বনী ঈসরাইলের কিতাবধারী রাসূল হযরত ঈসা (আ.)

 

মো.আলতাফ হোসেন ঃঃ
হযরত ঈসা (আ.) ছিলেন বনী ঈসরাইল বংশের সর্বশেষ নবী ও কিতাবধারী রাসূল। তিনি ‘ইনজীল’ প্রাপ্ত হয়েছিলেন। তাঁরপর থেকে শেষ নবী মুহাম্মাদ (সা.)-এর আবির্ভাব পর্যন্ত আর কোনো নবী আগমন করেননি। এই সময়টাকে‘রাসূল আগমনের বিরতিকাল’ বলা হয়। কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার অব্যবহিত কাল পূর্বে হযরত ঈসা (আ.) আল্লাহর হুকুমে পুণরায় পৃথিবীতে অবতরণ করবেন এবং মুহাম্মাদী শরী‘য়াত অনুসরণে ইমাম মাহদীর নেতৃত্বে সারা পৃথিবীতে শান্তির রাজ্য কায়েম করবেন। তিনি উম্মতে মুহাম্মাদীর সাথে বিশ্ব সংস্কারে ব্রতী হবেন। তাই তাঁর সম্পর্কে সঠিক ও বিস্তৃত ধারণা দেওয়া অত্যন্ত জরুরি বিবেচনা করে আল্লাহ পাক শেষনবী মুহাম্মাদ (সা.)-এর মাধ্যমে বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দিয়েছেন। উল্লেখ্য যে, হযরত ঈসা (আ.) সম্পর্কে পবিত্র কোরআনের মোট ১৫টি সূরায় ৯৮টি আয়াতে বর্ণিত হয়েছে।
হযরত ঈসা (আ.) বায়তুল মুকাদ্দাসের সন্নিকটে বায়তে লাহমে জন্মগ্রহণ করেন। বনী ঈসরাঈলের ওপর তাঁকে প্রেরণ করা হয়েছিলো। পবিত্র কোরআনে হযরত ঈসা (আ.) এর নাম সম্মানের সাথে বহুবার উচ্চারিত হয়েছে। যে নামে তাঁকে অভিহিত করা হয়েছে পবিত্র কোরআনে,তা থেকে তাঁর ফযীলত সুস্পষ্টভাবেই প্রতিফলিত হয়। যেমন কোরআনে তাঁকে অভিহিত করা হয়েছে আব্দুল্লাহ বা আল্লাহর বান্দা বলে,কালেমাতুল্লাহ বা আল্লাহর বাণী বা শব্দ বলে এবং ঈসা মাসীহ ইত্যাদি বলে। ঈসা ইবনে মারিয়াম যিনি খ্রিস্টধর্মের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ বাইবেলের নূতন নিয়মে যিশু নামে পরিচিত,ইসলাম ধর্মে একজন গুরুত্বপূর্ণ নবী ও রাসূল (আল্লাহ বা একেশ্বরের বার্তাবাহক ও প্রচারক) হিসেবে স্বীকৃত।

আল কোরআনে অন্যান্য নবী আলাইহিস সালামদের মতো ঈসা (আ.) কেও “আল্লাহ্র(একেশ্বরের) বাণী”,”আল্লাহ্র ভৃত্য”,”আল্লাহ্র বার্তাবাহক”, ইত্যাদি নামে ডাকা হয়েছে। কিন্তু যে কারণে ঈসা (আ.) ব্যতিক্রম, তা হলো তার অলৌকিক জন্মগ্রহণ। কোরআনে ঈসা (আ.)এর জন্মকে ইতিহাসের প্রথম মানব আদমের সৃষ্টি প্রক্রিয়ার সাথে তুলনা করা হয়েছে। বলা হয়েছে ঈসা (আ.) এর প্রতিকৃতি ছিলো আদম (আ.) প্রতিকৃতির মতো। আদম (আ.) এর মতোই ঈসাও আল্লাহর “হও” আরবিতে “কুন” আদেশে জন্মগ্রহণ করেন। তবে ইসলামে বর্ণিত ঈসা (আ.) এর জন্মকাহিনী খ্রিস্টধর্মে বর্ণিত যিশুর জন্মকাহিনী থেকে ভিন্ন। কোরআনের ভাষ্য অনুযায়ী মরিয়ম(আ.)। বিবি মরিয়াম মরুভূমিতে গিয়ে একটি পামবৃক্ষের ছয়ায় অনেক কষ্টস্বীকার করে ঈসা (আ.) এর জন্ম দেন।

কোরআনুল কারিমে হযরত ঈসা (আ.)এর নাম বিভিন্ন প্রসঙ্গে ২৫ বার উল্লেখ হয়েছে। হযরত মরিয়ম (আ.)এর নামে কোরআনুল কারিমে একটি স্বতন্ত্র সূরাও রয়েছে এবং মরিয়ম শব্দটি কোরআন কারিমে নানানভাবে ৩৫ বার উল্লিখিত হয়েছে। হজরত ঈসা (আ.)এর সৃষ্টি হযরত আদম (আ.)এর মতো।‘আল্লাহর নিকট নিশ্চয়ই ঈসা(আ.)এর দৃষ্টান্ত আদম (আ.)এর দৃষ্টান্তসদৃশ। তিনি তাকে মৃত্তিকা হতে সৃষ্টি করেছিলেন; অতঃপর তাকে বলেছিলেন “হও”,ফলে সে হয়ে গেলো।’ (সূরা-৩, আল ইমরান, আয়াত: ৫৯)।

