দখলের বেড়াজালে মুক্তাঙ্গন

 

মো.আলতাফ হোসেন ঃঃ
পার্ক সাধারণত প্রাকৃতিক অথবা প্রায়-প্রাকৃতিক অবস্থায় রক্ষিত একটি সংরক্ষিত অঞ্চল। এর বাইরেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে কৃত্রিম উপায়েও পার্ক তৈরি করা হয়। পার্ক হিসেবে চিহ্নিত করার পর অনেক সময় পার্কে বিভিন্ন প্রকার গাছপালা রোপণ করা হয়। পার্কে ঘাস আচ্ছাদিত অঞ্চলের সাথে শিলাময় অঞ্চল,জলাশয় এবং জীবন্ত মাছ ও উদ্ভিদ সংরক্ষণের জন্য নির্মিত কৃত্রিম জলাধার বা অ্যাকুরিয়ামসহ বিভিন্ন প্রাণীর জন্য নির্দিষ্ট স্থান থাকতে পারে। বিভিন্ন খেলাধুলা এবং বনভোজন অনুষ্ঠান করার জন্য পার্কের ঘাস যন্ত্র দিয়ে কেটে রাখা হয়। পার্কের নামকরণ সাধারণত কোনো একটি অঞ্চলের নামে অথবা কোনো বিশিষ্ট ব্যক্তির নামে করা হয়। বাংলাদেশে দুটো ক্যাটাগরিতে মোট ৮টি পার্ক রয়েছে। তার মধ্যে নওয়াব খাজা আব্দুল গণির উদ্যোগে সদরঘাটে ১৮৫৮ সালে তৈরি করা হয় বাহাদুর শাহ পার্ক। ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত একে ভিক্টোরিয়া পার্ক বলা হতো। এর পরে শেষ মুগল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহর নাম অনুযায়ী এর নামকরণ করা হয়।

একটি আদর্শ নগরীর বাসিন্দাদের জন্য নগরের মোট আয়তনের অন্তত ১০ শতাংশ জায়গা খোলা মাঠ বা পার্কের জন্য থাকা প্রয়োজন। কিন্তু ঢাকায় খেলার মাঠ আছে মাত্র চার শতাংশ জায়গা। এমনকি এই স্বল্প জায়গাও এখন দখলদাররা গিলে খাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি পরিকল্পিত আবাসিক এলাকায় নান্দনিকতা,পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, বিনোদন ও শরীর চর্চার জন্য খেলার মাঠ থাকা অপরিহার্য। কিন্তু বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্লানার্স (বিআইপি) ও ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ (ডব্লিউবিবি)-এর হিসাবে দেখা যায়, রাজধানীতে গড়ে দুই লাখ ৩০ হাজার ৭৬৯ জন মানুষের জন্য খেলার মাঠ আছে মাত্র ১টি।

বলধা গার্ডেন, ঢাকার একটি ঐতিহাসিক স্থান হিসেবে দেশে-বিদেশে পরিচিত। এদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক-বাহক হিসেবে কালের সাক্ষি হয়ে আছে। স্বাধীনতার আগে ও পরে বাংলাদেশে কোনো বিদেশি পর্যটক এলে তাদের পছন্দের তালিকায় ঢাকার ওয়ারীতে অবস্থিত বলধা গার্ডেনের নামটিও থাকতো। এছাড়া দেশের ভ্রমণ ও সৌন্দর্য পিপাসু মানুষও সপরিবারে বলধা গার্ডেনে বেড়াতে যেতেন। নানা কারণে ঐতিহ্যবাহী বলধা গার্ডেন আজ প্রায় ধ্বংসের মুখে। ঢাকার মানুষের এক সময়ের বিনোদনের প্রাণকেন্দ্র বলধা গার্ডেনে আজ অবাধে চলে মাদক সেবন ও অশ্লীলতা।

