বিশ্বের ভয়াবহ যত বিমান দুর্ঘটনা

 

মো. আলতাফ হোসেন ঃঃ
আকাশ পথে ভ্রমণকে সবচেয়ে আনন্দময় ভ্রমণ হিসেবেও মনে করে থাকেন অনেকে। বিমান পথে চলাচল মানুষের গন্তব্যস্থলে পৌঁছাকে করেছে সহজ ও দ্রুততার। বিজ্ঞানের আবিষ্কার বিমান পৃথিবীর এক দেশের সাথে অন্য দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় ঘটিয়েছে ব্যাপক পরিবর্তন। এক দেশ থেকে অন্য দেশে চাইলেই খুব সহজেই বিমানের সাহায্যে আকাশ পথে যাতায়াত করা যায়। তবে মাঝে মাঝে বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় এ আনন্দ ভ্রমণেই নেমে আসে বিষাদের ছায়া। কারণ দুর্ঘটনায় কবলিত বিমান থেকে বেঁচে ফেরার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। বিশ্বের বিভিন্ন সময়ে বিমান নিখোঁজ ও বিধ্বস্তের ঘটনা ঘটেছে। যার প্রমাণ পাওয়া গেছে নেপালের কাঠমন্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দের ইউএস বাংলার বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায়। প্রিয় পাঠক আসুন জেনে নেই ইতিহাসের ভয়াবহ কয়েকটি বিমান দুর্ঘটনাচিত্র।
১। ম্যাকডনেল ডগলাস ডিসি-১০ ঃ ইতিহাসের ভয়াবহ যতো বিমান দুর্ঘটনা ঘটেছে তার মধ্যে ম্যাকডনেল ডগলাস ডিসি-১০ অন্যতম। ১৯৭৪ সালে ৩ মার্চ দুর্ঘটনার কবলে পড়ে টার্কিশ ইয়ারলাইন্সের ম্যাকডনেল ডগলাস ডিসি-১০ বিমানটি। ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস থেকে উড্ডয়নের কিছুক্ষণ পরই এরমেওনভিলে একটি পার্কে আছড়ে পড়লে ৩৩৫ জন যাত্রী ও ১১ জন ক্রুর সবাই নিহত হন।

২। স্পেনের নর্থ এয়ারপোর্ট ট্রাজেডি- ঃ ১৯৭৭ সালের ২৭ মার্চ স্পেনের টেনেরিফে নর্থ এয়ারপোর্টে কেএলএম রয়েল ডাচ এয়ারলাইন্সের একটি বোয়িং-৭৪৭ বিমান উড্ডয়ন শুরু করার ঠিক পরপরই ‘প্যান আমেরিকান ওয়ার্ল্ড এয়ারওয়েজ’-বিমানের ওপর বিধ্বস্ত হয়। এতে দুই বিমানের মোট ৫৭৪ জনই নিহত হন।
৩। ইঞ্জিন খুলে পড়ে মার্কিন বিমানের ঃ ১৯৭৯ সালের ২৫ মে আমেরিকার মাটিতে সবচেয়ে ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনা ঘটে। শিকাগোর ও’হেয়ার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একটি ডিসি-১০ বিমান উড্ডয়ন শুরু করলে রক্ষণাবেক্ষণের ত্রুটির কারণে বাম পাশের ইঞ্জিনটি খুলে পড়ে। এতে নিহত হন ২৭৩ জন।
৪। অ্যান্টার্কটিকায় বিধ্বস্ত ডিসি-১০ ঃ ১৯৭৯ সালে ২৮ নভেম্বর নিউজিল্যান্ডের ডিসি-১০ বিমান অ্যান্টার্কটিকায় বিধ্বস্ত হলে ২৫৭ জন যাত্রী এবং ক্রুর সবাই নিহত হন।
৫। বেঁচে যান চার যাত্রী- ঃ ১৯৮৫ সালের ১২ আগস্ট একক বাণিজ্যিক বিমানে সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে জাপানে। জাপান এয়ারলাইন্সের বিমানটি টোকিও থেকে উড্ডয়নের কিছুক্ষণ পরই দেশটির পাহাড়ি অঞ্চলে বিধ্বস্ত হলে ৫২০ জন নিহত জন। বিস্মায়করভাবে প্রাণে বেঁচে যান চর যাত্রী।
৬। আকাশেই বিকল হয়ে যায় বোয়িং- ঃ ১৯৯১ সালের ২৬ মে ‘লডা এয়ার’র একটি বোয়িং-০১৭৬৭ বিমান উড্ডয়নের ১২ মিনিটের মাথায় আকাশেই বিকল হয়ে যায়। ব্যাংককের উত্তর-পশ্চিমে এটি বিধ্বস্ত হলে ২২৩ জন যাত্রী এবং ক্রুর সবাই নিহত হন।
৭। আগুন ধরে যায় নাইজেরিয়ান এয়ারওয়েজে ঃ ১৯৯১ সালে ১১ জুলাই সৌদি আরবের জেদ্দা থেকে উড্ডয়নের কিছুক্ষণ পরই আগুন ধরে যায় নাইজেরিয়ান এয়ারওয়েজের ডিসি-৮ বিমানটিতে। ২৬১ জন যাত্রী ও ক্রুর সবাই নিহত হন।
৮। জ¦ালানি ট্যাংকে বিস্ফোরণ- ঃ ১৭ জুলাই, ১৯৯৬ নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি এয়ারপোর্ট থেকে উড্ডয়নের কিছুক্ষণ পরেই ট্রান্স ওয়ার্ল্ড এয়ারলাইন্সের একটি বিমানের জ¦ালানি ট্যাংকে বিস্ফোরণ ঘটে। বিমানটি আটলান্টিক মহাসাগরে পতিত হয়। এতে ২১২ জন যাত্রী এবং ১৮ জন ক্রুর সবাই নিহত জন।
৯। দুই বিমানের সংঘর্ষ- ঃ ভারতের নয়াদিল্লি বিমানবন্দরে ১৯৯৬ সালের ১২ নভেম্বর সৌদি এবং কাজাখস্তান এয়ারলাইন্সের দুটি বিমানের সংঘর্ষ হয়। এতে নিহত হন দুই বিমানের ৩৪৯ জন।
১০। লকারবি শহরে ভেঙ্গে পড়ে বোয়িং- ঃ ২১ ডিসেম্বর, ১৯৯৮ সন্ধ্যার কিছু পর দক্ষিণ স্কটল্যান্ডের লকারবি শহরে ভেঙ্গে পড়েছিল প্যান-এর ফ্লাইট ১০৩- এর বোয়িং ৭৪৭-১২১ বিমানটি। লন্ডনের হিথরো বিমানবন্দর থেকে নিউইয়র্কের কেনেডি বিমানবন্দরগামী বিমানটির ২৫৪ জন যাত্রী এবং ১১ ক্রুর নিহত হন।

