খাদ্য ও পুষ্টি একে অপরের পরিপূরক

 

মো.আলতাফ হোসেন ঃঃ
খাদ্য ও পুষ্টি একে অপরের পরিপূরক।শরীরের চাহিদার জন্য আমাদের খাদ্যকে বিবেচনা করা হয়। ভালো স্বাস্থ্যের মূল ভিত্তি হলো পুষ্টিকর খাবার ও শরীর চর্চা। যখন কোন মানুষের খাদ্য ও পুষ্টি জ্ঞানের অভাব দেখা দেয় বা আর্থিক অভাব দেখা দেয় তখন রোগের বৃদ্ধি হয়, শারীরিক এবং মানসিক উন্নয়নে বাধা পায়। যে কারণে আমাদের খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞান সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান থাকতে হবে। অর্থাৎ যে পদার্থ খাওয়ার মাধ্যমে জীবন বাঁচানো থেকে শুরু করে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখে সেটাকে খাদ্য বলা যায়। অন্যভাবে বললে, খাদ্য হলো এমন উপাদান বিশেষত কার্বোহাইড্রেট, ফ্যাট এবং প্রোটিন যা একটি জীবকে শক্তি,বৃদ্ধি, এবং জীবনের প্রক্রিয়া বজায় রাখার জন্য ব্যবহার হয়। আসলে আমাদের প্রয়োজন দৈহিক, মানসিক আর বুদ্ধিবৃত্তির প্রয়োজনে খাদ্য গ্রহণ।
পুষ্টি এমন একটি শক্তি যা সঠিক পরিমানে পুষ্টিকর খাবার গ্রহনের মাধ্যমে তৈরি হয়। অন্যভাবে বললে,পুষ্টি হলো বিজ্ঞান ও গবেষণার মাধ্যমে প্রাপ্ত জ্ঞান যা খাদ্য এবং পুষ্টি শক্তির সাথে সম্পর্কিত। পুষ্টি হলো কোন খাদ্যটি পুষ্টিকর কিনা বা পুষ্টিকর হওয়ার সব নিয়ম মেনে চলে কিনা? পুষ্টি আমাদের দৈহিক গঠন তৈরিতে ও সুস্থ্য থাকতে সাহায্য করে।
বাংলাদেশ খাদ্য উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও শিশু ও মাতৃপুষ্টি নিশ্চিতকরণ এবং ব্যক্তিগত ও পারিবারিক পর্যায়ে বৈচিত্র্যপূর্ণ খাদ্যের সমন্বয়ে পরিপূর্ণ পুষ্টি সমৃদ্ধ খাদ্য গ্রডহণ এখনও বিরাট চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে শিশু পুষ্টির জন্য মায়ের দুধ পান ও পরিপূরক খাবার গ্রহণের হার এখনো অপ্রতুল। ব্যক্তির খাবারে খাদ্য উপাদান যথাযথ পরিমাণে না থাকা বা অতিরিক্ত থাকা অপুষ্টি এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত হওয়ার প্রধান কারণ। সুষম খাদ্য নির্বাচন ও গ্রহণের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি রোগগুলো সহজেই প্রতিরোধ করা সম্ভব।
খাদ্য গ্রহণের সাথে জড়িত অপুষ্টি এবং খাদ্য সংক্রান্ত দীর্ঘমেয়াদি রোগের হার কমানোর লক্ষ্যে বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে, নিজস্ব খাদ্যাভ্যাসের সাথে মিল রেখে প্রতিটি দেশের একটি খাদ্য গ্রহণ নির্দেশিকা থাকা প্রয়োজন। জাতীয় খাদ্য ও পুষ্টিনীতি এবং বাংলাদেশ জাতীয় পুষ্টি পরিকল্পনা ১৯৯৭ এর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিলো খাদ্য গ্রহণ নির্দেশিকা প্রকাশ। খাদ্য সংক্রান্ত দীর্ঘমেয়াদি রোগগুলোর মৃত্যুহার অপুষ্টিজনিত মৃত্যুর হারের চেয়ে বহুগুণ বেশি। এজন্য বাংলাদেশ জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষি ও পুষ্টি সংক্রান্ত বিনিয়োগ পরিকল্পনায় (২০১১-২০১৫) এবং জাতীয় পুষ্টিনীতি ২০১৫ তে জাতীয় খাদ্য গ্রহণ নির্দেশিকা প্রকাশকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়। এছাড়াও জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রতিটি জাতিকে নিজস্ব খাদ্য গ্রহণ নির্দেশিকায় বিশেষ কতগুলো তথ্যযুক্ত করার পরামর্শ দেয়। সাম্প্রতিক খাদ্যের অভাবজনিত অপুষ্টির চিত্র, খাদ্য সংক্রান্ত দীর্ঘমেয়াদি রোগের হার,সাম্প্রতিক