কোরআনে ঈসা(আ.)জন্মকে অলৌকিক বলা হলেও তার দেবত্ব বা “ঈশ্বরের পুত্রসন্তান” জাতীয় বৈশিষ্ট্য সম্পূণরূপে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। ইসলামে একেশ্বর আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কাউকে উপাস্য মনে করা একটি গুরুতর পাপ,যার নাম “র্শিক”(“ঈশ্বরের অংশীদারিত্ব” পাপ)। যদিও খ্রিস্টানদের ধর্মগ্রন্থ বাইবেলে ঈশ্বরের তিন রূপের কথা বলা নেই (পিতা,পুত্র ও পবিত্র আত্মা),তা সত্ত্বেও খ্রিস্টধর্মের একটি অন্যতম বিশ্বাস ঈশ্বরের ত্রিত্ববাদকে কোরআনে কঠোর ভাষায় “ঈশ্বরনিন্দা” হিসেবে তিরস্কার করা হয়েছে। ঈসাকে প্রায়শই আল কোরআনে মরিয়মের পুত্র হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে এবং এর মাধ্যমে ঈসার মানবত্বকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ঈসার বংশপরিচয় তার মা মরিয়মের মাধ্যমে ঈসরায়েলি গোত্রের ইব্রাহিমের পুত্র ইসহাকের সাথে সম্পর্কিত করা হয়েছে।

ঈসা (আ.)-এর আলোচনা করতে গেলে তাঁর মা ও নানীর আলোচনা আগেই করে নিতে হয়। কারণ তাঁদের ঘটনাবলীর সাথে ঈসার জীবনের গভীর যোগসূত্র রয়েছে। পূর্ববর্তী পয়গম্বরগণের শরী‘য়াতে প্রচলিত ইবাদত-পদ্ধতির মধ্যে আল্লাহর নামে সস্তান উৎসর্গ করার রেওয়াজও চালু ছিলো। এসব উৎসর্গীত সন্তানদের পার্থিব কোনো কাজকর্মে নিযুক্ত করা হতো না। এ পদ্ধতি অনুযায়ী ঈসার নানী অর্থাৎ ইমরানের স্ত্রী নিজের গর্ভস্থ সন্তান সম্পর্কে মানত করলেন যে,তাকে বিশেষভাবে আল্লাহর ঘর বায়তুল মুক্বাদ্দাসের খিদমতে নিয়োজিত করা হবে। তিনি ভেবেছিলেন যে পুত্র সন্তান হবে। কিন্তু যখন তিনি কন্যা সন্তান প্রসব করলেন,তখন আক্ষেপ করে বললেন, ‘হে আল্লাহ! আমি কন্যা প্রসব করেছি’? (আলে ইমরান ৩৬)। অর্থাৎ একে দিয়ে তো আমার মানত পূর্ণ হবে না কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছা ছিলো অন্যরূপ। তিনি উক্ত কন্যাকেই কবুল করে নেন। বস্তুতঃ ইনিই ছিলেন মারিয়াম বিনতে ইমরান, যিনি ঈসা (আ.)-এর কুমারী মাতা ছিলেন। নবী করিম (সা.)মারিয়ামকে জান্নাতের শ্রেষ্ঠ চারজন মহিলার অন্যতম হিসাবে বর্ণনা করেছেন। যেমন তিনি বলেন, ‘জান্নাতবাসী মহিলাগণের মধ্যে সেরা হলেন চারজন: খাদীজা বিনতে খুওয়ালিদ, ফাতেমা বিনতে মুহাম্মাদ, মারিয়াম বিনতে ইমরান এবং আসিয়া বিনতে মুযাহিম, যিনি ফেরাঊনের স্ত্রী’। মারিয়াম ছিলেন বিশ্ব নারী সমাজের শীর্ষস্থানীয়া এবং আল্লাহর মনোনীত ও পবিত্র ব্যক্তিত্ব (আলে ইমরান ৩/৪২)। তিনি ছিলেন সর্বদা আল্লাহর উপাসনায় রত,বিনয়ী, রুকু কারিনী ও সিজদাকারিনী (ঐ,৩/৪৩)। তিনি ছিলেন সতীসাধ্বী এবং আল্লাহর আদেশ ও বাণী সমূহের বাস্তবায়নকারিনী (তাহরীম ৬৬/১২)। আল্লাহ নিজেই তার নাম রাখেন ‘মারিয়াম’(আলে ইমরান ৩/৩৬)। অতএব তিনি ছিলেন অতীব সৌভাগ্যবতী।

