জাহিলিয়াত থেকে বের হয়ে আসার প্রচেষ্টা মানবসভ্যতার চিরায়ত সংগ্রাম

মো.আলতাফ হোসেন ঃঃ
আদম (আ.) থেকে শুরু করে বহু নবীর কর্মক্ষেত্রে ছিলো আরব দেশ। কালক্রমে আরবের লোকেরা নবীদের শেখানো জীবন বিধান ভুলে যায়। তাদের আকীদা বিশ্বাসে ঢুকে পড়ে বিকৃতি। তারা আল্লাহকে সব চাইতে বড় খোদা বলে স্বীকার করতো। কিন্তু বাস্তব জীবনে তারা নিজেদের মনগড় ছোটখাটো খোদাগুলোর পূজা উপাসনাই করতো। তারা বিশ্বাস করতো যে মানুষের জীবনে এই সব খোদারই প্রভাব বেশি। তারা এইসব মনগড়া খোদার নামেই মানত ও কুরবানী করতো। এদের কাছেই নিজেদের বাসনা পূরণের জন্য মুনাজাত করতো। তারা বিশ্বাস করতো, এই সব ছোটখাটো খোদাকে সন্তুষ্ট করলেই আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হবেন। তারা ফিরিশতাদেরকে আল্লাহর কন্যা মনে করতো। জিনদেরকে আল্লাহর ক্ষমতা ইখতিয়ারের শরীক মনে করতো। যেই সব শক্তিকে তারা আল্লাহর শরীক মনে করতো সেই সবের মূর্তি বানিয়ে তারা পূজা করতো। ঈমানী বিকৃতির সাথে সাথে পারষ্পরিক ঝগড়-বিবাদ আরবদের মধ্যে একটা সাধারণ ব্যাপারে পরিণত হয়েছিলো। সুদী কারবার, লুটপাট, চুরি-ডাকাতি, নরহত্যা, জুয়াখেলা, নাচগান, মদপান, যিনা এবং জাতীয় বহু দুষ্কর্ম তাদেরকে প্রায় পশুতে পরিণত করেছিলো। তাদের বেহায়াপনা এতো চরমে উঠেছিলো যে নারী ও পুরুষ উলংগ হয়ে কাবার চারিদিকে তাওয়াফ করতো। কন্যা সন্তানকে তারা জীবন্ত কবর দিতো। সেই সমাজে শ্রমজীবীরা ছিলো ক্রীতদাস। গোত্রের সরদারদের খেয়াল খুশিই ছিলো আইন।
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আবির্ভাবের প্রাক যুগের আরব সমাজকে বলা হয় আইয়ামে জাহিলিয়াতের সমাজ। এ যুগের আরব সমাজে যে অনাচার, অবিচার ও অশান্তি ছিলো এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে আমরা যদি তৎকালীন গোটা মানবসভ্যতার পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনায় সেই যুগের আরব সমাজটাকে চিন্তা করি তাহলে দেখব খ্রিষ্টীয় পঞ্চম-ষষ্ঠ শতাব্দীর আরব যথেষ্ট উন্নত সমাজ ছিলো। তৎকালীন সভ্যতায় আরব সমাজ একপ্রকার শীর্ষস্থানীয় সমাজই ছিলো। উত্তরে রোমান সাম্রাজ্যথ যার অন্তর্ভুক্ত ছিলো রোমান ও গ্রিক সভ্যতার অবশেষ। পূর্বে পারস্য সাম্রাজ্য,দক্ষিণে ইথিওপীয় সাম্রাজ্য।

এ ছাড়া দূরপ্রাচ্যের চীন ও ভারতের কোনো কোনো অঞ্চলে তখন সভ্যতার আলো টিমটিম করে জ্বলছিলো। এর মধ্যে আরব সমাজ পেছনে পড়া সমাজ ছিলো না মোটেও। জাহিলিয়াত বলতে যদি অনুন্নত, শিক্ষা-দীক্ষাহীন, জ্ঞান-বুদ্ধিহীন অথবা ধর্ম ও শিল্প-সংস্কৃতিহীন সমাজ বোঝায় তাহলে আরব সমাজ একেবারেই সে-রকম সমাজ ছিল না। সভ্যতার মানদন্ড বিচারের প্রায় সব সূচকেই আরবরা ছিলো যথেষ্ট উন্নত। সভ্যতার মানদন্ড বিচারের একটা বড় সূচক হলো ভাষা। ভাষার উৎকর্ষের দিক থেকে আরব সমাজ তৎকালীন বিশ্বের শীর্ষস্থানীয়দের মধ্যে ছিলো। তৎকালীন বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ভাষাগুলোর মধ্যে আরবি ছিলো একটি এবং আরব সমাজে ভাষা ও সাহিত্যের চর্চা ছিলো অত্যন্ত উঁচুমানের। উন্নত শিল্প-সংস্কৃতির চর্চা ছিলো আরবে। তৎকালীন সভ্যতার যেকোনো কেন্দ্রের তুলনায় আরব সংস্কৃতি পিছিয়ে ছিলো না কোনো দিক থেকেই। আরব সমাজ ছিলো স্বাধীন এবং আরব সংস্কৃতি ছিলো স্বাধীনচেতা।

