তোষামোদ ও অতিশয় প্রশংসায় নির্লজ্জতা ও হঠকারীতা প্রকাশ পায়

মো.আলতাফ হোসেন ঃঃ
নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য সত্য-মিথ্যা এবং কপটতার মিশেলে অন্যকে তুষ্ট করার অনৈতিক প্রচেষ্টায় চাটুকারিতা বলে অভিহিত করা যায়। এর সমার্থক শব্দ হলো তোষামোদি, মোসাহেবি, তেল মারা ইত্যাদি। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, যিনি এটা করছেন তিনি তা সজ্ঞানেই করছেন এবং যাকে করছেন তিনি এটা বুঝতে পেরেও বিষয়টি বেশ উপভোগ করেন এবং আত্মতুষ্টিতে ভোগেন। প্রতিদানে তিনি তাকে অনৈতিকভাবে কিছু সুযোগও দিয়ে থাকেন।
খোশামোদ,তোষামোদ ও অতিশয় প্রশংসা যা মানুষের নীচুতা,নির্লজ্জতা ও হঠকারীতা প্রকাশ পায়। ইসলাম অতিরিক্ত প্রশংসা, খোশামোদ,তোষামোদ পছন্দ করে না। পৃথিবীর শুরু থেকে সকল যুগে, সকল সমাজেই সত্য ও সুন্দরের বাস্তবসম্মত প্রশংসা নন্দিত ও পছন্দনীয়। এ ধরনের প্রশংসার রয়েছে অত্যন্ত ক্ষতিকর দিক। ইসলাম ধর্মে বাস্তবসম্মত প্রশংসা অনুমোদিত হলেও, তোষামোদ বরাবরই নিন্দিত ও ঘৃণিত। কেননা তা তোষামোদকারী ও তোষামোদকৃত উভয় ব্যক্তির জন্যই মারাত্মক ক্ষতিকর। তাই প্রশংসার ক্ষেত্রে তোষামোদকে পরিহার করে, মাত্রাজ্ঞানের পরিচয় দেয়া ও মধ্যমপন্থা অবলম্বন করা আবশ্যক।
খোশামোদ,তোষামোদ এবং কারো অতিরিক্ত প্রশংসায় অতিশয় উক্তি করা নীচুতা ও লজ্জাহীনতার আলামত সাথে সাথে মিথ্যার একটি প্রচ্ছন্ন রূপও এতে লুকায়িতো থাকে। যারা এভাবে অন্যের খোশামোদ করে এবং অবাস্তবভাবে অপরের প্রশংসা করে তারা একই সাথে তিন ধরনের গুণাহে লিপ্ত হয়ে থাকেঃ খোশামোদকারী লোকেরা নিজের মতলব হাসিলের জন্য এমন সব প্রশংসা করে যা বাস্তবতার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এটা নির্লজ্জ মিথ্যা ছাড়া কিছুই নয়, প্রশংসাকারী ব্যক্তি নিজের মুখ দ¦ারা এমন প্রশংসাসূচক বাক্যাবলী উচ্চারণ করে যার প্রতি সে নিজেও বিশ^াসী নয়। এ ধরনের কথা মুনাফিকী কি নয়? এভাবে প্রশংসা করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নিজেকে অন্যের চোখে হেয় প্রতিপন্ন করে। এতে তার নীচুতা, নির্লজ্জতা ও হটকারীতা প্রকাশ পায়।
সৃষ্টিলগ্ন থেকেই মানুষ সুন্দরের পুজারী। সৌন্দর্যের প্রতি মুগ্ধতা মানবমনের চিরায়ত ধর্ম। সেই মুগ্ধতা যখন অনুভব ও অনুভূতিকে ছাপিয়ে ভাষায় রূপায়িত হয় তখন তা হয় প্রশংসা। তাই প্রশংসা মানবমনের এক অনিবার্য আবেদন কিন্তু প্রশংসা যখন বাড়াবাড়ির পর্যায়ে চলে যায় তখন তা আর প্রশংসনীয় থাকে না, বরং নিন্দনীয় ও ঘৃণিত হয়ে যায়। প্রশংসার ক্ষেত্রে এই বাড়াবাড়িকেই তোষামদ, খোশামদ ইত্যাদি শব্দে ব্যক্ত করা হয়।