খাদ্য গ্রহণের ধরণ এছাড়াও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রকাশিত বিভিন্ন বয়সের খাদ্য উপাদানের চাহিদা, মৌসুমি খাবার এসব অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে বর্তমান খাদ্য উপাদানের চাহিদা, মৌসুমি খাবার অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে বর্তমান খাদ্য নির্দেশনা করা হয়েছে। গবেষণালব্ধ জ্ঞানের ভিত্তিতে প্রণীত খাদ্য গ্রহণ নির্দেশনা উন্নত পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণে সাহায্য করবে।
আঞ্চলিক খাদ্যাভাসের সাথে খাদ্য বৈচিত্র্যকে প্রাধান্য দেয়া দরকার। মৌলিক খাদ্যগুলো অর্থাৎ ভাত,রুটি,মাছ, মাংস,দুধ ডিম,ডাল,শাকসবজি ও ফলমূল সঠিক পরিমাণে গ্রহণ করতে হবে। খাদ্য গ্রহণ প্রক্রিয়ায় খাদ্য বিনিময় ও পরিবেশনের ওপর গুরুত্ব দেয়া জরুরি। সুস্বাস্থ্য বজায় রাখার জন্য প্রত্যেক খাদ্য বিভাগ থেকে পরিমিত পরিমাণে খাদ্য গ্রহণকেই প্রাধান্য দেয়া উচিত। পুষ্টিসম্মত খাদ্য গ্রহণের লক্ষ্যগুলো হলো- বাংলাদেশের জনগণের পুষ্টিগত অবস্থার উন্নয়ন এবং পুষ্টি উপাদনের অভাবজনিত রোগগুলো প্রতিরোধ করা; গর্ভবতী ও স্তন্যদাত্রী মায়েদের যথাযথ পুষ্টিগত অবস্থা বজায় রাখা; শিশুদের সঠিকভাবে মায়ের দুধ ও পরিপূরক খাবার খাওয়ানো নিশ্চিত করা; খাদ্যাভ্যাসের সাথে সম্পর্কিত দীর্ঘমেয়াদি রোগগুলো প্রতিরোধ এবং নিয়ন্ত্রণ করা; বয়স্কদের সুস্বাস্থ্যের সাথে আয়ুষ্কাল বাড়ানো। বাংলাদেশের জনসংখ্যার মধ্যে এক তৃতীয়াংশের বেশি শিশু প্রোটিন ও ক্যালরিজনিত পুষ্টিহীনতায় ভোগে, যার মধ্যে খর্বাকৃতি ৩৬ শতাংশ, কৃষকায় ১৪ শতাংশ এবং নিম্ন ওজনে রয়েছে ৩৩ শতাংশ। গড়ে এক চতুর্থাংশ মহিলা দীর্ঘস্থায়ী ক্যালরিজনিত অপুষ্টিতে ভোগে, যাদের অধিকাংশেরই দেহে একই সাথে জিংক,আয়রন ও আয়োডিনের স্বল্পতা রয়েছে। এসব আমাদের সর্তকতার সাথে লক্ষ রাখতে হবে।
ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ ও রঙ ব্যবহারের মাধ্যমে নষ্ট,বাসি ও নিম্নমানের খাবরকে আকর্ষণীয় করে তোলা হয়। টিনজাত ও প্যাকেটজাত খাদ্যে বিদ্যমান বিভিন্ন কৃত্রিম রাসায়নিক পদার্থ যেমন- টেস্টিং সল্ট, ট্রান্সফ্যাট ছাড়াও অনুমোদনবিহীন ও মাত্রাতিরিক্ত খাদ্য সংযোজন দ্রব্য ব্যবহার করা হয়, যা দেহে স্থূলতা, স্তন ক্যান্সার,প্রোস্টেট ক্যান্সার, উচ্চ রক্তচাপ,হৃদরোগ ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে। আমাদের দেশে অধিক মুনাফার জন্য শাকসবজি ও ফলফলাদি মৌসুমের আগে বাজারজাত করার জন্য অননুমোদিত কিংবা মাত্রাতিরিক্ত হরমোন ব্যবহার করার প্রবণতা দেখা যায়। অন্যদিকে শাকসবজি ফলফলাদি, মাছ এসব পচনশীল খাদ্যে ফরমালিনের অপব্যবহার হয়ে থাকে যা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। প্রাকৃতিকভাবে পরিপক্ব ফল ও শাকসবজিতেই পুষ্টিগুলো পরিপূর্ণভাবে পাওয়া যায়। খাবার প্রস্তত ও গ্রহণকালে খাদ্য নির্বাচন, লেবেল,খাদ্য সংরক্ষণ, উৎপাদন ও মেয়াদ, খাদ্য হস্তান্তর এবং ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কিত জ্ঞান ও ধারণা খাদ্যকে নিরাপদ করে এবং সুস্বাস্থ্য অটুট রাখতে সাহায্য করে।
