গ্রামীণ জীবনের রূপকার কবি বন্দে আলী মিয়া

 

মো.আলতাফ হোসেন ঃঃ
বাংলা সাহিত্যের অত্যন্ত জনপ্রিয় ও শক্তিমান কবি বন্দে আলী মিয়া। সাহিত্যের অন্যান্য শাখায় অবদান থাকলেও কবি ও শিশুসাহিত্যিক হিসেবে তাঁর পরিচিতি ও সুখ্যাতি রয়েছে। তিনি বাংলার কবি, প্রকৃতির কবি,গণমানুষের কবি। অসংখ্য কবিতা, ছড়া, প্রবন্ধ, উপন্যাস লিখে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে গেছেন তিনি। মা-মাটি-মানুষের প্রতি দরদ ফুটে উঠেছে তাঁর সৃষ্টিকর্মে। গ্রাম নিয়ে তাঁর অমর কবিতা ‘আমাদের গ্রাম’ পড়লে পাঠককে অবশ্যই ফিরে যেতে হবে শৈশবে, যেখানে তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা।

বন্দে আলী মিয়া ছিলেন একজন স্বনামধন্য বাংলাদেশি কবি,ঔপন্যাসিক,শিশু-সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও চিত্রকর। ১৯০৬ সালের ১৫ ডিসেম্বর বন্দে আলী মিয়া জন্মগ্রহণ করেন বাংলাদেশের রাধানগর গ্রামে। পিতা মুনশি উমেদ আলী মিয়া ও মাতা নেকজান নেসা ছিলেন শিক্ষানুরাগী। বাংলা সাহিত্যে বিরল প্রতিভা ও সব পল্লী কবির মধ্যে অন্যতম ছিলেন বন্দে আলী মিয়া। সাহিত্যকীর্তিতে তিনি যে উচ্চতায় উঠতে পেরেছিলেন, তার জন্য তিনি মনে করেন তাঁর মায়ের অবদান সবচেয়ে বেশি। মায়ের মুখের অফুরন্ত গল্প ও রূপকথা শুনেই বড় হচ্ছিলেন বন্দে আলী মিয়া। জীবনের শুরুতে প্রথাগত শিক্ষার হাতেখড়ি হয়েছিলো বাড়িতেই। কয়েক বছর পর বন্দে আলী মিয়া বাংলাদেশের পাবনা শহরের মজুমদার একাডেমিতে ভর্তি হন।

কবি বন্দে আলী মিয়ার কাব্যে পল্লীপ্রকৃতি ও মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের অত্যন্ত নিবিড় ও নিখুঁত চিত্র তাঁর তুলির আঁচড়ে জীবন্ত ও প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে। গ্রামীণ মানুষের সহজ-সরল জীবন,আচার-বিশ্বাস,লোকাচার,কুসংস্কার,আশা-আকাক্সক্ষার নিখুঁত চিত্র তাঁর কাব্যে বাঙময় হয়ে উঠেছে। পল্লীপ্রকৃতি ও গ্রামীণ মানুষের সহজ-সরল আটপৌরে জীবনের এত প্রাণবন্ত ও জীবন্ত উপস্থিতি আর কোনো কবির কাব্যে পরিলতি হয় না।স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর গ্রামীণ প্রকৃতির নিখুঁত উপস্থাপনায় ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। ময়নামতীর চর (১৯৩২) কাব্য পড়ে লিখেছিলেনÑ“তোমার ‘ময়নামতীর চর’ কাব্যখানিতে পদ্মাচরের দৃশ্য এবং জীবনযাত্রার প্রত্য ছবি দেখা গেলো।পড়ে বিশেষ আনন্দ পেয়েছি।তোমার রচনা সহজ এবং স্পষ্ট, কোথাও ফাঁকি নেই। সমস্ত মনের অনুরাগ দিয়ে তুমি দেখেছ এবং কলমের অনায়াস ভঙ্গিতে লিখেছ।তোমার সুপরিচিত প্রাদেশিক শব্দগুলি যথাস্থানে ব্যবহার করতে তুমি কুণ্ঠিত হওনি, তাতে করে কবিতাগুলি আরো সরস হয়ে উঠেছে। পদ্মাতীরের পাড়াগাঁয়ের এমন নিকট স্পর্শ বাংলা ভাষায় আর কোনো কবিতায় পড়েছি বলে আমার মনে পড়ছে না। বাংলা সাহিত্যে বিশেষ স্থানটি অধিকার করতে পেরেছেন তিনি। বন্দে আলী মিয়া প্রেম প্রকৃতি বিষয়ে যতটা না ছিলেন রোমান্টিক তার চেয়ে বেশি ছিলেন পল্লী জীবন ও পল্লীর সহজ-সরল মানুষের জীবনচিত্র রূপায়ণে পারদর্শী। এ কারণে তাঁর কাব্যের রোমান্টিকতা অপেক্ষা বাস্তবতার প্রতিফলন বেশি। তাঁর বেশির ভাগ কাব্যেই এ বিষয় প্রত্যক্ষীভূত হয়।

