বাংলা সাহিত্যে অনন্য প্রতিভা ও খ্যাতনামা মুসলিম রেনেসাঁর কবি গোলাম মোস্তফা

 

মো.আলতাফ হোসেন ঃঃ
গোলাম মোস্তফা একজন বাঙালি লেখক এবং কবি। তাঁর কাব্যের মূল বিষয় ছিলো ইসলাম ও প্রেম। খ্যাতিমান এ মানুষটি পেশায় ছিলেন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক। তিনি বাংলা সাহিত্যের আকাশে ইসলামী জাগরণের কবি,বহুমুখী প্রতিভাবান ব্যক্তিত্ব গোলাম মোস্তফা এক উজ্জল নক্ষত্র। মহৎপ্রাণ এ মানুষটি শুধু একজন কবিই নন বরং বাংলা সাহিত্যের সকল ধারায় তিনি ছিলেন সাবলীল এবং প্রথিতযশা লেখক। সঙ্গীতের ক্ষেত্রে তাঁর উল্লেখযোগ্য প্রতিভার পরিচয় পাওয়া যায়। গায়ক ও গীতিকার হিসেবে তিনি বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। বিশেষ করে ইসলামী গান, গজল ও মিলাদ মাহফিলের বিখ্যাত ‘কিয়ামবাণী’ (রসূল আহবান বাণী) রচনায় তিনি ছিলেন অদ্বিতীয়। তাঁর অনেকগুলি গান আব্বাস উদ্দীনের কণ্ঠেও রেকর্ড হয়েছিলো। এছাড়া নিজের কণ্ঠেও তিনি বেশ কয়েকটি গান রেকর্ড করেছিলেন।

গোলাম মোস্তফার জন্ম ১৮৯৭ সালে যশোর জেলার ঝিনাইদহ মহকুমার শৈলকূপা থানার অন্তর্গত মনোহরপুর গ্রামে। পিতা কাজী গোলাম রব্বানী, পিতামহ কাজী গোলাম সরওয়ার। তারা ছিলেন সাহিত্যানুরাগী-ফারসী ও আরবী ভাষায় সুপন্ডিত। তাঁর তিন পুত্রের মাঝে একজন হলেন বিখ্যাত পাপেটনির্মাতা ও চিত্রশিল্পী মোস্তফা মনোয়ার এবং সাম্প্রতিককালের অস্কারজয়ী বাংলাদেশী নাফিস বিন জাফর তাঁর নাতি। গোলাম মোস্তফার শিক্ষা জীবনের সূচনা হয় চার বছর বয়সে নিজগৃহে ও পার্শ্ববর্তী দামুকদিয়া গ্রামের পাঠশালায়। কিছুদিন পরে তিনি ফাজিলপুর গ্রামের পাঠশালাতে ভর্তি হন। দু’বছর এই পাঠশালায় বিদ্যা অর্জনের পরে তিনি ভর্তি হলেন শৈলকূপা উচ্চ ইংরেজি স্কুলে। ১৯১৪ সালে এই স্কুল থেকে বিশেষ কৃতিত্বের সাথে তিনি প্রবেশিকা বা ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন। ১৯১৬ সালে তিনি দৌলতপুর বি. এল কলেজ থেকে আই. এ এবং ১৯১৮ সালে কলকাতা রিপন কলেজ থেকে বি. এ পাশ করেন। পরে ডেভিড হেয়ার ট্রেনিং কলেজ থেকে বি. টি ডিগ্রিও লাভ করেন।

