প্রতিরোধযোগ্য স্ট্রোক পুরুষের তুলনায় নারীরা ঝুঁকিতে

 

মোঃ আলতাফ হোসেন ঃঃ
মস্তিষ্কের রক্তবাহী নালির দুর্ঘটনাকেই স্ট্রোক বলা হয়। আমাদের দেশে প্রচলিত একটি ধারণা আছে যে স্ট্রোক একটি হৃদপিন্ডের রোগ । বাস্তাবে এটি মোটেই সত্য নয় । আসলে স্ট্রোকে মস্তিষ্কের রোগ । এ দুঘটনায় রক্তণালি বন্ধও হতে পারে, আবার ফেটেও যেতে পারে । এর ফলে মস্তিষ্কে‹র কার্যক্ষমতা নষ্ট হয়ে যেতে পারে । স্ট্রোক সম্পূর্ণ মস্তিষ্কের রক্তনালির জটিলতা জনিত রোগ । মস্তিষ্কের কোনো অংশে রক্ত চলাচল বন্ধ হলে সাধারণত স্ট্রোক বা মস্তিষ্কর রক্তক্ষরণ হয়ে থাকে । প্রতি ৪৫ সেকেন্ডে বিম্বর কোথাও না কোথাও একজন আক্রান্ত হচ্ছেন । অনেক ক্ষেত্রে অসচেতনতার অভাবেই এই রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। পুরুষের তুলনায় নারী ও অল্প বয়সীরা স্ট্রোকের ঝুঁকিতে রয়েছে । বিশ্বের প্রতি পাঁচজন নারীর একজন এবং প্রতি ছয় জনের একজন পুরুষ মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণের ঝুঁকিতে থাকেন । নারীদের ঝুঁকির প্রধান কারণ হলে উচ্চ রক্তচাপ, অনিয়মিত, হৃদস্পন্দন, স্থুলতা, ডায়াবেটিস ও বিষন্ন্নতা । এছাড়া নারীরা বেশি ভোগেন গর্ভধারণ প্রসব পরবর্তী জটিলতা ও হরমোনজনিত রোগের কারণে ।

জাতীয় নিউরোসায়েন্স ইনস্টিটিউটের পরিচালক কাজী দ্বীন মোহাম্মদ বলেছেন, অন্যান দেশের তুলনায় বাংলাদেশের কম বয়ষ্ক মানুষি স্ট্রোক বা মস্কিষ্কের রক্তক্ষরণে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন । তাই আকাল মৃত্য ঠেকাতে সচেতনতার বিকল্প নেই । সম্প্রতি অ্যাপোলো হাসপাতালে আয়োজিত সেমিনারে কাজী দ্বীন মোহাম্মদ বলেন, বাংলাদেশে মস্কিষ্কে রক্তক্ষরণে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন অল্প বয়সীরা তাই রোগটি যে প্রতিরোধযোগ্য এই বার্তা দেশের সব জায়গায় ছড়িয়ে দিতে হবে । আলোচনায় অ্যাপেলো হাসপাতালের চিকিৎসক আলিম আক্তার ভুঁইয়া বলেন, চল্লিশের কাছাকাছি বয়স এবং যাদের ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ আছে এবং যারা ধুমপান করেন তাদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি ।

