সঙ্গেও সঙ্গতিপূর্ণ। কারণ সৃষ্টিকর্তা বা মহাবিশ্বের নিয়ন্ত্রকের সংখ্যা একাধিক হলে তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থাকতো। এ দ্বন্দ্ব সৃষ্টি জগতের শৃঙ্খলাকে বিনষ্ট করতো। তাতে ধ্বংস অনিবার্য হয়ে উঠতো।

তাওহীদের ওপর বিশ্বাস ইসলামের মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত। এ বিশ্বাস বা ইমান আনার মাধ্যমে বান্দা তার স্রষ্টার প্রতি যথার্থ আনুগত্যের প্রকাশ ঘটাতে পারে। তাওহিদ অর্থাৎ একাত্ববাদের শিক্ষা মানুষকে সত্যাশ্রয়ী হতে শিক্ষা দেয়। আল্লাহর প্রতি তার আনুগত্যকে নিরঙ্কুশ করে। অন্য কারও কাছে মাথা নত করার নির্বুদ্ধিতা এবং হীনম্মন্যতা থেকে রক্ষা করে।

একাত্ববাদ অর্থাৎ আল্লাহ এক এবং সব কিছুতে তার নিরঙ্কুশ থাকায় বিশ্বজগতের সব কিছু সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত হয়। কোথাও কোনো অসঙ্গতি চোখে পড়ে না। মাবুদের সংখ্যা একাধিক হলে শৃঙ্খলা লোপ পেতো। সূরা মু’মিনুনের ৯১ নম্বর আয়াতে এরশাদ করা হয়েছে, ‘আল্লাহর সঙ্গে অন্য কোনো ইলাহ্ নেই। যদি থাকতো তবে প্রত্যেক ইলাহ স্বীয় সৃষ্টি নিয়ে পৃথক হয়ে যেতো এবং একে অপরের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করতো।’ নিজেদের মুসলমান হিসেবে প্রমাণ করতে হলে তাওহিদ অর্থাৎ একাত্ববাদকে হৃদয়ে আঁকড়ে ধরতে হবে।
মানুষের জীবনে তাওহীদ অতীব গুরত্বপুর্ণ বিষয়। তাওহীদ বিশ্বাসের কারণেই মানুষ পরকালে মুক্তি লাভ করবে। তাওহীদ সম্পর্কে জানা ও নির্ভেজাল তাওহীদে বিশ্বাসী হওয়া প্রত্যেকের জন্য অত্যাবশ্যক। তাওহীদের বিপরীত হলো শিরক। যার কারণে মানুষের জীবনের সকল পুণ্য বিনষ্ট হয়, পূর্বের সব আমল বাতিল হয়ে যায় এবং পরকালে জাহান্নাম অবধারিত হয়। তাই শিরক থেকে সতর্ক-সাবধান হওয়া সকল মানুষের জন্য অতি জরুরী।

