একজন সত্যাশ্রয়ী নবী হযরত ইসমাইল (আ.)

 

মো.আলতাফ হোসেন ঃঃ
আল্লাহ তা’য়ালা যুগে যুগে সত্য দ্বীনসহ অসংখ্য নবী-রাসুল প্রেরণ করেছেন। যাদের প্রেরণের মূল লক্ষ্যই ছিলো এ জমিনে তাঁর ইবাদাত তথা দাসত্ব মানুষ শিখানো। মানুষকে সকল প্রকার অন্যায় জুলুম অত্যাচার থেকে ফিরিয়ে সঠিক জীবন দর্শন দেখানো। তাই প্রত্যেক নবি-রাসূলই আল্লাহ তা’য়ালা এ মিশন বাস্তবায়নে নিজেদের এবং উম্মতের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণ কামণায় দোয়া করেছেন। আল্লাহ তা’য়ালা পৃথিবীর বুকে অসংখ্য নবী-রাসূল পাঠিয়েছে। কোরানে বর্ণিত ২৫ জন নবী-রাসূলের একজন হলো হযরত ইসমাইল (আ.)।
হযরত ইসমাঈল (আ.) ছিলেন পিতা ইব্রাহিম (আ.)-এর জ্যেষ্ঠ পুত্র এবং মা হাজেরার গর্ভজাত একমাত্র সন্তান। ঐ সময়ে ইব্রাহিম (আ.) এর বয়স ছিলো ৮৬ বছর। শিশু বয়সে তাঁকে ও তাঁর মাকে পিতা ইব্রাহিম (আ.) আল্লাহর নির্দেশে মক্কার বিজন ভূমিতে রেখে আসেন। সেখানে ইব্রাহিম (আ.) এর দোয়ার বরকতে আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহে যমযম কূপের সৃষ্টি হয়। অতঃপর ইয়ামনের ব্যবসায়ী কাফেলা বনু জুরহুম গোত্র কর্তৃক মা হাজেরার আবেদনক্রমে সেখানে আবাদী শুরু হয়। ১৪ বছর বয়সে আল্লাহর হুকুমে মক্কার অনতিদূরে মিনা প্রান্তরে সংঘটিত হয় বিশ্ব ইতিহাসের বিস্ময়কর ত্যাগ ও কোরবানীর ঘটনা।
হযরত ইব্রাহিম (আ.) কর্তৃক পুত্র ইসমাঈলকে স্বহস্তে কোরবানীর উক্ত ঘটনায় শতবর্ষীয় পিতা ইব্রাহিম (আ.) এর ভূমিকা যাই-ই থাকুক না কেন চৌদ্দ বছরের তরুণ ইসমাঈলের ঈমান ও আত্মত্যাগের একমাত্র নমুনা ছিলেন তিনি নিজেই। তিনি স্বেচ্ছায় নিজেকে সমর্পণ না করলে পিতার পক্ষে পুত্র কুরবানীর ঘটনা সম্ভব কি হতো। তাই ঐ সময় নবী না হলেও নবীপুত্র ইসমাইলের আল্লাহভক্তি ও দৃঢ় ঈমানের পরিচয় ফুটে উঠেছিলো তাঁর কথায় ও কর্মে। এরপর পিতার সহযোগী হিসাবে তিনি কা‘বা গৃহ নির্মাণে শরীক হন এবং কা‘বা নির্মাণ শেষে পিতা-পুত্র মিলে যে প্রার্থনা করেন,আল্লাহ পাক তা নিজ যবানীতে পবিত্র কোরআনে বর্ণনা করে বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দিয়েছেন (বাক্বারাহ ২/১২৭-১২৯)।এভাবে ইসমাইল স্বীয় পিতার ন্যায় বিশ্বের তাবৎ মুমিন হৃদয়ে স্থায়ী আসন লাভ করেছেন। আল্লাহ তাঁর প্রশংসায় সূরা মারিয়াম ৫৪ আয়াতে বলেন, তিনি ছিলেন ওয়াদা রক্ষায় সত্যাশ্রয়ী’ যা তিনি যবহের পূর্বে পিতাকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন,‘হে পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে,তা কার্যকর করুন। আল্লাহ চাহেন তো আপনি আমাকে ছবরকারীদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন’ (সূরা: সাফফাত ৩৭/১০২)।