বিশ্বসাহিত্যে অমর কথাসাহিত্যিক কবি বন্দে আলী মিয়া। তাঁর মূল্যবান রচনা পড়লে মনের আকাশজুড়ে এক অনন্য নিদর্শন আকাশ তৈরি হয়। গান, গল্প, কবিতা, নাটক, উপন্যাস, প্রবন্ধ, কাব্যনাটক, গীতিনকশা, রূপকথা, জীবনী, ছোটদের জন্য অফুরন্ত রচনা, স্মৃতিকথাসহ একাধিক বিষয়ে বই লিখেছেন কবি বন্দে আলী মিয়া। সাহিত্যসেবায় তাঁর অনন্য প্রয়াস সার্থক করেছে বাংলাকে। তাঁর রচিত কাব্য ও শিশুসাহিত্য সমগ্র বাংলাকে নতুন আলোকে আলোকিত করেছে। তবু তিনি অনাদরে বিস্মৃতির অন্তরালে রয়ে গেলেন। কেন তিনি আজ বড় প্রাসঙ্গিক হয়েও আড়ালে রয়ে যাচ্ছেন? তার উত্তর আজও অধরা। পাঠ্যপুস্তকেও এই খ্যাতিমান কবি ব্রাত্য থেকে যাচ্ছেন দিনের পর দিন। শিশু ও বড়দের অনুপ্রেরণা দিতে ও নতুন সাহিত্য সাধনায় এগিযে আসতে সাহস জোগান এসব কবিসাহিত্যিক। উপেক্ষিত ও বিস্মৃতির অন্তরালে রয়ে যাওয়া বিরল কবি ও কথাসাহিত্যিকদের মধ্যে অন্যতম হলেন কবি বন্দে আলী মিয়া।

বন্দে আলী মিয়া রচিত গানের বইগুলোর মধ্যে ‘কলগীতি’, ‘সুরলীলা’ প্রভৃতি। তাঁর গানের বইয়ে আমরা যেমন পাই পল্লীগীতি, তেমনি আছে দেশের গান, মরমি গান ও হাসির গান। বিখ্যাত শিল্পীরা তাঁর গানে সুর ও কণ্ঠ দিয়েছেন। গল্প, কবিতা, নাটক, উপন্যাস, প্রবন্ধ, কাব্যনাটক, গীতিনকশা, রূপকথা, জীবনী, গল্পকথা, ছোটদের জন্য প্রচুর গ্রন্থ রচনা করেছেন তিনি। তাঁর রচিত কাব্য ও শিশুসাহিত্য সমগ্র বাংলাকে নতুন আলোকে আলোকিত করেছে যেমন, তেমনই সাহিত্যপথেরও নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
বন্দে আলী মিয়ার পরিচিতি মূলত শিশুসাহিত্যিক হিসেবে। আরও স্পষ্ট করে বললে ছোটদের ‘গল্পদাদু’ হিসেবে। আমাদের ছোট গ্রাম মায়ের সমান, আলো দিয়ে বায়ু দিয়ে বাঁচাইছে প্রাণ। মাঠভরা ধান আর জলভরা দিঘি, চাঁদের কিরণ লেগে করে ঝিকিমিকি। আমগাছ জামগাছ বাঁশঝাড় যেনো, মিলেমিশে আছে ওরা আত্মীয় হেন। খুব পরিচিত এই কবিতাটি লিখেছেন বন্দে আলী মিয়া। তাঁর পরিচিতি মূলত শিশুসাহিত্যিক হিসেবে।