একসময়ের ঐতিহ্যবাহী জমিদারবাড়ি বলধা গার্ডেন বর্তমানে কলঙ্কতিলক এঁকেছে পুরান ঢাকাবাসীর কপালে। এখন বলধা গার্ডেনের নাম শুনলেই মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে ন্যূনতম রুচিবোধসম্পন্ন যে কোনো মানুষ। কারণ, বলধা গার্ডেন এখন মাদকসাম্রাজ্য, রুচিহীন তারুণ্যের অবাধ মেলামেশার স্থান! ১৯০৯ সালে ঢাকা জেলার বলধার (বর্তমানে গাজীপুর) জমিদার নরেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরী এই উদ্যান তৈরি করেন। তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে নানা জাতের ফুল ও দুর্লভ উদ্ভিদ এনে লাগান এখানে। এখানে আছে প্রায় ৮শ প্রজাতির ১৮ হাজার উদ্ভিদ। পদ্মপুকুরসহ ছোট ছোট জলাশয়গুলোতে ভাসে নানা রঙের পদ্মফুল। এ ছাড়া এখানে আছে বিরল প্রজাতির ক্যাকটাস, বকুল, ক্যামেলিয়া, আফ্রিকান টিউলিপ,অর্কিড,অ্যাথুনিয়া, আমাজান লিলি,আশোকসহ নানা প্রজাতির ফুল ও অর্কিড।এই বাগানের ক্যামেলিয়া ফুলের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচনা করেছিলেন ‘ক্যামেলিয়া’ কবিতাটি। পুরান ঢাকার অভিজাত এলাকা খ্যাত ওয়ারীর বাসিন্দাদের নির্জন বিনোদন ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছিলো এই বলধা গার্ডেন। উদ্ভিদবিদদের জন্য এই উদ্যান ছিলো রীতিমতো গবেষণার স্থান। বলা হয় পুরান ঢাকাবাসীর গৌরবের জায়গা ছিলো এই বলধা গার্ডেন। কিন্ত এর ভেতর পুকুরের সিঁড়ির আড়ালে, বিভিন্ন ঝোপঝাড়,সরুস্থানে জুটিবদ্ধ হয়ে বসে আছে তরুণ-তরুণীরা। তারা শুধু বসেই নেই, দিনের আলোয় প্রকাশ্যে যৌনতায় মেতে উঠেছে!

বোটানিক্যাল গার্ডেন জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান (বাংলাদেশ ন্যাশনাল হার্বেরিয়াম) বোটানিক্যাল গার্ডেন হিসেবে অধিক পরিচিত। মিরপুরে বাংলাদেশ জাতীয় চিড়িয়াখানার পাশেই বোটানিক্যাল গার্ডেনের অবস্থান। ২০৮ একর জায়গার উপর প্রতিষ্ঠিত এই জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে প্রায় ৮০০ প্রজাতির বিভিন্ন বৃক্ষ রয়েছে। এই সব বৃক্ষরাজির মধ্যে রয়েছে নানান ধরনের ফুল, ফল, বনজ এবং ঔষধি গাছ। বোটানিক্যাল গার্ডেনে ফুলের বাগান ছাড়াও রয়েছে পুকুর, দীঘি ও ঘাসে ঢাকা সবুজ মাঠ। রাজধানী ঢাকা শহরের ভেতরে সবুজের রাজ্যে ভ্রমণের জন্য বোটানিক্যাল গার্ডেন অনন্য।তাই প্রতি বছর হাজার হাজার দর্শনার্থী এখানে বেড়াতে আসেন। ফুলের বাগান,খোলা আকাশ সবুজবেষ্টিত নিসর্গচিত্র কে না দেখতে চায়। আর তা যদি হয় ইটের জঙ্গল রাজধানীতে তাহলে তো কথাই নেই।
ঢাকার যতগুলো এলাকায় মাঠের অপ্রতুলতা আছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য উত্তরা। ২ লাখ ৩৮ হাজার বাসিন্দার আবাস মডেল টাউন উত্তরায় মাঠের অপ্রতুলতা রয়েছে ২৫টি। তবে এখানে রয়েছে কিছু পার্ক। সে রকম একটি পার্ক উত্তরা হাইস্কুলের পাশের পার্কটি, যার বাইরে লেখা, ‘পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের কাজের সুবিধার্থে বেলা ১১টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত প্রবেশ নিষেধ’।

