কুফর হলো আল্লাহকে অস্বীকার করা যা ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ

 

মো.আলতাফ হোসেন ঃঃ
কুফর আরবী শব্দ। কুফর অর্থ গোপন করা, অবিশ্বাস করা, অমান্য করা, অবজ্ঞা করা, অকৃতজ্ঞ হওয়া, বিশ্বাস ঘাতকতা করা, ইত্যাদি । পবিত্র কোরআনে কুফর শব্দটি অনেক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।

কুফর শব্দটি বিশ্বাস ঘাতকতা অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। এরশাদ হয়েছে, তাদের (ইয়াহুদদের) থেকে কুফর (বিশ্বাস ঘাতকতা ও হত্যা পরিকল্পনা ) অনুধাবন করে ঈসা বললো কে আল্লাহর পথে আমাকে সাহায্য করবে? হাওয়ারীগন বললো আমরা আল্লাহর সাহায্যকারী আমরা আল্লাহর ওপর ঈমান এনেছি। আপনি সাক্ষী আমরা মুসলিম। (আল ইমরান ৫২)
যে ব্যক্তি সুষ্পষ্ট কুফর করে সে কাফির। তাকে কাফির বলা হয়, কাফির হিসাবে দেখা হয়। তাকে কাফির জেনো, কাফির বুঝে কাফির হিসেবেই সামাজিকতা ও লেনদেন করা হয়। যে মুসলমান এমন কুফর করলো সে ইসলাম থেকে বেরিয়ে গেলো। ইসলামের সাথে তার কোনো সম্পর্ক থাকলো না । কোনো নেতা এমন কুফর করলে সে মুসলামানদের নেতা থাকতে পারে না। তার সাথে অসহযোগ ও বিদ্রোহ করা ওয়াজিব হয়ে যায়। ইহাই আল্লাহর হুকুম।
কুফর শব্দটি গোপন করা অর্থে ব্যবহৃত হবার নমুনা। এরশাদ হচ্ছে, জেনে রেখো! দুনিয়ার জীবন খেল তামাশা , অহমিকা, শোভা, ধন ও জনের প্রতিযোগিতা বৈ কিছুই নয়।(জীবনের উপমা) যেনো ওই মেঘমালা যার উৎপাদনে (কুফফার) কৃষকগণ মুগ্ধ হয়ে গেলো অতপর উৎপন্ন ফসলে মরণ শুরু হলো। হলুদবর্ণ ধারণ করে খড় কুঠায় পরিণত হলো।(হাদীস-২০) উক্ত আয়াতে কুফর শব্দটি গোপন করার অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে । কৃষকগণ বুঝতে শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে কুফফার কৃষকরা শস্য বীজ মাটিতে পুতে রাখে বিধায় তাদের কুফফার বলা হয়েছে।
কুফর শব্দটি অমান্য করার অর্থে ব্যবহৃত হরার নমুনা সম্পর্কে এরশাদ হয়েছে,ইহাই আ’দ (জাতি)। যারা আল্লাহর বিধান অমান্য (কুফর) করেছে, রাসূলের বিরোধিতা করে অবাধ্য দাম্ভিক নেতাদের মেনে নিয়েছে, ফলে দুনিয়া ও আখেরাতে তাদের পিছু নিয়েছে। জেনে রেখো! আ’দ আল্লাহর সাথে কুফর করেছে, জেনে রেখো! হুদের জাতি আ’দ ধ্বংস হয়ে গেছে। ( হুদ ৫৯-৬০)
কুফর শব্দটি অকৃতজ্ঞ অর্থে ব্যবহৃত হবার নমুনা। এরশাদ হয়েছে,‘‘যে শুকর করলো কৃতজ্ঞ হলো সে নিজের কল্যান করলো আর যে কুফর করলো অকৃতজ্ঞ হলো তার জানা উচিত তোমার প্রভু মহিয়ান,সকল প্রয়োজনের উর্ধ্বে।’’ (সূরা নামল: আয়াত-৪০)
কুফর শব্দটি অবজ্ঞা অর্থে ব্যবহৃত হবার নমুনা। এরশাদ হয়েছে,‘‘আল্লাহ একটি জনপদের বর্ণনা দিচ্ছেন। জনপদটি শান্ত ও নিরাপদ ছিলো। জীবনের তাগিদে প্রায়োজনীয় সবকিছু তথায় বিদ্যমান ছিলো। কিন্তু জনপদের লোকজন আল্লাহর নিয়ামতের কুফর (অবজ্ঞা) করলো। ফলে আল্লাহ তাদের ক্ষুধা ও ত্রাসের স্বাদ আস্বাদন করালেন। এসব তাদেরই কর্মফল।’’ নাহল: ১১২)