১১। কাঠমান্ডুর ত্রিভুবনে বিধ্বস্ত ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্স বিমান ঃ বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বরণকালের ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনা ঘটে গেলো নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। ১২ মার্চ, ২০১৮ নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে বাংলাদেশের ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের বিমান বিধ্বস্ত হয়ে অন্তত ৫১ জন নিহত হয়েছেন। স্থানীয় সময় সোমবার দুপুর ২টা ২০ মিনিটে কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ওই বিমান দুর্ঘটনা ঘটে। ইউএস বাংলার পক্ষ থেকে জানানো হয়, বিমানটিতে ৬৭ জন যাত্রী ও চারজন বিমানকর্মী ছিলেন। যাত্রীদের মধ্যে ৩৩ জন বাংলাদেশি, ৩২ জন নেপালি এবং একজন করে মালদ্বীপ ও চীনের যাত্রী ছিলেন বলে জানা গেছে। গত ৩৪ বছরের ইতিহাসে বাংলাদেশের বিমানের ভয়াবহ দুর্ঘটনা এটি।
নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিমানবন্দরে এর আগেও আরো বহু বিমান দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে। পাহাড় ঘেরা এই বিমানবন্দরটি কাঠমান্ডু উপত্যকায় এবং শহরের কেন্দ্র থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার দূরে। একের পর এক বিমান দুর্ঘটনার কারণে এই বিমানবন্দরটির নিরাপত্তা নিয়ে প্রায়শই আলোচনা হয়।

নেপাল থেকে বিবিসির সংবাদদাতা বলছেন, বিমানবন্দরটিতে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক কোনো বিমান অবতরণের পর থেকে এপর্যন্ত ৭০টিরও বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে। বলা হচ্ছে, এসব দুর্ঘটনায় ৬৫০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। বিমানের পাশাপাশি সেখানে হেলিকপ্টরও বিধ্বস্ত হয়েছে।

এছাড়া সৌদিয়া অ্যারাবিয়ান এয়ারলাইন্স ফ্লাইট-১৬৩, ১৯৮০ সালের আগস্টে রিয়াদ বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়নের সাথে সাথে বিমানটিতে আগুন ধরে যায় এবং অনেক ধোঁয়ার সৃষ্টি হয়। মাটিতে ক্রুরা যকণ বিমান্তি দরজা খোলার চেষ্টা করেন তখন আবার আগুন লাগে। ৩২৯ জন আরহি সবাই মারা যায়। এটাই একমাত্র বিমান দুর্ঘটনা যেখানে আকাশে না ঊরেও এটি ঘটে এবং সকল যাত্রী মারা যায়। তদন্তে পরে জানা যায় যে বিমানে তখন রান্না চলছিলো এবং চুলা থেকে আগুন লেগে যায়। কোরিয়ান এয়ারলাইন্স ফ্লাইট-০০৭: ১৯৮৩ সালের ১ সেপ্টেম্বরের ঘটনা। ঘটনাস্থল তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের মনোরন দ্বীপ। সোভিয়েত বাহিনী গুলি করে ভূপাতিত করে যাত্রীবাহি উড়োজাহাজটি। মারা যান ২৬৯ আরোহীর সবাই। ৩৪ বছর আগে ১৯৮৪ সালে ফকার এফ-২৭ তখনকার জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অদূরে বিধ্বস্ত হয়েছিল, এতে প্রায় ৪৯ জনের মৃত্যু হয়েছিল।ইরান এয়ার বিপর্যয় ঘটে ১৯৮৮ সালের ৩ জুলাই। পারস্য ও উপসাগরের আকাশে ইরান এয়ারের একটি যাত্রীবাহী উড়োজাহাগুলি করে ভূপাতিত করে যুক্তরাষ্ট্র। এতে মারা যায় ২৯০ অরোহীর সবাই। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছিল, ভুল করে ওই গুলি করা হয়। ২৫ মে, ২০০২ তাইওয়ান থেকে হংকংগামী এক বিমান ফ্লাইট ৬১১ মাঝ আকাশে বিকল হয়ে পড়লে বিধ্বস্ত হয়। এতে ২২৫ জনের সবাই নিহত হন। ইরানের ইলিউশিন বিমান ২০০৩ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারির ইরানের কেরমান এলাকায় বিমানটি বিধ্বস্ত হয়। খারাপ আবহাওয়ার কারণে বিধ্বস্ত হয় প্রভাবশালী বিপ্লবী গার্ড সদস্যদের বহনকারী উড়োজাহাজটি। মৃত্যু হয় ২৭৫ আরোহীরই। ২০০৯ সালে ফ্রান্সের রিও ডি জেনারিও থেকে প্যারিসের উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়ার পর যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে আটলান্টিক মহাসাগরের উপর থেকে ফ্লাইট ৪৪৭ নিখোঁজ হয়। ওই ফ্লাইটটে ২২৮ জন যাত্রী ছিল। ১০ এপ্রিল, ২০১০ পোল্যান্ডের বিমান বাহিনীর একটি বিমান দুর্ঘটনায় পড়লে দেশটির তৎকালীন প্রেসিডেন্টসহ ৯৬ জন যাত্রীর সবাই নিহত হন। সরকারি তদন্তে দুর্ঘটনার জন্য পাইলটকে দায়ী করা হয়। ২০১৪ সালে মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্সের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলে ফ্লাইট এমএইচ ৩৭ নিখোঁজ হয়ে যায়। তারপর বিমানের ২৩৯ জন যাত্রীর সবাইকে মৃত বলে ঘোষণা করা হয়। ওই বছরই এমএইচ ১৭ মোট ২৮৩ জন যাত্রী নিয়ে বিধ্বস্ত হয়। যাত্রীদের মধ্যে ৮০ জন শিশু ছিল।

যাতায়াতের নিরাপদতম ম্যাধম হিসেবে উড়োজাহাজকে বিবেচনায় করা হয়। কিন্তু চলতি বছরে ভয়ংকর সব বিমান দুর্ঘটনা ঘটছে বারবার। ফেব্রুয়ারিতে ইরানের মধ্যাঞ্চলের ইস্পাহানে একটি বিমান বিধ্বস্ত হয়ে ৬৬ জন যাত্রী নিহত হন। ইরানের দুর্ঘটনার কিছুদিন আগেই ১১ ফেব্রুয়ারি রাশিয়াতে সারাতোভ এয়ারলাইন্সের এ-১৪৮ বিমানটি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে বিধ্বস্ত হয়। এই দুর্ঘটাতে ৭০ জন নিহত হয়। এছাড়া অস্ট্রোলিয়ার সিডনীতে বিমান বিধ্বস্ত হয়ে ১৩ জন ও কোস্টারিকাতে ১২ জন নিহত হয়েছে।
বিগত বছরগুলোতে বিমানে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিমান পূর্বের যে কোনো সময়ের থেকে এখন বেশি নিরাপদ বলে দাবি করা হয়েছে। তারপরও বিমান দুর্ঘটনা থেমে থাকেনি। এর আগেও শত শত মানুষ একসঙ্গে বিমান দুর্ঘটনাতে প্রাণ হারিয়েছে। ইতিহাস এরকম ভয়ংকর সব বিমান দুর্ঘটনার সাক্ষী হয়ে আছে। বলা হয়ে থাকে বিমানের ত্রুটির কারণে নয় মূলত পাইলটের ভুলের কারণেই ৮০ শতাংশ বিমান দুর্ঘটনাতে পরে থাকে। আবার দক্ষ বিমান চালকের কৌশলে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরেছেন এমন নজিরও কম নেই।

লেখক: সাবেক জাতীয় ক্রীড়াবিদ(কারাতে ব্লাক বেল্ট ১ম ড্যান) চেয়ারম্যান গ্রিন ক্লাব
সভাপতি শারীরিক শিক্ষাবিদ সমিতি, গবেষক,শিক্ষক,সাংবাদিক ও কলামিস্ট