মানুষের জীবনে ইবাদাত ও মু‘আমালাত বা আধ্যাত্মিক ও বৈষয়িক দু’টি দিক রয়েছে। এর মধ্যে আধ্যাত্মিক বা রূহানী জগতটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আধ্যাত্মিক জগতের বিশ্বাস অনুযায়ী মানুষ তার বৈষয়িক জীবন পরিচালনা করে। এ কারণে আধ্যাত্মিক জগতকে সুনিয়ন্ত্রিত করার জন্য ইসলাম যে বিধান সমূহ প্রদান করেছে তা হলো ‘তাওক্বীফী’। অর্থাৎ যার কোন নড়চড় নেই। বান্দার পক্ষ হ’তে সেখানে কোনরূপ রায়-ক্বিয়াস বা ইজতিহাদের অবকাশ নেই। সালাত, সিয়াম, হজ্জ, যাকাত, যবেহ-মানত ইত্যাদি ইবাদত সমূহের নিয়ম পদ্ধতি উক্ত বিধানের অন্তর্ভুক্ত। এসব ক্ষেত্রে কেবলমাত্র পবিত্র কোরআন ও ছহীহ হাদিসে প্রাপ্ত বিধান মেনে চলাই নিরপেক্ষ মু’মিনের কর্তব্য। অতঃপর ‘মু‘আমালাত’ বা বৈষয়িক জীবনে মুমিন আল্লাহ প্রেরিত ‘হুদূদ’ বা সীমারেখার মধ্যে থেকে স্বাধীনভাবে কাজ করবেন। আদেশ-নিষেধ ও হালাল-হারাম-এর সীমারেখার মধ্যে থেকে যোগ্য আলেমগণ শারঈ মূলনীতির আলোকে ‘ইজতিহাদ’ করবেন ও যুগ-সমস্যার সমাধান দিবেন। রাজ্যশাসন, প্রজাপালন, চাকুরী,ব্যবসা-বাণিজ্য ইত্যাদি মানুষের জীবনের বিস্তীর্ণ কর্মজগত তাঁর মু‘আমালাত বা বৈষয়িক জীবনের অন্তর্ভুক্ত। একজন প্রকৃত মু’মিন তাঁর আধ্যাত্মিক জীবনে যেমন আল্লাহর বিধান মেনে চলেন, তেমনি বৈষয়িক জীবনেও ইসলামী শরিয়াতের আনুগত্য করে থাকেন। আধ্যাত্মিক জীবনে আল্লাহর আনুগত্য ও বৈষয়িক জীবনে গায়রুল্লাহর আনুগত্য স্পষ্ট শিরক। জান্নাতপিয়াসী মু’মিনকে তাই ইবাদতের ক্ষেত্রে যেমন হাদিসপন্থী হতে হবে, বৈষয়িক জীবনেও তেমনি শারঈ বিধানের আনুগত্য করে চলতে হবে। নইলে তার তাওহীদের দাবী মিথ্যা প্রমাণিত হবে। তাওহীদে রুবূবিয়াতকে মেনে নিলেও কাফের আরব নেতারা তাওহীদে ইবাদতকে মেনে নিতে পারেনি বলেই নবীকে অস্বীকার করেছিলো।

তাওহিদে বিশ্বাস মানুষকে আত্মসচেতন ও আত্মমর্যাদাবান করে। মানুষ আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো সামনে মাথা নত করে না। পক্ষান্তরে, তাওহীদে বিশ্বাস না করলে মানুষ বিপথগামী হয়ে যায়। সে গাছপালা, পশু-পাখি, চন্দ্র-সূর্য ইত্যাদির কাছে মাথা নত করে। নানা রকমের মূর্তিপূজা করতে থাকে। ফলে মানুষের আত্মমর্যাদা বিনষ্ট হয়। তাওহীদে বিশ্বাস মানুষের মধ্যে আত্মসম্মানবোধ ও আত্মসচেতনতা জাগিয়ে তোলে। তাওহীদ বা আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস মানুষকে এক জাতিত্ব বোধ এনে দেয়। ফলে মানুষ একে অপরের ভ্রাতৃত্ব ও সহমর্মিতায় উদ্বুদ্ধ হয়। পক্ষান্তরে শিরক বা বহু উপ্যাসের বিশ্বাস মানুষকে বহুদল ও গোষ্ঠীতে বিভক্ত করে দেয়। এতে মানব জাতির বিভাজন পরিণতিতে পারস্পরিক দ্বন্দ¦-সঙ্ঘাত ও হানাহানির কারণ হয়। এতে শান্তি ও মানবতা বিপর্যস্ত হয়। তাওহীদে বিশ্বাস মানুষকে এক আল্লাহর প্রতি নির্ভরশীল করে। ফলে যাবতীয় বিপদ- আপদে, দুঃখ-কষ্টে মানুষ হতাশ বা নিরাশ হয় না। বরং মহান আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে পূূর্ণোদ্দমে কাজ করতে থাকে এবং সাফল্য লাভ করে। এভাবে তাওহীদে বিশ্বাস মানুষকে দুনিয়ার জীবনে সুখ শান্তি ও সফলতার সবকটি দরজা খুলে দেয়।

