কালের স্রোতে হারিয়ে যাচ্ছে স্রোতস্বিনী কাপনা নদী

মো.আলতাফ হোসেন ঃঃ
কাপনা নদী বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সিলেট জেলার একটি নদী। নদীটির দৈর্ঘ্য ২৭ কিলোমিটার, গড় প্রস্থ ৭৮ মিটার এবং নদীটির প্রকৃতি সর্পিলাকার। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড বা “পাউবো” কর্তৃক কাপনা নদীর প্রদত্ত পরিচিতি নম্বর উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নদী নং ১১। এ নদীর দক্ষিণ পাশেই রাতারগুল জলাবন অবস্থিত।
এক সময়ের স্রোতস্বিনী সিলেটের জৈন্তাপুরের কাপনা শুকিয়ে এখন কোথাও ক্ষেত, আবার কোথাও নালার চেহারা নিয়েছে। এলাকাবাসীরা এখন এ নদীকে নদী নয়, কাপনাকে ডাকে ‘মরা খাল’ বলে। সিলেট জেলার বিভিন্ন উপজেলার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে বিভিন্ন নদ-নদী। তার মধ্যে সিলেট গোয়াইনঘাটে ৬টি ১। গোয়াইন নদী ২। পিয়াইন নদ ৩। সারী নদী ৪। পুরকচি নদী ৫। কাপনা নদী ৬। ডাকসা নদী দক্ষিণ সুরমা ৪টি- ১। সুরমা নদী ২। বাসিয়া নদী ৩। বড়রাখা নদী ৪। বেটুয়া নদী সিলেট সদরঃ ১টি ১। সুরমা নদী ফেঞ্চুগঞ্জ ২টিঃ ১। কুশিয়ারা নদী ২। জুরী নদী বিয়ানীবাজার ২টিঃ ১। কুশিয়ারা নদী ২। সোনাই নদী জকিগঞ্জ ২ টিঃ ১। সুরমা ২। কুশিয়ারা জৈন্তাপুর ৬টিঃ ১। সারি নদী ২। বড়গাং নদী ৩। ধামাই নদী ৪। ক্ষেপা নদী ৫। কাটা নদী ৬। মরাকাপনা বালাগঞ্জ ২টিঃ ১। কুশিয়ারা নদী ২। বড়ডারগা নদী কোম্পানিগঞ্জ ২টিঃ ১। ধলাই নদী ২। পিয়াইন নদী কানাইঘাট ১টিঃ ১। সুরমা নদী বিশ্বনাথ ৭টিঃ ১। সুরমা নদী ২। বাসিয়া ৩। বাজাসিং ৪। মাকুন্দ ৫। কাপনা ৬। ব্রাক্ষণা ৭। হাটখোলা গোলাপগঞ্জ ৩টিঃ ১। সুরমা নদী ২। কুশিয়ারা নদী ৩। কুড়া নদী ওসমানীনগর ১টিঃ ১. কুশিয়ারা নদী।
এক সময় দেশের হাওর, বিল, জলাশয়সহ নদ-নদীতে এ মাছ প্রচুর পরিমাণে দেখা গেলেও এখন আর পাওয়াই যাচ্ছে না। পাওয়া যাচ্ছে না সিলেট জেলার কাপনা নদীর ঐতিহ্যবাহী মাছগুলো। রাম টেংরা বিশেষত সিলেট বিভাগে পরিচিত মাছগুলোর একটি। এ অঞ্চলের জলাশয়ে এ মাছ পাওয়া যেত। কিন্তু সেসব আজ স্মৃতি।
সিলেট বিভাগের অর্ধশতাধিক নদ-নদী বিপন্নের পথে। বিপন্নের পথে ঐতিহ্যবাহী কাপনা নদীটি। উৎসমুখসহ বিভিন্ন স্থানে এসব নদ-নদী ভরাট হয়ে গেছে। এতে ভাটির জনপদে নৌপথ বন্ধ, চাষবাসে সংকট, অর্থনৈতিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। নদী হারাচ্ছে তার বৈশিষ্ট্য, অন্যদিকে দূষণের মাত্রাও বাড়ছে। বিশেষ করে পানিতে বর্জ্য মিশ্রণের ফলে ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে ভাটির জনপদের নদীগুলো। তীরবর্তী জনপদের জীবন-জীবিকা বদলে যাচ্ছে। বিলীন হচ্ছে জীববৈচিত্র্য। হ্রাস পাচ্ছে মাছের উৎপাদন।