রাজধানীর গেন্ডারিয়ার ধূপখোলা মাঠটির আয়তন প্রায় ২১ বিঘা। এ মাঠে খেলেই তৈরি হয়েছিলেন জাতীয় দলের বেশ কয়েকজন নামিদামি ফুটবলার-ক্রিকেটার। সে মাঠের একাংশে তৈরি হচ্ছে পার্ক, কমিউনিটি সেন্টার ও জিমনেশিয়াম। ফলে মাঠের পরিধি সংকুচিত হয়ে পড়েছে। সংকুচিত হচ্ছে এলাকার শিশু-কিশোর ও তরুণদের খেলাধুলার সুযোগ। এ চিত্র শুধু ধূপখোলা মাঠের ক্ষেত্রেই নয়। পুরান ঢাকার আরও যেসব খেলার মাঠ ছিলো,সেগুলোতেও একের পর এক গড়ে উঠেছে বহুতল অট্টালিকা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব খেলার মাঠগুলোতেও গড়ে উঠেছে ভবন। অবশিষ্ট মাঠগুলোতেও খেলাধুলার পরিবেশ নেই বললেই চলে। ফলে বর্তমান প্রজন্ম খেলাধুলার সুযোগ না পেয়ে বিপথগামী হচ্ছে। কেউ মাদকাসক্ত হচ্ছে। কেউ রাস্তার পাশে তরুণীদের উত্ত্যক্ত করছে। কেউ বা ইন্টারনেটে ডুবে থাকছে। এসবের প্রভাবে পুরান ঢাকার নগরজীবনে সৃষ্টি হচ্ছে নানা ধরনের সামাজিক সমস্যা। পাড়া-মহল্লাগুলোতে ছোটখাটো অপরাধ লেগেই আছে। বাংলাদেশ মাঠটি উন্মুক্ত থাকলেও সেখানে খেলাধুলার তেমন পরিবেশ নেই। একাংশে লোকজন দোকানপাট বানিয়েছে। আরেক অংশজুড়ে ময়লা-আবর্জনা ফেলা হচ্ছে। এ ছাড়া মাঠটি খানাখন্দেও ভরা। এরই মধ্যে কখনো কখনো বিভিন্ন কর্মসূচিরও আয়োজন করা হয়।

প্রায় ৬২ শতাংশ জায়গাজুড়ে অবস্থান যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা পার্ক। পার্কটি এক অংশ দখল করে রেখেছে অন্য অংশটি স্থানীয় হকারদের ভ্যানগাড়ি দিয়ে দখল করে রাখা হয়েছে। পার্কটিতে গাছপালার কোনো চিহ্নও নেই। পার্কের যত্রতত্র দেখা গেছে ময়লার ভাগাড়।
প্রায় ১৫ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত ধানমন্ডি পার্ক। পার্কটিতে রয়েছে শিশু-কিশোর ও সব বয়সের লোকজনের আনাগোনা। পার্কের ভেতর ব্যায়ামের কিছু যন্ত্রপাতি ছিলো তা এখন নেই। তবে এখনো যে কয়েকটি রয়েছে তা সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে। রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র পল্টন মোড় ও জিরো পয়েন্টের মাঝখানে প্রায় ৮৩ শতাংশ জায়গাজুড়ে অবস্থিত মুক্তাঙ্গন পার্ক। পার্কটি বেদখল হওয়ায় এখন আর চেনার উপায় নেই। এটি এখন পার্ক নয়, রেন্ট-এ কার ব্যবসাকেন্দ্র। দখল পাকাপোক্ত করতে কেটে নেয়া হয়েছে গাছ। বসার বেঞ্চগুলো এখন অস্তিত্বহীন।
‘ক্রীড়াই শক্তি ক্রীড়াই বল-সুস্থ দেহ সুন্দর মন’ এই প্রবাদটি যেন ভেস্তে যেতে বসেছে নেত্রকোনার দুর্গাপুরে। পৌরশহরের বিরিশিরি পিসিনল মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয়ের একটি খেলার মাঠ মাত্র। আট বছর ধরে দখল করে বালুবাহী ট্রাকের রাস্তায় পরিণত করে রমরমা ব্যবসা শুরু করেছে স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহল। শতবর্ষ পুরোনো বিরিশিরি পিসিনল মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয়ের কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশে মোটা অংকের টাকার বিপরীতে মাঠটি দখল করে ডাইভারশন তৈরি করে দেদারছে চলছে ব্যবসা। দীর্ঘদিন ধরে এই খেলার মাঠের ওপর দিয়ে সোমেশ্বরী নদী থেকে বালু, পাথর, কয়লা বহনকারী ট্রাক, লরিসহ বিভিন্ন যানবাহন বালু পরিবহন করে আসছে। প্রতিদিন ৩শ থেকে ৪শ গাড়ি চলাচল করে এই মাঠের ওপর দিয়ে। মাঠ দিয়ে যানবাহন চলাচল বন্ধের প্রতিবাদে সর্বস্থরের জনগণ বেশ কয়েকবার মানববন্ধনও করেছে। আর মাঠ দিয়ে ট্রাক চলাচলের জন্য প্রতি ট্রাক থেকে ২৫০ টাকা করে চাঁদা রাখছে স্থানীয় একটি প্রভাবশালীর অনুমোদিত একটি মহল বলে জানায় স্থানীয়রা।