অতঃপর কা‘বা নির্মাণকালে পিতা-পুত্রের দোয়ার (সূরা:বাকারাহ ১২৭-২৯) বরকতে প্রথমতঃ কা‘বা গৃহে যেমন হাযার হাযার বছর ধরে চলছে তাওয়াফ ও সালাত এবং হজ্জ ও ওমরাহর ইবাদত,তেমনি চলছে ঈমানদার মানুষের ঢল। দ্বিতীয়তঃ সেখানে সারা পৃথিবী থেকে সর্বদা আমদানী হচ্ছে ফল-ফলাদীর বিপুল সম্ভার। তাঁদের দো‘আর তৃতীয় অংশ মক্কার জনপদে নবী প্রেরণের বিষয়টি বাস্তবায়িত হয় তাঁদের মৃত্যুর প্রায় আড়াই হাযার বছর পরে ইসমাঈলের বংশে শেষনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর আবির্ভাবের মাধ্যমে। ইসমাঈল (আ.) মক্কায় আবাদকারী ইয়ামনের বনু জুরহুম গোত্রে বিবাহ করেন। তাদেরই একটি শাখা গোত্র কুরাইশ বংশ কা‘বা গৃহ তত্ত্বাবধানের মর্যাদাপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত হয়।এই মহান বংশেই শেষনবীর আগমন ঘটে। উল্লেখ্য যে, হযরত ইসমাইল (আ.) সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের ৯টি সূরায় ২৫টি আয়াতে বর্ণিত হয়েছে।
ইসমাইল (আ.) ছিলেন একজন আদর্শন সন্তান। তিনি পিতার প্রতি কেমন শ্রদ্ধাশীল ও অনুগত ছিলেন। হাজেরার মৃত্যুর পর ইব্রাহিম (আ.) যখন ইসমাঈলকে দেখতে যান,তখন তার স্ত্রীকে কুশলাদি জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন,‘আমরা খুব অভাবে ও কষ্টের মধ্যে আছি’। জবাবে তিনি বলেন,তোমার স্বামী এলে তাকে আমার সালাম দিয়ে বলো যে, তিনি যেন দরজার চৌকাঠ পাল্টে ফেলেন’। পরে ইসমাইল বাড়ি ফিরলে ঘটনা শুনে বলেন,উনি আমার আববা এবং তিনি তোমাকে তালাক দিতে বলেছেন। ফলে ইসমাইল স্ত্রীকে তালাক দেন ও অন্য স্ত্রী গ্রহণ করেন। পরে একদিন পিতা এসে একই প্রশ্ন করলে স্ত্রী বলেন, আমরা ভালো ও সচ্ছলতার মধ্যে আছি এবং তিনি আল্লাহর প্রশংসা করেন। ইব্রাহিম (আ.) তাদের সংসারে বরকতের জন্য আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করলেন। অতঃপর তাকে বলেন,তোমার স্বামী ফিরলে তাকে বলো যেন দরজার চৌকাঠ ঠিক রাখেন ও মযবূত করেন’।ইসমাইল ফিরে এলে ঘটনা শুনে তার ব্যাখ্যা দেন ও বলেন,উনি আমার পিতা। তোমাকে স্ত্রীত্বে বহাল রাখার নির্দেশ দিয়ে গেছেন। এই ঘটনার কিছু দিন পর ইবরাহীম পুনরায় আসেন। অতঃপর পিতা-পুত্র মিলে কা‘বা গৃহ নির্মাণ করেন।