১৯২০ সালে জানুয়ারী মাসে ব্যারাকপুর সরকারি হাই স্কুলের সহকারী শিক্ষক হিসেবে গোলাম মোস্তফার শিক্ষকতা জীবনের সূচনা হয়। ১৯২৪ সালে ব্যারাকপুর হাই স্কুল থেকে তিনি কলকাতা হেয়ার স্কুলে বদলী হন। দীর্ঘদিন এখানে শিক্ষকতা করার পর তিনি কলকাতা মাদ্রাসায় বদলী হন। সেখান থেকে ১৯৩৫ সালে বালিগঞ্জ সরকারি ডিমনেস্ট্রেশন হাই স্কুলে বদলী হয়ে সহকারি প্রধান শিক্ষকের পদে উন্নীত হন এবং কয়েক বছর পর উক্ত বিদ্যালযে প্রধান শিক্ষকের পদমর্যাদা লাভ করেন। এই বিদ্যালয়ের তিনিই প্রথম মুসলিম প্রধান শিক্ষক।
১৯৪০ সালে তিনি বাঁকুড়া জিলা স্কুলে বদলী হন। শিক্ষকতা জীবনে বিভিন্ন স্কুলে শিক্ষকতা করার পর ১৯৪৬ সালে তিনি ফরিদপুর জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। দীর্ঘ ত্রিশ বছর শিক্ষকতা করার পর ১৯৫০ সালে তিনি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
অনুবাদক হিসেবেও কবি গোলাম মোস্তফার বিশেষ খ্যাতির পরিচয় পাওয়া যায়। আরবী ও উর্দু সাহিত্য হতে গ্রন্থগুলি ভাষান্তরিত করে বাংলা সাহিত্যকে তিনি সমৃদ্ধ করেছেন। ‘ইখওয়ানুস সাফা’, ‘মুসাদ্দাস-ই-হালী’,- ‘কালাম-ই-ইকবাল’, ‘শিকওয়া’ ও ‘আল-কোরআন’ তার ভাষান্তরিত গ্রন্থগুলির অন্যতম। এছাড়া, চিন্তামূলক ও যুক্তিবাদের ওপর লিখিত আরও কিছু গ্রন্থাবলী তিনি রচনা করেছিলেন। ‘ইসলাম ও কমিউনিজম’, ‘ইসলামে জেহাদ’, ‘আমার চিন্তাধারা’, এগুলি তার গভীর চিন্তাধারার জ্ঞানলব্ধতার ফসল।

মুসলিম জাগরণের অগ্রদূত কবি গোলাম মোস্তফার অবদান বাংলা সাহিত্যে এক বিরল দৃষ্টান্ত। স্কুল জীবনেই এই কবির সাহিত্য প্রতিভার বিকাশ ঘটে। এ সময় তাঁর ‘আর্দ্রিয়ানোপল উদ্ধার’ কবিতাটি মাসিক মোহাম্মদী পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। তাঁর প্রথম কাব্য গ্রন্থ ‘রক্ত রাগ’ প্রকাশিত হলে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিচের দু’লাইন কবিতার মাধ্যমে কবিতার মাধ্যমে কবিকে অভিনন্দিত করেছিলেন-“তব নব প্রভাতের রক্তরাগখানি মধ্যাহ্নে জাগায় যেনো জ্যোতির্ময়ী বাণী।” তাঁর পরবর্তী গ্রন্থাবলীর মধ্যে ‘হাসনাহেনা’(কাব্যগ্রন্থ) ‘খোশরোজ’ (কাব্যগ্রন্থ),’সাহারা (কাব্যগ্রন্থ)’,‘বুলবুলিস্তান’ (কাব্যচয়ন) ও ‘রূপের নেশা’ ‘ভাঙ্গাবুক’ ‘একমন একপ্রাণ’ ইত্যাদি উপন্যাসগুলি বিশেষ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলো।
কবি গোলাম মোস্তফার সাহিত্যকর্ম হিসেবে রয়েছে দু’টি উপন্যাস,আটটি মৌলিক কাব্যগন্থ, ৫ টি কাব্যানুবাদ, ১টি গল্প সংকলন ও ৩টি কাব্য সংকলন। এছাড়াও তিনি রচনা করেছেন ৪টি জীবনী গ্রন্থ, ২টি ধর্ম বিষয়ক গ্রন্থ, ৩টি রাজনীতি ও ইতিহাস বিষয়ক গ্রন্থ এবং একটি প্রবন্ধ সংকলন। কবি গোলাম মোস্তফার আরও রয়েছে ১টি গানের সংকলন এবং বহু পাঠ্য পুস্তক। এসব গ্রন্থসমূহ থেকে সহজেই বোঝা যায় তিনি শুধু একজন কবিই ছিলেন না, সাহিত্যের নানা শাখায় ছিলো তাঁর স্বতস্ফূর্ত বিচরণ। বহুমুখী প্রতিভার একজন চৌকস লেখক ছিলেন তিনি। বাংলা সাহিত্যে তাঁর অপরিসীম অবদান রয়েছে।

সাহিত্যে অবদানে গীত রচনা,কাব্য, উপন্যাস, জীবনী, অনুবাদসহ সাহিত্যের প্রায় সকল শাখায় তাঁর স্বছন্দ পদচারণা ছিল। ১৯১৩ সালে দশম শ্রেনির ছাত্র থাকাকালে আদ্রিয়ানোপল উদ্ধার’ কবিতাটি প্রকাশিত হয়। কাব্য গ্রন্থঃ কাব্য-রক্তরাগ (১৯২৪), খোশরোজ (১৯২৯), কাব্য কাহিনী (১৯৩২), সাহারা (১৯৩৬), হাসনাহেনা (১৩৩৪), তারানা-ই-পাকিস্তান (১৯৪৮), বনি-আদম (১৯৫৮); উপন্যাস-রুপের নেশা (১৩২৬),ভাঙ্গাবুক (১৩২৮),একমন এক প্রাণ; জীবনী-বিশ্বনবী (১৯৪২); ইসলাম বিষয়ক গ্রন্থ-ইসলাম ও জেহাদ (১৯৪৭), ইসলাম ও কমিউনিজম(২য় সং-১৯৪৯), মরু দুলাল; প্রবন্ধ পুস্তুক-আমার চিন্তাধারা (১৯৬২);অনুবাদগ্রন্থ-মুসাদ্দাস-ই-হালী (১৯৪৯),মুরু দুলাল; প্রবন্ধ পুস্তক-আমার চিন্তাধারা (১৯৫৮) শিকওয়া ও জওয়াব-ই-শিকওয়া (১৯৬০), জয়পরাজয়। এছাড়া গীতি সঞ্চয়ন (১৯৬৮) এবং গোলাম মোস্তফা কাব্য গ্রন্থাবলী (১৯৬০) বিশ্বনবী’ গ্রন্থখানি গদ্য সাহিত্য তাঁর শ্রেষ্ঠ অবদান।

কাব্যের বৈশিষ্ট্যঃ তাঁর কাব্যের বৈশিষ্ট্য হলো সহজ সাবলীল শিল্পসম্মত প্রকাশ ও ছন্দ লালিত্য। তাঁর কাব্যে মুসলিম জাতীয়তাবাদী চেতনা প্রকাশ পায়। তিনি গীতিকার ও গায়ক ছিলেন। তাঁর নিজের সুরারোপিত বেশ কয়েকটি গানের রেকর্ডও পাওয়া যায়। সম্মাননা পদকঃ ১৯৫২ সালে যশোর সাহিত্য সংঘ কাব্য সুধাকর ও ১৯৬০ এ পাকিস্তান সরকার সিতারা-ই-ইমতিয়াজ’ উপাধি দেয়।

কবি গোলাম মোস্তফার ‘বিশ্বনবী’ একটি আশ্চর্য রকমের সফল সৃষ্টি। এই অমর গ্রন্থখানি গদ্যে রচিত হলেও সে গদ্যও কবিতার মত ছন্দময় এবং মধুর। গ্রন্থখানা বিশ্বনবী হয়রত মুহম্মদ এর একটি সার্থক জীবন চরিত। গ্রন্থটিতে হৃদয়ের আবেগ, আন্তরিক অনুভূতি যে ভাবে বর্ণিত হয়েছে তার তুলনা আমাদের বাংলা সাহিত্যে নিতান্তই বিরল। এর পরবর্তীকালে তিনি কোর-অনিক ঘটনার অমিত্রাক্ষর ছন্দে ‘বনি আদম’ নামে একটি মহাকাব্য লিখেছিলেন। যা বাংলা সাহিত্যে এক অমর ও অক্ষয় কীর্তি। সাহারা, বুলবুলিস্তান, রক্তরাগ, হাসনাহেনা, বিশ্বনবী, বনি আদমসহ অসংখ্য কাব্যগ্রন্থের স্রষ্টা, কবি গোলাম মোস্তফা।

কবি গোলাম মোস্তফা সাহিত্যকর্ম পুরোটাই ইসলামী ভাবধারার হলেও কবি কখনোই সাম্প্রদায়িকতার দোষে দুষ্ট হননি। মূলতঃ কবি গোলাম মোস্তফা একজন উঁচুমানের ইসলামী সাধক ছিলেন। তাকে আশেকে রাসুলও বলা হয়। বাংলা ভাষায় হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এর যতগুলি জীবনীগ্রন্থ রচিত হয়েছে তারমধ্যে মোস্তফা রচিত মোস্তফা চরিত আজ অব্দি বাংলাদেশ তথা বিশ্বের মুসলমানদের কাছে সর্বাধিক সমাদৃত। তিনি মহাগ্রন্থ আল কোরানের তাফছিরও করেছেন। সূরা ফাতিহা অবলম্বনে তার রচিত কবিতা ‘‘অনন্ত অসীম প্রেমময় তুমি বিচার দিনের স্বামী যতো গুণগান হে চির মহান তোমারই অন্তর্যামী।’’ আজও মানুষের মুখে মুখে শোনা যায়। বাঙালি মুসলমানদের ধর্মীয় সকল অনুষ্ঠানে কবি গোলাম মোস্তফার বিভিন্ন গান, হামদ ও নাতে রসূল পরিবেশন করা হয়। ধর্মীয় অনুষ্ঠানে এটি একটি রেওয়াজে পরিণত হয়ে গেছে।

কবি গোলাম মোস্তফা বাংলা সাহিত্যে চেয়েছিলাম ইসলামী কৃষ্টির সংমিশ্রণ। সেলক্ষ্যে ১৯১৩ সালে তাঁর প্রথম লেখা প্রকাশ। অতঃপর পরবর্তী পঞ্চাশ বছরকাল দু’হাতে লিখে গেছেন সাহিত্যের সকল ধারায়।এই দীর্ঘ সময়ে তিনি কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, শিশুতোষ সাহিত্য, গান, জীবনী, অনুবাদ সাহিত্য লিখেছেন। পেশাগতভাবে একজন শিক্ষক গোলাম মোস্তফা তাঁর দীর্ঘকালের অভিজ্ঞতার কল্যাণেই শিশু ও কিশোর মনন্তত্ত্বের সংগে ছিলেন নিবিড়ভাবে পরিচিত। এ কারণেই তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়েছে বহু স্মরণীয় শিশু সাহিত্যের নির্মাণ। ধর্ম বিশ্বাস ছিলো গোলাম মোস্তফার গভীরে প্রথিত, তার চিন্তার ভিত্তিভূমি। ইসলামের সাথে জাগতিক সত্য মিলিয়ে তাঁর ধারণা প্রগাঢ় ইসলামী ভাবধারায় সম্পৃক্ত।

বাংলা সাহিত্যে মুসলিম জাগরণের কবি হিশেবে সমাধিক পরিচিত কবি গোলাম মোস্তফা। বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় তিনি অনন্যতা স্থাপন করেছেন। মুসলিম জাগরণের অগ্রদূত কবি গোলাম মোস্তফার অবদান বাংলা সাহিত্যে এক বিরল দৃষ্টান্ত। স্কুল জীবনেই তার সাহিত্য প্রতিভার বিকাশ ঘটে।