বস্তুত যা ঈমান ও ইসলামের বিপরীত তা-ই হলো ‘কুফর’। কুফরের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে ঢেকে রাখা। আচ্ছাদিত করা, গোপন করা, অস্বীকার করা, অকৃতজ্ঞতা জানানো। আর ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় কুফর হলো, জরুরিয়াতে দ্বীন তথা ইসলামের অত্যাবশ্যকীয়, সুস্পষ্ট, সর্বজনবিদিত বিষয়াবলিকে অস্বীকার করা অথবা তন্মধ্য থেকে কোনো একটি বিষয় অস্বীকার করা। আর ঈমানের বিপরীত কুফর হলো, যে বিষয়ে ঈমান বা আন্তরিক বিশ্বাস থাকা আবশ্যক, সেখানে ঈমান না থাকা। (শরহুল মাকাসিদ : খন্ড ৩, পৃ. ৪৫৭)।
কাফিররা কুফর করে, অপকর্ম করে, রাতদিন পাপাচারে ডুবে থাকে। তথাপিও তারা খুশি ও আনন্দিত হয়। তারা নিজেদেরকে খুব ভালো ও সৎ ভাবে। তারা মনে করে তাদের মতো ভালো ও সৎ মানুষ জগতে বিরল। কারণ তাদের পাপকে সুন্দর ও শোভিত করে উপস্থাপন করা হয়। ফলে তারা পাপকে পাপ মনে করে না, নিজেদের অপরাধকে অপরাধ ভাবে না । এরশাদ হয়েছে,কাফিরদের চক্রান্ত ও আল্লাহর পথে বাধা দেয়াকে শোভিত করে দেয়া হয়। (সূরা রা’দ: আয়াত-৩৩)
‘কুফর’ ও ‘কাফের’ শব্দের ব্যবহার বহুলাংশে বেড়েছে। কেননা, মুসলমান রাজা-বাদশাহদের দ্বারা শাসিত রাষ্ট্রগুলোতে ব্যক্তিবিশেষের প্রতি ‘কুফর’ ও ‘কাফের’ শব্দের ব্যবহার ঢালাওভাবে করা হচ্ছে। বাছ নেই, বিচার নেই, শরয়ী প্রমাণের বালাই নেই, যত্রতত্র রাজানুগত্য প্রদর্শনের আলখাল্লাহ গায়ে দিয়ে এক শ্রেণির মানুষ উল্লিখিত শব্দ দু’টির দ্বারা অন্যকে হেয়, ইসলাম থেকে খারিজ প্রতিপন্ন করার লক্ষ্যে অপতৎপরতায় মেতে উঠেছে।
ইসলাম পরিপন্থি কুফরঃ অনেক মানুষ আল্লাহ মানে না, রাসূল মানে নাম ইসলাম মানে না, কোরআন মানে নাম। তারা ইসলাম গ্রহণ না করে অন্যভাবে জীবন যাপন করে। তারা কাফির। তাদের কুফর ইসলাম পরিপন্থি। এমন কুফরকে সুস্পষ্ট কুফর বা কুফরে বাওয়াহ বলা হয়।
যারা জরুরিয়াতে দ্বীনকে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে না, মুখেও তার স্বীকৃতি দেয় না। যেমন ইসলামের প্রাথমিক যুগ থেকে অদ্যাবধিকালের সাধারণ কাফের-মুশরিক যারা, তারা অন্তরেও বিশ্বাস করে না। মুখেও স্বীকার করে না। তারা প্রকৃতই কাফের। এদের সম্পর্কে আল কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘আর কাফেররা ওইসব বিষয় হতে মুখ ফিরিয়ে রাখে,যেসব বিষয়ে তাদেরকে ভীতিপ্রদর্শন ও সতর্ক করা হয়েছে।’ (সূরা আহকাফ: আয়াত ৩)। মোট কথা, কুফরে ইনকার হলো, ঈমান ও ইসলামের বিষয়াবলি অন্তরে ও মুখে অস্বীকার করা, সত্য বলে বিশ্বাস না করা, সত্যের নিকটবর্তী না হওয়া। (ফয়জুল বারী: খন্ড ১, পৃ.৭১)।
