ঘুষ একটি মরণ ব্যাধি যা দেশকে ধ্বংস ও অধঃপতনের অতল গহ্বরে নিক্ষেপ করে

মো.আলতাফ হোসেন ঃঃ
ঘুষ বাংলা শব্দ। একে উৎকোচও বলা হয়। যে কাজ করা ব্যক্তির দায়িত্ব, তা সম্পাদনের জন্য বিনিময় গ্রহণ করা অথবা যে কাজ করা তার জন্য ওয়াজিব- তা সম্পাদনের জন্যে বিনিময় গ্রহণ করাকে ঘুষ বলে।
ঘুষ একটি সামাজিক ব্যাধি। ঘুষ হচ্ছে স্বাভাবিক ও বৈধ উপায়ে যা কিছু পাওয়া যায় তার ওপর অবৈধ পন্থায় অতিরিক্ত কিছু গ্রহণ করা। কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী তার দায়িত্ব পালনের জন্য নিয়মিত বেতন/ভাতা পাওয়া সত্ত্বেও যদি বাড়তি কিছু অবৈধ পন্থায় গ্রহণ করে তাহলে তা ঘুষ হিসাবে বিবেচিত। অনেক সময় স্বীয় অসৎ উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য ঘুষ দেওয়া হয়। আবার অনেক সময় টাকা-পয়সা ছাড়াও উপহারের নামে নানা সমগ্রী প্রদান করা হয়। সুতরাং যেভাবেই হোক, আর যে নামেই হোক তা ঘুষের অন্তর্ভুক্ত। নবী করিম (সা.) এরশাদ করেছেন, ‘ঘুষ প্রদানকারী ও গ্রহণকারী উভয়ের ওপরই আল্লাহর লা‘নত।’
ঘুষ ও দুর্নীতিও নানা রকমের রয়েছে। তবে ঘুষ হচ্ছে প্রধান ও সবচেয়ে ব্যাপক দুর্নীতি। ঘুষের এই ব্যাপকতা কেবল আখিরাতের জন্যই ভয়াবহ নয়; বরং আমাদের এই সামাজিক জীবনেও দুর্ভোগের কারণ। ঘুষের বিষয়টি এখন আর লুকোছাপা নেই; তা এখন সবারই জানা। বাসে, লঞ্চে, পথে-ঘাটে মানুষ ঘুষের আলাপ করছে। আমাদের আশপাশের লোকজন তা শুনেও কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে না। এ রকম অবস্থার কারণেই আমরা জাতি হিসেবে ক্রমশ বোধহীন হয়ে পড়েছি এবং ভবিষ্যতের অজানা লা‘নত অথবা দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি অথবা সন্ত্রাসের আরও প্রকোপ দেখে এক বিরাট ভয় আমাদেরকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। কিন্তু ধর্মের বাণী আজ আমাদের জীবনে বাস্তব রূপ ধরে আসলেও আল্লাহর হুকুম পালন করার প্রতি আমাদের আগ্রহ নেই, যা দুঃখজনক হলেও সত্য। এ হচ্ছে এক ভয়াবহ অবস্থা।
ঘুষ বা উৎকোচ আসে নজরানার রূপ ধরে। ‘নবী করিম (সা.) একজন সাহাবীকে কর্মচারী নিয়োগ করে যাকাত আদায়ের জন্য পাঠালেন। সে ফিরে এসে রাসূল (সা.) কে বললেন, এটা যাকাতের মাল আর এটা আমাকে উপঢৌকনস্বরূপ দেওয়া হয়েছে। এতে রাসূলুল্লাহ (সা.) এর চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেলো। তিনি মসজিদের মিম্বারে দাঁড়িয়ে বললেন- সরকারী কর্মচারীর কি হলো! আমরা যখন তাকে কোনো দায়িত্ব দিয়ে কোথায়ও প্রেরণ করি তখন সে ফিরে এসে বলে এই মাল আপনাদের (সরকারের) এবং এটা আমাকে প্রদত্ত উপহার। সে তার বাড়িতে বসে থেকে দেখুক তাকে উপহার দেওয়া হয় কি-না।’ একবার এক সরকারী উর্ধ্বতন কর্মকর্তা ওমর (রা.) কে কিছু উপহার দিলেন। উপহারগুলো দেখে ওমর (রা.)বলেছিলেন- তুমি যে বললে এগুলো বায়তুলমালের আর এগুলো আমার উপহার! তুমি এই পদ ছেড়ে বাপের ঘরে বসে থাক, দেখ তো কে তোমার জন্য উপহার নিয়ে আসে।’ সত্য-মিথ্যার পার্থক্য করার এই জ্ঞান ও সাহসের জন্যই নবী (সা.) তাকে আল-ফারুক উপাধি দিয়েছিলেন।
