পরিবেশ রক্ষায় ১০ প্রাণীর অবদান

 

মো. আলতাফ হোসেন ঃঃ
প্রাণী আমাদের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। প্রাণী থেকে আমরা আমাদের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় নানা রকমের উপাদান পেয়ে থাকি। আমরা যারা পরিবেশ নিয়ে ভাবি তারাও পরিবেশ রক্ষায় নিজেদের জায়গা থেকে কিছু করতে পারি। অনেকেই হয়তো জানি না, আমাদের চারপাশে থাকা বিভিণ্ন উপকারী প্রাণীরা নিজেদের আসাসস্থল সংরক্ষণ বা তাদের পরিচর্যা করে থাকে। চলুন জেনে নেই আমাদের চারপাশে থাকা পরিবেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রাণীর উপকারিতা সম্পর্কে।

১। ব্যাঙ: পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় উভচর প্রাণীদের অবদান অপরিসীম। বাংলাদেশের খাল-বিল, নদী-নালাসহ সকল ধরনের জলাশয়ের সুপরিচিত একটি প্রাণী ব্যাঙ। বর্ষার নতুন পানিতে এই প্রাণীগুলো প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। বর্ষার বৃষ্টির পানিতে খাল-বিল ও ডোবা ভরে ওঠলে অবিরাম ডাক। এ যেনো আমাদের চিরচেনা বাংলার এক অবিরাম সুরের মুর্ছনা। তাই বর্ষা ঋতুতে এরা পানির সংস্পর্শে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে, পাশাপাশি এই সময়ে প্রজননের মাধ্যমে শুরু হয় নতুন প্রজন্মের।
লোকালয়ের বিভিণ্ন ব্যাঙের পাশাপাশি বাংলাদেশের বনাঞ্চলেও বেশ কিছু প্রজাতির বৈচিত্র্যময় ব্যাঙ বাস করে। উভচর প্রাণী হওয়ার কারণে ব্যাঙের জীবন চক্রে পানি একটি অপরিহার্য উপাদান।

আমাদের সুপরিচিত এ উভচর প্রাণীগুলো ফসলের ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ, মশা, মাছি, লাভা খেয়ে যেমন অর্থনৈতিক উণ্নয়নে সহায়তা করছে তেমনই প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায়ও অবদান রেখে যাচ্ছে। কিছু ব্যাঙ খুবই বিষাক্ত। ব্যাঙের জীবন চক্র দুই পর্যায়ের অপরিণত বয়সে পানিতে, আর পরিণত বয়সে ডাঙ্গায় বাস। উপকারী এই প্রাণীটিকে টিকিয়ে রাখতে হলে আমাদের জলাশয়গুলো রক্ষা করে এদের প্রাকৃতিক আবাস নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু আমাদের দেশে জলাশয় কমে যাওয়ার ফলে এদের আবাসস্থল কমে গেছে। অতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার এবং কল-কারখানার বর্জ্য পদার্থে পরিবেশ ও পানি দূষণের ফলে এদের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছে। এতে আমাদের সামগ্রিক প্রতিবেশ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

ফুড সার্কেলে ব্যাঙ মধ্যম স্তরের প্রাণী। বিভিণ্ন জটিল রোগ ছড়ায় এমন পোকা মাকড় এরা খায়। বিশেষ করে ম্যালেরিয়া বিস্তার ঘটায় এমন মশাও খেয়ে ফেলে।গোটা বিশে^ এখন পর্যন্ত ৪৭৪০ প্রজাতির ব্যাঙের দেখা মিলেছে। এর মধ্যে ১৯৮০ সালের পর প্রায় দুইশ’ প্রজাতির ব্যাঙ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বাংলাদেশে ব্যাঙের প্রজাতি মাত্র ৬৩টি। জল অথবা স্থল উভয় ক্ষেত্রেই ব্যাঙের অবাধ বিচরণ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

