দুর্নীতি দমনের জন্য সামাজিক আন্দোলনের কোন বিকল্প নেই

 

মো. আলতাফ হোসেন ঃঃ
একটি সুন্দর, সুশৃঙ্খল যুব সমাজের ভাবমূর্তির ওপর সমগ্র জাতির নীতি-নৈতিকতার ভবিষ্যৎ নির্ভর করে। দেশের সব প্রতিষ্ঠানের পরিচালনার দায়িত্ব প্রাজ্ঞ প্রবীণদের ওপর থাকে। তাঁদের অভিজ্ঞতা, সততা, দক্ষতা এবং ন্যায়নিষ্ঠার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের কার্যাবলি বাস্তবায়নের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে তরুণ ও যুবক বয়সীরা। তরুণদের মেধা, শ্রম ও দক্ষতা প্রতিষ্ঠানের সাফল্য এনে দেয়। অল্প কিছুসংখ্যক বিপথগামী বাদে সমাজের অধিকাংশ তরুণ-যুবক বিশুদ্ধ ও আদর্শবান। তাদের একত্র করা সম্ভব হলে তাদের দিয়েই দেশের বিরাজমান দুর্র্নীতি প্রতিরোধ করা যাবে।

যুবসমাজই দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করার ক্ষেত্রে উদ্দীপনামুলক ভূমিকা নিতে পারে। সুনাগরীকেরা এমন একটি সামাজিক পরিবেশ চায়, যেখানে তারা সবাই মিলে পরিবার-পরিজন নিয়ে নিরাপদে সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে পারে। যেখানে দুর্নীতি হবে, যেখানেই শান্তিপূর্ণভাবে জোরালো প্রতিবাদ জানাতে হবে।

দেশের জাতীয় সমস্যা দুর্নীতি প্রতিরোধ করা। শুধু দুর্নীতিবাজদের শাস্তি দিয়ে লাভ নয়, এ জন্য প্রয়োজন গণসচেতনতা, দেশপ্রেম এবং তারুণের অঙ্গীকার। ‘দুর্জয় তারুণ্য দুর্নীতি রুখবেই’-তরুণদের দুর্নীতিবিরোধী সামাজিক মূল্যবোধ নিজেদের মধ্যে ধারণ করতে এবং পরে নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে থেকে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে আন্দোলনের মাধ্যমে দুর্নীতি প্রতিরোধ করা সম্ভব। তরুণ-তরুণী, যুবক-যুবতীদের প্রত্যয়, দর্শন, প্রত্যাশা ও অঙ্গীকারের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে দুর্নীতির মাত্রা এবং কারণ নিয়ে দ্বিমত থাকলেও এর প্রতিরোধের বিষয়ে কারও কোনো ভিন্নমত থাকার কথা নয়। এছাড়া সবাইকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ অবস্থান গ্রহণের মাধ্যমে সুখী-সমৃদ্ধ ও প্রগতিশীল দেশ গড়ার আন্দোলনে অংশ নিতে হবে।

তরুণদের সাহসিকতা ও সংঘবদ্ধতার মাধ্যমে দুর্নীতি রোধ করা যায়। সাহসী তরুণেরা যদি একত্র হয়, তবে তাদের দলগত শক্তি দিয়ে দুর্নীতি প্রতিরোধ করা যাবে। সবাইকে বলতে হবে, ‘দুর্নীতি করব না এবং সইব না’। দুর্নীতি প্রতিরোধে মন্দকে পেছনে ফেলে ভালোকে কাছে টানার অনুভূতি সৃষ্টি করতে হবে। পাহাড় সমান দুর্নীতি দূর করার জন্য আদর্শবান ও সৎ তরুণ-যুবকদের সমাজকল্যাণমূলক কাজের নেতৃত্বে এগিয়ে আসা প্রয়োজন।

ধর্মীয় বিধিবিধান ও নৈতিক অনুশাসনের কথা জনসাধারণের কাছে সুন্দরভাবে তুলে ধরার মাধ্যমে সমাজ থেকে দুর্নীতি নির্মুল করা সম্ভব। যুবসমাজের দ্বারা জনসচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে সমাজ থেকে দুর্নীতির শিকড় উৎপাটন করা দরকার। কারা কীভাবে দুর্নীতি করছে, সে তথ্য প্রকাশ্যে ও জনসমক্ষে তুলে ধরা উচিত। নিজেদের পরিবার-পরিজন ও আত্মীয়স্বজনকে নিয়ে দুর্নীতি না করার এবং প্রতিরোধেরও অঙ্গীকার করতে হবে। তরুণ যুবসমাজ এ ব্যাপারে কেবল সাহায্য-সহযোগিতা করবে। দেশের যুবসমাজ অসততা, অন্যায় ও দুর্নীতির বিরোধিতা শুরু করলে দুর্নীতিপরায়ণ লোকেরা দুর্নীতি পরিত্যাগ করতে বাধ্য হবে। এর জন্য প্রয়োজন তরুণ ও যুবকদের সম্মিলিত ঐক্যমত ও সংঘবদ্ধতা।

দুর্নীতি প্রতিরোধে নিজের ইচ্ছাশক্তি ও আত্মশুদ্ধি প্রয়োজন। মানুষের আত্মাকে নিয়ন্ত্রণ করে বিবেকবোধের মাধ্যমে সমাজে দুর্নীতি প্রতিরোধ করতে হবে। কেউ যদি দুর্নীতিতে আকৃষ্ট হয়েও নিজের বিবেকের তাড়নায় দুর্নীতি থেকে মুক্ত থাকতে পারেন, তাহলে তিনি খাঁটি ধর্মপ্রাণ লোক। আত্মশক্তি বিকাশের মধ্য দিয়ে তরুণ প্রজন্ম তথা যুবসমাজ রুখে দাঁড়ালে দেশ দুর্নীতিমুক্ত হতে বাধ্য। এ জন্য ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ-জীবনের সর্বক্ষেত্রে দুর্নীতিবিষয়ক সর্বাত্মক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

দুর্নীতি দমনের জন্য সামাজিক আন্দোলনের কোনো বিকল্প নেই। প্রতিরোধের মাধ্যমেই দুর্নীতিকে নিয়ন্ত্রণে আনা যেতে পারে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মাদ্রাসা, মক্তব ও বিভিন্ন ধমীয় উপাসনালয় প্রভৃতি স্থান থেকে সদুপদেশ ও ধর্মীয় বিধিবিধানের আলোকে তৃণমূল পর্যায় থেকে দুর্নীতি দমনের জন্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা তৈরি করে সামাজিক আন্দোলন ও জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে আন্তধর্মীয় নেতাদের সম্পৃক্ততা ও বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করতে হবে।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনার (তদন্ত) এ এফ এম আমিনুল ইসলাম বলেছেন, দুর্নীতি প্রতিরোধে জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে। শৈশব থেকেই শিশুদের মনে দুর্নীতির কুফল এবং দুর্নীতিমুক্ত সমাজের সুফলের ধারণা দিতে পরিবার ও বিদ্যালয়কে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। তিনি বলেন, দুর্নীতিবাজরা কখনই জনগণের চেয়ে শক্তিশালী নয়। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি কমিয়ে আনতে কর্তা ব্যক্তির সদিচ্ছাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে দুর্নীতি প্রতিরোধ কার্যক্রমকে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দিতে সকলের সহযোগিতা প্রয়োজন।

৯ ডিসেম্বর দুর্নীতি বিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস। আন্তর্জাতিক দিবস হিসেবে এটি নতুন হলেও গুরুত্ব অপরিসীম। বিশেষত বাংলাদেশসহ তৃতীয় বিশে^র দেশগুলোর জন্য দিবসটি তাৎপর্যপূর্ণ। ২০০৩ সালে জাতিসংঘের উদ্যোগে মেক্সিকোর মেরিদায় অনুষ্ঠিত দুর্নীতিবিরোধী কনভেনশনে প্রতিবছর ৯ ডিসেম্বর দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। দুর্নীতি বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলে বিশ^ অর্থনীতিকে দুর্নীতিমুক্ত রাখাই এর উদ্দেশ্য।

২০০৪ সালে প্রথমবারের মতো দিবসটি পালিত হয়। বাংলাদেশ ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল দিবসটি পালন করে এবং নানারকম কর্মসূচি গ্রহণ করা। দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া এবং এ সম্পর্কে প্রচার প্রচারণা চালানোই এ দিবস পালনের মূল উদ্দেশ্য। বাংলাদেশ দিবসটি পালনের জন্য টিআইবি গৃহীত কর্মসূচি মধ্যে রয়েছে সেমিনার আয়োজন ও টিআইবি পুরস্কার বিতরণ। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আয়োজন করা হয় র‌্যালি, গণ নাটক, বিতর্ক ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা। জাতিসংঘ সনদে বলা হয়েছে, দুর্নীতি দমনবিরোধী কনভেনশন বাস্তবায়নের মাধ্যমে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দায়িত্ব হচ্ছে দেশসমূহের সরকারের। সুশীল সমাজ, এবং বেসরকারি মহলও সরকারকে সহায়তার মাধ্যমে এক্ষেত্রে ভালো ভূমিকা রাখতে পারেন।

লেখক: সাবেক জাতীয় ক্রীড়াবিদ(কারাতে ব্লাক বেল্ট ১ম ড্যান) চেয়ারম্যান গ্রিন ক্লাব
সভাপতি শারীরিক শিক্ষাবিদ সমিতি, গবেষক,শিক্ষক,সাংবাদিক ও কলামিস্ট