এ ধরণের প্রশংসা করার কারণে প্রশংসিত ব্যক্তির দুই ধরনের ক্ষতি হয়ে থাকে ঃ প্রথমতো, সে অহংকারে নিমজ্জিত হয়ে পড়ে, দ্বিতীয়, সে এই মিথ্যা প্রশংসা শ্রবণ করে নিজের সম্পর্কে অনুরূপ ধারণা পোষণ করে এবং অন্যান্য লোকদেরকে তুচ্ছতাচ্ছিল্যের নজরে দেখতে থাকে। আর সর্বক্ষণ সমস্ত মানুষের পক্ষ হতে এ জাতীয় প্রশংসাবাণী শুণার জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকে। পরিণামে তাদের অবস্থা এমন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছে যে, কৃতকর্মের ওপর প্রশংসিত হওয়ার কামনা করার পাশাপাশি অকৃতকর্মের ওপরও প্রশংসিত হতে চায়। এ ধরনের ব্যক্তিদের কঠোর হুশিয়ারি দিয়ে আল্লাহ ঘোষণা করেন-অর্থাৎ ‘তুমি মনে করো না, যারা নিজেদের কৃতকর্মের ওপর আনন্দিত হয় এবং না করা বিষয়ের জন্য প্রশংসা কামনা করে, তারা আমার নিকট থেকে অব্যাহতি লাভ করেছে। বস্তুতো তাদের জন্যে রয়েছে বেদনাদায়ক শাস্তি। (সূরা আল ইমরান : আয়াত ১৮৮)
কুরআন কারীমে অবাস্তব প্রশংসা বা তোষামোদকে ইহুদীখৃষ্টানদের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে সূরা তাওবায় আল্লাহ তা’লা এরশাদ করেন-অর্থাৎ- ইহুদীরা বলে, আমাদের রাসূল উযাইর হলেন আল্লাহ তা’লার পুত্র। আর খৃষ্টানরা বলে, আমাদের রাসূল ঈসা মসীহ হলেন আল্লাহ তা’লার পুত্র। এগুলো মূলত তাদের মুখের অত্যুক্তি। (সূরা তাওবা-৩০)। এই আয়াতের সমর্থনে সহীহ বুখারীর এক হাদীসে আল্লাহর রাসূল (সা.) ও এই ধরনে প্রশংসা বা তোষামোদকে ইহুদী-খৃষ্টানদের স্বভাব আখ্যা দিয়ে ঘোষণা করেন- ইহুদী খৃষ্টানরা যেভাবে তাদের রাসূলদের অবাস্তব প্রশংসা করেছে তোমরা আমার ক্ষেত্রে এমন বাড়াবাড়ি বা তোষামোদি করো না।
কুরআন কারীম ছাড়া বহু হাদীসেও আল্লাহর রাসূল (সা.) এই ধরনের অবাস্তব প্রশংসা বা তোষামোদকে কঠোর ভাষায় নিন্দা জানিয়েছেন। সহীহ মুসলিমের এক হাদীসে আল্লাহর রাসূল (সা.) বর্ণনা করেন- ‘যখন তোমরা তোষামোদকারীদের সম্মুখীন হবে তখন তাদের চেহারায় মাটি নিক্ষেপ করো। (সহীহ মুসলিম-) উক্ত হাদিসটি তোষামোদকারীদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। কারণ রহমত ও দয়ার ক্ষেত্রে যিনি অনুপম তিনিই এই সকল তোষামোদকারীদের চেহারায় মাটি নিক্ষেপ করতে বলেছেন।
অতিরিক্ত প্রশংসা বা তোষামোদ করা মূলত লজ্জাহীনতা ও অযোগ্যতার পরিচায়ক। সাধারণত অযোগ্য এবং অকর্মণ্য ব্যক্তিরাই কিছু পার্থিব স্বার্থ হাসিলের জন্য নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের তোষামোদ করে। মন্দ দিকগুলো এড়িয়ে, শুধু অতিরঞ্জিত প্রশংসা করে তাদের নৈকট্য হাসিলের ঘৃণ্য প্রয়াসে লিপ্ত হয়। এদের ব্যপারে এক হাদিসে আল্লাহর রাসূল (সা.) বর্ণনা করেন- ‘দুর্বল ঈমানের পরিচয় হলো, পার্থিব ধন-সম্পদের লোভে অন্যের অবাস্তব প্রশংসা করা বা তোষামোদ করা।’ এতে তোষামোদকৃত ব্যক্তি তুষ্ট হলেও পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র ভয়াবহ ক্ষতির সম্মুখীন হয়।
তোষামোদের কুফল বা ক্ষতির দিকগুলো আলোচনা করতে গিয়ে হযরত ইমাম গায্যালী (রহ.) তাঁর এক গ্রন্থে উল্লেখ করেন- অবাস্তব প্রশংসা বা তোষামোদ পাঁচটি ক্ষতি বয়ে আনে। তন্মধ্যে তোষামোদকারী ব্যক্তি তিনটি ক্ষতির সম্মুখীন হয় আর তোষামোদকৃত ব্যক্তি সম্মুখীন হয় দুটি ক্ষতির। তোষামোদকারী ব্যক্তি যে তিনটি ক্ষতির সম্মুখীন হয় তা হল- তোষামোদ করার মাধ্যমে তোষামোদকারী ব্যক্তি মূলত মিথ্যা ও প্রবঞ্চনার আশ্রয় নিয়ে থাকে। আর ইসলাম ধর্মে মিথ্যা বলা কবিরা গুনাহ বা মহাপাপ। এক হাদীসে আল্লাহর রাসূল (সা.) এরশাদ করেন- ‘আমার উম্মত কখনো দু’টি গোনাহ করতে পারে না। এক- মিথ্যা বলা। দুই- ধোঁকা দেয়া।’ সুতরাং তোষামোদকারী ব্যক্তি তোষামোদের মাধ্যমে কবিরা গোনাহের মত ভয়াবহ পাপে লিপ্ত হচ্ছে। তোষামোদকারী ব্যক্তি তোষামোদের মাধ্যমে দ্বিতীয় যে ক্ষতির সম্মুখীন হয় তা হল- মুনাফেকি বা কপটতার শিকার হওয়া। অন্তরে একটা রেখে মুখে ভিন্ন কিছু প্রকাশ করাকে বলা হয় মুনাফেকি বা কপটতা। তোষামোদকারী ব্যক্তি বাস্তবতাকে অন্তরে গোপন রেখে মুখে ভিন্নটা প্রকাশ করে। জেনে-শুনে কপটতার আশ্রয় নেয়। সমাজ ও রাষ্ট্রকে বাস্তবতা থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। পরকালে সবচেয়ে কঠিন শাস্তির মুখোমুখি হবে এসকল মুনাফিকরা। কুরআন কারীমে সূরা নিসায় আল্লাহ তা’লা এরশাদ করেন-অর্থাৎ- নিশ্চয়ই মুনাফিকরা জাহান্নামের সবচেয়ে নিম্নস্তরে থাকবে। (সূরা নিসা-১৪৫) তোষামোদকারী ব্যক্তি তোষামোদের মাধ্যমে তৃতীয় যে ক্ষতির সম্মুখীন হয় তা হলো-অন্যকে গোনাহে লিপ্ত করার ক্ষতি। কারণ, তোষামোদকৃত ব্যক্তি তোষামোদ শুনে নিজেকে বড় ও যোগ্য মনে করে। অন্যকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতে থাকে। রিয়া বা লৌকিকতার শিকার হয়ে পড়ে। আর এগুলোর দায় বা গুনাহ মূলত তোষামোদকারী ব্যক্তির ওপর বর্তায়।
তোষামোদকৃত ব্যক্তি অতিরিক্ত প্রশংসা শুনে আত্মম্ভরিকতার শিকার হয়ে যায়। ফলে অন্তরে জন্ম নেয় অহংকার ও অহমিকার সর্বনাশা ব্যাধি। যা তার সকল সদ্যগুণকে ধ্বংশ করে দেয়। আর অহংকারী ও দাম্ভিকরে আল্লাহ তা’য়ালাও অপছন্দ করেন। কুরআন কারীমে সূরা লোকমানে আল্লাহ তা’লা এরশাদ করেন- অর্থাৎ নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’য়ালা অহংকারী ও দাম্ভিক ব্যক্তিকে পছন্দ করেন না। (সূরা লোকমান-১৮)