খাদ্য গ্রহণে আমাদের অনেক বদঅভ্যাস আছে। যেমন যে খাবারটি আমরা বেশি পছন্দ করি তা বেশি খাই সব সময় খাই। খাবার টেবিলে আমাদের খাদ্যে ডাইভারসিটি কম কিন্তু জরুরি দরকার বেশি সংখ্যক খাদ্যের সমাহার। প্রতিদিন প্রতি বেলায় কিছু শাকসবজি,ফল, আমিষ এসবের সাথে ভাত থাকতে পারে। এসবের প্রতি আইটেম কিছু কিছু খেলে রুচিও বদলাবে সাথে পুষ্টির সমাহারে আমরা উপভোগ করতে পারব। আমাদের আরেকটি ক্রুটি হলো আমার ৩ বেলা বেঁধে খাই। সকাল দুপুর রাত কিন্তু নিয়ম হলো দিনভর সময় সুযোগ পেলে হালকা কিছু খাবার সব সময় খাওয়া। এতে পুষ্টিশক্তি সুষমতা রক্ষা পায় অনায়াসে। সতেজ বিষমুক্ত পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবারের প্রতি আমাদের যেনো বেশি নজর থাকে সে দিকে সতর্কতার সাথে লক্ষ্য রাখতে হবে। পুষ্টিসম্মত খাবার খেয়ে আমরা পুষ্টিসমৃদ্ধ জাতিতে পরিণত হবো এটাই হোক আমাদের নিত্য এবং আন্তরিক ও কার্যকর অঙ্গীকার।
আমাদের দৈনিক কাজকর্ম,চিন্তাভাবনা ও শারীরিক পরিশ্রমের জন্য দেহের ক্ষয় হয়। খাদ্য সেই ক্ষয় পূরণ করে। তাই দেহের পুষ্টির জন্য খাদ্য একান্ত প্রয়োজন। খাদ্যদ্রব্য মানুষের জীবনের ভিত্তি ও প্রধান অবলম্বন। ভালো খাওয়া দাওয়া ভালো স্বাস্থ্য,কর্মসামর্থ্য ও দীর্ঘ পরমায়ু লাভের উপায় কিন্তু ভালো ভালো খাদ্য খেলেও দেখা যায় শরীরে অনেক ক্ষেত্রে আশানুরূপ ফল পাওয়া যায় না। খাদ্য সুষম (ওয়েল ব্যালেন্সড) হওয়া প্রয়োজন। কোন কোন খাদ্য কী কী উপাদান বর্তমান তা জানা প্রয়োজন। খাদ্যের মান নির্ণয় করে খাদ্যকে ছ’টি উপাদানে ভাগ করা হয়েছে। ১। প্রোটিন (আমিষজাতীয় খাদ্য) ডিম, মাছ, মাংস, মেটে (লিভার), গুর্দা (কিডনি), চিজ, সোয়াবিন, চিনাবাদাম, ডাল, দুধজাতীয় খাদ্য ছানা প্রভৃতি প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন পাওয়া যায়। উপকারিতার মধ্যে শরীরের তাপ উৎপাদন, দেহের হজমক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ, দেহতন্তুর ক্ষতিপূরণ ও শরীরস্থ উপাদানসমূহ নির্মাণ প্রোটিন খাদ্যের কাজ। শরীর গঠনের জন্য প্রোটিন অপরিহার্য। আমাশয় রোগে প্রোটিন বিশেষ প্রয়োজন। তা ছাড়া শরীরের বৃদ্ধি (গ্রোথ), দেহের পুষ্টি এবং মেধা বাড়ানোর জন্য সহায়ক। ২। কার্বোহাইড্রেট (শর্করাজাতীয় খাদ্য) : চাল, চিনি,আটা,ময়দা,মিষ্টি,মধু,আম,আলু,মিছরি,গুড়,চিড়া,মুড়কি,সাগু,বার্লি ইত্যাদিতে কার্বোহাইড্রেট বর্তমান।এগুলো দৈনিক শক্তি, কর্মে উদ্যম, তাপ উৎপাদন ও চর্বি গঠন কার্বোহাইড্রেটের প্রধান কাজ। এই জাতীয় খাদ্যই আমাদের দেহ গঠন ও সংরক্ষণের প্রধান উপাদান। যাদের রোগা শরীর তাদের মেদ বৃদ্ধির জন্য এটি বিশেষ প্রয়োজনীয়। ৩। ফ্যাট বা চর্বি (স্নেহজাতীয় খাদ্য) : মাংসের চর্বি, মাখন, হোল মিল্ক, আইসক্রিম, বাদাম, তেল, ঘি, বনস্পতি, নারকেল তেল প্রভৃতি প্রচুর পরিমাণে চর্বি রয়েছে। এর উপকারিতা হলো কাজে উৎসাহ ও তৎপরতার জন্য ফ্যাট অপরিহার্য। শরীরের উত্তাপ উৎপাদন এবং চর্বি প্রস্তুতকরণ এই জাতীয় খাদ্যের প্রধান কাজ। দেহের কমনীয়তা রক্ষা ও দেহলাবণ্যের জন্য চর্বির প্রয়োজন খুব বেশি।
৪। মিনারেলস (লবণজাতীয় খাদ্য) : মাছ, শুকনো খাবার, মোওয়া, শুকনো ফল, সরষে, সবজি, সবুজ শাক, মোচা, কাঁচকলা, ডুমুর, খাদ্যলবণ প্রভৃতিতে মিনারেলস জাতীয় খাদ্য বর্তমান। এ ছাড়াও ক্যালসিয়াম, ফসফরাস ও লোহাজাতীয় খাদ্য এতে বর্তমান। উপকারিতায় রয়েছে লবণঘটিত উপাদান খাদ্যমাধ্যমে আমাদের রক্তে সঞ্চিত হয়। এটি রক্তবর্ধক। ক্যালসিয়ামের অভাবে অস্থিরোগ, রিকেটস ইত্যাদি হয়। ক্যালসিয়াম রক্ত জমাট বাঁধতে, দাঁত গঠনে ও রক্ষণে সহায়ক। ৫। ভিটামিন (খাদ্যপ্রাণ) আমাদের শরীরের এর প্রয়োজন খুব বেশি। তাছাড়া ভিটামিনের বিভিন্ন উপকারিতায় রয়েছে নানা গুনাগুন। ৬। পানি: শোথ, উদরী প্রভৃতি ব্যতীত অধিকাংশ রোগেই পানি উত্তম পথ্য। শরীরের অপরাপর ক্রিয়ায় সহায়ক হয়। কোষ্ঠকাঠিন্য ও প্রস্রাব পরিষ্কার রাখতে সহায়তা করে। একটা কথা সর্বদা মনে রাখা প্রয়োজন যে, শুধু খাদ্য খেলেই হয় না। খাদ্যকে শরীরে গ্রহণ করারও ক্ষমতা থাকা দরকার। শরীর যদি খাদ্যকে গ্রহণ না করে তবে প্রচুর খেলেও শরীরের পুষ্টিসাধন হয় না। অথবা অতিরিক্ত খাদ্য মেদ বা চর্বিতে রূপান্তরিত হয়। শরীরকে খাদ্য গ্রহণ করার উপযুক্ত করে তুলতে হলে আসন ও পরিমিত ব্যায়ামের প্রয়োজন। আমরা খাদ্য খাই মনের সাধ মেটানোর জন্য,দেহের পুষ্টির জন্য, যার মাধ্যমে শরীরকে সুস্থ ও সবল রেখে কর্মক্ষম জীবন যাপন করা যায়। আমাদের খাদ্য তালিকায় সবজি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। বিশ্বব্যাপী মানুষের মাঝে স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়ার সাথে সাথে খাদ্য তালিকায় সবজির গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। এ প্রবণতা উন্নত বিশ্বে স্বপোন্নত বিশ্বের তুলনায় অনেক বেশি।
বিভিন্ন প্রকার খাদ্যোপাদান শর্করা, আমিষ, তেল, খাদ্যপ্রাণ এবং খনিজ পদার্থের অভাবে মানুষের শরীরে বিভিন্ন রকমের অপুষ্টিজনিত সমস্যা দেখা যায়। শিশু কম ওজন নিয়ে জন্মায়; বিভিন্ন অপুষ্টিজনিত রোগে ভোগে; মহিলা এবং শিশু রক্তশূন্যতায় ভোগে; প্রয়োজনীয় ক্যালারির অভাবে ভুগছে; ভিটামিন এ’র অভাবজনিত রোগে ভুগছে; রাইবোক্লেভিনের অভাবে ভুগছে; গলা ফোলা রোদে আক্তান্ত হচ্ছে; শিশুরা অন্ধত্ব বরণ করছে।পুষ্টি ঘাটতিজনিত সমস্যাগুলোর শতকরা হার বা সংখ্যা নিয়ে মতপার্থক্য থাকলেও তা যে বাংলাদেশের বৃহত্তর জনপদে এক বিরাট সমস্যা হিসেবে বিরাজ করছে এ ব্যাপারে কারও কোনো দ্বিমত নেই বলেই মনে হয়। আর সে সমস্যা থেকে পরিত্রাণের সবচেয়ে সহজলভ্য এবং কম ব্যয়বহুল উপায় খাদ্য তালিকায় নিয়মিত ও পরিমিত রকমারি সবজির ব্যবহার। আবার প্রোটিন মানব দেহের অত্যাবশ্যকীয় পুষ্টি উপাদান। শরীর গঠন ও পেশি শক্তি উৎপাদনে মৌলিক কাঠামো হিসাবে প্রোটিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শরীর বৃদ্ধি ও সংরক্ষণের জন্য প্রোটিন প্রয়োজন। বিভিন্ন খাদ্য যেমন- মাংস, ডিম, মাছ, দুধ, দুগ্ধজাত দ্রব্য, ডাল, বাদাম, বিভিন্ন ফল ও বীজে প্রোটিন পাওয়া যায়। দৈহিক বৃদ্ধি ও সমৃদ্ধির জন্য ভিটামিন প্রয়োজন। মানব দেহের জন্য ১৩ প্রকার ভিটামিনের প্রয়োজন। দেহের স্বাভাবিক ক্রিয়াকর্ম পরিচালনার জন্য বিভিন্ন ভিটামিনের প্রয়োজন হয়। প্রয়োজনের তুলনায় কম হলে ঘাটতি জনিত রোগ সৃষ্টি হয়। সামগ্রিকভাবে বছরব্যাপী খাবার হিসেবে অন্যান্য খাবারের সাথে হরেক রকম সবজি পর্যাপ্ত পরিমাণে গ্রহণ করে অপুষ্টিজনিত সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক সবজি গবেষণার সূত্রপাত আশির দশকের শুরুতে। এরপর এর ক্রমবিকাশের ধারা অব্যাহতভাবে এগিয়ে চলেছে। কৃষি গবেষণা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এ গোত্রের ফসলের জাত উন্নয়ন ও উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের মূল দায়িত্বে নিয়োজিত। এক্ষেত্রে এ উদ্ভাবিত ৩০-৩৫টি প্রধান সবজির প্রায় ১০০টিরও বেশি জাত ও কিছু উৎপাদন প্রযুক্তি জাতীয় পর্যায়ে সবজির উৎপাদন বৃদ্ধিতে অবদান রাখছে। অন্যান্য প্রতিষ্ঠান প্রায় ২০টির মতো বিভিন্ন সবজির জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। বর্তমানে তাদের উদ্ভাবিত অনেক সবজির জাত কৃষক পর্যায়ে সমাদৃত হয়েছে এবং সবজির ফলন বৃদ্ধিতে ব্যাপক অবদান রাখছে যা খুবই আশাব্যঞ্জক।
