নাব্য হারিয়ে দখল-দূষণে খরস্রোতা গোয়াইল্যা নদী

 

মো.আলতাফ হোসেন ঃঃ
গোয়াইল্যা নদী বা বেলতলি নদী বা গোল্লার খাল বাংলাদেশের উত্তর-কেন্দ্রীয় অঞ্চলের টাঙ্গাইল ও গাজীপুর জেলার একটি নদী। নদীটির দৈর্ঘ্য ২৪ কিলোমিটার, গড় প্রস্থ ৩৪ মিটার এবং নদীটির প্রকৃতি সর্পিলাকার। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড বা “পাউবো” কর্তৃক গোয়াইল্যা নদীর প্রদত্ত পরিচিতি নম্বর উত্তর-কেন্দ্রীয় অঞ্চলের নদী নং ১৪।
টাঙ্গাইল জেলা বাংলাদেশের মধ্যাঞ্চলে অবস্থিত যা ঢাকা বিভাগের একটি প্রশাসনিক অঞ্চল। উপজেলার সংখ্যানুসারে টাঙ্গাইল বাংলাদেশের একটি “এ” শ্রেণীভুক্ত জেলা। এর জনসংখ্যা প্রায় ৩৮ লক্ষ এবং আয়তন ৩৪১৪.৩৫ বর্গ কিলোমিটার। টাঙ্গাইল অয়তনের ভিত্তিতে ঢাকা বিভাগের সর্ববৃহৎ এবং জনসংখ্যার ভিত্তিতে ২য় সর্ববৃহৎ জেলা।
বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্তর্গত একটি নদীমাতৃক দেশ। বিপুল জলরাশি নিয়ে প্রায় ৮০০ নদ-নদী ২৪,১৪০ কিলোমিটার জায়গা দখল করে দেশের মধ্য দিয়ে শাখা-প্রশাখাসহ প্রবাহিত হয়েছে। অন্যান্য জেলার মতো টাঙ্গাইল জেলায়ও রয়েছে বহুসংখ্যক নদ-নদী। জেলার সতত বিচরণশীল বিপুল জনগোষ্ঠির দৈনন্দিনতার জন্য প্রয়োজনীয় জল প্রকৃতিগতভাবে যোগান দিচ্ছে নদী-নালা। বছরের একটি নির্দিষ্ট মৌসুমে চলাচলের জন্য প্রয়োজন জলপথের। সকল কিছুর উর্ধ্বে কৃষিজ উৎপাদনের জন্য জলের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে নদ-নদীর ভূমিকা অনস্বীকার্য। কিন্তু দখল দূষণ আর খননের অভাবে মৃত নদীর তালিকায় চলে যাচ্ছে একসময়ের খরস্রোতা গোয়াইল্যা নদীটি।

