বাংলাদেশ এখন বিশ্বের অন্যতম খাদ্যশস্য উৎপাদনকারী দেশ

 

মো. আলতাফ হোসেন ঃঃ
খাদ্য হলো মানুষের প্রথম ও প্রধান মৌলিক অধিকার। এ অধিকার বেঁচে থাকার অধিকার। খাদ্যের অধিকার প্রতিষ্ঠায় পৃথবী আজ পূর্ণমাত্রায় সচেতন। সবার জন্য খাদ্য নিশ্চয়তার জন্য প্রথমেই আসে খাদ্য নিরাপত্তার কথা। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষের প্রথম দায়িত্ব। এজন্য যেমন প্রয়োজন খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা টেকসই রাখা, তেমনি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার পাশাপাশি সেসরকারি সংস্থাগুলোকেও পর্যাপ্ত ভূমিকা পালনে এগিয়ে আসা। উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডের ফলে কৃষি জমি হ্রাস পাচ্ছে। আবার দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি খাদ্য উৎপাদন মাত্রাকে অতিক্রম করে যাচ্ছে। সুতরাং সীমিত জমিতে ফলন বাড়ানো এবং এই ধারা অব্যাহত রাখা যেমন জরুরি, তেমনি জরুরি ফসল উৎপাদন কার্যক্রমে পরিবেশ সংরক্ষণ। খাদ্য নিরাপত্তায় পুষ্টি ঘাটতি পূরণ অন্যতম প্রধান শর্ত। এই শর্ত পূরণে মৎস ও পশু সম্পদ এর প্রতিও যত্নবান থাকা আবশ্যক। এসব বিষয়ের প্রতি চাই মানুষের আন্তরিক সচেতনতা। আর এই গণসচেতনতা সৃষ্টির বিশ^ খাদ্য দিবস পালনের লক্ষ্য। বিশ^ খাদ্য দিবস শুরু হয় ১৯৮১ সনে প্রথম আনুষ্ঠানিকতা আর প্রতিপাদ্য নিয়ে। ১৯৪৫ সনের ১৬ অক্টোবর জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা ঋঅউ (ঋড়ড়ফ ধহফ অমৎরপঁষঃঁৎধষ ঙৎরংধঃরড়হ) প্রতিষ্ঠিত হয়। বিশে^র মানুষের প্রয়োজনীয় খাদ্যের জোগান, দরিদ্র ও পুষ্টিহীনতা দূর করে ক্ষুধামুক্ত পৃথিবী গড়ার অঙ্গীকার নিয়ে ঋঅঙ তাদের কার্যক্রম শুরু করে। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা অধ্যুষিত এ পৃথিবীর প্রায় ৬.৫ বিলিয়ন মানুষের মধ্যে এখন প্রায় ৮৫০ মিলিয়ন মানুষ খাদ্যের অভাবে দরিদ্রের কষাঘাতে ধুঁকে মরছে।

ক্ষুধা, অপুষ্টি ও দারিদ্রের বিরুদ্ধে সংগ্রামে সংহতি জোরদার করা এবং খাদ্য সমস্যা সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষে জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থা ১৯৭৯ সালে বিশ^ খাদ্য দিবস পালনের ঘোষণা দেয়। মূলত ১৬ অক্টোবর কৃষি ও খাদ্য সংস্থার প্রতিষ্ঠা দিবস। বিশে^র বিশাল দরিদ্র জনগোষ্ঠীল খাদ্য ও পুষ্টিমানের উন্নয়ন, খাদ্য উৎপাদন, বিতরণ ও বিপনন ব্যবস্থার উন্নতি সাধন এবং একইসঙ্গে বিশে^র অর্থনৈতিক বিকাশের দৃঢ় অঙ্গীকার নিয়ে ১৯৪৫ সালের ১৬ অক্টোবর জাতিসংঘের প্রথম এবং সর্ববৃহৎ স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা হিসেবে জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থা (ঋঅঙ) আত্মপ্রকাশ করে। ১৯৮০ সালের ৫ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে মানুষের বেঁচে থাকতে ও কল্যাণের মৌলিক উপায় খাদ্য বিবেচনায়। ঋঅঙ কর্তৃক গৃহীত দিবস পালনের সিদ্ধান্ত অনুমোদিত হয়। (সিদ্ধান্ত ৩৫/৭০)।

ঋঅঙ এর প্রতিষ্ঠার দিনটি জাতিসংঘ তথা বিশ^বাসীর জন্য একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিন। এ প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য হলো জীবনযাত্রার মান এবং পুষ্টির মাত্রা বৃদ্ধি, সমবায়, প্রক্রিয়াজাতকরণ, বাজারজাতকরণ এবং বন্টন উন্নত করা, পল্লি উন্নয়ন, গ্রামীণ, জনসাধারনের জীবনযাত্রার মান উন্নত করা এবং এসব উপায় দ্বারা ক্ষুধা দূর করা। এসব লক্ষ্য নিয়ে ঋঅঙ উন্নয়নশীল দেশসমূহে কৃষি, উন্নত মাটি ও মাটি ব্যবস্থাপনা, ফসল ও পশু সম্পর্কিত উন্নয়ন, প্রযুক্তি আদান-প্রদান এবং কৃষি প্রকৌশল, ভূমি সংস্কার, উন্নত যোগাযোগ, প্রাকৃতিক সম্পদের বিকাশ এবং খাদ্য অপচয়রোধেও ঋঅঙ কারিগরি সাহায্য দিচ্ছে। জাতিসংঘের সংগে একত্রে ঋঅঙ এর রয়েছে এক বিশাল কর্মকান্ড বিশ^ খাদ্য কর্মসূচি। বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে ১৭৪টি সদস্য দেশের মধ্যে ১০০টিরও বেশি দেশ ঋঅঙ এর প্রতিনিধিত্ব অফিস আছে। ৫টি আঞ্চলিক ও ৫টি আধা আঞ্চলিক অফিস। ঋঅঙ মূলত একটি উন্নয়ন সংস্থা যা সদস্য দেশসমূহকে বিশেষজ্ঞ পরামর্শ এবং উন্নয়ন সম্পর্কে বিভিন্ন কারিগরি তথ্য ও পরামর্শ দিয়ে থাকে। সদস্য দেশসমূহের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের জন্য ঋঅঙ একটি কার্যকর ফোরাম হিসেবে কাজ করে। প্রায় ২০০ কোটি মার্কিন ডলার অর্থায়নে ঋঅঙ মাঠ পর্যায়ে ২০০০ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। দু’যুগের অধিক সময় ধরে ঋঅঙ বাংলাদেশে তার কর্মকান্ড পরিচালনা করে আসছে। ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ ঋঅঙ এর সদস্যভুক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঋঅঙ বাংলাদেশে তার উন্নয়নের সহযোগিতায় হাত প্রসারিত হয়। ১৯৭৮ সালে ঋঅঙ বাংলাদেশে তার প্রতিনিধিত্ব অফিস স্থাপন করে। বাংলাদেশে ঋঅঙ এর বর্তমান প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে থানাভিত্তিক উন্নত খাদ্য উৎপাদন প্রযুক্তি হস্তান্তর ও শনাক্তকরণ, জাতীয় কৃষি উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রনয়ণের ভিত্তি হিসেবে কৃষি পরিবেশ জোন সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ শক্তিশালীকরণ, সমন্বিত শস্য বালাই কার্যক্রম, শস্য বীজ ও ফল উৎপাদন বৃদ্ধি, অভ্যন্তরীণ ও সামুদ্রিক মৎস আহরণ ও উন্নয়ন, পশু সম্পদ, বন ও পরিবেশ উন্নয়ন। এছাড়া বর্তমানে ঋঅঙ সাহায্য পুষ্টি বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রকল্প বাস্তবায়নে অংশগ্রহণ করছে। এর মধ্যে রয়েছে ডাল ও মোটা দানাদর জাতীয় খাদ্যশস্য, পাঠ ও কে নাফ বীজ উন্নয়ন, উন্নতমানের পার্ট চাপানো প্রযুক্তি, জিন ব্যাংক, সমন্বিত শস্য বালাই দমন, মৎস উন্নয়ন ও সংরক্ষণ সম্পর্কীয় প্রযুক্তি বঙ্গোপসাগর উপকূলীয় অঞ্চলের মৎসজীবী সম্প্রদায়ের উন্নয়নের সম্পর্কীয় বিভিন্ন প্রকল্প। ঋঅঙ এর নীতি প্রতিফলিত বিশ^ খাদ্য দিবসেও একই অনুপ্রেরণায় সচেতন হয় মানুষ যার প্রধান আদর্শ নিরাপত্তা অর্জন।

বাংলাদেশে যেভাবে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে খাদ্য উৎপাদন তার সঙ্গে সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারে না। তাই খাদ্য নিরাপত্তার জন্য চালাতে হয় বিশেষ প্রচেষ্টা। এ লক্ষে কাজ করছে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা, কাউন্সিল, কৃষি সম্প্রসরণ অধিদপ্তর, ধান গবেষণা ইন্সটিটিউট মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইন্সটিটিউট। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইন্সটিটিউট এ পর্যন্ত ৩৩টি উচ্চ ফলনশীল আধুনিক জাতের ধান উৎপাদন করেছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউট এ পর্যন্ত গমের মোট ১৭টি রোগ প্রতিরোধ জাত উদ্ভাবণ করেছে। এ প্রতিষ্ঠান ৪টি উফসি জাতের ভূট্টা মুক্তায়ণ করেছে। কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউট বিভিন্ন আলোক রশ্মি প্রয়োগের মাধ্যমে বিভিন্ন ফসলের ১৬টি উন্নতজাত উদ্ভাবন করেছে। বাংলাদেশ পশু সম্পদ গবেষণা ইন্সটিটিউট এবং বাংলাদেশ মৎস ইন্সটিটিউট এ পর্যন্ত ২২টি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। একইভাবে কাজ করছে ইক্ষু গবেষণা ইন্সটিটিউট চা গবেষণায় ইন্সটিটিউট পাট গবেষণা ইন্সটিটিউট ও বন গবেষণা ইন্সটিটিউট। বাংলাদেশ মোট ১০টি গবেষনা প্রতিষ্ঠান খাদ্য চাহিদা মোকাবেলায় কাজ করছে।

রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে বলেছেন, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিঘাত বিবেচনায় নিয়ে এদেশর গ্রামীণ কৃষিনির্ভর অর্থনীতিকে সুদৃঢ়করণের মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্যবলয় তৈরি করা প্রয়োজন। আবহমানকাল থেকেই কৃষি বাংলাদেশর সামগ্রিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান নিয়ামক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। দেশের অধিকাংশ মানুষ গ্রামে বাস করেন এবং তাদের জীবনমান কৃষিনির্ভর। তাই দেশর সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য প্রযুক্তিনির্ভর টেকসই কৃষি ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব অত্যধিক।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখন বিশে^র অন্যতম খাদ্যশস্য উৎপাদনকারী দেশ। দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনে কৃষিখাতে এ অর্জন ধরে রাখতে সংশ্লিষ্ট সকলকে সচেষ্ট থাকতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, “পুুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। কৃষিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বর্তমান সরকারের গৃহীত নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণের ফলে কৃষিক্ষেত্রে অভাবনীয় সাফল্য অর্জিত হয়েছে। ধান, পাট, আলু, সবজি, ফলসহ মাছ, মাংস উৎপাদনে বাংলাদেশের সাফল্য আজ বিশ^ স্বীকৃত।

তিনি বলেন, “আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছি। আমরা খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পেরেছি। এখন পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।” তিনি বলেন, “কৃষিকাজে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের লক্ষ্যেই কৃষির সম্প্রসারণ কার্যক্রম গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করেছি। আমাদের সরকার ১০ টাকায় ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ করে দিয়েছে। কৃষি ভর্তুকির টাকা ওই অ্যাকাউন্টে সরাসরি প্রেরণ করা হচ্ছে।”
বিশে^র অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের মতো বাংলাদেশের দিবসটি উদ্যাপিত হচ্ছে। এ বছর দিবসটির মূল প্রতিপাদ্য হচ্ছে, “কর্ম গড়ে ভবিষ্যৎ, কর্ম গড়বে ২০৩০-এ ক্ষুধামুক্ত বিশ^।” বিশ^ খাদ্য দিবস উপলক্ষে দেশের সরকারি ও বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা নানা কর্মসূচি পালন করছে।

খাদ্য উৎপাদন; সংগ্রহ, সরবরাহ ও সংরক্ষণের বিষয়ে উন্নয়নশীলগুলোর মতো বাংলাদেশের রয়েছে কার্যকর ব্যবস্থা। দিবস পালনে ও দিবসের শ্লোগানে উদ্বুদ্ধ হয় জাতীয়, বিভাগীয়, জেলা ও থানা পর্যায়। আয়োজিত হয় সেমিনার, পদযাত্রা, আলোচনা সভা ও বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচার।

লেখক: সাবেক জাতীয় ক্রীড়াবিদ(কারাতে ব্লাক বেল্ট ১ম ড্যান) চেয়ারম্যান গ্রিন ক্লাব
সভাপতি শারীরিক শিক্ষাবিদ সমিতি, গবেষক,শিক্ষক,সাংবাদিক ও কলামিস্ট