প্রগতিশীল আন্দোলনে নারীবাদী বিদগ্ধ কবি সুফিয়া কামাল

 

মো. আলতাফ হোসেন ঃঃ
বেগম সুফিয়া কামাল বাংলাদেশের একজন প্রথিতযশা কবি, লেখিকা, নারীবাদী ও আধুনিক বাংলাদেশের নারী প্রগতি আন্দোলনের একজন পুরোধা ব্যক্তিত্ব। সুফিয়া কামাল ১৯১১ সালের ২০ জুন বরিশালের শায়েস্তাবাদে মামার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম সৈয়দ আব্দুল বারী এবং মাতার নাম সৈয়দা সাবেরা খাতুন। তার বাবা কুমিল্লার বাসিন্দা ছিলেন। যে সময়ে সুফিয়া কামালের জন্ম তখন বাঙালি মুসলিম নারীদের গৃহবন্দী জীবন কাটাতে হতো। স্কুল-কলেজে পড়ার কোন সুযোগ তাদের ছিলো না। পরিবারে বাংলা ভাষার প্রবেশ একরকম নিষিদ্ধ ছিলো। সেই বিরুদ্ধ পরিবেশে সুফিয়া কামাল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ পাননি। তিনি পারিবারিক নানা উত্থানপতনের মধ্যে স্বশিক্ষায় শিক্ষিত হয়েছেন।

সুফিয়া কামাল স্বাধীন বাংলাদেশে নারীজাগরণ আর সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে উজ্জ্বল ভূমিকা রেখে গেছেন। ১৯৯০ সালে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে শরিক হয়েছেন, কার্ফ্যু উপেক্ষা করে নীরব শোভাযাত্রা বের করেছেন। মুক্তবুদ্ধির পক্ষে এবং সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের বিপক্ষে আমৃত্যু তিনি সংগ্রাম করেছেন। প্রতিটি প্রগতিশীল আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন।

যে সময়ে মুসলিম মেয়েরা শিক্ষা-দীক্ষায় ছিলো একেবারেই পশ্চাৎপদ, সে সময়ে সুফিয়া কামালের মতো স্বশিক্ষিত ও সমাজপ্রগতি-সচেতন নারীর আবির্ভাব ছিলো এক অসাধারণ ব্যাপার। শায়েস্তাবাদে নানার বাড়ির রক্ষণশীল অভিজাত পরিবেশে বড় হলেও সুফিয়া কামালের মনোগঠনে দেশ, দেশের মানুষ ও সমাজ এবং ভাষা ও সংস্কৃতি মূল প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। সুফিয়া কামাল তেমন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভ করেননি। তখনকার পারিবারিক ও সামাজিক প্রতিবেশে বাস করেও তিনি নিজ চেষ্টায় হয়ে ওঠেন স্বশিক্ষিত ও সুশিক্ষিত। বাড়িত উর্দুভাষার চল থাকলেও নিজ উদ্যেগেই তিনি বাংলা ভাষা শিখে নেন।

১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দে সুফিয়ার যখন সাত বছর বয়স তখন তার বাবা সাধকদের অনুসরণে নিরুদ্দেশ যাত্রা করেন। ফলে তাকে তার মা সাবেরা খাতুন অনেকটা বাধ্য হয়ে বাবার বাড়িতে এসে আশ্রয় নেন। এই কারণে তার শৈশব কেটেছিলো নানার বাড়িতে। যে পরিবারে সুফিয়া কামাল জন্মগ্রহণ করেন সেখানে নারীশিক্ষাকে প্রয়োজনীয় মনে করা হত না। তার মাতৃকুল ছিলো শায়েস্তাবাদের নবাব পরিবারের এবং সেই পরিবারের কথ্য ভাষা ছিল উর্দু। এই কারণে অন্দরমহলে মেয়েদের আরবি, ফারসি শিক্ষার ব্যবস্থা থাকলেও বাংলা শেখানোর কোন ব্যবস্থা ছিল না। তিনি বাংলা শেখেন মূলত তার মায়ের কাছে। নানাবাড়িতে তার বড় মামার একটি বিরাট গ্রন্থাগার ছিলো। মায়ের উৎসাহ ও সহায়তায় এ লাইব্রেরির বই পড়ার সুযোগ ঘটেছিলো সুফিয়া কামালের।