সৃষ্টির সেরা জীব হচ্ছে মানুষ। অন্য সকল সৃষ্টি হচ্ছে মানুষের সেবক। কিন্তু তাওহীদের শিক্ষা না থাকলে ওগুলোর সামনে মাথা নত করে বসে থাকে। মনে করে ওগুলো কোনো লাভ বা ক্ষতি করতে পারে। ইতিহাসে অনেক ঘটনা পাওয়া যায়, সামান্য পাথরের পূজা করতো যে ব্যক্তি, তাওহীদের বিশ্বাসী হয়ে যাওয়ার পর সে ওই বস্তুকে কিছুই মনে করে না। যেমন এক বর্ণনায় এসেছে হযরত ওমর (রা.) জাহেলি যুগে হাজরে আসওয়াদের পূজা করতো কিন্তু যখন ঈমানের দৌলত নসীব হয়, তখন তার বক্তব্য ছিলো এরকম ‘আমি জানি তুমি একটি পাথর। কোনো উপকার বা ক্ষতি করার ক্ষমতা তোমার নেই। যদি রাসূল (সা.) চুম্বন করতে না দেখতাম তাহলে আমি তোমাকে চুম্বন করতাম না।

সৃষ্টির উদ্দেশ্য সম্পূর্ণভাবে উপলদ্ধি করা মানুষের সহজাত ক্ষমতার উর্দ্ধে। মানুষ একটি সসীম সৃষ্টিকর্ম এবং তার নিকট হতে অসীম স্রষ্টার ক্রিয়াকান্ড সম্পূর্ণ যুক্তিসঙ্গতভাবে উপলদ্ধি আশা করা যায় না। এই কারণে স্রষ্টা তাঁকে ইবাদত করা মানুষের স্বভাবের একটি অংশ হিসাবে তৈরি করেছেন। সৃষ্টির উদ্দেশ্য সম্বন্ধে পরিস্কার করে বুঝানোর জন্য তিনি পয়গম্বারদের এবং মানসিক ক্ষমতার বোধগম্য কিতাবসমূহ প্রেরণ করেছিলেন। স্রষ্টার ইবাদত (ইবাদাহ) করা উদ্দেশ্য এবং পয়গম্বারদের প্রার্থনা বার্তা ছিলো একমাত্র সৃষ্টাকে ইবাদত করা, তৌহিদ আল ইবাদাহ। এর কারণে আল্লাহ ছাড়া অথবা আল্লাহসহ অন্যকে ইবাদত করা কঠিন গুণাহ, শিরক। যে সূরা আল ফাতিহা, মুসলিম নরনারীদের নামাজে প্রতিদিন অন্ততপক্ষে সতেরবার পড়তে হয় সেই সূরার চতুর্থ আয়াত উল্লেখ করে ‘‘আমরা একমাত্র তোমারই ইবাদত করি এবং একমাত্র তোমার কাছেই আমবা সাহায্য চাই।’’ এই বিবৃতি থেকে পরিস্কার হয়ে যায়, সকল প্রকার ইবাদত আল্লাহকে উদ্দেশ্য করে করতে হবে যিনি সাড়া দিতে পারেন।

আল্লাহর রাসূল (সাঃ) এককত্বের দর্শন দৃঢ়ভাবে সমর্থন করে বলেছেন, ‘‘তুমি যদি ইবাদতে কিছু চাও তাহলে শুধু আল্লাহর নিকট চাও এবং তুমি যদি সাহায্য চাও তাহলে শুধু আল্লাহর নিকট চাও’’ প্রয়োজনীয় এবং আল্লাহর নিকটবর্তীতা আরও দৃঢ়ভাবে প্রকাশ পায়। ‘‘আর যখন আমার বান্দাগণ তোমাকে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবে, আমি তো নিশ্চয়ই নিকটবর্তী। আমি আহ্বানকারীর ডাকে সাড়া দেই, যখন সে আমাকে ডাকে। সুতরাং তারা যেনো আমার ডাকে সাড়া দেয় এবং আমার প্রতি ঈমান আনে। আশা করা যায় তারা সঠিক পথে চলবে।’’(সূরা আল বাকারা ২: ১৮৬) আর অবশ্যই আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি এবং তার প্রবৃত্তি তাকে যে কুমন্ত্রণা দেয় তাও আমি জানি। আর আমি তার গলার ধমনী হতেও অধিক কাছে। (সূরা কাফ ৫০: ১৬)