১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দে চিত্রবিদ্যায় ভর্তি হন কলকাতার ইন্ডিয়ান আর্ট একাডেমিতে। চিত্রবিদ্যা নিয়েই ১৯২৭ খ্রিষ্টাব্দে বন্দে আলী মিয়া প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। ১৯২৫ খ্রিষ্টাব্দে পড়াশোনার সময় তিনি ‘ইসলাম দর্শন’ পত্রিকার সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেছেন কিছুদিন। সাহিত্য সাধনায় নিজেকে ওই সময় থেকেই উজাড় করে দিতে লাগলেন। নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়। তাঁর প্রথম গ্রন্থ ‘চোর জামাই’ প্রকাশিত হয় ১৯২৭ খ্রিষ্টাব্দে। এটি একটি শিশুতোষ গ্রন্থ।তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়েছিল শিক্ষকতা দিয়ে, ১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতা করপোরেশন স্কুলে। প্রথম উপন্যাস প্রকাশিত হলো ১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দে, ‘বসন্ত জাগ্রত দ্বারে’ নামে।

বন্দে আলী মিয়ার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ময়নামতির চর’ প্রকাশিত হয় ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দে। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থের সব কবিতা পাঠককেই মুগ্ধ করেছিলো। সাহিত্য আলোচকদের মনেও দাগ কাটে ওই কাব্যগ্রন্থ। ওই সময়েই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসেন তিনি। বন্দে আলী মিয়ার রচিত লেখা বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় নিয়মিত প্রতিষ্ঠিতদের পাশে প্রকাশিত হতে লাগলো। দেশ বিভাগের পর তিনি কলকাতা জীবনে রবীন্দ্র-নজরুলের সান্নিধ্য লাভ করেন। তখন তাঁর প্রায় ২০০ খানা গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। সে সময় বিভিন্ন গ্রামোফোন কোম্পানীতে তাঁর রচিত পালাগান ও নাটিকা রের্কড আকারে কলকাতার বাজারে বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ১৯৬৪-র পর প্রথমে ঢাকা বেতারে ও পরে রাজশাহী বেতারে চাকরি করেন। তিনি তাঁর কবিতায় পল্লী প্রকৃতির সৌন্দর্য বর্ণনায় নৈপুন্যের পরিচয় প্রদান করেছেন। প্রকৃতির রূপ বর্ণনায় তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। তাঁর রচিত শিশুতোষ গ্রন্থ আজও অমর হয়ে আছে।