তাই অতিরিক্ত প্রশংসা ইসলাম শুধু নিষিদ্ধই নয় বরং তাতে রয়েছে মারাত্মক শাস্তি। এ বিষয়ে কঠোর হুশিয়ারি দিয়েছেন মহান আল্লাহ তাআলা। কুরআনুল কারিমে এসেছে- ‘তুমি মনে করো না- তারা শাস্তি থেকে মুক্তি পাবে, যারা নিজেদের কৃতকর্মের জন্য আনন্দিত হয় এবং না করা বিষয়ের জন্য প্রশংসিত হতে ভালোবাসে। এরূপ কখনও মনে করো না, তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। (সুরা আল ইমরান : আয়াত ১৮৮) সুতরাং কারো প্রশংসা, খোশামোদ, তোষামোদ করতে গিয়ে অতিরঞ্জিত না করাই ইসলামের বিধান। কেননা অতিরক্তি প্রশংসাও তোষামোদের দ্বিমুখী ক্ষতি রয়েছে। যে ব্যক্তির প্রশংসা আর প্রশংসা করা হয় উভয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
উচ্চ লক্ষ্য, উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও জীবনে বড় হওয়ার ইচ্ছা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা না করলে হয়তো প্রত্যেকেই স্বীকার করবেন নিজের উচ্চ লক্ষ্য ও বড় হওয়ার দুর্বার আকাঙ্ক্ষার কথা। উচ্চাকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে ব্যক্তিমাত্রই সচেষ্ট হয়। কেউ সফল হয়, কেউ হয় না। গন্তব্যে পৌঁছার পথ-পন্থা-পদ্ধতি ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হয়। অনেকে পরিশ্রম, ধৈর্য, অধ্যবসায় ও আত্মবিশ্বাসের কথা বলেন। পরিশ্রম ও অধ্যবসায় অনেক কষ্টলব্ধ বিষয়। ধৈর্য ধরারও ‘ধৈর্য’ অনেকের থাকে না। তাই সাফল্য পেতে অনেকে সহজ পদ্ধতির সন্ধান করেন। এ জন্য বেছে নেন চাটুকারিতার মতো মন্দ পদ্ধতি। কারও অহেতুক, অতিরিক্ত, কখনও বা অনুপস্থিত গুণাবলির প্রশংসা করে তার মাধ্যমে লাভবান হওয়ার ব্যক্তিত্বহীন ও নির্লজ্জ প্রয়াসের নাম এটি। বলাবাহুল্য, এ সময় তোষামোদকৃত ব্যক্তির কোনো ব্যর্থতা বা দোষ তোষামোদকারীর দৃষ্টিগোচর হয় না কিংবা স্মরণে এলেও তা উল্লেখ করা হয় না। প্রত্যেক ব্যক্তির জীবনে, বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্নভাবে, স্বনামে-বেনামে এদের সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটে। তবে প্রতিষ্ঠিত কোনো ব্যক্তি, কোনো প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা, সরকার ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন ব্যক্তি সাধারণত অধস্তন ব্যক্তির তোষামোদের শিকার হন।
বর্তমান সময়ে অফিস-আদালতে চাটুকারিতার বিস্তার প্রকট। কারণ এখানে সবারই উপরস্থ কর্মকর্তা থাকেন। আর তাকে তুষ্ট করতে পারলেই তো পাওয়া যায় কাঙ্খিতো সুবিধা। সেটা হতে পারে পছন্দসই নিয়োগ-বদলি কিংবা যে কোনো আনুকূল্য। আপনি কর্মে যতই পেশাদার হন না কেন বড় কর্তাকে তুষ্ট করতে না পারলে প্রতিযোগিতার ইঁদুর দৌড়ে আপনি কেবলই পেছনে পড়তে থাকবেন। তাই নিজের ব্যক্তিত্বকে বিসর্জন দিয়ে আপনাকেও শামিল হতে হবে চাটুকারদের দলে। আর আপনার প্রখর ব্যক্তিত্ববোধ যদি আপনাকে অবচেতন মনে এ কাজ করতে বাধা দেয় তবে শত দায়িত্বশীলতার পরও পদে পদে আপনি হবেন হয়রানির শিকার। সহকর্মীরা আপনাকে নিয়ে পেছনে হাসাহাসি করবে, আপনাকে বাঁকা চোখে দেখবে, এমনকি কর্মকর্তার কাছে আপনার আনুগত্য হতে পারে প্রশ্নবিদ্ধ! পরিণামে আপনার জীবন হয়ে উঠতে পারে দুর্বিষহ। আপনি অনেক প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেন বড় কর্তার আনুকূল্য না পাওয়ার কারণে। এক কথায় বলা যায়, ব্যক্তি থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও আমরা চাটুকারিতার বিস্তার প্রতিনিয়ত অনুধাবন করি। ক্ষমতার পালাবদলে চাটুকারও আপন স্বার্থ সিদ্ধির জন্য গিরগিটির মতো অনায়াসে রূপ পরিবর্তন করতে কুণ্ঠিত হয় না। এদের কোনো ধর্ম নেই। সময়ে এরা এত প্রভাবশালী হয়ে ওঠে যে, কোনো কোনো ইস্যুতে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের লোকদেরও দেখা যায় বেকায়দায় পড়ে গেছেন চাটুকারিতার কারণে। বাংলাদেশে এমন ঘটনা অতীতে বহুবার দেখা গেছে।
চাটুকারিতা মানুষের মধ্যে আত্মম্ভরিতা সৃষ্টি করে। আত্মম্ভরিতার কারণে নিজের যোগ্যতা এবং সক্ষমতা সম্পর্কে মানুষ ভুল ধারণার শিকার হয়। এই অপগুণ অপরকে অবজ্ঞা করতে শেখায়। মানুষ তার স্বাভাবিক বোধশক্তি হারিয়ে ফেলে আত্মপ্রবঞ্চনার শিকার হয় সে। যে মানুষের মধ্যে আত্মম্ভরিতা থাকে সে নিজের ভুলত্রুটি সম্পর্কে সচেতন হতে পারে না। এই অপগুণ সত্যানুসন্ধান থেকে মানুষকে বিরত রাখে। আত্মম্ভরিতা যাদের মধ্যে বাসা বাঁধে তারা কোনো সমালোচনাকে সহজে গ্রহণ করে না। চাটুকারদের মিথ্যা কথনে তারা প্রলুব্ধ হয়। নিজের ক্ষমতা কিংবা যোগ্যতা সম্পর্কে মানুষের অহংকার করার কিছু নেই। মানুষ যেহেতু সব বিষয়ে আল্লাহর ওপর নির্ভরশীল সেহেতু কোনো বিষয়ে তার আত্মম্ভরিতায় ভোগার অবকাশ নেই। রসুল (সা.) আলাইহি ওয়াসাল্লাম আত্মম্ভরিতা সম্পর্কে মুমিনদের সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। হজরত মিকদাদ (রা.) থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, রসুল (সা.) আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা চাটুকারদের দেখলে তাদের মুখে মাটি নিক্ষেপ কর । (মুসলিম থেকে মিশকাত)
ইসলাম চাটুকারিতা পছন্দ করে না। ইসলাম মনে করে, চাটুকারিতার বৃত্ত থেকে বের হতে হলে সবার আগে প্রয়োজন দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। প্রয়োজন আত্মশুদ্ধি। পরিশুদ্ধ কোনো ব্যক্তি অযাচিত চাটুকারকে কোনোভাবে প্রশ্রয় দেয় না। উপরস্থ কর্মকর্তার কাছে তার অধীনস্থের মূল্যায়ন হতে হবে যোগ্যতার ভিত্তিতে, তেল মারার ওপর নয়। এক্ষেত্রে নিজের ব্যক্তিত্ববোধকে জাগ্রত করতে হবে। পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ববোধ বাড়াতে হবে। মনে জাগ্রত করতে হবে দেশপ্রেম। তবেই সর্বস্তরে চাটুকারিতার বিস্তার রোধ সম্ভব। বাংলায় একটি প্রবাদ আছে। ‘আমি ভালো তো জগৎ ভালো’। অতএব সবার আগে নিজের চরিত্র বদলাতে হবে। কারণ মানুষ হিসেবে আমরা কেউ দোষ-ত্রুটির ঊর্ধে নই।