সম্প্রতি রাজধানীর ল্যাব্এইড হাসপাতালেও সেমিনারে নিউরোলোজি বিভাগের প্রধান পরামর্শক সিরাজুল হক বলেন, জন্ম নিয়ন্ত্রন বড়ি সেবন নারীদের মধ্যে স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায় । আলোচকরা বলেন, গর্ভকালীন এবং এর আগে ও পরে নারীরা অনেক বেশি স্ট্রোকের ঝুঁকিতে থাকেন । এ সময়টা প্রতিরোধের ব্যবস্থা নিতে হবে পর্যাপ্ত । এ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক সংগঠন স্ট্রোক অ্যাসেসিয়েশন ঝুঁকি এড়াতে এফএসএসটি ফাস্ট কথাটির উপর গুরুত্ব দিচ্ছে । সংগঠনটি এ নিয়ে একটি গান ও তৈরি করেছে । যেখানে বলা হচ্ছে স্ট্রোক হলে ফাস্ট গানটির কথা মনে রাখতে হবে । এই গানে এফ ব্যবহার হচ্ছে ফেস বা মুখ বোঝাতে । বলা হয়েছে কারো মুখের এক পাশ যদি একটু ঝুলে পড়ে তাহলে এক মুহুর্তেও দেরি করা ঠিক হবে না । গানে এ ব্যবহার হচ্ছে আর্ম বা বাহু বোঝাতে । স্ট্রোক হলে বাহুতে ব্যথা হবে । ‘এস’ ব্যবহার হচ্ছে স্পিক বা কথা বলার সংক্ষিপ্ত রূপ হিসেবে । স্ট্রোক হলে কথা জড়িয়ে আসবে, বা রোগী কথাই বলতে পারবে না । আর টি হচ্ছে টাইম বোঝাতে ঠিক এই সময়ে টেলিফোনে সাহায্য চাইতে হবে হাসপাতালে যাওয়ার । উল্লেখ্য বিশ্বের যত মানুষ মারা যান, তাঁদের সবচেয়ে বড় অংশের মৃত্যুর কারণ হৃদরোগ ও মস্কিষ্কে রক্তক্ষরণ । বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, দেশে প্রতি পাঁচজন নারীর মধ্যে একজন স্ট্রোকের ঝুঁকিতে রয়েছেন । আর স্ট্রোকে মারা যাওয়ার প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৬ জনই নারী জন্ম নিয়ন্ত্রণ পিল গ্রহণ, প্রসবকালীন জটিলতা, (্এক্লাম্পশিয়া) হরমন প্রতিস্থাপনসহ নানা কারণে নারীরা স্ট্রোকের ঝুঁকিতে রয়েছেন।

বিশ্ব স্ট্রোক সংস্থা জানায়, নারী পুরুষ সবার ডায়াবেটিস হলেও প্রেগনেন্সি ডায়াবেটিস প্রসবকালীন জটিলতা এক্লাম্পাশিয়া জন্ম নিরোধ বড়ি সেবন, হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি বা হাড় ক্ষয় রোগের কারণে নারীদের স্ট্রোকের ঝুঁকি বেশি হয় । সংস্থাটি আরো বলেছে অনেক সময় নীরবে অনেক নারী স্ট্রোকের স্বীকার হলেও চিকিৎসার সুযোগ হয় না বলেই পরে তারা ঝুঁকিতে পড়েন । সংস্থার জরিপে জানা গেছে, বিশ্বে প্রতি ছয় সেকেন্ড একজন মানুষ স্ট্রোক বা মস্কিষ্কে রক্তক্ষরণ জনিত কারণে মরা যান । বছরে প্রায় ৬০ লক্ষ মানুষ স্ট্রোকে মারা যাচ্ছে এবং এই সংখ্যা এইডস, যক্ষ্মা এবং ম্যালেরিয়া রোগে সাম্মিলিতভাবে মৃত্যুর চেয়েও বেশি । বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্ট্রোকের প্রধান কারণ হাইপার টেনশন । এছাড়া ধুমপান মাদক সেবন, ডায়াবেটিস, স্ট্রোকের পারিবারিক ইতিহাস, হৃদরোগ রক্তে বেশি মাত্রায় চবি অতিরিক্ত মোটা হওয়া, অতিরিক্ত কোমল পানীয় পান এই ধরণের আশংকা বাড়িয়ে দিতে পারে । এমনকি সাদা পাতা গুল কিংবা জর্দা খেলে স্ট্রোকের ঝুঁকি বেড়ে যায় ।