পটুয়াখালীর বাউফলের কালাইয়ায় ধানহাট ও খেলার মাঠ দখল করে ইট, খোয়া, বালু ও পাথরের ব্যবসা চলছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সেখানে অবৈধভাবে ব্যবসায়িক কার্যক্রম চালাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে এভাবে মাঠের ব্যবহার হয়ে আসছে। বর্তমানে ওই মাঠে ইট, বালু ও পাথর রাখার কারণে তারা খেলাধুলা করতে পারছে না। বেদখল হওয়ায় ধানহাট ছোট হয়ে আসছে।

নওগাঁর বদলগাছীতে খাদাইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের খেলার মাঠে গ্রামবাসীকে হাট লাগানোর সুযোগ দিয়ে বিপাকে পড়েছে স্কুল কর্তৃপক্ষ। হাট লাগিয়ে স্কুল কর্তৃপক্ষ লাভবান হচ্ছে না। লাভের ভাগ খাচ্ছে টিয়া। পুরো মাঠ দখল করে গ্রামের কতিপয় ব্যক্তি ব্যবসা-বাণিজ্য দোকান গড়ে তোলে। তারা ইচ্ছেমতো মাঠের জমি বেচাকেনা করছে। দোকানঘর নির্মাণ করে ভাড়া দিয়েছে।

তালার মাগুরা বাজার সংলগ্ন প্রায় ২শ’ বছরের পুরাতন ঐতিহ্যবাহী খেলার মাঠের জমি দখল চেষ্টা চালায় এলাকার একটি দূর্বৃত্তচক্র। মাগুরা বাজার সংলগ্ন মাগুরা যুব সংঘ’র নিয়ন্ত্রনাধিন সরকারি খেলার মাঠটি প্রায় ২শ’ বছরের পুরাতন। এই মাঠে ওয়াজ মাহফিলসহ বিভিন্ন ক্রীড়া টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া এলাকার যুব সমাজ এই মাঠে খেলা করে। কিন্তু সন্ত্রাসী ও বহু অপকর্মের হোতারা খেলার মাঠসহ মাঠ সংলগ্ন কপোতাক্ষ নদের জমি জোর দখল করতে চেষ্টা চালায়।

শেরপুরের ঝিনাইগাতীতে খেলার মাঠ দখল করে চাষাবাদের অভিযোগ উঠেছে। ফলে এলাকায় ক্রীড়া কর্মকান্ড ব্যাহত হচ্ছে। উপজেলার ধানশাইল চকপাড়া গ্রামে একটি খেলার মাঠ ছিলো। দেশ স্বাধীনের পূর্বে থেকেই এলাকার তরুণ ও যুব সমাজ এ মাঠে খেলাধূলা করত। বনবিভাগের প্রায় ২ একর জমির উপর এ খেলার মাঠটি অবস্থিত। গ্রামের প্রভাবশালী খেলার মাঠটি দখল করে চাষাবাদের পাশাপাশি ওই জমির উপর ঘর-বাড়ি নির্মাণ করে বসবাস করে আসছেন। এলাকার তরুণ ও যুব সমাজ খেলাধূলা করতে পারছে না। এতে ঝিমিয়ে পরেছে ক্রীড়া কার্যক্রম। এ নিয়ে এলাকার সচেতন মহলের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।

চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার শতবর্ষী একটি খেলার মাঠ দখলের চেষ্টা করছে একটি প্রভাবশালী চক্র। ঐতিহ্যবাহী মাঠটি দখলে নিতে মরিয়া চক্রটি মাঠের মধ্যেই ভবন নির্মাণের পাঁয়তারা করছে। তবে চিকনদন্ডী ইউনিয়ন ও নগরীর ১নং দক্ষিণ পাহাড়তলী ওয়ার্ড এলাকার বাসিন্দারা চাইছেন যেকোনো মূল্যে এই শতবর্ষী দামুয়া পুকুর খেলার মাঠটি রক্ষা করতে। এই মাঠের আশপাশে প্রায় ২ বর্গকিলোমিটারের মধ্যে অন্য কোনো খেলার মাঠ নেই। এলাকার বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী ও স্থানীয় ছেলেমেয়েরা এই মাঠেই খেলাধুলা করে। এই মাঠে ফুটবল অনুশীলন করে অনেকের জেলা ও জাতীয় পর্যায়ে পর্যন্ত খেলার সুযোগ হয়েছে।

ঢাকায় খেলার মাঠগুলো দখল হয়ে যাচ্ছে। কোনটি দখল করছে ব্যক্তি আবার কোনটি ক্লাবের নামে দখল করে প্রভাবশালীরা। সেখানে স্থাপনা নির্মাণ করে চালু করা হচ্ছে নানা ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। যার সর্বশেষ শিকার ঢাকার ধানমন্ডি মাঠ। কোটি মানুষের শহর ঢাকা। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের হিসাবে ঢাকায় এখন প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ৪৫ হাজার মানুষের বাস।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে, একটি শহরে প্রতিটি মানুষের জন্য থাকতে হবে ৯ বর্গমিটার খোলা জায়গা, ঢাকায় তা আছে মাত্র ১ বর্গমিটার। জনসংখ্যার হিসাবে যেখানে ঢাকায় থাকার কথা ছিলো প্রায় ১ হাজার ৩০০ খেলার মাঠ, সেখানে দুই সিটি করপোরেশনের কাছে আছে মাত্র ২৩৫টি খেলার মাঠ, অর্থাৎ মাঠের ঘাটতি প্রায় ১ হাজার ১০০। নগর-পরিকল্পনাবিদেরা বলছেন, এই মাঠগুলো বড় মাঠ হতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। এলাকার মধ্যে ছোট ছোট খোলা জায়গা থাকতে হবে, যেখানে সব বয়সের মানুষ খেলাধুলা, হাঁটাহাঁটি করতে পারেন। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, ন্যূনতম প্রয়োজনীয় সেই জায়গাগুলোও নেই। এমনকি আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন হাউজিং প্রকল্পেও এ ধরনের পর্যাপ্ত মাঠ রাখা হচ্ছে না।

রাজধানীতে মোট ৫১টি পার্ক মাঠ রয়েছে। ঢাকা সিটি করপোরেশন ভাগ হওয়ার পরে উত্তর সিটি করপোরেশনের হাতে রয়েছে ২৬টি পার্ক আর দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের হাতে (নথি অনুযায়ী) ২৫টি পার্ক মাঠ রয়েছে। দেখা গেছে, আসাদগেট নিউ কলোনি পার্ক মাঠটি দখল করে গড়ে উঠেছে বেশ কয়েকটি পরিবহন কোম্পানির অফিস। বসানো হয়েছে স্থায়ী চায়ের দোকান। মাঠের এক পাশ দখল করা হয়েছে নির্মাণাধীন ভবনের বর্জ্য ও এলাকার ময়লা-আবর্জনা দিয়ে।

‘ঢাকা সিটি কর্পোরেশন বৈশাখী পার্ক। সার্বিক তত্ত্বাবধানে ও দায়িত্বে বনানি সোসাইটি। অবস্থান বনানির ৯ নং রোডে, এফ ব্লকে। পার্কের ভেতরে যারা হাঁটবে তাদের মাঠের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ২০০ টাকা করে প্রতিমাসে দিতে হবে।’ লিখিত ব্যানার ঝোলানো রয়েছে পার্কের চারদিকে। কাগজ-কলমে এটি শিশুপার্ক হলেও দেখে তা বোঝার উপায় নেই। শিশুদের বিনোদনের কোনো সরঞ্জাম নেই এখানে। গাছপালার সংখ্যা কম। সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষের আনাগোনা নজরে আসে না। রাজধানীর দু-একটি ছাড়া সব কটি শিশুপার্ক বেদখলে চলে গেছে।