১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দে বন্দে আলী মিয়ার আরেকটি কাব্যগ্রন্থ ‘অনুরাগ’ প্রকাশিত হয়। তারপর কবিকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতে লাগলো ‘স্বপ্নসাধে’,‘মৃগপরী’,‘বোকা জামাই’,‘লীলাকমল’,‘কামাল আতাতুর্ক’,‘মধুমতির চর’ প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থ। কবি শিক্ষকতার পাশাপাশি শিল্পকলাতেও সুনাম অর্জন করেন। তিনি ছবি আঁকতেন মনের বিশাল ক্যানভাসকে ছবিতে উদ্ভাসিত করতে। গ্রন্থের প্রচ্ছদচিত্র চিত্রায়ণ থেকে পেশাদারি ছবিও এঁকেছেন তিনি অঢেল।
১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে দেশভাগ কবিকে ছিন্নমূল করে দিলো। অবশেষে তিনি কলকাতা ছেড়ে চলে যান নিজ গ্রামে। বাংলাদেশে ফিরে তিনি বেকার হয়ে পড়লেন। বই লিখে ও ছবি এঁকে জীবিকা নির্বাহ করতে লাগলেন। দেশভাগ কবি বন্দে আলী মিয়া মেনে নিতে পারেননি। ওই সময় তিনি গভীর বেদনায় ভেঙে পড়েন। তিনি চেয়েছিলেন দুই বাংলাকে একসূত্রে বাঁধতে। দুই বাংলার মিলন প্রয়াসে তাঁর রচিত সাহিত্য পড়লে আমাদের চিবুক চোখের জলে ভিজে যায়। কবি ‘কিশোর পরাগ’, ‘জ্ঞানবার্তা’ নামে শিশু পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। কবি হিসেবে বিখ্যাত হলেও সাহিত্যের প্রায় সব বিষয়ে তিনি বলিষ্ঠ বিচরণ করেছেন। কিন্তু আমরা তাঁর সাহিত্যসেবার সুফল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছি না কি! বাংলা সাহিত্যে এমন শক্তিশালী কবি ও সাহিত্যিক কম উঠে এসেছেন।
বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধকরণে গুরু ত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন বন্দে আলী মিয়া । এই স্বনামধন্য কবি, ঔপন্যাসিক, শিশু সাহিত্যিক, চিত্রকর ও সাংবাদিকের কলমে ঋদ্ধ হয়েছে সাহিত্যের নানা শাখা। তাঁর রচিত ‘আমাদের ছোট গাঁয়ে ছোট ছোট ঘর,থাকি সেথা সবে মিলে নাহি কেহ পর’ কবিতাটি এখনো সবার মুখে মুখে উচ্চারিত হয়।

ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ-বাংলার বিরূপ পরিবেশে বন্দে আলী মিয়া তাঁর স্বতন্ত্র লেখনশৈলীর দ্বারা ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেন। তাঁর রচিত পালা গান ও নাটিকা নিয়মিত বেতারে প্রচারিত হতো। রবীন্দ্র-নজরুল সাহিত্য বলয়ের প্রবল প্রতাপের মধ্যেও তিনি নিজের পরিচিত ও সাহিত্যিক খ্যাতি ধরে রাখতে সক্ষম হন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বন্দে আলী মিয়ার রচনার প্রশংসা করেছিলেন।

আপন প্রতিভার ঔজ্জ্বল্যে খ্যাতিমান বন্দে আলী মিয়া কবিতার পাশাপাশি ছড়া, ছোটগল্প, নাটক, উপন্যাস, স্মৃতিকথা, প্রবন্ধ, শিশুসাহিত্য প্রভৃতি প্রায় দুই শতাধিক রচনাকর্মের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যের ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করেছেন। বন্দে আলী মিয়ার কবিসত্তার সার্বিক মূল্যায়নে রচিত গ্রন্থ ‘কবি ও কাব্যরূপ’ প্রকাশ করেছে ‘স্টুডেন্ট ওয়েজ’।’স্টুডেন্ট ওয়েজ’ গবেষণার নিরিখে বস্তনিষ্ঠ মূল্যায়নের আলোয় বৃহত্তম পাঠক সমাজের সামনে বাংলা সাহিত্যের এই বহুমাত্রিক লেখকে উদ্ভাসিত করেছে।
ইতিহাস কথা বলে। মানুষকে ভাবায়, তাড়িত করে। প্রতিদিনের উল্লেখযোগ্য ঘটনা কালক্রমে রূপ নেয় ইতিহাসে। সেসব ঘটনাই ইতিহাসে স্থান পায়; যা কিছু ভালো, যা কিছু প্রথম, যা কিছু মানবসভ্যতার আশীর্বাদ-অভিশাপ। তাই ইতিহাসের দিনপঞ্জি মানুষের কাছে সবসময় গুরুত্ব বহন করে।

কবি বন্দে আলী মিয়ার নাম শফিকুল ইসলাম শিবলী। কিন্তু তিনি বন্দে আলী মিয়া নামেই অত্যধিক পরিচিত। বন্দে আলী মিয়া আজকের বাস্তবতায় প্রায় বিস্মৃত ব্যক্তিত্ব। তিনি কবি,ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, গীতিকার ও শিশুসাহিত্যিক। বন্দে আলী মিয়াকে গ্রামীণ দৃশ্যাবলির ভাষ্যকার হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। চিত্রকর হিসেবেও পরিচয় আছে এই কবির। তুলির মতো বাস্তবেও তিনি গ্রামীণ জীবনের নিদারুণ চিত্র কবিতা-ভাষ্যে তুলে ধরেছিলেন।

বন্দে আলী মিয়ার লেখা ‘কোরানের গল্প’ একটি ইসলামি শিক্ষা বিষয়ক অসাধারণ বই। বইটিতে বেশ কিছু ইসলামিক সত্য ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন লেখক। এ বইটি তিনি লিখেছেন তরুণদের মনোজগতে কোরআনের ঘটনাগুলোর বর্ণণার দ্বারা আঁচড় কাটার জন্য। তার মধ্যে আছে, আদি মানব ও আজাযিল,হাবিল ও কাবিল, স্বর্গ চ্যুতি, মহাপ্লাবন,আদজাতির ধ্বংস, ছামুদ জাতির ধ্বংস, বলদর্পী নমরুদ, হাজেরার নির্ব্বাসন,কোরবানি, কাবাগ্রহের প্রতিষ্ঠা, ইউসুফ ও জুলেখা, শাদ্দানের বেহেস্ত, পাপাচারী জমজম,কৃপন কারুণ,ফেরাউন ও মুসা।
বাংলাদেশের খ্যাতিমান শিশুতোষ কবি বন্দে আলী তাঁর জীবনকালের প্রায় ৫০ বছরই তিনি সাহিত্য চর্চায় কাটিয়েছেন। কবি বন্দে আলী মিয়া ছিলেন শিশুদের কবি। কেমন করে শিশুদের মন লেখনির মাধমে আনন্দে ভরে তোলা যায় এটাই ছিলো তার মূলত সাধনা। বাস্তব ক্ষেত্রেও তিনি শিশু সুলভ মন নিয়েই ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের সাথে প্রায়ই হাসি ঠাট্টা করতেন। তিনি ছিলেন প্রায় সকলেরই দাদু। তিনি কথা বলার সময় প্রায়ই ছড়া কাটতেন ।

কবি বন্দে আলী মিয়া ছিলেন কঠোর পরিশ্রমী। তিনি মৃত্যুর পূর্ব মূহুর্ত পর্যন্ত নিজের হাতে বাজার করেছেন। তিনি বহুদিন নিঃসঙ্গ জীবন কাটিয়েছেন। তিনি হাফ ছেড়ে বাচতে চেয়েছেন। তাই তিনি লিখেছেন এবারে আমার শেষ হয়ে এলো প্রবাসের দিন গুলি। যাবার বেলায় বারে বারে হায় মন ওঠে তবু দুলি। ১৯৭৮ সালে রাজশাহী হতে প্রকাশিত কবি বন্দেআলী মিয়া সংবর্ধনা সংখ্যায় প্রতিতীতে তার একটি কবিতা ছাপা হয়। তাতে তিনি লিখেছিলেন- আর কোনো দিন ফিরিবনা আমি কভু তোমাদের মাঝে। শোন কান পেতে আমার ভূবনে বিদায়ের বাঁশী বাজে। বন্দে আলী মিয়া।