স্ট্রোক কেন হয়?
অনেক কারণেই স্ট্রোক হতে পারে । যেমন-
১। অতিরিক্ত টেনশন, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, রক্তে বেশিমাত্রায় চর্বি ।
২। অলস জীবন যাপন করা, ’’লতা বা অতিরিক্ত মোটা হওয়া, অতিরিক্ত মাত্রায় কোমল পানীয় গ্রহণ ।
৩। অনিয়তিন্ত্রক উচ্চ রক্তচাপ স্ট্রোকের সবচেয়ে বড় কারণ ।
৪। নারীদের ঝুঁকির প্রধান কারণ হলো উচ্চরক্তচাপ অনিয়মিত হৃৎস্পন্দন,¯ূ’’লতা, ডায়াবেটিস ও বিষন্নতা, জন্মনিয়ন্ত্রন বড়ি সেবন নারীদের মধ্যে স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায় ।
৫। ধুমপান, মাদক সেবন হৃদরোগ ডাবাবেটিস স্ট্রোকের পারিবারিক ইতিহাস রক্তে বেশি মাত্রায় চর্বি অতিরিক্ত মোটা হওয়া ।
৬। অনেক সময় বংশনুক্রমে কিংবা পূর্বের স্ট্রোক হার্ট এ্যাটাক ও দুরবর্তী রক্তনালী বন্ধ হওয়ার কারণেও স্ট্রোক হতে পারে ।
৭। কিছু কিছু ওষুধ যা রক্ত জমাট বাধার ক্ষমতা কমিয়ে দেয় যেমন অ্যাসপিরিন, ক্লপিডগ্রেল প্রভৃতি ব্যবহারে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হতে পার ।
৮। যে কোনো ধরণের প্রদা অথবা ইনজেকশন ও জন্মগতভাবে ব্রেনে কিংবা মস্তিষ্কে রক্তনালী থাকা।
৯। ঘুমের সময় নাক ডাকা ও শ্বাসকষ্টজনিত উপসর্গ ।
১০। স্ট্রোকের প্রধান কারণ হাইপার টেনশন ।

স্ট্রোকের লক্ষণ
ক্স স্ট্রোক রোগের লক্ষণসমূহ হচ্ছে ।
ক্স স্ট্রোকের মারাত্ক উপসর্গ হচ্ছে অজ্ঞান হওয়া, চিখুনি, তীব্র মাথা ব্যথা ও বমি ।
ক্স এক চোখ বা দুই চোখেই ক্ষনস্থায়ী ঝাপসা দেখা বা একে বারেই না দেখা ।
ক্স পা দুইটিতে দুর্বল বোধ করা ।
ক্স শরীরের কোথাও বা একাংশ অবশভাব লাগা কিংবা দুর্বলবোধ করা । মাথা ঝিমঝিম করা মাথা ঘোড়া দৃষ্টি ঘোলা লাগা, হঠাৎ করে কিছুক্ষণের জন্য হত বিহবল হয়ে পড়া বমি বমি বোধ অথবা বমি করা । অতিরিক্ত মাত্রায় কোমল পানীয় পান এই ধরণের আশংকা বাড়িয়ে দিতে পারে ।
ক্স কথা বলার সমস্যা অর্থাৎ কিছুক্ষণের জন্য কথা জড়িয়ে যাওয়া অস্পষ্ট হওয়া ও একেবারে কথা বলতে বা বুঝতে না পারা ।

যে ভাবে প্রতিরোধ সম্ভব ঃ স্ট্রোক ব্রেন বা মস্কিষ্কের কঠিন রোগ । এই রোগ মস্কিষ্কের রক্তনালী থেকে উদ্ভুব হয়। স্ট্রোক হলে অনেক সময় রোগী পক্ষাঘাত গ্রস্তহয়ে পড়তে পারে । এ জন্য সুনির্দিষ্ট ও জরুরী চিকিৎসা প্রয়োজন। “স্ট্রোক প্রতিরোধযোগ্য রোগ । গ্রামাঞ্চলে কিংবা শহরের যে কোনা হাসপাতালে এ রোগের চিকিৎসা সম্ভব ।নিয়মিত ব্যায়াত করতে হবে । বাড়তি ওজন কমাতে হবে । ধুমপান, মধ্যপান, মাদক দ্রব্য, সাদাপাতা ও জর্দা খাওয়া, গুল লাগানো থেকে বিরত থাকতে হবে। শাকসবজি অল্পভাত, পাঙ্গাশ, চিংড়ি, কাকড়া বাদে যে কোনো মাছ, বাচ্চা মুরগি ও ডিমের সাদা অংশ খেলে কোন ক্ষতি হয় না । চর্বি ও শর্করাযুক্ত খাবার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে । ফাস্টফুড, বাদাম, সন্দেশ, রসগোল্লা, দুধ-ঘি, পোলাও, বিরিয়ানি, গরু বা খাসির মাংস নারকেল বা নারকেল যুক্ত খাবার ডিমের কুসুম ইত্যা খাওয়া যাবে না। হৃৎপিন্ডের রোগের চিকিৎসা, রক্তের চর্বি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে ।