তাওহীদ একটি বাস্তব ও সত্য অবস্থার নাম। তাওহীদ মেনে চললে হয় ইবাদাত আর তাওহীদ মেনে না চললে অর্থাৎ শিরক করলে হয় কুফুর। তাওহীদের মূল বাণী ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া আর কোনো মাবুদ নাই। এটি সর্বত্তম বাক্য, পবিত্র বাক্য। আল্লাহ তা’য়ালা যুগেযুগে বহু নবী ও রাসূলগণকে প্রেরণ করেছেন যেনো তারা তাওহীদের বাণী মানুষের নিকটে পৌঁছে দেয় । প্রত্যেক নবী রাসূলের মূল বাক্য ছিলো লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া আর কোনো মাবুদ নাই। মানুষের মধ্যে অল্প কিছু সংখ্যক আছে যারা আল্লাহকে স্বীকার করে না। মূলত তারা মনের পূজারী। তাই তারা মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত। এই অল্প কিছু সংখ্যক নাস্তিক ছাড়া সবাই আল্লাহকে স্বীকার করে। আল্লাহ আমাদের সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, রিযিকদাতা, তিনি ক্ষমতাবান এসব স্বীকার করে এবং তার ইবাদাতও করে। কিন্তু মূল সমস্যা এখানে যে, তারা অন্যকে এসব ব্যাপারে আল্লাহর সাথে অংশীদার করে। আবার কখনও আল্লাহর সৃষ্টিকে তার সাথে সামঞ্জস্যশীল মনে করে। মক্কার মুশরিকরা আল্লাহকে স্বীকার করত, কিন্তু তারা মনে করত যে, আমরা অধম গুণাহগার বান্দা, তাই আল্লাহ আমাদের প্রার্থনা কবুল করবেন না। তাই তারা বিভিন্ন দেবদেবীর পূজা করতো যেনো তারা আল্লাহর কাছে সুপারিশ করে তাদের জন্য। আর সেই অসীলায় যেনো আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করেন। আজ আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, মুসলিমদের মধ্যেও সেই অন্ধত্ব বিরাজমান। একদল মুসলিম যারা পীর ও মাজারকে পূজা করছে। যেনো তারা অসীলা হতে পারে, সুপারিশকারী হতে পারে আল্লাহর নিকটে, যেমন মক্কার মুশরিকরা করতো।

ইহুদীরা উযায়েরকে (আ:) আল্লাহর পুত্র সাব্যস্ত করেছিলো এবং খৃষ্টানরা ঈসাকে (আ:) আল্লাহর পুত্র ও মারইয়ামকে আল্লাহর স্ত্রী সাব্যস্ত করেছিলো। এর জবাব দিতে গিয়ে আল্লাহ তা’য়ালা কোরআনে উল্লেখ করেনঃ বলুন, তিনিই আল্লাহ এক, আল্লাহ অমুখাপেক্ষী, তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং কেউ তাকে জন্ম দেয়নি। এবং তার তার সমতুল্য কেউ নেই। (সূরা ইখলাস)

সুতরাং ‘আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো সত্য ইলাহ নেই’ এ হুকুম ও ফায়সালার মধ্যে এর বিষয়বস্তু বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এখানে যদি শুধু জবানের উচ্চারণ উদ্দেশ্য হতো, তাহলে ইহার ইলম অর্জন করা আবশ্যক হতো না, ইহা দ্বারা কোনো উপকার হতো না এবং এর দ্বারা তাদের বিরুদ্ধে দলীল পেশ করাও সম্ভব হতো না। সুতরাং আল্লাহ তা‘য়ালা যে সাক্ষ্য দিয়েছেন তাতে রয়েছে বান্দার জন্য তাওহীদের বর্ণনা, তাদের জন্য রয়েছে দিক নির্দেশনা এবং এর পরিচিতি। যেমন কোনো বান্দার কাছে যখন কোনো বিষয়ে সাক্ষ্য থাকবে, সে যদি তা বর্ণনা না করে; বরং তা গোপন করে, তাহলে তার দ্বারা কেউ উপকৃত হবে না এবং এর মাধ্যমে কোনো দলীল-প্রমাণও কায়েম হবে না। সুতরাং তাওহীদের সাক্ষ্য বর্ণনা করা ব্যতীত যেহেতু তার দ্বারা উপকৃত হওয়া সম্ভব নয়, তাই আল্লাহ তা‘য়ালা তা অত্যন্ত পরিস্কারভাবে বর্ণনা করেছেন। মানুষের শ্রবণ, দৃষ্টি এবং বিবেক ও বোধশক্তির নিকট আল্লাহ তা‘য়ালা তাওহীদের দলীলগুলো বর্ণনা করেছেন।

আল্লাহ তা‘য়ালা তাঁর সম্মানিত কিতাবে নিজের যেসব গুণাবলী বর্ণনা করেছেন এবং তার শ্রেষ্ঠতম মুহাম্মাদ (সা.) তাঁর প্রভুকে যেসব বিশেষণে বিশেষিত করেছেন, জাহমীয়া, মুতাযেলা এবং কতিপয় সিফাতকে বাতিলকারী আশায়েরা ও মাতুরীদি সম্প্রদায়ের লোকেরা এ ধারণায় ঐ সব সিফাতকে অস্বীকার করে যে, তা বিবেক-বুদ্ধি ও বোধশক্তিকে পরাজিত করে। আল্লাহ তা‘য়ালা তাঁর কিতাবে এবং নবী করিম (সা.) তাঁর সুন্নাতে যেসব গুণাবলীর সুস্পষ্ট বর্ণনা প্রদান করেছেন, তা তাদের ধারণার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। আল্লাহ তা‘য়ালা সূরা যুখরুফের শুরুতে বলেন, ‘হা-মীম এ সুস্পষ্ট কিতাবের শপথ! সূরা ইউসুফের শুরুতে আরো বলেন, ‘‘আলিফ-লাম-রা! এগুলো সুস্পষ্টরূপে বর্ণনাকারী কিতাবের আয়াত’’। তিনি সূরা হিজরের শুরুতে আরো বলেন, ‘‘আলিফ-লাম-রা! এগুলো আল্লাহর কিতাব ও সুস্পষ্টভাষী কোরআনের আয়াত’’। সূরা আল-ইমরানের ১৩৮ নং আয়াতে আল্লাহ তা‘য়ালা আরো বলেন, ‘‘এটি মানব জাতির জন্য একটি সুস্পষ্ট বর্ণনা এবং যারা আল্লাহকে ভয় করে তাদের জন্য হেদায়াত ও উপদেশ’’। সূরা মায়েদার ৯২ নং আয়াতে আল্লাহ তা‘য়ালা বলেন, ‘‘আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করো এবং নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত থাকো। কিন্তু যদি তোমরা আনুগত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও তাহলে জেনে রাখো, সত্য সুস্পষ্টভাবে পৌঁছিয়ে দেয়া ছাড়া আমার রাসূলের আর কোনো দায়িত্ব নেই’’। আল্লাহ তা‘য়ালা সূরা নাহালের ৪৪ নং আয়াতে আরো বলেন, ‘‘এ উপদেশ বাণী তোমার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে মানুষকে সুস্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিতে পারো যা তাদের জন্য অবতীর্ণ করা হয়েছে এবং যাতে তারা চিন্তা-গবেষণা করে’’।

