বাংলা কাব্যে প্রকৃতিবন্দনা ও শ্যামল স্নিগ্ধরূপ সৌন্দর্যের কবি যতীন্দ্রমোহন বাগচী

 

মো : আলতাফ হোসেন ঃঃ
যতীন্দ্রমোহন বাগচী একজন বিখ্যাত বাঙালি কবি। কবি যতীন্দ্রমোহন বাগচীর জন্ম ২৭ নভেম্বর ১৮৭৮ সালে নদীয়ার জমশেরপুরে। পৈতৃক নিবাস হুগলির বলাগড় গ্রামে। শিক্ষাজীবনে কলকাতার ডাফ কলেজ (এখন স্কটিশ চার্চ কলেজ) থেকে ডিগ্রি। কর্মজীবনে তিনি সারদাচরণ মিত্রের প্রাইভেট সেক্রেটারি, পরে কলকাতা করপোরেশনে নাটোর মহারাজের প্রাইভেট সেক্রেটারি ও জমিদারির সুপারিনটেনডেন্ট পদে এবং কর কোম্পানি ও এফ এন গুপ্ত কোম্পানির ব্যবস্থাপক ছিলেন। তিনি মানসী পত্রিকার সম্পাদক,যমুনা পত্রিকার যুগ্ম সম্পাদ ও পূর্বাচল পত্রিকার মালিক এবং সম্পাদক ছিলেন। অল্প বয়সেই কাব্যচর্চা শুরু করেন। ভারতী, সাহিত্য প্রভৃতি পত্রিকায় তাঁর কবিতা প্রকাশিত হতো। তিনি রবীন্দ্রোত্তর যুগের শক্তিমান কবিদের অন্যতম। পল্লী প্রকৃতির সৌন্দর্য ও পল্লীজীবনের সুখ-দুঃখের কথা তিনি দক্ষতার সঙ্গে প্রকাশ করেন। যতীন্দ্রমোহন সারদাচরণ মিত্রের ব্যক্তিগত সচিবরূপে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে কলকাতা কর্পোরেশনে নাটোর মহারাজের ব্যক্তিগত সচিব ও জমিদারির সুপারিনটেন্ডেন্ট পদে এবং কর কোম্পানি ও এফ.এন গুপ্ত কোম্পানির ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করেন।
পল্লী-প্রীতি যতীন্দ্রমোহন বাগচীর কবিমানসের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য।”পথের পাঁচালী”র বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও কবি জীবনানন্দ দাশের মত তাঁর কাব্যবস্তু নিসর্গ-সৌন্দর্যে চিত্ররূপময়। গ্রাম বাঙলার শ্যামল স্নিগ্ধ রূপ উন্মোচনে তিনি প্রয়াসী হয়েছেন। গ্রাম জীবনের অতি সাধারণ বিষয় ও সুখ-দুঃখ তিনি সহজ সরল ভাষায় সহৃদয়তার সংগে তাৎপর্যমন্ডিত করে প্রকাশ করেছেন।
যতীন্দ্রমোহন বহু সাহিত্যিক পত্রিকায় গঠনমূলক অবদান রেখেছেন। ১৯০৯ থেকে ১৯১৩ পর্যন্ত মানসী পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। ১৯২১ এবং ১৯২২ সালে তিনি যমুনা পত্রিকার যুগ্ন সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন। ১৯৪৭ থেকে ১৯৪৮ পূর্বাচল পত্রিকার মালিক এবং সম্পাদক ছিলেন। তাঁর রচনায় তাঁর সমকালীন রবীন্দ্র সাহিত্যের প্রভাব লক্ষ্য করে যায়। তাঁকে রবীন্দ্র পরবর্তী বাংলা সাহিত্যের একজন প্রধান সাহিত্যিক হিসেবে বিবেচনা করে হয়।
