বিপন্ন প্রায় প্রমত্তা বানার নদী

 

মো. আলতাফ হোসেন ঃঃ
নদী সমার্থক শব্দ-তটিনী,তরঙ্গিনী, সরিৎ ইত্যাদি। সাধারণত মিষ্টি জলের একটি প্রাকৃতিক জলধারা যা ঝরণাধারা, বরফগলিত স্রোত অথবা প্রাকৃতিক পরিবর্তনের মাধ্যমে সৃষ্ট হয়ে প্রবাহ শেষে সাগর, মহাসাগর, হ্রদ বা অন্য কোনো নদী বা জলাশয়ে পতিত হয়। মাঝে মাঝে অন্য কোনো জলের উৎসের কাছে পৌঁছানোর আগেই নদী সম্পূর্ণ শুকিয়ে যেতে পারে। নদীকে তার গঠন অনুযায়ী শাখানদী, উপনদী, প্রধান নদী, নদ ইত্যাদি নামে অভিহিত করা যায়। আবার ভৌগোলিক অঞ্চলভেদে ছোট নদীকে বিভিন্ন নামে ডাকা হয়। নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে প্রাচীন বাংলার অনেক শহর। সাধারণত নদীর নামকরণ করা হয়েছে মেয়েদের নামে। নদী হলো খাতের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত জলধারা।

নদী যেমন ভূগঠনের মুখ্য ভূমিকা পালন করছে তেমনি,মানব সভ্যতার ক্রম-বিকাশেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে বিকশিত নদীমাতৃক এই বাংলাদেশের অনেক নদী-তীরে গড়ে উঠেছে বন্দর, নগরী হাট বাজার ইত্যাদি। ভূমিগঠন, জনবসতি স্থাপন,শস্য উৎপাদন,জলপথে যোগাযোগ,ব্যবসা-বাণিজ্যসহ আর্থ -সামাজিক কর্মকান্ডে এবং নিজস্ব সংস্কৃতি বিকাশে এই নদ-নদীগুলোর গুরুত্ব অপরিসীম।
১৭৮৩ সালে জেমস রেনেল অংকিত বাংলাদেশের মানচিত্র যে নদী-নালাগুলোর বিবরণ রয়েছে বর্তমানে সেগুলি চিহ্নিত করা কষ্টসাধ্য। নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে এবং পরিত্যক্ত গতিপথ ভরাট হয়ে পুরানো নদীপথের চিহৃ মুছে গেছে। আবার একই নদীর গতিপ্রবাহ ভিন্ন ভিন্ন স্থানে ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত।
সাধারণত উঁচু ভূমি বা পাহাড় গিরিখাত থেকে সৃষ্ট ঝরণাধারা,বরফগলিত স্রোত কিংবা প্রাকৃতিক পরিবর্তন থেকে নদীর জন্ম। হাজার হাজার ফুট উঁচু পাহাড় থেকে তীব্র বেগে ধেয়ে আসা জলরাশিতে এক ধরনের প্রচন্ড গতি সঞ্চারিত হয়। ছুটে আসা এই দ্রুত গতিসম্পন্ন জলস্রোত স্থলভাগ অতিক্রম করার সময় নদী নামে পরিচিত হয়।

