বাংলা সাহিত্যের সফল কালজয়ী পুরুষ স্বামী বিবেকানন্দ

 

মো.আলতাফ হোসেন ঃঃ

বাংলা সাহিত্যের সফল কথ্যরীতির অন্যতম প্রধান প্রচারক কালজয়ী পুরুষ স্বামী বিবেকানন্দ। বাংলা তথা সমগ্র ভারতবর্ষের সবচেয়ে বিখ্যাত দার্শনিক ছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ। তিনি একজন দার্শনিক ছাড়াও ছিলেন লেখক ও সঙ্গীতজ্ঞ মানুষও। তাঁর লেখা প্রত্যেকটি বই আজও সকল বাঙালি তথা সমগ্র বাংলা ভাষাভাষীকে সমানভাবে মুগ্ধ ও অনুপ্রানীত করে তুলেছে।

১৮৬৩ সালের ১২ জানুয়ারি মকর সংক্রান্তি উৎসবের দিন উত্তর কলকাতার সিমলা অঞ্চলে ৩ নং গৌরমোহন মুখোপাধ্যায় স্ট্রিটে জন্ম গ্রহন করেছিলেন। তাঁর পিতা বিশ^নাথ দত্ত কলকাতা উচ্চ আদালতের একজন আইনজীবী ছিলেন। বিবেকান্দ একটি প্রথাগত বাঙালি কায়স্থ সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন যেখানে তাঁর নয় জন ভাই-বোন ছিলো। তাঁর মধ্যম ভাই মহেন্দ্রনাথ দত্ত ছিলেন বিশিষ্ট লেখক ও বিদেশ ভ্রমণে বিবেকান্দের সঙ্গী । কনিষ্ঠ ভাই ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত ছিলেন বিশিষ্ট সাম্যবাদী নেতা ও গ্রন্থকার। এই দত্ত পরিবারের আদি নিবাস ছিলোঅধুনা ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বর্ধমান জেলার কালনা মহকুমার অন্তর্গত দত্ত-ডেরিয়াটোনা বা দত্ত ডেরেটোনা গ্রাম। মুঘল শাসনকাল থেকে দত্তরা উক্ত গ্রামের অধিবাসী ছিলেন। ছেলেবেলা থেকেই আধ্যাত্মিকতার দিকে নরেন্দ্রনাথের আগ্রত ফুটে ওঠে। এই সময় শিব, রাম,সীতা ও মহাবীর হুনমানের মূর্তির সামনে তিনি প্রায়শই ধ্যানে বসতেন। সাধু সন্যাসীদের প্রতিও তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিলো। ছেলেবেলা স্বামী বিবেকান্দ অত্যান্ত দুরন্ত ছিলেন। তাঁর পিতা-মাতার পক্ষে তাঁকে সামলানো মাঝে মাঝেই দুঃসাধ্য হয়ে ওঠতো। তাঁর মা বলতেন,শিবের কাছে ছেলে চাইলুম। তা তিনি নিজে না এসে পাঠালেন তাঁর চেলা এক ভূতকে। প্রথমে নিজ গৃহে মায়ের নিকট এবং পরে একজন গৃহ শিক্ষকের নিকট নরেন্দ্রের শিক্ষা জীবন শুরু হয়।

দার্শনিক,ধর্মীয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব,রামকৃষ্ণমিশন প্রতিষ্ঠাতা। স্বামী বিবেকান্দ এক অনন্য সাধারণ প্রতিভা,যিনি আধুনিককালের ধর্ম সংস্কৃতি এবং পরোক্ষাভাবে ভারতীয়দের জাতীয় আত্মচেতনার রূপ দিতে সাহায্য করেছিলেন। উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত হিন্দু ধর্মীয় জীবন ব্যবস্থা, আচরণ ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অভ্যস্ত হওয়া সত্ত্বেও তিনি হিন্দু ধর্মের বহু আদর্শিক বিচ্যুতির কড়া সমালোচক ছিলেন। তিনি একটি ভাবা দর্শক প্রচার এবং একটি সম্পূর্ণ নতুন কর্মসূচির প্রদান করেছিনে। তাঁর সময়ের তুলনায় বহুদিক থেকে প্রাগ্রসর চিন্তার অধিকারী স্বামী বিবেকান্দ জাতীয় পুনর্জীবনের পথ ও পন্থা নিয়ে বহু ভুল বোঝাবুঝির অবকাশ রয়েছে। স্বামী বিবেকান্দের পিতৃ পদত্ত নাম ছিলো নরেন্দ্রনাথ দত্ত। (ডাক নাম ছিলো বীরেশ^র বা বিলে এবং নরেন্দ্র বা নরেন)। ১৮৭১ সালে নরেন্দ্রনাথ ঈশ^রচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউশনে ভর্তি হন।পারিবারিক পরিবেশে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ শেষে তিনি মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউট ও প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যায়ন করেন।

১৮৭৭ এ তাঁর পরিবার সাময়িকভাবে রায়পুরে (অধুনা ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের ছত্তিসগড় রাজ্যে) স্থানান্তরিত হওয়াার আগ পর্যন্ত তিনি এই বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেছিলেন। ১৮৭৯ খ্রিষ্টাব্দে দত্ত পরিবার আবার কলকাতায় ফিরে আসেন। নরেন্দ্রনাথ প্রেসিডেন্সি কলেজের (অধুনা প্রেসিডেন্সি বিদ্যাবিদ্যালয়, কলকাতা) প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। তিনিই ছিলেন সেবছর উক্ত পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ একমাত্র ছাত্র। তিনি প্রচুর বই পড়তেন। দর্শন,ধর্ম,ইতিহাস,সমাজবিজ্ঞান, শিল্পকলা ও সাহিত্য বিষয়ে বই পড়ায় তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিলো। বেদ,উপনিষদ, ভাগবদগীতা,রামায়ণ, মহাভারত,পুরাণ প্রভৃতি হিন্দু ধর্র্মগ্রন্থ পাঠেও তাঁর আগ্রহ ছিলো। এছাড়া তিনি হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে তালিম নিতেন এবং নিয়মিত অনুশীলন, খেলাধুলা ও সামজসেবামূলক কাজকর্শে অংশ নিতেন। জেনেরাল অ্যাসেম্বলি’জ ইনস্টিটিউশনে (অধুনা স্কটিশ চার্চ কলেজ,কলকাতা) পড়ার সময় নরেন্দ্রনাথ পাশ্চাত্য যুক্তিবিদ্যা, পাশ্চাত্য দর্শন ও ইউরোপীয় ইতিহাস অধ্যয়ন করেছিলেন।

১৮৮০ খ্রিষ্ট্রাব্দে,তিনি কেশবচন্দ্র সেনের নব বিধানের সদস্য হয়েছিলেন, যা রামকৃষ্ণের সঙ্গে সাক্ষাতের পর এবং খ্রিষ্টান ধর্ম থেকে হিন্দু ধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়ার পর সেন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১৮৮১ খ্রিষ্ট্রাব্দে তিনি চারুকলা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৮৮৩ সাল থেকে তিনি জেনারেল এ্যাসেমব্লিজ ইনস্টিটিউট থেকে বিএ পাসের পর পিতার মৃত্যুর কারণে আর লেখাপড়ায় অগ্রসর হতে পারেননি। শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। পাশাপাশি সাহিত্য,ইতিহাস, বিজ্ঞান,দর্শন ইত্যাদি বিষয়ে জ্ঞানার্জন করেন। বিশেষ পারদর্শিতা অর্জন করেন। সঙ্গীত ও শরীরচর্চায়। স্বামী বিবেকান্দ রামকৃষ্ণের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিলেন ছাত্রাবস্থায়ই। রামকৃষ্ণের মৃত্যুর পর তার কিছু শিষ্যের সহায়তায় বরাহনগরে রামকৃষ্ণ মঠ স্থাপনে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। এ সময় এক পর্যায়ে তিনি সন্ন্যাসধর্ম গ্রহণ করেন এবং ৩ বছরকাল পুরো ভারত ঘুরে বেড়ান।

১৮৮৪ খ্রিষ্ট্রাব্দে স্মাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। নরেন্দ্রনাথ ডেবিড,হিউম,জর্জ ডব্লিউ,এফ হেগেল, আর্থার সোফেনহায়ার,অগাস্ট কোঁত,জন স্টুয়ার্ট মিল ও চালর্স ডারউইনের রচনাবলি পাঠ করেছিলেন। হারবার্ট স্পেনসারের বিবর্তনবাদের প্রতি তিনি বিশেষভাবে আকৃষ্ট হয়েছিলেন। সে সময়ে স্পেনসারের সঙ্গে তার চিঠিপত্র বিনিময়ও চলতো। স্পেনসারের এডুকেশন (১৮৬১) বইটি তিনি বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন। পাশ্চাত্য দার্শনিকদের রচনাবলি পড়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি সংস্কৃত ধর্মগ্রন্থ ও বাংলা সাহিত্য নিয়েও চর্চা করেন। জেনেরাল অ্যাসেম্বলি’জ ইনস্টিটিউশন প্রিন্সিপাল ইউলিয়াম হেস্টি লিখেছেন,‘নরেদ্র সত্তিকারের মেধাবী আমি বহু দেশ দেখেছি,কিন্তু তার মতো প্রতিভা ও সম্ভাবনাময় ছাত্র দেখিনি। এমনকি জার্মান বিশ^বিদ্যালয়গুলোর দর্শন ছাত্রদের মধ্যেও না’ একজন যুব-সত্যানুসন্ধানকারী হিসেবে ঈশ^র জ্ঞানলাভের প্রতিও তাঁর গভীর আগ্রহ জন্মলাভ করে। তিনি রাজা রামমোহন রায়ের বেদান্তবিষয়ক গ্রন্থাদি পাঠ করে ব্রাহ্মসমাজের প্রতি আকৃষ্ট হন। কেশবচন্দ্র সেন এ আন্দোলনের একজন শক্তিশারী নেতা হিসেবে আবির্ভূত হলে নরেন্দ্র তাঁর বক্তৃতা শুনতেন এবং তাঁর সংগঠিত সভা সমিতিতে ভক্তিমূলক সংগীত পরিবেশন করতেন। নরেনের জীবনে এমন একটি সময় আসে যখন তিনি পার্থিব জীবন এবং সন্ন্যাস জীবনের যে কোনো একটি গ্রহণ করার বিষয়ে দ্বিধান্বিত ছিলেন। এ সময় তিনি আইন বিষয়ে পড়াশুনা করছিলেন, কিন্তু পিতার মৃত্যুর কারণে তিনি পড়াশুনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। তাঁকে তাঁর পরিবারের ভরণপোষণের দায়ভার গ্রহণ করতে হয় এবং তিনি মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউশনে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। ১৮৮৬ সালের ১৬ আগষ্ট রামকৃষ্ণের মৃত্যুর পর নরেন্দ্র ও তাঁর ১২ জন শিষ্য কলকাতার উপকন্ঠ বরাহনগরে একটি ‘মঠ’ প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানে তাঁর গুরুর নিকট থেকে শিক্ষালব্দ আধ্যাত্মিক সাধনা শুরু করেন। এশিয়াটি সোসাইটি গ্রন্থাগার থেকে বই এনে তাঁরা সেখানে

গভীরভাবে বৌদ্ধিকচর্চাও শুরু করেন। তাঁদের স্তবসংগীতের মধ্যে একটি কৌতুহলোদ্দীপক মন্ত্র হচ্ছে ‘প্রজাতন্ত্র দীর্ঘজীবী হউক’ যা তাঁদের এ পার্থিব জগতে রাজনৈতিক আদর্শের ইঙ্গিত প্রদান করে। বিবেকানন্দের নেতৃত্বে পরিচালিত আধ্যাত্মিক সাধনার মধ্যে বেশ কিছু অসাধারণ বৈশিষ্ট্য ছিলো। মরাহনগর মঠে থাকাকালীন বিবেকান্দ তাঁর সন্ন্যাসী নাম বিবেকান্দ গ্রহণ করেন। পরে কোনো একসময়ে ববিশানন্দনামে আরেকটি নাম গ্রহণ করেন। ১৮৯০ সালের উত্তরপ্রদেশের গাজিপুর গিয়ে বিবেকানন্দ জানতে পারেন পোহারি বাবাব সম্পর্কে। তিনি সেখানেই থাকতেন। যৎসামান্য খেতেন। তাঁকে মহাপুরুষ বলে মনে হয় স্বামীজির। তিনি চিঠি লেখেন প্রেমদাদাস মিত্রকে।। জানান, তিনি পোহারি বাবার দীক্ষা নেবেন। তবে দীক্ষা নেওয়ার আগের রাতে শ্রীরামকৃষ্ণ দুঃখ ভরা মুখে স্বপ্নে দেখা দেন। এর পরে পরপর ২১ দিন স্বামীজির স্বপ্নে একইরকম দুঃখ ভরা মুখে দেখা দেন স্বীমীজি। ব্যস তারপরে দীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত পাল্টে ফেললেন স্বামীজি। ১৮৯৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত ধর্মসভায় হিন্দু প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দেন। তার সারগর্ভ বক্তৃতা ধর্মসভার গুরুত্ব বাড়িয়ে দেয়।১৮৯৯ সালে তিনি বেলুড়ে প্রতিষ্ঠা করেন রামকৃষ্ণ মিশনের প্রধান কেন্দ্র। রামকৃষ্ণ সেবাশ্রম, ব্রহ্মচর্যাশ্রম, রামকৃষ্ণ হোম, রামৃষ্ণ পাঠশালা তারই স্থাপিত। সাম্য,স্বাধীনতা,সর্বজীবে দয়া,ত্যাগ এবং বৈরাগ্য সাধনার কালজয়ী পুরুষ স্বামী বিবেকানন্দের মৃত্যুবার্ষিকী ৪ জুলাই।স্বামীজি এমন একজন মহান ব্যক্তিত্ব ছিলেন যাঁর উচ্চ চিন্তাধারা, আধ্যাত্মিক জ্ঞান ও সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা প্রত্যেক মানুষের মনে এক গভীর ছাপ ফেলেছিলো । তাঁর অভূতপূর্ব দূরদর্শী মনোভাব ভারতের বিকাশের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে সেইসময়।
স্বামী বিবেকানন্দকে বাংলা সাহিত্যের সফল কথ্যরীতির অন্যতম প্রধান প্রচারকও বলা হয়। ধর্ম ও সমাজ সংস্কারক আইনজীবী বিশ^নাথ দত্তের সন্তান হিসেবে ধর্ম-কর্মের প্রতি ছোট বেলা থেকে সচেতন এবং সংস্কারবাদী। স্বামীজি এছাড়াও ভাতৃপ্রীতি ও সবাইকে ভালোবাসা দেওয়ার নীতিতেও বিশ্বাসী ছিলেন । তিনি মনে করতেন, ভাতৃপ্রীতি ও সদ্ভাবের দ্বারা প্রত্যেকটা মানুষ তার জীবনকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে পারে।

বিবেকানন্দ ১৮৯৭ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ জানুয়ারি কলম্বো পৌঁছান এবং এক পরমানন্দদায়ক অভ্যর্থনা গ্রহণ করেন। এখানে তিনি প্রাচ্যে তাঁর প্রথম প্রকাশ্য বক্তৃতা (ভারত, পবিত্র ভূমি) করেন। সেখান থেকে কলকাতায় তাঁর পৌঁছানো ছিলো এক বিজয়ঘটিত প্রত্যাবর্তন। তিনি ভ্রমণ করেন কলম্বো থেকে পাম্বান, রামেস্বরম, রামনাদ, মাদুরাই, কুম্বাকোনাম এবং মাদ্রাজ। এই জায়গাগুলোতে তিনি বক্তৃতা দেন। জনগণ এবং রাজারা তাকে অত্যুৎসাহী অভ্যর্থনা জানান। পাম্বানে মিছিলে রামনাদের রাজা নিজে স্বামীজির ঘোড়ার গাড়ি টানেন। মাদ্রাজে যাওয়ার পথে কতিপয় জাগয়ায় যেখানে ট্রেন থামত না সেখানে জনগণ রেললাইনে বসে ট্রেন থামাত এবং স্বামীজির বক্তৃতা শোনার পরই ট্রেনকে যেতে দিতো। মাদ্রাজ থেকে তিনি কলকাতায় তাঁর ভ্রমণ অব্যাহত রাখেন এবং আলমোড়া পর্যন্ত তাঁর বক্তৃতা দেওয়া চালিয়ে যান। যেখানে পাশ্চাত্যে তিনি ভারতের মহান আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের কথা বলেছিলেন, সেখানে ভারতে ফিরে তার ‘কলম্বো থেকে আলমোড়া’ বক্তৃতা ছিলো জনগণের জন্য নৈতিক অনুপ্রেরণা, বর্ণাশ্রম ভাইরাস দূরীকরণ, বিজ্ঞান শিক্ষায় উৎসাহদান, দেশের শিল্পায়ন, দারিদ্র্য দূরীকরণ,ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান। এ সমস্ত বক্তৃতা কলম্বো থেকে আলমোড়া বক্তৃতা হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে। এই বক্তৃতাসমূহকে জাতীয়তাবাদী ঐকান্তিকতা ও আধ্যাত্মিক ভাবাদর্শের প্রকাশ বলে বিবেচনা করা হয়।
ব্রিটিশ-শাসিত ভারতে জাতীয়তাবাদী ধারণার অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে স্বামী বিবেকানন্দ জাতীয়তাবাদী আদর্শটিকে নির্দিষ্ট করে দিয়েছিলেন। সমাজ সংস্কারক চার্লস ফ্রিয়ার অ্যান্ড্রুজের ভাষায়, “স্বামী বিবেকানন্দের নির্ভীক দেশাত্মবোধ সারা ভারতে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছিলো। ভারতের নবজাগরণে স্বামী বিবেকানন্দ যতটা অবদান রেখেছিলেন, ততটা অন্য কেউ এককভাবে রাখতে পারেননি। বিবেকানন্দ ভারতের সর্বব্যাপী দারিদ্র্র্যের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেছিলেন,এই দারিদ্র্য দূরীকরণের জন্যই ভারতে জাতীয় নবজাগরণের প্রয়োজন আছে। তাঁর জাতীয়তাবাদী ধারণা ভারতীয় দার্শনিক ও রাজনৈতিক নেতাদের প্রভাবিত করেছিলো। শ্রীঅরবিন্দ বলেছিলেন, বিবেকানন্দ ভারতকে আধ্যাত্মিক চেতনায় জাগরিত করেছিলেন। মহাত্মা গান্ধির মতে বিবেকানন্দ ছিলেন সেই অল্প কয়েকজন হিন্দু ধর্মসংস্কারকদের একজন “যিনি হিন্দুধর্মের প্রথা ও রীতিনীতির মৃত শাখাপ্রশাখাগুলিকে ছেঁটে ফেলে হিন্দুধর্মের সৌন্দর্য রক্ষা করেছিলেন। স্বাধীন ভারতের প্রথম গভর্নর-জেনারেল চক্রবর্তী রাজাগোপালাচারী বলেছিলেন, বিবেকানন্দ হিন্দুধর্ম ও ভারতকে রক্ষা করেছিলেন। বিশিষ্ট স্বাধীনতা সংগ্রামী নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু বলেছিলেন, বিবেকানন্দ ছিলেন “আধুনিক ভারতের স্রষ্টা।

বিবেকানন্দ ছিলেন একজন গায়ক, চিত্রশিল্পী, আশ্চর্য ভাষাবিশারদ ও কবি।তিনি অনেকগুলি গান ও কবিতা লিখেছিলেন, যার মধ্যে তাঁর প্রিয় রচনা “মৃত্যুরূপা মাতা” কবিতাটি অন্যতম। বিবেকানন্দের উপদেশগুলির মধ্যে রসবোধের পরিচয় পাওয়া যায় এবং তার ভাষা ছিলো সহজ-সাবলীল। বাংলা রচনার ক্ষেত্রে তিনি মনে করতেন, ভাষা (কথ্য ও লিখিত) এমন হওয়া উচিত যা লেখকের পান্ডিত্য প্রদর্শনের বদলে, লেখকের বক্তব্যের মূল ভাবটিকে ফুটিয়ে তুলতে পারবে।’বর্তমান ভারত’ হলো বিবেকানন্দের লেখা একটি বিখ্যাত বাংলা প্রবন্ধ। ১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দের রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের একমাত্র বাংলা মুখপত্র ‘উদ্বোধন’ পত্রিকার মার্চ সংখ্যায় এটি প্রথম প্রকাশিত হয়। ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দে প্রবন্ধটি বই আকারে প্রকাশিত হয় এবং পরে ‘স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা’ গ্রন্থের ষষ্ঠ খন্ড সংকলিত হয়।এই প্রবন্ধেই বিবেকানন্দ দরিদ্র ও তথাকথিত হীন বর্ণে জন্ম নেওয়া ভারতীয়দের নিজের ভাই বলে উল্লেখ করেছিলেন।

স্বামী বিবেকানন্দের শিক্ষা ও দর্শন ভারতের ধর্ম, শিক্ষা,চরিত্র গঠন এবং বিভিন্ন সামাজিক বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। বিবেকানন্দ ছিলেন একজন ভারতীয় হিন্দু সন্ন্যাসী। তিনি পাশ্চাত্যে বেদান্ত দর্শন প্রচারে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন। সেই সঙ্গে ভারতেও ধর্মসংস্কারে তার বিশেষ অবদান রয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্বামী বিবেকানন্দের শিক্ষা সম্পর্কে বলেছেন, “যদি ভারতকে জানতে চাও, তবে বিবেকানন্দের রচনাবলি পড়ো। তাঁর মধ্যে যা কিছু আছে সবই ইতিবাচক; নেতিবাচক কিছুই নেই। বিবেকানন্দ অনুভব করেছিলেন, দেশের ভবিষ্যৎ জনগণের উপর নির্ভর করে। তাই তিনি মানুষের ওপর বেষি জোর দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, “আমার উদ্দেশ্য হলো মানুষের চরিত্র গঠন”। এইভাবেই তিনি নিজের শিক্ষা বর্ণনা করেন। বিবেকানন্দ তাঁর আদর্শ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছিলেন,”(তাঁর উদ্দেশ্য) মানবজাতিকে তাঁর অন্তর্নিহিত দেবত্ব শিক্ষা দেওয়া এবং জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে তা কিভাবে কাজে লাগাতে হয় তা শেখানো।