যতীন্দ্রমোহন বাগচীর কাব্যগ্রন্থসমূহের মধ্যে রয়েছে-লেখা (১৯০৬),রেখা (১৯১০),অপরাজিতা(১৯১৫),বন্ধুর দান (১৯১৮),জাগরণী (১৯২২),নীহারিকা (১৯২৭) মহাভারতী (১৯৩৬) কাব্যমালঞ্চ নাগকেশর,পাঞ্চজন্য,পথের সাথী প্রভৃতি। তিনি বেশ কয়েকটি সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন। কাজলা দিদি, যৌবন-চাঞ্চল্য, অপরাজিতা, অন্ধ বধূ ইত্যাদি যতীন্দ্রমোহন বাগচীর বিখ্যাত কবিতা মূলত যতীন্দ্রমোহন বাগচী এর কাজলা দিদি ছড়া কবিতাটি। বাংলা সাহিত্যে সবচেয়ে বেশি পরিচিত।
রবীন্দ্র সমকালীন অনেক কবির মতোই তাঁর কাব্যের বিষয়বস্তু ফুঠে ওঠে। পল্লীপ্রকৃতির সৌন্দর্য, নাগরিক জীবনের তুলনায় তাঁর সরলতা ও স্বাভাবিকতা, রোম্যান্টিক আদর্শবাদ, মানুষের দুঃখ-দৈন্যের জন্য, বিশেষ করে পীড়িতা নারীর জন্য ব্যথা তাঁর কাব্যের মূল প্রেরণা । “আধুনিক” কবিসমাজের সঙ্গে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির ঐক্য না থাকলেও, তাঁর প্রকাশভঙ্গির ক্ষেত্রে যে সজীবতা ও নতুনত্ব সৃষ্টি করেছিলেন সেখানে তিনি “আধুনিক” কবিদের নিকটবর্তী। তাঁর কবিতা “কাজলা দিদি” যা পরে প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কণ্ঠে একটি অতি জনপ্রিয় গান হয়ে বাঙালীর মনের গভীরে প্রবেশ করেছিলো। তাঁর “অপরাজিতা” কবিতাটিও জনপ্রিয় কবিতার মধ্যে অন্যতম।
যতীন্দ্রমোহন ছিলেন রবীন্দ্রোত্তর যুগের শক্তিমান কবিদের অন্যতম। পল্লী-প্রকৃতির সৌন্দর্য ও পল্লীজীবনের সুখ-দুঃখের কথা তিনি দক্ষতার সঙ্গে প্রকাশ করেন। ভাগ্য বিড়ম্বিত ও নিপীড়িত নারীদের কথা তিনি বিশেষ দরদের সঙ্গে প্রকাশ করেছেন। ‘কাজলাদিদি’ ও ‘অন্ধবন্ধু’ তাঁর এ ধরনের দুটি বিখ্যাত কবিতা। যতীন্দ্রমোহন বাগচীর লেখা ‘বাঁশবাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ওই, মাগো আমার শোলকবলা কাজলা দিদি কই?’ হারিয়ে যাওয়া বোনটিকে ফিরে পাওয়ার হৃদয় নিংড়ানো গভীর আকুতি আজও দাগ কেটে আছে সবার মনে। একটি সার্থক কবিতাই যে কবিকে সাহিত্যের আসনে স্থায়ীভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম কাজলা দিদি কবিতাটি এর অন্যতম প্রমাণ। এ কবিতাটি বিখ্যাত করেছিলো কবি যতীন্দ্রমোহন বাগচীকে। কাজলাদিদি কবির কবিতাটির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আমাদের শৈশবস্মৃতি। আমরা সবাই কমবেশি এই কবিতাটি পড়েছি। সে কবিতাটি সব কালের পাঠকদেরই কাঁদায়। কাজলাদিদি যতীন্দ্রমোহন বাগচীর একটি অসাধারণ শোকবিধুর কাব্যগাথা।
যতীন্দ্রমোহন বাগচীর বাবা হরিমোহন বাগচী এবং মা গিরিশমোহিনী দেবী। বাগচী পরিবার ছিলো তখনকার একটি মুক্তচিন্তার পাঠশালা। ১৯১৩ খ্রিষ্টাব্দ থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি মানসী, বঙ্গদর্শন, সাহিত্য, ভারতী, প্রবাসী, সাধনা, সবুজপত্র, মর্মবাণী, পূর্বাচল, যমুনা ইত্যাদি পত্রিকায় বিভিন্ন সময়ে তিনি লিখেছেন। গ্রামবাংলার শাশ্বত শ্যামল স্নিগ্ধরূপ তার রচনায় বিভিন্নভাবে প্রকাশিত হয়েছে। গ্রামীণ জীবনের সাধারণ বিষয় ও সুখ দুঃখগুলোকে তিনি সহজসরল ভাষায় সহৃদয়তার সঙ্গে তাৎপর্যমন্ডিত করে প্রকাশ করেছেন। এখানেই কবির পরম সার্থকতা। আমাদের সবুজশ্যামল বাংলার চিরন্তণ সৌন্দর্য তাঁর দৃষ্টি আর মননকে এড়িয়ে যায়নি। এক বোনহারা ভাইয়ের যে আকুতি এ যেন পরম মমতায় লালিত আমাদের বাঙালি পরিবারিক জীবনের নিজস্ব কৃষ্টি ও সংস্কৃতি। হারিয়ে যাওয়া সেই দিদির নাম কাজলা। দিদিহারা একটা ছোট্ট মেয়ে, দিন রাত দিদিকে খুঁজে ফেরে। মায়ের আঁচল ধরে কতো প্রশ্ন করে। মা দিদির কথায় আঁচলে মুখ লুকায়। যতীন্দ্রমোহন বাগচীর কাব্যগ্রন্থগুলো হলো: লেখা, কেয়া, বন্ধুর দান, জাগরণী, নীহারিকা প্রভৃতি। কাজলা দিদি কবিতাটি কাব্যমালঞ্চ কাব্যগ্রন্থের।
যতীন্দ্রমোহন বাগচী খুব অল্প বয়স থেকেই কাব্যচর্চা শুরু করেন। সে যুগে রবীন্দ্রনাথের ভক্তের তুলনায় নিন্দুকের সংখ্যা কম ছিলো না। তখন যতীন্দ্রমোহনের মতো সাহসী তরুণ কবিরা রবীন্দ্রনাথের জয়গান করে প্রকৃত আধুনিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন। কলকাতায় তাঁর বাড়িতে তিনি গড়ে তোলেন ‘রবীন্দ্র-সাহিত্যচক্র’ এবং ১৯১২ সালে রবীন্দ্র-সংবর্ধনার যে আয়োজন চোখে পড়ে তার মূল উদ্যোক্তা ছিলেন তিনি। একুশ জন গায়কের কোরাসে যতীন্দ্রমোহন রচিত গান দিয়ে সেই সভা শুরু হয়েছিলো। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও যতীন্দ্রমোহন বাগচীকে স্নেহ করতেন। তাঁর ‘নাগকেশর’ কাব্যগ্রন্থের আলোচনাতে বিশ্বকবি বলেছিলেন: ‘তোমার লেখনী তোমার কবিত্বকে পক্ষিরাজ ঘোড়ার মতন এখনো সমান বেগে বহিয়া লইয়া চলিয়াছে। তোমার নিপুণ ছন্দের পায়ে পায়ে অনায়াস নৃত্যলীলার নূপুর বাজিতেছে, আবার তাহার হাতে ও মাথায় কানায় কানায় ভরা বিচিত্র রসের থালি।’
কবি ও সম্পাদক যতীন্দ্রমোহন বাগচী। তিনি বহু সাহিত্যিক পত্রিকায় গঠনমূলক অবদান রেখেছেন। যতীন্দ্রমোহন বাগচীর শিক্ষাজীবন শুরু হয় তাঁর জ্যাঠামশায়ের কাছে। জ্যাঠামশায়ের কাছে পাঠ্যপুস্তক নয়, তিনি পড়েন মহাভারত, কৃত্তিবাসের সপ্তকান্ড ও রামায়ণ। জ্যাঠামশায়ও নিবিড়ভাবে শুনতেন যতীন্দ্র মোহন বাগচীর এই পড়া। তার প্রথম একাডেমিক জীবন শুরু বহরমপুরের খাগড়াতে মিশনারী স্কুলে। শৈশবেই তিনি তীক্ষè মেধার পরিচয় দিয়ে শিক্ষকদের বিস্মিত করে ফেলেন। শিক্ষাজীবন শেষে নদীয়াস্থ জমিদারী দেখাশোনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কিন্তু এসবে তার মন বসলো না। তিনি চলে যান কলকাতায়। সেখানে তিনি পুরোপুরি সাহিত্য চর্চায় মনোনিবেশ করেন।তাঁর শৈশব জীবনের লেখা তখনকার আলো ও উৎসাহ পত্রিকায় নিয়মিতভাবে প্রকাশিত হতো।
যতীন্দ্রমোহনের কবিতায় হাতেখড়ি স্কুল জীবনে। তখন তিনি পঞ্চম শ্রেনির ছাত্র। ১৮৯১ সালে যতীন্দ্রমোহন শুনতে পেলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর আর নেই। বিদ্যাসাগরের মৃত্যুতে কিশোর কবির মন বেদনার্ত হয়ে ওঠে। লিখে ফেলেন বিদ্যাসাগর স্মরণে ছোট্ট একটি কবিতা। এ কবিতা সে সময় অনেককেই অশ্রুসজল করেছে। তেরো বছর বয়সে লেখা সেই রচনাটিই যতীন্দ্রমোহনের প্রথম মুদ্রিত কবিতা বলে সাহিত্যশ্রুতি রয়েছে।
পল্লীর প্রতি যতীন্দ্রমোহনের ছিলো স্বাভাবিক আকর্ষণ, একই সঙ্গে তার জন্ম-সংস্কার। সে কারণেই পল্লীর এমন মোহনরূপ তাঁর কবিতায় আমরা পাই; সেখানে কোনো কৃত্রিমতা নেই। কোথাও পল্লী-প্রকৃতির উৎকট রোমান্টিক ভাবুকতা তিনি প্রশ্রয় দেননি। সহজ এবং বাস্তব ঘটনার বর্ণনাই ছিলো তাঁর কবিতার বৈশিষ্ট্য। তাঁর পল্লীকবিতা শুধুমাত্র পল্লী-বর্ণনায় পরিণত হয়নি, হৃদয়ের উত্তাপে জীবনের স্পন্দন লাভ করেছে। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর যতীন্দ্রমোহনের ‘রেখা’ পড়ে মুগ্ধ হয়ে কবিকে লিখেছিলেন: ‘এক একটি ছোটোখাটো রেখার টানে গ্রাম্য দৃশ্যগুলি কেমন ফুটিয়া উঠিয়াছে। তোমার ছন্দ সুমধুর, ভাষাও ভাবের উপযোগী। কোনো কোনো কবিতায় সুললিত সংস্কৃত শব্দের প্রাচুর্য, আবার গ্রামদৃশ্যের বর্ণনায় ভাবব্যঞ্জক চলিত গ্রাম্য-শব্দের নিপুণ প্রয়োগ দেখিতে পাওয়া যায়।’
যতীন্দ্রমোহনের আত্মজীবনীতে তাঁর লেখা কবিতার বইটি পড়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কবিকে আরও কবিতা লেখার জন্য উৎসাহিত করেন। দ্বিতীয় বই লেখা আরও চার বছর পরে ১৮৯০ সালে প্রকাশিত হয়। লেখা এবং পরবর্তীকালে অপরাজিতা প্রকাশিত হওয়ার পর তাঁর কবিখ্যাতি সর্বাধিক প্রচারিত হয়। এই সময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, করুণানীধান বন্দোপাধ্যায়, মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, হেমেন্দ্রকুমার রায়,শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, কাজী নজরুল ইসলাম, কালিদাস রায়, যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত, নরেন্দ্র দেব, রাধারানী দেবী প্রমুখ কবি ও সাহিত্যিকদের মজলিস বসত তাঁর বাড়িতে। সেখানে গানের আসরও বসত। সেই আসরে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, সুরেন্দ্রনাথ মজুমদার, রাধিক্য গোস্বামী, জ্ঞান গোস্বামী, গিরিজাভূষণ, নলিনীকান্ত সরকার প্রমুখ অনেক বিখ্যাত গায়ক অংশ নিতেন।
যতীন্দ্রমোহনকে লেখক-জীবনের খ্যাতির পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনের দুঃখ সঙ্গে করে চলতে হয়েছে। তাঁর তিন কন্যাসস্তানের অকাল মৃত্যু এবং স্ত্রী ভাবিনী দেবীর মৃত্যু তাঁকে বারবার শোকাতুর করেছে। সন্তান ও পত্নীর বিয়োগব্যথা যতীন্দ্রমোহনকে অনেক কবিতা রচনায় উদ্বুদ্ধ করেছে। তাঁর কন্যা ইলার মৃত্যুর পরই শোকার্ত হয়ে তিনি ‘কাজলা দিদি’ লিখেছিলেন। প্রতিভা বসুর লেখা পড়ে এ তথ্য জানা যায়। সেই লেখা থেকে আরো জানা যায়, লেখার পর এটি তিনি যত্ন করে রাখেননি, হারিয়ে ফেলেছিলেন। তাঁর পুত্রবধূ লেখাটি কুড়িয়ে পেয়ে যত্ন করে রেখে দিয়েছিলেন। এখানে উল্লেখ্য যে, জ্যেষ্ঠা এই পুত্রবধূ যতীন্দ্রমোহনের খুব প্রিয় ছিলো। তিনিই শ্বশুরের সব রচনা সযত্নে গুছিয়ে রাখতেন। অনেক সময় কবির লেখা ডায়েরিতে টুকে রাখতেন। তাঁর রান্নাও খুব সুস্বাদু ছিলো। কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর রান্নার খুব ভক্ত ছিলেন। ইতিহাস আজীবন কথা বলে। ইতিহাস মানুষকে ভাবায়, তাড়িত করে। প্রতিদিনের উল্লেখযোগ্য ঘটনা কালক্রমে রূপ নেয় ইতিহাসে। সেসব ঘটনাই ইতিহাসে স্থান পায়, যা কিছু ভালো, যা কিছু প্রথম, যা কিছু মানবসভ্যতার অভিশাপ-আশীর্বাদ। তাই ইতিহাসের দিনপঞ্জি মানুষের কাছে সবসময় গুরুত্ব বহন করে।
যতীন্দ্রমোহন শুধুমাত্র ঘরোয়া সুখ-দুঃখের কবিতা বা নিসর্গচিত্রের রচয়িতাই ছিলেন না, প্রেমের সুমধুর কতো কবিতাও তিনি লিখেছেন। তাঁর প্রেমের কবিতায় গভীর ভাবাবেগ যেমন আছে,সেরকমই হৃদয়-নিবেদনের সংযত প্রকাশ। তুমি শিশির ভেজা কাশের বনে বিছিয়ে দিয়ে আঁচল, সিত জ্যোৎস্নামাখা হাঁসের পাখায় এলিয়ে দিয়ে কাঁচল সাদা ঝিনুক-পাতা বালির তটে ঘুমিয়েছিলে রাণী (জ্যোৎস্না লক্ষ্মী) -প্রেমের কবিতায় ছিলো যতীন্দ্রমোহনের সুমিত প্রকাশ। তিরিশের যুগে কল্লোল পত্রিকাগোষ্ঠীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক স্থাপিত হয় যে কবিতাটির মাধ্যমে সেটি হলো যৌবন চাঞ্চল্যÑ ভুটিয়া যুবতী চলে পথ আকাশ কালিমাখা কুয়াশায় দিক ঢাকা চারিধারে কেবলি পর্বত; যুবতী একেলা চলে পথ! কোনো কষ্টকল্পিত শব্দের ব্যবহার নেই, সর্বত্র আবেগ আর স্বচ্ছতায় আঁকা মুগ্ধতার বর্ণনা।
খ্যাতনামা সাহিত্যিক রাজশেখর বসু (পরশুরাম) যতীন্দ্রমোহনকে ‘গদ্যে পদ্যে সার্বভৌম’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। যতীন্দ্রমোহন ‘কবি কুলেশ্বর’ উপাধিতেও ভূষিত হন, কিন্তু তিনি কখনো ব্যবহার করেননি। ১৯৩১ সালে জলধর সেনের সভাপতিত্বে রসচক্র সাহিত্য সংসদের পক্ষ থেকে বেলঘরিয়ার একটি উদ্যান, সম্মেলনে যতীন্দ্রমোহনকে সংবর্ধনা দেয়া হয়।১৯৪৪ সালে তাকে দেশবাসীর পক্ষ থেকে মহারাজা শ্রীশচন্দ্র নন্দী, মহারাজা যোগেন্দ্রনারায়ণ রায় এবং ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের পৃষ্ঠপোষকতায় এবং ড.অতুলচন্দ্র গুপ্তের সভাপতিত্বে অভিনন্দিত করা হয়।
যতীন্দ্রমোহনকে লেখক-জীবনের খ্যাতির পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনের দুঃখকে সঙ্গে করে চলতে হয়েছে। তাঁর তিন কন্যা-সন্তানের অকালমৃত্যু এবং স্ত্রী ভাবিনী দেবীর মৃত্যু তাঁকে বারবার ধাক্কা দেয়। এই বিষয়ে যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের ‘ইলাবাস’ কবিতাটি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। সন্তান ও পত্নীর বিয়োগব্যথা যতীন্দ্রমোহনকে অনেক কবিতা রচনায় উদ্বুদ্ধ করেছে।
যতীন্দ্রমোহন কাহিনীমূলক কবিতা রচনায় ছিলেন সিদ্ধহস্ত। দুর্যোধন, কর্ণ, শবরীর প্রতীক্ষা প্রভৃতি কবিতায় তিনি যথেষ্ট কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন। পৌরাণিক কাহিনীগুলোকে এমন সুন্দরভাবে উপস্থাপনের বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়। কোনো উচ্ছ্বাস-প্রাবল্যে কবিতার সীমারেখা কখনোই তিনি অতিক্রম করেননি। যতীন্দ্রমোহনের প্রথম কবিতার বই লেখা ৬৬টি কবিতা ও গানে সমৃদ্ধ হয়ে জমশেরপুর থেকে প্রকাশিত হয় এবং রবীন্দ্রনাথকে উৎসর্গিত করা হয়। লেখা কাব্যগ্রন্থেই সেই বিখ্যাত দিদিহারা কবিতাটি অন্তর্ভুক্ত ছিলো-বাঁশ বাগানের মাথার ওপর চাঁদ উঠেছে ওই- মাগো আমার শোলোক-বলা কাজলা দিদি কই? পুকুরধারে নেবুর তলে থোকায় থোকায় জোনাক জ্বলে- ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না, একলা জেগে রই; মাগো আমার কোলের কাছে কাজলা দিদি কই? এমন সহজ শব্দে এমন অসাধারণ চিত্রকল্প সৃষ্টি যতীন্দ্রমোহনই পারতেন। তাঁর সবচেয়ে বড় গুণ ছিলো তাঁর চিত্রকল্পের ব্যবহার। এই কবিতাটিতে কোনো পান্ডিত্য পূর্ণ বিশ্লেষণ নেই, তত্ত্ব বা ভাষার আতিশয্যও নেই। কিন্তু অত্যন্ত সহজ ভাষায় লেখা এই কবিতাটি যে কোনো হৃদয়কেই নাড়া দেয়। কাজলা দিদির শোকে কাতর ভাইটি যে প্রত্যেক পাঠকের বুকের মধ্যে ঢুকে পড়েছে,এইখানেই যতীন্দ্রমোহন অনন্য। দ্বিজেন্দ্রলাল রায় এই কবিতাটি সম্বন্ধে মন্তব্য করেছিলেন ‘কবিতাটি সোনার অক্ষরে ছাপানো উচিত ছিলো।’
যতীন্দ্রমোহন বাগচীর জন্মের প্রায় দেড়শ বছর পর কবির কবিতাগুলো বারবার পড়লে তাঁর লেখার বিশেষ তিনটি বৈশিষ্ট্য সহজেই আমাদের চোখে পড়ে। বলে রাখা ভালো তাঁর এই বৈশিষ্ট্যগুলো একান্তই তাঁর নিজস্ব এবং এই বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমেই তিনি স্বতন্ত্র্য সত্তা হয়ে বাংলা সাহিত্যে অম্লান হয়ে আছেন। তাঁর কবিতার প্রথম বৈশিষ্ট্যই ‘পল্লী নিবিষ্টতা’। তিনি গ্রামকে দেখেছেন বহুমাত্রিকভাবে। গ্রামের সৌন্দর্য ও সৌকর্য অনুধাবনের পাশাপাশি তিনি অনুধাবন করেছিলেন গ্রামগুলোরও পরিবর্তন ঘটছে। ফলে পল্লীপ্রিয় যতীন্দ্রমোহন বাগচী তাঁর কবিতায় পল্লীর এমন পরিবর্তনের জন্যে হাহাকারও করেছেন। আরেকটু কাছ থেকে দেখলে সহজেই বোঝা যাবে- যতীন্দ্রমোহন বাগচী তাঁর কবিতায় জন্মভূমি হিসেবে সমগ্র দেশকে বোঝাননি। তিনি জন্মভূমি বলতে উপস্থাপন করেছেন তাঁর গ্রামকে। এ কথা আবদুল মান্নান সৈয়দ আরো চমৎকারভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি বাগচীর কবিতা ব্যাখ্যা করে বলেছেন, ‘যতীন বাগচী জন্মভূমি বলতে স্বদেশ বোঝাননি- বুঝিয়েছেন তাঁর জন্মগ্রাম।’ তাঁর অন্য কবিতাগুলো পড়ে এটা স্পষ্ট হয় যে, দেশের সামগ্রিক অবস্থা ও বহির্বিশ্বের ঘটনাপ্রবাহের দিকে তাঁর মনোযোগ কম ছিল, তাঁর মূল মনোযোগ ছিলো গ্রামকেন্দ্রিক। এজন্য সমকালকে তাঁর কবিতায় ঐভাবে পাওয়া যায় না। সমকালীন বিষয়-আশয়ের চেয়ে প্রকৃতিবন্দনা, সৌন্দর্যের উপলব্ধি ও পল্লী নিবিষ্টতাই তাঁর কবিতায় বেশি উজ্জ্বল হয়ে ফুটে উঠেছে। পরবর্তীকালের বন্দে আলী মিয়া ও জসীম উদদ্ীন যে পথে দীর্ঘযাত্রা করেছেন ও থিতু হয়েছেন- সে পথের একজন আদি পথিক নিঃসন্দেহে যতীন্দ্রমোহন বাগচী। তাঁকে বলা হতো ‘প্রথম পল্লী কবি’।
পল্লী প্রিয়তার জন্যে যতীন্দ্রমোহন বাগচীর কবিতায় বারবার ওঠে এসেছে ‘গ্রীষ্ম’, ‘বর্ষা’, ‘শীত’, ‘বসন্ত’ ঋতুর কথা। উঠে এসেছে বৃষ্টি, শেওলা-দিঘি, আমের বরণ, খেজুর গাছ, বাঁশবাগান, নেবুর গন্ধ, শিশির কণা, তনুলতা, গরুর গাড়ি, ঝোপঝাড়, ঝাউগাছ, ঘাসের ডাঁটা, ঝিঁঝি পোকা, শিরীষ ফুল, ধীবর সন্তান, বটবৃক্ষ, শ্যামল শস্য ইত্যাদির কথা। প্রকৃতির যথার্থ উপস্থাপন তাঁর কবিতাকে চিত্রময় ও বর্ণিল করেছে। এসব কারণেই জ্যোতিন্দ্রনাথ ঠাকুর যতীন্দ্রমোহন বাগচীর কবিতাকে ‘চিত্রাঙ্গনী প্রতিভা’ হিসেবে অবহিত করেছিলেন। যতীন্দ্রমোহন বাগচী ১৯৪৮ সালের ১ ফেব্রুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন।

লেখকঃ সাবেক জাতীয় ক্রীড়াবিদ,সভাপতি,শারীরিক শিক্ষাবিদ সমিতি
চেয়ারম্যান গ্রিন ক্লাব,শিক্ষক,গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট