বাংলা সাহিত্যের মার্কসবাদী ভাবধারায় বিশ্বাসী কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য

 

মো : আলতাফ হোসেন ঃঃ
সুকান্ত ভট্টাচার্য বাংলা সাহিত্যের মার্কসবাদী ভাবধারায় বিশ্বাসী এবং প্রগতিশীল চেতনার অধিকারী তরুণ কবি। পিতা-নিবারণ ভট্টাচার্য, মা-সুনীতি দেবী। ১৯২৬ সালের ১৫ই আগস্ট তিনি তাঁর মাতামহের বাড়ি কলকাতার কালীঘাটের ৪৩,মহিম হালদার স্ট্রীটের বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। পৈতৃক বাড়ি গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়া উপজেলার অন্তর্গত ঊনশিয়া গ্রামে। বেলেঘাটা দেশবন্ধু স্কুল থেকে ১৯৪৫ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে অকৃতকার্য হন। এ সময় ছাত্র আন্দোলন ও বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মকান্ডে যুক্ত হওয়ায় তাঁর আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সমাপ্তি ঘটে।

সুকান্তের বাল্যবন্ধু ছিলেন কবি অরুণাচল বসু। সুকান্ত সমগ্রতে লেখা সুকান্তের চিঠিগুলির বেশিরভাগই অরুনাচল বসুকে লেখা। অরুণাচল বসুর মাতা কবি সরলা বসু সুকান্তকে পুত্রস্নেহে দেখতেন। কবির জীবনের বেশিরভাগ সময় কেটেছিলো কলকাতার বেলেঘাটার ৩৪ হরমোহন ঘোষ লেনের বাড়িতে। সেই বাড়িটি এখনো অক্ষত আছে। নিকটেই কবির ভাইয়েদের মধ্যে দুজন, বিভাস ভট্টাচার্য ও অমিয় ভট্টাচার্যের বাড়ি। পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সুকান্তের সম্পর্কিত ভ্রাতুষ্পুত্র।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, তেতাল্লিশ এর মম্বন্তর, ফ্যাসিবাদী আগ্রাসন, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রভৃতির বিরুদ্ধে তিনি কলম ধরেন। ১৯৪৪ সালে তিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন। সেই বছর আকাল নামক একটি সংকলনগ্রন্থ তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়। কৈশোর থেকেই সুকান্ত যুক্ত হয়েছিলেন সাম্যবাদী রাজনীতির সঙ্গে। পরাধীন দেশের দুঃখ দুর্দশাজনিত বেদনা এবং শোষণ মুক্ত স্বাধীন সমাজের স্বপ্ন, শোষিত মানুষের কর্ম জীবন এবং ভবিষ্যৎ পৃথিবীর জন্য সংগ্রাম তাঁর কবিতার মূল প্রেরণা।

১৯৪১ সালে সুকান্ত কলকাতা রেডিওর গল্পদাদুর আসরের যোগদান করেন। সেখানে প্রথমে তিনি রবীন্দ্রনাথের কবিতা আবৃত্তি করেন। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর সেই আসরেই নিজের লেখা কবিতা পাঠ করে তাকে শ্রদ্ধা জানান। গল্পদাদুর আসরের জন্য সেই বয়সেই তাঁর লেখা গান মনোনীত হয়েছিলো আর তাঁর সেই গান সুর দিয়ে গেয়েছিলেন সেকালের অন্যতম সেরা গায়ক পঙ্কজ মল্লিক। সুকান্তকে আমরা কবি হিসেবেই জানি। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ যেমন কেবল মাত্র কবি ছিলেন না, সাহিত্যের সকল ক্ষেত্রে তা৭র ছিলো অবাধ বিচরণ। তেমনি সুকান্তও ঐ বয়সেই লিখেছিলেন কবিতা ছাড়াও, গান, গল্প, নাটক এবং প্রবন্ধ। তাঁর ‘ছন্দ ও আবৃত্তি’ প্রবন্ধটি পাঠেই বেশ বোঝা যায় ঐ বয়সেই তিনি বাংলা ছন্দের প্রায়োগিক দিকটিই শুধু আয়ত্বে আনেন নি, সে নিয়ে ভালো তাত্ত্বিক দক্ষতাও অর্জন করেছিলেন।

কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের জীবনে আশীর্বাদতুল্য নারীরূপে এসেছিলেন তাঁর জেঠাতো বোন রাণীদি (কারো কারো মতে রানুদি)। রাণীদির স্নেহের ছায়াতলে থেকেই শিশু-সুকান্ত বড় হতে থাকে। ছোট্ট সুকান্তকে পাশে বসিয়ে, কখনো বা কোলে তুলে নিয়ে রাণীদি তাকে শোনাতেন মজার মজার পৌরাণিক গল্প, বলতেন বড় বড় কবি-লেখকদের জীবনকথা আর সবসময় উৎসাহিত করতেন পড়াশোনা এবং লেখালেখির ক্ষেত্রে। প্রিয় সেই রাণীদি বিনা নোটিসে হঠাৎই একদিন পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন। সুকান্তের মাথার উপর থেকে আচমকাই সরে গেলো বিশাল একটি ছায়া। সেটাই ছিলো বালক সুকান্তের জীবনে মারাত্মক একটা ধকল।

আট-নয় বছর বয়স থেকেই সুকান্ত লিখতে শুরু করেন। স্কুলের হাতে লেখা পত্রিকা ‘সঞ্চয়ে’ একটি ছোট্ট হাসির গল্প লিখে আত্মপ্রকাশ করেন। তার দিনকতক পরে বিজন গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘শিখা’ কাগজে প্রথম ছাপার মুখ দেখে তাঁর লেখা বিবেকান্দের জীবনী। মাত্র এগার বছর বয়সে ‘রাখাল ছেলে’ নামে একটি গীতি নাট্য রচনা করেন। এটি পরে তার ‘হরতাল’ বইতে সংকলিত হয়। বলে রাখা ভালো, পাঠশালাতে পড়বার কালেই ‘ধ্রুব’ নাটিকার নাম ভূমিকাতে অভিনয় করেছিলেন সুকান্ত। বাল্য বন্ধু লেখক অরুণাচল বসুর সঙ্গে মিলে আরেকটি হাতে লেখা কাগজ ‘সপ্তমিকা’ সম্পাদনা করেন। মার্ক্সবাদী চেতনায় আস্থাশীল কবি হিসেবে সুকান্ত কবিতা লিখে বাংলা সাহিত্যে স্বতন্ত্র স্থান করে নেন। সুকান্তকে বলা হয় গণমানুষের কবি।

সুকান্ত ভট্টাচার্য অগ্নিদীপ্ত সৃষ্টি প্রণোদনা দিয়ে সব ধরনের প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করতে প্রয়াসী ছিলেন। মানবিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য বাংলা কাব্যধারার প্রচলিত প্রেক্ষাপটকে আমূল বদলে দিতে পেরেছিলেন। সুকান্ত কমিউনিস্ট পার্টির পত্রিকা দৈনিক স্বাধীনতার (১৯৪৫) ‘কিশোর সভা’ বিভাগ সম্পাদনা করতেন। মার্কসবাদী চেতনায় আস্থাশীল কবি হিসেবে সুকান্ত কবিতা লিখে বাংলা সাহিত্যে স্বতন্ত্র স্থান করে নেন। তাঁর কবিতায় অনাচার ও বৈষ্যমের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিবাদ পাঠকদের সংকচিত করে তোলে। গণমানুষের প্রতি গভীর মমতায় প্রকাশ ঘটেছে তাঁর কবিতায়। তার রচনাবলির মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো:ছাড়পত্র (১৯৪৭),পূর্বাভাস (১৯৫০), মিঠেকড়া (১৯৫১), অভিযান (১৯৫৩), ঘুম নেই (১৯৫৪), হরতাল (১৯৬২),গীতিগুচ্ছ (১৯৬৫) প্রভৃতি। পরবর্তীকালে উভয় বাংলা থেকে সুকান্ত সমগ্র নামে তাঁর রচনাবলি প্রকাশিত হয়। সুকান্ত ফ্যাসিবাদবিরোধী লেখক ও শিল্পিসঙ্ঘের পক্ষে আকাল (১৯৪৪) নামে একটি কাব্যগ্রন্থ সম্পাদনা করেন।