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে গোলাম মোস্তফা এক স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। আধুনিক বাংলাসাহিত্যে ইসলামী ভাবধারার সাহিত্য রচনায় রয়েছে তার বিশেষ কৃতিত্ব। বাঙালি মুসলমানের জাতীয় জাগরণ তার সাহিত্যেকর্মের মূল উদ্দেশ্য। গোলাম মোস্তফার সাহিত্যের বেশির ভাগের মূল বিষয় ইসলামী আদর্শ ও মুসলিম ঐতিহ্য। নিছক সৌন্দর্য সৃষ্টির উদ্দেশ্যে তিনি লিখেননি; বরং ইসলাম ও ইসলামী আদর্শ রূপায়নের জন্যই লিখেছেন তিনি। তিনি রসাত্মক কবিতা রচনা করলেও কোরআন-হাদিস তথা ইসলামী আদর্শ ঐতিহ্যের প্রতি ছিলেন তীক্ষè দৃষ্টিসম্পন্ন। কোনো রচনাই যেনো ইসলাম পরিপন্থী কিংবা ইসলামের বিকৃত উপস্থাপন না হয় সে দিকে তিনি ছিলেন সদা সতর্ক। ইসলামী চেতনার রূপায়ণই তাঁর সাহিত্য-সাধনার প্রধান উদ্দেশ্য এবং মুসলিম সমাজের সাহিত্য-সংস্কৃতির জাগরণ তাঁর লক্ষ্য। তিনি মুসলিম জাতির জাগরণমূলক ইসলামী বৈশিষ্ট্যমন্ডিত বিষয়াবলিকেই গীতি কবিতার আঙ্গিকে পরিবেশন করেছেন। তাঁর জীবন সাধনায় মুসলিম বৈশিষ্ট্য ও স্বাতন্ত্র্যমন্ডিত বিষয়াবলীকেই সাহিত্যে রূপায়িত করেছেন।

১৮৯৭ সাল ঊনবিংশ শতাব্দির শেষ ভাগ,বাংলা কাব্য-সাহিত্যের তখনও যুগান্তকারী প্রতিভার উন্মেষ ঘটেনি বললেই চলে। পুথি সাহিত্য ও ঊনবিংশ শতাব্দির কার্য রীতিতে অভিষিক্ত গুটি কয়েকজন মুসলমান কবি-সাহিত্যিক-মীর মোশারফ হোসেন, কায়কোবাদ,শাহাদৎ হোসেন প্রমুখ। এইরূপ পরিবেশে রবীন্দ্র সত্যেন্দ্র বলয়ে অবস্থান করে, তথা বাংলা সাহিত্যের বৃহত্তর ঐতিহ্য থেকে মধুকনা আহরন করে নিজস্ব রচনা শৌলির বিশিষ্টতায় উজ্জল কবি গোলাম মোস্তফা কাব্যজগতে আবির্ভূত হন। তাঁর কাব্যে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সকল পাঠকের মনোরঞ্জন করতে সমর্থ হয়, এদিক থেকে কবি গোলাম মোস্তফা বাঙ্গালী মুসলমান কবিদের ভেতর তখনকার দিনে আধুনিক আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃতের অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

গোলাম মোস্তফা বাংলা সাহিত্যের অনন্য প্রতিভা ও খ্যাতনামা কবি। কবি হিসেবে বেশি পরিচিত হলেও তিনি ছিলেন প্রাবন্ধিক, ঔপন্যাসিক,জীবনী লেখক,অনুবাদক,গীতিকার, সুরকারসহ বহু প্রতিভার অধিকারী। আধুনিক বাংলা সাহিত্যে ইসলামী চেতনার সাহিত্য রচনায় গোলাম মোস্তফার স্বতন্ত্র¿ বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান।

‘বিশ্বনবী’ গোলাম মোস্তফার সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি এবং সমগ্র বাংলা সাহিত্যে এর সমতুল্য গ্রন্থ অতিশয় দুর্লভ। গোলাম মোস্তফা অন্য কিছু না লিখে শুধু ‘বিশ্বনবী’ লিখলেও বাংলা সাহিত্যে চির অমর ও স্মরণীয় হয়ে থাকতেন, একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়। বাংলা সাহিত্যে নবী (সা.) জীবনী সম্পর্কিত বিভিন্ন গ্রন্থের মধ্যে ‘বিশ্বনবী’ বিশেষ উল্লেখযোগ্য। শুধু উল্লেখযোগ্য বললে যথেষ্ট হয় না, সর্বাধিক জনপ্রিয় গ্রন্থ হিসাবে সর্বজনপ্রিয়। এ গ্রন্থে বিশ্বের সর্বোত্তম ও সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানবের জীবন, জীবনের নানা ঘটনা, মোজেজা উল্লেখের সাথে সাথে ইসলামের চির শাশ্বত কল্যাণময় মানবিক আদর্শ,সৃষ্টিরহস্য ইত্যাদি নানা বিষয় অত্যন্ত যুক্তিপূর্ণভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