নদী যখন পাহাড়ি এলাকায় প্রবাহিত হয় তখন তার যৌবনাবস্থা। এ সময় নদী ব্যাপক খননকাজ চালায় এবং উৎপত্তিস্থল থেকে নুড়ি, বালি, পলি প্রভৃতি আহরণ করে অতি সহজে সমুদ্রে নিক্ষেপ করে। নদী এভাবেই আবহমানকাল ধরে পৃথিবীপৃষ্ঠকে ক্ষয় করে চলেছে। তার এ কাজ শেষ হয় তখন, যখন সমস্ত নদী-অববাহিকা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে সমভূমি বা প্রায় সমভূমি অঞ্চলে পরিণত হয়। উৎস থেকে মহোনা অবধি নদীর এই কাজকে তিনটি পর্যায় ভাগ করা হয়।
প্রধান নদী সাধারণত পাহাড় হতে সৃষ্ট ঝরণা, হিমবাহ থেকে সৃষ্টি হয়, যেমন পদ্মা গঙ্গোত্রী হিমবাহ হতে উৎপন্ন হয়েছে। শাখানদী অন্য কোনো নদী হতে উৎপন্ন হয়। যেমন বুড়িগঙ্গা ধলেশ্বরীর শাখা নদী। উপনদী সাধারণত অন্য নদীতে গিয়ে মেশে এবং প্রবাহ দান করে, যেমন আত্রাই নদী। কোনো প্রধান নদী অন্য নদীর উপনদীও হতে পারে। আবার পুরুষ ও স্ত্রীবাচক শব্দের ভিত্তিতে এই জলস্রোতকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। যে সকল জলস্রোতের নাম স্ত্রীবাচক তাদের নদী বলা হয়। এদের নাম দীর্ঘস্বর কারান্ত হয়। যেমনঃ মেঘনা, যমুনা, কর্ণফুলী, কুশিয়ারা ইত্যাদি। যে সকল জলস্রোতের নাম পুরুষবাচক তাদের বলা হয় নদ। এদের নাম হ্রস্বস্বর কারান্ত হয়। যেমনঃ কপোতাক্ষ,ব্রহ্মপুত্র, নীল নদ ইত্যাদি নদ। তবে এই নিয়ম সেসকল নদীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য,যাদের নাম পৌরাণিক।
নদীকে ঘিরেই বিশ্বের প্রতিটি শহর,বন্দর,গঞ্জ, বাজার প্রভৃতি গড়ে উঠেছে। মালামাল পরিবহন ও যোগাযোগের সহজ উপায় হলো নৌকা। মালামাল পরিবহনে খুবই স্বল্প খরচে নৌকার জুড়ে মেলা ভার। যিনি নৌকা চালান তিনি মাঝি হিসেবে চিহ্নিত। একসময় নৌকায় পাল তোলা থাকতো। সময়ের বিবর্তনে এর স্থান দখল করেছে ইঞ্জিন চালিত নৌকা। মাঝ নদীতে জেলেরা উত্তাল তরঙ্গের সাথে যুদ্ধ করে মাছ আহরণ করে। এগুলোও এখন ইতিহাসের পাতায় পথ খোঁজছে।
আদিকাল থেকে এদেশের মানুষের জীবনের উৎস ছিলো নদী। এই নদীগুলো কৃত্রিম কারণে ও সময়ের ধারায় আজ বিপর্যয়ের সম্মুখিন। তার বড় প্রমাণ শুকনো মৌসুমে দেশের উত্তর কেন্দ্রীয় অঞ্চলের নদ- নদীর অবস্থা ও অবস্থান। এসব অঞ্চলের জেলাগুলো ঘুরলে বুঝা যায় যে, দেশের নদীগুলোর অবস্থা আজ কতটা নাজুক।

বানার নদী বা বানার আপার নদী বা কলমদারী নদী বাংলাদেশের উত্তর-কেন্দ্রীয় অঞ্চলের জামালপুর ও ময়মনসিংহ জেলার একটি নদী। নদীটির দৈর্ঘ্য ৯৬ কিলোমিটার, গড় প্রস্থ ৪৩ মিটার এবং নদীটির প্রকৃতি সর্পিলাকার। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড বা “পাউবো” কর্তৃক বানার নদীর প্রদত্ত পরিচিতি নম্বর উত্তর-কেন্দ্রীয় অঞ্চলের নদী নং ৪৪। স্থানীয়ভাবে নদীটি জামালপুর সদর উপজেলায় বানার, ফুলবাড়িয়া উপজেলায় কলমদারী এবং ত্রিশাল উপজেলায় বানার নামে পরিচিত।
বাংলাদেশের নদ-নদীর পানি সংকটের পেছনে উজানে পানি প্রত্যাহার অনেকাংশে দায়ী। তবে এটিকে সংকটের একমাত্র কারণ বলার অবকাশ নেই। নদী রক্ষায় সচেতন ও সোচ্চার হতে হবে আমাদের সকলের। দেশকে বাঁচাতে হলে এর কোনো বিকল্প নেই।
হাজার হাজার বছর নদ-নদীকে কোনো মানুষের রক্ষা করার প্রয়োজন হয়নি। আজ তারা অগণিত শত্রুর দ্বারা আক্রান্ত। নদ-নদী দখল আর নদীর পার কেটে বালু উত্তোলন যেকোনো অপরাধই শাস্তিযোগ্য।নদী ছিলো আপন বেগে পাগলপারা। তাকে আক্রমণ বা বাধা দেওয়ার সাধ্য ছিলো না কারও। নদ-নদী ছিলো অজাতশস্ত্র,কালের বিবর্তনে হারিয়েছে এসব নদীর নাব্যতা। নদীমাতৃক দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বেশ সুপরিচিত। অসংখ্য নদ-নদী বাংলাদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। শাখা প্রশাখাসহ প্রায় ৮০০ নদ-নদী বিপুল জলরাশি নিয়ে ২৪,১৪০ কিলোমিটার জায়গা দখল করে দেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের আওতাধীন নদী ও শাখা নদীর সংখ্যা প্রায় ৪ হাজার এর বাইরেও ১৮ হাজার থেকে ২২ হাজার শাখা ও উপনদী রয়েছে। সে হিসেবে বাংলাদেশে নদীর সংখ্যা দাঁড়ায় ২৬ হাজার। নগরায়ন, দখল-দূষণ ও ভরাটের কারণে দেশের নদ-নদী বিলুপ্তির পথে। টিকে আছে মাত্র ৮০টির মতো। দেশ এখন মরুকরণের পথে। এই বর্ষা শরৎকালও বৃষ্টিহীন। এভাবে চলতে থাকলে দেশ অচিরেই বসবাসের অযোগ্য হবে। যে জেলা ভাসতো পানির ওপর, আজ সেখানে শুরু হয়েছে পানির জন্য হাহাকার।

বানার নদীটি জামালপুর জেলার জামালপুর সদর উপজেলার শরিফপুর ইউনিয়নে প্রবহমান পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদী হতে উৎপত্তি লাভ করেছে। অতঃপর এই নদীর জলধারা ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশাল উপজেলার আমিরবাড়ি ইউনিয়ন অবধি প্রবাহিত হয়ে খিরো নদীতে নিপতিত হয়েছে। এই নদীতে সারাবছর পানিপ্রবাহ থাকে না। পলির প্রভাবে নদীর তলদেশ ক্রমশ ভরাট হয়ে যাচ্ছে, স্থানীয় লোকজন কর্তৃক নদীর দুই পাশ ভরাট করায় এর প্রশস্ততা সংকুচিত হচ্ছে এবং নদীর গভীরতা হ্রাস পাচ্ছে।
বানার নদী এখন মরা খাল। সময়ের বিবর্তনে নদীটি এখন হারিয়ে যেতে বসেছে। সেইসঙ্গে চলছে দখলের মহোৎসব। নদীটির পাড় দখল হয়ে গেছে অনেক আগেই। এখন চলছে মাঝখানের অংশ দখলের প্রতিযোগিতা। নদীর বুকে এখন ফসলের মাঠ। এক সময় উত্তাল বানার নদীর পানির ঢেউ ভেঙে কলকল শব্দে রঙবেরঙের বাহারি পাল তুলে বয়ে চলত নানা বরণ নৌকা, বজরা। কোথাও কোথাও বানারের চিত্র দেখে মনে হবে না এটি সেই আগের প্রমত্ত বানার নদী। দেখে মনে হবে ছোট একটি খাল। শুস্ক মৌসুমে পানি না থাকায় নদীর পাড়ঘেঁষা চাষিরা সেচ সংকটে ফসল আবাদ নিয়ে বিপাকে পড়েছেন। ঐতিহ্যবাহী বানার নদীটি খননের দাবি জানিয়েছেন তীরবর্তী কৃষিজীবী মানুষ।