ব্যাঙ ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দিতে সক্ষম। পৃথিবীর বিভিণ্ন দেশে ব্যাঙ একটি উপাদেয় খাদ্য। বহু যুগ ধরেই মানুষ ব্যাঙকে বিভিণ্ন রোগের প্রতিষেধক খাবার হিসেবে গ্রহণ করে আসছে। প্রতিবছর সোনা ব্যাঙ রপ্তানি করে বাংলাদেশ প্রায় ২ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলার অর্জন করে। কিন্তু এ সময়ে ফসলে বিভিণ্ন পোকার আক্রমণে আমরা হারিয়েছি কোটি কোটি ডলার।

অনেকের ধারণা, সাপ পৃথিবীর সবচেয়ে বিষধর প্রাণী। কিন্তু এ ধারণাটি সঠিক নয়। কারণ সাপ এ পৃথিবীর সবচেয়ে বিষধর প্রাণী ‘গোল্ডেন পয়েজন ডার্ট ফ্রগ যে পরিমাণ বিষ বহন করে পৃথিবীর কোনো সাপ সেই পরিমাণ বিষ বহন করে না। এদের বিষে ২০ জন মানুষ অথবা দুটি পুর্ণবয়স্ক পুরুষ হাতির মৃত্যু ঘটে। এরা মধ্য ও দক্ষিণ আফ্রিকার বৃষ্টি প্রবণ বনে বাস কর। এরা ২ ইঞ্চি পর্যন্ত লম্বা হয়। তবে কখনো কখনো মাত্র ০.৪৯ ইঞ্চি লম্বা বিষাক্ত ডার্ট ব্যাঙও দেখা যায়। এদের দেহ কালো-হলুদ, নীল-হলুদ ইত্যাদি রঙের হয়। এ ব্যাঙটির ওজন মাত্র ২ গ্রাম।

২। প্রজাপতি: সকালে সূর্যমামা পূর্ব আকাশে উঁকি দেয়ার পূর্বেই ঘুম ভাঙ্গে প্রজাপতিরা দলবেঁধে আহারের খোঁজে ছুটে চলে। ঝোপ-ঝাড়ে, বন-জঙ্গল, এ গাছ থেকে ও গাছে সবুজ বনানী, নরম ঘাসের ডগায় দিনভর চলে এদর ওড়াউড়ি। বেগুনি নীল, আসমানি সবুজ, হলুদ কমলা, লাল বনের বৈচিত্রময় ডানায় ভর কের তারা ছুটে চলে। প্রজাপতি নয়ন জুড়ায়: তাই প্রজাপতি নিয়ে গড়ে ওঠেছে অনেক প্রজাপতি পার্ক, প্রজাপতি চিড়িয়াখানা মিউজিয়াম ও সংরকক্ষণ প্রতিষ্ঠান। প্রজাপতি দিয়ে অনেক চমকপ্রদ ও শখের মূল্যবান সো-পিস ও গিফট্ সামগ্রী বানানো হয়। যা চড়া দামে বিক্রি করা হয়। প্রজাপতি ফুলে ফুলে উড়ে শুধু মধুই খায় না পরাগরেণু স্থানান্তরিত করে ফুলের পরাগায়নও ঘটায়। প্রজাপতি একটি বাহারি রঙের একটি সুন্দর পতঙ্গ। প্রজাপতি কীট প্রতঙ্গের একটি বড় দলের অংশ। যেটিকে বলা হয় লেপিডোপটেরা, যার অর্থ আঁশযুক্ত ডানা। কারণ এদের ডানায় ক্ষুদ্র ধূলার ন্যায় আঁশ আছে। প্রজাপতির জীবনচক্র চার ভাগে বিভক্ত। অর্থাৎ এদের জীবনের রয়েছে চারটি ধাপ- ডিম, লার্ভা, পিউশ এবং পূর্ণাঙ্গ প্রজাপতি। পৃথিবীতে প্রায় ১৫০০০ হাজার থেকে ২০০০০ প্রজাতির প্রজাপতি আছে। প্রজাপতি সাধারণত উজ্জ্বল রঙের হয়। অধিকাংশ মানুষের বিশ^াস প্রজাপতির আয়ুষ্কাল খুবই কম। তবে প্রজাপতি ১ সপ্তাহ থেকে ১ বছর পর্যন্ত বাঁচে। প্রজাপতি নিজেদের সুরক্ষিত করে রাখে বিভিণ্ন উপায়ে। এদের পা দিয়ে খাদ্যের স্বাদ গ্রহণ করে।
৩। কেঁচো: কেঁচোকে প্রকৃতির লাঙল বলা হয়। কেঁচো মাটি খুঁড়ে মলত্যাগের সঙ্গে রাসায়নিক পদার্থ বের করে কেঁচো কম্পোস্ট তৈরি করে। এই সার সম্পূর্ণ পরিবেশ বান্ধব; যা ব্যবহার করে ফসল উৎপাদন এবং মাটির উর্বরতা বাড়ানো যায়। রাসায়নিক এবং কীটনাশকের ব্যবহার ও জলজ প্রাণীর স্বাস্থ্য ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখিন হচ্ছে। কেঁচো কম্পোস্ট ব্যবহার করলে একদিকে পরিবেশ রক্ষা পাবে, অন্যদিকে নতুন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। ইতোমধ্যে কৃষকরা কেঁচো সার ব্যবহার করে আলু, মরিচ, লাউ, ডাটা, ধনে পাতা, লতি কচু, পুঁই শাক, কলমিশাক চাষ করেছেন, যা পরিবেশের জন্য খুবই ইতিবাচক। যে হারে রাসায়নিক সারও কীটনাশকের দাম বাড়ছে, তাতে ধান চাষ করে কৃষকরা লাভের মুখ দেখে না। কেঁচো কম্পোস্ট ব্যবহার যেহেতু দামে কম এবং পরিবেশ বান্ধব, তাই এই সার ব্যবহার করে আমরা পরিবেশ রক্ষায় সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারি।

কেঁচোর বিষ্ঠা মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করে। কেঁচো চোখ ও পাহীন নিশাচর কীট। দিনের বেলায় এরা মাটির নীচে গর্তে থাকে। বর্ষাকালে বৃষ্টির পানিতে গর্ত ভরে গেলে এরা বাইরে বেরিয়ে আসে। কেঁচো উভয় লিঙ্গ প্রাণী; অর্থাৎ একই কেঁচোর দেহে পুরুষ ও স্ত্রী জনন অঙ্গসমূহ
রয়েছে। এরা এদের দেহটি সংকুচিত- ও সম্প্রসারিত করতে পারে। কেঁচোর সুগঠিত মস্তক নেই। এদের একাধিক হৃদপিন্ড আছে। একটি পূর্ণগঠিত কেঁচোর দৈর্ঘ্য ৮ ইঞ্চি পর্যন্ত হয়ে থাকে। কেঁচোর দেহ অংশটি সদৃশ ছোট ছোট প্রায় ১০০ থেকে ১২০টি খন্ড নিয়ে গঠিত। কেঁচো ৪ থেকে ৮ বছর পর্যন্ত বাঁচে।

৪। গুই সাপ: গুই সাপকে শত্রু বলে গণ্য করে এদের প্রাণে মেরে ফেলার প্রবণতা বেশি গ্রামীণ জনপদে। কিন্তু গুই সাপ কখনোই মানুষের ক্ষতি করে না। বরং পরিবেশ রক্ষায় অনন্য ভূমিকা রাখছে। বিশে^র বিভিণ্ন দেশে গুই সাপের বিচরণ থাকলেও বাংলাদেশে এটি অধিক ঝুঁকিতে রয়েছে। অনুসন্ধ্যানে জানা গেছে গোটা পৃথিবীতে ৭৩ প্রজাতির গুই সাপ রয়েছে আর বাংলাদেশে রয়েছে তিনটি প্রজাতি। ব্যাপকহারে বন উজাড় আর অহেতুক নানা কুসংস্কারের কারণে গ্রামাঞ্চলের মানুষ অযথা ভয় পেয়ে মেরে ফেলে গুই সাপকে। এমনটি ঘনহারে পুকুর ডোবা, জমি খালবিল ভরাটের ফলে ওরা বাসস্থল হারাচ্ছে প্রতিনিয়ত। প্রাণী গবেষকদের মতে, পরিবেশের একটি মাংসাশী প্রাণী হিসেবে বস্তুসংস্থানে অথবা প্রকৃতির খাদ্য শৃঙ্খলে অনন্য ভূমিকা রাখছে গুই সাপ। এছাড়া বিভিণ্ন পঁচা আবর্জনা মৃত প্রাণ ভক্ষণ করে এটি পরিবেশ দূষণের হাত থেকে প্রকৃতিকে রক্ষা করে।

এই প্রাণীদের বাসস্থান অবাধে বিচরণ, নিধন বন্ধ করা, জমিতে পরিবেশ বান্ধব সার ব্যবহার নদী ও জলাশয় রক্ষা করার ব্যাপারে সরকারের পাশাপাশি আমাদের নিজেদেরও এগিয়ে আসতে হবে। তবেই তো বাঁচবে পরিবেশ, বাঁচবে দেশ। ৬। মৌমাছি: মৌমাছি এক ধরনের উপকারী পতঙ্গ। সাধারণত দলবদ্ধভাবে বাস করে বলে এদেরকে সামাজিক পতঙ্গ বলা হয়। বিজ্ঞানীদের ধারণা প্রায় ১৫ কোটি বছর ধরে মৌমাছি মধু সংগ্রহ করে যাচ্ছে। মধু মৌমাছি একমাত্র পতঙ্গ যাদের তৈরি করা খাদ্য মানুষ খেয়ে থাকে। এরা মোমও উৎপণ্ন করে; যা দিয়ে মোমবাতি তৈরি করা হয় এবং আসবাবপত্র পরিশের কাজে ব্যবহৃত হয়। মধু মৌমাছি ১ কেজি মধু উৎপণ্ন করতে ৫০ লাখ ফুলের সুমধুর পাণীয় আহরণ করে। মৌমাছি সেকেন্ডে প্রায় ২১৫ বার তাদের ডানা নাড়াতে পারে। একটি মৌমাছির জটিল চোখগুলোতে প্রায় ৬৩০০ মাইক্রোস্কোপি লেন্স আছে। একটি চাকে যদি কখনো ২টি রাণী মৌমাছি আবির্ভূত হয়; তাহলে তারা প্রচন্ড মারামারি করে এবং যে কোনো ১টি মৃত্যুবরণ করে।

কোনো কোনো প্রকার মৌমাছি বাক্সবন্দী করে চাষ করে মধু উৎপাদন করা হয়। দেশে খাঁটি মধুর চাহিদা পূরণ করে পুষ্টিহীনতা রোধে মৌমাছি সাহায্য করে। মোম, মোমবাতি, প্রসাধনী যেমন কোল্ড ক্রীম সেভিং ক্রীম, স্নো ইত্যাদিসহ বিভিণ্ন প্রকার ওষুধ তৈরিতে মধু ব্যবহার করা হয়। ফুলে ফুলে ঘুরে বেড়ানোর সময় মৌমাছিরা তাদের পা, বুক এবং লোমে ফুলের অসংখ্য পরাগরেণু বয়ে বেড়ায়। এক ফুলের অসংখ্য পরাগরেণু বয়ে বেড়ায়। এক ফুলের পরাগরেণু অন্য ফুলের গর্ভমুন্ডে পড়লে পরাগায়ন ঘটে। ফুলের পরাগায়নের মাধ্যমে কৃষিজ, ফলদ ও বনজ গাছপালার ফলনও গুণগতমান বৃদ্ধি করে ও জীব বৈচিত্র সংরক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

৬। বোলতা: কীটপতঙ্গদের মধ্যে বোলতা খুবই বুদ্ধিমান। বোলতা দেখতে অনেকটাই মৌমাছির মতো। ধারণা করা হয়, বর্তমানে পৃথিবীতে প্রায় ১৭০০০ প্রজাতির বোলতা আছে। এদের দেহটি বেশ সরু। এদের ২ জোড়া ডানা আছে। এরা খুবই দক্ষ উডুক্কু এদের ৩টি ছোট ছোট ও ২টি জটিল চোখ আছে, যা এদের দৃষ্টি শক্তিকে প্রখর করেছে। সামাজিক বোলতাদের মধ্যেও মৌমাছির মতো একজন রাণী থাকে। বোলতা ফল এবং পোকামাকড় খায় এবং এদের বাচ্চাদের ও তা খাওয়ায়। সামাজিক বোলতারা একটি বিশাল দলে বাস করে থাকে বলা হয় কলোনি। একটি কলোনিতে ১০ লাখেরও বেশি বোলতা থাকতে পারে।

বোলতা স্বচ্ছ দুই জোড়া পর্দা যুক্ত এক প্রকার আক্রমাত্মক হুল ফোটানো উড্ডয় নক্ষম পোকা। সবচেয়ে বড় প্রকারের বোলতা ভীমরুল নামেও ডাকা হয়। এটি ক্ষতিকারক মথ বা মাজরা জাতীয় পোকার ডিম নষ্টকারী পোকা হিসেবে পরিচিত। মৌমাছির মতো এদের দেহে লোম থাকে না।

বোলতার উদয়ের পশ্চাতে ডিম পাড়ার অঙ্গটি পরিবর্তিত হয়ে হুল তৈরি হয়েছে। এদের হুলে বিষাক্ত পদার্থ থাকে, যা দিয়ে এরা শিকারকে আক্রমণ করে থাকে। বোলতা অন্য পোকা মাকড়ের শুককীটের মধ্যে ডিম পারে এবং সেই ডিম থেকে জন্ম নেয়া বোলতা কীটগুলো অন্য পোকার শুককীটগুলোকে খেয়ে বড় হয়। এজন্য কৃষিজ পতঙ্গ নিবারণে বোলতাদের সাহায্য নেয়া হয়।

৭। শকুন: প্রকৃতির পরিচ্ছণ্নতাকর্মী হিসেবে শকুন তীক্ষ্ম দৃষ্টিসম্পণ্ন কুৎসিত ও ভয়াল দর্শন একটি পরিচিত পাখি। প্রাচীন মিশরীয়রা শকুনকে আদর্শ মায়ের প্রতীক বলে মনে করতো। পরিবেশের বন্ধু এ পাখিটি আজ বিলুপ্তির পথে। এরা ৪০ বছর পর্যন্ত বাঁচে। এরা ৬ কিলোমিটার দূর থেকে মৃত দেহ দেখতে পায়। এদের ঘ্রাণ শক্তি নেই। এরা মৃত পশুর মাংস খায়। এরা কখনো স্বার্থপরের মতো একা প্রচুর মাংস খেতে পারে, আবার এক নাগাড়ে বহুদিন না খেয়েও থাকতে পারে। নানা ধরনের মরা পঁচা খেয়ে রোগ জীবাণুর হাত থেকে যেমন আমাদের রক্ষা করে, তেমনি পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতেও সাহায্য করে। এরা পঁচা বিশেষ করে গরু-ছাগল প্রভৃতির মৃত দেহ খেয়ে পরিবেশ পরিচ্ছণ্ন রাখে। এদের সকালের দিকে তেমন নড়া চড়া করতে দেখা যায় না। রোদের প্রখরতা কমলে এরা আকাশের অনেক উঁচুতে উড়ে উড়ে খাবার খোঁজে। খাবারের সন্ধান পেলে দ্রুত নিচে নেমে গোগ্রাসে দলবেঁধে খাওয়া শুরু করে। পানি পেলে এরা গোসল করে এবং পানি খায়। শকুন দিবাচর পাখি হলেও কখনো কখনো সন্ধ্যার পর খাবার খেতে দেখা যায়। এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় দলবেঁধে বিচরণ করে। এরা শিকারী পাখি না হওয়ায় সুস্থ প্রাণীর ওপর আক্রমণ করে না। শুধু মৃত প্রাণীই খেয়ে থাকে। বর্তমানে এই উপকারী পাখিটি মানুষের অসচেতনতা, অজ্ঞতা, অবহেলা আর অদূরদর্শিতার কারণে অতি বিপণ্ন প্রাণীর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। দিন দিন অস্বাভাবিক শকুনের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। এভাবে চললে অদূরভবিষ্যতে এরা যে বিলুপ্ত হয়ে যাবে এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। বাংলা শকুন আমাদের দেশের স্থায়ী পাখি।

৮। চড়ুই পাখি: চড়ুই ফিঞ্চ প্রজাতির ছোট পাখি। এদের আদি নিবাস এশিয়া ও আফ্রিকা। এ ক্ষুদ্র গানের পাখিটি বর্তমানে পৃথিবীর সর্বত্রই বাস করে। চড়ুই মাত্র ৪ ইঞ্চি লম্বা হয়। এরা হাটতে পারে না; সব সময় লাফিয়ে লাফিয়ে চলে। এরা ঘণ্টায় ৫০ মাইল বেগে উড়তে পারে। স্ত্রী চড়ুই সাধারণত দু’টি ডিম পাড়ে। চড়ুই প্রায় ১০ বছর বাঁচে।

চড়ুই প্রধানত শস্য দানা, ঘাসের বিচির পাশাপাশি অসংখ্য পোকামাকড় ঘিরে থাকে। বিশেষ করে পোকা মাকড় শুককীট, মুককীট বা লেদাপোকা যারা শস্য উৎপাদনের অন্তরায়। এরা যেসব প্রজাতির পোকামাকড় খায় তাদের মধ্যে বিটল পোকা, ছাড় পোকা, পিঁপড়া, মাছি উল্লেখযোগ্য। চড়ুই এসব পোকার ক্ষতিকর আক্রমণ থেকে ফসল, সবজির ক্ষেত, বনাঞ্চল বাঁচিয়ে পরিবেশও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।

৯। শুয়োপোকা: শুঁয়োপোকা হলো প্রজাপতি বা মথের শুককীট। শুয়োপোকা গোগ্রাসে তাদের খাবার খায়। শুয়োপোকার দৃষ্টিশক্তি দুর্বল। এরা ১ মিলিমিটার থেকে ৩ ইঞ্চি পর্যন্ত লম্বা হয়। শুঁয়োপোকা নানা রং ও আকৃতির হয়ে থাকে। কিছু শুয়োপোকাকে দেখতে পাখির বিষ্ঠার মতো মনে হয়। শুয়োপোকার কোনো দাঁত নেই। এরা পাতা কাটে চোয়াল দিয়ে। কিছু শুঁয়োপোকার দেহে লোম আছে। প্রকৃতিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অপচনশীল প্লাস্টিক বর্তমানে এক মহাগুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। বৈজ্ঞানিরা জৈব প্রযুক্তির বিভিণ্ন পদ্ধতি প্রয়োগ করে প্রতিনিয়ত চেষ্টা চালাচ্ছেন এই সমস্যাটি থেকে মুক্তি পেতে। এর মধ্যে একটি প্রচেষ্টা হলো বিভিণ্ন অনুজীব ব্যবহার করে প্রাকৃতিকভাবে প্লাস্টিক ক্ষয় করা। বিজ্ঞানীরা খেয়াল করেছেন, একটি বিশেষ প্রজাতির শুঁয়োপোকা পলিথিন পরিপাক করতে সক্ষম। মোম শুঁয়োপোকার মত মৌচাকের মধু এবং মোম খেয়ে বেঁচে থাকে। বিজ্ঞানীরা পরিক্ষাগারে পলিথিনের পর্দার ওপর বেশ কিছু শুঁয়োপোকা রেখে একটি পরীক্ষা চালান এবং লক্ষ্য করেন যে, এই প্রজাতির শুঁয়োপোকা ধারণকৃত পলিথিন ব্যাগ খুব দ্রুত ফুটো তৈরি করে। প্রায় ১০০টি শুয়োপোকা ৯২ মিলিগ্রাম প্লাস্টিক মাত্র ১২ ঘণ্টার ক্ষয় করতে সক্ষম।

১০। মাকড়শা: অনেকের ধারণা, মাকড়সা এক ধরনের পোকা। কিন্তু মাকড়সা পোকা নয়। এরা আলাদা একটি দলের অন্তর্ভুক্ত, যাকে বলা হয় অ্যারাকনি ডস, যার মধ্যে বিছাও আছে। মাকড়সা নিঃসঙ্গ মাংসাশী স্থলচর অমেরুদন্ডী শিকারী কীট বিশেষ। এদের দেহ দু’টি ভাগে বিভক্ত। এদের ৮টি পা আছে। পৃথিবীতে প্রায় ৪০,০০০ প্রজাতির মাকড়সা আছে। এরা শিকার ধরার জন্য জাল বুনে। হাড়ের চেয়ে শক্ত ও নাইলনের চেয়ে দ্বিগুন স্থিতিস্থাপক এদের তৈরি জাল। অধিকাংশ প্রজাতির মাকড়সা বিষধর।স্বল্প সংখ্যক প্রজাতির মাকড়সা বিষধর। এরা মানুষের জন্য খুবই বিপজ্জনক। মাকড়সার বিষ দাঁত আছে। যা দিয়ে এরা বিষ ইমজেক্ট করে। বিজ্ঞানীরা বর্তমানে মাকড়সার বিষ ওষধু হিসেবে ব্যবহার করতে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। অধিকাংশ মাকড়সা মাত্র ২ বছর। পর্যন্ত বাঁচে। তবে ট্যারান্টুলাসহ কিছু প্রজাতির মাকড়সা বন্দী অবস্থায় ২৫ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে।

মাকড়সা পরিবেশের জন্য উপকারী একটি অমেরুদন্ডী কীট। গোটা বিশে^ প্রতিবছর কী পরিমাণে খাদ্য মাকড়সার পেটে যায় তার হিসাব করেছেন একদল সুইস বিজ্ঞানী। তাদের এই হিসাব গোটা দুনিয়ায় বিজ্ঞানীদের চমকে দেয়। সুইজারল্যান্ডের প্রখ্যাত বাজেল বিশ^ বিদ্যালয়ের গবেষকরা বলেছেন, মাকড়সারা প্রতিবছর আনুমানিক ৪০ থেকে ৮০ কোটি টন খাবার খায়। আর মাকড়সার খাবারের তালিকায় রয়েছে ছোট ছোট প্রাণী। গবেষকরা বলছেন, প্রতিবছর মানুষও প্রায় একই পরিমাণ মাংস ও মাছ জাতীয় খাবার খেয়ে থাকে। প্রাণী জগতের ফুড চেইন বা খাদ্য শৃঙ্খলে এবং পোকা মাকড় নিধনে মাকড়সার গুরুত্ব সম্পর্কে মানুষকে আরো সচেতন হবে। ১৯৫৮ সালে প্রকাশিত ব্রিটিশ লেখক উইলিয়াম ব্রিস্টোর ‘দ্য ওয়াল্ড অব স্পাইডার পামের শিরোনামের একটি বইতে বলা হয়েছিলো প্রতিবছর ব্রিটেনজুড়ে মাকড়সাগুলো যে পরিমাণ পোকা মাকড় খায় তা প্রায় ব্রিটেনের মোট জনসংখ্যার ওজনের সমান। তিনি যুক্তি দেন যে এই জাতীয় পোকা মাকড় মাকড়সাগুলো খেয়ে সাবাড় না করলে পরিবেশের ক্ষতি হতে পারতো।

লেখক: সাবেক জাতীয় ক্রীড়াবিদ,সভাপতি শারীরিক শিক্ষাবিদ সমিতি
চেয়ারম্যান গ্রিন ক্লাব,শিক্ষক,গবেষক,সাংবাদিক,কলামিস্ট