ঘুষ হচ্ছে একটি হারাম জিনিস। যদিও ঘুষখোর এটাকে হারাম মনে করে না। আয়াতে ঘুষ খেয়ে ধর্মের বাণী বদলে দেওয়ার কথা বলা হলেও সকল জালিয়াতির জন্যই শাস্তি প্রযোজ্য। ঘুষ সব সময় টাকা-পয়সা হয় না। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নানান বস্তু ও বিষয় হতে পারে। এ জন্যই হাদিসের ভাষায় এটিকে বলে ‘রিশওয়াহ’ বা দড়ি। দড়ি দিয়ে কুপের ভেতর থেকে বালতি টেনে উঠাবার মত ঘুষ অন্যের হক নিজের ঘরে নিয়ে আসে। এজন্য এই প্রক্রিয়ায় তিনটি পক্ষ থাকে। ১. রাশী যে ঘুষ প্রদান করে, ২. মুরতাশী যে ঘুষ গ্রহণ করে এবং ৩. রায়েশ যে অনুঘটক হয়ে কাজ করে।
ইসলামের পরশ আমাদের ক্বলবে পৌঁছেনি বলেই আজ আমরা ঘুষকে উপহার ভাবি। অফিসের ফাইল ঘুষ না পেলে সামনে চলে না। যার ফলে দেশ ও জাতির কাক্সিক্ষত উন্নতি হয় না। কর্মকর্তা কর্মচারীদের মধ্যে মেধাহীনদের রাজত্ব চলে। ঘুষ দিয়ে যে চাকুরী পেতে হয় সেই চাকুরীকে সেবা মনে করার কোনো কারণ নেই। আর তাই ঘুষ দিয়ে শিক্ষকের চাকুরী পাওয়া লোকটির কাছ থেকে তার ছাত্ররা কতটুকু এলেমদার হবে তা নিয়ে মনে অনেক সংশয় থেকে যায়। এই ঘুষের জামানায় পাকা দড়িবাজরা তরতর করে উপরে উঠে যাচ্ছে দেখে আল্লাহর নেক বান্দারা মাঝে মাঝে ভাবে, যে কি নেক নিয়তের কি কোনো দাম নেই? এটা কি বোকামি? কিন্তু তিতা ফলের চারা লাগিয়ে যেমন সুমিষ্ট ফলের আশা করা যায় না তেমনি দুর্নীতির মাধ্যমে গড়ে উঠা ব্যবস্থাপনার কাছে কোনো কল্যাণ আশা করা যায় না। তাই ঘুষ সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন: ‘এরপর যালিমরা বদলে দিল যা তাদের বলা হয়েছিলো। তার পরিবর্তে অন্য কথা। এ কারণে যারা যুলুম করলো তাদের ওপর নাযিল করলাম আকাশ হতে এক মহাশাস্তি। কারণ, তারা অধর্ম-অন্যায় কাজ করেছিলো।’ (আল-কোরআন,২:৫৯) এ আয়াতে সত্যকে বদলে দেওয়ার শাস্তির উল্লেখ আছে। ঘুষও সত্যকে বদলে দেয়। পাসকে ফেল দেখিয়ে দেয়। একজন হকদারের হক বদলে দিয়ে অন্যকে অন্যায়ভাবে দেওয়া হয়। অতীত যামানায় যারা ঘুষ গ্রহণ করত, দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে ধর্মের বাণীতে জালিয়াতি করতো তাদের সম্পর্কে আল-কোরআনে বলা হয়েছে: ‘সুতরাং দুর্ভোগ তাদের জন্য যারা নিজ হাতে কিতাব রচনা করে এবং তুচ্ছ মূল্য প্রাপ্তির জন্য বলে এটি আল্লাহর নিকট হতে এসেছে। তাদের হাত যা রচনা করেছে তার জন্য শাস্তি তাদের এবং যা তরা উপার্জন করে তার জন্যও শাস্তি তাদের।’ (আল-কোরআন,২:৭৯)
ইমাম তাবারানী তার আল-মু‘জামুস সগীর গ্রন্থে একটি হাদীস সংকলন করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: ‘রিশওয়াহ বিচারের ক্ষেত্রে কুফরি। লোকেরা নিজেদের মধ্যে এ কাজ করা সুহত।’ আগেই বলা হয়েছে রিশওয়াহ অর্থ ঘুষ। তাহলে সুহত অর্থ কি? এ প্রশ্নের উত্তর পাই রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর একটি হাদিসে: ‘যে গোশত উদগত হয়েছে সুহত থেকে, তার জন্য জাহান্নামের আগুনই বেশি উপযোগী। একজন জিজ্ঞেস করলো, সুহত কী? তিনি বললেন, বিচার বা শাসনকার্যে ঘুষ গ্রহণ।’ তাহলে দেখা যায় যে, ঘুষের অর্থে যে নিজে পানাহার করে এবং তার পোষ্যদের পানাহার করায় সকলের জন্যই তা খুবই মন্দ কাজ। এই ঘুষ-লালিত দেহের ইবাদত আল্লাহ কবুল তো করবেনই না বরং তাদের জন্য লাঞ্ছনা, আখিরাতের আগুণ অপেক্ষা করছে। ইহুদীদের দুর্গতির কারণ হিসেবে আল্লাহ তা‘য়ালা বলেন: ‘তারা মিথ্যা শ্রবণে অত্যন্ত আগ্রহশীল এবং অবৈধ (ঘুষ) ভক্ষণে অত্যন্ত আসক্ত।’ (আল-কোরআন, ৫:৪২) অপর একটি আয়াতে আল্লাহ তা‘য়ালা বলেন: ‘হে নবী! আপনি (আহলে কিতাবদের) অনেককেই দেখবেন পাপে, সীমালঙ্ঘনে ও অবৈধ ভক্ষণে (ঘুষ খাওয়াতে) তৎপর। তারা যা করে নিশ্চয় তা নিকৃষ্ট।’ (আল-কোরআন, ৫:৬২)
আয়াতে ‘অবৈধ ভক্ষণ’ তরজমা করা হলেও হাদীসে এই ‘সুহত’ বা অবৈধ আয়কে ঘুষ হিসেবে তাফসীর করে দেওয়া হয়েছে। তবে সকল প্রকার দুর্নীতির মাধ্যমে উপার্জিত আয়ও এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। এই ঘুষের বিষয়টি পবিত্র কোরআনের একটি আয়াতে স্পষ্টতই এসেছে। বিচারের রায়কে প্রভাবিত করা এবং প্রশাসকদেরকে নিরপেক্ষতা ও ন্যায়নিষ্ঠতা থেকে আলাদা করাই যে ঘুষের মূখ্য উদ্দেশ্য হয়ে থাকে তা প্রতিফলিত হয়েছে এই আয়াতে: ‘তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অন্যের অর্থ-সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করো না এবং মানুষের ধন-সম্পত্তির কিছু অংশ জেনেশুনে অন্যায়ভাবে গ্রাস করার উদ্দেশ্যে তা বিচারকদের বা প্রশাসকদের কাছে পেশ করো না।’ (আল-কোরআন, ২: ১৮৮)

ঘুষ আমাদের জাতীয় উন্নয়নকে ব্যাহত করছে। ঘুষের কারণে মানুষ যোগ্যতার মূল্যায়ণ পাচ্ছে না। ঘুষের চিন্তায় যখন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাথা ঘুরতে থাকে তখন হাতের কলম সিরাতুল মুস্তাকীমে চলে না। ঘুষ হচ্ছে সমাজদেহে নীরব মরণ ব্যাধি। সকল নীতি-নৈতিকতা, সমস্ত আইন-কানুন, বিধি-বিধানকে বিধ্বংস করে দেওয়ার জন্য ঘুষ নামক এই নমরুদই দায়ী। এ হচ্ছে এক মরণ ভাইরাস যা আমাদের সমাজের সকল ব্যবস্থাপনাকে নাজেহাল করে দিচ্ছে। এই অভিশাপ থেকে মুক্ত হতে না পারলে আমাদের উপর আল্লাহর রহমত নাযিল হবে না এবং আমরাও একটি সময় অতীতের নমরূদ, ফিরাউনদের ন্যায় অভিশপ্ত জাতিতে পরিণত হব ও আল্লাহর গজবে ধ্বংস হয়ে যাব। কালব- এর পরিশুদ্ধির জন্য দেহ পরিশুদ্ধ থাকতে হয়। হালাল রুজি বা সৎ উপার্জনকারী আল্লাহর বন্ধু বলে রাসূলুল্লাহ (সা.) ঘোষণা করেছেন। পক্ষান্তরে, অসৎ উপার্জন করে অতি তাড়াতাড়ি সুখের সন্ধান করা আসলে বৃথা। অনেকেই অর্থ উপার্জনে সুবিধাজনক বিষয়ে লেখাপড়া শেষ করেই তার পেশায় এমনভাবে মগ্ন হয় যেন সে পারে তো দু দিনেই বিশাল বিত্ত-বৈভবের মালিক হয়ে যায়। লোকের সেবা করা এবং এজন্য ত্যাগী মনোভাব নিয়ে কাজ করার কোনো লক্ষণই দেখা যায় না। রাসূলুল্লাহ (সা.) এক হাদীসে এই তাড়াহুড়া করে অসৎভাবে উপার্জন করা থেকে বিরত থাকতে বলেছেন: ‘কোনো প্রাণী তার রিযিক পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত কখনও মরবে না। সাবধান! আল্লাহকে ভয় করো এবং আবেদনে সৌন্দর্য বজায় রাখো। তোমার রিযিক ধীরগতিতে আসার কারণে তা আল্লাহর নাফরমানির মাধ্যমে চেয়ো না। কারণ তাঁর নিকট যা আছে তা লাভ করতে হলে তাঁর আনুগত্যের মাধ্যমেই করতে হবে।’ (বাযযার, ইবন মাসউদ (রা.) হতে) তবে কেউ যদি অন্যের সম্পদ গ্রাস করে তবে তার পরিণতি সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন: ‘যারা ইহুদী ছিলো, তাদের যুলুমের কারণে আমরা তাদের ওপর এমন সব পবিত্র বস্তু হারাম করে দিয়েছি, যা ছিলো তাদের জন্য হালাল। এছাড়াও আল্লাহর পথে অনেক বাধা দেওয়ার জন্য তা করেছিলাম এবং তারা সুদ গ্রহণের কারণে- যা তাদেরকে নিষেধ করা হয়েছিলো এবং অন্যায়ভাবে লোকের ধনসম্পদ গ্রাস করার জন্য। কাফিরদের মর্মন্তুদ শাস্তি প্রস্তুত রেখেছি।’ (আল-কোরআন, ৪:১৬০-১৬১) এমনিভাবে অসৎ উপার্জন করে গাড়ি-বাড়ি, বিত্ত-বৈভব, প্রভাব-প্রতিপত্তি লাভ করার যে তীব্র আকাঙ্খা মানুষের মনে জাগে এবং শয়তান এইসব অপকর্মকে আকর্ষণীয় ও লোভনীয় করে সামনে তুলে ধরে, এর পরিণতি দুনিয়া ও আখিরাতে ভয়াবহ! ইসলামে ঘুষ সম্পূণরুপে হারাম। ঘুষদাতা ও ঘুষগ্রহিতা উভয়ে জাহান্নামী।
নবী করিম (সা.) বলেন, প্রশাসনের ব্যক্তিবর্গ হাদিয়া কবুল করলে চুরি বলে গণ্য হবে। (অর্থাৎ হারাম হবে) (মুসনাদে আহমাদ পৃ ৪২৪) রাসূল (সা.) আরো বলেন, রাজা-বাদশাদের হাদিয়া গ্রহণ করা ঘুষের অন্তর্ভুক্ত। (খতিবে বাগদাদী রচিত তালখীসুল মুতাশাবিহ পৃ. ৩৩১।
আমাদের সামনে স্পষ্ট হলো। কোনো প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা বা কর্মচারী তার দায়িত্ব পালনের জন্য নিয়মিত বেতন/ভাতা পাওয়া সত্ত্বেও যদি বাড়তি কিছু অবৈধ পন্থায় গ্রহণ করে তাহলে তা ঘুষ হবে। তখন বিনা সুওয়ালে দেয়া হোক বা খুশি মনে দেয়া হোক। এখন তাহলে কি নিজেদের মধ্যেও হাদিয়া দেয়া যাবে না? একজন মানুষের সাথে কয়েক ধরণের সম্পর্ক থাকে। কখনো নিজেদের মধ্যে কেউ কর্মকর্তা হয় আর অন্যজন অধিনস্ত হয়। এক্ষেত্রে যতক্ষণ প্রশাসনিক কাজে রয়েছে ততক্ষণ যে কোনো অতিরিক্ত দান ঘুষ হবে। যদি প্রশাসনিক কাজে না থাকে। এবং তাদের মধ্যে পূর্ব থেকেই হাদিয়া আদান প্রদানের সম্পর্ক রয়েছে তখন পূর্বে যতটুকু হাদিয়া দিত ততটুকুই দিতে পারবে এরচেয়ে বেশি নয়। যদি পরিচয়টি এ চাকরির সুবাধে হয়েছে তবে তখন গ্রহণ করলে তা হাদিয়া হবে না বরং তা ঘুষ হবে।
বর্তমানে আরেক মহাদুর্যোগ শুরু হয়েছে যে, ঘুষকে আর এখন ঘুষ বলে না, কেউ তাকে হাদিয়া বলে, কেউ তাকে উপহার, উপটৌকন, সম্মানীসহ বিভিন্ন নামে গ্রহণ করছে। কেউ যুক্তি দাঁড় করাচ্ছে আমিতো তার কাছে চাই না। তাই হাদিয়া হবে। জলজ্যন্ত একটি হারাম কে এখন হারামও মনে করছে না মুসলমান। বরং তাকে হালাল করার জন্য কোরআন হাদীস ও দেশের আইনের অপব্যখ্যা করছে ও বোল পাল্টাচ্ছে। ঘুষ হারাম শব্দ পরিবর্তন করে তাকে হালাল করা যাবে না। বরং শব্দ পরিবর্তনের জন্যও রয়েছে শাস্তির ব্যবস্থা। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, এরপর যালিমরা বদলে দিল যা তাদের বলা হয়েছিলো। তার পরিবর্তে অন্য কথা। এ কারণে যারা যুলুম করল তাদের উপর নাযিল করালাম আকাশ হতে এক মহাশাস্তি। কারণ তারা অধর্ম-অন্যা কাজ করেছিলো। (আল-কোরআন, ২:৫৯)
সুদ প্রথা টাকা দিয়ে টাকা উপার্জন করা, ইসলামী সমাজে একটি অমার্জনীয় অপরাধ। ইসলামের দৃষ্টিতে ইহা একটি মারাত্মক ও ধ্বংসাত্মক শোষণের কৌশল। ইসলামে এই অপরাধের কোন ক্ষমা নেই। কারণ ইহা ব্যক্তি, মানুষ ও সমাজকে নিঃস্ব করে দেয়। ঘুষ একটি সামাজিক ব্যাধি, সমাজের ক্ষমতাহীন মানুষেরা তার হৃত অধিকার কিংবা অন্যের অধিকারকে করায়ত্ব করার লক্ষ্যে দুর্নীতিপরায়ণ দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে যে অবৈধ অর্থ কিংবা পণ্যসামগ্রী পর্দার অন্তরালে প্রদান করে থাকে ইহাই ঘুষ কিংবা উৎকোচ নামে পরিচিত।
