বিশ্ব অর্থনীতিতে পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনা ও পর্যটক আকর্ষণ আমাদের করণীয়

 

মো. আলতাফ হোসেন ঃঃ
আজকের বিশ্ব পর্যটন একটি অতি পরিচিত ও জীবন সচল শিল্প। আন্তর্জাতিক সমঝোতা শান্তি ও সহযোগিতার বহন হিসেবে এর জুড়ি নেই। বিশে^র ৮৩টি দেশের অর্থনীরিত প্রধান ৫টি খাতের মাধ্যমে পর্যটন শিল্প একটি। বিশ্বে প্রতি ১১ কর্মজীবীর মধ্যে একজন পর্যটন শিল্পের সাথে জড়িত আছে। বিশ্বে পর্যটকরা ভ্রমণ খাতে ব্যয় করে ৫০ হাজার কোটি মার্কিন ডলার। পর্যটন একটি লাভজনক ও কর্মসংস্থান সহায়ক শিল্প খাত। পৃথিবীর অনেক দেশের সাথে অর্থনীতির সাথে নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে এই শিল্পের। সামাজিক অবদানের পাশাপাশি পর্যটন দিচ্ছে ব্যাপক কর্মসংস্থান ও মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সুযোগ। পর্যটন বিনোদনের মাধ্যমে মানুষে মানুষে বন্ধুত্ব রচনা এক অনবদ্য পদ্ধতি। দ্বন্দ ও সংঘাতময় বিশে^ মানব কল্যাণ সাধনের ক্ষেত্রে পর্যটন পালন করে কার্যকর ভূমিকা। কারণ পর্যটনের মাধ্যমে মানুষ মানুষকে অন্তরঙ্গ আলোকে জানে এবং ভুল বোঝাবুঝি ও দূরত্বের অবসান ঘটায়। অর্থনৈতিক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে যুগ পণ্যভাবে পর্যটন শিল্প যথাযোগ্য অবদান রেখে চলেছে। সুতরাং আজকের বিশ্বের এরূপ শিল্পের বিকাশে তৎপর হওয়া প্রতিটি জাতির কর্তব্য।

বিশ্বে প্রায় ৮ কোটি মানুষ এই শিল্পের সাথে সরাসরি জড়িত। পরোক্ষভাবে ৮০ কোটি মানুষ আছে এই শিল্পের সাথে জড়িত। এছাড়া বিশ্বে পর্যটন শিল্প জিডিপিতে অবদান রাখছে মোট ৯ ভাগ। এমনকি বিশে^র ৮ ভাগ কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অবদান রয়েছে এই খাতের।
মালয়েশিয়ায় প্রতিবছর ভ্রমণে যখন ২৫ মিলিয়ন মানুষ। তার সেখানে ব্যয় ২০ দার্শনিক দুই ডলার মাথাপিছু ব্যয় করেন তার ৮০৮ মালয়েশিয়ার পর্যটন খাতের আর ২ হাজার কোটি ডলার, থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুর তাদের পর্যটন খাতকে আকর্ষণীয়ভাবে সাজিয়েছে নেপালের মোট জাতীয় আয়ের ৪০ শতাংশ আসে পর্যটন শিল্প থেকে।

২০১৭ সালে পর্যটন খাতে রেকর্ড আয় করেছে যুক্তরাষ্ট্রের হলিউড নগরী লস অ্যাঞ্জেলেস। কোটি ৮৫ লাখ পর্যটক ভ্রমণ করায় ৩ হাজার ৪৯০ কোটি ডলার আয় করেছে মার্কিন এ ফাউন্টি। ২০২০ সালের মধ্যে ৫ কোটি পর্যটক আকর্ষণের পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্ণিয়া অঙ্গরাজ্যের এ শহরটি সারা বিশে^র ভ্রমণ পিপাসুদের পছন্দের দেশ হলো হ্রাস, ফ্রান্সে পর্যটন খাত থেকে দেশটির মোট জিডিপির প্রায় সাত শতাংশ আসে। যা দেশটির গাড়ি শিল্প খাত থেকে যে আয় হয় তার চেয়েও বেশি। ফ্রান্সে আসা পর্যটকরা মাথাপিছু ৬৪৬ খাতে দেশটি ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেছে। ৩৬টি ন্যাশনাল পার্ক ও অসংখ্য প্রাকৃতিক বিনিময় নিয়ে চিলি ২০২০ সালের মধ্যে পর্যটন বিশে^র তৃতীয় বৃহত্তম (জিডিপির) দেশ হয়ে ওঠবে বলে দেশটির পর্যটন সংস্থা ঘোষণা দেয়।
কানাডা পর্যটকদের জন্য স্বর্ণ। ভ্রমণ খরচ অনেক বেশি বলে ধন কুবেরদের আনাগোনা এখানেই বেশি। পশ্চিমে রকি মাউন্টন, সিটি অব ভ্যানকোভার; ভিক্টোরিয়া, ক্যালগরি মধ্য কানাডায় নায়াগ্রা জলপ্রপাত, টরেন্টো ওতোয়া, মান্টেরিয়াল, কিউবেক সিটি এবং গ্রস মর্ণ
ন্যাশাল পার্ক পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ প্রতিবছর দেশটি পর্যটনে গড়ে ৮৮.৫ মার্কিন ডলার আয় করে। ভারত স্বাধীনতার ৭০ বছরে পৃথিবীর বুকে অন্যতম সেরা পর্যটন রাজ্যে রূপ নিয়েছে। ওয়াল্ড ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজমের হিসাব অনুযায়ী ২০১৬ সালে দেশটির পর্যটন শিল্প থেকে ২২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করেছে এবং দেশটির জিডিপির হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯.৬ শতাংশ।

শিল্প সাহিত্য ও সংস্কৃতির দেশ স্পেন। স্পেনের ১৫টিরও বেশি জনপ্রিয় ঐতিহাসিক পর্যটন স্থান রয়েছে যেখানে সারা বছরই থাকে ভ্রমণ প্রিয় মানুষের আনাগোনা। স্পেন ইউরোপের পঞ্চম বৃহত্তম পর্যটনের দেশ। ভ্রমণে নানা কেলেঙ্কারি কাটিয়ে ২০১৬ সালে পর্যটনে ডলার করে ব্যয় করেন। পর্যটকদের ৮৩ ওয়াল্ড ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিমের হিসাব অনুযায়ী ২০১৬ দেশটি পর্যটন শতাংশই আসেই ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে। চীন আর স্পেনে সমানসংখ্যক মানুস ভ্রমণের যান। চীনে গেলো বছর মোট ৫৭ দশমিক ৭ মিলিয়ন পর্যটক গেছে। এ সময় পর্যটকরা মোট ৫০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেন। পর্যটকরা মাথা পিছু ব্যয় করেন ৯৬৯ ডলার। জার্মানিতে আসা পর্যটকরা মাথাপিছু ব্যয় করেন ১২৫৩ ডলার।

সৌদি আরবে প্রতিবছর যান ১৩ দশমিক সাত মিলিয়ন মানুষ। তারা ব্যয় করেন সাত দশমিক চার বিলিয়ন ডলার। প্রতি পর্যটক মাথাপিছু ব্যয় করেন ৫৪১ ডলার। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশ ম্যাকাও তার ক্যাসিনোর জন্য বিখ্যাত; এখানে প্রত্যেক পর্যটক মাথাপিছু ব্যয় করেন ৩২১৩ দশমিক ৮ মিলিয়ন পর্যটক, প্রতিবছর তারা ব্য করেন ৩২ দশমিক এক বিলিয়ন ডলার। মাথাপিছু ব্যয় করেন ১৩৪৮ ডলার করে। থাইল্যান্ড প্রতিবছর যান ২২ দশমিক চার মিলিয়ন পর্যটক। তারা বার্ষিক ব্যয় করেন ৩০ দশমিক বিলিয়ন ডলার। মাথাপিছু প্রতিপর্যটক ব্যয় করেন ১৩৪৪ ডলার। দক্ষিণ আমেরিকার বিস্ময় চিনি। ইস্টার আইল্যান্ডের ৮৮৭টি পাথুরে মাথা দেশটিকে আরো রহস্যময় করে তুলেছে। গেল বছর পর্যটন দেশটির প্রবৃদ্ধি ছিলো শক্তিশালী। মিয়ানমার পর্যটকদেরও কাছ প্রাকৃতিক স্বর্গ বলেই পরিচিত।সামরিক শাসনের কলঙ্ক ঘুচিয়ে দেশটি এখন পর্যটন বিশ্বেরর অন্যতম নগরী। প্রতিবছর ১ মিলিয়ন পর্যটক বাড়ছে দেশটিতে ২০১৬ সালে পর্যটকদের সংখ্যা ছিলো ৫ মিলিয়ন।

ডেনমার্ক ২০১৪ সালে সর্বোচ্চ ৪৭ মিলিয়ন পর্যটকের সমাগম ঘটেছিলো। ২০১৬ সালে কলম্বিয়া পর্যটন থেকে আয় হয় ৫৮৮০ বিলিয়ন ডলার। প্রতিবছর দেশটিতে ২.৯ মিলিয়ন বেশি পর্যটকের আগমণ ঘটে। পর্যটন শিল্প পেরুর তৃতীয় বৃহত্তম জাতীয় আয়ের উৎস। ডব্লিউ টিটিসির হিসাব মতে ২০১৫ সালে ৩.৮ মিলিয়ন ভ্রমণ পিপাসুর আগমণ ঘটে এখানে। বিশেষত আধুনিক স্থাপত্যকলা ও শিল্প কারখানা ডিজাইন ফিন্যান্ডের মুনাফা আছে ওয়াল্ড ট্রাভেল এন্ড ট্যুরিমনেয় হিসাব মতে, ২০১৬ সালেই ৪.৬ মিলিয়নের বেশি পর্যটনের আগমণ ঘটে এখানে। বর্তমানে বাংলাদেশকে সারা বিশ্বে দ্রুত বর্ধনশীল ১০টি পর্যটন মার্কেটের একটি হিসেবে ভাবা হচ্ছে।

বর্তমানে বিশ্বে পর্যটকদের সংখ্যা প্রায় ৯০ কোটি। ২০২০ সালে এ সংখ্য। ২০২০ সালে এ সংখ্যা দাঁড়াবে ১৬০ কোটি। পর্যটন বিশেষজ্ঞদের মতে, এ বিপুল সংখ্যক পর্যটকের মধ্যে প্রায় ৭৩ শতাংশ ভ্রমণ করবে এশিয়ার দেশগুলোয়। বিশ্বে পর্যটন সংস্থার তথ্যমতে, ২০১৮ সালের মধ্যে এ শিল্পে ৩৫ কোটি ৭০ লাখ লোকের কর্মসংস্থান হয়ে যা কিন্তু অর্থনীতিতে অবদান রাখে ১০ দশমিক ৫ শতাংশ। বাংলাদেশ যদি এ বিশাল বাজার ধরতে পারে, তাহলে পর্যটনের হাত ধরেই বদলে যেতে পারে বাংলাদেশের অর্থনীতি পর্যটস এখন একটি শিল্প, যা অনেক দেশের অর্থনীতির একটি মুখ্য উপাদান। এ শিল্প বিশ্বব্যপী একটি দ্রুত বিকাশমান খাত হিসেবে চিহ্নিত। কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি ছাড়াও বহুমাত্রিক কর্মকান্ডের সুযোগ সৃষ্টি ছাড়াও বহুমাত্রিক কর্মকান্ডের মাধ্যমে পর্যটন অনেক দেশেরই শীর্ষ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী শিল্পে পরিণত হয়েছে।

ইউএন ডব্লিউটিওর তথ্য অনুযায়ী ১৯৫০ সালে বিশে^ পর্যটকের সংখ্যা ছিলো মাত্র আড়াই কোটি। ২০১২ সালে বেড়ে এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১শ ৩৫ কোটি। অঞ্চলভিত্তিতে ২০১২ সালে সবচেয়ে বেশি পর্যটকদের আগমণা ঘটেছে ইউরোপ, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে। ২০১২ সালে বিশ^ পর্যটন আয় জিডিপির ৯ শতাংশ , যা বিশ^ রপ্তানির ৬ শতাংশ। এর রপ্তানি মূল্য ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার এ খাতে প্রতি ১০ জনে একজনের কর্মসংস্থান হয়েছে।

পর্যটন শিল্পের অর্থনৈতিক সাংস্কৃতিক ও সামাজিক অবদান ও গুরুত্ব সম্পর্কে জনসচেতাকে সদৃঢ় করার লক্ষ্য নিয়ে ১৯৭৯ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ প্রতিবছর ২৭ সেপ্টেম্বর বিশ্বে পর্যটন দিবস পালনের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে। সদস্য রাষ্ট্র সমূহের আয়োজিত বিভিন্ন অনুষ্ঠান কর্মসূচি গ্রহণের মাধ্যমে একসঙ্গে দিবসটি পালনের জন্যেও সাধারণ পরিষদ আহ্বান জানায়। এ সিদ্ধান্ত ও বিশ্বে পর্যটন আহ্বান জানায়। এ সিদ্ধান্ত ও বিশ^ পর্যটন আহ্বান জানায়। এ সিদ্ধান্ত ও বিশ^ পর্যটন সংস্থায় নিদের্শনা অনুসারে সংস্থার সদস্যজুড়ে সব দেশে ১৯৮০ সাল থেকে বিশ^পর্যটন দিবস পালিত হয়ে আসছে বিশে^র অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও যথাযথ গুরুত্ব সহকারে।

লেখক: সাবেক জাতীয় ক্রীড়াবিদ(কারাতে ব্লাক বেল্ট ১ম ড্যান) চেয়ারম্যান গ্রিন ক্লাব
সভাপতি শারীরিক শিক্ষাবিদ সমিতি, গবেষক,শিক্ষক,সাংবাদিক ও কলামিস্ট