১৯২৪ সনে মাত্র ১৩ বছর বয়সে মামাতো ভাই সৈয়দ নেহাল হোসেনের সাথে সুফিয়ার বিয়ে দেওয়া হয়। নেহাল অপেক্ষাকৃত আধুনিকমনস্ক ছিলেন, তিনি সুফিয়া কামালকে সমাজসেবা ও সাহিত্যচর্চায় উৎসাহিত করেন। সাহিত্য ও সাময়িক পত্রিকার সঙ্গে সুফিয়ার যোগাযোগও ঘটিয়ে দেন তিনি। সুফিয়া সে সময়ের বাঙালি সাহিত্যিকদের লেখা পড়তে শুরু করেন। ১৯১৮ সালে কলকাতায় গিয়েছিলেন সুফিয়া কামাল। সেখানে বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে তার দেখা হয়েছিলো। সুফিয়া কামালের শিশুমনে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছিলো বেগম রোকেয়ার কথা ও কাজ। সুফিয়া কামালের কাজেকর্মেও ছাপ পাওয়া যায় বেগম রোকেয়ার।

সাহিত্যপাঠের পাশাপাশি সুফিয়া কামাল সাহিত্য রচনা শুরু করেন। ১৯২৬ সালে তাঁর প্রথম কবিতা ‘বাসন্তী’ সেসময়ের প্রভাবশালী সাময়িকী সওগাতে প্রকাশিত হয়। ত্রিশের দশকে কলকাতায় অবস্থানকালে বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্র যেমন রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, শরৎচন্দ্র প্রমুখের দেখা পান। মুসলিম নারীদের সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করার জন্য বেগম রোকেয়ার প্রতিষ্ঠিত সংগঠন ‘আঞ্জুমানে খাওয়াতিনে ইসলামে’ রোকেয়ার সঙ্গে সুফিয়া কামালের পরিচয় হয়। বেগম রোকেয়ার চিন্তাধারা ও প্রতিজ্ঞা তার মধ্যেও সঞ্চারিত হয়, যা তার জীবনে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে।

১৯৩২ সালে তাঁর স্বামীর আকস্মিক মৃত্যু তাঁকে আর্থিক সমস্যায় নিপতিত করে। তিনি কলকাতা কর্পোরেশন স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন এবং ১৯৪২ সাল পর্যন্ত এ পেশায় নিয়োজিত থাকেন। এর মাঝে ১৯৩৯ সালে কামালউদ্দিন আহমেদের সাথে তাঁর দ্বিতীয় বিয়ে হয়। দেশবিভাগের পূর্বে কিছু কাল তিনি নারীদের জন্য প্রকাশিত সাময়িকী বেগমের সম্পাদক ছিলেন।

১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের পর সুফিয়া কামাল পরিবারসহ ঢাকায় চলে আসেন। ভাষা আন্দোলনে তিনি নিজে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন এবং এতে অংশ নেওয়ার জন্য নারীদের উদ্বুদ্ধ করেন। ১৯৫৬ সালে শিশুদের সংগঠন কচিকাঁচার মেলা প্রতিষ্ঠা করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মহিলা হোস্টেলকে ‘রোকেয়া হল’ নামকরণের দাবী জানান। ১৯৬১ সালে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষিদ্ধের প্রতিবাদে সংগঠিত আন্দোলনে তিনি জড়িত ছিলেন। এই বছরে তিনি ছায়ানটের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।

