বাংলা সাহিত্যের সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

 

মো : আলতাফ হোসেন ঃঃ

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ছিলেন উনিশ শতকের বিশিষ্ট বাঙালি ঔপন্যাসিক। বাংলা গদ্য ও উপন্যাসের বিকাশে তার অসীম অবদানের জন্যে তিনি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে অমরত্ব লাভ করেছেন। তাকে সাধারণত প্রথম আধুনিক বাংলা ঔপন্যাসিক হিসেবে গণ্য করা হয়। তবে গীতার ব্যাখ্যাদাতা হিসাবে,সাহিত্য সমালোচক হিসাবেও তিনি বিশেষ খ্যাতিমান। তিনি জীবিকাসূত্রে ব্রিটিশ রাজের কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি বাংলা ভাষার আদি সাহিত্যপত্র বঙ্গদর্শনের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন। তিনি ছদ্মনাম হিসেবে কমলাকান্ত নামটি বেছে নিয়েছিলেন। তাঁকে বাংলা উপন্যাসের জনক বলা হয়। এছাড়াও তিনি বাংলা সাহিত্যের সাহিত্য সম্রাট হিসেবে পরিচিত।

বঙ্কিমচন্দ্র রচিত আনন্দমঠ (১৮৮২) উপন্যাসের কবিতা বন্দে মাতরম ১৯৩৭ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস কর্তৃক ভারতের জাতীয় স্তোত্র হিসেবে স্বীকৃতি পায়। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ১৮৩৮ সালের ২৬ জুন জন্ম গ্রহণ বর্তমান উত্তর ২৪ পরগনা জেলার নৈহাটি শহরের নিকটস্থ কাঁঠালপাড়া গ্রামে। চট্টোপাধ্যায়দের আদিনিবাস ছিলো হুগলি জেলার দেশমুখো গ্রামে। বঙ্কিমচন্দ্রের পূর্বপুরুষ রামজীবন চট্টোপাধ্যায় কাঁঠালপাড়ার রঘুদেব ঘোষালের কন্যাকে বিবাহ করেন। রামজীবনের পুত্র তথা বঙ্কিমচন্দ্রের প্রপিতামহ রামহরি চট্টোপাধ্যায় মাতামহের সম্পত্তি পেয়ে কাঁঠালপাড়ায় আসেন এবং সেখানেই বসবাস শুরু করেন। রামহরির পৌত্র যাদবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের তৃতীয় পুত্র বঙ্কিমচন্দ্র,মাতা দুর্গাসুন্দরী দেবী,বঙ্কিমের পূর্বে তার আরও দুই পুত্রের জন্ম হয় শ্যামাচরণ ও সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। বঙ্কিমের জন্মকালে তিনি সদ্য অবিভক্ত মেদিনীপুর জেলার ডেপুটি কালেক্টর পদে উন্নীত হয়েছিলেন।

১৮৪৪ সালে বঙ্কিমচন্দ্র পিতার কর্মস্থল মেদিনীপুরে আনীত হলে, সেখানেই তাঁর প্রকৃত শিক্ষার সূচনা হয়। মেদিনীপুরের ইংরেজি স্কুলের প্রধান শিক্ষক জনৈক এফ টিডের পরামর্শে যাদবচন্দ্র শিশু বঙ্কিমকে তার স্কুলে ভর্তি করে দেন। এখানেও বঙ্কিম অল্পকালের মধ্যেই নিজ কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হন। পূর্ণচন্দ্রের রচনা থেকে জানা যায়, বার্ষিক পরীক্ষার ফলে সন্তুষ্ট হয়ে টিড সাহেব বঙ্কিমকে ডবল প্রমোশন দিতে উদ্যত হলে যাদবচন্দ্রের হস্তক্ষেপে তিনি নিরস্ত হন। ১৮৪৭ সালে টিড ঢাকায় বদলি হয়ে গেলে সিনক্লেয়ার তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন; তাঁর কাছেও বঙ্কিম প্রায় দেয় বছর ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করেন।