চাটুকাররা মানুষকে বাস্তব অবস্থা থেকে দূরে রাখে। নিজেদের অসৎ উদ্দেশ্য চরিতার্থে লক্ষ্যে তারা ভুল পথে পরিচালিত করে। আরেক হাদিসে আত্মতৃপ্তি বা আত্মম্ভরিতাকে তিনি ধ্বংসাত্মক বলে অভিহিত করেছেন। হজরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, তিনটি জিনিস মুক্তিদানকারী এবং তিনটি জিনিস ধ্বংসকারী। মুক্তিদানকারী তিনটি জিনিস হলো- প্রকাশ্যে ও গোপনে খোদাভীতি অবলম্বন করা, সন্তোষ ও ক্রোধ উভয় অবস্থায় সত্য কথা বলা এবং,প্রাচুর্য, দারিদ্র্য উভয় অবস্থার মধ্যপন্থা অবলম্বন করা। ধ্বংস নিশ্চিতকারী জিনিসগুলো হলো-,কুপ্রবৃত্তির দাস হওয়া ,কৃপণ স্বভাব ও সংকীর্ণমনা হওয়া,আত্মতৃপ্তি। এগুলোর মধ্যে শেষোক্তটি সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক (বায়হাকি থেকে মিশকাতে)।
সাধারণত উদ্দেশ্য হাসিলকে সামনে রেখে কোনো ব্যক্তির প্রশংসা বা তোষামোদে প্রবৃত্ত হওয়া জায়েজ নয়। ইসলাম এ কাজকে অতি গর্হিত ও নীতিবিবর্জিত স্বভাব হিসেবে দেখে থাকে। কেননা তা সম্পূর্ণরুপে ‘আলহামদুল্লিাহর’র খিলাফ। এ ছাড়া সার্বিক দিক বিবেচনায় বিষয়টি শিষ্টাচার বিরোধী এবং অসামাজিক কার্যকলাপের আওতাভুক্ত। এ জন্য হাদিস শরীফে দেখা যায়, যখনই কেউ সামনে উপস্থিত ব্যক্তির প্রশংসা করত, রাসূলুল্লাহ (সা.) স্বয়ং তাতে বাধা দিতেন এবং তার বিরোধিতা করে বক্তব্য পেশ করতেন। অনুরূপভাবে সাহাবিদের সামনেও কেউ প্রশংসাবাণী উচ্চারণ করলে তাঁরা তা ভীষণভাবে অপছন্দ করতেন এবং সরাসরি তা প্রত্যাখ্যান করতেন।
হজরত আবু মা’মার বলেন, এক ব্যক্তি জনৈক আমিরের সম্মুখে দাঁড়িয়ে তার প্রশংসা করছিলো। হজরত মিকদাদ তার মুখের ওপর বালু ছুড়ে মারেন এবং বলেন,‘রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাদেরকে প্রশংসাকারীর মুখে বালু নিক্ষেপ করতে আদেশ করেছেন।’(আদাবুল মুফরাদ)
সাহেবায়ে কেরামগণ চাটুকারদের সম্পর্কে সদা সতর্ক থাকার চেষ্টা করতেন। আত্মম্ভরিতা থেকে বাঁচার জন্য তারা সর্বশক্তিমান আল্লাহর দরবারে দোয়া করতেন। কারোর প্রশংসা শুনে যেন মনে অহংকারবোধ বাসা বাঁধতে না পারে সে জন্য নিজের দোষ-ক্র’টি এবং দুর্বলতার কথা সব সময় স্মরণ করতেন এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতেন।
কোনো ফাসিক ব্যক্তির প্রশংসা করা হলে আল্লাহ তায়ালা ক্রোধান্বিত হন এবং এতে তাঁর আরশ প্রকম্পিত হয়ে ওঠে।