ইসমাইল সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন,‘সর্বপ্রথম ‘স্পষ্ট আরবী’ ভাষা ব্যক্ত করেন ইসমাইল। যখন তিনি ছিলেন মাত্র ১৪ বছর বয়সের তরুণ’।এখানে ‘স্পষ্ট আরবী’ অর্থ ‘বিশুদ্ধ আরবী ভাষা’ এটাই ছিলো কুরাইশী ভাষা যে ভাষায় পরে কুরআন নাযিল হয়। এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, সকল ভাষাই আল্লাহ কর্তৃক ইলহামের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে। ইসমাঈল ছিলেন বিশুদ্ধ কুরায়শী আরবী ভাষার প্রথম ইলহাম প্রাপ্ত মনীষী। এটি ইসমাঈলের জন্য একটি গৌরবময় বৈশিষ্ট্য। এজন্য তিনি ছিলেন ‘আবুল আরব’ বা আরবদের পিতা। অন্যান্য নবীগণের ন্যায় যদি ইসমাইল ৪০ বছর বয়সে নবুঅত পেয়ে থাকেন,তাহ’লে বলা চলে যে, ইসমাঈলের নবুঅতী মিশন আমৃত্যু মক্কা কেন্দ্রিক ছিলো। তিনি বনু জুরহুম গোত্রে তাওহীদের দাওয়াত দেন। ইস্রাইলী বর্ণনানুসারে তিনি ১৩৭ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন ও মা হাজেরার পাশে কবরস্থ হন’।কা‘বা চত্বরে রুকনে ইয়ামানীর মধ্যে তাঁর কবর হয়েছিল বলে জনশ্রুতি আছে। তবে মক্কাতেই যে তাঁর মৃত্যু হয়েছিলো,এটা নিশ্চিতভাবে ধারণা করা যায়। ইসমাঈলের বড় মহত্ত্ব এই যে, তিনি ছিলেন ‘যবীহুল্লাহ’ অর্থাৎ আল্লাহর রাহে স্বেচ্ছায় জীবন উৎসর্গকারী এবং তিনি হ’লেন শেষনবী মুহাম্মাদ (সা.)-এর মহান পূর্বপুরুষ। আল্লাহ তাঁর উপরে শান্তি বর্ষণ করুন।
ইসলামে ইসমাইলকে নবী এবং ইসলামী নবী মুহাম্মদের পূর্বপুরুষ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এছাড়াও তিনি মক্কা ও কাবা নির্মাণের সাথে যুক্ত হন। এই উৎসগুলোর মধ্যে রয়েছে কুরআন,কুরআন ভাষ্য (তাফসীর), হাদিস,মুহাম্মদ ইবনে জারির আল-তাবারির মত ঐতিহাসিক বর্ননাভিত্তিক সংকলন এবং ইস্রাইলীয় (বাইবেল বা প্রাচীন বনি ইসরাইল ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে ইসলামি গ্রন্থ যা ইহুদী বা খ্রিস্টান উৎস থেকে উদ্ভূত)। অধিকাংশ মুসলমান বিশ্বাস করে যে ইব্রাহীমকে তার পুত্র ইসমাইলকে উৎসর্গ করতে বলা হয়েছে, যদিও কোরআনে ছেলের নাম উল্লেখ করা হয়নি। একাধিক সংস্করণ প্রস্তাব করে যে এটি মূলত একটি মৌখিক গল্প যা কোরআন এবং অতিরিক্ত ধারাভাষ্যে লেখার আগে প্রচারিত হযেছিল।৯২৯৫ নরম্যান ক্যালডার ব্যাখ্যা করেছেন, “মৌখিক আখ্যানের ক্ষেত্রে এর বিভিন্ন সংস্করণে ফর্ম ও পুঙ্খানুপুঙ্খতার অস্থিতিশীলতা এবং একটি যথাযথ সৃজনশীল নমনীয়তা পরিলক্ষিত হয়,যা একে একটি অনন্য শিল্পে পরিণত করে।” :৯২৯৩ প্রতিটি সংস্করণ প্রকৃতপক্ষে একটি “শিল্পের অনন্য রচনা”, নির্দিষ্ট ধারণা উপস্থাপনের জন্য বিভিন্ন উপায়ে যেমন অন্যরকম থেকে পৃথক, যেমন ইসহাকের চেযে ইসমাইলের গুরুত্ব কারণ তিনি প্রথম সন্তান ছিলেন। প্রতিটি সংস্করণ সত্যিই একটি “অনন্য শিল্পকর্ম”, নির্দিষ্ট ধারণাকে বিভিন্ন উপায়ে প্রকাশ করার জন্য ভিন্ন ভিন্ন, যেমন ইসহাকের থেকে ইশমায়েলের অধিক গুরুত্ব,কারণ তিনি প্রথম সন্তান ছিলেন।
হযরত ইসমাইল (আ.) কে ইসলামে নবী হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে অন্যান্য নবীদের সাথে কুরআনে তালিকাভুক্ত করা হয়। অন্যান্য আয়াতে,ইসমাইল ধৈর্য্যশীল, সৎ এবং ধার্মিক হওয়ার জন্য প্রশংসিত হন। একটি বিশেষ উদাহরণ যা স্বতন্ত্রভাবে ইসমাইলকে বর্ণনা করে তা হলো ১৯: ৫৪-৫৫ একটি বিশেষ উদাহরণ যা ইসমাইলকে পৃথকভাবে বর্ণনা করে তা হল ১৯:৫৪-৫৫ আয়াত-“আর স্মরণ কর এই কিতাবে ইসমাইলকে। তিনি ছিলেন সত্যিকারের প্রতিশ্রতি রক্ষাকারী এবং আল্লাহ্র রাসূল,নবী। আর তিনি তার পরিবার-পরিজনকে প্রার্থনা ও দানের নির্দেশ দিতেন এবং তিনি ছিলেন তার আল্লাহ্র সন্তোষপ্রাপ্ত।” ইসমাইলের বংশধর হিসেবে মুহাম্মদের নবুয়ত ন্যায্য হয় এবং এতে প্রাক-ইসলামী যুগ থেকে নবীদের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকে।
ইসমাইলের “আরবদের প্রতিষ্ঠাতা” হিসেবে প্রথম উল্লেখ করেন জোসেফাস। ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ইসমাইল ও তাঁর বংশধর ইসমাইলাইটদেরকে ইহুদি ও খ্রিস্টীয় সাহিত্যে আরবদের সাথে সম্পর্কিত করা হয়েছে, এবং প্রায়ই আরব হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ইসলাম একটি ধর্ম হিসেবে বিকশিত হওয়ার আগে, ইসমাইলকে নানাভাবে চিত্রিত করা হয় কিন্তু প্রতিষ্ঠার পর ইসমাইলকে প্রায় সবসময় ইহুদী ও খ্রিস্টান শাস্ত্রে নেতিবাচক আলোকে দেখা যায়, যেন তিনি ইহুদি ও খ্রিস্টধর্মে “অপর” এর প্রতীক হয়ে গেছেন। ২৩ ইসলামী সম্প্রদায় আরো শক্তিশালী হয়ে ওঠার পর, ইসমাইল এবং এইভাবে মুসলমানরা ইব্রাহিমের প্রিয় বংশধর -এই ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য ইসমাইল সম্পর্কে কিছু ইহুদী মিদ্রাশ সংশোধন করা হয় যাতে তাকে আরো নেতিবাচকভাবে চিত্রিত করা হয়।১৩০ ইহুদি ও মুসলিম উৎস্য অনুযায়ী ইসমাইলের বংশধরদের বংশলতিকায় পার্থক্য দেখা যায়। ইসলামের বিকাশ ইসলামের উপর যেকোনভাবে ইহুদিধর্ম ও খ্রিস্টধর্ম থেকে ভিন্ন হবার জন্য চাপ সৃষ্টি করে, আর এর প্রভাবে ইসমাইলের উত্তরসুরিদের থেকে আরবদের উদ্ভবের বংশধারাটিও প্রভাবিত হয়।