নিয়মিত ওষুধ সেবনের মাধমে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ রাখতে হবে । স্ট্রোক অবশ্যই একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ, একবার আক্রান্ত হয়ে গেলে চিকিৎসা অত্যান্ত জটিল, ব্যয়বহুল এবং কষ্টসাধ্য । কেউ এই ধরণের অসুস্থতার শিকার হতে পারেন? স্ট্রোক কেবল ব্যক্তিগত, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সমস্যা নয় । এটি সামাজিক সমস্যাও বটে । কেননা এটার সঙ্গে বেশিরভাগ মাুনষ হারাচ্ছেন তাদের কর্মক্ষমতা ।

স্টোকের রোগীদের চিকিৎসার জাতীয় পর্যায়ে কোনো গাইড লাইন নেই । স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে এ ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নেয়া হয় নি। স্ট্রোকে আক্রান্ত রোগীদের শুরুতে যে ম্যানেজমেন্ট্রে প্রয়োজন তা ঢাকার বাইরে সরকারি হাসপাতালে সিংহভাগ ডাক্তারই জানেন না। ভুল চিকৎসার শিকার হয়ে মৃত্যুই তাদের একমাত্র পথ । গাইড লাইন অনুযায়ী শুরুতে স্ট্রোকের রোগীর সঠিক ম্যানেজমেন্ট করা হলে গ্রামাঞ্চলে আক্রান্ত ৮০ থেকে ৯০ ভাগ রোগী ঢাকার আনার প্রয়োজন নেই বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা।
আমাদের দেশে প্রচলিত একটি ধারণা আছে যে স্ট্রোক একটি “হৃৎপিন্ডের রোগ” বাস্তবে এটি মোটেই সত্য নয়। স্ট্রোকে আক্রান্তের মধ্যে ৪০ ভাগ মারা যায়, আর ৩০ভাগ পক্ষাঘাতগ্রস্থ হয়ে পড়েন। তারা বেঁচে থেকেও দুধিসহ জীবন যাপন করেন। বছরে আক্রান্ত হচ্ছে ৬ কোটি এবং মারা যাচ্ছে ২ কোটি মানুষ। স্ট্রোকের কারণে দেড়কোটি লোক পঙ্গু হচ্ছে। মস্কিষ্কে রক্ত ক্ষরণ বা স্ট্রোক যেমন ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক সমস্যা, একই সঙ্গে অনেক মানষ হারাচ্ছে তাদের কর্মক্ষমতা, হচ্ছে প্রচার অর্থ ব্যয়। সুতরাং স্ট্রোক জাতীয় ও বিশ্বজনীন সমস্যা। প্রতি৬ জনে ১ জনের স্ট্রোকে আক্রান্ত ২ বার ঝুঁকি থাকে।

সাধারণত পঞ্চাশোর্ধ ব্যক্তিদের মধ্যে স্ট্রোকে আক্রান্তের হার বেশি লক্ষ্য করা গেলেও যেকোনো বয়সেই তা হতে পারে। ৫০ বছর বয়সের পর প্রতি ১০ বছরে স্ট্রোকের ঝুঁকি দ্বিগুণ হয়। আক্রান্তের মধ্যে পুরুষের সংখ্যই বেশি। মহিলাদের মধ্যে স্ট্রোকে আক্রান্তের হার কম। স্ট্রোকে আক্রান্তের হার দিন দিন বেড়েই চলছে। ফাস্টফুডে আসক্তদের মধ্যে স্ট্রোকে আক্রান্ত হবার আশঙ্কা বেশি। শিশু ও তরুনদের অনেকে খাদ্যাভাসের কারণে স্ট্রোক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারেন। অনেক ক্ষেত্রে সচেতনতার অভাবেই একই রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে আমাদের দেশে এখন ১৫ থেকে ২০ লাখ স্ট্রোকের রোগী রয়েছে। প্রতি হাজারে গড়ে ৩ থেকে ৫ জন স্ট্রোকে আক্রান্ত হচ্ছেন।

লেখকঃ সাবেক জাতীয় ক্রীড়াবিদ,সভাপতি শারীরিক শিক্ষাবিদ সমিতি
চেয়ারম্যান গ্রিন ক্লাব,শিক্ষক,গবেষক,সাংবাদিক ও কলামিস্ট