আল্লাহ তা’য়ালার একত্ববাদের পরিচয়ই হচ্ছে তাওহীদের মূল কথা। ঈমান হচ্ছে একজন মুসলিমের জন্য সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। তাওহীদ বা একত্ববাদ হচ্ছে এই ঈমানের মূল ভিত্তি। আল্লাহকে মানার ক্ষেত্রে তাঁর একত্ববাদাদের জ্ঞান অর্জন করা ফরজ। বান্দা তার নাম, সিফাত এবং কর্মাবলীর ক্ষেত্রে তাঁকে এক ও অদ্বিতীয় বলে প্রতিষ্ঠিত করা।

পৃথিবীতে সঙ্ঘটিত ও সঙ্ঘটিতব্য সকল ঘটনা অনুঘটনা এক মাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকে হয় এবং তাঁর ইশারাতেই হয়ে থাকে। এখানে অন্য কোনো মাধ্যম ও কার্যকারণের ন্যূনতম ভূমিকা নেই। প্রত্যেক মানুষ সকল বিষয়কে উপরোক্ত বিশ্বাসের আলোকে বিচার করবে। এটিই হচ্ছে মূলত তাওহীদের সার কথা। আর প্রভূত্ব, ইবাদাত, নাম ও গুণাবলির ক্ষেত্রে মহান আল্লাহ তা’য়ালার একত্ববাদের অস্তিত্বকে প্রমাণ করা হলো তাওহীদ। সুতরাং এক মাত্র তারই ইবাদাত করবে। যে ইবাদতের মাধ্যমে তাঁর একত্ববাদকে প্রতিষ্ঠিত করবে। তাঁর সাথে অন্য কারো ইবাদত করবে না। আর যে ব্যক্তি তাওহীদের শিক্ষা ও তাৎপর্য বাস্তবায়ন করলো সে বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাকে কোনোই শাস্তি পেতে হবে না। আর শিরক ও বিদাআত হচ্ছে এই মূল ভিত্তির বিধ্বংসীকারী মারস্ত্র। আল্লাহ তাঁর তাওহীদ বা একত্ববাদের কথা মহা গ্রন্থ আল কোরআনে বিভিন্ন আয়াতে তুলে ধরছেন। যেমন: আল্লাহর মারোফাত বা পরিচয়ের সবচেয়ে সুপ্রসিদ্ধ আয়াতগুলো হলো সূরা ইখলাসের ৪টি আয়াত- অর্থ বলুন, তিনি আল্লাহ, এক, আল্লাহ অমুখাপেক্ষী, তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং কেউ তাঁকে জন্ম দেয়নি এবং তার সমতুল্য কেউ নেই। (১১২ : ১-৪)। সূরা বাকারার ২৫৫ নং আয়াত (এ আয়াতটি কে আয়াতুল কুরসী বলা হয়)। অর্থ: “আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো উপাস্য নেই, তিনি জীবিত, সবকিছুর ধারক। তাঁকে তন্দ্রাও স্পর্শ করতে পারে না এবং নিদ্রাও নয়। আসমান ও যমীনে যা কিছু রয়েছে, সবই তাঁর। কে আছ এমন, যে সুপারিশ করবে তাঁর কাছে তাঁর অনুমতি ছাড়া? দৃষ্টির সামনে কিংবা পিছনে যা কিছু রয়েছে সে সবই তিনি জানেন। তাঁর জ্ঞানসীমা থেকে তারা কোনো কিছুকেই পরিবেষ্টিত করতে পারে না, কিন্তু যতটুকু তিনি ইচ্ছা করেন। তাঁর সিংহাসন সমস্ত আসমান ও যমীনকে পরিবেষ্টিত করে আছে। আর সেগুলোকে ধারণ করা তাঁর পক্ষে কঠিন নয়। তিনিই সর্বোচ্চ এবং সর্বাপেক্ষা মহান।” সূরা হাসরের প্রসিদ্ধ শেষ তিন আয়াতে আল্লাহ তা’য়ালা বলেন: অর্থ: তিনিই আল্লাহ্, তিনি ব্যতীত অন্য কোনো মাবুদ নাই। যিনি গোপন ও প্রকাশ্য সব জানেন। তিনি মহান এবং পরম করুণাময়। তিনিই আল্লাহ্, তিনি ব্যতীত অন্য কোনো উপাস্য নাই। তিনিই সার্বভৌম, পবিত্র, শান্তি উৎস, ঈমানের বিধায়ক, নিরাপত্তার রক্ষক, পরাক্রমশালী, অপ্রতিরোধ্য, সর্বশ্রেষ্ঠ। মহিমা আল্লাহ্র। তারা আল্লাহ্র সম্বন্ধে যে শরীক আরোপ করে তিনি তার উর্দ্ধে। তিনিই আল্লাহ্ সৃষ্টিকর্তা, উদ্ভাবক, আকৃতির রূপকার, সকল উত্তম নাম তারই। আকাশ মন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে, সমস্তই তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে। তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।
তাওহীদ বা একত্ববাদ হচ্ছে বান্দা নিশ্চিত ভাবে বিশ্বাস করবে যে, আল্লাহ তা’য়ালা এক ও অদ্বিতীয়, এককভাবে সকল বস্তুর মালিক, প্রতিপালক, সমগ্র বিশ্বকে তিনিই এককভাবে পরিচালনা করছেন, সকল কিছুর তিনিই সৃষ্টিকর্তা, তিনিই সকল ইবাদাতের একমাত্র যোগ্য, তিনি সর্বোতভাবে যাবতীয় পরিপূর্ণ গুণাবলী ও বৈশিষ্টে বৈশিষ্টমন্ডিত। তাওহীদের সার কথা এই যে, বান্দা সুনিশ্চিতভাবে আল্লাহ তা’য়ালার রুবুবিয়্যাতে (প্রভুত্বে), উরুহিয়াতে (উপাস্যত্বে) এবং আসমা ওয়াসসিফাতে (নির্ধারিত সত্ত্বাবাচক ও গুনবাচক নামে) একক বলে স্বীকার করবে, কোনো শরীক স্থাপন করবে না।

আল্লাাহ তা’য়ালা মানুষের জন্য এক ও একক সর্বাধিপতি প্রতিপালক। তিনি রাজত্ব, সৃষ্টি, ধন-সম্পদ ও কর্তৃত্বের অধিপতি। এতে কোনো অংশীদার নেই। এককভাবে তিনিই প্রভু। এবাদত, আনুগত্য, আশা-ভরসা, সাহায্য ও ফরিয়াদের ক্ষেত্রে অন্য কাউকে তার সাথে অংশীদার করা জায়েজ নেই। তিনি সুন্দর নামসমূহ ও মহান গুণাবলির অধিকারী, তার সদৃশ কোনো জিনিস নেই। তিনি সর্ব-শ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা।

মহান আল্লাহ এ বিশ্ব চরাচরের সব কিছু সৃষ্টি করেছেন তাঁর ইবাদতের জন্য । তিনি অসংখ্য নবী-রাসূলদের পাঠিয়েছেন, লোকদের একত্ববাদের দিকে ডাকার জন্য। কোরআনের প্রায় সূরাতেই তাওহীদের প্রতি স্ববিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি শিরকের বর্ণনাও এসেছে অবধারিতভাবে। তাতে ব্যক্তি ও সমাজের ওপর শিরকের ক্ষতিকর দিকটি ফুঠে উঠেছে সুন্দরভাবে। শিরক একটি মারাত্মক পাপ, তার কারণেই মূলত: মানুষ দুনিয়াতে ধ্বংস হয় এবং আখেরাতে চিরকালের জন্য জাহান্নামে প্রবেশ করবে।
আসমানী কিতাব ও নাবী-রসূলদের মাধ্যমে তাওহীদের দলীলগুলোর ব্যাপারে কথা হলো আল্লাহ তা‘য়ালা আমাদেরকে তার পূর্ণতার গুণাবলী, একত্ব এবং অন্যান্য বিষয় সম্পর্কে জানিয়ে দিয়েছেন এবং ঐগুলোর খোলাখুলি বর্ণনা প্রদান করেছেন। সে সম্পর্কিত সুস্পষ্ট আয়াতগুলোর তেলাওয়াত শুনেই তা দ্বারা উপকৃত হওয়া সম্ভব।

ইসলাম মানুষকে সুন্দর জীবন দিয়েছে এবং সঙ্গে সঙ্গে সুন্দর জীবনের জন্য সুন্দর নীতিমালা প্রদান করেছে। কারণ ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা। মানুষের জীবনে প্রতিটি বিষয়, প্রতিটি দিক সম্পর্কে ইসলাম সুষ্ঠু ও সুন্দর দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে। তাওহীদ হচ্ছে প্রত্যেক মুসলিমের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। তাই জীবন শুরু করতে হবে তাওহীদ দিয়ে, শেষও করতে হবে তাওহীদ দিয়েই। জীবনের প্রতিটি পর্বে, প্রতিটি অনুষঙ্গে তাওহীদকে প্রতিষ্ঠা করা, তাওহীদের প্রতি অপরকে দাওয়াত দেয়াই হচ্ছে তার কাজ। কারণ, কেবল তাওহীদই পারে মু’মিনদেরকে ঐক্যবদ্ধ করতে, দাড় করাতে পারে তাদেরকে কালিমার ওপর একতাবদ্ধভাবে।

তাওহীদে বিশ্বাস মানুষকে দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতা এনে দেয়। কেননা, তাওহিদ মানুষকে আল্লাহর পরিচয় দান করে। এর মাধ্যমে মানুষ আল্লাহ তা’য়ালার ক্ষমতা ও গুণাবলি জানতে পারে। দুনিয়ার কাজকর্মের জন্য মানুষকে পরকালে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবেÑ এ শিক্ষা তাওহীদের মাধ্যমে লাভ করা যায়। এ শিক্ষার দ্বারা মানুষ অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকে, এর ফলে সে আখিরাতে সফলতা লাভ করবে।

তাওহীদে বিশ্বাস মানুষকে ইবাদত ও সৎকর্মে উৎসাহিত করে। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সন্তুষ্টি লাভের জন্য মানুষ সৎকর্মে অগ্রসর হয়। অসৎ ও অশ্লীল কাজ থেকে বিরত থাকে। ফলে মানব সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয়। তাওহিদে বিশ্বাস পরকালীন জীবনে মানুষকে সফলতা দান করে। তাওহিদে বিশ্বাস ছাড়া কেউই জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। বস্তুত মানব জীবনের সব ক্ষেত্রেই তাওহিদে বিশ্বাস মুক্তি ও সফলতার দ্বার উন্মুক্ত করে দেয়।

মুসলিমদের জন্য তাওহীদ বা একত্ববাদ খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই তাওহীদের পরিশুদ্ধি ছাড়া কেউ মুসলিম হতে পারে না। প্রাণ ছাড়া দেহ যেমন অকার্যকর, তেমনি বিশুদ্ধ তাওহীদ ছাড়া আমলও অকার্যকর। তাই ইহ ও পরকালীন জীবনে মুক্তির জন্য তাওহীদের আকিদা পোষণ করা আমাদের জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মানবজীবনে তাওহীদ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যার ওপর ইহকাল ও পরকালের কল্যাণ-অকল্যাণ, সফলতা-ব্যর্থতা নির্ভরশীল। তাওহীদের ওপর অটল ও অবিচল থাকা প্রত্যেক ব্যক্তির ওপর ফরয।

লেখকঃ সাবেক জাতীয় ক্রীড়াবিদ,সভাপতি শারীরিক শিক্ষাবিদ সমিতি
চেয়ারম্যান গ্রিন ক্লাব,লেখক,গবেষক,সাংবাদিক ও কলামিস্ট