স্রোতস্বিনী কাপনা ছাড়াও সিলেট বিভাগের প্রধান নদী সুরমা, কুশিয়ারা, খোয়াই, মনু, ধলাই, পিয়াইন, সারি, সুতাং, রত্না, সোনাই, করাঙ্গী, ঝিংড়ি, ভেড়ামোহনা, রক্তি, কালনী, বৌলাইসহ বেশকিছু নদ-নদীর নাব্য হারিয়ে গেছে। নদী ভরাটের কারণে বোরো চাষীরা হাহাকার করেন এই মৌসুমে। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য সুরমা ও কুশিয়ারা এখন যৌবনহারা। বদলে গেছে সিলেটের কয়েকটি অঞ্চলের মানচিত্র।
নদীমাতৃক এই বাংলাদেশের সৃষ্টি হয়েছিলো হিমালয় থেকে ছুটে আসা অসংখ্য নদ-নদীর প্রবাহ থেকে। যে প্রবাহের সাথে বহমান বিন্দু বিন্দু পলিমাটি হাজার হাজার বছর ধরে গড়ে তুলেছিলো পৃথিবীর বৃহত্তম এই ব-দ্বীপ। এ দেশের মানুষের জীবন-জীবিকা সবকিছুতেই রয়েছে নদীর প্রভাব। একসময় এই নদীর বুকেই ভেসে গিয়েছে বড় বড় বানিজ্যিক জাহাজ। নদীর পাড়ে মানুষের জীবন-জীবিকা নিয়ে তৈরী হয়েছে গান, কবিতা, উপন্যাস ও চলচ্চিত্র। মুলত তিব্বতী ভাষায় বঙ্গ অর্থ ভেজা। আবার বাংলায় বঙ্গ শব্দটি বহন এবং ভাঙ্গার সাথে জড়িত। তাই বঙ্গ একসাথে বহন করে উপরের পানি ও পলিমাটি আবার সেটা বিভিন্ন পথে ভাঙ্গনের সৃষ্টি করে। তাই এ দেশের অন্য নাম হল বঙ্গ দেশ। তবে সেসব এখন অতীত। বাংলাদেশ এখন নদী বিপর্যয়ের দেশ। দেশের আড়াই শতাধিক ঐতিহ্যবাহী, নান্দনিক নদ নদী মরে গেছে। অনেকগুলো বেদখল হয়েছে। অস্তিত্ব বিপন্ন হয়েছে। এভাবেই দেশের প্রায় ৯৯% নদী তাদের নাব্যতা, গভীরতা, আকার আকৃতি হারাচ্ছে। বিপর্যস্ত হচ্ছে পরিবেশ। হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্য।
নদ-নদী নয় খাল, বিল, জলাশয়সহ সব জলাধারকে দখলমুক্ত করে এতে পানি ধারণ না করলে দেশ অপূরণীয় ক্ষতির দিকে অগ্রসর হবে। দেশের প্রায় তিন কোটি লোকের জীবিকা সংকটে পড়বে। জলবায়ু উদ্বাস্ত হবে উপকূলীয় এলাকার কোটি কোটি মানুষ। দেশ থেকে হারিয়ে যাবে জীববৈচিত্র্য, মৎস্য প্রজাতি এবং বিপন্ন হবে প্রাকৃতিক পরিবেশ।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড এর হিসাব অনুযায়ি বাংলাদেশে নদীর সংখ্যা এখন ৪০৫টি। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদী ১০২টি, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের নদী ১১৫টি, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নদী ৮৭টি, উত্তর-কেন্দ্রীয় অঞ্চলের নদী ৬১টি, পূর্ব-পাহাড়ি অঞ্চলের নদী ১৬টি এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের নদী ২৪টি হিসেবে বিভাজন করে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। দেশের অর্থনীতিতে নদীর গুরুত্ব অপরিসীম। নদীর বয়ে আসা পলিমাটিতেই বাংলাদেশের কৃষিজমি অত্যন্ত উর্বর। কৃষিনির্ভর অর্থনীতিতে নদীই ভরসা। সেচ আর বিদ্যুতের জন্যও নদীর দরকার।