জন্মের পর ছয় বছর বঙ্কিমচন্দ্র কাঁঠালপাড়াতেই অতিবাহিত করেন। পাঁচ বছর বয়সে কুল-পুরোহিত বিশ্বম্ভর ভট্টাচার্যের কাছে বঙ্কিমচন্দ্রের হাতে খড়ি হয়। শিশু বয়সেই তাঁর অসামান্য মেধার পরিচয় পাওয়া যায়। বঙ্কিমের কণিষ্ঠ সহোদর পূর্ণচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন, “শুনিয়াছি বঙ্কিমচন্দ্র একদিনে বাংলা বর্ণমালা আয়ত্ত করিয়াছিলেন। যদিও গ্রামের পাঠশালায় বঙ্কিম কোনো দিনই যাননি। পাঠশালার গুরুমশাই রামপ্রাণ সরকার বাড়িতে তাঁর গৃহশিক্ষক নিযুক্ত হন। বঙ্কিমচন্দ্রের রচনা থেকে মনে হয় তিনি রামপ্রাণের শিক্ষা থেকে বিশেষ উপকৃত হননি। তিনি লিখেছেন, “সৌভাগ্যক্রমে আমরা আট দশ মাসে এই মহাত্মার হস্ত হইতে মুক্তিলাভ করিয়া মেদিনীপুর গেলাম।

১৮৪৯ সালে বঙ্কিমচন্দ্র পুনরায় কাঁঠালপাড়ায় ফিরে আসেন। এইসময় কাঁঠালপাড়ার শ্রীরাম ন্যায়বাগীশের কাছে বঙ্কিম বাংলা ও সংস্কৃতের পাঠ নেন। বঙ্কিমচন্দ্র খুব ভালো আবৃত্তিকারও ছিলেন। সংবাদ প্রভাকর ও সংবাদ সাধুরঞ্জন নামক সংবাদপত্রে প্রকাশিত বহু কবিতা তিনি এই বয়সেই কণ্ঠস্থ করে ফেলেন। ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর বিরচিত বিদ্যাসুন্দর কাব্য থেকে বিদ্যার রূপবর্ণন ও জয়দেব প্রণীত গীতগোবিন্দম্ কাব্য থেকে ধীরে সমীরে যমুনাতীরে কবিতাদুটি তিনি প্রায়শই আবৃত্তি করতেন। এছাড়াও পন্ডিত হলধর তর্কচূড়ামণির কাছে এই সময় তিনি মহাভারত শ্রবণ করতেন। হলধরই তাঁকে শিক্ষা দেন “শ্রীকৃষ্ণ আদর্শ পুরুষ ও আদর্শ চরিত্র”। এই শিক্ষা তাঁর পরবর্তী জীবনে রচিত নানা রচনাতে প্রতিফলিত হয়েছিলো।