দ্বিমুখী নীতি অবলম্বনকারী ব্যক্তি, যে এক ব্যক্তির নিকট তার প্রশংসা করে, অন্যত গিয়ে আবার তার বদনাম করে এবং সম্মুখস্থ ব্যক্তির প্রশংসা করে তাদের সম্পর্কে নবী করিম (সা.) বলেন,‘‘দুনিয়ার জীবনে যে ব্যক্তি দ্বিমুখী নীতি অবলম্বন করবে কিয়ামতের দিন তার মুখে একটি আগুনের জিহ্বা লাগিয়ে দেয়া হবে।
তোষামোদ মূলত মানুষের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতাকে বিনষ্ট করে দেয়। কারণ, মানুষ যখন যোগ্যতার প্রয়োগ ছাড়াই প্রশংসা শুনতে পায় তখন মেধা ও শ্রম ব্যয় করতে আগ্রহী হয় না। ফলে আত্মতুষ্টিতে ভুগতে থাকে। আর আত্মতৃপ্তি ও আত্মতুষ্টি মানুষের শুধু উন্নতি ও অগ্রগতিকেই ব্যাহত করে তা নয়, বরং ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের অবনতিকেও ত্বরান্বিত করে। কেননা গতিশীলতা হলো সৃষ্টির স্বাভাবিক ধর্ম। তাকে ঊর্ধ্বমুখী না রাখলে অধঃগামী হবেই। অন্যদিকে তোষামোদ আর খোশামোদের আধিক্যের কারণে জাতীয় জীবনে আত্মসম্মান ও আত্মপরিচয় বোধের অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। এরই ফলে পরষ্পর হানাহানি, কাঁদা ছোঁড়াছুড়ি, দ্বন্দ, অবিশ্বাস বা মিথ্যাচারের সয়লাবে ভেসে যাচ্ছে সমাজ ও রাষ্ট্র ।
তোষামোদ সাধারণত ক্ষমতা ও অর্থের পিছু নেয়। কারও ক্ষমতা কিংবা অর্থ ফুরালে তোষামোদকারীও আর তার ছায়া মাড়ায় না। প্রতিষ্ঠান, সমাজ বা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা যখন এর শিকার হন, তখন তারা আমোদে গদগদ হন। আর নিজের দুর্বলতা, ব্যর্থতা বা অযোগ্যতা সম্পর্কে সঠিক ও সম্যক ধারণা না থাকার কারণে প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রের ক্ষতি বয়ে আনেন। সুন্দরের প্রশংসা, ভালো কাজের বাহবা অবশ্যই প্রাপ্য। কিন্তু যখন মানুষের প্রশংসা কিংবা গুণকীর্তন মাত্রা ছাড়িয়ে যায় তখনই এটা চাটুকারিতার পর্যায়ে পড়ে। তাই দেশ ও জাতির বৃহৎ স্বার্থের কথা বিবেচনা করে, ইহকাল ও পরকালে আল্লাহ ও রাসূলের সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে সব ধরনের তোষামোদ ও খোশামোদ পরিহার করা একান্ত কর্তব্য। কারো প্রশংসা করতে হলে মাত্রাজ্ঞানের পরিচয় দেয়া এবং মধ্যপন্থা অবলম্বন করা আবশ্যক। আল্লাহ তা’য়ালা ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র ও জাতীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রেই আমাদেরকে তোষামোদের কুফল থেকে সুরক্ষা দান করেন। ইসলামে যে কোনো বিষয়ে অতিরঞ্জিত বা বাড়াবাড়ি প্রশংসা করা নিষিদ্ধ। এতে প্রশংসাকারী ও প্রশংসিত উভয় ব্যক্তিই মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হয়।

লেখকঃ গবেষক,সাবেক জাতীয় ক্রীড়াবিদ,
চেয়ারম্যান গ্রীণ ক্লাব, মানিকগঞ্জ,সাংবাদিক ও কলামিস্ট