ঈমান ও ইসলামের ক্ষেত্র এক, কিন্তু শুরু ও শেষের মধ্যে কিছুটা পার্থক্য বিদ্যমান। ঈমান অন্তর থেকে শুরু হয় এবং দৈহিক আমলে পৌঁছে পূর্ণতা লাভ করে। একইভাবে ইসলাম দৈহিক আমল থেকে শুরু হয় এবং অন্তরে পৌঁছে পূর্ণতা লাভ করে। অন্তরের বিশ্বাস প্রকাশ্য আমল পর্যন্ত না পৌঁছালে তা গ্রহণযোগ্য হয় না। অনুরূপ প্রকাশ্য আনুগত্য আন্তরিক বিশ্বাসে না পৌঁছালে গ্রহণযোগ্য হয় না। ইসলামী শরীয়াহ মতে কাউকে কাফের বলে আখ্যায়িত করা খুবই স্পর্শকাতর ও মারাত্মক একটি বিষয়। না জেনে, না বুঝে ধারণাবশত বা বিদ্বেষবশত কাউকে কাফের বলে প্রচার করা নিজের ঈমানের জন্য হুমকিস্বরূপ।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন: ‘‘একব্যক্তি জীবনভর সীমালঙ্ঘন ও পাপে লিপ্ত থাকে। যখন তার মৃত্যুর সময় উপস্থিত হয় তখন সে তার পুত্রদেরকে ওসিয়ত করে বলে যে, আমার মৃত্যু হলে তোমরা আমাকে আগুনে পুড়াবে। এরপর আমাকে বিচুর্ণ করবে। এরপর ঝড়ের মধ্যে আমাকে (আমার দেহের বিচুর্ণিত ছাই) সমূদ্রের মধ্যে ছাড়িয়ে দেবে। কারণ, আল্লাহর কসম, যদি আমার প্রতিপালক আমাকে ধরতে সক্ষম হন তবে আমাকে এমন শাস্তি দিবেন যে শাস্তি তিনি অন্য কাউকে দেন নি। তার সন্তানগণ তার ওসিয়ত অনুসারে কর্ম করে। তখন আল্লাহ যমিনকে নির্দেশ দেন যে যা গ্রহণ করেছে তা ফেরত দিতে। তৎক্ষণাৎ লোকটি পুনর্জীবিত হয়ে তার সামনে দন্ডায়মান হয়ে যায়। তখন তিনি লোকটিকে বলেন: তুমি এরূপ করলে কেনো? লোকটি বলে: হে আমার প্রতিপালক: আপনার ভয়ে। তখন তিনি তাকে এজন্য ক্ষমা করে দেন।’’
নবী করিম (সা.) এর তাকওয়া বা ইনসাফের বিষয়ে সন্দেহ পোষণ করা সুনিশ্চিত কুফর। এজন্য মাজলিসে উপস্থিত খালিদ ইবন ওয়ালীদ (রা) লোকটিকে মৃত্যুদন্ড প্রদানের অনুমতি প্রার্থনা করেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন: ‘‘না। হয়তবা লোকটি সালাত আদায় করে।’’ খালিদ (রা) বলেন: ‘‘কতো মুসল্লীই তো আছে যে মুখে যা বলে তার অন্তরে তা নেই।’’ তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘‘আমাকে নির্দেশ দেওয়া হয় নি যে, আমি মানুষের অন্তর খুঁজে দেখব বা তাদের পেট ফেড়ে দেখব।’’
মক্কা বিজয়ের পূর্বে হাতিব ইবন আবী বালতা‘আ (রা) যুদ্ধের গোপন বিষয় ফাঁস করে মক্কার কাফিরদের নিকট একটি পত্র লিখেন। পত্রটি উদ্ধার করার পর রাসূলুল্লাহ (সা.) হাতিব (রা)-কে এর কারণ জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন যে, মুনাফিকী বা কুফরীর কারণে তিনি এরূপ করেন নি, বরং নিজের পরিবারকে রক্ষা করতে এরূপ করেছেন। হাতিবের কর্ম বাহ্যত আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সা.) সাথে খিয়ানত ও কুফর ছিলো। এজন্য উমার (রা) বলেন, হে আল্লাহর রাসূল, আপনি অনুমতি দিন, আমি এ মুনাফিককে হত্যা করি। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা.) এ বিষয়ে হাতিবের বক্তব্যকেই চূড়ান্ত বলে গ্রহণ করেছেন। অর্থাৎ বাহ্যিকভাবে একটি কর্ম সুনিশ্চিত কুফর হতে পারে। তবে এরূপ কর্মে লিপ্ত মু’মিন যদি এর কোনো ওযর বা ব্যাখ্যা দেন তবে তা গ্রহণ করতে হবে।