একাধারে বিপ্লবী ও স্বাধীনতার আপোসহীন সংগ্রামী কবি সুকান্ত ছিলেন কমুনিষ্ট পার্টির সারাক্ষণের কর্মী। পার্টি ও সংগঠনের কাজে অত্যধিক পরিশ্রমের ফলে নিজের শরীরের উপর যে অত্যাচারটুকু তিনি করলেন তাতে তার শরীরে প্রথম ম্যালেরিয়া ও পরে দুরারোগ্য ক্ষয়রোগে আক্রান্ত হয়ে ১৯৪৭ সালের ১৩ই মে মাত্র ২১ বছর বয়সে কলিকাতার ১১৯ লাউডট স্ট্রিটের রেড এড কিওর হোমে মৃত্যুবরণ করেন। সুকান্ত ভট্টাচার্যের জীবন মাত্র ২১ বছরের আর লেখালেখি করেন মাত্র ৬/৭ বছর। সামান্য এই সময়ে নিজেকে মানুষের কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন। তাঁর রচনা পরিসরের দিক থেকে স্বল্প অথচ তা ব্যাপ্তির দিক থেকে সুদূরপ্রসারী।

সুকান্তর শৈশব ও কৈশাের কেটেছিল দেশের উত্তাল আবহাওয়া ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ ব্যাপ্তির মধ্যে। যেখানে ছিলো মন্বন্তর, ফ্যাসিস্ট-বিরোধী আন্দোলন,স্বাধীনতা সংগ্রাম, শ্রমিক ধর্মঘট আর ভ্রাতৃঘাতী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। ১৯৪০ থেকে ১৯৪৭ এইভয়াবহ উত্তাল সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেই সুকান্তর কাব্যচর্চা। ফলে তাঁর রচনায় আমরা খুঁজে পাই সমকালীন সামাজিক, রাজনৈতিক পরিবেশ পরিস্থিতির কাব্যরূপায়ণ। আর এখানেই তিনি সমযুগে স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেছেন। রবীন্দ্রনাথ শেষ বয়সে এমন একজন কবিকে আহ্বান করে গিয়েছিলেন, যিনি গাইবেন মাটির কাছের নিপীড়িত মানুষের জাগরণের গান, মাটির মর্মবাণী যিনি শােনাবেন বাংলা কাব্যের আকাশে বাতাসে। সে গান রবীন্দ্রনাথ গাইতে পারেন নি; তবে প্রত্যাশা করেছিলেন একজন গাইবেন। বলাকা’র পরে নবজাতক-এ তিনি আন্তরিক আহ্বান জানালেন নবীন আগন্তুককে “নবীন আগন্তুক নবযুগ তব যাত্রার পথে চেয়ে আছে উৎসুক।”-কবির এই আহ্বানে সাড়া দিতেই যেন সুকান্ত এক নবজাতকের ছাড়পত্র নিয়ে আবির্ভূত হয়েছেন “এসেছে নতুন শিশু,তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান; জীর্ণ পৃথিবীতে ব্যর্থ, মৃত আর ধংসস্তুপ পিঠে চলে যেতে হবে আমাদের।”(ছাড়পত্র /নাম কবিতা) শাষিত নিপীড়িত, বঞ্চিত ক্ষুধাতুর মানুষের মধ্যে সংগ্রামী চেতনা উজ্জীবিত করে এক বিপ্লবের স্পন্দন জাগিয়ে তোলাই ছিল সুকান্তর ‘দৃঢ় অঙ্গীকার’।

ফ্যাসিবাদী আগ্রাসন, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও অনৈতিক ব্রিটিশ শাসন প্রভৃতির বিরুদ্ধে তিনি ও তাঁর দল ভীষনভাবে সোচ্চার হন । ১৯৪৪ সালে তিনি এরপর ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হন। সেই বছরই “আকাল” নামক একটি সংকলনগ্রন্থ তিনি সম্পাদনাও করেন এবং সেখানেই শোষিত মানুষের কর্ম জীবন, ভবিষ্যৎ পৃথিবীর জন্য সংগ্রাম, সমাজের দুর্দশাজনিত বেদনা এবং শোষণ মুক্ত স্বাধীন সমাজের স্বপ্ন প্রভৃতি বিষয় নিয়ে কবিতা লিখতে থাকেন। তাঁর সেই কবিতা সংকলন মানুষকে ভীষনভাবে সাহস ও অনুপ্রেরণা যোগায় রাজনৈতিক কর্মকান্ডে লিপ্ত হওয়ার জন্য।

স্বাধীনতার স্বপ্নে বিভোর এই কবি দেশ স্বাধীন হবার মাত্র তিন মাস আগে ১৯৪৭ সালের ১২ই মে পার্থিব মায়া ত্যাগ করে চলে যান বড় অসময়ে। সুকান্তর এই মৃত্যুটাই যেনো বাঙালির কাছে একটা বেদনাবিধুর কবিতা।
সুকান্ত ভট্টাচার্য বইটি এমন এক সময়ে প্রকাশিত হলো, যখন এই কবিকে আমরা ভুলতেই বসেছি। ‘কিশোর কবি’ অভিধায় অভিহিত বাংলা সাহিত্যে আসন করে নেওয়া সুকান্তের জন্ম বা মৃত্যুদিবস পাকিস্তান আমলেও যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে পালিত হতো। এমনকি ঢাকায় তাঁর স্মরণে গড়ে উঠেছিলো ‘সুকান্ত একাডেমি’ নামের প্রতিষ্ঠান। এসব সম্ভবত এখন অতীতের বিষয়। ফলে মুহম্মদ জাহাঙ্গীরের লেখা সুকান্ত ভট্টাচার্যের এই জীবনীগ্রন্থের প্রকাশ আমাদের মনে করতে বাধ্য করল যে ‘কিশোর কবি’ স্মরণযোগ্য। তাঁর কাব্যকৃতি, কর্মবহুল সংক্ষিপ্ত জীবন ভোলার নয় এবং নানা বিচারেই তা দৃষ্টান্তস্থানীয়।

অত্যন্ত সহজ-সরল ভাষায় সুকান্তর শৈশব-কৈশোর ও তাঁর শিক্ষাজীবনের প্রায় বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেছেন তিনি। তুলে ধরেছেন তাঁর পরিবারের বিবরণ, নিত্যসঙ্গী তাঁদের দারিদ্র্যের কথাও। আর এসবের ভেতরেই যে সুকান্তর কাব্যচর্চার শুর, জাহাঙ্গীর খুবই সুন্দরভাবেই লিখেছেন সে প্রসঙ্গ, ‘সুকান্তর কবি-জীবন সত্যিকার অর্থে শুরু হয় যখন তার বয়স চৌদ্দ কি পনেরো। তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিকা এসে পড়েছে কলকাতায়ও। মানবতা তখন লাঞ্ছিত। যুদ্ধের তান্ডবলীলা চোখের সামনে তখনো দেখা না গেলেও এর ভয়াবহতা অনুমান করে সবাই শঙ্কিত। এ সময় সুকান্ত বেশ কিছু কবিতা লেখেন। পূর্বাভাস গ্রন্থে এসব কবিতা সংকলিত হয়েছে।’

সাহিত্যিক বুদ্ধদেব বসু সুকান্তের বর্ণনা দিয়েছেন এমন করে-“গর্কীর মতো, তাঁর চেহারাই যেনো চিরাচরিতের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। কানে একটু কম শোনে, কথা বেশি বলেনা, দেখামাত্র প্রেমে পড়ার মতো কিছু নয়, কিন্তু হাসিটি মধুর, ঠোঁট দু’টি সরল”। বুদ্ধদেব বসু সুকান্তের কথা আরো বলেছেন, “যে চিলকে সে ব্যঙ্গ করেছিলো, সে জানতো না সে নিজেই সেই চিল; লোভী নয়, দস্যু নয়, গর্বিত নিঃসঙ্গ আকাশচারী, স্খলিত হয়ে পড়লো ফুটপাতের ভিড়ে, আর উড়তে পারলো না, অথবা সময় পেলো না। কবি হবার জন্যই জন্মেছিলো সুকান্ত, কবি হতে পারার আগে তাঁর মৃত্যু হলো”।

কবিতার পৃষ্ঠায় সুকান্তই সূর্যকে বলতে পেরেছিলেন,“হে সূর্য তুমি ত জানো আমাদের গরম কাপড়ের কত অভাব!”, সিগারেটকে আহবান জানাতে পেরেছিলেন ‘হঠাৎ জ্বলে উঠে বাড়িসুদ্ধ পুড়িয়ে’ মারতে, ‘যেমন করে তোমরা আমাদের পুড়িয়ে মেরেছ এতকাল’; সুকান্ত কেঁদেছেন ডাকঘরের রানারের দুঃখে-‘পিঠেতে টাকার বোঝা, তবু এই টাকাকে যাবে না ছোঁয়া!’

সুকান্ত ভট্টাচার্য ছিলেন ইংরেজ শাসিত পরাধীন রাষ্ট্র-যন্ত্রের তথা অবিভক্ত ভারতবর্ষের একজন দুর্বার কবিতাসৈনিক। বৃটিশভারতের পরাধীন জাতিগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক দৈন্যদশা, মানবিক বিপর্যয়, ভুলুণ্ঠিত অধিকার, মানবতার অবক্ষয়, দুর্বৃত্তপনা এবং দুর্বলের উপর সবলের দমনরীতি ইত্যাদি মূর্তছায়ারূপে তাঁর এক একটি কবিতায় ঝলক দিয়ে উঠেছে। বিশ শতকের সর্বপ্রধান অসাম্প্রদায়িক কবি এবং বিদ্রোহী কবিতার জনক কাজী নজরুল ইসলাম ও সুকান্ত ভট্টাচার্য দুজনই হয়ে উঠলেন ইংরেজবিরোধী শক্তির দুই প্রান্তের দুজন দুঃসাহসী কলমী-সেনাপতি।

মাত্র ২১ বছর বয়সে প্রাণপ্রদীপ নিভে যাওয়া সত্ত্বেও বেঁচে আছেন সগৌরবে। লিখে গেছেন সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম, যন্ত্রণা ও বিক্ষোভকে পুঁজি করে অসাধারণ সব কবিতা। যিনি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত গণমানুষের মুক্তি ও নতুন সমাজ গড়ার জন্যে লড়াই করেছেন তিনি অন্য কেউ নন বাংলা সাহিত্যের ‘ক্ষণজন্মা কবি’ সুকান্ত ভট্টাচার্য।

রবীন্দ্রোত্তর বাংলা কবিতার বৈপ্লবিক ভাবধারাটি যাদের হাত ধরে সমৃদ্ধ হয়েছে তাদের মধ্যে একজন সুকান্ত ভট্টাচার্য। তিনি ছিলেন বাংলা সাহিত্যের মার্কসবাদী ভাবধারায় বিশ্বাসী কবি ছিলেন। তিনি মাত্র ছয় থেকে সাত বছরের সাহিত্যচর্চায় বাংলায় চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন।
মার্ক্সবাদী ও প্রগতিশীল চেতনার কবি সুকান্ত ভট্টাচায কিশোর বয়সেই এই কবি তাঁর অসাধারণ কাব্যশক্তি ‘ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়/পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি’ এবং ‘শাবাশ বাংলাদেশ/এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়/জ্বলেপুড়ে ছারখার/তবু মাথা নোয়াবার নয়’ এই অমর পঙিক্ত রচনার মাধ্যমে বাংলা কবিতায় চির অমর হয়ে আছেন। তাঁর কবিতা ও অন্যান্য লেখার মূল ভাবনা হচ্ছে সাম্যবাদ ও প্রগতিশীল চিন্তাধারা।

সুকান্ত ভট্টাচার্য নিজেকে কোলাহলপ্রেমী একজন জনতার কবি হিসেবে পরিচয় দিতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দে তাঁর জেঠতুতো দাদা রাখাল ভট্টাচার্যের স্ত্রীকে লেখা একটি পত্রের মধ্যে সে কথার সত্যতা পাওয়া যায়। পত্রের একাংশে তিনি লিখেছেন ‘আমি কবি বলে নির্জনতাপ্রিয় হবো, আমি কি সে ধরনের কবি? আমি যে জনতার কবি হতে চাই। জনতা বাদ দিলে আমার চলবে কী করে? সুতরাং সঙ্কোচের বিহ্বলতা নিজের অপমান।’ তাই তিনি সারাজীবন লিখে গেছেন সাধারণ মানুষের কথা। নেমেছেন জনতার অধিকার আদায়ের সংগ্রামে। ‘পড়তে বসে থাকে আমার পথের দিকে চোখ/পথের চেয়ে পথের লোকের দিকেই বেশি ঝোঁক’ এমন অসামান্য অন্তঃমিল সমৃদ্ধ কিছু কবিতার ভাষায় তিনি নিজেই স্বীকার করেছিলেন যে, পথের চেয়ে পথের মানুষকেই তিনি বেশি ভালোবাসেন, পছন্দ করেন শীতে জবুথবু হয়ে যাওয়া রাস্তার উলঙ্গ ছেলেটাকে। ফলে তাঁর সহজ ভাষার সাঙ্কেতিক স্রোত, ক্ষোভমাখা পঙিক্তর বহুব্রীহি ব্যঞ্জনা এবং ক্ষুদ্রবস্তুর শ্লেষমাখা উপমাস্নিগ্ধ কবিতাগুচ্ছ হয়ে উঠেছে প্রতিবাদের ভাস্কর, মানবতার ছাড়পত্র। সামান্য ‘দেয়শলাই কাঠি’র প্রতীকে তিনি নীরবে নিভৃতে অবহেলায় পড়ে থাকা ক্ষুদ্রজাতিগোষ্ঠীর যে ভয়ঙ্কর হুঙ্কারের চিত্রোচ্ছ্বাস দেখিয়েছেন তা’ নিঃসন্দেহে তুলনারহিত। বিন্দুজলে যে সিন্ধুর প্লাবন সৃষ্টি হতে পারে তাঁর প্রকৃষ্ট উদাহরণ তিনি কাব্যিক ভাষায় বুঝিয়ে দিয়েছেন বহুবার। ”আমি একটা ছোট্ট দেশলাইয়ের কাঠি এত নগণ্য, হয়তো চোখেও পড়ি না; তবু জেনো মুখে আমার উসখুস করছে বারুদ বুকে আমার জ্বলে উঠবার দুরন্ত উচ্ছ্বাস; আমি একটা দেশলাইয়ের কাঠি।

সুকান্তের আরো একটি বিখ্যাত কবিতা ‘সিঁড়ি’। সেখানে হাজার যুগের সমাজ ব্যবস্থায় লুকিয়ে থাকা নির্মম বাস্তবতাকে চিরকালীন সত্যের ছাপচিত্র হিসেবে অঙ্কন করেছেন তিনি। একেবারেই সাধারণ কিছু ‘সিঁড়ি এর উপমায় তিনি তুলে ধরেছেন ব্রাত্যশ্রেণির মানুষের পিঠে পদচ্ছাপ ফেলে মুহুর্মুহু উপরে উঠে যাওয়া উঁচু পর্যায়ের মানুষের নির্মমতার প্রামাণ্যচিত্র।

বাংলা সাহিত্যের সমস্ত শ্রেষ্ঠ কবিদের মধ্যে অন্যতম হলেন সুকান্ত ভট্টাচার্য । তিনি তাঁর সীমিত জীবনকালে যা কিছু সাহিত্যসৃষ্টি করে গেছেন তা সত্যিই এক কথায় অনবদ্য। তিনি মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ,মন্বন্তর,ফ্যাসিবাদ আগ্রাসন ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রভৃতির বিরুদ্ধে সেইসময় কলম ধরেছিলেন। তাঁর সমস্ত সাহিত্য কর্ম আজও প্রত্যেক বাঙালী পাঠকদের সমানভাবে মন কাঁড়ে । সুকান্তের জীবন ও কাব্য ছিলো একই সুরে গ্রথিত ও একই মন্ত্রে অনুরণিত। তাই কোন এক অংশকে আলাদা করে বলা যায় নাৃবলতে হলে সমান্তরালভাবে, একসাথেই বলতে হয়। সুকান্ত ভট্টাচার্য তার কোন বইই প্রকাশিত হবার পর দেখে যেতে পারেননি। তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয় ‘ছাড়পত্র’, এবং এরপর অন্যগুলোও; জীবনের প্রতিটি অংশেই সুকান্ত যেনো অনিয়মকেই তাঁর জীবনের অঙ্গ করে তুলেছিলেন। একদিকে যেমন পার্টির কাজ, তেমনই অন্যদিকে সাহিত্যকর্ম, অভাব ও অনটন এইসব কিছুর ধকল তাঁর শীর্ণ শরীর আর মেনে নিতে পারেনি । অত্যধিক পরিশ্রমের ফলে নিজের শরীরের উপর যে অত্যাচারটুকু তিনি করেন তাতে তাঁর শরীরে প্রথমে ম্যালেরিয়া ও পরে দুরারোগ্য যক্ষারোগ এসে হানা দেয় । যারফলে ১৯৪৭ সালের ১৩ই মে তারিখে কোলকাতার ১১৯ নম্বর লাউডট ট্রিস্ট্রের অন্তর্গত “রেড এড কিওর হোমে” তিনি অবশেষে মৃত্যুবরণ করেন । মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স ছিলো মাত্র ২১ বছর।

লেখকঃ সাবেক জাতীয় ক্রীড়াবিদ,সভাপতি,শারীরিক শিক্ষাবিদ সমিতি
চেয়ারম্যান গ্রিন ক্লাব,শিক্ষক,গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট