জননন্দিত সৃষ্টিশীল কবি ফররুখ আহমদ

 

মো : আলতাফ হোসেন ঃঃ

ফররুখ আহমদ একজন প্রখ্যাত বাংলাদেশী কবি। এই বাঙালি কবি ‘মুসলিম রেনেসাঁর কবি’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছিলেন। তাঁর কবিতায় বাংলার অধঃপতিত মুসলিম সমাজের পুনর্জাগরণের অণুপ্রেরণা প্রকাশ পেয়েছে। বিংশ শতাব্দীর এই কবি ইসলামি ভাবধারার বাহক হলেও তাঁর কবিতা প্রকরণকৌশল,শব্দচয়ন এবং বাকপ্রতিমার অনন্য বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল। আধুনিকতার সকল লক্ষণ তাঁর কবিতায় পরিব্যাপ্ত। তাঁর কবিতায় রোমান্টিকতা থেকে আধুনিকতায় উত্তরণের ধারাবাহিকতা পরিস্ফুট। ‘‘সাত সাগরের মাঝি’’কাব্যগ্রন্থে তিনি যে-কাব্যভাষার সৃষ্টি করেছেন তা স্বতন্ত্র এবং এ-গ্রন্থ তাঁর এক অমর সৃষ্টি।

ফররুখ আহমদ খুলনা জেলা স্কুল থেকে ১৯৩৭ সালে ম্যাট্রিক এবং কলকাতার রিপন কলেজ থেকে ১৯৩৯ সালে আই.এ. পাস করেন। এরপর স্কটিশ চার্চ কলেজে দর্শন এবং ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। ফররুখ আহমদের জন্ম ১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দে (তৎকালীন যশোর জেলার অন্তর্গত) মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার মাঝাইল গ্রামে। তাঁর বাবা সৈয়দ হাতেম আলী ছিলেন একজন পুলিশ ইন্সপেক্টর। ফররুখ আহমদের মায়ের নাম রওশন আখতার। ১৯৪২ সালের নভেম্বর মাসে আপন খালাতো বোন সৈয়দা তৈয়বা খাতুন (লিলি)-এর সঙ্গে ফররুখ আহমদের বিয়ে হয়। তাঁর নিজের বিয়ে উপলক্ষে ফররুখ ‘উপহার’ নামে একটি কবিতা লেখেন যা ‘সওগাত’ পত্রিকায় অগ্রহায়ণ ১৩৪৯ সংখ্যায় ছাপা হয়। ফররুখ আহমদের কর্মজীবন শুরু হয় কোলকাতায়। ১৯৪৩ সালে আই.জি.প্রিজন অফিসে, ১৯৪৪ সালে সিভিল সাপ্লাইতে এবং ১৯৪৬ সালে জলপাইগুড়িতে একটি ফার্মে চাকরি করেন তিনি। ১৯৪৫ সালে তিনি মাসিক ‘মোহাম্মদী’-র ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। তবে শেষ পর্যন্ত স্থায়ীভাবে চাকরি করেন ঢাকা বেতারে। দেশ বিভাগের পর ১৯৪৮ সালে ফররুখ আহমদ কলকাতা থেকে ঢাকায় চলে এসে ঢাকা বেতারে যোগ দেন। এখানেই প্রথমে অনিয়মিত হিসেবে এবং পরে নিয়মিত স্টাফ আর্টিস্ট হিসেবে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন।

১৯৬০ সালে ফররুখ আহমদ বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। কবি ফররুখ আহমদ ১৯৬৫ সনে প্রেসিডেন্ট পদক প্রাইড অব পারফরমেন্স এবং ১৯৬৬ সালে পান আদমজী সাহিত্য পুরস্কার ও ইউনেস্কো পুরস্কার। ১৯৭৭ ও ১৯৮০ সালে তাঁকে যথাক্রমে মরণোত্তর একুশে পদক ও স্বাধীনতা পদক দেওয়া হয়। কবি ফররুখ আহমদ ছিলেন একজন ভাষা সৈনিক। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে তিনি সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন নিয়ে তার “মধুর চেয়েও মধুর যে ভাই আমার দেশের ভাষা” গানটি বেশ জনপ্রিয় হয়। পাকিস্তান আন্দোলন চলাকালীন ভাষা বিতর্কের সময় থেকেই তিনি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে জোরদার ছিলেন।পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপরই তিনি মাসিক সওগাত (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর, ১৯৪৭) সংখ্যায় পাকিস্তান: রাষ্ট্রভাষা ও সাহিত্য নিবন্ধে লেখেন: “গণতান্ত্রিক বিচারে যেখানে সমগ্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা হওয়া উচিত, সেখানে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্র্রভাষাকে পর্যন্ত যারা অন্য একটি প্রাদেশিক ভাষায় রুপান্তরিত করতে চান তাঁদের উদ্দেশ্য অসৎ। পূর্ব পাকিস্তানের সকল অধিবাসীদের সাথে আমিও এই প্রকার অসাধু প্রতারকদের বিরুদ্ধে আমার তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি”। বায়ান্নর রক্তাক্ত ঘটনার পর রেডিওতে কর্মরত শিল্পী আলতাফ মাহমুদ, আব্দুল আহাদ, আব্দুল হালিম চৌধুরীদেরকে নিয়ে তিনি ধমঘটে যোগদেন। তিনি তদানিন্তন পাকিস্তানী শাসকদের ব্যাঙ্গ করে ‘রাজ-রাজরা’ নামে একটি নাটক লেখেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নাটকটি মঞ্চায়িত হয়। প্রখ্যাত নাট্যকার মুনীর চৌধুরী এতে অভিনয় করেন।

ফররুখ আহমদ সাহিত্যের নানা শাখায় বিচরণ করলেও তাঁর প্রধান পরিচয় ‘কবি’। ফররুখ আহমদ সনেটও রচনা করেছেন। তাঁর রচনায় ধর্মীয় ভাবধারার প্রভাব দেখা যায়। এছাড়া আরবি ও ফারসি শব্দের প্রাচুর্য তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ইসলামি ঐতিহ্যের প্রতি ছিলো তাঁর অগাধ আস্থা। তবে তিনি পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার সমর্থন করতেন। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় কবি ফররুখ আহমদ। তিনি মুসলিম রেনেসাঁর কবি হিসেবে সমধিক পরিচিত। কারণ তাঁর কবিতা তৎকালীন বাংলার অধঃপতিত মুসলিম সমাজের পুনর্জাগরণের অনুপ্রেরণা জোগায়। দুর্ভিক্ষ পীড়িত মানুষের হাহাকার,আর্তনাদ, অনাহার ক্লিষ্টের করুণ পরিনতি,সমকালের সংকট,জরাগ্রস্ত বাস্তবতা,সাম্প্রদায়িকতার হিংস্রতা দেখে তিনি আঘাত পান।আর সকল অসঙ্গতি-ই তাঁকে সাহিত্য সাধনায় অনুপ্রেরণা জোগায়।
১৯৪৩ সালে বাংলাদেশের দুর্ভিক্ষ নিয়ে ফররুখ আহমদ অসংখ্য কবিতা রচনা করেন। যার সংখ্যা প্রায় ১৯। ১৯৪৩ সালে কিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য ‘আকাল’ নামে একটি সংকলন প্রকাশ করেন। তাতে কবি ফররুখ আহমদের বিখ্যাত ‘লাশ’ কবিতাটি স্থান পায়। দুর্ভিক্ষ নিয়ে অদ্যবধি বাংলা সাহিত্যে ‘লাশ’ এর মত কবিতা আর কেউ লিখতে পারেন নি।দুর্ভিক্ষ নিয়ে ব্যাথিত কবির উচ্চারণ-“যেখানে পথের পাশে মুখ গুঁজে প’ড়ে আছে জমিনের ’পর; সন্ধ্যার জনতা জানি কোনদিন রাখেনা সে মৃতের খবর”।

রেনেসাঁর কবি,জাগরণের কবি,ঐতিহ্যের কবি,জাতিসত্তার কবি ফররুখ আহমদ বাংলা সাহিত্যে মহান উচ্চতায় অধিষ্ঠিত। জাতীর আগামী স্বপ্নের জাল বুনতে পথ দেখিয়েছেন এই মহান কবি। তার শ্রেষ্ট সৃষ্টি ‘সাত সাগরের মাঝি’ কাব্য গ্রন্থের জন্য তিনি অমর হয়ে আছেন। এটি কবির প্রথম প্রকাশিত কাব্য গ্রন্থ। প্রকাশক ছিলেন কবি বেনজীর আহমদ। প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন। মুসলিম ঐতিহ্যের পুনর্জ্জীবন কামনা করে রোমান্টিকতার আবহে কবি জাতিকে জেগে ওঠার আহবান করেছেন। অন্যরা যখন জ্ঞান, বিজ্ঞান, শিল্প সাহিত্যে এগিয়ে যাচ্ছে কবি তখন পিছিয়ে পড়া তাঁর নিজ জাতীকে জেগে ওঠার ডাক দেন। কবি ফররুখ আহমদের কাব্যগ্রন্থগুলো হলো-‘সাত সাগরের মাঝি’(১৯৪৪),‘সিরাজাম মুনিরা’(১৯৫২),‘নৌফেল ও হাতেম’ (১৯৬১), ‘মুহুর্তের কবিতা’(১৯৬৩), ‘ধোলাইকাব্য’(১৯৬৩),‘হাতেম তায়ী’(১৯৬৬),‘নতুন লেখা’(১৯৬৯),‘কাফেলা’(১৯৮০),‘হাবিদা মরুর কাহিনী’ (১৯৮১),‘সিন্দাবাদ’(১৯৮৩), ‘দিলরুবা’ (১৯৮৪)। শিশু সাহিত্যেও তিনি অতুলনীয় ছিলেন। তার রচিত শিশুতোষ গ্রন্থ হলো- ‘পাখির বাসা’ (১৯৬৫),‘হরফের ছড়া’ (১৯৭০),‘চাঁদের আসর’ (১৯৭০),‘ছড়ার আসর’ (১৯৭০),‘ফুলের জলসা’ (১৯৮৫)।

বাংলা সাহিত্যে মাইকেল মধুসূদন দত্ত রচিত মহাকাব্য ‘মেঘনাদ বধ’ এর পরে অন্যতম সফল মহাকাব্য ফররুখ আহমদ রচিত ‘হাতেম তায়ী’।মুসলিম কবিদের মধ্যে কাব্যনাটক রচনার পথিকৃত তিনি। তাঁর ‘নৌফেল ও হাতেম’ একটি সফল ও জনপ্রিয় কাব্যনাটক। সনেট রচনায়ও সফল তিনি। বাংলা সাহিত্যে মাইকেলের পরে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে আর কোনো কবি এতো বেশি সফল সনেট রচনা করতে পারেন নি। তাঁর সনেট গ্রন্থের মধ্যে-‘মুহুর্তের কবিতা’,‘দিলরুবা’,‘অনুস্বার’ প্রধান। গদ্য কবিতা রচনায় সিদ্ধহস্ত কবি ফররুখ আহমদ। তাঁর গদ্য কবিতার সংকলন-‘হাবেদা মরুর কাহিনী’ লিখে সফল তিনি। গীতিনাট্য ‘আনার কলি’ (১৯৬৬)। বাংলা সাহিত্যের সার্থক রূপকার কবি ফররুখ আহমদের ‘হাতেম তায়ী’ কাব্যটি অমিত্রাক্ষর ছন্দে রচিত এক অমূল্য সম্পদ। এখানে তিনি কবি মাইকেলকে সম্পূণরূপে অনুস্মরণ করেননি।এ ক্ষেত্রে তাঁর লিখনীতে একটি অভিন্ন স্বতন্ত্রতা পরিলক্ষিত হয়েছে। ‘হাতেম তা’য়ী’ কাব্যটিকে বাংলার অনেক কবি সাহিত্যিক ‘মহাকাব্য ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। কবি এখানে পৌরাণিক উপমার আশ্রয় না নিলেও মুসলিম ঐতিহ্যের উপমা সম্ভার ভাষা ও ছন্দের মনোহারিত্বে বর্ণনা করেছেন। এ কাব্য বাংলা সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ। হাতেম তায়ী কাব্যের কিয়দাংশ যখন রক্তিম চাঁদ অন্ধকার তাজিতে সওয়ার উঠে আসে দিগ্বলয়ে, ওয়েসিস নিস্তব্ধ, নির্জন, দূরে পাহাড়ের চূড়া ধ্যান-মৌন; অজানা ইঙ্গিতে তখনি ঘুমন্ত প্রাণ জেগে ওঠে। তখনি এ মনে মরু প্রশ্বাসের সাথে জেগে ওঠে বিগত দিনের দীর্ঘশ্বাস।আঁধো-আলো -অন্ধকারে দেখি আমি চেয়ে বিস্মৃতির দ্বার খুলে উঠে আসে ঘুমন্ত স্মৃতিরা রত্রির অস্পষ্ট পাখী দেখি আমি অজ্ঞাত বিস্ময়ে!
কবি ফররুখ আহমদ তাঁর অমর সৃষ্টির জন্যে সরকার ও বিভিন্ন সংস্থা কর্তৃক পেয়েছেন অনেক পুরস্কার ও স্বীকৃতি। ১৯৬০ সালে তিনি প্রেসিডেন্ট পুরস্কার ‘প্রাইড অব পারফরমেন্স’ ও ‘বাংলা একাডেমী পুরস্কার’ লাভ করেন। ১৯৬৬ সালে ‘হাতেমতায়ী’ গ্রন্থটির জন্যে ‘আদমজী পুরস্কার’ এবং একই বছর তাঁর ‘পাখীর বাসা’ গ্রন্থটির জন্যে ‘ইউনেস্কো পুরস্কার’ পান। মরণোত্তর বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ১৯৭৭ সালে ‘একুশে পদক’ এবং ১৯৮০ সালে ‘‘স্বাধীনতা পুরস্কার’’ প্রদান করেন। ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃক কবিকে ‘ইসলামিক ফাউন্ডেশন পুরস্কার’ প্রদান করা হয়।

বাংলা কাব্য-সাহিত্যের এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক। আমাদের সাহিত্য-ইতিহাসের স্বল্পালোচিত ব্যক্তিসমূহের অন্যতম। অথচ বাংলা কাব্যে তার আসন তর্কাতীতভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত। নজরুলের মতই বাংলা কাব্যগগণে তাঁর আবির্ভাব ছিলো ধূমকেতুর মতো। ফররুখ আহমদ প্রথম খ্যাতি পান ১৯৪৪ সালের দুর্ভিক্ষের পটভূমিতে লেখা ‘লাশ’ কবিতার জন্য। প্রকাশিত হয় সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘আকাল’-এ। প্রথম কাব্যগন্থ ‘সাত সাগরের মাঝি’ প্রকাশিত হয় এ বছরেই। মাইকেল-রবীন্দ্র-নজরুল পরবর্তী অন্যতম কবি ফররুখ আহমদ মাত্র ছাপ্পান্ন বৎসর বয়সে আমাদের কাছ থেকে অনেক অভিমান নিয়ে চলে গেলেন। যিনি তাঁর কবিতা,গান,প্রবন্ধ ও নাটকে তুলে ধরেছেন শ্রমিক-মজুর,মেহনতি মানুষের দুঃখ,বেদনার কথা, তাদের ওপর উপরতলার মানুষের নির্যাতনের কথা।সাম্রাজ্যবাদের শোষণ-বঞ্চনা আর জুলুমের কথা।শিক্ষিত মধ্যবিত্ত মার্জিত পরিবারে সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মগ্রহণ করলেও কবির জীবনের শেষ সময়গুলো কেটেছে দুর্বিষহ অসচ্ছলতা ও অর্থকষ্টের মধ্য দিয়ে। তার চিকিৎসক বলেছেন, ‘ফররুখ আহমদ ঠিকমতো চিকিৎসা,ওষুধ ও পথ্য পেলে আরো কিছুদিন জীবিত থাকতেন।’পৃথিবীর ইতিহাসে দেখা যায়, যুগে যুগে অনেক দেশেই সে দেশের দার্শনিক,কবি-সাহিত্যিকগণ শাসক বা প্রভাবশালীদের কাছ থেকে পেয়েছেন অনাদর, অবহেলা আর হয়েছেন নিগৃহীত। তারা অত্যাচার-নিপীড়নের হলাহল পান করে নীলকণ্ঠ, আর সে দেশের মানুষের জন্য সৃষ্টি করে গেছেন অমৃত। গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিস, পারস্যের কবি ফেরদৌসি, বাংলা সাহিত্যের কবি গোবিন্দ দাস, কাজী নজরুল ইসলাম, কবি ফররুখ আহমদসহ অসংখ্য গুণী ব্যক্তিত্ব এরূপ।

আত্মবিশ্বাসী কবি ফররুখ আহমদ তাঁর সৃষ্টিকর্মে ছিলেন নিষ্ঠাবান। সাহিত্য সাধনার ক্ষেত্রে একাগ্রতা নিয়ে নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। কিন্তু প্রচার ও প্রকাশের ক্ষেত্রে কারো সহযোগিতা বা সাহায্য প্রাপ্তির ধার তিনি ধারতেন না। তাই দেখা যায় তিনি জীবিতকালে অর্ধশতাধিক বিভিন্ন ধরনের গ্রন্থ রচনা করলেও প্রকাশ পেয়েছে মাত্র ১৪টি। অন্যদিকে তার মৃত্যুর পর চব্বিশটির অধিক গ্রন্থ প্রকাশিত ও পুনঃ প্রকাশিত হয়েছে।কবি ফররুখ আহমদ ছিলেন এক বিশেষ ঐতিহ্যানুসারী। সেই সঙ্গে তিনি ছিলেন ঐতিহ্যসন্ধানী। বাঙলা কাব্যে তিনি নতুন ঐতিহ্য নির্মাণ করেন। সিন্দাবাদ, হাতেম ও নৌফেল ইত্যাদি নাম-চরিত্র ছিলো তাঁর কাব্যের অনুষঙ্গ। আরব্যোপন্যাসের মুগ্ধ পাঠক ছিলেন বলেই বোধকরি হাজার এক রজনী’র বহু ঘটনা ও চরিত্র তাঁর হাতের ছোঁয়ায় নতুন প্রাণ পেয়েছে। ফররুখ আহমদ ছিলেন মুসলিম পুনর্জাগরণের কবি,সমাজসচেতন কবি। অত্যাচারিত-নিপীড়িত ক্ষুধার্ত মানুষের কবি। তাঁর লেখার মুসলিম জনতার কথা শুধু নয়,সকল জাতি ও গণমানুষের কথা ফুটে উঠেছে। তিনি গান লিখেছেন, মাটির মানুষ মাঠের মানুষ ঘরের মানুষ আর এই দুনিয়ায় সবার সাথে সমান অধিকার। কবি আরো লিখেছেন,গরীবের তাজা বুকের লহুতে ইত্যাদি। কবি ফররুখ আহমদ ছিলেন প্রাচীন গ্রীক সাহিত্যের প্রমিথিউস,তানতালাস ইডিপাস।জীবনে তিনি আল্লাহ ছাড়া কারো কাছে মাথা নত করেননি।সাহিত্য সাধনার স্বীকৃতি স্বরূপ জীবিতকালে বেশ কিছু জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন তাঁর যোগ্যতার জন্য। মৌলিক প্রতিভার জন্য।

কবির ধর্মীয় চেতনা ও মূল্যবোধ যে সৃষ্টিশীলতা, কাব্যের অলংকার ও সাহিত্যের মান ক্ষুন্ন করতে পারেনি।মুসলিম জাগরণের কবি হিসেবে ফররুখ আহমদ খ্যাতি পেলেও তাঁর কাব্যে মানবিকতা ও রসবোধের কমতি ছিলো না। ইসলামী আদর্শই তাঁর কবিতায় মানুষ ও মানবিকতাকে মুখ্য করে তুলেছে। কবি ফররুখ আহমদ সৃষ্ট সাহিত্যসম্ভার ভাষা তথা বিশ্বসাহিত্যের অমূল্য সম্পদ।দর্শনগতভাবে তিনি ছিলেন মানবতাবাদী কবি। নীতি আদর্শে প্রশ্নে ছিলেন আপসহীন।কবি ফররুখ আহমদের চিন্তাচেতনা দর্শন সবই ছিলো এ দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন। তার কবিতা ছিলো মানবতাবাদী দর্শনে পরিপূর্ণ কিন্তু কাব্যে রসবোধেরও কমতি নেই। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস-স্বীকৃত একজন অসাধারণ জননন্দিত কবি ফররুখ আহমদ। কবির সাহিত্য জীবনের শুরুতে ‘সওগাত’ পত্রিকায় ফররুখ সম্পর্কে আবু রুশদ লিখেছেন- ‘ফররুখ আহমদ রোমান্টিক কবি, অর্থাৎ তার দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তব-বোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়। তাঁর কাব্যে সৌন্দর্যের জয়গান অকুণ্ঠ, সুদূরের প্রতি আকর্ষণও তাঁর কাব্যের আর একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য। তবুও তিনি নিঃসন্দেহে আধুনিক। এমনিভাবে প্রখ্যাত অনেক সমালোচক সাহিত্যিক ফররুখ আহমদ সম্পর্কে তাদের মূল্যায়ন তুলে ধরেছেন।

বাংলা সাহিত্যে মুসলিম জাগরণের কবি ফররুখ আহমদ ছিলেন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের গর্বিত নবাব। যিনি তাঁর সৃষ্টিসম্ভার দিয়ে বাংলা সাহিত্য সমৃদ্ধ করেছেন।ঋণী করেছেন বাঙালি জাতিকে। দীর্ঘ চার দশকের সাহিত্য সাধনায় তিনি বিপুল পরিমাণ সাহিত্য-শস্য রেখে গেছেন পরবর্তী প্রজন্মের জন্য; যার বৃহদংশই শিল্প,শৈলী ও সৃষ্টিশীলতার গুণে এখনো সাহিত্যপ্রেমীদের কাছে আবেদনময়ী। কবি ফররুখের অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো, একজন আধুনিক ও সৃষ্টিশীল কবি হওয়ার পরও আত্মপরিচয় ভোলেননি কখনো। সাহিত্য সাধনার দীর্ঘ পথপরিক্রমায় তিনি আত্মবিমুখ হননি কখনো। বরং তিনি তাঁর কাব্য ও রচনায় ‘বাঙালি মুসলিম’ পরিচয়টি জাগিয়ে তোলার প্রয়াস পেয়েছেন বরাবর। সাহিত্য সমালোচক ড. আহমদ শরীফ ফররুখ আহমদের এই চেতনাবোধ সম্পর্কে বলেন,‘আমাদের বাংলা ভাষায় স্বকীয় আদর্শে সাহিত্য সৃষ্টি করতে হবে,আদর্শ হবে কোরআনের শিক্ষা,আধার হবে মুসলিম ঐতিহ্যানুগ,বিষয়বস্তু হবে ব্যক্তি বা সমাজ অথবা বৃহদর্থে জগৎ ও জীবন। এভাবে আমাদের জাতীয় সাহিত্য ও জাতীয় জীবন গড়ে উঠবে।তরুণ কবি ফররুখ আহমদ একান্তভাবে মুসলিম ঐতিহ্যের পরিপ্রেক্ষিতে কাব্য সাধনা করে পথের দিশারির গৌরব অর্জন করেছেন।’

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসস্বীকৃত একজন অসাধারণ জননন্দিত কবি ফররুখ আহমদ। স্বপ্নরাজ্যের সিন্দাবাদ, ঐতিহ্যের কবি ফররুখ আহমদ বাংলা-সাহিত্যকাশে এক উজ্জ্বল তারকা। ছন্দের কবি, সঙ্গীতঝঙ্কারের কবি ফররুখ আহমদের কাব্যে ইতিহাস-ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, স্বদেশ, সমকাল ফুটে উঠেছে সার্থকভাবে। অফুরণ সৌন্দর্য, উদাস কল্পনা, রূঢ় বাস্তবতা, প্রদীপিত আদর্শ,সমুদ্রবিহার, রোমান্টিকতা, প্রেম প্রভৃতি তাঁর কবিতার এক মৌলিক চরিত্র নির্মাণ করেছে। গানের ভুবনেও তাঁর পদচারণা ছিলো সর্বত্র। পঞ্চাশ-ষাটের দশকে শিল্পী ও গীতিকার হিসেবে তার ছিল ব্যাপক খ্যাতি। শিশুসাহিত্য, প্রবন্ধ,নাটক, অনুবাদসাহিত্যেও তার অবদান উল্লেখযোগ্য।
মানবতাবাদী ও জাতীয় জাগরণের কবি ফররুখ আহমদ একজন আধুনিক ও সৃষ্টিশীল কবি হওয়ার পরও আত্মপরিচয় ভোলেননি কখনো। সাহিত্য সাধনার দীর্ঘ পথ-পরিক্রমায় তিনি আত্মবিমুখ হননি বরং তাঁর কাব্য ও রচনায় ‘বাঙালি মুসলিম’ পরিচয়টি জাগিয়ে তোলার প্রয়াস পেয়েছেন বারংবার।

বিশুদ্ধ সাহিত্যরস মানবিক অনুভূতি বা চিত্তের অন্যবিধ আহার্যের চাইতেও বেশি কিছু ফররুখের কাছ থেকে সংগ্রহ করেছে এদেশের মুসলিম সমাজ। কবির সৃষ্টি জল সিঞ্চন করেছে আমাদর রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক ও স্বদেশিকতার চেতনার শিকড়ে।ঐতিহ্য সচেতন ইসলামী পুনর্জাগরণের কবি যেভাবে পুঁথি ও প্রাচীন আরবী এতিহ্য আত্মস্ত করে আধুনিক চিন্তার আলোকে স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে সাহিত্য নির্মাণ করেছেন তা ফররুখ উত্তর -সুরিদের জন্য আলোক বর্তিকা হিসেবে কাজ করবে।

কবি ফররুখের কাব্য প্রতিভার প্রদীপ্ত ছটায় বাংলা কাব্যের দিগন্ত যেমন প্রসারিত ও আলোকিত হয়েছে,তেমন তাঁর জীবনবোধের দীপ্তি ও ঐতিহ্যানুসারিতার স্নিগ্ধ আলোয় বাংলা সাহিত্য নব জীবন ও অপূর্ব রূপ অর্জন করেছে। কবি ফররুখের ঐতিহ্য প্রীতির জয়গান গেয়ে মুহম্মদ আবদুল হাই লিখেছেন,“কবি হিসাবে তিনিও বিশিষ্টতা ও খ্যাতি অর্জন করেছেন ইসলামের ইতিহাস চেতনা ও মুসলিম জীবনাদর্শমূলক সাহিত্যের ঐতিহ্য প্রীতির জন্য।তাঁর শব্দানুশীলন,বাক্য বিন্যাস ও ভাষা ব্যবহারের রীতিতে ইসলামের অতীত যুগের চিত্র ও আদর্শ প্রতিফলিত হয়েছে।এ যুগে মুসলিম জীবন ও মানসের আদর্শ বিচ্যুতির জন্যে কবি বেদনাবোধ করেছেন।সংস্কারকামী মনের আশ্চর্য প্রতিফলন রয়েছে তাঁর শব্দ চয়ন কুশলতায়।”
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কবি ফররুখ আহমদের মৃত্যু এক অভাবনীয় শূন্যতা সৃষ্টি করেছে। এই অভিমানী কবি চরম দারিদ্র্যতার মধ্যে চিকিৎসার অভাবে পরম পৌরুষত্বের সাথে ১৯৭৪ সালের অক্টোবর মাসের ১৯ তারিখে ছাপ্পান্ন বছর বয়সে নিয়তি নির্ধারিত মৃত্যুকে বরণ করেন। তিনি তাঁর কবিতায় সমাজের অবহেলিত মানুষের কথা লিখে গেলেও তার জীবনে তাঁকে বহু দুঃখ কষ্ঠের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করতে হয়েছে। মূলত ইসলামী আদর্শ লালন করার কারনেই তাঁকে এত ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। বাংলা সাহিত্যে কবি ফররুখ আহমদ এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম। বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রে তিনি প্রতিভার যে উজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখে গেছেন তা যুগ যুগ ধরে বাঙ্গালী জাতির জীবনে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তিনি বেঁচে থাকবেন তাঁর অমর সৃষ্টির মধ্য দিয়ে।

লেখক, সাবেক জাতীয় ক্রীড়াবিদ(কারাতে ব্লাক বেল্ট ১ম ড্যান)
গবেষক,সাংবাদিক,কলামিস্ট ও চেয়ারম্যান গ্রিন ক্লাব, মানিকগঞ্জ