জামালপুর সদর উপজেলার শরিফপুর ইউনিয়নের কাছে প্রবাহমান পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ থেকে উৎপত্তি হয়ে বানার নদী জামালপুর, ময়মনসিংহ জেলার মুক্তাগাছা, ফুলবাড়িয়া হয়ে ত্রিশাল উপজেলার আমিরবাড়ি ইউনিয়নের কাছে খিরো নদীতে গিয়ে শেষ হয়েছে। ফুলবাড়িয়া উপজেলায় নদীটি কলমদারী নাম ধারণ করেছে। কোথাও বানার আপার নদী নামেও পরিচিত।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এক সময় বানার নদীতে অনেক পানি থাকতো। ব্রহ্মপুত্র নদ মরতে থাকায় বানারের অবস্থাও খারাপ হয়ে গেছে। অনেক জায়গা প্রভাবশালীরা দখল করে ফেলেছে। আগে বানার নদী থেকে প্রচুর মাছ ধরা যেতো। এই নদীর হিরণপুঁটি আর জাইতবাইন মাছের খুব সুনাম ছিলো কিন্তু এখন আর কিছুই পাওয়া যায় না এ নদীতে।

বানার নদীতে পলি জমে নদীর তলদেশ ক্রমশ ভরাট হয়ে যাচ্ছে, স্থানীয় লোকজন কর্তৃক নদীর দুই পাশ ভরাট করায় এর প্রশস্থতা ক্রমশ সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। গভীরতাও হ্র্যাস পাচ্ছে। মাতা নদ ব্রহ্মপুত্রের পানিপ্রবাহ কমে আসায় সন্তান নদী বানারের এই শুকনো দশা। জামালপুর অংশে কিছুটা প্রশস্থতা থাকলেও ময়মনসিংহ অংশ বিশেষ করে মুক্তাগাছা এবং ফুলবাড়িয়া অংশে নদীটির অবস্থা খুবই করুণ।
রূপ-মাধুর্যে সমৃদ্ধ আমাদের প্রাণপ্রিয় এই মাতৃভূমি বাংলাদেশ।অবিরাম সৌন্দর্যে আঁকা নদীমাতৃক দেশ আমাদের এই বাংলাদেশ। ষড়ঋতুর দেশ। এককালের প্রায় হাজার নদীর দেশ। জোয়ারভাটার দেশ। সমভূমি আর সবুজ বন-বনানী ও পাহাড়-পর্বত ঘেরা। পাক-পাখালির দেশ, সুজলা-সুফলা,শস্য-শ্যামলা এই বাংলা মায়ের শিতল বক্ষ চিরে বয়ে চলেছে অসংখ্য নদ ও নদীর অববাহিকা।

বাংলা ভাষার কথ্যরূপ বহমান জলধারায় ধ্বনির মতোই সাবলীল,ষ্ফূর্ত নদী।আদিকাল থেকে জীবন ও জলের প্রবাহ একাকার, অবিচ্ছিন্ন। নদী ও জীবন পরস্পরের সবচেয়ে সার্থক উপমান এবং এতটাই সঙ্গত যে,ক্রমাগত পুনরাবৃত্ত হয়েও নতুন জীবনের অনিঃশেষ বহমানতা,পরিক্রমণ,বিবর্তন,সবকিছু একই সঙ্গে নদীতে দৃশ্যমান। নদীর সঙ্গে মানুষের রয়েছে গভীর মিতালী।
নদী প্রকৃতির দান। বলা হয়ে থাকে নদী বাঁচলে দেশ বাঁচবে। এ দেশের অর্থনীতিও নদীনির্ভর।নদীমাতৃক এই বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা নদী-নালার ওপর নির্ভরশীল। অতএব, নদীর অস্তিত্ব বিপন্ন হলে এর সাথে সংশ্লিষ্ট সকল পেশার মানুষ বেকার হয়ে পড়বে। তাই সময়োপযোগী দেশের সকল নদ-নদী খনন,দখল-দূষণ,নদী উদ্ধার করে নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে সচেতনমহলের দাবি।

লেখকঃ সাবেক জাতীয় ক্রীড়াবিদ,সভাপতি শারীরিক শিক্ষাবিদ সমিতি
চেয়ারম্যান গ্রিন ক্লাব,শিক্ষক,গবেষক,সাংবাদিক ও কলামিস্ট