রাজধানীর পুরান ঢাকার নারিন্দা শিশুপার্কটি এখন অস্তিত্বহীন। নারিন্দার শিশুদের জন্য স্থাপিত এ পার্কটি দখল করে রেখেছে একটি সংগঠন, যা স্থানীয় প্রভাবশালীদের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত। তারা এর বিশাল অংশজুড়ে একটি দোতলা ভবন নির্মাণ করে দখল করে রেখেছেন। এখন পার্কের অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। নারিন্দা পার্কটিতেও একটি কমিউনিটি সেন্টার গড়ে তোলা হয়েছে। প্রায় ৩৫ শতাংশ জায়গাজুড়ে মতিঝিল বিআরটিসি ভবনের বিপরীতে অবস্থান মতিঝিল পার্কটির। ডিএসসিসি নিয়ন্ত্রিত এ পার্কটির এখন বেহাল দশা।
ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) পাঁচটি পার্ক ও খেলার মাঠ থেকে অবৈধ দখল উচ্ছেদ করা হয়েছে। পাঁচটি পার্ক ও খেলার মাঠ আধুনিকায়নে আর কোনো বাধা রইলো না। যেসব পার্ক থেকে দখলদারদের উচ্ছেদ করা হয়েছে সেগুলো হলো- বনানী পূজা মাঠ, বনানী সি ব্লক পার্ক, মোহাম্মদপুর ত্রিকোণ পার্ক,শিয়া মসজিদ পার্ক এবং মোহাম্মদপুর উদয়াচল পার্ক।দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সাক্ষী মুক্তাঙ্গন পার্ক বন্দী।পার্কের সিংহভাগ একশ্রেণির ব্যবসায়ীর দখলে। জায়গাটি এখন আর আলাদা করে চেনা যায় না। জিপিও থেকে পল্টন মোড় যেতে হাতের বাম দিকের খোলা অংশটিই মুক্তাঙ্গন।

হাজারীবাগ শিশুপার্কে অবৈধ দোকান ছাড়াও রয়েছে ক্ষমতাসীন কর্মীদের আড্ডার ঘর। দিনের বেলায় এখানে দু-একজন এসে বসলেও বিকেল থেকেই শুরু হয় মাদকাসক্তদের আনাগোনা। ছিনতাই এখানে নৈমিত্তিক ঘটনা। কাগজে-কলমে মুক্তাঙ্গন পার্ক থাকলেও বাস্তবে এটি রেন্ট-এ-কারের ব্যবসাকেন্দ্র।একজনের নামে থাকা জমি ১২ বছর ধরে অন্যজনের ভোগদখলে থাকলেই সেই জমি তার হয়ে যাবে, এমন আইনে পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। দখলদার যাতে জমির মালিক না হয়ে যায়, সেজন্য ‘ভূমির ব্যবহারস্বত্ব গ্রহণ আইন, ২০২০’ নামে নতুন আইন করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রস্তাবিত আইনের খসড়া তৈরি করেছে ভূমি মন্ত্রণালয়। পরিবেশ ও প্রকৃতি আমাদের জন্য ধরণীতে অনেক নিয়ামত দিয়েছে। আমরা পরিবেশ ও প্রকৃতির নিয়ামতগুলো ভোগ করছি সত্য কিন্তু কেউ তার অকৃতজ্ঞের মতো নির্বিচারে জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ ধ্বংস করছে। নিশ^াস ফেলার জায়গাটুকু নিচ্ছে দখল করে। আমাদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য-ভোগবিলাসের জায়গাটুকু হয়ে যাচ্ছে ভোগ দখল।পরিবেশের জন্য সাধারণ রোগে অসুস্থ মানুষের স্বাস্থ্যসেবাও নাগালের বাইরে। অর্থাৎ দখল-দূষণরোধকল্পে পরিবেশের জন্য চাই দেশে রুচিবোধ সম্পন্ন একটি সুন্দর মুক্তাঙ্গন।

লেখকঃ গবেষক,সাবেক জাতীয় ক্রীড়াবিদ,
চেয়ারম্যান গ্রীণ ক্লাব, মানিকগঞ্জ,সাংবাদিক ও কলামিস্ট