হাজেরা (আ.) হযরত ইব্রাহিম (আ.) এর পুণ্যবতী স্ত্রী ও হযরত ইসমাইল(আ.) এর মা। হযরত ইসমাইল(আ.) তখন একবারে দুগ্ধপোষ্য শিশু।এই সময় আল্লাহ তা’য়ালার ইচ্ছা হলো, তিনি হযতর ইসমাইল (আ.) এর সন্তানের হাতে মরুময় মক্কাকে আবাসযোগ্য বাসভূমিতে পরিনত করবেন। তিনি হযরত ইব্রাহিম(আ.) কে হুকুম দিলেন,হাজেরা (আ.) ও ইসমাইলকে ভয়াবহ মরু ময়দানে একা রেখে আসতে। এ ছিলো এক কঠিন পরীক্ষা! একদিকে বৃদ্ধ বয়সে ইসমাইল(আ.) কে সন্তানরূপে পেয়ে তাঁর অপত্য ছিলো প্রবল। অন্যদিকে মক্কার মরুভূমিতে বসবাস ছিলো কঠিন। সেখানে না ছিলো জনমানব,না ছিলো খাদ্য পানীয়।তাও হযরত ইব্রাহিম(আ.) আল্লাহর আদেশ পালন করলেন।
আদি পিতা আদম (আ.) এর যুগ থেকেই কোরবানির বিধান চালু হয়েছিলো। আদম (আ.) এর দুই ছেলে হাবিল ও কাবিলের কোরবানীর কথা পবিত্র আল কোরআনে বর্ণিত হয়েছে। তাদের একজনের কোরবানি আল্লাহর কাছে কবুল হয়েছে এবং অন্যজনের কোরবানি কবুল হয়নি। পৃথিবীতে কোরবানির ইতিহাস এখান থেকেই শুরু। তবে আজকের মুসলিম সমাজে যে কোরবানির প্রচলন রয়েছে তা মূলত জাতির পিতা হযরত ইব্রাহিম (আ.) এর দেখানো পথ থেকেই। হযরত ইব্রাহিম (আ.) এর শতবর্ষ বয়সের পর আল্লাহ তায়ালা তাঁকে যে সন্তান দান করেছিলেন, তিনি আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক আদিষ্ট হয়ে তাঁর সে কলিজার টুকরা হযরত ইসমাইল (আ.) এর কোরবানির সূত্র ধরে আজও সেই কোরবানী প্রচলিত আছে।
হযরত ইসমাইল (আ.) এর যখন হাঁটাচলা ও খেলাধূলা করার বয়স তখন হযরত ইব্রাহিম (আ.)কে স্বপ্নে আদেশ করা হলো,তুমি তোমার প্রিয় বস্তু আল্লাহর নামে কোরবানি করো। ইব্রাহিম (আ.) স্বপ্নে আদিষ্ট হয়ে ১০টি উট কোরবানি করলেন।পুনরায় তিনি আবারও একই স্বপ্ন দেখলেন। অতঃপর ইব্রাহিম (আ.) আবারও ১০০টি উট কোরবানি করলেন। আবারও তিনি একই স্বপ্ন দেখে ভাবলেন, আমার কাছেতো এ মুহূর্তে আমার কলিজার টুকরা প্রিয় পুত্র ইসমাইল (আ.) ছাড়া আর তেমন কোনো প্রিয় বস্তু নেই। ইসমাইল (আ.) যখন পিতার সঙ্গে হাঁটা-চলার উপযোগী হলো তখন ইব্রাহিম (আ.) বললেন, হে আমার পুত্র! আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আমি তোমাকে কোরবানি করছি। সুতরাং তোমার মতামত কি? হযরত ইসমাইল (আ.) বললেন, হে আমার পিতা! আপনি যে বিষয়ে আদিষ্ট হয়েছেন তা পালন করুন। আপনি আমাকে আল্লাহর মেহেরবানিতে ধৈর্যশীলদের একজন পাবেন। অতঃপর যখন তাঁরা দু’জন একমত হলেন আর তখন আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছার সামনে আত্মসমর্পণ করলেন। ইব্রাহীম (আ.) ইসমাইল (আ.)