‘বিশ্বনবী’ প্রণয়নে লেখক যে কী ধরনের পরিশ্রম ও অসাধারণ প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিলেন এর অষ্টম সংস্করণের শেষে প্রদত্ত এ গ্রন্থ রচনায় সহায়ক গ্রন্থসমূহের তালিকা থেকে তা সুস্পষ্ট। এ তালিকায় বিশ্ববিখ্যাত মোট ৬২টি গ্রন্থের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এতে রয়েছে মহাগ্রন্থ আল-কোরআন,আল-হাদীস, আরবি-উর্দু-ইংরেজী-বাংলা ভাষায় রচিত বহু খ্যাতনামা সীরাত গ্রন্থ। এমনকি, বিশ্বখ্যাত বিভিন্ন বৈজ্ঞানিকদের রচিত গ্রন্থ থেকেও তিনি এতে অনেক বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব-তথ্য ও যুক্তি-তর্কের অবতারণা করে ইসলামের সত্যতা ও মাহাত্ম্য তুলে ধরার প্রয়াস পেয়েছেন।

নজরুলের অগ্রজ কবি হিসেবে সে যুগে গোলাম মোস্তফা ছিলেন অন্যতম আধুনিক কবি। কবি গোলাম মোস্তফা ছিলেন সে যুগের ইসলামী ঐতিহ্যের এক আলোক বর্তিকা, অনগ্রসর মুসলিম সমাজের জাগরনের নকীব। এ ক্ষেত্রে তিনি নি:সন্দেহে কাজী নজরুল ও ফররুখ আহমদের পুর্বসূরি। কলকাতা জীবনে কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে ঘনিষ্ট সম্পর্ক গড়ে উঠে এবং আব্বাস উদ্দীনের ভূমিকা ছিলো এ ক্ষেত্রে অনন্য। কবি নজরুল তখন অল ইন্ডিয়া রেডিও কলকাতা কেন্দ্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। গোলাম মোস্তফা ও শিল্পী আব্বাস উদ্দীনের ঐকান্তিক চেষ্টা ও তাগিদে কবি নজরুল ইসলাম তখন ইসলামী গান রচনায় এগিয়ে আসেন। বস্তুত গ্রামোফোন রেকর্ডের মধ্যদিয়ে সেসব গান দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়ে এবং ঘুমন্ত মুসলিম সমাজে অভুতপূর্ব আলোড়ন সৃষ্টি করে। তাই বলা যায়, মুসলিম নবজাগরনের কবি গোলাম মোস্তফা, শিল্পী আব্বাস উদ্দীন ও কবি নজরুল যেন এক সূত্রে গাঁথা।

গোলাম মোস্তফা বাংলা সাহিত্যে মুসলিম রেনেসাঁর কবি নামে পরিচিত। স্বাতন্ত্র্যমন্ডিত রচনাই তার সাহিত্যকর্মের মূল উদ্দেশ্য। তবে তাঁর সাহিত্যকর্মের মূল উপজীব্য ইসলামি আদর্শ ও ঐতিহ্য। তাঁর উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো আদর্শের ক্ষেত্রে দৃঢ়তা। দীর্ঘ ৫০ বছর সাহিত্যকর্ম অব্যাহত রেখে বাংলা সাহিত্যভান্ডারকে করেছেন সমৃদ্ধ। বাংলা সাহিত্যের সাধক কবি গোলাম মোস্তফা তাঁর শেষ জীবনের কয়েক বছর ঢাকা শান্তিনগরস্থ নিজ গৃহে (মোস্তফা মঞ্জিল) অতিবাহিত করেন।বেশ কিছু দিন রোগ যন্ত্রণা ভোগ করার পর কবি ১৯৬৪ সালের ১৩ অক্টোবর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

লেখকঃ সাবেক জাতীয় ক্রীড়াবিদ,সভাপতি শারীরিক শিক্ষাবিদ সমিতি,
চেয়ারম্যান গ্রিন ক্লাব,গবেষক,সাংবাদিক ও কলামিস্ট