ধোঁকা ও প্রতারণা হীন মানসিকতার পরিচায়ক

 

মো.আলতাফ হোসেন ঃঃ
ধোঁকা ও প্রতারণা হীন মানসিকতার পরিচায়ক। প্রতারণা মুনাফিকের অন্যতম স্বভাব। যারা প্রতারণা করে, তারা প্রকৃত মুসলমান হতে পারে না। একসময় প্রতারকের মুখোশ খুলে যায়, তখন আর পালানোর পথ থাকে না। অপরকে ঠকানো এবং মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ করা ইত্যকার কারণে ইসলামী শরী’আতে ধোঁকা ও প্রতারণা হারাম। ইসলাম কোনো ধরনের অন্যায় কাজকে অনুমোদন করে না। বিশেষ করে যারা মানুষকে ঠকায়, তাদের ব্যাপারে কোরআন ও রাসূল (সা.) এর হাদিসে সতর্ক করা হয়েছে। ইসলামের দৃষ্টিতে ধোঁকাবাজি ও প্রতারণা জঘন্য অপরাধ। ধোঁকাবাজরা তাদের অপকর্মের মাধ্যমে শুধু অপরকেই প্রতারিত করে না নিজেদেরও এই অপরাধ বলয়ের মধ্যে জিম্মি করে ফেলে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ ঘোষণা করেন ‘ধোঁকা ধোঁকাবাজদেরই ঘিরে ফেলে।’ সূরা ফাতির-৪৩। যারা প্রতারণা বা ধোঁকাবাজির সঙ্গে জড়িতো, তাদের যে পরিণাম ভয়াবহ তা স্পষ্ট করা হয়েছে হাদিসের বর্ণনায়। নবী করিম (সা.) বলেন, ‘ধোঁকাবাজ ও প্রতারক জাহান্নামির বাযযার। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি কোনো লোকের সঙ্গে ধোঁকাবাজী করে সে আমার উম্মতের বাইরে।
ইসলাম সত্যের সঙ্গে মিথ্যার মিশ্রণকে কখনোই সমর্থন করে না। মিথ্যাকে সত্যের আবরণ পরিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টাই হচ্ছে প্রতারণা। মিথ্যা দিয়ে যেমন বাস্তব ও প্রকৃত ঘটনাকে আড়াল বা গোপন করা হয়, প্রতারণার মাধ্যমেও অনুরূপভাবে প্রকৃত অবস্থাকে আড়াল করে সাধারণ মানুষকে ঠকানো হয়। ইসলামের দৃষ্টিতে মানবজীবনে যা কিছু করণীয়, তার মধ্যে ফাঁকিবাজি ও প্রতারণার কোনো স্থান নেই। কোরআনে আল্লাহ বলেন,‘আর তোমরা সত্যকে মিথ্যার সঙ্গে মিশ্রিত করবে না এবং তোমরা জেনেশুনে সত্য গোপন করবে না।’ (সূরা আল- বাকারা; আয়াত-৪২) আল্লাহ পাক এরশাদ করেন, বল ‘‘সত্য এসেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে। মিথ্যা তো বিলুপ্ত হবারই।’’ (সূরা বণী-ইসরাইল; আয়াত ৮১)

আল্লামা ইকবাল বলেন, ‘‘বে-ঈমান মানুষের জন্য লেখনী তরবারী সমভাবে নিরর্থক, ঈমান যখন হয় বিলুপ্ত স্বভাবও কাষ্ঠ আর লৌহ হারিয়ে ফেলে তার মূল্য’’। ইসলামে ধোঁকা বা প্রতারণা করা হারাম। দৈনন্দিন জীবনে এ ধোঁকা বা প্রতারণা হতে পারে কথা বা কাজে, লেন-দেন এবং ব্যবসা-বানিজ্যে। তা যে কাজেই হোক না কেনো কোনো ক্ষেত্রেই পরস্পর ধোঁকা ও প্রতারণার আশ্রয় নেয়াকে ইসলাম সমর্থন করে না বরং ইসলামে এগুলোকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। ধোঁকা বা প্রতারণার মন্দ পরিণাম ঘোষণা করে আল্লাহ তা‘য়ালা কুরআনে পাকে এরশাদ করেন, ‘মন্দ পরিণাম তাদের জন্য, যারা মাপে কম দেয়’। যারা লোকদের কাছ থেকে মেপে নেয়ার সময় ঠিকই পুরোমাত্রায় গ্রহণ করে কিন্তু যখন তার বিনিময় প্রদান করতে মাপে বা ওজন করে তখন কম দেয়। (সুরা মুতাফফিফিন : আয়াত ১-৩)
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, ‘একবার প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) কোনো এক খাদ্যবস্তুর স্তুপের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন; তখন তিনি খাদ্যবস্তুর স্তুপে হাত ঢুকিয়ে দেখলেন যে, এর ভেতর সিক্ত। তখন তিনি বললেন, ‘হে খাদ্যের মালিক! এটি কি? জবাবে খাদ্যের মালিক বলল, হে আল্লাহর রাসুল! বৃষ্টির কারণে এরূপ হয়েছে। এ কথা শুনে প্রিয় নবী (সা.) বললেন- ‘তুমি ভেজা খাদ্যশস্য ওপরে রাখলে না কেনো? তাহলে তো ক্রেতাগণ এর অবস্থা দেখতে পেতো (প্রতারিত হতো না)। যে ধোঁকা দেয় সে আমার উম্মতের মধ্যে গণ্য হবে না।’ (মুসলিম,মিশকাত)। লেনদেন ও বেচাকেনা ইত্যাদির ক্ষেত্রে প্রতারণা করা, পণ্যদ্রব্যের পরিচয় দান কিংবা বর্ণনার ক্ষেত্রে ভুল প্রচারণা করা ইসলামে নিষিদ্ধ।

ইসলামের দৃষ্টিকোণে ঠকবাজি, প্রতারণা ও ওজনে কম দেওয়ার শাস্তির। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে প্রতারণা ও প্রতারক, উভয়ের ব্যাপারে কঠোর নিন্দা জ্ঞাপন করেছেন এবং তাদের জন্য অবধারিত ধ্বংসের ঘোষণা দিয়েছেন। এ সংক্রান্ত স্পষ্ট বর্ণনা পাওয়া যায় পবিত্র কালামের এই আয়াতে অর্থাৎ “ধ্বংস তাদের জন্য, যারা মাপে কম দেয়। যারা মানুষের থেকে মেপে নেয়ার কালে পূর্ণ মাত্রায় গ্রহণ করে। আর যখন তাদের জন্য মাপে বা ওজন করে, তখন কম দেয়।” এ এক কঠিন ঘোষণা, যারা ঠগবাজি করে, মাপে ও ওজনে মানুষকে কম দেয় তাদের জন্য। সুতরাং যারা পুরোটাই চুরি করে, আত্মসাৎ করে, এবং মানুষকে তাদের প্রাপ্য বস্তুতে ঠকায়, তাদের কী কঠিন অবস্থা হবে তা সহজেই অনুমান করা যায়। মাপে ও ওজনে কমপ্রদানকারীর তুলনায় এরা আল্লাহ তাআলার শাস্তির অধিক ভাগিদার, এতে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই।

আল্লাহর নবী শুয়াইব (আ.) তার সম্প্রদায়ের মানুষকে তার প্রাপ্য বস্তুতে ঠকানো এবং মাপে ও ওজনে কম প্রদানে সতর্ক করেছেন, যেমন আল্লাহ তাআলা তার সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে বর্ণনা করেছেন। এমনিভাবে আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতারণা থেকে সতর্ক করেছেন এবং প্রতারকের ব্যাপারে কঠোর হুশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন।

সুতরাং রাসূলের উক্তি ‘আমাদের দলভুক্ত নয়’ প্রতারণার বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসেবে যথেষ্ট। প্রতারণা, প্রতারণার নোংরা এলাকায় পা বাড়ানো, তার ভয়াবহ ঘেরাটোপে আটকে পড়া থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্য এ উক্তিই আমাদেরকে সরল পথ দেখাবে। মানুষ যাতে স্বত:স্ফূর্তভাবেই প্রতারণা ও এ সংক্রান্ত যাবতীয় ক্ষেত্রে নিজেকে বাঁচিয়ে চলে এবং এ ব্যাপারে মানুষের পরিবর্তে আল্লাহকেই পর্যবেক্ষক হিসেবে গ্রহণ করে, তাই মানুষের সামনে আল্লাহ তাআলা কর্তৃক এই সতর্কবানী উপস্থাপন করা আমাদের একান্ত কর্তব্য ও দায়িত্ব।
প্রখ্যাত হাদীস বিশারদ মুনাভী বলেন : প্রতারণা হচ্ছে ভালোর সাথে মন্দের মিশ্রণ ঘটানো। অপর এক হাদীস ব্যাখ্যাকার ইবনে হাজর আল-হায়সামী বলেন : নিষিদ্ধ প্রতারণা হচ্ছে ক্রেতা ও বিক্রেতার ন্যায় পণ্যের কোনো মালিক তার পন্যের এমন দোষ সম্পর্কে অবগতি লাভ করা যে, যদি তার গ্রাহক এ সম্পর্কে অবগত হয় তবে সে তা গ্রহণ করতে কোনোভাবেই সম্মত হবে না। কাফাভী বলেন : প্রতারণা হচ্ছে অন্তরের কালোত্ব, মুখমন্ডলের মলিনতা। এ কারণেই হিংসা ও বিদ্বেষকেও ‘প্রতারণা’ শব্দে বর্ণনা করা হয়।
কবি যথার্থই বলেছেন : আত্মার ভিতর থেকেই যদি কোন প্রতিরোধের উপায় না জেগে উঠে, তবে ব্যক্তি কখনোই বক্র পথ থেকে ফিরে আসে না।

আমাদের বর্তমান সামাজিক অবস্থা, মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং সর্বোপরি বস্তুগত ও আধ্যাত্মিক লেনদেন বিবেচনা করলে এ বিষয়টি অত্যন্ত পরিস্কার হয়ে যায় যে, আমরা নানাভাবে প্রতারণা দ্বারা আক্রান্ত হয়ে আছি। এর ভয়াল ছোবল আমাদেরকে ধীরে ধীরে ঘিরে ফেলছে। আমরা কোনভাবেই এর আক্রমণ থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করতে সক্ষম হচ্ছি না।

প্রতারণা বিভিন্নভাবে এ সমাজে এখন হাজির হচ্ছে, কখনো স্বয়ং পণ্যে প্রতারণা করা হচ্ছে, কখনো তার শাখা-প্রশাখায় কিংবা সংখ্যায়। আবার কখনো তার ওজনে, তার মৌলিক গুণাগুণে, অথবা তার উৎস গোপন করে তাতে প্রতারণার আশ্রয় নেয়া হচ্ছে। তাছাড়া বিবাহ সামাজিক মেল-বন্ধনের পবিত্র একটি অঙ্গ, বিবাহ-শাদিতেও আজকাল প্রতারণার আশ্রয় নেয়া হচ্ছে। এ প্রতারণাগুলোর ধরন ও প্রক্রিয়া মানুষের খুবই নিম্নরুচির প্রকাশ ঘটায়। অহরহ আমরা যে ঘটনার মুখোমুখি হচ্ছি, তা হচ্ছে, এক বোনকে দেখিয়ে ভিন্ন বোনকে বিয়ে দিয়ে দেয়া হচ্ছে। ছেলে কিংবা মেয়ের দোষ-ক্রটি গোপন করে বিয়ে দিয়ে দেয়া হচ্ছে। একে মোটেই পাপ মনে করা হচ্ছে না। পাত্রীকে দেখতে চাওয়া হলে পরিবারের পক্ষ থেকে তাকে এমনভাবে প্রদর্শন করা হচ্ছে, যা মোটেই কাম্য নয়। সাজসজ্জার বাহুল্য করে তার আসল রূপকে ঢেকে রাখা হচ্ছে। ফলে বর প্রতারিত হচ্ছে। এগুলো সমাজের অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে, অথচ মানুষ এর পাপের দিকটির কথা ভুলে যাচ্ছে বেমালুম। সমাজিক প্রতারণার যে কয়টি বাহ্যিক রূপ সচরাচর আমরা দেখতে পাই তার মধ্যে মুসলমানদের কেনা-বেচায়, তাদের বাজার ব্যবস্থায় প্রতারণা কি প্রকট রূপ ধারণ করেছে, ধীরে ধীরে তা কতোটা ভয়াবহ অবস্থায় উপনীত হচ্ছে, তা বলাই বাহুল্য। প্রতারণার এক ভয়াবহ অবস্থার মাঝে আমরা বসবাস করছি। প্রতারণা দোষ ঢেকে রাখার সমতুল্য গণ্য করা হচ্ছে।
মা’কাল বিন আল-মুযানী (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি মৃত্যু শয্যায় বর্ণনা করেন, আমি নবী করিম সা.) বলতে শুনেছি, তিনি বলছেন এমন কোনো বান্দা নেই, যাকে আল্লাহ অধীনস্থদেরকে দায়িত্ব দিয়েছেন এবং সে মৃত্যু বরণ করেছে অধীনস্থদের ব্যাপারে প্রতারক অবস্থায়, আল্লাহ অবশ্যই তার উপরে জান্নাত হারাম করে দিবেন।

সুতরাং এ হচ্ছে এক কঠিন ঘোষণা, এই ঘোষণার আওতাধীন প্রত্যেক ঐ ব্যক্তি, যাকে আল্লাহ অধীনস্থদের দায়িত্ব প্রদান করেছেন। হোক সে ছোট কিংবা বড়। পরিবারের সদস্য থেকে রাষ্ট্রপতি, সকলে এর আওতায় পড়বে। অতএব, প্রত্যেকের কর্তব্য হচ্ছে তার অধীনস্থদের প্রতি কল্যাণ কামনা করা, তাদের প্রতি সৎ থাকা, তাদেরকে কল্যাণের পথে উপদেশ-নসীহত প্রদান করা এবং প্রতারণার আশ্রয় না নেয়া।

সুতরাং যে চাকুরীজীবী, তার জন্য আবশ্যক হচ্ছে চাকুরী ক্ষেত্রে সততা প্রদর্শন করা। শরীয়ত মোতাবেক কোনো প্রকার প্রতারণা ও ধোঁকা ব্যতীত বৈধ উপায়ে তার দায়িত্ব পালন করে যাওয়া। সে মানুষের জন্য কাজ করবে ও তাদের উপকার সাধনে কোনো প্রকার কার্পণ্য করবে না। সে যেনো সর্বদা এই ধারণা মনে বদ্ধমূল রাখে যে, তাকে একদিন অবশ্যই আল্লাহর দরবারে হাজির হতে হবে, তার দায়-দায়িত্ব আল্লাহ বুঝে নিবেন। আল্লাহ তাকে এ দায়িত্ব দিয়েছেন মুসলমানদের কল্যাণ ধারা চির বহমান রাখার উদ্দেশ্যে। প্রতারণার জন্য নয়।
এক মুমিন তার অপর মুমিন ভাইয়ের জন্য আয়না স্বরূপ, যখন তার মাঝে কোনো প্রকার ত্রুটির সন্ধান পাবে, তাকে দূর করবে, শুদ্ধ করে তুলবে তাকে। কল্যাণ কামনা সম্পন্ন হবে মুমিনদের থেকে কষ্ট দূর করা, দীনের ক্ষেত্রে যে ব্যাপারে তারা অজ্ঞ- যা তাদের জানা নেই, তা জানিয়ে দেয়া এবং কথা ও কাজের মাধ্যমে তাদেরকে সহযোগিতা করার মাধ্যমে। তারা কল্যাণ সাধন করবে একে অপরের গোপন বিষয়গুলো গোপন রাখার মাধ্যমে, পারস্পরিক ক্ষতি কাটিয়ে, একজন অপরজনের উপকার সাধন করে। তারা একে অপরকে সৎকাজের আদেশ দিবে, অসৎকাজে বাধা প্রদান করবে। নমনীয়তা, ইখলাস, দয়ার্দ্র আচরণ, বড়কে সম্মান ও ছোটর প্রতি স্নেহশীলতা, উত্তম উপদেশের মাধ্যমে পস্পরে কল্যাণ সাধন, ইত্যাদি হবে তাদের চলার ঐকান্তিক পাথেয়। তারা নিজেদের জন্য যা ভালোবাসে, অপরের জন্যও সে কল্যাণ কামনা করবে। নিজেদের জন্য যা অপছন্দ করে, অপরের জন্য সে অকল্যাণ অপছন্দ করবে। অপরের জন্য কল্যাণ কামনায় প্রতারণার প্রক্রিয়া হচ্ছে, অপরের জন্য কিছু করতে গিয়ে ইখলাস ও বিশুদ্ধ উদ্দেশ্য রাখা হয় না। তাতে দীনী ও দুনিয়াবী বস্তুগত উদ্দেশ্য হাসিলের পায়তারা করা হয়। মুমিনদের মাঝে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্বের অবশ্যম্ভাবী দাবী হচ্ছে মুমিন তার অপর মুমিন ভাইয়ের জন্য কিছু করতে গিয়ে নিজেকে পুরোপুরি উজাড় করে দিবে এবং তাতে পুরোপুরি বিশুদ্ধ নিয়ত রাখবে। কারণ, মুমিনদের আকাঙ্খা হচ্ছে কল্যাণের আকাঙ্খা, আর মুনাফিকদের প্রবণতা হচ্ছে প্রতারণার প্রবণতা।

এমনিভাবে, যে পিতা, তার দায়িত্ব ও কর্তব্য হচ্ছে সে তার সন্তান-সন্ততিকে কল্যাণের পথে ধাবিত করার ক্ষেত্রে সর্বদা প্রচেষ্টা চালাবে, তাদের শিক্ষা-দীক্ষা ও তরবিয়তে কোনো প্রকার ক্রুটি ও গাফলতি করবে না। বরং সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাবে, যাতে সে নিজেকে ও সন্তানদেরকে জাহান্নামের সেই আগুন হতে রক্ষা করতে পারে, যার জ্বালানী হবে মানুষ ও পাথর, যার পাহারায় থাকবে কঠিন কঠোর ফেরেশতাগণ। হাদীস বিশারদগণ বলেছেন, যে কোন কাজে-কর্মে প্রতারণা রাসূলের এ উক্তির আওতাভুক্ত। পরীক্ষায় প্রতারণার বিষয়টিও এর অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং যে কোনো বিষয়েই ছাত্র-ছাত্রীরা প্রতারণা করতে পারবে না, এটি সম্পূর্ণরুপে হারাম বলে গণ্য হবে। এ হাদীসটি এবং সমর্থভুক্ত অন্যান্য হাদীস এ ব্যাপারে উত্তম দলীল।’প্রতারণা ও ঠকবাজির কিছু প্রকাশ ক্ষেত্র ও বাহ্যিক রূপ। বলা যায়, প্রতারণা ও জালিয়াতির নানাবিধ প্রকাশের ও বাহ্যিক রূপের কিয়দংশ। আমরা একে বিশেষভাবে উল্লেখ করা যুুক্তিযুক্ত মনে করেছি, যাতে মানুষ সতর্ক হয় এবং আসন্ন বিপদ হতে নিজেকে মুক্ত রাখতে সক্ষম হয়।

যে কোনো প্রকার প্রতারণায় যে ব্যক্তি লিপ্ত হয়েছে, তার প্রতি আমাদের করুণ আবেদন হলো : তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, যাবতীয় গোপন বিষয়ের অধিকারী সর্ববিষয়ে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষক আল্লাহর ব্যাপারে সতর্ক হও, সাবধান হও। তার শাস্তি ও আযাবের কথা স্মরণ করো এবং জেনে রাখো, দুনিয়া খুবই ক্ষণস্থায়ী, ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয়েও পরকালে হিসাব নেয়া হবে। ভালো বা মন্দ যতো ক্ষুদ্রই হোক, পরিণতিতে তা প্রভাব রাখবে। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন ‘যারা তাদের পশ্চাতে দুর্বল সন্তান-সন্ততি ছেড়ে গেছে, যাদের ওপর তারা ভীত, তারা যেনো ভয় করে। অতএব, তারা যেনো আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করে এবং তারা যেনো সোজা কথা বলে। যে এই আয়াতে গভীরভাবে চিন্তা করবে সে অবশ্যই তার সন্তানদের ব্যাপারে ভীত হবে এবং মন্দ কর্ম হতে বিরত থাকবে।
সুতরাং মানুষের উচিত, ধোঁকা বা প্রতারণা থেকে বিরত থাকা। কেননা ধোঁকা বা প্রতারণার দ্বারা মানুষ বিশ্বনবি হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর জামাআত থেকে বের হয়ে যায়।

তাই প্রত্যেক মুমিনের প্রতিজ্ঞা হওয়া দরকার- আমরা যে সমাজে বাস করি সেখানে সর্বত্রই ভেজালের ছড়াছড়ি। ধোঁকা প্রতারণার জাল বিস্তার করছে সর্বত্র। কে কাকে ঠকাবে সে চিন্তায় অস্থির প্রায়। এ কথাগুলো অস্বীকার করার মতো নয়। কেউ অবিশ্বাস করতে পারবে না এ বাস্তব সত্য। অথচ মুসলমানদের আদর্শ এটা নয়, আমাদের নবীজীর আদর্শ নয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মুমিন কখনো এক গর্তে দু’বার পা দেয় না।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘মুমিন কাউকে ধোঁকা দেয় না ধোঁকা খায় না।’ ধোঁকা মুসলমানদের আদর্শ নয়।চলমান সমাজকে যদি শান্তিময় ও সুখময় করতে হয়, যদি শান্তির অনাবিল নীড় গড়তে হয়, তাহলে অবশ্যই আমাদের ধোঁকা প্রতারণা ও ভেজাল ছাড়তে হবে। তাহলেই সমাজ স্বচ্ছ, সুন্দর ও কল্যাণময় হয়ে ওঠবে।

ধোঁকাবাজ বা প্রতারক ব্যক্তি ক্রমেই আল্লাহ ও মানুষ থেকে দূরে সরে যায়। ধোঁকা বা প্রতারণায় রয়েছে নানাবিধ ক্ষতি, তন্মধ্যে অন্যতম হচ্ছে প্রতারণা মানুষকে জাহান্নামের পথে ঠেলে দেয়, নিক্ষেপ করে তার ভয়াবহ ও স্থায়ী আগুনে। তাছাড়া প্রতারণা ব্যক্তির আত্মিক নীচুতা ও মানসিক কলঙ্কের পরিচায়ক। সুতরাং চরম নীচু মানসিকতার অধিকারীই কেবল তা করে থাকে, এবং স্থায়ী ধ্বংসে পতিত হয়। প্রতারক ক্রমে আল্লাহ ও মানুষ থেকে দূরে সরে যায়। প্রতারণা দু’আ কবুলের পথ বন্ধ করে দেয়। তা সম্পদ ও বয়সের বরকত ধ্বংস করে দেয়। ঈমানের দুর্বলতা ও কমতির পরিচায়ক। অব্যাহত প্রতারণা ও জালিয়াতী প্রবণতার ফলে প্রতারক গোষ্ঠীর ওপর যালিম ও কাফিরদেরকে চাপিয়ে দেয়া হয়। যে ব্যক্তি ধোঁকা বা প্রতারণায় নিয়োজিত হয়; সে নবী করিম (সা.) এর উম্মত হিসেবে স্বীকৃতি পাবে না। ধোঁকা বা প্রতারণা মানুষের ঈমানের দুর্বলতা ও কমতির পরিচায়ক। ধোঁকা বা প্রতারণা মানুষের দোয়া কবুলের পথ বন্ধ করে দেয়। প্রতারণায় সম্পদ ও বয়সের বরকত অর্জিত হয় না। ব্যক্তির আত্মিক নীচুতা ও মানসিক কলংকের পরিচায়ক। ধোঁকাবাজী ও প্রতারণা যেহেতু ইসলামে হারাম তাই এ থেকে বিরত থাকা প্রত্যেক মুসলমানের একান্ত আবশ্যকীয় কাজ। আল্লাহ তা’আলা মুসলিম উম্মাহকে ধোঁকা বা প্রতারণা থেকে হেফাজত থাকার পাশাপাশি দুনিয়া ও পরকালের কল্যাণে সঠিক পথে নিজেকে পরিচালিত করে কোরআন ও সুন্নাহ মোতাবেক ধোঁকা ও প্রতারণামুক্ত জীবন-যাপন করে জীবনের ভয়াবহ ক্ষতি থেকে বেঁচে থাকার এবং সঠিক পথে চলে আলোকিত জীবন যাপন করার তাওফিক দান করুন।

লেখকঃ গবেষক,সাবেক জাতীয় ক্রীড়াবিদ,
চেয়ারম্যান গ্রীণ ক্লাব, মানিকগঞ্জ,সাংবাদিক ও কলামিস্ট