১৯৬৯ সালে মহিলা সংগ্রাম কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন, গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেন, পাকিস্তান সরকার কর্তৃক ইতঃপূর্বে প্রদত্ত তমঘা-ই-ইমতিয়াজ পদক বর্জন করেন। ১৯৭০ সালে মহিলা পরিষদ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭১ সালের মার্চে অসহযোগ আন্দোলনে নারীদের মিছিলে নেতৃত্ব দেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর বাসভবন সংলগ্ন গোটা ধানমন্ডি এলাকা পাকিস্তানী বাহিনীর নিরাপত্তা হেফাজতে ছিলো,আর ঐ সময় তিনি ধানমন্ডিতে নিজ বাসভবনে সপরিবারে নিরাপদে অবস্থান করেন ।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সুফিয়া কামালের দুই মেয়ে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেন এবং ভারতের আগরতলায় মুক্তিযোদ্ধাদের সেবার জন্য একটি হাসপাতাল স্থাপন করেন। সুফিয়া, তাঁর স্বামী ও ছেলে দেশের মধ্যেই থেকে যান মুক্তিবাহিনীকে সাহস ও শক্তি জোগানোর জন্য এবং মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন খবরাখবর সরবরাহের জন্য। যুদ্ধকালীন তিনি একাত্তরের ডায়েরী নামে একটি দিনলিপি রচনা করেন এবং এ সময়ে লেখা তাঁর কবিতাগুলি পরবর্তীকালে মোর যাদুদের সমাধি ’পরে নামে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হড। কবিতাগুলিতে তিনি বাঙালিদের ওপর পাকবাহিনীর নৃশংসতা বর্ণনা করেন এবং দেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করেন। এ সময় রচিত ‘বেণীবিন্যাস সময় তো আর নেই’ কবিতায় মাতৃভূমির প্রতি দায়িত্ব পালনের জন্য তিনি মহিলাদেরও আহবান জানান।

সুফিয়া কামাল একালে আমাদের কাল নামে একটি আত্মজীবনী রচনা করেছেন। তাতে তাঁর ছোটবেলার কথা এবং রোকেয়া-প্রসঙ্গ স্থান পেয়েছে। তিনি অনেক ছোটগল্প এবং ক্ষুদ্র উপন্যাসও রচনা করেছেন। কেয়র কাঁটা (১৯৩৭) তাঁর একটি উল্লেখযোগ্য গল্পগ্রন্থ। তাঁর আরো কয়েকটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: মায়া কাজল, মন ও জীবন, উদাত্ত পৃথিবী, অভিযাত্রিক ইত্যাদি। তাঁর কবিতা চীনা, ইংরেজি, জার্মান, ইতালিয়ান, পোলিশ, রুশ, ভিয়েতনামিজ, হিন্দি ও উর্দু ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ১৯৮৪ সালে রুশ ভাষায় তাঁর সাঁঝের মায়া গ্রন্থটি সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে প্রকাশিত হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়ও তাঁর বেশ কিছু কবিতা প্রকাশিত হয়। ২০০১ সালে বাংলা একাডেমী তাঁর কিছু কবিতার ইংরেজি অনুবাদ নিয়ে মাদার অব পিয়ার্লস এন্ড আদার পয়েমস্ এবং ২০০২ সালে সুফিয়া কামালের রচনা সমগ্র প্রকাশ করেছে।

জীবনের পরবর্তী সময়ে সমাজসেবা ও সংগঠনমূলক কাজের বিবরণ সুফিয়া কামাল এভাবে বর্ণনা করেন ‘প্রথম জীবনে কাজ করার পর আঠার থেকে বিশ বছর বয়স পর্যন্ত আমি বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের প্রতিষ্ঠিত কলকাতার ‘আঞ্জুমান মাওয়াতিনে’ কাজ করি। এই প্রতিষ্ঠানের কাজ ছিলো কলকাতার বস্তি এলাকার মুসলমান মেয়েদের মনোভাবে একটু শিক্ষিত করে তোলা। মিসেস হামিদা মোমেন, মিসেস শামসুন্নাহার মাহমুদ, সরলা রায়, জগদীশ বাবুর স্ত্রী অবলা বসু, ব্রহ্মকুমারী দেবী এরা সকলেই ছিলেন এই প্রতিষ্ঠানে। আমার স্বামী ছিলেন উদার প্রকৃতির মানুষ, এসব কাজে তার কাছ থেকে প্রচুর উৎসাহ পেয়েছি আমি। ১৯৪৩ এর দুর্ভিক্ষের সময় বর্ধমানে এবং ‘৪৬ এর ‘ডাইরেক্ট এ্যাকশন ডে’র হিন্দু মুসলমান সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পর বিপন্ন এবং আহতদের মধ্যে কাজ করেছি। পর্যায়ক্রমে ভাষা আন্দোলন, গণআন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে আমি বিশেষভাবে জড়িয়ে পড়ি।’

স্বাধীনতার পরেও সুফিয়া কামাল অনেক সংগঠন প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করেন। তিনি যেসব সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা-প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন সেগুলি: বাংলাদেশ মহিলা পুনর্বাসন বোর্ড, বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন কমিটি এবং দুস্থ পুনর্বাসন সংস্থা। এছাড়াও তিনি ছায়ানট, বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশন এবং নারী কল্যাণ সংস্থার সভানেত্রী ছিলেন।

