ভাষাতত্ত্ব চর্চার ইতিহাসে একজন প্রকৃত জ্ঞানতাপসের প্রতিকৃতি ড.মুহম্মদ শহীদুল্লাহ

 

মো.আলতাফ হোসেন ঃঃ

ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ভারতীয় উপমহাদেশের একজন স্মরণীয় বাঙালি ব্যক্তিত্ব,বহুভাষাবিদ, বিশিষ্ট শিক্ষক ও দার্শনিক ছিলেন। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ১৮৮৫ সালের ১১ই জুলাই ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ২৪ পরগণার পেয়ারা গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি ১৯০৪ সালে হাওড়া জেলা স্কুল থেকে এন্ট্রান্স এবং ১৯০৬ সালে কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে এফ.এ (বর্তমান এইচ.এস.সি এর সমমান) পাশ করেন।

১৯১০ সালে সিটি কলেজ, কলকাতা থেকে সংস্কৃতে সম্মানসহ বি.এ এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বে এম.এ (১৯১২) ডিগ্রি অর্জন। এ ছাড়াও ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সরবোন বিশ্ববিদ্যালয়,প্যারিস থেকে পি.এইচডি ডিগ্রি লাভ করেন।পড়াশোনা শেষ করার পূর্বেই কিছুকাল তিনি যশোর জেলা স্কুলে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। এন্ট্রান্স পাশের সময় থেকেই মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বিভিন্ন ভাষার প্রতি অতি উৎসাহী ও আগ্রহী হয়ে উঠেন এবং একাধিক ভাষা শিক্ষা শুরু করেন।

ড.মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ যশোর জেলা স্কুলের শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন; তারপর সীতাকুন্ড হাইস্কুলে কিছুদিন প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করার পর তিনি ১৯১৫ থেকে ১৯১৯ সাল পর্যন্ত চব্বিশ পরগণার বসিরহাটে আইন ব্যবসা করেন। ১৯১০ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁকে বেদ পঠনের অনুমতি দেননি পন্ডিত সত্যব্রত সামশ্রমী। স্যার আশুতোষের চেষ্টায় ও কলিকাতা উচ্চ আদালতের নির্দেশে তিনি বেদপাঠের সুযোগ পান কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে।

১৯১৯ থেকে ১৯২১ সাল পর্যন্ত ডক্টর দীনেশ চন্দ্র সেনের সহকর্মী হিসেবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষক হিসেবে কাজ করেন। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত ও বাংলা বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। পাশাপাশি একই বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯২২ থেকে ১৯২৪ সালে পর্যন্ত আইন বিভাগে খন্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে কাজ করেন। ১৯৩৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ও রিডার হিসেবে নিযুক্ত হন। সেখান থেকে ১৯৪৪ সালে অবসর গ্রহণ করেন। অবসরের পর তিনি বগুড়ার সরকারি আজিজুল হক কলেজে অধ্যক্ষ হিসেবে যোগ দেন। ১৯৫৩-১৯৫৫ সালে তিনি পুনরায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে ফরাসি ভাষার খন্ডকালীন শিক্ষক হিসাবে কাজ করেন। ১৯৫৫ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত ও পালি বিভাগে যোগদান করে ১৯৫৮ সালে অবসর গ্রহণ করেন।