‘‘কোনো পাপের কারণে বা আকীদাগত মতভেদীয় কোনো বিষয়ে বিভ্রান্তিতে নিপতিত হওয়ার কারণে কোনো মুসলিমকে কাফির বলা বৈধ নয়। বিদ্রোহী খারিজীদের বিরুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সা.) যুদ্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন। খলীফায়ে রাশেদ আলী (রা) তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার বিষয়ে সাহাবী, তাবিয়ী ও পরবর্তী যুগের ইমামগণ সকলেই ঐকমত্য পোষণ করেন। এতদসত্ত্বেও আলী (রা), সাদ ইবন আবী ওয়াক্কাস (রা) ও অন্যান্য সাহাবী কেউ তাদেরকে কাফির বলেননি, বরং তাদেরকে মুসলিম হিসেবে গণ্য করেছেন। হাদীসের সুস্পষ্ট বক্তব্য ও ইজমার মাধ্যমে যাদের বিভ্রান্তি প্রমাণিত তাদের বিষয়েই এরূপ বিধান। অন্যান্য বিভ্রান্ত দল-উপদলের বিভ্রান্তি আরো অনেক অস্পষ্ট। যে সকল বিষয়ে তারা সত্য থেকে বিচ্যুত হয়েছে সে সকল বিষয়ে অনেক সময় তাদের চেয়ে অধিক অভিজ্ঞ আলিমেরও পদস্খলন হয়েছে। মহান আল্লাহ ঐক্যের ও সম্প্রীতির নির্দেশ দিয়েছেন এবং বিদআত ও মতভেদ নিষেধ করেছেন।’’
‘যারা ঈমান আনার পর কুফরী করলো, তারপর তাদের কুফরী বেড়েই চললো, তাদের তাওবাহ কখনো কবুল করা হবে না এবং এ লোকেরাই পথভ্রষ্ট। যারা কুফরী করে এবং সেই কাফির অবস্থায়ই মারা যায়,তাদের কেউ পৃথিবী-ভরা স্বর্ণও বিনিময়স্বরুপ প্রদান করতে চাইলে তা তার কাছ থেকে কখনো গ্রহন করা হবে না। এরাই তারা, যাদের জন্য যন্ত্রনাদায়ক শাস্তি রয়েছে এবং তাদের কোনো সাহায্যকারী নেই।’ (সূরা: আলে- ইমরান, আয়াত: ৯০-৯১)।
‘‘কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে কাফির, ফাসিক বা পাপী বলা যাবে না। কেবলমাত্র যদি কারো বিষয়ে কোরআন-সুন্নাহর আলোকে সুনিশ্চিতভাবে কুফর, ফাসিক বা পাপাচার প্রমাণিত হয় তবেই তা বলা যাবে। আমি নিশ্চিত যে, মহান আল্লাহ এ উম্মাতের ভুল-ভ্রান্তি ক্ষমা করেছেন। আর ফিকহী মাসআলার ভুল এবং আকীদা বিষয়ক ভুল উভয় প্রকারের ভুলই এ ক্ষমার অন্তর্ভুক্ত।’’
‘‘সালাফ সালিহীন- আমাদের ইমাম আবূ হানীফাও তাঁদের অন্তর্ভূক্ত- থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, আমরা কোনো আহলু কিবলাকে কাফির বলি না। এ বক্তব্যের ভিত্তিতেই আকীদাবিদগণ মূলনীতি তৈরি করেছেন যে, শীয়া-রাফিযী, খারিজী, মুতাযিলী, মুজাস্সিমা (দেহে বিশ্বাসী) ও অন্যান্য বিভ্রান্ত ফিরকাকে কাফির বলা যাবে না। তবে কারো আকীদা বিশ্বাস যদি কুফরী পর্যন্ত পৌঁছে যায় তবে ভিন্ন কথা।’’