কে জবাই করার জন্যে কাত করে শুইয়ে দিলেন,তখন আল্লাহর নির্দেশে ইসমাইল (আ.)-এর পরিবর্তে একটি দুম্বা কোরবানি হয়ে গেল। নিশ্চয়ই এটি ছিলো ইব্রাহিম ও ইসমাইলের জন্যে একটা পরীক্ষা। অতঃপর মানুষের জন্যে এ কোরবানির বিধান চালু হয়ে গেল। যা আজও মুসলিম সমাজে অত্যন্ত ভাব গাম্ভির্যের সঙ্গে পালন হয়ে আসছে। ত্যাগের সু-মহান ও অনুপম দৃষ্টান্তকে চিরস্মরণীয় করে রাখার জন্য আল্লাহ তা’য়ালা তার প্রিয় রাসুল মুহাম্মদ (সাঃ) এর উম্মতের উপর পশু কোরবানি ওয়াজিব করে দিয়েছেন। উম্মতে মুহাম্মদীর কোরবানি হযরত ইব্রাহিম (আ.) এর কোরবানীকে স্মরণ করিয়ে দেয়। ইব্রাহীম (আ.) এর গোটা জীবন ছিল কোরবানি তথা অতুলনীয় আত্নোৎসর্গ ও আত্নত্যাগের মহিমায় উজ্জল। প্রিয় পুত্র ইসমাঈল (আ.) কে কোরবানি করা ছিলো ইব্রাহিম (আ.) এর জীবনের অসংখ্য কোরবানির চরম ও শ্রেষ্টতম ঘটনা। তাদের স্মরণ পশু কোরবানীর এ বিধান রোজ কেয়ামতের আগ পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে।
হযরত ইসমাইল (আ) এর জন্ম ও ইতিহাস: হযরত ইব্রাহিম এ পর্যন্ত নিঃসন্তান ছিলেন। একদিন তিনি আল্লাহর দরবারে দোয়া করলেন, হে আল্লাহ আপনি আমাকে একটি সৎ সন্তান দান করুন। সে দোয়া আল্লাহ ফিরিয়ে দেননি, আল্লাহ তার দোয়া কবুল করে তাকে সান্ত¦না দিলেন। হযরত ইব্রাহিম এর ছোট বিবি হযরত হাজেরা (আ) গর্ভবতী হলেন। অতঃপর হযরত ইসমাইল (আ.) জন্মগ্রহণ করেন। হযরত সারা (আ) এটা জানতে পেরে মানব প্রকৃতির তাড়নায় হাজেরা (আ) এর প্রতি ঈর্ষান্বিত হলেন। তিনি হাজেরাকে নানাভাবে উত্ত্যক্ত করতে লাগলেন। অবশেষে একদিন হযরত ইব্রাহিম (আ) হযরত হাজেরাকে এবং তার স্তন্যপায়ী শিশু ইসমাইলকে নিয়ে চললেন।যেখানে বর্তমান কাবা গৃহ অবস্থিত! সেখানে একটি বড় গাছের নিচে জমজম কূপের বর্তমান স্থানের উপরের অংশে তাদেরকে ছেড়ে গেলেন। এই স্থানটি তখন জনহীন বিরাণভূমি ছিলো। পানির নাম চিহ্ন পর্যন্তও ছিলো না। হযরত ইব্রাহিম এক মাশক্ (কলসি) পানি ও খেজুর তার নিকট রেখে দেন। অতঃপর মুখ ফিরিয়ে রওনা হলেন। হাজেরা তার পেছনে পেছনে বলতে বলতে চললেন যে,হযরত ইব্রাহিম (আ) আপনি আমাদেরকে উপত্যকা ভূমি ছেড়ে কোথায় যাচ্ছেন। যেখানে কোন মানুষ নেই। কোনো সহায়ও নেই,কোনো সুখ দুঃখের সাথী নেই।