নদী ও পরিবেশ গবেষকরা মনে করেন,বৈশি^ক উষ্ণায়নের প্রভাবে বাংলাদেশের যে ভয়াবহ দুর্যোগ আনছে,তার মধ্যে নদী হত্যা এর অন্যতম কারণ।অবৈধভাবে নদী দখল,হাসপাতালের বর্জ্য, শিল্পকারখানার বর্জ্য, পলিমাটি, পলিথিন ব্যাগ, প্লাষ্টিক, মল মুত্রসহ সকল প্রকার আবর্জনা ফেলে নদী ভরাট ও দূষণ করা হচ্ছে। প্রকৃতি নয়, মানব সৃষ্ট দূষণের কবলে পড়ে গত ৩ যুগে প্রায় ১৮ হাজার কিলোমিটার নদী পথ বিলীন হয়েছে। নদী মরে যাওয়ায় জলবায়ুর পরিবর্তন হচ্ছে। যে কারণে সময়মত বৃষ্টিপাত হয় না এবং নদীতে পানি না থাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে গেছে।
কালের আবর্তনে দখল আর দূষণের কবলে পড়ে আশীর্বাদের কাপনা নদী এখন মৃত্যু প্রহর গুণছে। দেশের অন্যান্য জেলার মতো সিলেট জেলার কাপনা নদী ও নাব্য হারিয়েছে যেসব নদী দখল-দূষণ রয়েছে সেসকল নদ-নদীকে বাঁচাতে সরকারের পাশাপাশি আমাদের সকলের এগিয়ে আসতে হবে। দেশের নদী খনন অত্যন্ত জরুরি। তার কারণ আমাদের ২৪ হাজার কিলোমিটার নদীপথের মধ্যে এখন মাত্র ৫ হাজার কিলোমিটার নদীপথ আছে। সরকার ইতিমধ্যে ৮০০ কিলোমিটার নদীপথ খননের কাজ হাতে নিয়েছে। এখন বড় প্রকল্পগুলো হাতে নেয়ায় নদীর নাব্যতা ফিরে পাবে এটা দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক দিক।
নদী হলো খাতের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত জলধারা। নদী সমার্থক শব্দ-তটিনী,তরঙ্গিনী,সরিৎ ইত্যাদি। সাধারণত মিষ্টি জলের একটি প্রাকৃতিক জলধারা যা ঝরণাধারা, বরফগলিত স্রোত অথবা প্রাকৃতিক পরিবর্তনের মাধ্যমে সৃষ্ট হয়ে প্রবাহ শেষে সাগর, মহাসাগর, হ্রদ বা অন্য কোনো নদী বা জলাশয়ে পতিত হয়। ১৭৮৩ সালে জেমস রেনেল অংকিত বাংলাদেশের মানচিত্র যে নদী-নালাগুলোর বিবরণ রয়েছে বর্তমানে সেগুলি চিহ্নিত করা কষ্টসাধ্য। নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে এবং পরিত্যক্ত গতিপথ ভরাট হয়ে পুরানো নদীপথের চিহৃ মুছে গেছে। আবার একই নদীর গতিপ্রবাহ ভিন্ন ভিন্ন স্থানে ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত। আমাদের ভাব প্রকাশের বাহন মাতৃভাষা বাংলা আর জলধারার বাহক বাংলার নদ-নদী পরস্পরের প্রকৃষ্ঠ উপমান। নদ-নদী সুরক্ষা নিয়ে দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে এখনো তৎপরতা দেখা যায় না অনেকেরই।দেশকে বাঁচাতে আমাদের সকলের গণসচেতনতা জরুরি।তাছাড়া নদ-নদী উদ্ধারে সরকারের সুষ্ঠু পরিকল্পনায় দেশের বিভিন্ন নদ-নদী ফিরে পাচ্ছে প্রাণ। এভাবে অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে সরকারের পাশাপাশি আমাদের সকলের এগিয়ে আসতে হবে।
বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। নদ-নদী এ দেশের সবচেয়ে মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ। নদ-নদী যোগাযোগব্যবস্থায় রাখছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। চাষাবাদের পানি সেচে নদ-নদীর ভূমিকা অসামান্য। নদ-নদী থেকে আহরিত মাছ দেশবাসীর আমিষ চাহিদার এক বড় অংশ মেটায়। দেশের নদ-নদীর দৃষ্টিনন্দন সৌন্দর্যকে ব্যবহার করা গেলে পর্যটককদের কাছে বাংলাদেশ আকর্ষণীয় গন্তব্যস্থলে পরিণত হবে। অর্জিত হবে বৈদেশিক মুদ্রা। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, জনসচেতনতার অভাবে দেশের নদ-নদীগুলো অস্তিত্ব হারাচ্ছে। দেশের নদ-নদী সুরক্ষায় জনবলের স্বল্পতা এবং অন্যান্য সীমাবদ্ধতাকে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করানো হলেও আসল সমস্যা দায়বদ্ধতার অভাব। এ ব্যাপারে জনপ্রতিনিধিসহ প্রশাসনকে সক্রিয় হতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও পালন করতে হবে নজরদারির ভূমিকা।
নদীকে কেন্দ্র করে যুগে যুগে রচিত হয়েছে কালজয়ী সব গান। বারবার লেখক-কবির লেখায় স্থান পেয়েছে নদী। রচিত হয়েছে নদী ও নদীপারের মানুষের জীবনসংগ্রাম নিয়ে পদ্মানদীর মাঝির মতো কালজয়ী উপন্যাস। কিন্তু দখল-দূষণ,ভরাট ও বালু উত্তোলনের কারণে আজ নদী বিলুপ্ত ও নজরদারির অভাবসহ নানা কারণে নদীমাতৃক দেশের আজ করুণ অবস্থা। নদ-নদী এখনো প্রবাহমান রয়েছে সেসব নদনদী রক্ষার উদ্যোগ কর্তৃপক্ষকে আশু নিতে হবে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় নদ-নদীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। যদি নদীগুলো এভাবে তাদের অস্তিত্ব হারাতে থাকে তাহলে অচিরেই পরিবেশের ভারসাম্য মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হবে। যা আমাদের চিরায়ত জলবায়ুর বিরুদ্ধে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে। আর এ সব কারণেই দেশের নদী দখলকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে থেকে দখলমুক্ত করতে হবে। নদী পথকে আরও আধুনিকায়ন ও সড়কপথের তুলনায় গুরুত্ব দিতে পারলে যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও সহজ হতো। আমাদের জনজীবনে নদীর গুরুত্ব অনুধাবন করতে হবে। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি পর্যায়েও নদী রক্ষার জন্য সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। দেশের মধ্যে প্রবহমান অন্যান্য নদ-নদীর মতো উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সিলেট জেলার কাপনা নদীকে বাঁচাতে সকলকে এগিয়ে আসতে হবে।

লেখকঃ সাবেক জাতীয় ক্রীড়াবিদ(কারাতে ব্লাক বেল্ট ১ম ড্যান),সভাপতি শারীরিক শিক্ষাবিদ সমিতি,
চেয়ারম্যান গ্রিন ক্লাব,শিক্ষক, গবেষক,সাংবাদিক ও কলামিস্ট