কবি বন্দে আলী মিয়া ছিলেন সরল প্রকৃতির। দাম্ভিকতা বা আত্মঅহংকার তাঁর মাঝে ছিলোনা। শিশু সাহিত্যে বিশেষ কৃতিত্বের জন্য তিনি প্রেসিডেন্ট পুরুষ্কার লাভ করেন। তাঁর অধিকাংশ রচনা ছিলো শিশুদের উপযোগি করে লেখা। শিশুদের জন্য প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিদের জীবনীও তিনি লিখেছেন। তাঁর ৯ খানা কাব্য ১০ খানা উপন্যাস, ৩ খানা ছোট গল্প, ১১ খানা নাটক এবং সঙ্গীত ভিত্তিক ২ খানা রচনা রয়েছে। কবি বন্দে আলী মিয়ার শিশুতোষ রচনাবলীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য রচনা হলো চোর জামাই, মৃগপরী, মেঘকুমারী, বাঘের ঘরে ঘোগের বাসা, তাজমহল, বোকা জামাই, সুন্দর বনের বিভীষিকা, চালাকি, ভুতের কান্ড, শিয়াল পন্ডিতের পাঠশালা, শঠে শাঠ্যাং, ছোটদের নজরুল, কায়কোবাদ প্রভৃতি। যার সংখ্যা প্রায় ৮৭টি। এ ছাড়া তাঁর “জীবনের দিনগুলি’’ একটি বিশেষ রচনা। কবি বন্দে আলী মিয়া বেশি জাক জমক পছন্দ করতেন না। এমনকি তাঁর লেখার জন্য ভাবুক মনে ভাবের অভাব হতোনা। তিনি যে কোনো পরিবেশেই কবিতা লিখতেন। কবিতা ছিলো তাঁর নিত্য সঙ্গি।

কবির শিশুসাহিত্যে সবচেয়ে বড় অবদান হলো ছোটদের উপযোগী জীবনীগ্রন্থ। মহৎ লোকদের জীবনী যে মানুষের চরিত্র ও মনুষ্যত্ব অর্জনে বড় অবলম্বন তা হয়তো বন্দে আলী মিয়া বিশেষভাবে অনুধাবন করেছিলেন। তাই তিনি ইতিহাস থেকে বিখ্যাত মনীষী, মহামানব, কবি-সাহিত্যিক, বৈজ্ঞানিক, সমাজসেবক, রাজনীতিবিদ প্রভৃতির জীবনতথ্য অবলম্বনে প্রচুর শিশুতোষ জীবনী লিখেছেন। তার মধ্যে ‘কোহিনূর’, ‘ছোটদের বিষাদ সিন্ধু’, ‘ছোটদের মীর কাসিম’,‘তাহমহল’, ‘কারবালার কাহিনী’ প্রভৃতি গ্রন্থে শিক্ষণীয় দিক তুলে ধরা হয়েছে। তিনি কোরান, হাদিস ও গুলিস্তাঁর গল্প লিখেছেন। আরো লিখেছেন ‘ইরান-তুরানের গল্প’,‘ঈশপের গল্প’, ‘দেশ বিদেশের গল্প’, ‘শাহনামার গল্প’। তিনি লোককাহিনী, রোমাঞ্চকর ও রূপকথার কাহিনী অবলম্বনে গ্রন্থ রচনা করেছেন।
কবি বন্দে আলী মিয়া ছিলেন প্রথিতযশা চিত্রকর । শিশুতোষ গ্রন্থের মজার মজার ছবিগুলো তিনি নিজের হাতেই এঁকেছেন। আবার ইসলামী সংস্কৃতিকেও তিনি বিশ্বস্ততার সাথে জীবনের সাথে মানিয়ে নিয়েছিলেন। কবি ছিলেন প্রত্যন্ত পল্লীর নিসর্গ প্রেমী। তাঁর চেতনায় ছিল চিরন্তন সত্যের তৃষা। তিনি সময়ের গন্ডীতে কখনো বাধা পড়তে চাননি। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গী ছিলো সুদুর প্রসারী,আর ছিলো দুঃখী মানুষের জন্য অত্যন্ত সহানুভূতিশীল একটি বিশাল হৃদয়, যা তাঁকে নিয়ে যেতো নদীর কূল ভাঙ্গা অসহায় মানুষের পাশে। আসলে তিনি ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী।

বন্দে আলী মিয়া ছিলেন একাধারে কবি,ঔপন্যাসিক,শিশুসাহিত্যিক,সাংবাদিক ও চিত্রকর। তার সাহিত্যক্ষেত্রের বিচরণই শুধু এমন বৈচিত্র্যপূর্ণ ছিলো না, বৈচিত্র্যপূর্ণ ছিলো তাঁর পেশাগত জীবনও। তিনি শিক্ষকতা করেছেন, বেতারে কাজ করেছেন এমনকি নাটকেও কাজ করেছেন। তবে তিনি সবচেয়ে বেশি বিখ্যাত শিশুসাহিত্যিক হিসেবে। বন্দে আলী মিয়া সব মিলিয়ে প্রায় দেড়শ’র মতো বই লিখেছেন। যার মধ্যে ১০৫টি বই-ই ছোটদের জন্য। তাঁর উল্লেখযোগ্য বইগুলো হচ্ছে-‘ময়নামতির চর’, ‘অরণ্য’,‘গোধূলী’, ‘নীড়ভ্রষ্ট’, ‘জীবনের দিনগুলো’, ‘অনুরাগ’ ‘ঝড়ের সংকেত’। আর ছোটদের জন্য লেখা বইগুলোর মধ্যে খুব জনপ্রিয় হয়েছিলো চোর জামাই, মেঘকুমারী, মৃগপরী, বোকা জামাই, কামাল আতাতুর্ক, ডাইনি বউ, রূপকথা, কুঁচবরণ কন্যা, ছোটদের নজরুল, শিয়াল পন্ডিতের পাঠশালা, বাঘের ঘরে ঘোগের বাসা ইত্যাদি। বন্দে আলী মিয়া সাহিত্যকীর্তির জন্য পুরস্কার-সম্মাননাও কম পাননি। শিশুসাহিত্যে উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য ১৯৬২ সালে পান বাংলা একাডেমী পুরস্কার। ১৯৬৫ সালে পান প্রেসিডেন্ট পদক। মৃত্যুর পরও তিনি পেয়েছেন দুটো মরণোত্তর পদক-১৯৮৮ সালে একুশে পদক, ১৯৯০ সালে স্বাধীনতা পদক।

বাংলা সাহিত্যে যে কয়জন সাহিত্যিক স্বীয় কর্ম ও সৃজনশীলতার মহিমায় শত বাঙালির হৃদয়ে ভাস্বর হয়ে আছেন তাদের মধ্যে মাটি ও মানুষের গ্রামীণ জীবনের রূপকার কবি বন্দে আলী মিয়া অগ্রগণ্য- একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়। লোকজ ঐতিহ্যধারায় পল্লী নিম্নবিত্তের জীবনাবহ ধারণ এবং প্রতিভাস্বিক উপস্থাপন আর কোন কবির মধ্যে দেখা যায় না। কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্নেহধন্য ও আশীর্বাণী খ্যাত ‘ময়নামতির চর’ (১৯৩২) বাংলা সাহিত্যে এক উল্লেখযোগ্য সংযোজন এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
কবি বন্দে আলী মিয়া ১৯৭৯ সালের ২৭ জুন আমাদের মাঝ থেকে চির দিনের জন্য হারিয়ে গেলেও তাঁর সাধনার ফসল, জীবন বোধের বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে রচিত ছড়া, কবিতা, গান আজো বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে অবিস্মরণীয় হয়ে আছে। পাবনা শহরের রাধানগর মহল্লয় তাঁর বাসভবন কবি কুঞ্জের পশ্চিম পাশে তাঁকে সমাহিত করা হয়। চিরতরে কবি সেখানেই ঠাঁই করে নিয়েছেন। বেছে নিয়েছেন জীবন যন্ত্রনা থেকে মুক্তি পাবার আনন্দলোকের পথ।

লেখকঃ সাবেক জাতীয় ক্রীড়াবিদ,সভাপতি শারীরিক শিক্ষাবিদ সমিতি,
চেয়ারম্যান গ্রিন ক্লাব,গবেষক,সাংবাদিক ও কলামিস্ট