কাফিরদের শাস্তি কবর থেকেই শুরু হবে এ মর্মে আনাস (রা) রাসূলুল্লাহ (সা.) থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘বান্দাকে যখন কবরে রেখে তার সাথীগণ অর্থাৎ-আত্নীয়-স্বজন, পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব সেখান থেকে চলে আসে আর তখনো সে তাদের জুতার শব্দ শুনতে পায় তার নিকট (কবরে) দু‘জন ফেরেশতা পৌঁছেন এবং তাকে বসিয়ে প্রশ্ন করেন, তুমি দুনিয়াতে এই ব্যক্তির অর্থাৎ-মুহাম্মাদ (সা.) এর ব্যাপারে কী জানো? এ প্রশ্নর উত্তরে মু’মিন বান্দা বলে, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ (সা.) নি:সন্দেহে আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল। তখন তাকে বলা হয়, ওই দেখে নাও তোমার ঠিকানা জাহান্নাম কিরুপ জঘন্য ছিলো। তারপর আল্লাহ তা’য়ালা তোমার সে ঠিকানা অর্থাৎ-জাহান্নামকে জান্নাতের সঙ্গে পরিবর্তন করে দিয়েছেন। তখন সে বান্দা দু‘টি ঠিকানা (জান্নাত-জাহান্নাম) একই সঙ্গে দেখবে। কিন্তু মুনাফিক ও কাফিরদেরকে যখন জিজ্ঞেস করা হয়, দুনিয়াতে এ ব্যক্তি অর্থাৎ-মুহাম্মাদ (সা.) সম্পর্কে কী ধারণা পোষণ করতে? তখন সে উত্তরে দেয়, আমি বলতে পারি না (প্রকৃত সত্য কী ছিলো) মানুষ যা বলতো আমিও তাই বলতাম। তখন তাকে বলা হয়, তুমি বিবেক-বুদ্ধি দিয়েও চেষ্টা করোনি এবং মহান আল্লাহর কোরআন পড়েও জানতে চেষ্টা করোনি। এ কথা বলে তাকে লোহার হাতুড়ি দিয়ে কঠিনভাবে মারতে থাকে, এতে সে তখন উচ্চস্বরে চিৎকার করতে থাকে। এ চিৎকারের শব্দ পৃথিবীর জিন আর মানুষ ছাড়া নিকটস্থ সকলেই শুনতে পায়।(মুত্তাফাকুন‘আলাইহি,শব্দসমূহ বুখারী,র হা:-১৩৩৮,১৩৭৪)।
স্মরণ রাখতে হবে-ইসলাম ও ইসলামের নবী (সা.) এই বক্রতা বা গোমরাহী এবং এই বাড়াবাড়ি ও অতি-উদারতার আদৌ পক্ষপাতী নন। ইসলাম তার অনুসারীদের জন্য একটি আল্লাহপ্রদত্ত বিধান পেশ করেছে। যে ব্যক্তি ঠান্ডা মাথায় এবং সর্বপ্রকার দ্বিধা-দ্বন্দ্ব পরিহার করে তাকেই শিরোধার্য করে নেয়, সে মুসলমান। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর এই বিধানের সামান্যতম কোনো ব্যাপারকেও ইনকার বা অগ্রাহ্য করে বসে, নিঃসন্দেহে ও নির্দ্বিধায় বলা চলে, সে ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে যায়। এমন ব্যক্তিকে ইসলাম তার গন্ডির মধ্যে ধরে রাখতে চায় না। এমন ব্যক্তির দ্বারা ইসলামের পরিসর ও মুসলমান সমাজের লোকসংখ্যা বৃদ্ধি করতে ইসলাম ও মুসলিম জাতি রীতিমত অপমানবোধ করে এবং এ ধরনের স্বল্পসংখ্যক লোককে ইসলামের মধ্যে দাখিল বলে মেনে নিলে হাজারো মুসলমানের ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে যাওয়ার সমূহ আশংকা দেখা দেয়। অতীতে একাধিকবার এরূপ দেখা গিয়েছে। আর এটা এমনি একটি ক্ষতি যে, যদি প্রকৃতই এর বিনিময়ে হাজার রকমের কল্যাণও সাধিত হয়, তবুও কোনো ধর্মপ্রাণ মুসলমান তা গ্রাহ্য করতে পারে না, বিশেষত যখন সেই হাজার রকমের উপকার নিছক কাল্পনিক ও অনুমানভিত্তিক হয়।
ইরতিদাদ শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো, ফিরে যাওয়া ও বিমুখ হওয়া। শরীয়তের পরিভাষায়, ঈমান ও ইসলাম থেকে বিমুখ হয়ে যাওয়াকে ইরতিদাদ বলে আর যে বিমুখ হয় তাকে মুরতাদ বলা হয়।
শরহে মাকাসিদে আল্লামা তাফতাজানি কুফরের প্রকরণ বর্ণনা করেছেন এভাবে-এ কথা সুস্পষ্ট হয়ে গিয়েছে যে, যে ব্যক্তি মুমিন নয়, সেই কাফের পদবাচ্য। এখন যদি সে নিজেকে মুসলমান বলে বাহ্যত দাবি করে তবে এমন ব্যক্তিকে মুনাফিক বলা হবে। আর যদি মুসলমান হওয়ার পর কুফরীতে লিপ্ত হয় তবে তাকে বলা হবে মুরতাদ। কেননা, সে ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে গেছে। আর যদি সে ইহুদী ধর্ম, খ্রিস্ট ধর্ম প্রভৃতি মানসূখ বা রহিত ধর্ম অবলম্বন করে তবে তাকে বলা হবে কিতাবী। যদি সে ব্যক্তি মনে করে যে, এই বিশ্ব চরাচর অনাদিকাল থেকে (কোনো স্রষ্টা ও নিয়ন্তা ছাড়াই) এমনিতেই চলে আসছে এবং যুগচক্রেই সব এমনিতে ঘটে চলেছে, তবে তাকে বলা হবে দাহরিয়া। আর যদি সে স্রষ্টার অস্তিত্বই আদৌ স্বীকার না করে, তবে তাকে বলা হবে মু’আত্তিল। যদি নবী করীম (সা.)এর নবুওয়াত ও ইসলামের প্রতীকরূপী সওম-সালাতের স্বীকারোক্তির সাথে সাথে এমন কিছু বিশ্বাসও পোষণ করে, যা সর্ববাদীসম্মতরূপে কুফর বলে স্বীকৃত, তবে এমন ব্যক্তিকে বলা হবে যিন্দীক।-শরহে মাকাসিদ : ২/২৬৮-৬৯ ও কুল্লিয়াতু আবিল বাকা : ৫৫৩-৫৪)
যিন্দীকের সংজ্ঞা বর্ণনাকালে বলা হয়েছে যে, সে তার বাতিল বিশ্বাস অন্তরে পোষণ করে, তার অর্থ এই নয় যে, সে মুনাফিকদের মতো তার অন্তরের বিশ্বাসকে গোপন রাখে; বরং তার অর্থ এই যে, সে তার কুফরী আকীদা ও বিশ্বাসসমূহকে ইসলামের ছদ্মাবরণে চাকচিক্যময় করে পেশ করে।
যারা আল্লাহ যে বিধান দিয়েছেন তা অনুযায়ী শাসন করে না এবং মানব রচিত আইন দ্বারা শাসন করে, অথবা তাদের খেয়াল খুশি ও ঐতিহ্য অনুযায়ী করে, তাহলে তারা কাফির ও মুশরিক। আল্লাহ বলেনঃ (ভাবানুবাদ) “তিনি কাউকে নিজ কর্তৃত্বে শরীক করেন না”। (সূরা কাহাফ, আয়াত ২৬) আল্লাহ আরও বলেন, “নির্দেশ চলে আল্লাহর”। (সূরা ইউসুফ, আয়াত ৬৭)
আল্লামা শামী (রহ.) বলেন, যিন্দীক তার ধর্মদ্রোহী মতকে নিখুঁত রূপ দিতে ও প্রতিষ্ঠিত করতে আগ্রহী থাকে এবং সে তাকে নিখুঁতরূপে পেশ করে। যিন্দীকের সংজ্ঞা বর্ণনা করতে গিয়ে বলা হয় যে, সে তার কুফর গোপন করে। তার অর্থ এই যে, সে তার কুফরকে এমনভাবে পেশ করে যে, মানুষ তার ব্যাপারে বিভ্রান্ত হয়। এ জন্য তার কুফর গোপন করা প্রকাশ করারই নামান্তর। (শামী : ৩/৪৫৮)