হযরত ঈসা (আ.)আসমানে অবস্থান করছেন সশরীরে। তিনি মৃত্যু বরণ করেননি। তিনি কিয়ামতের পূর্বে রাসূল (সা.)এর উম্মতী হিসেবে উম্মতী মুহাম্মদীর ধর্ম ইসলাম প্রচারের মানসে পৃথিবীতে আবার আগমন করবেন। তিনি যেহেতু মারাই যাননি তাই রূপক ঈসার কোন প্রয়োজনই। বরং স্বয়ং ঈসা (আ.) ই আসবেন। যেমনটি সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। হযরত আবু হুরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল(সা.)এরশাদ করেছেন-ঐ সত্বার কসম! যার হাতে আমার প্রাণ!অচিরেই ঈসা(আ.) ইনসাফগার শাসক হিসেবে অবতরণ করবেন। অতঃপর তিনি ক্রুশ চিহ্নকে ভেঙ্গে ফেলবেন। শুকরকে বিনাশ করবেন। আর জিযিয়াকে রহিত করবেন। তখন সম্পদের এমন প্রবাহ ঘটবে যে, কেউ তা গ্রহণ করার মতো থাকবে না। (সহীহ বুখারী, হাদীস নং-২১০৯, সহীহ মুসলিম,হাদীস নং-৪০৬,সুনানে তিরমিজী,হাদীস নং-২২৩৩,মুসনাদুশ শামীন, হাদীস নং-১১৩) আল মুজামুল আওসাতের এক দীর্ঘ হাদীসের একাংশে এসেছে- তারপর ঈসা (আ.)আসবেন মুহাম্মদ (সা.) কে সত্যায়নকারী হিসেবে তার উম্মত হয়ে। (আল মুজামুল আওসাত,হাদীস নং-৪৫৮০) অন্য হাদিসে এসেছে- হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত।রাসূল(সা.) এরশাদ করেন-ঈসা বিন মরিয়ম অবতরণ করে ৪০ বছর মানুষের মাঝে অবস্থান করবেন। (আল মুজামূল আওসাত, হাদীস নং-৫৪৬)

হযরত ঈসা (আ.) এর ক্রুশবিদ্ধকরণের ব্যাপারেও কোরআনের বর্ণনা বাইবেল থেকে ভিন্ন। কোরআন অনুযায়ী যিশুকে ক্রুশবিদ্ধ করে হত্যা করা হয়নি,যদিও আপাতদৃষ্টিতে এরকম মনে করানো হযেছিলো। বলা হয় যে,ক্রুশবিদ্ধ করার জন্য যখন বাহক তাকে নিতে ঘরে প্রবেশ করে তখনই আল্লাহ তাকে উপরে তুলে নেন এবং বাহকের চেহারাকে ঈসা-এর চেহারার অনুরুপ করে দেন। ফলে ঈসা মনে করে ঐ বাহককে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়। প্রকৃতপক্ষে মারা যাওয়ার আগেই আল্লাহ ঈসাকে তাঁর দিকে আসমানে তুলে নেন অর্থাৎ তিনি আসমানে আরোহণ করেন। যদিও এটি একটি মতবাদ কেবল। এর স্বপক্ষে কোনো আয়াত বা হাদিস নেই। তবে এই ব্যপারে সুনিশ্চিতভাবে বলা হয়েছে যে তাঁকে হত্যা করা হয় নি। ঈসা আকাশে জীবিত অবস্থায় বিরাজ করছেন এবং শেষ বিচারের দিনের আগে তিনি আবির্ভূত হবেন।তিনি আসবেন শেষ জামানায় দাজ্জালকে ধ্বংস করতে।

হযরত ঈসা (আ.)এর জন্ম যেমন বিস্ময়কর,তাঁর পুনরাবির্ভাবও হবে বিস্ময়করভাবে। তাঁর সম্পর্কে কোরআন মাজিদে আছে, ‘আর“আমরা আল্লাহর রাসূল মারইয়াম তনয় ঈসা মাসিহকে হত্যা করেছি”তাদের এই উক্তির জন্য (তাদের এই পরিণতি)।অথচ তারা তাকে হত্যা করেনি, ক্রুশবিদ্ধও করেনি; কিন্তু তাদের এইরূপ বিভ্রম হয়েছিলো। যারা তার সম্বন্ধে মতভেদ করেছিলো,তারা নিশ্চয় এই সম্বন্ধে সংশয়যুক্ত ছিলো; এই সম্পর্কে অনুমানের অনুসরণ ব্যতীত তাদের কোনো জ্ঞানই ছিলো না। ইহা নিশ্চিত যে তারা তাকে হত্যা করেনি,বরং আল্লাহ তাকে তাঁর নিকট তুলে নিয়েছেন এবং আল্লাহ পরাক্রমশালী,প্রজ্ঞাময়।’ (সূরা-নিসা, আয়াত: ১৫৭-১৫৮)। হাদিসমতে,ঈসা (আ.) চতুর্থ আসমানে রয়েছেন। কিয়ামতের পূর্বে তিনি দুনিয়ায় আসবেন হযরত মুহাম্মাদ (স.)এর উম্মত হয়ে; অতঃপর তিনি স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করবেন।

বিবি মরিয়ম নাছেরা নামক একটি শহরের অধিবাসিনী ছিলেন। নাছেরা শহরটি বাইতুল মুকাদ্দাসের অদূরেই অবস্থিত ছিল। বিবি মরিয়ম পিতা মাতার মানত পূর্ণ করার জন্য বাইতুল মুকাদ্দাসের খেদমতে নিযুক্ত ছিলেন। তিনি বাল্যকাল থেকেই অতিশয় সুশীলা এবং ধর্মানুরাগিণী ছিলেন। তাঁর পিতার নাম ছিলো ইমরান এবং নবী জাকারিয়া (আ.)-এর শ্যালিকা বিবি হান্না তার জননী ছিলেন। একদিন বিবি মরিয়ম নামাজ পড়ছিলেন,হঠাৎ ফেরেশতা জিব্রাঈল অবতীর্ণ হলেন। তিনি বললেন,তোমার প্রতি সালাম,তুমি আল্লাহর অনুগ্রহপ্রাপ্তা।আল্লাহ তোমার সাথে রয়েছেন।বিবি মরিয়ম এই অপ্রত্যাশিতপূর্ব সম্বোধনে ভীতচকিতা হলেন।ভাবতে লাগলেন-কে এলো,কিসের সালাম। হযরত জিব্রাঈল (আ.) বললেন-আমি আল্লাহর ফেরেশতা জিব্রাঈল। তুমি ভীত হইও না; তুমি পবিত্র সন্তান লাভ করবে,এই সুসংবাদ তোমাকে দিতে এসেছি। বালিকা ভীত হলেন এবং বললেন-তা কেমন করে হবে? আমি যে কুমারী। আমি স্বামীর সঙ্গ লাভ করিনি। ফেরেশতা বললেন,‘আল্লাহর কুদরতেই হবে এটি। তাঁর কাছে এটি কঠিন কাজ নয়।’ এই বলে ফেরেশতা অন্তর্হিত হলেন। ছয় মাস পূর্বে হযরত জাকারিয়া (আ.)-এর স্ত্রী গর্ভবতী হয়েছেন-এখন আবার কুমারী মরিয়ম আল্লাহর কুদরতে গর্ভবতী হলেন। বিবি মরিয়ম যদিও আল্লাহর কুদরতে সন্তান সম্ভবা হলেন,কিন্তু দেশের লোকেরা তা মেনে নেবে কেনো? কুমারী নারীর এভাবে গর্ভবতী হওয়ার ফলে সবাই তাকে বাইতুল মুকাদ্দাস থেকে বের করে দিলেন-এমন কি তাকে স্বগ্রামও ছেড়ে যেতে হলো।সঙ্গী সহায়হীন অবস্থায় গর্ভবতী মরিয়ম একটি নির্জন প্রান্তরে সন্তান প্রসব করলেন।

হযরত ঈসা (আ.)১২ বছর বয়সে বড় বড় জ্ঞানী এবং পন্ডিতবর্গের সাথে ধর্ম বিষয়ে আলোচনা করতেন। তাঁর বাকপটুতা এবং তত্ত্বজ্ঞান শুনে পন্ডিতরা অবাক হয়ে যেতেন। ক্রমান্বয়ে হযরত ঈসা আধ্যাত্মিক জ্ঞানের পূর্ণতা লাভ করতে লাগলেন। ত্রিশ বছর বয়সে তিনি আল্লাহর কাছ থেকে ‘ওহি’ লাভ করেন এবং নবীরূপে ধর্মপ্রচার করতে শুরু করলেন। হযরত ইয়াহহিয়া বিবি মরিয়মের খালাতো ভাই হতেন। তিনি ইয়ারদন নদীর তীরে লোকদের ধর্মোপদেশ দান করতেন। হযরত ঈসা (আ.) সেখানে গিয়ে ওয়াজ করতে শুরু করেন।-ওহি আসা শুরু করার পর থেকে ইনজিল কিতাব অবতীর্ণ হতে থাকে। তিনি তাঁর নবুয়তের প্রমাণস্বরূপ বহু অলৌকিক কার্যাবলি দেখাতে শুরু করেন। মাটি দিয়ে পাখি তৈরি করে উড়িয়ে দেয়া,অন্ধকে দৃষ্টিদান, বোবাকে বাকশক্তি দান,কুষ্ঠকে আরোগ্য করা, পানির উপরে হাঁটা ইত্যাদি তার মোজেজা ছিলো।তাঁর আধ্যাত্মিক শক্তির বলে বহু রোগী আরোগ্য লাভ করে। বহু লোক ধর্মজ্ঞান লাভ করে।সর্বপ্রথমে যারা হযরত ঈসা (আ.)-এর ওপর ঈমান এনেছিলেন,সাথে থেকে সাহায্য করেছিলেন তাদের ‘হাওয়ারি’ বলা হতো। তাঁরা সর্বদা হযরত ঈসা (আ.)-এর সাথে থাকতেন। হযরত ঈসা (আ.) যখন নবী হন, সেকালে ইয়াহুদি ধর্মগুরুরা অতিশয় শিথিল হয়ে পড়েছিলেন। তাদের মধ্যে প্রকৃত ধর্মানুভূতির পরিবর্তে ভন্ডামি প্রবেশ করেছিলো। তাদের মধ্যে কেবল ধর্মের বাহ্যিক আবরণ ছিলো। হযরত ঈসা (আ.) এর ঘোর বিরোধী ছিলেন। তিনি তাঁর ওয়াজ বক্তৃতায় ইয়াহুদি ধর্মগুরুদের কঠোর সমালোচনা করতেন। এতে সেই সকল বাহ্যাবরণ বিশিষ্ট ইয়াহুদি ধর্মপ্রচারকরা হযরত ঈসা (আ.)-এর ঘোর শত্রুতে পরিণত হন কিন্তু হযরত ঈসা (আ.)-এর বাণী ছিলো আল্লাহর বাণী। তা এমনই হৃদয়গ্রাহী হতো যে,যে শুনত তার হৃদয়ই তাতে আকৃষ্ট হতো। বিদ্বেষপরায়ণ ইয়াহুদি পুরোহিতরা কোনো কথায়ই হযরত ঈসা (আ.) কে ধরতে পারতেন না। তারা হযরত ঈসা (আ.)-কে নানা ছুতানাতায় দোষী সাব্যস্ত করার চেষ্টায় লিপ্ত হলেন।
দুনিয়াবী সংঘাতে দুনিয়াদারদের পার্থিব বিজয় হ’লেও চূড়ান্ত বিচারে তাদের পরাজয় হয় এবং তারা ইতিহাসে সর্বাধিক নিন্দিত ব্যক্তিতে পরিণত হয়। পক্ষান্তরে নবী ও সমাজ সংস্কারকগণ নির্যাতিত হলেও চূড়ান্ত বিচারে তারাই বিজয়ী হন এবং সারা বিশ্ব তাদেরই ভক্ত ও অনুসারী হয়। ঈসা (আ.)-এর জীবন তারই অন্যতম প্রকৃষ্ট প্রমাণ।

ইহুদীদের বিপক্ষে হযরত ঈসা (আ.)-কে সাহায্যের ব্যাপারে আল্লাহ পাঁচটি ওয়াদা করেছিলেন এবং সবক’টিই তিনি পূর্ণ করেন। (১) হত্যার মাধ্যমে নয় বরং তার স্বাভাবিক মৃত্যু হবে (২) তাঁকে ঊর্ধ্বজগতে তুলে নেওয়া হবে (৩) তাকে শত্রুদের অপবাদ থেকে মুক্ত করা হবে (৪) অবিশ্বাসীদের বিপক্ষে ঈসার অনুসারীদেরকে ক্বিয়ামত অবধি বিজয়ী রাখা হবে এবং (৫) কিয়ামতের দিন সবকিছুর চূড়ান্ত ফায়ছালা করা হবে। এ বিষয়গুলি বর্ণিত হয়েছে নিম্নোক্ত আয়াতে। যেমন আল্লাহ বলেন,‘‘আর স্মরণ কর যখন আল্লাহ বললেন, হে ঈসা! আমি তোমাকে ওফাত দিব এবং তোমাকে আমার কাছে তুলে নেবো এবং তোমাকে কাফিরদের হাত থেকে মুক্ত করবো। আর যারা তোমার অনুসরণ করবে,তাদেরকে ক্বিয়ামত পর্যন্ত কাফিরদের বিরুদ্ধে বিজয়ী করে রাখবো। অতঃপর তোমাদের সবাইকে আমার কাছে ফিরে আসতে হবে, তখন আমি তোমাদের মধ্যকার বিবাদীয় বিষয়ে ফায়ছালা করে দেব’’ (আলে ইমরান, আয়াত ৫৫)। উক্ত আয়াতে বর্ণিত অর্থ ‘আমি তোমাকে ওফাত দিবো’। ‘ওফাত’ অর্থ পুরোপুরি নেওয়া। মৃত্যুকালে মানুষের আয়ু পূর্ণ হয় বলে একে ‘ওফাত’ বলা হয়। রূপক অর্থে নিদ্রা যাওয়াকেও ওফাত বা মৃত্যু বলা হয়। যেমন আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ মানুষের প্রাণ নিয়ে নেন তার মৃত্যুকালে, আর যে মরেনা তার নিদ্রাকালে’ (যুমার,আয়াত-৪২)।সেকারণ যাহহাক, ফাররা প্রমুখ বিদ্বানগণ অর্থ বলেন,আমি আপনাকে নিজের কাছে উঠিয়ে নেব এবং শেষ যামানায় (পৃথিবীতে নামিয়ে দিয়ে) স্বাভাবিক মৃত্যু দান করব। এখানে বর্ণনার আগপিছ হয়েছে মাত্র’ (কুরতুবী, ইবনু কাছীর)। যা কোরআনের বহু স্থানে হয়েছে। ঈসার অবতরণ, দাজ্জাল নিধন,পৃথিবীতে শান্তির রাজ্য স্থাপন ইত্যাদি বিষয়ে ছহীহ ও মুতাওয়াতির হাদীছ সমূহ বর্ণিত হয়েছে। প্রায় সকল বড় বড় নবীই হিজরত করেছেন। এক্ষণে পৃথিবী থেকে আসমানে উঠিয়ে নেওয়া, অতঃপর পুনরায় পৃথিবীতে ফিরিয়ে দিয়ে স্বাভাবিক মৃত্যু দান করা- এটা ঈসা (আ.)-এর জন্য এক ধরনের হিজরত বৈ কি! পার্থক্য এই যে, অন্যান্য নবীগণ দুনিয়াতেই এক স্থান থেকে অন্যস্থানে হিজরত করেছেন। পক্ষান্তরে ঈসা (আ.) দুনিয়া থেকে আসমানে হিজরত করেছেন। অতঃপর আসমান থেকে দুনিয়াতে ফিরে আসবেন। আল্লাহ সর্বাধিক অবগত এবং তিনিই সকল ক্ষমতার অধিকারী। অতঃপর ঈসার অনুসারীদের কিয়ামত অবধি বিজয়ী করে রাখার অর্থ ঈমানী বিজয় এবং সেটি ঈসা (আ.)-এর ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী শেষ নবী মুহাম্মাদ (সা.)-এর অনুসারীদের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়েছে। ঈমানী বিজয়ের সাথে সাথে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিজয় যেমন খেলাফত যুগে হয়েছে,ভবিষ্যতে আবারও সেটা হবে। এমনকি কোন বস্তিঘরেও ইসলামের বিজয় নিশান উড়তে বাকী থাকবে না। সবশেষে কিয়ামত প্রাক্কালে ঈসা ও মাহদীর নেতৃত্বে বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক বিজয় সংঘটিত হবে এবং সারা পৃথিবী শান্তির রাজ্যে পরিণত হবে। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই ইসলাম আল্লাহর একমাত্র মনোনীত ধর্ম’। (সূরাঃ আলে ইমরান,আয়াত-১৯) আর ইসলামের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো- ইসলাম বহুধাবিভক্ত ধর্ম-বর্ণ-জাতি-শ্রেণি-পেশার সমন্বয়ে বৃহত্তর রাষ্ট্রগঠনে সক্ষম। ইসলাম আহলে কিতাব ও তাদের নবী-রাসূলদের স্বীকৃতি দেয়।এ ছাড়া যেকোনো অমুসলিমের সঙ্গে একই রাষ্ট্রে বসবাস,পারস্পরিক লেনদেন,গোশত ব্যতীত যেকোনো খাদ্য বিনিময় ও ভক্ষণের অনুমতি দেয়। এমনকি আহলে কিতাবের সঙ্গে শর্ত সাপেক্ষে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন এবং তাদের জবাইকৃত জন্তুর গোশত খাওয়ারও অনুমতি দেয়। ইসলাম মতে, পূর্ববর্তী নবী-রাসূল ও ঐশী গ্রন্থগুলোর ব্যাপারে মৌলিক বিশ্বাস রাখা ইমানের অপরিহার্য শর্ত। প্রত্যেক ধর্মানুরাগী সত্যানুসন্ধানী সৎ ব্যক্তিমাত্রই জানেন যে ঈসা (আ.) একজন প্রবীণ ও মহান ব্যক্তি। বিশেষ করে খ্রিষ্টান ও মুসলিম ধর্ম বিশ্বাসের মধ্যে তিনি সম্মানিত স্থানে অধিষ্ঠিত। তাঁর সম্পর্কে উভয় ধর্ম গ্রন্থ- ইঞ্জিল ও কোরআনে বিভিন্ন সাদৃশমূলক বিষয় বিদ্যমান। খ্রিস্টানদের কাছে তিনি যিশু-খ্রিষ্ট।আর মুসলমানের কাছে তিনি হযরত ঈসা (আ.) হিসেবে গণ্য।

ঈসা (আ.) আল্লাহ তা’য়ালার বান্দা ও তাঁর প্রেরিত রাসূল। আল্লাহ তা’য়ালা আপন শক্তিতে পিতা ছাড়া তাঁকে দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন। আল্লাহ তা’য়ালা এরশাদ করেন-‘যখন ফেরেশতাগণ বললো,হে মারইয়াম! আল্লাহ তোমাকে তাঁর এক বাণীর সুসংবাদ দিচ্ছেন,যার নাম হলো মসীহ-ঈসা ইবনে মারইয়াম; দুনিয়া ও আখিরাতে তিনি মহাসম্মানের অধিকারী এবং আল্লাহর ঘনিষ্ঠদের অন্তর্ভুক্ত হবেন। যখন তিনি মায়ের কোলে থাকবেন এবং পূর্ণ বয়স্ক হবেন, তখন তিনি মানুষের সঙ্গে কথা বলবেন। আর তিনি সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত হবেন। তিনি বললেন,পরওয়ারদেগার! কেমন করে আমার সন্তান হবে; আমাকে তো কোনো পুরুষ-মানুষ স্পর্শ করেনি। বললেন,এভাবেই। আল্লাহ যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন। তিনি যখন কোনো কাজ করার জন্য ইচ্ছা করেন তখন বলেন যে, ‘হয়ে যাও’, অমনি তা হয়ে যায়।'(সুরা আলে ইমরান : ৪৫-৪৭)

পূর্ববর্তী নবী-রাসুলদের প্রতি ইমান আনা ইসলামের মৌলিক আকিদার অন্তর্ভুক্ত। ঈসা (আ.) বনি ইসরাইলের সর্বশেষ নবী ও কিতাবধারী রাসুল। পবিত্র কোরআনের ১৫টি সুরার ৯৮টি আয়াতে ঈসা (আ.)-এর অলৌকিক জন্ম,দাওয়াত,ইহুদিদের ষড়যন্ত্র এবং আসমানে উঠিয়ে নেওয়ার ঘটনা বিস্তারিত বিবৃত হয়েছে। পিতা ইব্রাহিম (আ.)-এর কনিষ্ঠ পুত্র ইসহাক (আ.)-এর বংশের হাযার হাযার নবী-রাসূলের মধ্যে সর্বশেষ নবী ও কিতাবধারী রাসূল ছিলেন হযরত ঈসা (আ.)। তাঁর পূর্বেকার সকল নবী এবং তিনি নিজে শেষ নবী মুহাম্মাদ (সা.) সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করে গেছেন, যিনি ইবরাহীম (আ.)-এর জ্যেষ্ঠ পুত্র ইসমাঈল (আ.)-এর বংশের একমাত্র নবী এবং সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল। ঈসা (আ.) পর্যন্ত সকল নবী ও রাসূল বনু ঈসরাইল তথা স্ব-স্ব গোত্রের প্রতি আগমন করলেও শেষনবী প্রেরিত হয়েছিলেন বিশ্ব মানবতার প্রতি বিশ্বনবী হিসাবে। অতএব ঈসা (আ.)-এর প্রতিশ্রুত শেষনবী ‘আহমাদ’ বা মুহাম্মাদ-এর অনুসারী উম্মতে মুহাম্মাদীই হলো ঈসা (আ.)-এর প্রকৃত অনুসারী ও প্রকৃত উত্তরসুরী। নামধারী খৃষ্টানরা নয়।

মু‘জেযা প্রদর্শনের মাধ্যমে বিরোধী পক্ষকে ভয় দেখানো যায় বা চুপ করানো যায় কিন্তু হেদায়াতের জন্য আল্লাহর রহমত আবশ্যক। যেমন ঈসা (আ.)-কে যে মু‘জেযা দেওয়া হয়েছিলো,সে ধরনের মু‘জেযা অন্য কোন নবীকে দেওয়া হয়নি। এমনকি তাঁর জন্মটাই ছিলো এক জীবন্ত মু‘জেযা কিন্তু তা সত্ত্বেও শত্রুরা হেদায়াত লাভ করেনি। সবকিছু মানবীয় জ্ঞান দ্বারা পরিমাপ করা যায় না। বরং সর্বদা এলাহী সিদ্ধান্তের প্রতি বিশ্বাসী ও আকাংঙ্খী থাকতে হয়। যেমন মারিয়াম ও তৎপুত্র ঈসার জীবনের প্রতিটি ঘটনায় প্রমাণিত হয়েছে। যারা নিঃস্বার্থভাবে সমাজের কাজ করেন ও পরকালীন মঙ্গলের পথ প্রদর্শন করেন, স্বার্থপর ও দুনিয়া পূজারী সমাজ নেতারা তাদের শত্রু হয় এবং পদে পদে বাধা দেয় কিন্তু সাথে সাথে একদল নিঃস্বার্থ সহযোগীও তারা পেয়ে থাকেন। যেমন ঈসা (আ.) পেয়েছিলেন। অন্যান্য নবীদের মতো আল কোরআন এ ঈসা (আ.) কেও “আল্লাহ্র বার্তাবাহক”,নামে ডাকা হয়েছে। অলৌকিক জন্মগ্রহণের কারণে অন্যান্য নবী থেকে ঈসা (আ:) ব্যতিক্রম। ঈসা (আ.) এর জন্মকে কোরআনে ইতিহাসের প্রথম মানব আদমের সৃষ্টি প্রক্রিয়ার সাথে তুলনা করা হয়েছে। বলা হয়েছে ঈসার প্রতিকৃতি আদমের প্রতিকৃতির মতো ছিলো। খ্রিস্টধর্মে বর্ণিত যীশুর জন্ম কাহিনী থেকে ইসলামের বর্ণিত ঈসার জন্ম কাহিনী ভিন্ন। কুরআনের বাণী অনুযায়ী ঈসা (আ.) এর জন্ম দেন বিবি মরিয়াম, মরুভূমিতে একটি বৃক্ষের ছায়ায় অনেক কষ্ট স্বীকার করে। ঈসার ক্রুশবিদ্ধকরণের ব্যাপারে বাইবেল এ যা বর্ণনা করা হয়েছিলো তা কোরআন থেকে ভিন্ন। বাইবেল এ বলা হয়েছিল ঈসা (আ.) ক্রুশবিদ্ধ হয়েছে, কিন্তু কোরআন এ বলা হয় যে, যখন তাকে ক্রুশবিদ্ধ করার জন্যে বাহক ঘরে প্রবেশ করে তখনই আল্লাহ ঈসা (আ.) কে উপরে তুলে নেন এবং আল্লাহর ইচ্ছায় বাহকের চেহারা ঈসা-এর চেহারার অনুরুপ হয়ে যায়। ঈসা কে মহান আল্লাহ মারা যাওয়ার আগেই স্বর্গ বা জান্নাতে তুলে নিয়ে যান অর্থাৎ তিনি আরোহণ করেন স্বর্গে। জীবিত অবস্থায় আকাশে বিরাজ করছেন আল্লাহর নবী ঈসা (আ.) এবং তিনি আবির্ভূত হবেন শেষ বিচারের দিনের আগে।

সাধারণতঃ সকল নবীই ৪০ বছর বয়সে নবুঅত লাভ করেছেন। তবে ঈসা (আঃ) সম্ভবতঃ তার কিছু পূর্বেই নবুয়ত ও কিতাব প্রাপ্ত হন। কেননা বিভিন্ন রেওয়ায়াত দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে যে, আকাশে তুলে নেবার সময় তাঁর বয়স ৩০ থেকে ৩৫-এর মধ্যে ছিলো। তিনি যৌবনে আকাশে উত্তোলিত হয়েছিলেন এবং পৌঢ় বয়সে পুনরায় দুনিয়ায় ফিরে এসে মানুষকে তাওহীদের দাওয়াত দিবেন।

পৃথিবীতে মানুষ সৃষ্টির স্বাভাবিক প্রক্রিয়া থেকে ব্যতিক্রম ছিলেন তিনজন মানুষ। তার মধ্যে হযরত ঈসা (আ.) একজন।পিতা-মাতার মিলনের মাধ্যমে সব মানুষ পৃথিবীতে আসলেও প্রথম মানব হযরত আদম(আ.),মা হাওয়া এবং হযরত ঈসা(আ.) ছিলেন তার ব্যতিক্রম।পবিত্র কোরআনের বর্ননা অনুসারে আদমকে আল্লাহ মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন। মা হাওয়াকে আদমের পাঁজরের হাড় থেকে সৃষ্টি করেছেন মাতা ছাড়া। আর ঈসাকে(আ.) সৃষ্টি করেছেন পিতা ছাড়া। কোরআনে ঈসা (আ.) এর জন্মকে অলৌকিক বলা হলেও তাঁর দেবত্ব বা “ঈশ্বরের পুত্রসন্তান” জাতীয় বৈশিষ্ট্য সম্পূণরূপে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। যদিও খ্রিস্টানদের ধর্মগ্রন্থ বাইবেলে ঈসা (আ.) কে ঈশ্বরের পুত্র সন্তান হিসেবে লেখা হয়েছে কিন্তু ইসলামে আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে স্রষ্টা মনে করা একটি গুরুতর পাপ যার নাম শিরক(আল্লাহর সাথে কাউকে সমতুল্য মনে করা)। ঈসা (আ.) কে আল কুরআনে মরিয়ম এর পুত্র হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। অপখ্রিস্টের” (দাজ্জালের) আবির্ভাব ও এ সংক্রান্ত অভ্যুত্থানে ঈসা (আ.) এর ভূমিকা নিয়ে অনেক হাদিস আছে। কোরআনে বর্ণিত রয়েছে দাজ্জালের আবির্ভাবের পরে নবী মুহাম্মদের একজন উম্মত অনুসারী হিসেবে পৃথিবীতে অবতরণ করবেন ঈসা এবং দাজ্জালকে হত্যা করবেন। তিনি তারপর আরও ৪৫ বছর দুনিয়ায় বেঁচে থাকবেন। তিনি পৃথিবীতে সুশাসন ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করবেন এবং সমস্ত পৃথিবীর শাসনভার গ্রহণ করবেন। সবশেষে মহান আল্লাহর আদেশে তিনি মৃত্যুবরণ করবেন। হযরত মুহাম্মদ (সা.) কবরের পাশে তাকে সমাহিত করা হবে। এই কারণে মদীনায় নবী মুহাম্মদ এর কবরের পাশে তাকে কবর দেয়ার জায়গা প্রস্তুত করে রাখা হয়েছিলো যা এখনো বহাল আছে।

লেখকঃ গবেষক,সাবেক জাতীয় ক্রীড়াবিদ,
চেয়ারম্যান গ্রিন ক্লাব,মানিকগঞ্জ,সাংবাদিক ও কলামিস্ট