নদী, খাল-বিল,গজারির বন টাঙ্গাইলের গর্বের ধন। কিন্তু সেই নদী-নালা, খাল-বিল এখন আর নেই। অনেক আগেই টাঙ্গাইল শহর দিয়ে বয়ে চলা নদীগুলো ভরাট আর দখলের কারণে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। শুকিয়ে মরতে বসেছে খরস্রোতা গোইয়াল্যা নদীটি। তাছাড়া যমুনা নদীর কয়েকটি শাখা নদী টাঙ্গাইল জেলাশহর ও উপজেলা শহরের ওপর দিয়ে বয়ে চলেছে। তার মধ্যে ধলেশ্বরী, ঝিনাই, বংশাই, বৈরাণ, এলানজানী ও শহরের ওপর দিয়ে বয়ে চলা লৌহজং নদী অন্যতম। এই নদীগুলোও আজ ভরাট আর দখল হয়ে সরু খালে পরিণত হয়েছে। একসময় এই নদ-নদী দিয়ে বড় বড় লঞ্চ-স্টিমার চলাচল করত। এখন শুষ্ক মৌসুমে অনেক জায়গায় নদীর তলদেশে ধান চাষ করা হচ্ছে। টাঙ্গাইলের পোড়াবাড়ীতে লঞ্চঘাট ছিল। লঞ্চঘাটকে ঘিরেই বাণিজ্যিক কেন্দ্র গড়ে উঠেছিলো। এখান থেকেই ধলেশ্বরী নদীর পানি আর খাঁটি দুধ দিয়ে টাঙ্গাইলের পোড়াবাড়ীর চমচম তৈরি হতো। সেই নদীর পানি আর নেই। কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে নদী। দখল আর দূষণের হাত থেকে রক্ষায় পায়নি খরস্রোতা গোয়াইল্যা নদী।
নদীমার্তৃক বাংলাদেশে অসংখ্য নদ-নদী ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে জালের মতো। বছরের কিছু সময় পানি থাকলেও বাকি সময়টা থাকে শুকনো মরা খালে। এমনি একটি নদী গোয়াইল্যা নদী। আবার দখল দখণের কারণে টাঙ্গাইল শহরের ওপর দিয়ে বয়ে চলা নদীর দুই পাশে গড়ে উঠেছে হাজার হাজার ঘর-বাড়ি। এভাবেই অস্তিত্ব বিলিনের পথে একসময়ের খরস্রোতা গোয়াইল্যা নদীটি।
ঢাকা বিভাগ বাংলাদেশ এর আটটি প্রশাসনিক বিভাগের অন্যতম। এটি বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় অঞ্চলে অবস্থিত। বর্তমানে ঢাকা ও বরিশাল বিভাগের সাথে সীমান্তবর্তী কোন জেলা নেই। আয়তনে ঢাকা বিভাগের বৃহত্তম জেলা টাঙ্গাইল জেলা। টাঙ্গাইল একটি ঐতিহ্যবাহী জনপদ। বহু অতীত ঐতিহ্য আর বাংলার চির পরিচিত লোক-সংস্কৃতি ইতিহাসে ক্রমধারার উত্তরাধিকারী। প্রাচীন ইতিহাস-ঐতিহ্যে আর লোক-সাহিত্য ও সংস্কৃতির ঐতিহ্যে টাঙ্গাইল জেলার অবস্থান অনেক উঁচুতে। টাঙ্গাইলের লোক-ঐতিহ্য নিয়েও প্রবাদ বচন রচিত হয়েছে। যেমন-‘চমচম, টমটম ও শাড়ি, এই তিনে টাঙ্গাইলের বাড়ি।’ প্রবাদ প্রবচনের ছড়াটিতে টাঙ্গাইলের তিনটি লোক ঐতিহ্যের কথা উঠে এসেছে। টাঙ্গাইলের তৈরি চমচম মিষ্টি আর তাঁতের শাড়ি পৃথিবী খ্যাত। টমটম গাড়িও একদা ছিল টাঙ্গাইলের লোক ঐতিহ্যের উল্লেখযোগ্য যানবাহন। হারিয়ে যেতে বসেছে এসব ঐতিহ্যসহ স্বপ্নের নদীনালা। বাংলাদেশের নদীব্যবস্থার ওপর প্রথম আঘাত আসে ইংরেজ আমলের ভুল নদী ব্যবস্থাপনায়।আমাদের জীবন, জীবিকা, সংস্কৃতি, শিল্প-সাহিত্য—সবকিছুর সঙ্গে আমাদের নদীগুলো সম্পর্কযুক্ত। হাজার বছর ধরেই এসব নদ-নদী আমাদের কৃষি, প্রকৃতি ও অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করেছে। নদী রক্ষা না করলে তাই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রক্ষা পাবে না।

বাংলাদেশে ছোট বড় মিলিয়ে বহু নদীর অস্তিত্ব এখন হুমকির সম্মুখিন। নাব্যতা সংকট এবং খননের অভাবে বহু নদী মুছে গেছে মানচিত্র থেকে। শিল্প বর্জ্যের দূষণ আর অবৈধ দখলের শিকার হয়ে মরা খালে পরিণত হয়েছে অনেক নদী। এমনি একটি নদী গোয়াইল্যা নদী।
বাংলার সৌন্দর্য তার প্রাকৃতিক পরিবেশের জন্য। আর এ পরিবেশের জন্য সবচেয়ে বড় উপাদান নদী। উপনদী-শাখানদী-খাল-বিলে ঘেরা এ দেশের জমির উবর্রতা শক্তির মূলেও রয়েছে নদী। নদী বাংলাদেশের প্রাণ। নদীকে উপেক্ষা করে বাংলাদেশের কোনো সৌন্দর্য কল্পনা করা যায় না। নদীর গুরুত্ব বলে শেষ করা যাবে না। নদীর গুরুত্ব অপরিসীম। এক সময় নদীকে কেন্দ্র করে সভ্যতা ও শহর গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশের প্রবাহিত প্রায় সব নদ-নদীই আন্তর্জাতিক সীমানা অতিক্রম করেছে। হিমালয় থেকে উৎপত্তি হয়ে ভারত-বাংলাদেশ সীমা অতিক্রম করে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে সর্বশেষ বঙ্গোপসাগরে মিশে গেছে। নদীকে নিয়ে রচিত হয়েছে গল্প, উপন্যাস, নাটক, গান। তৈরি হয়েছে কালজয়ী চলচিত্র। শিল্পকলায়ও প্রাধান্য পেয়েছে নদী। নদীতে পাল তোলা নৌকা, ভাটিয়ালি গান এসব এখন অতীতের স্মৃতি হতে চলেছে।
নদীমাতৃক দেশ বাংলাদেশ। এ দেশের ওপর দিয়ে বয়ে চলেছে শত শত নদী। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের আওতাধীন নদী ও শাখা নদীর সংখ্যা প্রায় ৪ হাজার এর বাইরেও ১৮ হাজার থেকে ২২ হাজার শাখা ও উপনদী রয়েছে। সে হিসেবে বাংলাদেশে নদীর সংখ্যা দাঁড়ায় ২৬ হাজার। নদী দখল,বাঁধ, গরায়ন,ভরাটের কারণে দেশের নদ-নদী বিলুপ্ত। টিকে আছে মাত্র ৮০টির মতো। একসময় এদেশের মানুষের জীবিকার উৎস ছিলো নদী। এই নদীগুলো কৃত্রিম কারণে ও সময়ের ধারায় আজ বিপর্যয়ের সম্মুখিন। বিপর্যয়ের সম্মুখিন খরস্রোতা গোয়াইল্যা নদী।
নদীনির্ভর বাংলা কথাশিল্পের ধারাবাহিকতায় অবিস্মরণীয় কীর্তি নদী। জল ও জীবনের ঐকতান একাকার হয়ে যেনো বয়ে গেছে বিভিন্ন নদী। টাঙ্গাইল ও গাজীপুর জেলার নদীর প্রায় সব ক’টিই এখন আর কলস্বরা নেই। তার মধ্যে গোয়াইল্যা নদী একটি। গতি প্রকৃতি হারিয়ে গোয়াইল্যা নদীর এখন মরণ দশা। সময়ের বিবর্তনে পাল্টে যাচ্ছে এর ধরণ । দখল ও দূষণে টাঙ্গাইল জেলার নদীগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেহাল অবস্থা গোয়াইল্যা নদীর। ধমনীতে যেমন রক্ত প্রবাহ জরুরি তেমনি দেশকে বাঁচাতে হলে সে দেশের বুকের ভেতর নদী প্রবাহ জরুরি। কিন্ত পলির প্রভাবে নদীর তলদেশ ক্রমশ ভরাট হয়ে যাচ্ছে। জেলার বুক চিরে বয়ে যাওয়া এক সময়ের প্রবল স্রোতে আর গভীর জলরাশির এ নদী আজ নিজের স্বাভাবিক গতিপথ হারিয়ে মর্মী নদীতে রূপ নিতে বসেছে। অবৈধভাবে নদীর দুই পাশ ভরাট করায় এর প্রশস্ততা সংকুচিত হচ্ছে এবং নদীর গভীরতা হ্রাস পাচ্ছে।
দেশের অর্থনীতিও নদীনির্ভর। নদীমাতৃক এই বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা নদী-নালার ওপর নির্ভরশীল। অতএব, নদীর অস্তিত্ব বিপন্ন হলে এর সাথে সংশ্লিষ্ট সকল পেশার মানুষ বেকার হয়ে পড়বে। তাই সময়োপযোগী গোয়াইল্যা নদী খনন,দখল-দূষণ,নদী উদ্ধার করে নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে সচেতনমহলের দাবি। ছবি-প্রতিকী

লেখকঃ সাবেক জাতীয় ক্রীড়াবিদ(কারাতে ব্লাক বেল্ট ১ম ড্যান),সভাপতি শারীরিক শিক্ষাবিদ সমিতি,
চেয়ারম্যান গ্রিন ক্লাব,শিক্ষক, গবেষক,সাংবাদিক ও কলামিস্ট