১৮৪৯ সালে হুগলি কলেজে (অধুনা হুগলী মহসিন কলেজ) ভর্তি হন। এখানে তিনি সাত বছর পড়াশোনা করেন। হুগলি কলেজ পড়াকালীন ১৮৫৩ সালে জুনিয়র স্কলারশিপ পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করে মাসিক আট টাকা বৃত্তি লাভ করেন। এই বছরেই সংবাদ প্রভাকরে কবিতা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে বিশ টাকা পুরস্কার লাভ করেন। হুগলি কলেজ অধ্যয়নকালেই বঙ্কিমচন্দ্র কবিবর ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের সংবাদ প্রভাকর ও সংবাদ সাধুরঞ্জনে গদ্য-পদ্য রচনা আরম্ভ করেন। পরবর্তীকালে তাঁর বহু রচনা এই দুই কাগজে প্রকাশিত হয়।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ঔপন্যাসিক, সাংবাদিক, বাংলার নবজাগরণের অন্যতম প্রধান পুরুষ। পিতা যাদবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রথম দিকে ছিলেন ব্রিটিশ উপনিবেশিক সরকারের একজন কর্মকর্তা, পরে হুগলির ডেপুটি কালেক্টর হন। ১৮৫৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ব্যাচের যে দুজন ছাত্র বিএ পাস করেন, বঙ্কিমচন্দ্র ছিলেন তাঁদের একজন। তিনি তাঁর পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে নিম্ন নির্বাহী চাকরিতে (সাব-অর্ডিনেট এক্সিকিউটিভ সার্ভিস) যোগ দেন এবং পরে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও ডেপুটি কালেক্টর পদে চাকরি করেন। উপনিবেশিক সরকারের কর্মকর্তা হিসেবে বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর দায়িত্ব দক্ষতার সঙ্গে পালন করেন। তাঁর কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ কর্তৃপক্ষ তাঁকে ১৮৯১ সালে ‘রায়বাহাদুর’ এবং ১৮৯৪ সালে ‘কোম্পানিয়ন অব দ্যা মোস্ট ইমিনেন্ট অর্ডার অব দ্যা ইন্ডিয়ান ইমপায়ার, (সিএমইওআই-ই) উপাধি প্রদান করে। বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর পেশাগত জীবনে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন, তা তাঁর চিন্তা ও কর্মে গুরুতপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে ইতিহাসে তিনি সরকারি চাকরিজীবী হিসেবে নন, বরং একজন লেখক ও হিন্দু পুনরুত্থানবাদী চিন্তাবিদ হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত।
বাংলা সাময়িকী সাহিত্যের প্রসারেও বঙ্কিমচন্দ্রের অবদান অসামান্য। তাঁর সম্পাদিত বঙ্গদর্শন পত্রিকার মাধ্যমে একটি নতুন লেখকগোষ্ঠীর আবির্ভাব ঘটে। তাঁরা সাময়িকী সাহিত্যের বিষয় বস্তু এবং রচনাশৈলীর দিক থেকে এক নতুন আদর্শ স্থাপন করেন। সমাচার দর্পণ, সংবাদ প্রভাকর, সম্বাদ কৌমুদী এবং তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা রচনাশৈলীর যে ধারা সৃষ্টি করেছিলো, বঙ্কিমচন্দ্র তার পরিবর্তন করে ভিন্নধর্মী সমালোচনার ধারা সৃষ্টি করেন, যদিও অতীতের মতো ধর্মীয় আলোচনা ছিলো এর প্রধান বৈশিষ্ট্য।

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ছিলেন উনিশ শতকের বিশিষ্ট বাঙালি ঔপন্যাসিক। বাংলা গদ্য ও উপন্যাসের বিকাশে তাঁর অসীম অবদানের জন্য তিনি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে অমরত্ব লাভ করেছেন। তাঁকে সাধারণত প্রথম আধুনিক বাংলা ঔপন্যাসিক হিসেবে গণ্য করা হয়। তিনি ছদ্মনাম হিসেবে কমলাকান্ত নামটি বেছে নিয়েছিলেন। তাঁকে বাংলা সাহিত্যের সাহিত্য সম্রাটও বলা হয়। বাংলা উপন্যাস ও বাংলা গদ্য সাহিত্যের উৎকর্ষ সাধনে বঙ্কিমচন্দ্রের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। চরিত্র চিত্রণ, শিল্পসৃজন, বর্ণনা, নান্দনিকতা এবং সর্বোপরি বাংলা গদ্যের উৎকর্ষ সাধনে বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর পূর্বসূরিদের থেকে অনেক দূর অগ্রসর হয়েছিলেন। তাঁর সম্পাদিত ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকার মাধ্যমে একটি নতুন লেখকগোষ্ঠীর আবির্ভাব ঘটে। সনাতন ধর্ম সম্পর্কে তাঁর নিজস্ব ব্যাখ্যা ‘কৃষ্ণচরিত’, ‘ধর্মতত্ত্ব’ ও ‘শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা’ নামে ধারাবাহিকভাবে বঙ্গদর্শনে প্রকাশিত হয়। বঙ্গদর্শন মাত্র চার বছর (১৮৭২-১৮৭৬) স্থায়ী হয়েছিলো। সাহিত্যজীবনের শেষ দিকে বঙ্কিমচন্দ্রকে সৃজনশীল সাহিত্যচর্চার চেয়ে সনাতন ধর্মের প্রকৃত স্বরূপ উদ্ঘাটনের প্রতিই বেশি মনোযোগী মনে হয়েছিলো। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় উনিশ শতকের বাঙালি সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর প্রথম দুটি বিখ্যাত উপন্যাস দূর্গেশনন্দিনী (১৮৬৫) ও কপালকুন্ডলা (১৮৬৬) রচনা করেন। উপন্যাস দুটি দ্রুত প্রচার লাভ করে। বাংলা উপন্যাস ও বাংলা গদ্য সাহিত্যের উৎকর্ষ সাধনে বঙ্কিমচন্দ্রের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর পূর্বে বাংলা উপন্যাস বলতে যা বোঝাত তা ছিলো কতিপয় সংস্কৃত নাটক ও গল্প এবং কিছু ফারসি ও আরবি গল্পের অনুবাদ এবং সেগুলি ছিলো প্রধানত শিক্ষামূলক ও নীতিমূলক। সেসব উপন্যাসের মূল লক্ষ্য ছিলো কাব্যচর্চা, প্রকৃতির পূঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা, মানবীয় সৌন্দর্যের অযৌক্তিক উপস্থাপনা, অবিরাম কাল্পনিক ঘটনার বিবরণ এবং বিস্ময়কর ও অতিপ্রাকৃত বিষয়ের বর্ণনা। রচনারীতি ও গদ্যশৈলীর দিক থেকে ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নববাবু বিলাস (১৮২৩) এবং প্যারীচাঁদ মিত্রের আলালের ঘরের দুলাল (১৮৫৮) ছিল আধুনিক সাহিত্যের ধারায় দুটি ব্যতিক্রমধর্মী রচনা। চরিত্রচিত্রণ, শিল্পসৃজন, বর্ণনা, নান্দনিকতা এবং সর্বোপরি বাংলা গদ্যের উৎকর্ষ সাধনে বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর পূর্বসূরিদের থেকে অনেক দূর অগ্রসর হয়েছিলেন এবং বাংলা সাহিত্যকে এমন একটি ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন যার প্রত্যক্ষ প্রভাবে বিকশিত হয়েছে বিশ শতকের বাংলা ভাষা ও সাহিত্য।