খাদ্য মানুষের মৌলিক অধিকারসমূহের মধ্যে অন্যতম। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫ (ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব হচ্ছে সব নাগরিকের অন্ন,বস্ত্র,আশ্রয়,শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা করা; আবার সংবিধানের ১৮ (১) অনুচ্ছেদে জনগণের ‘পুষ্টির স্তর উন্নয়ন ও জন স্বাস্থ্যের উন্নতি সাধনকে রাষ্ট্রের অন্যতম প্রাথমিক দায়িত্ব হিসেবে গণ্য করা হয়েছে’। এছাড়াও বাংলাদেশ সরকার সম্প্রতি জাতীয় খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নীতি ২০২০ প্রণয়ন করেছে।
উন্নয়নশীল দেশগুলিতে চরম দারিদ্র্য পরিমাপের প্রধান পদ্ধতিগুলোর মধ্যে মৌলিক চাহিদা হলো অন্যতম একটি পদ্ধতি। এটি দীর্ঘমেয়াদী সচ্ছল জীবনযাপনের জন্য একান্ত প্রয়োজনীয় ন্যূনতম চাহিদাগুলোকে (সাধারণত ভোগ্য সামগ্রীর ক্ষেত্রে) সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করে। দারিদ্র্যসীমাকে তখন সেই চাহিদা পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় আয়ের পরিমাণ হিসাবে সংজ্ঞয়িত করা হয়। ১৯৭৬ সালে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার বিশ্ব কর্মসংস্থান সম্মিলনে (ওয়ার্ল্ড এমপ্লয়মেন্ট কনফারেন্সে) ‘মৌলিক চাহিদা’ পদ্ধতিটি চালু হয়েছিলো।
পুষ্টি বিষয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টি ও পুষ্টি উন্নয়নের গতিকে ত্বরান্বিত করার মাধ্যমে অভীষ্ঠ অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে আজ সোমবার থেকে শুরু হচ্ছে জাতীয় পুষ্টি সপ্তাহ-২০১৮। জনগণের খাদ্যাভাস ও খাদ্য পরিকল্পনায় পুষ্টির বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়ার লক্ষ্যে এবছর পুষ্টি সপ্তাহের প্রতিপাদ্য নির্ধারন করা হয়েছে ‘খাদ্যের কথা ভাবলে পুষ্টির কথাও ভাবুন’।
দেশের সবচেয়ে দুস্থ ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষ যাদের দারিদ্র্য ও খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে, যারা প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার এবং যারা অতি প্রান্তিক এলাকায় বসবাস করে তাদেরও পুষ্টি নিশ্চিত করা হবে। এছাড়াও যক্ষ্মা ও এইচআইভি ও এইডস রোগী এবং অপুষ্টিতে আμান্ত অন্যান্য জনগোষ্ঠীও অগ্রাধিকার পাবে। ২০২৫ সালের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের অপুষ্টি হ্রাস করতে ‘জাতীয় পুষ্টিনীতি ২০১৫’ ও অন্যান্য নীতির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অনুসরণ করে দ্বিতীয় জাতীয় পুষ্টি কর্মপরিকল্পনায় (২০১৬-২০২৫) কয়েকটি সূচক ও লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।