জাহিলিয়াতের সমাজ মানে সবজান্তা, আত্দশ্লাঘায় নিমজ্জিত ও আত্দ-অহমিকাপূর্ণ মানুষের সমাজ। জাহিলিয়াতের সমাজ মানে ‘কমপ্লিট কোড অব লাইফ’ এর মতো বদ্ধচিন্তায় বিশ্বাসী সমাজ। আরবের কোরেশরা এমন অন্ধবিশ্বাসে নিমজ্জিত হয়ে পড়েছিলো যে, তারা আল্লাহর ঘরের রক্ষক, আল্লাহ একমাত্র তাদের,তারা যা বোঝে এবং যা করে এসবই সত্য আর অন্য সব মিথ্যা। তারা তাদের নিয়ন্ত্রণে আল্লাহর শরিফ বা আল্লাহর পথের মধ্যস্থতাকারী স্থাপন করেছিলো নিজেদের প্রভুত্ব রক্ষা করার জন্য।আরবের এই অভিজাত সম্প্রদায়ের বদ্ধচিন্তা ও অহমিকা আচ্ছন্নতাকেই ইসলামে চিহ্নিত করা হয়েছে জাহিলিয়াত হিসেবে।তৎকালীন পৃথিবীর প্রায় সব মানুষই ছিলো বর্ণজ্ঞানহীন,পরিশীলিত ভাষাহীন,শিল্প-সংস্কৃতি সম্পর্কে অজ্ঞ এবং জীবনাচরণে কমবেশি অশালীন। ইসলাম সেসব সমাজকে জাহিলিয়াতের সমাজ হিসেবে চিহ্নিত করেনি, চিহ্নিত করেছে অভিজাত কোরেশ সম্প্রদায় ও তাদের নেতৃত্বাধীন সংস্কৃতিমান আরব সমাজকে। সুতরাং বিষয়টা স্পষ্ট যে, জাহিলিয়াতের সমাজ মানে অনুন্নত,অশিক্ষিত মানুষের সমাজ নয়, জাহিলিয়াতের সমাজ মানে জ্ঞানপাপী মানুষের সমাজথ বদ্ধচিন্তা ও অচলায়তন বিশ্বাসে অন্ধ সমাজ।

ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য,বিশ্বস্ততা,অতিথিপরায়ণতা,শৌর্যবীর্য ও কর্তব্যপরায়ণতায় আরবরা গৌরবদীপ্ত জাতি হিসেবে সুপরিচিত ছিলো। আরবদের তুলনায় তৎকালীন পৃথিবীর অনেক মানব গোষ্ঠীই ছিলো অনুন্নত, জ্ঞান-বুদ্ধিহীন এবং ভাষা-শিল্প-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে একেবারেই মানবেতর পর্যায়ে। তাহলে আরবের প্রাক ইসলাম যুগ আইয়ামে জাহিলিয়াত হিসেবে আখ্যায়িত হলো কেনো? আরব জাতির ইতিহাসের অন্যতম প্রণেতা ইতিহাসবেত্তা পি.কে হিট্টি বিষয়টা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। একদিক থেকে বিচার করলে বিষয়টা বিস্মিত হওয়ারই। কিন্তু এটাই সত্য। প্রাক ইসলাম যুগের আরব সমাজ ছিলো জাহিলিয়াতের সমাজ। তাহলে জাহিলিয়াত বিষয়টা আসলে কী? জাহিলিয়াত মানে অনুন্নয়ন,অশিক্ষা,দারিদ্র্য,ভাষা-সাহিত্যের উৎকর্ষহীনতা বা শিল্প-সাহিত্যের পশ্চাৎপদতা নয়।

প্রাক ইসলামী যুগে আরব দেশে ব্যভিচারের প্রাদুর্ভাব সব জায়াগায় ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিলো।পতিতাবৃত্তি সমাজে স্বীকৃতি লাভ করে। যৌন ব্যভিচার সমাজ কোনো নিন্দনীয় বিষয় ছিলো না। যারা এসকল অন্যায়-অবৈধ কাজে নিজেদের যতবেশী সম্পৃক্ত রাখতে পারত সমাজে তাদের মর্যাদা সবচেয়ে বেশি ছিলো। এভাবে করে তারা নীতিহীন এবং অসামাজিক কাজের মধ্যে নিজেদের নিমজ্জিত করেছিলো।তখনকার দিনে অন্যান্য সমাজের ন্যাড আরব সমাজেও দাসপ্রথা প্রচলিত ছিলো। পণ্যদ্রব্যের মতো দাস-দাসীও হাটে-বাজারে বিক্রি হতো। তাদের দুরবস্থা সম্পর্কে আমীর আলী বলেন,“ভৃত্যি হোক আর ভূমিদাস হোক তাদের ভাগ্যে ক্ষীণ আশা বা এককণা সূযরশ্মিও কবরের এদিকে জীবনে জুটতো না।” প্রভুরা তাদের ওপর খেয়াল-খুশি মতো অত্যাচার করতো। তারা কখনো দাসীদের উপপত্নী হিসেবে গ্রহণ করতো। এক কথায় তাদের জীবন-মৃত্যু নির্ভর করতো তাদের প্রভুর ওপর।তাদের বিবাহের কোন স্বাধীনতা ছিলো না। তখনকার দিনে দাসদের অবস্থা ছিলো শোচনীয়।

ইসলাম আবির্ভাভের পূর্বে আরব এর রাজনৈতিক অবস্থা ছিলো অত্যন্ত নাজুক।আরব এর অধিইকাংশ জায়গা ছিলো স্বাধীন।এক এক স্বাধীন রাষ্ট্র এক এক গোত্র দ্বারা পরিচালিত হতো। প্রত্যেক গোত্রে এক এক জন গোত্র প্রধান থাকতো।গোত্রের লোকদের ভিতর অত্যন্ত সুসম্পর্ক ছিলো কিন্তু এক গোত্র অন্য গোত্রকে সহজে সহ্য করতে পারত না।সামান্য কোনো বিষয় তাদের ভিতর কোনো যুদ্ব শুরু হলে সে যুদ্ব তাদের ভিতর প্রায় সময় এরকম গোত্র গোত্র যুদ্ব লেগে থাকতো। সামান্য বিষয় নিয়ে মক্কার কুরাইশ আর কায়েস গোত্রের ভিতর এক ভয়াবহ রক্তখয়ী যুদ্ব সংঘটিত হয় যা “ফিজারের যুদ্ব” নামে পরিচিত যা প্রায় পাঁচ বছর যাবৎ স্থায়ী ছিলো। তেমনিভাবে উটকে পিটানোর অভিযোগে বকর এবং তঘলিব গোত্রের ভিতর যুদ্ব হয়েছিলো ৪০ বছর যাবৎ,আবিস এবং ধীমান গোত্রের ভিতর যুদ্ব হয়েছিলো প্রায় এক শতাব্দী পর্যন্ত,মদীনার আউস এবং খাযরায গোত্রের ভিতর অনেকদিন যাবৎ যুদ্ব লেগে ছিলো। ঐতিহাসিক গীবন বলেছেন,“ঈসলাম আসার পূর্বে আরবে প্রায় ১৭০০টি যুদ্ব সংঘটিত হয়েছিলো”।

আইয়ামে জাহিলিয়াতে নারী জাতির প্রতি চরম অবমাননা করা হতো। তাদেরকে সেসময় মানুষ হিসেবে বিবেচনা করা হতো না। তাদেরকে নিজেদের ভোগের সামগ্রী হিসেবে মনে করা হতো। কোনো মহিলার সাথে কোন পুরুষের বিবাহের পর সেই স্বামী যেকোন পুরুষের সাথে অবৈধ সম্পর্ক রাখতে পারতো। এতে স্ত্রী স্বামীর বিরুদ্বে বিন্দুমাত্র প্রতিবাদ করতে পারতো না। স্বামীগণ মারা গেলে স্ত্রীগণ তাদের সম্পত্তির কোনো অংশ পেতো না। একজন লোক ইচ্ছামত বিবাহ করতে পারতো আবার ইচ্ছামত তালাক দিতে পারতো। তৎকালীন আরব সমাজে নীতি-নৈতিকতা বলতে কিছুই ছিলো না। হিংসা-বিদ্বেষ,অহংকার, দাম্ভিকতা, খিয়ানতদারিতা, অপচয়, মারামারি, লুটপাট,রাজহানী,ইত্যাদি অন্যায় অপরাধের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে সমাজকে একেবারে কলুষিত করে ফেলেছিলো।

এমন কোনো ধরনের নিষ্ঠুর কাজ ছিলো না যাকিনা আরবদের দ্বারা সঙ্ঘটিত হতো না। তারা জীবিত উটের পিছন দিক দিয়ে গোশত কেটে ভক্ষণ করতে পারতো। তারা কখনো কখনো নারীদের ঘোড়ার লেজের সাথে লেলিয়ে দিতো। এতে ঐ নারী মৃত্যুবরণ করলে তারা তাতে আনন্দ উদযাপন করতো। সেসময় আরব সমাজ কুসংস্কার দ্বারা আচ্ছাদিত ছিলো। নরবলি তাদের ভিতর প্রচলিত ছিলো। তারা তীর নিক্ষেপ করে ভাগ্য নির্ধারণ করত।তারা মৃতব্যক্তির কবরের পাশে উট বেধে রাখতো। এভাবে করে তাদের সমাজ একেবারে কুসংস্কারে ভরপুর হয়ে পড়েছিলো। আইয়্যামে জাহিলিয়াতের সময় আরব অঞ্চলের বেশকিছু লোকজন দারিদ্যতার ভয়ে নিজ শিশুসন্তানকে হত্যা করতে কুণ্ঠিত বোধ করত না। কোরআনের ভাষায় আল্লাহ তা’য়ালা বলেন,“তোমরা দারিদ্র্যতার জন্য নিজেদের সন্তানদের হত্যা করো না।” (সূরা আন আম; আয়াত-১৫২)

জাহেলিয়াত বলতে সাধারণত যা বুঝায় তা হচ্ছে ইসলাম আগমনের পূর্বের যুগ, যা বিশ্বের সর্বত্র বিস্তৃত ছিলো। তবে প্রশ্ন হলো চৌদ্দ শত বৎসর পূর্বের সেই যুগকে কেনো জাহেলিয়াতের যুগ বলা হতো? সেই যুগের মানুষকে কেন জাহিল বলা হতো? আসলেই কি তারা শিক্ষাদীক্ষা, জ্ঞান বিজ্ঞান থেকে এতই পিছপা ছিলো, যার কারণে তাদের নাম হলো জাহিল?