সুফিয়া কামাল নারীর সামাজিক শৃঙ্খল ভেঙে মুক্তির দিগন্ত উন্মোচন করার জন্য নিবেদিত ছিলেন। নারীর সামগ্রীক মুক্তির জন্য তাঁর ভূমিকা ছিলো সমসময়ের জন্য উদ্দীপনামূলক ও আগ্রহউদ্দীপক, সে কারণে তার অনুভব এমন ‘আমার কাছে সবচেয়ে ভালো লাগে এই দেখে যে, মেয়েরা আগের তুলনায় এখন অনেক সাহসী হয়েছে। মেয়েরা এখন রাস্তায় বেরিয়ে অন্তত নিজেদের কথা বলতে শিখেছে। নারীর স্বাধীনতা সম্পর্কে সুফিয়া কামালের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধগত বিবেচনা ছিলো, এ কারণে তিনি নারী স্বাধীনতার সাথে সাথে নীতি-আদর্শ-ঐতিহ্যকে গুরুত্ব দিয়েছেন, এমনি প্রতিভাস তার বক্তব্য থেকে জানা যায় ‘মেয়েরা স্বাধীনতা পেয়েছে।

সুফিয়া কামাল পর্দাযুগের মেয়েদের সঙ্গে এখনকার সময়কালের মেয়েদের তুলনা করেন এভাবে, যাতে তার দৃষ্টিভঙ্গি ও বিবেচনা লক্ষ করা যায় আগে মেয়েরা ষোলআনা নির্ভরশীল ছিলো পুরুষের ওপর। স্ত্রীকন্যার কি প্রয়োজন না প্রয়োজন তা স্বামী বা পিতাই নির্ধারণ করতেন। যেখানে পুরুষ মানুষটি এসব ব্যাপার তেমন মাথা ঘামাতো না সেখানে স্ত্রীকন্যা নীরবে কষ্ট সহ্য করতো এবং সেই পরিস্থিতিতেই নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতো। এখন আবার যে সব মেয়েদের রোজগার আছে- স্বামীরা তাদের রোজগার কেমন করে খরচ হবে তাও বলে দিতে চায়। আর টাকা পয়সার ব্যাপারে দেখা গেছে মেয়েরা নিজের টাকা যত খরচ করে স্বামীরা ততোই হাত গুটোয়। পুরুষদের সম্পর্কে উক্তি আছে ‘তারা হাতে মারে, ভাতে মারে, দাঁতে মারে’ এই অবস্থায় একজন মানুষ সুখী কেমন করে হবে? আর মেয়েদের ক্ষেত্রে কত স্তরের দুঃখ যে আছে তার ঠিক নেই। তাই তুলনামূলকভাবে কাউকে কাউকে একটু বেশি সুখী মনে হয়। পর্দার যুগে কোন অবস্থাতেই মেয়েটি বাড়ি ছেড়ে পালাতে পারতো না- আজকাল পারে। মেয়েদের স্বামী পরিত্যাগ করার ঘটনাও বিরল নয়। আজকাল মেয়েদের স্বাধীনতা বেশি এবং সেই অনুপাতে নিশ্চয়ই সুখও বেশি।

সুফিয়া কামাল রাজনৈতিক বিবেচনা থেকে দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির কথা ভেবেছেন, অন্যদিকে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে প্রগতির পথে এগিয়ে যাওয়ার বাসনা অনুভব করেছেন। মানুষে মানুষে ভালোবাসা ও সাম্য তার লেখা ও কর্মকান্ডে ভিত্তিমূল হিসেবে কাজ করেছে। দার্শনিক বিবেচনাবোধ থেকে এভাবে তিনি ইতিহাস ও সমাজ বিশ্লেষণ করেছেন ‘ইতিহাসে বার বার দেখা গেছে, মূঢ়তা এবং হিংস্রতা যখন সীমা অতিক্রম করেছে তখনই তার ধ্বংস অনিবার্য হয়ে উঠেছে- সে নিজেকেই নিজে ধ্বংস করেছে। হয়তো অনেক সুন্দর ও শুভকে এজন্যে আত্মহুতি দিতে হয়, কিন্তু ভয় এবং হতাশায় নিস্কৃতি কোথায়?- আরও একটা কথা মানি, আমাদের দারিদ্র্য এবং হতাশার অন্যতম কারণ; জনসংখ্যার অনুপাতে আমাদের সম্পদের অভাব; মানুষের ক্ষুধায় এবং লোভে প্রকৃতি লুন্ঠিত, শূন্য হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু প্রতিকারের পথ একটাই : দুঃখের অন্ন সবাইকে একসাথে ভাগ করতে খেতে হবে, তারপর মানুষ ও প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার জন্যে বিজ্ঞানকে কাজে লাগাতে হবে। মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসাই সব সমস্যা দূর করতে সক্ষম।’