স্বামী বিবেকানন্দ মানুষকে শুধু ইতিবাচক শিক্ষা দেওয়ার পক্ষপাতী ছিলেন। কারণ তিনি মনে করতেন, নেতিবাচক চিন্তাগুলি মানুষকে দুর্বল করে দেয়। তিনি বলেছিলেন, যদি ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েদের সবসময় দোষারোপ না করে উৎসাহিত করা হয়, তবে তারা এক সময় উন্নতি করবেই। স্বামী বিবেকানন্দ মনে করতেন, শিক্ষা পরিপূর্ণতার এক প্রকাশ। তা মানুষের মধ্যেই থাকে। তিনি মনে করতেন, সমসাময়িক শিক্ষা ব্যবস্থা যে মানুষকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে সাহায্য করে না, বা মানুষের মধ্যে আত্মনির্ভরতা ও আত্মমর্যাদাবোধ জাগিয়ে তুলতে সাহায্য করে না, তা খুব বেদনার বিষয়। বিবেকানন্দ শিক্ষাকে তথ্যের সমষ্টি মনে করতেন না। তাঁর কাছে শিক্ষা ছিলো আরও বেশি কিছু। তিনি শিক্ষাকে মানুষ তৈরি করার, জীবন দানের ও চরিত্র গঠনের মাধ্যম মনে করতেন। তিনি শিক্ষাকে মহান চিন্তার সমষ্টি মনে করতেন।
স্বামী বিবেকানন্দ ছিলেন একজন হিন্দু সন্ন্যাসী, দার্শনিক, লেখক, সংগীতজ্ঞ এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর ভারতীয় অতীন্দ্রিয়বাদী রামকৃষ্ণ পরমহংসের প্রধান শিষ্য। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে হিন্দুধর্ম তথা ভারতীয় বেদান্ত ও যোগ দর্শনের প্রচারে প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। অনেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে বিভিন্ন ধর্মমতের মধ্যে পারস্পরিক সুসম্পর্ক স্থাপন এবং হিন্দুধর্মকে বিশ্বের অন্যতম প্রধান ধর্ম হিসেবে প্রচার করার কৃতিত্ব বিবেকানন্দকে দিয়ে থাকেন।ভারতে হিন্দু পুনর্জাগরণের তিনি ছিলেন অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব। সেই সঙ্গে ব্রিটিশ ভারতে তিনি ভারতীয় জাতীয়তাবাদের ধারণাটি প্রবর্তন করেন।

স্বামী বিবেকানন্দ ছোটোবেলা থেকেই আধ্যাত্মিকতার প্রতি আকর্ষিত হতেন। তাঁর গুরু রামকৃষ্ণ দেবের কাছ থেকে তিনি শেখেন, সকল জীবই ঈশ্বরের প্রতিভূ তাই মানুষের সেবা করলেই ঈশ্বরের সেবা করা হয়। রামকৃষ্ণের মৃত্যুর পর বিবেকানন্দ ভারতীয় উপমহাদেশ ভালোভাবে ঘুরে দেখেন এবং ব্রিটিশ ভারতের আর্থ-সামাজিক অবস্থা সম্পর্কে প্রত্যক্ষ জ্ঞান অর্জন করেন। পরে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে ১৮৯৩ খ্রিষ্টাব্দের বিশ্ব ধর্ম মহাসভায় ভারত ও হিন্দুধর্মের প্রতিনিধিত্ব করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইংল্যান্ড ও ইউরোপে তিনি হিন্দু দর্শনের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে অসংখ্য সাধারণ ও ঘরোয়া বক্তৃতা দিয়েছিলেন এবং ক্লাস নিয়েছিলেন। তাঁর রচিত গ্রন্থগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য চিকাগো বক্তৃতা, কর্মযোগ, রাজযোগ, জ্ঞানযোগ, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে বেদান্ত,ভারতে বিবেকানন্দ,ভাববার কথা,পরিব্রাজক,প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য, বর্তমান ভারত,বীরবাণী(কবিতা-সংকলন),মদীয় আচার্যদেব ইত্যাদি।

বিবেকানন্দ ছিলেন সংগীতজ্ঞ ও গায়ক। তাঁর রচিত দুটি বিখ্যাত গান হলো “খন্ডন-ভব-বন্ধন” (শ্রীরামকৃষ্ণ আরাত্রিক ভজন) ও “নাহি সূর্য নাহি জ্যোতি”। এছাড়া “নাচুক তাহাতে শ্যামা”, “৪ জুলাইয়ের প্রতি”, “সন্ন্যাসীর গীতি” ও “সখার প্রতি” তার রচিত কয়েকটি বিখ্যাত কবিতা। “সখার প্রতি” কবিতার অন্তিম দুইটি চরণ“বহুরূপে সম্মুখে তোমার ছাড়ি কোথা খুঁজিছ ঈশ্বর?/জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।বিবেকানন্দের সর্বাধিক উদ্ধৃত একটি উক্তি। ভারতে বিবেকানন্দকে ‘বীর সন্ন্যাসী’ নামে অভিহিত করা হয় এবং তাঁর জন্মদিনটি ভারতে জাতীয় যুব দিবস হিসেবে পালিত হয়।

আমেরিকায় তাঁর প্রথম পরিদর্শনের সময় ১৮৯৫ ও ১৮৯৬ খ্রিষ্টাব্দে তিনি দু-বার ইংল্যান্ড ভ্রমণ করেন এবং সেখানে তাঁর বক্তৃতাসমূহ সফল ছিলো। এখানে তিনি সাক্ষাত পান এক আইরিশ মহিলা মিস মার্গারেট নোবলের; যিনি পরে ভগিনী নিবেদিতা নামে পরিচিত হন। ১৮৯৬ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে তাঁর দ্বিতীয় ইংল্যান্ড ভ্রমণের সময় পিমলিকোতে এক গৃহে অবস্থানকালে বিবেকানন্দ দেখা পান অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বিখ্যাত ভারততত্ত্ববিদ ম্যাক্স মুলারের, যিনি পাশ্চাত্যে রামকৃষ্ণের প্রথম আত্মজীবনী লেখেন। ইংল্যান্ড থেকে তিনি অন্যান্য ইউরোপীয় দেশেও ভ্রমণ করেছেন।জার্মানিতে তিনি আরেক ভারততত্ত্ববিদ পল ডিউসেনের সঙ্গ সাক্ষাত করেন। তিনি দুটি শিক্ষায়তনিক প্রস্তাবও পান, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাচ্য দর্শনের চেয়ার এবং কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে একই ধরনের প্রস্তাব। তিনি উভয় প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন এই বলে যে, পরিভ্রমণকারী সন্ন্যাসী হিসেবে তিনি এই ধরনের কাজে স্থিত হতে পারবেন না।

ধর্মপ্রচারে পরিবর্তন আনতে তাঁর সফল ভূমিকা ছিলো, বিশেষ করে পাশ্চাত্যে বেদান্ত কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা। বিবেকানন্দ সনাতন হিন্দু ধারণা অভিযোজিত করেছিলেন এবং পশ্চিমীদের চাহিদা ও সমঝোতা অনুযায়ী ধর্মভাবের মিশ্রন ঘটিয়েছিলেন, যারা পশ্চিমী গূঢ় ঐতিহ্য ও আন্দোলনের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন।হিন্দু ধর্মভাবে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অভিযোজনের মধ্যে ছিলো চারটি যোগব্যায়ামের পদ্ধতি,যার মধ্যে রাজযোগ,পতঞ্জলির যোগ সূত্রের ব্যাখ্যা,অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ১৮৯৬ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর বই রাজযোগ প্রকাশিত হয়, যা তাৎক্ষণিক সাফল্য লাভ করে এবং প্রাশ্চাত্যে যোগ ব্যাখ্যার জন্য অত্যন্ত প্রভাবশালী ভূমিকা রেখেছিলো।

তিনি আমেরিকা এবং ইউরোপের কতিপয় অকৃত্রিম শিষ্যকে আকৃষ্ট করেছেন, যার মধ্যে ছিলেন জোসেফিন ম্যাকলিওড, উইলিয়াম জেমস, জোসাই রয়েস, রবার্ট জি ইঙ্গারসোল, নিকোলা টেসলা, লর্ড কেলভিন, হ্যারিয়েট মনরো, এলা হুইলার উইলকক্স, সারাহ বার্নহার্ডট, এমা ক্যালভি, হারম্যান লুডউইক ফারডিন্যান্ড ভন হেলমহোলটজ। তাঁর বেশ কিছু দীক্ষাপ্রাপ্ত অনুগামী ছিলেন: মারি লুইস (একজন ফরাসি মহিলা) যিনি পরবর্তীতে স্বামী অভয়ানন্দ এবং লিওন ল্যান্ডসবার্গ, যিনি পরবর্তীতে স্বামী কৃপানন্দ হিসেবে পরিচিত হন যাতে তারা বেদান্ত সোসাইটি অব মিশন নিয়ে কাজ চালিয়ে যেতে পারেন। এমনকি এযাবৎকাল পর্যন্ত এখানে বিদেশি নাগরিকদের আনাগোনা রয়েছে যা লস অ্যাঞ্জেলেসে অবস্থিত। আমেরিকা থাকাকালীন বিবেকানন্দকে ক্যালিফোর্নিয়ার সান হোসে রাজ্যের দক্ষিণ পর্বতে বেদান্ত ছাত্রদের জন্য একটি আশ্রম স্থাপনের উদ্দেশ্যে জমি দেওয়া হয়। তিনি এটিকে শান্তি আশ্রম নামে উল্লেখ করেন।

স্বামী বিবেকানন্দ মানুষের মনকে একটি সর্বদা অশান্ত ও নিজের প্রকৃতির বশে চঞ্চল বানরের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি দেখেছিলেন, মানুষের মন সাধারণত বাইরের দিকে বেরোতে চায়। আর তার জন্য সে ইন্দ্রিয়গুলিকে অবলম্বন করে। তাই তিনি আত্মসংযমের উপর জোর দিয়েছিলেন।কারণ তিনি বলেছেন, সংযত মনের চেয়ে শক্তিশালী আর কিছুই হয় না। আর যতই মনকে সংযত করা হয়, তার শক্তি ততো বাড়ে।তাই তিনি এমন কিছু করতে বারণ করেছেন, যা মনকে অশান্ত করে বা মনের অসুবিধা সৃষ্টি করে।
স্বামী বিবেকানন্দ লক্ষ্য করেছিলেন সব জায়গাতেই নারী জাতিকে খেলনা মনে করা হয়। আধুনিক যুগে আমেরিকার মতো দেশে নারীর স্বাধীনতা আছে। তবুও বিবেকানন্দ সেখানে দেখেছিলেন, পুরুষ জাতি মেয়েদের সৌন্দর্যের নিরিখে তাদের বিচার করে। বিবেকানন্দ বলেছিলেন, এটা অনৈতিক। আর নারী জাতিরও এটা মেনে নেওয়া উচিত না। বিবেকানন্দের মতে, এতে মানবতার মহান দিকটি নষ্ট হয়ে যায়। বিবেকানন্দের মতে, ভারতে নারী জাতির আদর্শ হলো মাতৃত্ব।অসামান্য,নিঃস্বার্থ, সর্বংসহা, ক্ষমাশীলা মায়ের আদর্শটিকে বিবেকানন্দ উচ্চ স্থান দিয়েছেন। ভারতীয় জাতির যে দুটি অভ্যাসকে তিনি সবচেয়ে অকল্যাণকর বলে চিহ্নিত করেন, সেদুটি হলো নারী জাতির অবমাননা ও জাতিভেদ প্রথা। স্বামী বিবেকানন্দ লিঙ্গ বৈষম্যের সম্পূর্ণ বিরোধিতা করেছেন। তার মতে আত্মায় লিঙ্গ বা বর্ণভেদ করা অশাস্ত্রীয়। এমনকি যোগ্যতার নিরিখ বিচার করাও অন্যায়। তাই তিনি পুরুষ-নারী চিন্তা না করে মানুষ চিন্তা করতে বলেছেন। স্বামী বিবেকানন্দের মতে, জাতির উন্নতির মাপকাঠিই হলো সেই জাতিতে নারীর মর্যাদার স্থান।আর তাই ভারতে নারীর অবস্থা ভালো না হলে ভারতের অতীত মর্যাদা ও গৌরব উদ্ধার করা সম্ভব নয় বলেই তিনি মত প্রকাশ করেছেন। বিবেকানন্দ পুরুষ ও নারীকে পাখির দুই ডানার সঙ্গে তুলনা করেছেন। পাখি যেমন এক ডানায় ভর করে উড়তে পারে না, তেমনি নারী জাতির অবস্থা উন্নত না হলে জগতের উন্নতি সম্ভব নয় বলেই তিনি মত প্রকাশ করেছেন।

সাফল্য অর্জন করা নিয়ে স্বামীজির বাণী, ‘সাফল্য লাভ করিতে হইলে প্রবল অধ্যবসায়, প্রচন্ড ইচ্ছাশক্তি থাকা চাই। অধ্যবসায়শীল সাধক বলেন,’ আমি গন্ডূষে সমুদ্র পান করিব। আমার ইচ্ছামাত্র পর্বত চূর্ণ হইয়া যাইবে। এইরূপ তেজ, এইরূপ সংকল্প আশ্রয় করিয়া খুব দৃঢ়ভাবে সাধন করো। নিশ্চয়ই লক্ষে উপনীত হইবে।বিপদে মানুষ পড়তেই পারেন। তবে সেখান থেকে নিজেকে তুলে ধরতে রাস্তা দেখিয়েছেন স্বামী বিবেকানন্দ। তিনি বলছেন, ‘নিজেদের বিপদ থেকে টেনে তোলো! তোমার উদ্ধার-সাধন তোমাকেই করতে হবে।ভীত হয়ো না। বারবার বিফল হয়েছো বলো নিরাশ হয়ো না। কাল সীমাহীন, অগ্রসর হতে থাকো, বারবার তোমার শক্তি প্রকাশ করতে থাকো, আলোক আসবেই।

স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন,’হে বীরহৃদয় যুবকগণ ,তোমরা বিশ্বাস কর যে ,তোমরা বড় বড় কাজ করবার জন্য জন্মেছ। ওঠ, জাগো, আর ঘুমিও না; সকল অভাব, সকল দুঃখ ঘুচাবার শক্তি তোমাদের ভিতরেই আছে। এ কথা বিশ্বাস করো, তা হলেই ঐ শক্তি জেগে উঠবে।’স্বামীজি বলেছেন, ‘তোমরা কাজ করে চল। দেশবাসীর জন্য কিছু কর-তাহলে তারাও তোমাদের সাহায্য করবে, সমগ্র জাতি তোমার পিছনে থাকবে। সাহসী হও, সাহসী হও! মানুষ একবারই মরে। আমার শিষ্যেরা যেন কখনো কোনমতে কাপুরুষ না হয়। মানুষের কল্যাণ এবং সার্বিক উন্নতিতে কাজ করার অভীপ্সায় স্বামী বিবেকানন্দ হাজার বার জন্মগ্রহণে রাজি। এর জন্য নরকে যেতেও তিনি প্রস্তত। শত শত বুদ্ধের কারুণ্য-নিষিক্ত হৃদয়বান মানুষই ছিলো তাঁর কাক্সিক্ষত। অজ্ঞ, কাতর, পীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কাজে, তাদের স্বমহিমায় উদ্ভাসিত করার লক্ষ্যে তিনি ছিলেন প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। তাই তাঁর ধর্ম-দর্শন-অধ্যাত্মচিন্তার সবটাই জুড়ে আছে মানুষের কথা। তাঁর কাজ, চিঠি, প্রবন্ধ, বক্তৃতা নিজের হাতে গড়ে তোলা রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের কেন্দ্রেও সেই মানুষের কল্যাণ ও উত্থানের প্রসঙ্গ এবং প্রাধান্য। গুরুভাই তূরীয়ানন্দকে তিনি বলেন, ‘জীবে জীবে, বিশেষত মানুষের মধ্যে তাঁর অবস্থান’। ‘তাঁর’ অর্থাৎ মানুষ যাঁকে বলে দেবতা। যোগীর ধারণায় পরমপুরুষ ভগবান ঈশ্বর! বৈদান্তিক অনুভবে তিনিই পরমব্রহ্ম।

বাংলা তথা সমগ্র ভারতবর্ষের সবচেয়ে বিখ্যাত দার্শনিক ছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ। তিনি একজন দার্শনিক ছাড়াও ছিলেন লেখক ও সঙ্গীতজ্ঞ মানুষও। তাঁর লেখা প্রত্যেকটা বই আজও সকল বাঙালী তথা সমগ্র বাংলা ভাষাভাষীকে সমানভাবে মুগ্ধ ও অনুপ্রাণিত করে চলেছে। কোটি-সূর্যের আলোর ন্যায় ভাস্বর যে মুক্তপুরুষ সমগ্র জগতের মধ্যে হিন্দুধর্মের মহিমা প্রচার করেছিলেন, তিনিই স্বামী বিবেকানন্দ। একমাত্র স্বামী বিবেকানন্দই সহজ ও সুন্দর উপায়ে বেদান্তের ফলিত রূপের প্রচার ও প্রসার ঘটাতে সক্ষম হয়েছিলেন। স্বামী বিবেকানন্দের জীবনী ও বাণী পর্যবেক্ষণ করলে বোঝা যায় যে, তৎকালীন সন্ন্যাসীদের মধ্যে তিনি কতটা যুগোপযুগী ছিলেন। স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ছিলো,“যখন আপনি ব্যস্ত থাকেন তখন সব কিছুই সহজ বলে মনে হয় কিন্তু অলস হলে কোনো কিছুই সহজ বলে মনে হয়না”।“নিজের জীবনে ঝুঁকি নিন,যদি আপনি জেতেন তাহলে নেতৃত্ব করবেন আর যদি হারেন তাহলে আপনি অন্যদের সঠিক পথ দেখাতে পারবেন”।“কখনো না বলোনা, কখনো বলোনা আমি করতে পারবোনা’’। তুমি অনন্ত এবং সব শক্তি তোমার ভিতরে আছে, তুমি সব কিছুই করতে পারো”।“কখনো বড় পরিকল্পনার হিসাব করবেন না, ধীরে ধীরে আগে শুরু করুন, আপনার ভূমি নির্মাণ করুন তারপর ধীরে ধীরে এটিকে প্রসার করুন”।“মনের শক্তি সূর্যের কিরণের মতো, যখন এটি এক জায়গায় কেন্দ্রীভূত হয় তখনই এটি চকচক করে ওঠে”। “একটি সময়ে একটিই কাজ করো এবং সেটা করার সময় নিজের সবকিছুই তার মধ্যে ব্যয় করে দেও”। “নিজেকে দুর্বল মনে করা সবথেকে বড় পাপ”।“যদি কোনদিন, আপনার সামান্য কোনো সমস্যা না আসে, আপনি নিশ্চিত হতে পারেন যে আপনি ভুল পথে হাটছেন” মনীষী স্বামী বিবেকানন্দ মানুষের জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার এবং নেতিবাচক দিকগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে জীবনে সাফল্যে লাভের জন্য আলোর পর্দাটা তুলে দিতে সচেষ্ট ছিলেন সবসময়। তিনি কাজ করেছেন মানুষের জন্য, মানুষের কল্যানের জন্য।

স্বামী বিবেকানন্দ শুধু বাঙালির জীবনের এক আদর্শ মহামানবই নন, তিনি যুগাবতার। তাঁর দেখানো আদর্শের রাস্তা যুক্তিবোধের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায় মানুষকে। আধ্যত্মকে এক অন্য পর্যায়ে উন্নতি করে স্বামীজী সকলের জীবনকে আরও বেশি করে আলোর দিকে ঠেলেদিয়েছেন। নেতিবাচক ভাবনার অন্ধকার দিকটির পর্দা সরিয়ে তিনি বাঙালির জীবনবোধকে আরও বেশি করে অনুপ্রাণিত করেছেন। উদ্বুদ্ধ হয়েছে যুব সমাজ, আর সেজন্যই তার জন্মদিন ১২ জানুয়ারি যুব দিবস বলে খ্যাত।
স্বামী বিবেকানন্দ আধুনিক ভারতবর্ষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মনীষী, ধর্মসংস্কারক, সমাজ চিন্তাবিদ ও লেখক। স্বামী বিবেকানন্দ ভারতের সুপ্ত চেতনাকে তাঁর শান্তি ও ভ্রাতৃত্বের বাণী দিয়ে জাগ্রত করেছিলেন। তিনিই প্রথম ভারতীয় যিনি বেদান্ত ও যোগ দর্শন পাশ্চাত্যে প্রচার করেন। অসাধারণ বাগ্মী ও দৃঢ় ব্যক্তিত্বসম্পন্ন বিবেকানন্দ নানা সংস্কার, প্রথা ও আচারের বাতাবরণ ছিন্ন করে ভারতবর্ষের মানুষকে মানবতাবাদের আহ্বানে উদ্বুদ্ধ করায় সচেষ্ট ছিলেন। তিনি আধুনিক ভারতের অন্যতম স্রষ্টা হিসেবে পূজিত। ২০০৪ সালে বিবিসি বাংলা একটি ‘ম্রোতা জরিপ’-এর আয়োজন করে। বিষয়টি ছিলো-সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি কে? ত্রিশ দিনের ওপর চালানো জরিপে শ্রোতাদের ভোটে নির্বাচিত শ্রেষ্ঠ ২০জনের জীবন নিয়ে বিবিসি বাংলায় বেতার অনুষ্ঠান পরিবেশিত হয় ২০০৪-এর ২৬শে মার্চ থেকে ১৫ই এপ্রিল পর্যন্ত। বিবিসি বাংলার সেই জরিপে শ্রোতাদের মনোনীত শীর্ষ ২০জন বাঙালির তালিকায় ১৭তম স্থানে ওঠে আসেন ধর্মগুরু স্বামী বিবেকানন্দ। অবশেষে ৪ই জুলাই ১৯০২ সালে, মাত্র ৩৯ বছর বয়সে স্বামী বিবেকানন্দ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তিনি নাকি সেইদিন, ভোরবেলা ঘুম থেকে ওঠেন এবং বেলুড় মঠ প্রাঙ্গনে তিন ঘন্টা ধরে ধ্যানও করেন । এছাড়াও তিনি স্বামী প্রেমানন্দের সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে তাঁর সাথে রামকৃষ্ণ মঠের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাগুলো সম্পর্কে আলোচনাও করেন। এরপর সন্ধ্যা ৭টা নাগাদ তিনি তাঁর ঘরে ফেরেন এবং সবাইকে নির্দেশ দেন বিরক্ত না করার । এর ঠিক প্রায় দুই ঘন্টা পর অর্থাৎ রাত ৯:১০ মিনিটে ধ্যানরত অবস্থায়ই তাঁর মৃত্যু হয়। ডাক্তারদের মতে তাঁর মৃত্যু হয়েছিলো মস্তিস্কের একটা রক্তনালী ফেটে যাওয়ার ফলে কিন্তু তাঁর শিষ্যদের মতে তিনি নাকি স্বেছায় দেহত্যাগ করেন,তাঁর মৃত্যু হয়নি।

লেখক, সাবেক জাতীয় ক্রীড়াবিদ(কারাতে ব্লাক বেল্ট ১ম ড্যান)
গবেষক,সাংবাদিক,কলামিস্ট ও চেয়ারম্যান গ্রিন ক্লাব, মানিকগঞ্জ