ইতিহাসের পাতা যদি উল্টিয়ে দেখা যায়, তবে সকলকে এক বাক্যে স্বীকার করতে হবে যে, সেই যুগেও শিক্ষাদীক্ষার চর্চা ছিলের। তাদের ভাষা ও কবিতা গুলোতে এতো উচ্চাঙ্গতা, ভাবের গাম্ভীর্যতা ও অপরূপ প্রকাশ ভঙ্গি ছিলো, যা দেখে পরবর্তী যুগের কবি সাহিত্যিকদের হিমশিম খেতে হয়। এমন কি তাদেরকে লক্ষ্য করে কোরআনের চ্যালেঞ্জ এটাই প্রমাণ করে যে তারা মূর্খ ছিল না কিন্তু তারপরও সেই যুগকে কেনো জাহেলিয়াতের যুগ বলা হতো? এই প্রশ্নের সঠিক জবাব পেতে হলে আমাদেরকে নজর দিতে হবে আল্লাহ্র কিতাব পবিত্র কুরআনের দিকে। কারণ হলো আরবী ভাষায় এবং জাহেলিয়াত শব্দটি সর্ব প্রথম কোরআনেই ব্যবহৃত হয়েছে। আল্লাহ্ তা’য়ালা বলেন: আমি বনী ইসরাইলকে সাগর পার করে দিয়েছি। তখন তারা এমন একটি সম্প্রদায়ের কাছে গিয়ে পৌঁছাল, যারা স্বহস্তে নির্মিত মূর্তি পূজায় নিয়োজিত ছিলো। তারা বলতে লাগল, হে মুসা, তাদের যেমন অনেক গুলি মাবুদ রয়েছে তেমন আমাদের জন্য একজন মাবুদ বানিয়ে দাও। তিনি (মুসা আ:) বললেন: নিশ্চয়ই তোমরা জাহিল সম্প্রদায়। অর্থাৎ প্রকৃত মাবুদের পরিচয় লাভে তোমরা অজ্ঞ ও মূর্খ। সূরা আল ইমরান: ১৫৪ আয়াতে বর্ণিত হচ্ছে: তারা আল্লাহ্র সম্পর্কে জাহেলিয়াত যুগের ধারণার ন্যায় মিথ্যা ধারণা করছে। সূরা মায়েদার ৫০ নং আয়াতে বর্ণিত হচ্ছে: তারা কি জাহেলিয়াত যুগের হুকুম কামনা করে। আল্লাহ্ অপেক্ষা বিশ্বাসীদের জন্য উত্তম হুকুম দাতা আর কে হতে পারে? আল্লাহ্র হুকুম ছাড়া যত হুকুম রয়েছে সব জাহেলিয়াত। সূরা আল ফাতাহ এর ২৬ নং আয়াতে বর্ণিত হচ্ছে: কাফেররা তাদের অন্তরে মূর্খতা যুগের জিদ পোষণ করতো। সুরা আহজাবের ৩৩ নং আয়াতে উল্লেখ আছেঃ জাহেলিয়াত যুগের অনুরূপ নিজেদেরকে প্রদর্শন করবে না। (অর্থাৎ সেই যুগে বিস্তৃত ছিলো নির্লজ্জতা ও বেহায়াপনা।)

ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েম এবং কোরআন-হাদিস-ইজমা-কিয়াস কেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা চালুর আগে জাজিরাতুল আরবে যে ভয়ঙ্কর, নোংরা এবং অমানবিক সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা বিরাজমান ছিলো সেগুলোর নিকৃষ্টতা বুঝানোর জন্য আইয়ামে জাহেলিয়াত শব্দটি ব্যবহার করা হয়। ওই আমলের বেশির ভাগ আরব অধিবাসীর মন-মানসিকতা, চরিত্র, আচার-আচরণ, চিন্তা-চেতনা ও রাজনীতি ছিলো যুদ্ধ কেন্দ্রিক। তাদের বিয়েশাদি, ব্যবসা-বাণিজ্য, ভোগ-বিনোদন, যৌনতাড়না, প্রেম-বিরহ, শিল্প-সাহিত্য-কবিতা ইত্যাদি সব কিছুর মূলেই ছিলো যুদ্ধের তাড়না। যুদ্ধজয়ের প্রবল তাড়না অথবা পরাজিত হওয়ার নিদারুণ আতঙ্ককে ঘিরেই তাদের দৈনন্দিন জীবনের সব কিছু রচিত হতো। আধুনিক যুগের যুদ্ধ যেনো সেই প্রাচীনকালের যুদ্ধ বিগ্রহের মতো রূপ নিতে চলছে।
আল কুরআনের ভাষ্য হলো ইসলামপূর্ব খোদাদ্রোহী সমাজ ব্যবস্থার সময়কালকে আইয়্যামে জাহেলিয়াত বলে বুঝানো হয়েছে। আইয়্যামে জাহেলিয়াত যুগে আরবদের ধর্মীয়, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থা ছিলো শোচনীয়। আরবরা যখন মারামারি, কাটাকাটি, ঝগড়া, বিভেদ, নারী নিয়ে খেল তামাশা করতো সে দিনে নারীদের কোনো মূল্যায়ন ছিলো না। নারীকে ভোগ বিলাসের সামগ্রী মনে করা হতো। আইয়ামে জাহেলিয়াতের যুদ্ধের ধরন-ধারণ বুঝতে হলে আমাদের শব্দ দু’টির মর্মার্থ বুঝতে হবে। আইয়াম শব্দের অর্থ হলো যুগ, সময় বা কাল। অন্য দিকে, জাহেলিয়াত অর্থ অন্ধকার, কুসংস্কার, নির্বুদ্ধিতা ইত্যাদি বুঝালেও সে যুগের মানুষকে কোনো অবস্থায়ই বোকাসোকা অথবা নির্বোধ বলা যাবে না। ইসলাম আবির্ভাবের আগে মোটামুটি এক শ’ থেকে দেড় শ’ বছর সময়কালকে অনেকে জাহেলিয়াতের যুগ বলে। আইয়্যামে জাহেলিয়াতের যুগের যে বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে বর্বর যুগ বলা হতো বর্তমান যুগের সাথে তা অনেকটা মিলে যাচ্ছে। তাই আজ আমি সে বিষয়ের কয়েকটি ব্যবধান দেখিয়ে লেখা শুরু করলাম। মানবতার মুক্তির দিশারি হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্মের পূর্বে আরবের সামগ্রিক জীবনধারায় বিরাজ করছিলো অস্থিরতা, বিশৃঙ্খল ও নৈরাজ্য। এসময় ত্রাহি ত্রাহি রবে সত্য এবং বিচারের বাণী মিথ্যার লৌহশলাকার কঠিন পিঞ্জরে আবদ্ধ হয়ে নীরবে কাঁদছিলো। ঐতিহাসিকগণ এ চরম বিভৎস যুগকে অজ্ঞতার যুগ বা আইয়ামে জাহেলিয়াত বলে অভিহিত করেছেন।

তৎকালীন আরব সমাজে জুয়াখেলা,মদ্যপানের মত জঘন্য অভ্যাস তাদের ভিতর ব্যাপকভাবে লক্ষ্যকরা যেত। সেসময় তারা মদপান করত আর তা করে বিভিন্ন ধরনের অশ্লীল কাজের সাথে নিজেদের সম্পৃক্ত করতো। মদ যে যতো বেশি পান করতে পারত সে নিজেকে নিয়ে ততো বেশি গর্ববোধ করতে পারতো। সেই যুগের তুলনায় বর্তমান যুগটিও পিছিয়ে নেই বললেই চলে। কেননা ভাইয়ে ভাইয়ে মারামারি,খুন খারাপি,জুয়া খেলা,মদ পান করা,এসব অশ্লীল কাজ যেনো নিত্যদিনের সঙ্গী।

সম্মানিত দ্বীন ইসলাম হচ্ছেন সবচেয়ে আধুনিক। কারণ মহান আল্লাহ পাক তিনি এরপর আর কোনো ধর্ম নাযিল করেননি। মহান আল্লাহ পাক এরশাদ করেন, “তোমরা মহিলারা ঘরে অবস্থান করবে, জাহিলিয়াত যুগের মেয়েদের মতো সৌন্দর্য প্রদর্শন করে ঘুরে বেড়িও না”। এই সম্মানিত আয়াত শরীফ থেকে আমরা সহজেই বুঝতে পারি মেয়েদেরকে পর্দার সাথে ঘরে অবস্থান করতে হবে। প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হতে হলে সমস্ত শরীর ঢেকে বের হতে হবে। জাহিলিয়াত যুগ বা মূর্খতার যুগ হচ্ছে দ্বীন ইসলাম নাযিল হওয়ার পূর্বের যুগ। সেই যুগে মেয়েরা সৌন্দর্য প্রদর্শন করে ঘুরে বেড়াতো।পর্দা করা হচ্ছে আধুনিকতা। সম্মানিত দ্বীনে মেয়েদের অনেক মর্যাদা দেয়া হয়েছে। এজন্য মেয়েদের পর্দা করার সম্মানিত আদেশ করা হয়েছে। যারা সমস্ত শরীর ঢেকে অর্থাৎ পর্দা করে বের হবেন তাদেরকে কেউ উত্ত্যক্ত করবে না এবং তারা যে ভদ্র জ্ঞানী সেটাও চিনা সহজ হবে। কোনো জ্ঞানী বা ভদ্র মহিলা কখনো নিজের সৌন্দর্য পর পুরুষকে দেখায় না। আর যে দেখায় সে আসলে ভদ্র হতে পারে না। সম্মানিত হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে এরশাদ,“যে (পুরুষ) দেখে এবং যে (মেয়ে) দেখায়, উভয়ের প্রতি মহান আল্লাহ পাকের লানত।” লানত মানে অভিশাপ। লানতগ্রস্থ মানুষ জ্ঞানী হতে পারে না।

তৎকালীন আরব সমাজ নারী-পুরুষের লজ্জা-শরম বলতে কিছুই ছিলো না। যেকেউ কারো সামনে নিজেদের গুপ্তাংগ প্রদর্শন করতে তারা মোটেও কার্পণ্য প্রকাশ করতো না।কিশোরী মেয়েরা প্রকাশ্যে উলঙ্গ হয়ে গোসল করতো। নারী-পুরুষেরা কাবা গৃহের সামনে উলঙ্গ হয়ে তওয়াফ করতো। অশ্লীল সাহিত্যের বিস্তারে সেই মূর্খতার যুগেও আরব সমাজে সাহিত্য তথা কাব্যচর্চ্চা অত্যন্ত সুনিপুণভাবে হতো। সেসময় তাদের কবিতার বিষয়বস্তু ছিলো নারী,প্রেম,অশ্লীলতা ইত্যাদি। কবিরা তাদের অশ্লীল কবিতার মাধ্যমে সমাজে সর্বপ্রকারের অনর্থও ঘটাতো।প্রাক ইসলামী যুগে ইমরুল কায়েস,তারাকা আমর, লবীদ, যুহায়ের প্রভৃতি কবিদেরনাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিলো। ইমরুল কায়েসর কবিতায় একথা খুঁজে পাওয়া যেতো যে, কীভাবে তিনি মহিলাদের পোশাক লুকিয়ে তাদের রুপের অপরুপ বর্ণনা দিতেন। কাব ইবনে আশরাফ নামে একজন কবি ছিলো যিনি সর্বদা মহিলাদের নিয়ে এমন ব্যাঙ্গার্থক কবিতা রচনা করতেন।

বর্তমান দেশে অবৈধ যৌন সম্পর্ক স্থাপনের পরিপ্রেক্ষিতে জন্ম নেয়া শিশুর মাকে সন্তানের পিতৃ পরিচয় আদায় করতে প্রেমিকের বাড়ির সামনে অনশন করতে হয়। আত্মহত্যার ঘটনাও বিরল নয়। আইয়্যামে জাহেলিয়ার ইতিহাসে কখনো ধর্ষণের পর কোনো নারীকে হত্যা করা হয়নি। কোনো নারী ধর্ষণের ঘটনাও ঘটেনি। শিশু ধর্ষণের তো প্রশ্নই আসে না। সৎ মাকে পুত্র কর্তৃক বিবাহ করার ঘটনা ঘটলেও আপন মাকে যৌন সম্পর্ক স্থাপনে উত্যক্ত করা হয়েছে এমন ঘটনা অসম্ভব।

আইয়ামে জাহেলিয়া যুগের কোনো মানুষ যদি আজ বেঁচে থাকতো; তাহলে বর্তমান বাংলাদেশের মানুষ ওই সময়ের মানুষকে বর্বর, ওই যুগকে আইয়ামে জাহেলিয়া বা অন্ধকারাচ্ছন যুগ বললে নিশ্চিত করে বলা যায়, তিনি আমাদের বিরুদ্ধে মানহানি মামলা করতেন। আইয়্যামে জাহেলিয়ার যুগের সাথে বর্তমান দেশের সামাজিক অনাচারের তুলনামূলক অধ্যায়ন করলে- এই সময়ের চেয়ে ওই সময়ের মানুষরা বেশি সভ্য ছিলো, তা খুব সহজে উপলব্ধি করা যাবে। আমাদের ভাগ্য ভালো, ওই সময়ের কেউ আজ আর জীবিত নেই!
সময়টা মূর্খতার। সময়টা হিংস্রতার। শুকনো অতৃপ্ত মরুভূমি রক্তের জন্য উতলা।পশুকে পানি পান করাতে গিয়ে সৃষ্ট কাজিয়ার সূত্রে বছরের পর বছর ধরে লড়াই চলছে অবিরাম। ধনী আর নির্ধনের বিরোধ চরমে। কালো আর ধলোর শ্রেণিতফাত মাত্রাহীন। মুসলিম অধ্যুষিত শিক্ষিত সমাজ নিজেদের সংস্কৃতি, ইতিহাস, স্বকীয়তায় কিছুটা সচেতন থাকলেও বর্তমানে সেটিও ভেঙে পরার উপক্রম হয়েছে। আরবের সংস্কৃতির নামে আপাদমস্তক এক ধরণের অ-সংস্কৃতি চালু হচ্ছে। সেখানে তারা বলতে চাচ্ছে মুসলিমদের আসলে কোনো সংস্কৃতি নেই। দুই ইদের বাহিরে তাদের কোন কিছুই নেই। প্রাগ-ইসলামিক যুগে আরবে সংস্কৃতির কিছু ছোঁয়া থাকলেও পরবর্তীতে তা নিষিদ্ধ হয়। সেই নিষিদ্ধ’কেই অন্ধ অনুসারীরা অনুসরণ করে যাচ্ছে। ফলে নির্বোধ ধার্মিকরা তাদের হাজার বছরের স্থানীয় সংস্কৃতিগুলো ধ্বংস করতে পিছ পা হচ্ছে না। লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে; আরব সমাজে ইসলামের আগমনের পরও কেউ কোন নাম পরিবর্তন করে নি। বরং আরবের সেই কোরাইশদের সংস্কৃতিতেই নাম ধারণ করেছে। অথচ ইমানি জোশে বলিয়ান ধার্মিকরা নিজের শিকড় ভুলে গিয়ে অন্ধের মতন আরবের নামগুলো ধারণ করছে। হুর লোভী এসব দ্বিপদ মানুষগুলোর হয়তো জানা নেই আরবের খ্রিষ্টান, ইহুদিরাও আরবি নামের নাম ব্যবহার করে। আরবি কোনো ইসলামিক ভাষা নয়। বরং আরবের ভাষাতেই ইসলামের আগমন ঘটেছে।

জাহিলিয়াতের যুগ অতিক্রম করে মহানবী (সা.)-এর শিক্ষা ও সংস্পর্শে মানবসভ্যতা আলোর যুগে প্রবেশ করেছিলো। আজকের মানবসভ্যতা জ্ঞানে, গুণে ও বিষয়-বৈভবে উন্নতির শিখরে উপনীত হয়েছে। কিন্তু এই সভ্যতায়ও আমরা অন্ধকার বা জাহিলিয়াতের আলামত কম দেখতে পাচ্ছি না। একদিকে তৈরি হচ্ছে নীতি-নৈতিকতা ও মানবিকতা বিবর্জিত ধর্মহীন জ্ঞানপাপী সমাজ, অন্যদিকে ধর্মের নামেই এক শ্রেণি পড়ে আছে বন্ধচিন্তার অন্ধকার অচলায়তনে। এটা আজকের সমাজ ও সভ্যতার বিরাট সংকট। জাহিলিয়াতের কথা বলতে গিয়ে আজ আমরা যেনো শুধু ৬ষ্ঠ শতাব্দীর আরবের জাহিলিয়াত সংক্রান্ত মুখস্থ কথা না আউড়ে প্রকৃত জাহিলিয়াতটাকে বোঝার চেষ্টা করি। জাহিলিয়াত থেকে বের হয়ে আসার প্রচেষ্টা মানবসভ্যতার চিরায়ত সংগ্রাম। আজকের যুগের জাহিলিয়াতকে বুঝতে না পারলে আমাদের সভ্যতা সংকটের দিকে এগোবে। আমরা মুসলমানরা ষষ্ঠ শতাব্দীর জাহিলিয়াতের যুগ পার করে জন্মসূত্রেই ইসলামের সব আলোর উত্তরাধিকারী বনে গিয়েছি এমন মনে করাটাও এক ধরনের জাহিলিয়াত।

সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় আইনের সংশোধনী প্রয়োজন। বাংলাদেশের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ও বিশেষ আইনের আওতায় ধর্ষণের জন্য যাবজ্জীবন কারাদন্ড ও জরিমানার ব্যবস্থা রয়েছে। নতুন প্রস্তাব- ধর্ষণকারীদের যৌন সঙ্গমের হাতিয়ার চিরতরে নিস্তেজ করে দিতে হবে, যাতে করে কারাদন্ড ভোগের পরও দুস্কর্মের ভার আজীবন বয়ে বেড়ায়। ইউক্রেনে ধর্ষণের ব্যাপকতা রোধে খোজা করার উদ্যোগ নিয়েছে। ব্যাপকহারে এটার প্রচার ও প্রসারণা করতে হবে।

এছাড়া ধর্ষণ বা নারী নির্যাতনের অভিযোগ পাওয়ার সাথে সাথে তা আমলে নিতে হবে এবং তদন্ত শুরু করতে হবে এবং অবশ্যই নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে বিচারকার্য শেষ করতে হবে; নইলে বিচারের দীর্ঘসূত্রিতায় ভিকটিম মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হবে, খেই হারিয়ে আত্মহত্যার ভয়াল পথে পা বাড়াতে পারে। সর্বাগ্রে ধর্ষণ প্রতিরোধে সামাজিক আন্দোলন ছাড়া কোনো উপায়ান্তর নাই। সচেতনা সৃষ্টিতে নিয়মিত সেমিনার, সিম্পোজিয়াম,গোলটেবিল বৈঠক করা যেতে পারে।

আধুনিক কালের জাহিলিয়াতগুলো আমাদেরকে বুঝতে হবে, নিজেদের ভেতরের জাহিলিয়াতগুলোও বুঝতে হবে। ইসলামের মূল শিক্ষা হলো নিরন্তর আলোর সন্ধানথজীবনের সরল পথের সন্ধান। আজকের যুগে মুসলিম সমাজের ভেতরের এবং বাইরের জাহিলিয়াতের অন্ধকার ভেদ করে আলোর সন্ধান আমাদের করতে হবে। জীবন ও জগতে সত্য ও ন্যায় উপলব্ধি করার মাধ্যমেই শুধু এ পথে অগ্রসর হওয়া সম্ভব।

আইয়ামে জাহেলিয়া অর্থ অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগ। মহানবী হযরত মুহাম্মদের (সা.) জন্মের পূর্ববর্তী সময়কে আইয়্যামে জাহেলিয়া বলা হয়। ওই সময়ের সামাজিক অনাচারের বিষয়গুলো তুলে ধরে আমরা ইসলাম পূর্ব আরবের মানুষদের বর্বর বলি। বিশেষ করে নারী নির্যাতন,নারীকে পণ্য বিবেচনা করে ভোগ করা ও মেয়ে শিশুকে জীবন্ত কবর দিয়ে হত্যার ঘটনার কথা উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরি। বর্তমান বাংলাদেশের সামাজিক অনাচারের ফিরিস্তি তুলে ধরলে আইয়ামে জাহেলিয়ার ওই সামাজিক অনাচার যে নস্যি, তা যে কেউ সহজে উপলব্ধি করতে পারবেন।

মায়ের পেটে শিশুকে গুলি করে হত্যার চেষ্টা, নিজের আপন মাকে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের জন্য উত্যক্ত করায় মা কর্তৃক সন্তানকে হত্যা,সন্তান কর্তৃক মা-বাবাকে হত্যা,পরকীয়া প্রেমে আসক্ত মা কর্তৃক শিশুদের হত্যা, বাবা কর্তৃক মেয়েকে ধর্ষণ, ভাই কর্তৃক বোনকে ধর্ষণ, শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রীকে ধর্ষণ, মাদ্রাসার শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রীর সাথে জোরপূর্বক যৌন সম্পর্ক স্থাপন,ক্যান্টনমেন্টের মতো সুরক্ষিত এলাকায় ধর্ষণের পর কলেজ শিক্ষার্থীকে হত্যা, অবৈধ যৌন সম্পর্ক স্থাপনের পরিপ্রেক্ষিতে জন্ম নেয়া শিশুকে ছয়তলার ছাদ থেকে ফেলে দিয়ে হত্যার চেষ্টা বা ডাস্টবিনে অথবা জঙ্গলে ফেলে দেয়া, চলন্ত বাসে গার্মেন্টস কর্মীকে ধর্ষণ, কাজের মেয়ের সাথে অবৈধ যৌন সম্পর্ক স্থাপন ও হত্যা, ছয় বছরের শিশুকে ধর্ষণসহ ুব্যভিচার,যুলুম-অত্যাচার,নিপিড়ন যেনো জাহিয়াতের যুগকেও হার মানিয়েছে।
তৎকালীন আরবের যে সমাজব্যবস্থা ছিলো,যে অনাচার,ব্যভিচার ছিলো তা হযরত মুহাম্মদ সা:-এর মনকে ব্যথিত করতো। সেই অন্ধকারের যুগ, আইয়্যামে জাহিলিয়াত যুগের মধ্যে থেকেও তার পবিত্র আত্মা দিয়ে বুঝতে পেরেছিলেন সমাজে অনাচার চলছে। তখন থেকেই তিনি যুবকদের নিয়ে সংগঠন তৈরি করেছিলেন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

সেই আরবের বর্বরতার ন্যায় বর্তমানে চলছে জাহিলিয়াতের যুগ। আজকাল নির্দ্বিধায় রাস্তাঘাটে মানুষ মারা হচ্ছে। নদী-নালা-খাল-বিলের মধ্যে মানুষের লাশ ভাসে। প্রতিদিন শুধু নারীরাই লাঞ্ছিত হচ্ছে না। শিশুরাও লাঞ্ছনা-ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। এটাই তো আইয়্যামে জাহিলিয়া। যে জাহিলিয়া যুগের বিরুদ্ধে মহানবী (সা.) রুখে দাঁড়িয়েছিলেন,সেই যুগের মধ্যে আমাদের বাস করতে হচ্ছে। আমরা মহানবীর সা:-এর আদর্শ থেকে অনেক দূরে সরে গেছি। তার আদর্শ ধরে রাখলে আমাদের সমাজে কোনো কদাচার-অনাচার আসন গেড়ে বসতো না। মহানবীর বাণী অনুসরণ করলে মুসলিম সমাজ ও মানবসমাজকে এতো দুদর্শায় পড়তে হতো না। পৃথিবীতে একটি মাত্র পথ সত্য,এ ছাড়া যা রয়েছে তা হচ্ছে ভ্রান্ত। জাহেলিয়াতের করাল গ্রাস থেকে মুক্ত হয়ে আল্লাহ্র বিধান পুরোপুরি অনুসরণের চেষ্টা করি। শয়তানের পদাঙ্ক দূরে ফেলে ইসলামের অনুশাসন মেনে চলি।

লেখকঃ,সাবেক জাতীয় ক্রীড়াবিদ,সভাপতি শারীরিক শিক্ষাবিদ সমিতি
চেয়ারম্যান গ্রিন ক্লাব,লেখক,গবেষক,সাংবাদিক ও কলামিস্ট