বেগম সুফিয়া কামাল বাংলাদেশের একজন প্রথিতযশা কবি, লেখিকা, নারীবাদী ও আধুনিক বাংলাদেশের নারী প্রগতি আন্দোলনের একজন পুরোধা ব্যক্তিত্ব। তিনি কবি হলেও সবার কাছে আরও একটি পরিচয় আছে- জননী সাহসিকা। যুগে যুগে যারা নারী জাতির অবগতির জন্য অবদান রেখেছেন তার মধ্যে সুফিয়া কামাল অন্যতম। নারীর মানবাধিকার অর্জনের লক্ষ্যে সংগ্রাম,শিশুদের জন্য আনন্দময় জগৎ গড়ে তোলা, সংস্কৃতির অধিকারচর্চার জন্য গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পতাকা হাতে ব্রিটিশ যুগে পশ্চিম ও পূর্ব বাংলায় পূর্ব পাকিস্তান ও বাংলাদেশে কত পথ যে হেঁটেছেন, লিখেছেন গল্প ও কবিতা, দিয়েছেন শতসহস্র ভাষণ। লাখ লাখ শিশু, নারী, তরুণ-তরুণীর খাতায় দিয়েছেন স্বাক্ষর-শুভাশিস। সেসব স্বাক্ষরের ধারাক্রমে সুফিয়া খাতুন, সুফিয়া এন হোসেন, সুফিয়া কামালের সূচনা ঘটেছে। জীবনের নানা উত্থান-ঘটনা-দুর্ঘটনা-শোক-আনন্দের ধারায় ‘কবি সুফিয়া’ নিজের স্থায়ী পরিচয়ে সমুজ্জ্বল হয়ে আছেন। বারবার বিবেকের সত্যভাষণ তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন গল্পে, কবিতায়, বক্তৃতায়। হেঁটেছেন,বলেছেন, প্রতিবাদ জানিয়েছেন অসত্যের,অত্যাচারের, দমননীতির বিরুদ্ধে। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে তাঁর প্রতিবাদ সোচ্চার ছিলো মুখের ভাষায়, কলমের কালিতে এবং হৃদয়ের রক্তক্ষরণে।

হেলেন কেলারের মতো,অন্যের অধিকার আদায়ের জন্য সোচ্চার ছিলেন সুফিয়া কামাল । যা তাঁকে বিশ্বে আইকন নারীতে পরিণত করেছে। নারী-পুরুষের সম অধিকার আদায়ের জন্য ধারণ করেছিলেন আন্দোলনের আয়ুধ। বেগম সুফিয়া কামাল যেমন ছিলেন সমাজ সংস্কারে অগ্রণী, তেমনি ছিলেন রাজসিক ও বিদগ্ধ আধুনিক কবি। কাব্য, উপন্যাস, গল্প, স্মৃতিকথা ইত্যাদিতে ফলপ্রসূ পদচারণা ছিলো তাঁর। নারী অধিকার আন্দোলনের নেত্রী ও কবি পরিচয়ের প্রবল প্রভাবই দেদীপ্যমান। শিল্প-সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ সব পুরস্কার-সম্মাননায় অভিষিক্ত সুফিয়া কামাল কাব্যকলার ক্ষেত্রে জীবন, প্রকৃতি ও মানুষের সার্বিক প্রেরণায় বিশ্বাস করতেন। রোমান্টিক কবি ওয়ার্ডসওয়ার্থের কাব্যিক অলংকার প্যান্থেয়িজমে প্রভাবিত সুফিয়া কামালের কাব্যিক ভাষা ও বিষয়ের সারল্য অন্যতম। মূল্যবোধের প্রবহমানতা তাঁকে করেছে সর্বজনীন। কবিতাশরীর নির্মাণে দিয়েছেন রুচিশীল চারুশিল্পীর পরিচয়।