খাদ্য নিরাপত্তার প্রধান শর্ত খাদ্যশস্যের গড় প্রাপ্যতা। সেদিক থেকে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত সন্তোষজনক। দ্বিতীয় শর্ত প্রাপ্ত খাদ্যশস্যে সবার অভিগম্যতা। বর্তমান সরকার সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচীর আওতায় তা অনেকটাই নিশ্চিত করতে পেরেছে। ১০ টাকা কেজি দরে গরিব মানুষের কাছে সময়মতো চাল পৌঁছে দিচ্ছে। তাতে দেশে প্রাপনীয় খাদ্যশস্যে তাদের অভিগম্যতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। খাদ্য নিরাপত্তার তৃতীয় শর্ত খাদ্যের পর্যাপ্ততা ও স্থায়িত্বশীলতার দিকে এখন আমাদের দৃষ্টি। নিরাপদ খাদ্য সরবরাহের কথাও ভাবছেন সবাই। বর্তমান করোনা মহামারীর প্রভাবে বিশ্ব এখন টালমাটাল। তাতে খাদ্যশস্যের উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে বিশ্বব্যাপী। ফলে আন্তর্জাতিক খাদ্যমূল্য ক্রমেই বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে খাদ্যের উৎপাদন বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, ‘আমাদের মাটি উর্বর। তাতে ফলমূল, শাক-শবজি, শস্য লাগান। কোথাও এতটুকু মাটি যেন অনাবাদি না থাকে’। ৭ এপ্রিল ২০২০ এক ভিডিও কনফারেন্সে এই নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী। এর আগেও তিনি দেশের খাদ্য উৎপাদন যাতে ব্যাহত না হয়, সেদিকে দৃষ্টি রেখে এক ইঞ্চি জায়গাও অনাবাদি না রাখার আহ্বান জানান। করোনাকালে দেশের কৃষকদের যাতে কোন অসুবিধা না হয় সে জন্য তিনি পর্যাপ্ত প্রণোদনা ঘোষণা করেন।
বঙ্গবন্ধু বলেছেন, ‘খাদ্য বলতে শুধু ধান, চাল, আটা, ময়দা আর ভুট্টাকে বুঝায় না, বরং মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, শাক-সবজি এসবকে বুঝায়। সুতরাং কৃষির উন্নতি করতে হলে এসব খাদ্যশস্যের সমন্বিত উৎপাদনের উন্নতি করতে হবে।’ বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাশিত সেই সমন্বিত কৃষি উন্নয়ন এখন দৃশ্যমান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুযোগ্য নেতৃত্বে কৃষির সকল উপ-খাতেই বিপুল পরিমাণে উৎপাদন বেড়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ মৎস্য উৎপাদনে স্বয়ম্ভর বলে ঘোষণা দেয়া হয়েছে। ২০০৭-০৮ সালে দেশে মাছের মোট উৎপাদন ছিলো ২৫ লাখ টন। ২০১৯-২০ সালে তা বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৪৪ লাখ টনে। মৎস্য খাতে বর্তমান গড় প্রবৃদ্ধির হার প্রায় ৬ শতাংশ। তাছাড়া পুষ্টির অন্যান্য উপাদান ডিম,দুধ ও মাংসের উৎপাদনে বিপুল পরিমাণে প্রবৃদ্ধি পরিলক্ষিত হচ্ছে। দেশ এখন ডিম ও মাংস উৎপাদনে প্রায় স্বয়ম্ভর। দুগ্ধ উৎপাদনে এখনো ঘাটতি আছে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ। তবে যে হারে উৎপাদন বাড়ছে,তাতে এর ঘাটতি মেটানো সম্ভব হবে অচিরেই।
বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। দেশের জিডিপিতে কৃষিখাতের অবদান শতকরা প্রায় ২৪ ভাগ হলেও, গ্রামীণ বাংলাদেশের শতকরা প্রায় ৭০ ভাগ লোক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কৃষি দেশের অর্থনীতির প্রধান জীবনীশক্তি। কৃষি উৎপাদনের ওপর খাদ্য নিরাপত্তা নির্ভরশীল। নানা কারণে শুধু বাংলাদেশ নয়,পৃথিবীর সব মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। শিল্পায়ন,নগরায়ন এবং অপরিকল্পিত ভূমির ব্যবহারের ফলে ক্রমহ্রাসমান ভূমি থেকে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্যের যোগান দেওয়া বাংলাদেশের জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ।
সভ্যতার কেন্দ্রবিন্দু হলো একটি পরিবার। কাজেই পারিবারিক পুষ্টি চাহিদা পূরণ হলে সভ্যতার ক্রমবিকাশও সহজ হয়। পুষ্টির অভাবে মানুষের স্বাভাবিক চিন্তা-চেতনার বিকাশ ব্যাহত হয়। মানুষকে স্বাভাবিক কর্মচাঞ্চল্যে ফিরিয়ে আনতে সুস্থ মানুষের প্রয়োজন। এ সুস্থ মানুষ সৃষ্টির জন্য পারিবারিক পুষ্টি চাহিদা পূরণ জরুরি।
হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন কৃষি ও কৃষক বান্ধব। সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর, উন্নত বাংলাদেশ এবং সোনার বাংলা গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন বঙ্গবন্ধু। সদ্য স্বাধীনতা প্রাপ্ত দেশ পূনর্গঠন করতে গিয়ে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, সার্বিক উন্নয়নে কৃষির উন্নতির কোন বিকল্প নেই। সেই লক্ষ্যে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ছিল তার অন্যতম প্রয়াস। তিনি জানতেন, মানুষের প্রথম চাহিদা খাদ্য। তাই খাদ্য নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে তিনি কৃষি এবং কৃষকের উন্নয়নের উপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। কৃষির উন্নয়ন বলতে বুঝায় কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদের সমন্বিত উন্নয়ন। তিনি কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নের জন্য গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করতেন। তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত এ জনপদটিকে কৃষি অর্থনীতিতে স্বনির্ভর করে তোলার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ ও কর্মসূচী গ্রহণ করেন। দূরদর্শী ও বিচক্ষণ বঙ্গবন্ধু বুঝতে পেরেছিলেন, কৃষি ও কৃষকের উন্নতি বিধান নিশ্চিত করা না গেলে জাতির ভবিষ্যৎ অন্ধকার। তিনি স্বপ্ন দেখতেন কৃষি বিপ্লবের।
খাদ্য নিরাপত্তা হলো খাদ্যের কার্যকর চাহিদা মোতাবেক সুষম খাদ্য সরবরাহ; যখন জনসাধারণ সব সময় সুস্থ ও কর্মঠ জীবন যাপনের জন্য দৈনন্দিন খাদ্য চাহিদা ও পছন্দসই খাদ্য সংগ্রহের জন্য পর্যাপ্ত,নিরাপদ এবং পুষ্টিকর খাদ্য সংগ্রহ করতে সক্ষম হবে,সে অবস্থাকেই খাদ্য নিরাপত্তা বলা হবে। বর্তমানে আমরা দানাজাতীয় খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা পেলেও পুষ্টি নিরাপত্তার বিষয়টি সেভাবে গুরুত্ব পায়নি। খাদ্য নিরাপত্তার সাথে পুষ্টি নিরাপত্তার কার্যকরভাবে সংযোগ ঘটাতে না পারলে খাদ্য নিরাপত্তা অর্থহীন হয়ে যাবে। তাই সবজি ফসলের অধিক উৎপাদন ও গ্রহণ দানাজাতীয় ফসলের ওপর চাপ কমিয়ে খাদ্য এবং পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। পাশাপাশি কৃষকের জন্য মুনাফার সংস্থান করে দেশের অর্থনীতিতেও অবদান রাখতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে সব ক্ষেত্রে নিরাপদ খাদ্য দিয়ে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বব্যাপী খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে চলে এসেছে। একদিকে অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে জনসংখ্যার বৃদ্ধি, অন্যদিকে উন্নত বিশ্বে জৈব জ্বালানির যথেচ্ছ ব্যবহারের কারণে খাদ্য সঙ্কট দিন দিন আরো প্রকট হচ্ছে। ফলে গত কয়েক বছরে খাদ্যদ্রব্যের দাম কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় দারিদ্র্য ও অপুষ্টির সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে অনুন্নত ও ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোতে দ্রব্যমূল্যের কারণে মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। আর এর ভয়াবহতা আমাদের মতো জনবহুল দরিদ্র দেশটির জন্য এক বিভীষিকাময় অবস্থার সৃষ্টি করেছে। তবে যথাযথ পরিকল্পনার মাধ্যমে আমাদের সম্পদের সঠিক ব্যবহার বিশেষ করে কৃষির আধুনিকায়ন করে দেশকে কৃষিভিত্তিক শিল্পোন্নত দেশে পরিণত করা সম্ভব।