সাহিত্য জীবনের শেষ দিকে বঙ্কিমচন্দ্রকে সৃজনশীল সাহিত্যচর্চার চেয়ে হিন্দুধর্মের প্রকৃত স্বরূপ উদ্ঘাটনের প্রতিই বেশি মনোযোগী মনে হয়েছে। ১৮৮০-র দিকে স্পষ্টতই তিনি সাহিত্যচর্চার চেয়ে ধর্মচর্চার প্রতি বেশি ঝুঁকে পড়েন। তিনি প্রাচীন ভারতের নৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের পুনঃপ্রতিষ্ঠা চেয়েছিলেন। তাঁর এ ধারণা আনন্দমঠ (১৮৮২) ও দেবী চৌধুরাণী (১৮৮২) গ্রন্থে এবং ধর্মশাস্ত্র ও গীতার ভাষ্যে পরিষ্কারভাবে ফুটে উঠেছে। তিনি নব্য হিন্দুবাদের একজন সংস্কারক এবং একটি হিন্দুজাতি গঠনের চেষ্টা করেছিলেন।
আধুনিক বাংলা সাহিত্যের যে সূচনা হয়েছিলো ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের (১৮১২-১৮৫৯) হাতে, সেই প্রারম্ভের সৃজন-নায়কত্ব সময়ের প্রবাহে ও সমাজের প্রয়োজনে একদিন চলে এসেছিলো বঙ্কিমচন্দ্রের চিন্তা-প্রকাশের দরোজায়। চিন্তানায়ক বঙ্কিম মেধাবী শিক্ষার্থী ছিলেন। লেখার ভাষা কেমন হওয়া চাই এমন ধারণা নিয়ে নিবন্ধ লিখতে গিয়ে বঙ্কিম এভাবেই শুরু করেছেন তাঁর বক্তব্য। ‘বাঙ্গালা ভাষা’ নিবন্ধটিতে তিনি বাংলা ভাষার কথিত রীতি বা প্রচলিত রীতির সাহিত্যিক প্রাসঙ্গিকতা পরিবেশন করতে চেয়েছেন। সমকালে বঙ্কিমচন্দ্রের চিন্তাশীলতা এবং সাধনা বাংলাভাষার উন্নতিকল্পে বিশেষ অবদান রেখেছিলো। উত্তরকালেও তার প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়নি। কঠিন-দুর্বোধ্য ভাষাপ্রিয়তাকে পরিহার করে, তিনি সহজ ও সর্বজনের কাছে পরিচিত তথা চলিত বাংলা প্রবর্তনের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন। এবং তিনি লক্ষ্যও করেছিলেন যে, সমকালীন শিক্ষিত-ভদ্র সম্প্রদায় বাংলাভাষার প্রকৃত প্রয়োগে আগ্রহী। তাই তিনি বললেন: “যে-ভাষা বাঙ্গালা সমাজে প্রচলিত, যাহাতে বাঙ্গালার নিত্য কার্যসকল সম্পাদিত হয়, যাহা সকল বাঙ্গালিতে বুঝে, তাহাই বাঙ্গালা ভাষা তাহাই গ্রন্থাদির ব্যবহারের যোগ্য।” রঙ্গ-ব্যঙ্গময় ভাষা নাকি পন্ডিতি ভাষা কোনটি পাঠকের কাছে, লেখকের কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়া উচিত এবং সমালোচনা প্রভৃতির ভাষা কী হওয়া প্রয়োজন, সে-বিষয়েও তাঁর অভিমত অত্যন্ত পরিষ্কার।

সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র বাংলা সাহিত্যে এক অনন্য প্রতিভার অধিকারী। তাঁর অপ্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিভার স্পর্শে জাতি নবচেতনায় জাগ্রত হয়, স্বাজাত্যবোধে উদ্বুদ্ধ হয়, নতুন আদর্শে অনুগ্রাণিত হয়, বাংলা ভাষা ও সাহিত্য সঙ্কুচিত গন্ডী পেরিয়ে বৃহত্তর আঙিনায় পদার্পণ করে। তার প্রতিভার ছোঁয়ায় দীর্ঘকালের সুপ্তি কেটে গেলো, গতানুগতিকতা ও পুচ্ছানুগ্রাহিতার অবসান ঘটলো, ভাস্বর হয়ে ওঠে সাহিত্যের অঙ্গন। আর ভাড়ামি নয়, নির্মল শুভ্র সংযত ও বুদ্ধিদীপ্ত হাস্যরস আস্বাদন করে বাঙালীর রুচি বদল হলো। সেই বিজয় বসন্ত গোলেব কাত্তলি কেচ্ছাকাহিনীর দিন ফুরোলো, সাহিত্য জীবনমুখী হলো, জাতির চাওয়া-পাওয়া, জাতির জীবনের সমস্যা সাহিত্যে প্রতিফলিত হলো। সাহিত্য ও সংস্কৃতি জগতে এক বিরাট পরিবর্তন ঘটল। সাহিত্যে বৈচিত্র্য আসে। তার সৃষ্টি-ধন্য হয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য শৈশব থেকে যৌবনে পদার্পণ করে। তিনিই জাতীয় মন্ত্রের উদগাতা সাহিত্য সম্রাট ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র।

ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের সংবাদ প্রভাকর পত্রিকায় বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্য সাধনার সূত্রপাত। ললিতা ও মানস কাব্য কীর্তি তাঁর প্রথম সাহিত্যিক নিদর্শন। মধুসূদনের মতো প্রথম বয়সে বঙ্কিমচন্দ্র ও ইংরেজির মোহে বিভ্রান্ত হয়ে ইংরেজি ভাষায় রাজমোহন’সুইফ উপন্যাস রচনা করেন। কিন্তু অচিরেই তাঁর মােহভঙ্গ ঘটে। অনাদৃত মাতৃভাষায় তিনি ফিরে এলেন। তার প্রতিভা স্পর্শে বাংলা সাহিত্যের শুকনো খাতে যেনো বান ডাকলো। সৃষ্টি বৈচিত্রে বাংলা সাহিত্যের ডালি ভরে উঠলো। বদ্ধিম সম্পাদিত মাসিক পত্র বঙ্গদর্শন বাঙালী পাঠকসমাজকে চমকিত করলো। ‘বঙ্গদর্শনে’র পাতায় বঙ্কিমের প্রথম উপন্যাস ‘দুর্গেশনন্দিনী যে নতুন ধারার সূচনা করে। তরঙ্গমুখর নির্জন সমুদ্রতীরে সন্ধ্যালোকে এলায়িত কুস্তলা উদাসী সুন্দরী কপালকুন্ডলার যে বাণীমূর্তি একেছেন, রোমান্স হিসাবে তা ভারতীয় সাহিত্যে শুধু নয়,বিশ্ব সাহিত্যে বিরল। এর পর একে একে অষ্ট্রা বঙ্কিমের হাত থেকে রচিত হলো,মৃণালিনী’, যুগোলাঙ্গুরীয়’,‘চন্দ্রশেখর’, ‘রাজসিংহ’, ‘আনন্দমঠ’, ‘দেবীচৌধুরানী’, ‘সীতারাম’,বিষবৃক্ষ,‘কৃষ্ণকান্তের উইল’,‘রজনী’ ও ‘রাধারানী’ এই সব উপন্যাসে বাংলা সাহিত্যে স্থায়ী সম্পদ রূপে পরিগণিত হলো। আনন্দমঠে উত্তরবঙ্গের সন্ন্যাসী বিদ্রোহকে গৌরবান্বিত ভূমিকায় স্থাপন করে তিনি যে দেশাত্মবােধের বাণী উচ্চারণ করলেন, তাতে সমগ্র ভারতবাসী উজ্জীবিত হয়। এর অগ্নিগর্ভ স্বাদেশিকতা বিপ্লবীদের মনে উদ্দীপনার সঞ্চার করে। এই উপন্যাসে কথিত স্বদেশ প্রেমের বীজমন্ত্র ‘বন্দেমাতরম দ্বারা আসমুদ্র হিমাচল মন্দ্রিত হয়। এই সব উপন্যাসের কাহিনী বিন্যাস, চরিত্র চিত্রণ, বিষয় ভাবনা বাংলা সাহিত্যে শুধু নয়, ভারতীয় উপন্যাস সাহিত্যের আদর্শ হয়ে আছে।

বঙ্কিমচন্দ্রের প্রতিভার শেষ পর্যায় পূর্ণভাবে প্রকাশ পায় স্বাদেশিকতা ও অনুশীলন ধর্মের ব্যাখ্যা। ‘কমলাকান্তের দপ্তরে’র নায়ক নেশাখোর কমলাকান্তের মুখে মাতৃপ্রেমের প্রথম প্রকাশ ‘আনন্দমঠের’ ‘বন্দেমাতরম’ মন্ত্রে পূর্ণ প্রতিষ্ঠা পায়। বঙ্কিমচন্দ্রের প্রায় সব উপন্যাসই ইংরেজি, জার্মান, হিন্দি, কানাড়া, তেলেগু প্রভৃতি ভাষায় অনুবাদ হয়েছে। তাঁর উপন্যাসগুলির নাট্যরূপ সাফল্যের সঙ্গে মঞ্চে অভিনীত ও সিনেমায় রূপায়িত হয়েছে। উপন্যাসগুলির নাটকীয়তা ও রোমান্টিকভাব সফলতার একটা কারণ। ঐতিহাসিক উপন্যাসের বিস্তৃত আঙিনায় বাঙালির রোমান্টিক মনকে প্রথমে মুক্তি দিয়েছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র।

জীবনবোধ এবং জীবন দর্শনের উপর ভিত্তি করেই স্থাপিত হয় কবি, সাহিত্যিকদের রচনা এবং মনীষীদের জীবন। যা জীবন দর্শন যত উন্নত, গভীর তিনি পেয়েছেন পাঠকের মনে শীর্ষস্থান। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সময়ে তাঁর চেয়ে জীবনবোধ সম্পন্ন সাহিত্যিক ছিলো না বললেই চলে। যার উদাহরণ আমরা তাঁর করা চয়ন এবং বাণী থেকে পেয়েছি। দর্শন নিয়ে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উক্তি সমূহের কিছু অংশ হলো “আত্মোপকারীকে বনবাসে বিসর্জন করা তাহাদিগের প্রকৃতি, তাহারা চিরকাল আত্মোপকারীকে বনবাস দিবেকিন্তু যত বার বনবাসিত করুক না কেনো, পরের কাষ্ঠাহরণ করা যাহার স্বভাব, সে পুনর্বার পরের কাষ্ঠাহরণে যাইবে। তুমি অধমতাই বলিয়া আমি উত্তম না হইব কেনো?” উপরোক্ত বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় উক্তি তাঁর রচিত ‘কপালকুন্ডলা’ উপন্যাস থেকে চয়ন করা হয়েছে।

প্রায় প্রতিটি সাহিত্যিকই নারী, ভালোবাসা এবং মনুষ্যত্ব নিয়ে লিখেছেন এবং নিজ নিজ অভিব্যক্তির মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন নিদারুন কিছু সত্য। যা আমাদের মনের গভীরেই থাকে কিন্তু তাঁদের প্রকাশভঙ্গিতে ছুঁয়ে যায় আমাদের মন। এমন কিছু অভিমত, যা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় উক্তির মাধ্যমে অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলে গিয়েছেন। “যাকে ভালোবাসো তাকে চোখের আড়াল করোনা।”

ভাষা ও উপন্যাসের কাঠামো তৈরির বিষয়ে তিনি পথ দেখিয়েছিলেন। দেশের রাষ্ট্রীয়, ধর্মীয়, সামাজিক ও শিক্ষামূলক উন্নতির সব রকম প্রয়াসে তিনি অবিরাম লেখনী চালনা করেছেন। ‘আনন্দমঠের’ ‘বন্দেমাতরম’ মন্ত্র ভারতবর্ষে রাষ্ট্রীয় ভাব প্রবুদ্ধ করেছে, অপূর্ব দেশপ্রীতির উদ্ভব ঘটিয়েছে। বঙ্কিমচন্দ্র কেবলমাত্র সাহিত্যিক বা লেখক নন, উপরন্তু তিনি যুগস্রষ্টা। ঐতিহাসিক, রোমান্টিক, পারিবারিক, এই তিন ধারায় উৎসারিত বঙ্কিমচন্দ্রের আখ্যানগুলির সমসাময়িক ও পরবর্তী সাহিত্য ও জীবনের ওপর অপরিসীম প্রভাব বিস্তার করেছে। বঙ্কিমচন্দ্র ভারতীয় জাতীয়তাবাদ জাগিয়ে তুলতে প্রবন্ধ ও গ্রন্থে ‘বন্দে মাতরম্’, ‘মাতৃভূমি’, ‘জন্মভূমি’, ‘স্বরাজ’, ‘মন্ত্র’ প্রভৃতি নতুন শ্লোগান তৈরি করেন। কর্মক্ষেত্রে তিনি ন্যায়নিষ্ঠ, নির্ভীক, কর্তব্যপরায়ণ, সুযোগ্য শাসক ও বিচারক ছিলেন। ইংরেজ সরকার তাঁকে শেষ জীবনে রায়বাহাদুর এবং সি.আই.ই. উপাধিতে ভূষিত করেন। তেত্রিশ বছর সরকারি চাকরি করার পর ১৮৯১ খ্রিস্টাব্দের ১৪ সেপ্টেম্বর বঙ্কিমচন্দ্র অবসর গ্রহণ করেন। কর্ম ও সাহিত্যসাধনার স্বীকৃতি হিসেবে বঙ্কিমচন্দ্র পেয়েছেন নানা উপাধি ও সম্মাননা। এছাড়াও বাংলা আধুনিক গদ্যশৈলীতে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে গণ্য করা হয় প্রথম আধুনিক বাংলা ঔপন্যাসিক হিসেব। এছাড়া তিনি গীতার ব্যাখ্যাদাতা ও সাহিত্য সমালোচক হিসেবেও খ্যাতি পান। তাই তাকে হিন্দু পুনর্জাগরণের দার্শনিকও বলা হয়।
প্রথম আধুনিক বাংলা ঔপন্যাসিক হিসেবে খ্যাত,বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তিনি একাধারে বাঙ্গালী সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও ব্রিটিশ সরকারের আওতাধীন সরকারী কর্মকর্তা ছিলেন। তবে সরকারী চাকুরীজীবির চেয়ে তিনি লেখক এবং হিন্দু পুনর্জাগরণের দার্শনিক হিসেবেই বেশি প্রখ্যাত ছিলেন। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত উল্লেখযোগ্য রচনাবলী দুর্গেশনন্দিনী, কপালকুন্ডুলা, বিষবৃক্ষ, কৃষ্ণকান্তের উইল, রাজসিংহ, কমলাকান্তের দপ্তর ইত্যাদি। এসকল গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধে তিনি সময় উপযোগী অসংখ্য উক্তি ও বাণী করে গিয়েছেন। যা কালের সীমা ছাড়িয়ে আজো জ্বলজ্বল করছে এই সময়ে এবং অতিক্রম করে যাবে অনেক প্রজন্ম।

বাংলা সাহিত্যের বিকাশপর্বে ভাষা-প্রয়োগ-বিষয়ক চিন্তার দ্বন্দ্ব চলাকালে সমাজ-বিশ্লেষক, সাহিত্যের অনন্য সাধক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের এমন সময়োপযোগী নিবন্ধ আমাদের জাতীয়তা ও ভাষার নিজস্বতা রক্ষায় বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে হয়। কেবল লিখে নয়, কিভাবে লিখতে হবে, কার জন্য লিখতে হবে লেখার শক্তি-সৌন্দর্য-সামর্থ্য কেমন হওয়া চাই এসব বিষয়েও ভেবেছেন, ভাবনার প্রকাশ করেছেন ‘সাহিত্য সম্রাট’ বঙ্কিম! বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় অসাধারণ কিছু উপন্যাস সকলের মাঝে তুলে ধরেছেন, যা তাঁকে কালজয়ী করে রেখেছে। যদিও তাঁর বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িকথার অভিযোগ রয়েছে। তাঁর উপন্যাস থেকে সাম্প্রদায়িকতাকে পাশ কাটিয়ে গেলে, তিনি একজন অসাধারণ ঔপন্যাসিক। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় উক্তি সমূহের মধ্যে সে সময়ের নিদারুণ বাস্তবতা ফুটে উঠলেও, তা এখনের সমাজের সাথে পুরোই খাপ খেয়ে যায়।

বাংলা সাহিত্যের নবজাগরণের পথিকৃৎ-কর্মী বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। বঙ্কিমী সাহিত্যের বিশেষত্ব এককথায় তার রসায়নে। বৌদ্ধিক রসের সঙ্গে সাহিত্য রসের এমন মিশেল পরবর্তী বাংলা সাহিত্যেও বিরল। না বললেও বোঝা যায়; সমসাময়িক জাতীয়তাবাদের ঝোড়ো হাওয়ায় বাংলা-বাঙালির সাংস্কৃতিক ইতিহাসের নির্মাণকল্পে বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর সাহিত্য-রচনার সমস্ত শক্তি ঢেলে দিলেও, তাঁর মননসঞ্জাত রসই বাংলা সাহিত্যকে প্রথম আধুনিকতার আলো দেখিয়েছিলো। এককথায় বলতে গেলে, একদিকে উপন্যাসের কাব্য অন্যদিকে প্রবন্ধ তথা গদ্যের বিজ্ঞান, তার সঙ্গে কিছু গান,কবিতা ও ভারতবর্ষ সব মিলিয়েই বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। সাহিত্য রচনার ভাষা কেমন হওয়া উচিত এ বিষয়ে বঙ্কিমচন্দ্র শতাধিক বৎসর পূর্বে যা বলে গেছেন, তা আজও প্রাসঙ্গিক। এখনও বাংলা ভাষায় সাহিত্য রচনার গুণাগুণ বিচারে বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বাঙ্গালা ভাষা’ রচনাটির গ্রহনযোগ্যতা প্রামাণ্য রয়ে গেছে। তিনি ৮ এপ্রিল ১৮৮৯ সালে বহুমূত্র রোগে মৃত্যুবরণ করেন।

লেখক, সাবেক জাতীয় ক্রীড়াবিদ(কারাতে ব্লাক বেল্ট ১ম ড্যান)
গবেষক,সাংবাদিক,কলামিস্ট ও চেয়ারম্যান গ্রিন ক্লাব, মানিকগঞ্জ