সুফিয়া কামালের কবিতার বিষয় প্রেম, প্রকৃতি,ব্যক্তিগত অনুভূতি, বেদনাময় স্মৃতি, জাতীয় উৎসবাদি, স্বদেশানুরাগ, মুক্তিযুদ্ধ এবং ধর্মানুভূতি। অন্তরঙ্গ আবেগের বিশিষ্ট পরিচর্যায় এবং ভাষাভঙ্গির সহজ আবেদনঘন স্পর্শে তাঁর কবিতা সুন্দর ও আকর্ষণীয়। তিনি ভ্রমণ ও ডায়রি জাতীয় গদ্য ও শিশুতোষ গ্রন্থও রচনা করেছেন। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ২০টিরও বেশি।

সাহিত্য ক্ষেত্রে বিশিষ্ট অবদানের জন্য সুফিয়া কামাল অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেছেন। ১৯৬১ সালে তিনি পাকিস্তান সরকার কর্তৃক ‘তঘমা-ই-ইমতিয়াজ’ নামক জাতীয় পুরস্কার লাভ করেন; কিন্তু ১৯৬৯ সালে বাঙালিদের ওপর অত্যাচারের প্রতিবাদে তিনি তা বর্জন করেন। তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য পুরস্কার: বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৬২), একুশে পদক (১৯৭৬), নাসিরউদ্দীন স্বর্ণপদক (১৯৭৭), মুক্তধারা পুরস্কার (১৯৮২), জাতীয় কবিতা পরিষদ পুরস্কার (১৯৯৫), ওমেনস্ ফেডারেশন ফর ওয়ার্ল্ড পিচ ক্রেষ্ট (১৯৯৬), বেগম রোকেয়া পদক (১৯৯৬), দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ স্বর্ণপদক (১৯৯৬), স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার (১৯৯৭) ইত্যাদি।

সুফিয়া কামালের সারাটি জীবন কেটেছে নারীদের স্বাধীনতা এবং নারীদের শোষণ বঞ্চনার হাত থেকে রক্ষা করার চেষ্টায়। কলকাতায় যখন ধর্মীয় দাঙ্গা বাধে তখন তিনি কলকাতার সোহরাওয়ার্দী এভিনিউ এলাকাই লেডি ব্র্যাবোর্ন কলেজে একটি আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি করার ব্যাপারে যথেষ্ট সাহায্য করেন। ১৯৪৯ সালে বেগম রোকেয়ার সুলতানার স্বপ্ন গ্রন্থের প্রধান চরিত্র সুলতানার নামানুসারে একটি পত্রিকা প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধে সুফিয়া কামালের অবদান ছিলো অবিস্মরণীয়। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতির ওপর আগ্রাসনের কারণে রবীন্দ্রনাথকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। কবি সুফিয়া কামাল এই নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধেও তীব্র প্রতিবাদ জানান। সুফিয়া কামাল ৫০টিরও অধিক পুরস্কার লাভ করেছেন। তিনি মহৎপ্রাণ সমাজসেবী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সাথে জাতির কল্যাণের জন্য কাজ করেছেন।

বাঙালির সমস্ত প্রগতিশীল আন্দোলনে ভূমিকা পালনকারী সুফিয়া কামাল ১৯৯৯ সালের ২০ নভেম্বর শনিবার সকালে বার্ধক্যজনিত কারণে ইন্তেকাল করেন। সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যদায় ২৮ নভেম্বর তাঁর ইচ্ছানুযায়ী তাঁকে আজিমপুর কবরস্থানে সমাহিত করা হয়। বাংলাদেশী নারীদের মধ্যে তিনিই প্রথম এই সম্মান লাভ করেন। প্রতি বছর এই দিনটিতে তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্মরণ করা হয়।

লেখকঃ সাবেক জাতীয় ক্রীড়াবিদ,সভাপতি,শারীরিক শিক্ষাবিদ সমিতি
চেয়ারম্যান গ্রিন ক্লাব,শিক্ষক,গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট