নাব্যতা হারিয়ে বিলীনের পথে খরস্রোতা লাউরানজানি নদী

 

মো.আলতাফ হোসেনঃ
নদীর সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক চিরকালের। জীবন-জীবিকা ও সভ্যতার অগ্রগতিও ঘটেছে নদীর তীরে। নদী যেমন ভূগঠনের মুখ্য ভূমিকা পালন করছে তেমনি,মানব সভ্যতার ক্রম-বিকাশেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে বিকশিত নদীমাতৃক এই বাংলাদেশের অনেক নদী-তীরে গড়ে উঠেছে বন্দর, নগরী হাট বাজার ইত্যাদি। ভূমিগঠন, জনবসতি স্থাপন,শস্য উৎপাদন,জলপথে যোগাযোগ,ব্যবসা-বাণিজ্যসহ আর্থ-সামাজিক কর্মকান্ডে এবং নিজস্ব সংস্কৃতি বিকাশে নদ-নদীর গুরুত্ব অপরিসীম।
লাউরানজানি নদী বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সুনামগঞ্জ জেলার একটি নদী। নদীটির দৈর্ঘ্য ২৩ কিলোমিটার, গড় প্রস্থ ৭৯ মিটার এবং নদীটির প্রকৃতি সর্পিলাকার। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড বা “পাউবো” কর্তৃক লাউরানজানি নদীর প্রদত্ত পরিচিতি নম্বর উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নদী নং ৭৫।

১৭৮৩ সালে জেমস রেনেল অংকিত বাংলাদেশের মানচিত্র যে,নদী-নালাগুলোর বিবরণ রয়েছে বর্তমানে সেগুলি চিহ্নিত করা কষ্টসাধ্য। নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে এবং পরিত্যক্ত গতিপথ ভরাট হয়ে পুরানো নদীপথের চিহৃ মুছে গেছে। আবার একই নদীর গতিপ্রবাহ ভিন্ন ভিন্ন স্থানে ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত।
সুনামগঞ্জ জেলা বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সিলেট বিভাগের একটি প্রশাসনিক অঞ্চল। সিলেট বিভাগ বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত একটি প্রশাসনিক অঞ্চল, যা সিলেট, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জ এই চারটি জেলা নিয়ে গঠিত। উপজেলার সংখ্যানুসারে সুনামগঞ্জ বাংলাদেশের একটি “এ” শ্রেণীভুক্ত জেলা। কিংবদন্তি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি থেকে অনুমান করা হয় যে, সুনামগঞ্জ জেলার সমগ্র অঞ্চল প্রাচীন কামরূপ বা প্রাগজ্যোতিষপুর রাজ্যের অন্তর্গত ছিল। জনৈক মোঘল সিপাহি সুনামুদ্দির নামে সুনামগঞ্জের নামকরণ করা হয়। ১৮৭৭ খ্রিষ্টাব্দে সুনামগঞ্জকে মহকুমায় এবং ১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দে জেলায় উন্নীত করা হয়।

সুনামগঞ্জ জেলায় রয়েছে জালের মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বহুসংখ্যক নদ-নদী। কোনো কোনো নদী বিলীনের পথে। সুনামগঞ্জ জেলার সঙ্গে নদীর নাব্যতা সংকটের ফলে ব্যবসা বাণিজ্য হুমকির মুখে পড়েছে। প্রতি বছর কোটি কোটি ঘনফুট বালি ও নুড়ি, বেল্ডার ও ভাঙ্গা পাথরসহ বিভিন্ন মালামাল দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো ও আমদানী করা হয়। কিন্তু নদীগুলোর নাব্যতা সংকটের কারনে অক্টোবর মাস থেকেই ব্যবসা বানিজ্যে ভাটা পরে। এই নদীকে কেন্দ্র করে প্রত্যক্ষ ভাবে ৬০হাজারের বেশি শ্রমিক জড়িত রয়েছে। নদীর নাব্যতা সংকটের কারণে বিভিন্ন পয়েন্টে চাঁদাবাজি করছে সংঘবদ্ধ চক্র ও যেখানে ৩০মিনিটের পথ পাড়ি দিতে হয় সেখানে ১৪-১৫দিন সময় লেগে যায়। সুরমা, রক্তি, যাদুকাটা, পাটলাই ও বৌলাই নদী শুকিয়ে যাওয়া অংশ খনন না করায় ব্যবসায়ীদের মাঝে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। আর বিপন্ন হতে চলেছে নদী পাড়ের লোক জনের জীবন ও জীবিকা। জেলার ১১টি উপজেলার মধ্যে কয়েকটি উপজেলা ছাড়া বাকি সবক’টি উপজেলার সাথে অভ্যন্তরীণ কিংবা বাইরের জেলা ও উপজেলার সাথে মালামাল পরিবহনে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ নেই, বর্ষায় ও হেমন্তে নৌ-পথ ই ভরসা। হেমন্ত কালে প্রয়োজনের তাগিদে লোকজন পাঁয়ে হেঁটে কিংবা মটর সাইকেলে চলাচল করলেও মালামাল পরিবহনের একমাত্র মাধ্যম নদী পথ কিন্তু বর্তমানে জেলার কয়েকটি নদীর নাব্যতা হারানোর ফলে এর বিরুপ প্রভাব পড়েছে জেলা বাসীর জীবন যাত্রায়। জেলার অন্যান্য নদীর মতো হারিয়ে যাচ্ছে খরস্রোতা লাউরানজানি নদীটি।

আমাদের দেশের প্রধান নদীসমূহ পদ্মা, মেঘনা, যমুনা,ব্রহ্মপুত্র,কর্ণফুলি,শীতলক্ষা,গোমতি। দেশের ছোট-বড় ৮০০শ নদীর মধ্যে ৪৫০টি নদীর অববাহিকা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে । তার মধ্যে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদী(১০২টি),উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের নদী(১১৫টি),উত্তর-পূর্বাঞ্চলে(৮৭টি),উত্তর কেন্দ্রীয় অঞ্চলের নদী ১৬টি),এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের নদী(২৪টি)।
বাংলাদেশকে নদীমাতৃক দেশ বলা হয়। কারণ দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা নদীগুলো দেশের অর্থনীতি এবং জনজীবনকে সতেজ ও সচল রাখতে পালন করছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে নদীকে বাদ দিয়ে কল্পনা করা যায় না কৃষির কথা, কল্পনা করা যায় না মৎস্যপুষ্টির কথা। পরিবেশ এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষাসহ নানা ক্ষেত্রেও নদ-নদীর রয়েছে অতুলনীয় ভূমিকা। কিন্তু অযত্ন-অবহেলা এবং দখল-দূষণে আজ বিপন্ন হয়ে পড়েছে এসব নদ-নদী। বিপন্নের দিকে ধাবিত হতে চলছে একসময়ের খরস্রোতা লাউরানজানি নদীটি।
সুনামগঞ্জ জেলায় অনেক নদ-নদী রয়েছে। এ জেলার অনন্য প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য ও ভৌগলিক অবস্থান সমগ্র বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চল হতে এ জেলাকে দিয়েছে এক স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। জেলার বেশির ভাগ অঞ্চলই হাওর, বাওর, ও অপেক্ষাকৃত নীচু অঞ্চল নিয়ে গঠিত এবং বৎসরের প্রায় ৭/৮ মাস জলমগ্ন থাকে। বর্ষার সময় এখানে সমুদ্রের মত ঢেউ খেলে এবং গ্রামগুলোকে মনে হয় এক একটি ছোট ছোট দ্বীপ। অনেক ছোট ছোট নদী ভারতের পাহাড়ি অঞ্চলে উৎপন্ন হয়ে জেলার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে সুরমা- কুশিয়ারায় পতিত হয়েছে। এ জেলার নদ-নদীর মধ্যে-সুরমা, কুশিয়ারা,কালনী ,চলতি ,যাদুকাটা ,রক্তি ,মরাচেলা,খাসিয়ামারা, বৌলাই, পাটলাই ,দাড়াইন,কংসসহ অন্যান্য নদ-নদী। ভরাট হওয়া নদী এখন সুনামগঞ্জের হাওরবাসীর গলার কাঁটা। হাওরবাসীকে নিরাপদ করতে এসব নদী খননের বিকল্প নেই। পাহাড়ী ঢলে নেমে আসা পলিমাটি এবং নদীর বুকে অপরিকল্পিতভাবে নদী শাসনের কারণে খরস্রোতা নদী যৌবন হারিয়ে বিপন্ন করেছে। জেলার অন্যান্য নদীর মতো ভালো অবস্থায় নেই খরস্রোতা লাউরানজানি নদীটি।

পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, কৃষি, জীবনযাপন সব কিছুর সঙ্গে পানির সম্পর্ক। একসময় যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম ছিল নদীপথ। দেশের বিস্তীর্ণ সেই নদীপথও আজ সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল এ দেশের অনেক বাণিজ্যিক এলাকা। সেগুলোও তাদের অস্তিত্ব হারাচ্ছে। আমাদের অনেক নদী এমনিতেই মৃতপ্রায়। গ্রীষ্মে পানি মেলে না। বর্ষাকালে সামান্য বৃষ্টিতেই দুই কূল ছাপিয়ে যায়। মৃত নদীর তালিকায় চলে যাচ্ছে একসময়ের খরস্রোতা লাউরানজানি নদীটি। নদীমাতৃক বাংলাদেশের প্রকৃতি, জনজীবন, চাষাবাদ প্রায় সবই নদীনির্ভর। নদী না বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে না। অর্থাৎ বাংলাদেশের জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে। অথচ বাংলাদেশ সে পথেই এগিয়ে চলেছে। বহু নদী এর মধ্যেই মরে গেছে। বহু নদী মৃত্যুর পথে। নদীগুলোর গভীরতা কমে যাওয়ায় তখন বন্যা ও জলাবদ্ধতা অবধারিত হয়ে পড়ে। হাজার হাজার কোটি টাকার ফসল নষ্ট হয়।
নদী এখন ভয়ানকভাবে বিপন্ন। সংখ্যা, আয়তন ও গুণমান সব দিক থেকেই। তাই অবশ্যম্ভাবীরূপে নদীর প্রাণবৈচিত্র্যও এখন ভীষণভাবে সংকটাপন্ন। একসময় যেসব নদী ছিলো প্রাণবৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ, আজ সেসব নদী পরিণত হয়েছে প্রায় প্রাণশূন্য সংকীর্ণ স্রোতধারায় কিংবা বিষাক্ত নর্দমায়। একসময়ের বিস্মৃত অতল জলরাশি ভরা নদী এখন দেখা যায় অবিস্তীর্ণ অগভীর বালিয়াড়ি ভরা এক শীর্ণকা হিসেবে। আবার কোনো কোনো জায়গায় নদী সম্পূর্ণভাবে মুছে গিয়ে তৈরি হয়েছে ফসলের ক্ষেত কিংবা স্থাপনা। ফলে নদীর প্রাণবৈচিত্র্যর সেই ঐশ্বর্যময় জৌলুস আর আগের মতো নেই। জলজ অনেক প্রাণ প্রজাতি বাংলাদেশ থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। আর বহু প্রজাতি নিশ্চিহ্ন হওয়ার প্রহরও গুনছে। বাংলাদেশের মানচিত্রের দিকে তাকালে জালিকার মতো নদীগুলো আমাদের আশ্বস্ত করে, দেশটি এখনো নদীমাতৃক। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলে। দেশের বেশিরভাগ ছোট নদী হয় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে কিংবা মৃতপ্রায়। বড় নদীগুলোও বছরের অনেক সময় নাব্য সংকটে ভোগে। দেশের অন্যতম প্রধান নদীর বেহাল দশায় অববাহিকার বিপুল জনগণ শঙ্কাগ্রস্ত। তাছাড়া একসময়ের স্রোতস্বিনী নদীগুলো নাব্য হারাচ্ছে। ভরাট হয়ে যাওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে এ নদীর পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। পানিপ্রবাহ না থাকায় বছরের ৬ থেকে ৭ মাস নদী থাকে জলাধারহীন। এসব নদ-নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে এনে দেশকে সোনালী পর্যায়ে আনার জন্য সকলের দৃষ্টি জরুরী। শুধু নদী ড্রেজিং করলেই সমস্যা সমাধান হবে না, দেশের খাল বিলগুলো খননের কাজটিও জরুরি। কারণ দেশে পানি আসে, পানি যায়- এই গতানুগতিক ধারার পরিবর্তন দরকার। দেশের স্বার্থে খাল-বিল, নদী-নালার সার্ফেস ওয়াটারকে পরিকল্পিত ব্যবহারে উদ্যোগ নেয়া দরকার। তৈরি করতে হবে প্রয়োজন অনুযায়ী সøুইসগেইট, রাবার ড্যাম। আরো যে কাজটি করা প্রয়োজন তা হলো নদীর বাঁক কেটে সোজা করা। এতে পানির প্রবাহে বাধা হ্রাস পাবে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমবে, নদীতে পানি থাকবে। তবেই দেশে মৎস্যসম্পদ বাড়বে। মানুষের দুঃখ দুর্দশা, জীব-জন্তুর মহামারীর প্রকোপ কমবে। যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নতি হবে, বেকারত্ব হ্রাস পাবে, দেশে ফসল উৎপাদন বাড়বে। ইরিগেশনের জন্য পানি প্রাপ্তি সহজ হবে। বন্যার আক্রমণ থেকে রক্ষা পাবে, দেশ অর্থনৈতিকভাবে সুদৃঢ় হবে। প্রধানমন্ত্রী বছরব্যাপী নদী খননের নির্দেশনা দিয়েছেন। তাঁর এই নির্দেশনাকে গুরুত্ব দিয়ে প্রকল্প নিতে হবে। নদী বাঁচাতে হবে। নদী বাঁচলেই বাংলাদেশ বাঁচবে।

নদীমাতৃক এই বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা নদী-নালার ওপর নির্ভরশীল। অতএব, নদীর অস্তিত্ব বিপন্ন হলে এর সাথে সংশ্লিষ্ট সকল পেশার মানুষ বেকার হয়ে পড়বে। নদ-নদী এখনো প্রবাহমান রয়েছে সেসব নদ-নদী রক্ষার উদ্যোগ কর্তৃপক্ষকে আশু নিতে হবে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় নদ-নদীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। যদি নদীগুলো এভাবে তাদের অস্তিত্ব হারাতে থাকে তাহলে অচিরেই পরিবেশের ভারসাম্য মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হবে। যা আমাদের চিরায়ত জলবায়ুর বিরুদ্ধে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে। আর এ সব কারণেই দেশের নদী দখলকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে থেকে দখলমুক্ত করতে হবে। নদী পথকে আরও আধুনিকায়ন ও সড়কপথের তুলনায় গুরুত্ব দিতে পারলে যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও সহজ হতো। আমাদের জনজীবনে নদীর গুরুত্ব অনুধাবন করতে হবে। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি পর্যায়েও নদী রক্ষার জন্য সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। দেশের মধ্যে প্রবহমান অন্যান্য নদ-নদীর মতো দেশের লাউরানজানি নদীকে বাঁচানোই এখন সময়ের দাবি।ছবি-প্রতিকী

লেখকঃ সাবেক জাতীয় ক্রীড়াবিদ(কারাতে ব্লাক বেল্ট ১ম ড্যান),সভাপতি শারীরিক শিক্ষাবিদ সমিতি,চেয়ারম্যান গ্রিন ক্লাব, গবেষক,শিক্ষক,সাংবাদিক ও কলামিস্ট