দেহের বৃদ্ধি, শক্তি ও বেঁচে থাকার জন্য প্রতিটি প্রাণীর খাদ্য অপরিহার্য। অতএব মানবদেহকে সুস্থ-সবল রাখার জন্যও খাদ্য অপরিহার্য। খাদ্য ও পুষ্টি সম্পর্কে যথেষ্ট ধারণা অর্জন করা দেহকে সুস্থ রাখার পূর্বশর্ত। আমিষ, শর্করা, তেল ও চর্বি ইত্যাদি জৈব-যৌগ আমরা খাদ্য হিসাবে গ্রহণ করি। আর এ সকল খাদ্য থেকে পুষ্টি পাই। শরীরের যথাযথ বৃদ্ধি সাধন এবং শরীরকে সবল রাখার জন্য সঠিক পরিমানে উপযুক্ত খাবার খাওয়া খুবই জরুরী। কারণ খাদ্য দেহের গঠন, বৃদ্ধি সাধন, ক্ষয়পূরণ, রক্ষণাবেক্ষণ, কর্মশক্তি প্রদান এবং রোগ প্রতিরোধের কাজ করে। আমরা উদ্ভিদ ও প্রাণী থেকে মূলত খাদ্য পাই। খাদ্য ও পুষ্টি সম্পর্কে যথেষ্ট ধারণা অর্জন করা দেহকে সুস্থ রাখার পূর্বশর্ত। প্রতিদিন একজন মানুষের কতটুকু খাবার গ্রহনের প্রয়োজন তা নির্ভর করে মূলত বয়স, দেহের উচ্চতা ও দেহের ওজনের ওপর। তবে বেশি শারীরিক পরিশ্রম করলে বেশি শক্তি ও সুষম খাদ্যের প্রয়োজন। তাই খাদ্যের সঠিক প্রকারভেদ অনুয়াযী সুষম খাদ্য নিশ্চিত করতে হবে।
বিশ্ব খাদ্য সম্মেলন ১৯৯৬ অনুযায়ী ‘খাদ্য নিরাপত্তা তখনই আছে বলে মনে করা হয় যখন প্রত্যেক নাগরিকের সব সময়ের জন্য যথেষ্ট পরিমাণে,নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য প্রাপ্তির প্রত্যক্ষ ও অর্থনৈতিক নিশ্চয়তা থাকে যা তাদের সক্রিয় ও সুস্থ জীবন নিশ্চিতকরণের জন্য সঠিক পরিমাণ খাদ্যের চাহিদা পূরণ করে’। খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ে বিশ্ব খাদ্য সম্মেলন ১৯৯৬ এ গৃহীত এ সংজ্ঞা প্রায় সফল বাস্তবায়ন বাংলাদেশে হচ্ছে। দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর জন্য নিরাপদ খাদ্য আছে ঠিকই; কিন্তু দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাসকারী অধিকাংশ মানুষ অর্থাভাব কিংবা অজ্ঞতার কারণে এখনো অপুষ্টির শিকার। এ পুষ্টি চাহিদা পূরণ সহজেই সম্ভব যদি ফ্যামিলি ফারমিং এর মাধ্যমে প্রচেষ্টা চালানো যায়। সামাজিক ন্যায়বিচারের এক অপরিহার্য উপাদান হচ্ছে,সব মানুষের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য নিরাপত্তা। সুতরাং বর্তমান সরকার-ঘোষিত লক্ষ্য ২০২১ সালের মধ্যে দেশকে একটি সমৃদ্ধ ও সুখী ডিজিটাল বাংলাদেশ রূপায়নে সর্বাগ্রে বিবচেনা আনতে হবে কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি।
খাদ্য,স্বাস্থ্য ও পুষ্টি-এই তিনটি শব্দ একটি আরেকটির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সুস্বাস্থ্য ও সুস্থ মনের জন্য প্রতিদিন পুষ্টিকর ও সুষম খাদ্যের প্রয়োজন। দেহের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টির চাহিদা পূরণ করতে হলে একজন ব্যক্তির জন্য সুষম খাদ্য নির্বাচন, খাদ্যের সহজলভ্যতা ও পুষ্টিমূল্য বজায় রেখে খাদ্য গ্রহণ করতে হবে। এ ছাড়া অর্থনৈতিক অবস্থা, খাদ্য উৎপাদন,খাদ্য বিতরণ ব্যবস্থা, খাদ্যাভ্যাস ইত্যাদির উপরও পুষ্টি অনেকটাই নির্ভর করে।

লেখকঃ গবেষক,সাবেক জাতীয় ক্রীড়াবিদ,
চেয়ারম্যান গ্রীণ ক্লাব,মানিকগঞ্জ,সাংবাদিক ও কলামিস্ট