হযরত ইসমাইল (আ.) এর জীবনী। আল্লাহ বলেন,‘এই কিতাবে আপনি ইসমাইলের কথা বর্ণনা করুন। তিনি ছিলেন ওয়াদা রক্ষায় সত্যাশ্রয়ী এবং তিনি ছিলেন রাসূল ও নবী’।‘তিনি তাঁর পরিবারবর্গকে সালাত ও যাকাত আদায়ের নির্দেশ দিতেন এবং তিনি স্বীয় পালনকর্তার নিকট পছন্দনীয় ছিলেন’ (সূরা:মারিয়াম ১৯/৫৪-৫৫)।
মহান আল্লাহ তা’য়ালার প্রতি অবিচল আস্থা ও বিশ্বাসের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলেন হযরত হাজেরা (আ.)।তিনি মুসলিম জাতির পিতা হজরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালামের স্ত্রী এবং পয়গাম্বর হযরত ইসমাইল জবিহুল্লাহর মাতা। আল্লাহ তা’য়ালা ইচ্ছা করলেন তাঁর প্রিয় ও পবিত্র ভূমি মক্কা নগরীকে জনবসতি ও আবাদ করবেন। সে আলোকে হযরত ইব্রাহিম (আ.)কে নির্দেশ দিলেন তাঁর প্রাণপ্রিয় দুগ্ধপোষ্য শিশু সন্তান হযরত ইসমাইল ও স্ত্রী হযরত হাজেরাকে জনমানবহীন মরুপ্রান্তর রেখে আসার জন্য। হযরত ইব্রাহিম (আ.) আল্লাহর নির্দেশ পালন করলেন। আবাদ হলো পবিত্র নগরী মক্কা। জেনে নেয়া যাক সংক্ষেপে সে ঘটনা-হযরত ইব্রাহিম (আ.) মিসর থেকে কেনআনে আসার বৎসরাধিককাল পরে প্রথম সন্তান ইসমাঈলরে জন্ম লাভ হয়। হজরত ইসমাইলের জন্মের কিছুদিন পরেই প্রাণপ্রিয় শিশু সন্তান ও তার মা হাজরোকে মক্কার জনশূন্য মরুপ্রান্তরে রেখে আসার নির্দেশ পান। এটা ছিলো হযরত ইব্রাহিম (আ.) ও হযরত হাজেরার জন্য মর্মান্তিক ও মহা পরীক্ষা।
হাদিস শরীফে বর্ণিত আছে,হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর বংশে চল্লিশ হাজার নবী-রাসূল আগমন করেছিলেন। এর মধ্যে প্রথম হযরত ইসমাইল (আ.) এবং সবার শেষে হযরত মোহাম্মদ (সা.)। ইসমাইল হলেন কোরআনে উল্লিখিত একজন ব্যক্তিত্ব এবং ইহুদিধর্ম, খ্রিষ্টধর্ম ও ইসলাম অনুসারে ইব্রাহিমের প্রথম পুত্র। আদিপুস্তক অনুসারে, তিনি ১৩৭ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। খ্রিষ্টীয় ও ইসলামি ঐতিহ্য ইসমাইল ইসমাইলীয় ও আরব জাতির পূর্বপুরুষ এবং কায়দারের পিতৃকুলপতি বিবেচনা করে। মুসলিম ঐতিহ্য অনুসারে নবী ইসমাইল ও তাঁর মাতা হাজেরা মক্কার কাবার নিকটে অর্ধবৃত্তাকার হিজর ইসমাইল দেয়াল দ্বারা সীমানির্দেশিত অঞ্চলে সমাহিত রয়েছেন।

লেখকঃ গবেষক,সাবেক জাতীয় ক্রীড়াবিদ,
চেয়ারম্যান গ্রিন ক্লাব,মানিকগঞ্জ,সাংবাদিক ও কলামিস্ট