ইজমা অনুযায়ী তাদের কুফর হচ্ছে বড় কুফর (কুফর আল আকবার)। আর এ ইজমার ব্যাপারে ইবনে কাসির ও আধুনিক যুগের আহলে সুন্নাতের অনেক উলামা বর্ণনা করেছেন। আল্লাহ বলেন, “যে সব লোক আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তদানুযায়ী ফায়সালা করে না তারাই কাফির”। (সূরা মায়িদা, আয়াত ৪৪) আল্লাহ আরও বলেন,“আপনি কি তাদেরকে দেখেন নি যারা দাবী করে যে, যা আপনার প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে আমরা সে বিষয়ের ওপর ঈমান এনেছি এবং আপনার পূর্বে যা অবর্তীণ হয়েছে। তারা বিরোধীয় বিষয়কে তাগুতের দিকে নিয়ে যেতে চায়, অথচ তাদের প্রতি নির্দেশ হয়েছে যাতে তারা ওকে মান্য না করে। পক্ষান্তরে, শয়তান তাদেরকে প্রতারিত করে পথভ্রষ্ট করে ফেলতে চায়”। (সূরা নিসা, আয়াত ৬০) এবং আল্লাহ বলেন,“তাদের কি এমন শরীক দেবতা আছে যারা তাদের জন্যে সে ধর্ম সিদ্ধ করেছে যার অনুমতি আল্লাহ দেন নি? যদি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না থাকত তবে তাদের ব্যাপারে ফয়সালা হয়ে যেতো। নিশ্চয়ই জালিমদের জন্যে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি”। (সূরা শুরা, আয়াত ২১)
কোরআনের পাশাপাশি রাসূল (সা.)-এর পবিত্র হাদিস শরিফেও কুফর বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা যখন বিয়ের উদ্দেশ্যে তোমাদের পছন্দমতো ধার্মিক ও জ্ঞানী-বুদ্ধিদীপ্ত পাত্র-পাত্রী পেয়ে যাবে তখন বিয়ে করতে দেরি করিও না।’ (তিরমিজি)। আরেক হাদিসে রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা বিয়ের জন্য উপযুক্ত পাত্রী নির্বাচন করো এবং সাদৃশ্য ও সমতা লক্ষ্য রেখো।’ (ইবনে মাজাহ)। এ হাদিসের আলোকে ইমাম শাওকানি (র.) বলেন, ‘বিয়ের ক্ষেত্রে পাত্র বা পাত্রীর ধর্ম ও চারিত্রিক বিষয়টি অবশ্যই লক্ষ্য করতে হবে। (নায়লুল আওতার : ৬/২৬২)। কুফর বা সমতার ক্ষেত্রে দীনদারির বিষয়টিই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। ইমাম শাফেয়ি (র.) সম্পদ এবং ইমাম আজম (র.) বংশ মর্যাদাকেও কুফর অন্তর্ভুক্ত করেছেন।
সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো ঈমান। ঈমানের বিপরীত কুফর। ঈমান সত্য, কুফর মিথ্যা। ঈমান আলো, কুফর অন্ধকার। ঈমানই জীবন, কুফর মৃত্যুতুল্য। ঈমান সরল পথ, আর কুফর ভ্রষ্টতার রাস্তা। ঈমান শুধু মুখে কালেমা পড়ার নাম নয়, ইসলামকে তার সব অপরিহার্য অনুষঙ্গসহ মনেপ্রাণে গ্রহণ করার নাম ঈমান। ঈমান হলো, ওহি বা আসমানি প্রত্যাদেশের মাধ্যমে জানা সব কিছুকে সত্য বলে বিশ্বাস করা। অজ্ঞতা-অনুমান আর কল্পনা-কুসংস্কারের কোনো অবকাশ ঈমানে নেই। ঈমান অবিচল বিশ্বাসের নাম।

লেখকঃ সাবেক জাতীয় ক্রীড়াবিদ,সভাপতি শারীরিক শিক্ষাবিদ সমিতি
চেয়ারম্যান গ্রিন ক্লাব,লেখক,গবেষক,সাংবাদিক ও কলামিস্ট