যদি কেউ ঘুষকে হাদিয়া বা উপটৌকন, সম্মানী ইত্যাদি নাম দিয়ে ভক্ষণ করার ফন্দি-ফিকিরে লিপ্ত তাদের সাবধান হওয়া চাই। ইসলামে মন্দকে মন্দ বলা যথার্থ, যদিও সে মন্দে লিপ্ত। যদি হারামকে হালাল মনে করা হয় এবং হারামকে হালাল শব্দ দিয়ে নিশ্চিন্তে গ্রহণ করে তবে ঈমানের সমস্যা হয়ে যাবে। আল্লাহ তা’য়ালা আরো বলেন, দুর্ভোগ তাদের জন্য যারা নিজ হাতে কিতাব রচনা করে এবং তুচ্ছ মূল্য প্রাপ্তির জন্য বলে এটি আল্লাহর নিকট হতে এসেছে। তাদের হাত যা রচনা করেছে তার জন্য শাস্তি তাদের এবং যা তারা উপার্জন করে তার জন্যও শাস্তি তাদের। (আল-কোরআন ২ : ৭৯)
ঘুষ দুর্ণীতি যদিও হাজার বছর ধরে চলে আসছে কিন্তু ইসলাম ধর্মে এ ঘুষকে হারাম ঘোষণা করেছে। তখন থেকে মুসলিমগণ ঘুষ গ্রহণ করতেন না। এ ঘুষের প্রচলন ভারতবর্ষে আবার শুরু হয়েছে ইংরেজদের আমল থেকে। ভারতবর্ষে ঘুষ শুরু হয় তখন থেকে। অতএব আমাদের আল্লাহর আযাব ও লানত থেকে বাঁচতে হবে। না হয় দুনিয়া ও আখেরাত দু’টি নষ্ট হবে নিশ্চিত। তাই ঘুষসহ সকল অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে।
সুদ ও ঘুষ সম্পর্কে মহান আল্লাহ তা’য়ালা পবিত্র কোরআনে স্পষ্টভাবে বলেছেন : ‘তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না এবং মানুষের ধন-সম্পত্তির কিছু অংশ জেনে বুঝে অন্যায়ভাবে গ্রাস করার উদ্দেশ্যে বিচারককে উৎকোচ দিও না।’ (বাকারা ১৮৮)
ইবাদত কবুল হওয়ার প্রথম শর্ত হচ্ছে হালাল রুজি। এ জন্য প্রত্যেক মুসলমানের পক্ষে হালাল রুজি অন্বেষণ করা ফরজ। রাসূল করিম (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি হালাল রুজি দ্বারা তার পরিবার প্রতিপালনের চেষ্টা করে থাকে, সে আল্লাহর পথে যোদ্ধার মতো। যে ব্যক্তি নিজেকে সংযত রেখে দুনিয়ায় হালাল রুজি অন্বেষণ করে, সে শহীদদের পদমর্যাদায় অবস্থিত। তিনি আরো বলেছেন, যে ব্যক্তি ৪০ দিন ধরে হালাল দ্রব্য ভক্ষণ করে, আল্লাহ তার হৃদয়কে জ্যোতির্ময় করেন এবং তার অন্তর থেকে তার মারফতে হেকমতের ফোয়ারা প্রবাহিত করে দেন। (ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন, হালাল-হারাম অধ্যায়, পৃষ্ঠা-২৬৮)
ঘুষের লেনদেন মানুষ নিজের স্বার্থে করে। যা সামাজিকভাবে গুরুতর অপরাধ। ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে তা ভয়াবহ পাপ। ঘুষের লেনদেনকে ইসলাম কোনোভাবে প্রশ্রয় দেয় না। কেননা, ঘুষ গ্রহণ করা মানে অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে আত্মসাত করা। যা হারাম। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা’য়ালা এরশাদ করেন, ‘তোমরা নিজেদের মধ্যে একজন অপরজনের ধনসম্পদ অবৈধভাবে গ্রাস করো না। মানুষের ধন সম্পদের কিছু অংশ জেনে শুনে অন্যায়ভাবে গ্রাস করার উদ্দেশ্যে তা বিচারককে ঘুষ দিও না। ’ (সূরা আল বাকারা: ১৮৮)
অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থ আল্লাহর রাস্তায় দান করলেও এর কোনো মূল্য নেই। এ সম্পর্কে হাদিসে উল্লেখ আছে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কোনো ব্যক্তি হারাম ধন-সম্পদ উপার্জন করে তা থেকে দান করলে তা কখনো কবুল করা হয় না এবং তার জন্য সে মাল বরকতপূর্ণও হয় না। তার পরিত্যক্ত হারাম ধন-সম্পদ তার জন্য জাহান্নামের পাথেয় ছাড়া আর কিছুই হয় না। অর্থাৎ এর দ্বারা পরকালীন কল্যাণ ও মঙ্গল লাভ করা যায় না। আল্লাহ তা’য়ালার চিরন্তন নিয়ম এই যে তিনি কখনো মন্দ দ্বারা মন্দ দূরীভূত করেন না। বরং তিনি ভালো দ্বারা মন্দকে অপনোদন বা দূরীভূত করেন। নাপাক, নাপাক বা নোংরা বস্তুকে দূরীভূত করে পবিত্র-পরিচ্ছন্ন করতে পারে না।
ঘুষের কারণে আর্থসামাজিক উন্নয়ন বাধাঁগ্রস্থ হয়। বরাদ্দকৃত অর্থের সিংহভাগ ঘুষের মাধ্যমে চলে যায়। ঘুষদাতা এবং গ্রহীতা উভয়ে নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়ে। ঘুষ গ্রহণকারী বিনাশ্রমে অতিরিক্ত টাকা পেয়ে বিভিন্ন ধরণের অপরাধে লিপ্ত হয়। অনেকে তো বলেন, অস্ত্র ঠেকিয়ে অর্থ আদায় আর ফাইল আটকিয়ে টাকা গ্রহণে কোনো পার্থক্য নেই, পদ্ধতির প্রভেদ ছাড়া।
অভিজ্ঞদের মতে, সমাজকে এগিয়ে নিতে সর্বাগ্রে ঘুষের লেনদেন চিরতরে বন্ধ করতে হবে। কেননা, সমাজ ও রাষ্ট্রে ঘুষের লেনদেন ছড়িয়ে পড়লে সে সমাজে ভীতি ও সন্ত্রাস ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। তাই, আদর্শ সমাজ বিনিমার্ণে ঘুষের লেনদেনকে অবশ্যই না বলতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।
হাদিস শরিফে রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘আর-রাশি ওয়াল মুরতাশি কিলা হুমা ফিননার অর্থ : ঘুষ যে দেয় এবং নেয়, দুই জনই জাহান্নামি।’ আরেকটি হাদিসে রাসূল (সা.) বলেছেন, এমন একটা সময় আসবে যখন মানুষ ঘুষ দেওয়া-নেওয়াকে সামাজিক নিয়ম বানিয়ে ফেলবে। অন্য হাদিসে নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘মানুষ ঘুষ দেবে-নেবে উপহারের নামে।’ হাদিসগুলো মিশকাত শরিফ থেকে নেওয়া। ঘুষ হলো যে কাজের যোগ্য আপনি নন,কিন্তু সে কাজ করার জন্য কর্তৃপক্ষকে আর্থিক কিংবা যে কোনো ধরনের সুবিধা দেওয়াই ঘুষ। ইসলামের নবী ঘুষ দাতা-গ্রহীতা দুই জনকেই জাহান্নামি বলেছেন।
ঘুষ একটি অন্যায় কাজ- একথা সকলে একবাক্যে স্বীকার করেন। অথচ দুঃখজনক যে, এটি দেশের সর্বত্র বহাল তবিয়তে চালু রয়েছে। এতে একজনের প্রাপ্তি এবং অন্যজনের ক্ষতি ও মনঃকষ্ট, মানুষে মানুষে ঘৃণা, ক্ষোভ, আইনের প্রতি অশ্রদ্ধা ইত্যাদি নৈতিক ও সামাজিক অবক্ষয়ের মধ্য দিয়ে পুরো রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা ক্রমে বিপর্যয়ের দিকে ধাবিত হয়। অপরদিকে সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ অখুশি হন। এর অশুভ পরিণতি এক সময় নিজের ওপর ও পরবর্তী প্রজন্মের ওপর বর্তায়। তাই স্বভাবতঃই এর নগ্ন চেহারা ও অশুভ পরিণতি নিয়ে আলোচনা এখন খুবই প্রাসঙ্গিক এবং সময়ের অনিবার্য দাবী।
ঘুষের মাধ্যমে অন্যের প্রতি আর্থিক ও মানসিক যুলুম করা হয় বলে ঘুষখোররা যালেম হিসাবে অপরাধী। যুলুমের শাস্তি সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে, ‘কেবল তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা অবলম্বন করা হবে, যারা মানুষের প্রতি যুলুম করে এবং পৃথিবীতে অন্যায়ভাবে বিদ্রোহ করে বেড়ায়। তাদের জন্য রয়েছে মর্মন্তুদ শাস্তি’ (শূরা ৪২/৪২)।
আরো এরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ যালিমদেরকে পছন্দ করেন না’ (শূরা ৪২/৪০)। মহান আল্লাহ অন্যত্র বলেন, ‘যারা যুলুম করে তোমরা তাদের দিকে ঝুঁকে পড় না। পড়লে তোমাদেরকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে। এমতাবস্থায় আল্লাহ ব্যতীত তোমাদের কোনো অভিভাবক থাকবে না এবং তোমাদের সাহায্য করা হবে না’ (সূরা হুদ ১১/১১৩)। তিনি আরো বলেন, ‘আর আল্লাহ যালিম সম্প্রদায়কে সৎপথে পরিচালনা করেন না’ (সূরা জুম‘আ: ৬২/৫)।
ঘুষখোর যালিমরা নিরীহ মযলূমদের বদ দোয়া ও প্রতিশোধের শিকার : রাসূল (সা.) বলেন,‘তুমি মযলুমের বদ দোয়া থেকে বেঁচে থাকো। কেননা মযলুমের বদ দো‘য়া ও আল্লাহর মাঝে কোনো পর্দা নেই’। অর্থাৎ মযলুমের দো‘য়া ব্যর্থ হয় না। তাছাড়া কিয়ামতের দিন অন্যের সম্পদ ভক্ষণকারী যালিমের নিকট থেকে তার নেকী হ’তে মযলুমের বদলা পরিশোধ করা হবে। নেকী শেষ হয়ে গেলে মযলুমের পাপ যালিমের ওপর চাঁপানো হবে। পরিশেষে তাকে নিঃস্ব অবস্থায় জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।
ঘুষ কিয়ামতের দিন বিপদের বোঝা হয়ে ঘুষখোরের কাঁধেই চেঁপে বসবে। নবী করিম (সা.) কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত জনৈক কর্মচারীর হাদিয়া গ্রহণের কথা শুনে এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি ঘোষণা দিলেন, ‘সেই সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ! সাদকা মাল হ’তে স্বল্প পরিমাণও যে আত্মসাৎ করবে, সে তা কাঁধে নিয়ে কিয়ামত দিবসে উপস্থিত হবে। সেটা উট হ’লে তার আওয়ায করবে, গাভী হ’লে হাম্বা হাম্বা শব্দ করবে এবং বকরী হ’লে ভ্যাঁ ভ্যাঁ করতে থাকবে’।
প্রয়োজনের তুলনায় স্বল্প বেতনের কারণে মানুষ ঘুষের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে থাকে। এজন্য ইসলাম প্রত্যেককে এমন মজুরি বা বেতন প্রদানের কথা বলেছে যে তা দ্বারা সে তার ন্যায়ানুগ ও স্বাভাবিক প্রয়োজন মেটাতে পারে। শ্রমিকদের অধিকার সম্পর্কে মহানবী (সা.) বলেন, “তারা তোমাদের ভাই। আল্লাহ তাদেরকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন। কারো ভাই তার অধীনে থাকলে তার উচিত নিজে যা খাবে তাই খাওয়াবে। নিজে যা পরবে তাকেও তা পরতে দিবে এবং তাকে দিয়ে এমন কাজ করাবে না যা তার সাধ্যাতীত। কোনভাবে তার ওপর আরোপিত বোঝা বেশি হয়ে গেলে নিজেও সে কাজে তাকে সাহায্য করবে।”
ইসলামের দৃষ্টিতে হাদিয়ার আদান প্রদান শুধু জায়েযই নয় বরং সুন্নত। কিন্তু ঘুষ নাজায়িয। হাদিয়ার দ্বারা পরস্পরের মধ্যে আন্তরিকতা ও ভালবাসা সৃষ্টি হয় আর ঘুষের কারণে তা নষ্ট হয়। হাদিয়া ও ঘুষের মধ্যে পার্থক্য হলো, হাদিয়ার মধ্যে দাতা ও গ্রহীতার অন্তরের পারস্পারিক মহব্বত ছাড়া পার্থিব কোনো স্বার্থ হাসিল কিংবা কোনরূপ অবৈধ সুবিধা পাওয়ার আশা থাকে না। কিন্তু ঘুষের মধ্যে এ ধরনের আশা থাকে। দায়িত্বে নিয়োজিত কোনো ব্যক্তিকে হাদিয়ার আকারে কোনো কিছু প্রদান করাও ঘুষের অন্তর্ভুক্ত। ঘুষ খাওয়ার কু-অভ্যাস পৃথিবীতে প্রথম শুরু হয় ইহুদী পন্ডিতদের থেকে।
মহান আল্লাহ তাদের সেই ভক্ষণকে তিরস্কার করে পবিত্র কোরআনে এরশাদ করেছেন, ‘তাদের (ইহুদীদের) অনেককে তুমি দেখবে পাপাচারিতায়, সীমা লংঘনে ও অবৈধ ভক্ষণে তৎপর। তারা যা করছে নিশ্চয় তা কতো নিকৃষ্ট।(তাদের) রাব্বানীগণ ও পন্ডিতগণ তাদেরকে পাপ কথা বলতে এবং অবৈধ ভক্ষণে নিষেধ করে না, এরা যা করছে নিশ্চয়ই তা অতি নিকৃষ্ট’-(সুরা মায়িদা- ৬২-৬৩)।
ঘুষ থেকে বেঁচে থাকা মু’মিনের জন্য অপরিহার্য কর্তব্য। ১. পরকালের ভয়। ২. সম্পদের লোভ বর্জন। সম্পদ বৃদ্ধির লোভ ও দুনিয়াপ্রীতি মানুষকে অবৈধ পন্থায় সম্পদ অর্জন করতে উদ্বুদ্ধ করে। ৩. আল্লাহভীতি, ৪. সম্পদ অর্জনে ইসলামী নীতি অবলম্বন। সম্পদ অর্জনের অনেক বৈধ পন্থা রয়েছে। যার বৈধ পন্থায় সম্পদ অর্জনের অভিজ্ঞতা রয়েছে, সে অবৈধ পন্থা অবলম্বন করবে না। ৫. শাস্তির ব্যবস্থা। ঘুষ খাওয়া একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ৬. গণসচেতনতা ৭. যথাযথ পারিশ্রমিক প্রদান। ৮. স্বজনপ্রীতি পরিহার। স্বজনপ্রীতি ও দলীয়করণ মানুষকে মন্দ কাজ করতে বাধ্য করে। ঘুষ নামক মন্দ কাজ থেকে বাঁচার জন্য স্বজনপ্রীতি ও দলীয়করণ বর্জন করতে হবে।
মানব মর্যাদার মাপকাঠি তাকওয়া। মানুষ দ্রুত বিত্তের অধিকারী হওয়ার জন্য সাধারণত ঘুষ গ্রহণ করে থাকে। কিন্তু রাসূলুল্লাহ্ (সা.) বিত্তশালীর চেয়ে বিত্তহীনের বেশি গুরুত্ব প্রদান করেছেন। ইসলামের দৃষ্টিতে মর্যাদার মাপকাঠি অর্থবিত্ত নয় বরং ইসলামের শিক্ষা হচ্ছে যে যতো বেরি তাকওয়াসম্পন্ন বা আল্লাহভীরু, সে ততবেশি মর্যাদাবান। এ সম্পর্কে আল-কোরআনে বর্ণিত হয়েছে: ‘নিশ্চয়ই তোমাদের মধ্যে সেই আল্লাহর নিকট অধিক সম্মানিত যে অধিক আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বনকারী।’ (সূরা আল-হুজুরাত:১৩)
বর্তমানে ঘুষ বাণিজ্য এ দেশকে ধ্বংস ও অধঃপতনের অতল গহ্বরে নিক্ষেপ করছে। আগামী দিনের সুস্থ-সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠায় এটি অবশ্যই পরিত্যজ্য। এটি যতো আলোচিত হবে জনগণ এ বিষয়ে ততো সচেতন হবে এবং তার সুফল ভোগে সমর্থ হবে। হাদিয়ার ক্ষেত্রে যদি শর্ত না থাকে। তবে তা হারাম হয়ে যাবে। সুতরাং শর্তগুলো যদি থাকে তবে উভয়ের জন্য হালাল আর যদি শর্তগুলো না থাকে তবে উভয়ের জন্য হারাম। যদি দাতা বাধ্য হয় জীবন সঙ্কট মুহুর্ত বা ক্ষতি হয় তবে তখন ঐ হাদিয়া দাতার জন্য জায়েজ হবে আর গ্রহীতার জন্য হারাম হবে। হাদিয়ার ওপর পিঠে আমরা দেখতে পাই ঘুষ।
প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল পদে বহাল থেকে হারাম অর্থ গ্রহণই হচ্ছে ঘুষ। এই ঘুষ যারা দেয় তারাও সমান অপরাধী। বেআইনী ফায়দা হাসিলের জন্য যারা কর্তা ব্যক্তিদেরকে বিভিন্ন সুবিধা বা টাকা পয়সা দিয়ে প্রভাবিত করতে চেষ্টা করে তারাই এই গুণাহ সংঘটনের অন্যতম শরীক। যারা ঘুষকে একটি অঘোষিত ব্যবস্থা হিসেবে প্রশ্রয় দেয় তারাই অপরাধী। দেখা যায় মাঝে মধ্যে বেড়াই ক্ষেত খায়, রক্ষকই হয় ভক্ষক। ন্যায়কে যাদের লালন করার কথা তারাই অন্যায়কে ধারণ করছে। এভাবে দুর্নীতির ডালপালা সারা দেশে বিস্তার লাভ করে।

লেখকঃ সাবেক জাতীয় ক্রীড়াবিদ,সভাপতি শারীরিক শিক্ষাবিদ সমিতি
চেয়ারম্যান গ্রিন ক্লাব,লেখক,গবেষক,সাংবাদিক ও কলামিস্ট