১৯২৫ সালে গৌড়ী বা মাগধী প্রাকৃত থেকে বাংলা ভাষার উৎপত্তি হয়েছে প্রমাণ করার পর অধ্যয়ন করেছেন জার্মানির ফ্রাইবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে। এরপর ১৯২৮ সালে বাংলা ভাষার প্রাচীন নিদর্শন চর্যাপদাবলি বিষয়ে গবেষণা করে প্যারিসের সরবোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভারতীয় মুসলমানদের মধ্যে প্রথম ডক্টরেট অর্জন করেছেন। এছাড়া ধ্বনিতত্ত্বে মৌলিক গবেষণার জন্য প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিপ্লোমাও লাভ করেছিলেন। ভাষাবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে বহুভাষিক ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর ছিলো অবাধ বিচরণ। ১৮টি ভাষা জানতেন তিনি। ফলস্বরূপ, সহজেই বিভিন্ন ভাষার সঞ্চিত জ্ঞান দ্বারা অভিগমনে সক্ষম ছিলেন তিনি। বিভিন্ন ভাষায় অদম্য আগ্রহী ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে, ১৯৪৮ সালে পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলনে ধর্মীয় নয়,জাতিগত পরিচয় হিসেবে বাঙালিত্বকে স্বীকার করে সভাপতির অভিভাষণে ঘোষণা করেছিলেন, ‘আমরা হিন্দু বা মুসলমান যেমন সত্য, তার চেয়ে বেশি সত্য আমরা বাঙালি।

১৯৬৩ সালে বাংলা একাডেমি কর্তৃক গঠিত বাংলা একাডেমির পঞ্জিকার তারিখ বিন্যাস কমিটির সভাপতি নিযুক্ত হন। তাঁর নেতৃত্বে বাংলা পঞ্জিকা একটি আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত রূপ পায়। শহীদুল্লাহ সবসময়ই সাহিত্য কর্মকান্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এম.এ পাশ করার পরই তিনি বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতির সম্পাদক হন। ১৯৪৮ সালে তিনি পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলনের সভাপতি ছিলেন। তিনি উর্দু অভিধান প্রকল্পেরও সম্পাদক ছিলেন। তাছাড়া ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বিভিন্ন বই লিখেছেন। তাঁর বিভিন্ন ভাষার দখল ছিলো অসাধারণ ও অসামান্য। উর্দু ভাষার অভিধান প্রকল্পেও তিনি সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছেন। পরে পূর্ব পাকিস্তানি ভাষার আদর্শ অভিধান প্রকল্পের সম্পাদক হিসেবে বাংলা একাডেমিতে যোগ দেন। ১৯৬১-১৯৬৪ সাল পর্যন্ত বাংলা একাডেমির ইসলামি বিশ্বকোষ প্রকল্পের অস্থায়ী সম্পাদক পদে নিযুক্ত হন।

 

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরই দেশের রাষ্ট্রভাষা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হলে বাংলা-কে রাষ্ট্র ভাষা করার পক্ষে যে ক-জন ব্যক্তি জোরালো বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন তাদের মধ্যে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ অন্যতম। তাঁর এই ভূমিকার ফলে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের পথ অনেকখানিই প্রসস্ত হয়। ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম এমেরিটাস অধ্যাপক পদ লাভ করেন। একই বছর ফ্রান্স সরকার তাঁকে সম্মানজনক পদক নাইট অফ দি অর্ডারস অফ আর্টস অ্যান্ড লেটার্স দেয়। ঢাকা সংস্কৃত পরিষদ তাঁকে ‘বিদ্যাবাচস্পতি’ উপাধিতে ভূষিত করে। পাকিস্তান আমলে তাঁকে ‘ প্রাইড অফ পারফরম্যান্স পদক ও মরণোত্তর ‘হিলাল-ই ইমতিয়াজ খেতাব’ প্রদান করা হয়। ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর কালচারাল রিলেশন্স তাঁকে সম্মানিত সদস্য (ফেলো) রূপে মনোনয়ন করে কিন্তু পাকিস্তান সরকারের অনুমতি না থাকায় তিনি তা গ্রহণ করেননি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে মরণোত্তর ‘ডি. লিট’ উপাধি দেয়। ১৯৮০ সালে মরণোত্তর বাংলাদেশের স্বাধীনতা পদক দেওয়া হয়। তিনি ‘ চলন্ত শব্দ কল্পদ্রুম ‘ বলেও পরিচিত । ২০০৪ সালে বিবিসি বাংলা একটি ‘শ্রোতা জরিপ’-এর আয়োজন করে। বিষয়টি ছিলো-সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি কে? ত্রিশ দিনের ওপর চালানো জরিপে শ্রোতাদের ভোটে নির্বাচিত শ্রেষ্ঠ ২০জনের জীবন নিয়ে বিবিসি বাংলায় বেতার অনুষ্ঠান পরিবেশিত হয় ২০০৪-এর ২৬শে মার্চ থেকে ১৫ই এপ্রিল পর্যন্ত। বিবিসি বাংলার সেই জরিপে শ্রোতাদের মনোনীত শীর্ষ ২০জন বাঙালির তালিকায় ১৬তম স্থানে ওঠে আসেন ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ।

 

ড.মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এর জীবদ্দশায় বাংলা ভাষার উৎকর্ষ সাধনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি। তাঁকে বলা হতো “চলন্ত এনসাইক্লোপেডিয়া”। বিভিন্ন ভাষার প্রতি ছোটবেলা থেকেই ছিলো তাঁর অদম্য আগ্রহ। ডক্টরেট শেষ করার আগেই তিনি গবেষণার কাজ করেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও অধ্যাপনার কাজ করেন ১৯২১ সাল থেকে। তিনি করাচিতে ঊর্দু অভিধান বোর্ডের প্রধান হিসাবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন। করাচি থেকে ঢাকায় ফিরে তিনি প্রফেসর এমিরেটাস হন। তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম প্রফেসর এমিরেটাস,”বলেন ড.মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ছেলে মুহম্মদ তকিউল্লাহ। তাঁর জীবদ্দশায় বহু ভাষা শিখেছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষার অভিধান তৈরি করে বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রাখেন। বাংলা অ্যাকাডেমির ইসলামি বিশ্বকোষ প্রকল্পের অস্থায়ী সম্পাদক পদেও কাজ করেছিলেন তিনি। এছাড়াও বাংলা অ্যাকাডেমির পঞ্জিকার তারিখ বিন্যাস কমিটির সভাপতি হিসাবে তাঁর নেতৃত্বে বাংলা পঞ্জিকা একটি আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত রূপ পায়।

ড.মুহম্মদ শহীদুল্লাহ কমরেড পত্রিকায় একটি লেখা তিনি লেখেন, ‘দ্য ল্যাঙ্গোয়েজ প্রবলেম অফ পাকিস্তান’।এই নিবন্ধে যে কথাগুলো তিনি বলেন, সেগুলো হচ্ছে এই যে পাকিস্তান রাষ্ট্রের বাংলাভাষী অংশে,যদি বাংলা ছাড়া অন্য কোনো ভাষা রাষ্ট্রভাষা হয়, তাহলে সেই স্বাধীনতা হবে পরাধীনতারই নামান্তর। “এই কথাটাই দেশে তখনকার বাঙালি সুধীসমাজ লুফে নেন। এবং এই কথাটার ওপরই শুরু হয় ভাষা আন্দোলন। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহই ছিলেন ভাষা আন্দোলনের প্রধান উদ্যোক্তা। তিনি বাংলা ভাষার ইতিহাস দু খন্ডে লিখেছিলেন। একসময় বিদ্যাপতির যে পদগুলো ছিলো সেগুলো সম্পাদনা করেছিলেন তিনি। এবং তাঁর একটি বিরাট কৃতিত্ব হচ্ছে প্রাচীন বাংলার যে প্রথম নিদর্শন-চর্যাপদ, সেই চর্যাপদ তিনি সম্পাদনা করেছিলেন। কাজেই একদিকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, অন্যদিকে গবেষণা এবং আঞ্চলিক ভাষার অভিধান সম্পাদনা- এই দিকগুলো যদি আমরা বিচার করি,তাহলে আমরা দেখব প্রতিভার বৈচিত্র্যে তিনি কতো অসামান্য ব্যক্তি ছিলেন। গবেষকরা মনে করেন তাঁর ৭৪ বছরের জীবনে তাঁর কাজের মাধ্যমে তিনি বাঙালি জাতিকে বাংলা ভাষা এবং বাংলা ভাষার রচনাকে ভালবাসতে শিখিয়ে গেছেন। প্রাচ্যের অন্যতম সেরা এই ভাষাবিজ্ঞানী বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে যে জোরালো বক্তব্য দিয়েছিলেন এবং ভূমিকা রেখেছিলেন, তার ফলেই এই ভূখন্ডে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের পথ অনেকখানি প্রশস্ত হয় বলে মনে করেন ভাষা বিষয়ক গবেষকরা।

ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হলেন সেই বিরলপ্রজ আলেমদের একজন যিনি জনমানসের চিন্তার বিকাশ ঘটাতে শুধু আগ্রহীই ছিলেন না,বাঙ্গালীর সাংস্কৃতিক কৃতিত্বকে গ্রামীণ মানুষের সাংস্কৃতিক কৃতিত্ব বিবেচনা করার পাশাপাশি পন্ডিত হিসেবে সবসময় নিজেকে যিনি অভিহিত করতেন ‘সর্বহারাদের সংস্কৃতি’র একজন। মাতৃভাষার গুরুত্ব উপলব্ধি করতে যা তাঁকে বাধ্য করেছিলো। অগ্রণী বাঙ্গালী মুসলিম পন্ডিত হিসেবে সর্বজন স্বীকৃত ভাষাতাত্ত্বিক ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ ভাষাতাত্ত্বিক জাতীয়তাবাদের উত্থানের সাথে যুক্ত ভাষাতত্ত্ববিদ হিসেবে মাতৃভাষা এবং বাঙালি পরিচয়ের গুরুত্ব অনুধাবন করে ১৯১৭ সালের ২৭ ডিসেম্বর কলকাতায় অনুষ্ঠিত ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সম্মিলন’-এর দ্বিতীয় অধিবেশনে সভাপতির ভাষণে যে-কথাগুলো বলেছিলেন সে-কথাগুলোর গভীরতা এতো সুদূরপ্রসারী যে, বাঙ্গালীমাত্রকে তা আজও অনুধাবন করতে হয়। বলেছিলেন তিনি, ‘পৃথিবীর ইতিহাস আলোচনা করে দেখো, মাতৃভাষার উন্নতি ছাড়া কোনো জাতি কি কখনো বড় হতে পেরেছে? আরব পারস্য জয় করেছিলো,কিন্তু পারস্য আরবের ভাষা নেয়নি। শুধু নিয়েছিল তার ধর্মভাব আর কতোগুলো শব্দ। সেদিন অতি কাছে যেদিন বাংলা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ভাষার স্থান অধিকার করবে। বিদেশি ভাষার সাহায্যে জ্ঞানবিজ্ঞানের চর্চার মতো সৃষ্টি ছাড়া প্রথা কখনো টিকতে পারে না।

ধর্মপ্রাণ মুসলমান হয়েও যে শহীদুল্লাহ নিজের বাঙালিত্বকে প্রাধান্য দিয়েছেন আর সবকিছুর থেকে বেশি, হিন্দুত্ববাদের রোষাণলে আবার তাঁকেই পড়তে হয়েছে। ডক্টর মুহম্মদ শহিদুল্লাহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের একমাত্র প্রভাষক হিসাবে যোগদান করেছিলেন, ডক্টর শহীদুল্লাহ রিডারের বেতন-ভাতা দাবি করলে বিভাগীয় অধ্যক্ষ শাস্ত্রী শহীদুল্লাহর দাবির প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করে উপাচার্যকে চিঠিতে শহীদুল্লাহকে বর্ধিত বেতনে না-নেয়ার বদলে ঢাকা কলেজের সংস্কৃতের প্রভাষক অক্ষয়কুমার দত্তগুপ্তকে নিযুক্ত করার সুপারিশ করেন।

শাস্ত্রীর দত্তগুপ্তকে সুপারিশে হিন্দুত্ববাদী আচরণ যদিও প্রকটভাবে ধরা দেয় না, তবে হিন্দুত্ববাদের ভয়াবহতার সম্মুখীন শহীদুল্লাহকে হতে হয়েছিলো তাঁর প্রমাণ পাওয়া যায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগের তৎকালীন বেদ বিষয়ক অধ্যাপক সত্যব্রত সামধ্যায়ীর আচরণে। সত্যব্রত একজন মুসলমান ছাত্রকে বেদ পড়াতে অস্বীকার করেন। ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তাঁর স্মৃতিচারণে পরবর্তীকালে বলেছিলেন, ‘পন্ডিত সত্যব্রতের সামনে আমি এই তর্ক তুলেছিলাম যে, শাস্ত্রে শুদ্র এবং নারীকে বেদ পড়ানো নিষিদ্ধ বলা আছে। তাই কোন যুক্তিতে আমাকে বেদ পড়ানো হবে না! আমি তো নারী ও নই শূদ্র নই, তাহলে আমাকে বেদ পড়াতে আপনার আপত্তি কোথায়?’ শহীদুল্লাহ’র যুক্তির প্রতি কোনো রকম কর্ণপাত করেননি প্রতিক্রিয়াশীল সেই ব্রাহ্মণ পন্ডত সত্যব্রত। ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তৎকালীন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের শরণাপন্ন হলে আশুতোষ সত্যব্রতকে অনুরোধ করলেও উপাচার্যের অনুরোধ রক্ষা করতে সত্যব্রত অস্বীকার করেন। তার বদলে উপাচার্যকে তিনি হুমকি প্রদান করেন, যে যদি মুসলমান ছাত্রকে বেদ পড়ানো হয়, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি পদত্যাগ করবেন।

আঞ্চলিক ভাষার অভিধান,বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস,বাঙ্গালা ভাষার ইতিবৃত্ত ইত্যাদি তার অমর অবদান। তিনি উর্দু অভিধানও প্রণয়ন করেছেন এবং শ্রীলংকার ভাষার উৎপত্তিও নির্ধারণ করেছেন। তিনি ১৮টি ভাষায় সুপন্ডিত হলেও গভীরভাবে ভালোবাসতেন বাংলাভাষাকে। বাংলাভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে তিনি পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মলগ্ন থেকেই ছিলেন সোচ্চার। তিনি ১৯৪৭ সাল থেকেই এ বিষয়ে তীব্র দাবি উত্থাপন করছিলেন বিভিন্ন প্রবন্ধে ও ভাষণে। তিনি বলেছিলেন, পূর্ব পাকিস্তানে রাষ্ট্রভাষা বাংলা না হয়ে উর্দু বা আরবী হলে তা হবে গণহত্যার শামিল। তিনি পাকিস্তান সরকারের সকল প্রকার ভয়ভীতিকে উপেক্ষা করে বাংলা ভাষার পক্ষে তার সংগ্রাম চালিয়ে যান। তিনি ভাষা আন্দোলনকারী ছাত্রনেতাদের জন্য ছিলেন প্রধান প্রেরণা।

মুহম্মদ শহীদুল্লাহ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষাবিদ ছিলেন। তিনি ১৮টি ভাষা নিয়ে গবেষণা করেছিলেন (এই ভাষাগুলোতে তিনি রীতিমতো পন্ডিত ছিলেন), ২৭টি ভাষায় পারদর্শী ছিলেন (তার মানে ২৭টি ভাষায় কথা বলতে, পড়তে, লিখতে জানতেন) এবং ৪০টি ভাষা সম্পর্কে তাঁর পড়াশোনা ছিলো। তিনি সংস্কৃত, প্রাচীন পাহ্লবী, আরবী, হিব্রু, খোতনি, তিব্বতি, পালি ইত্যাদি ভাষা নিয়ে গবেষণা করেছিলেন। তিনি বাংলা ভাষার উৎপত্তি নিয়ে এবং চর্যাপদ নিয়ে মূল গবেষণা করেছিলেন। তাঁর মতে বাংলাভাষার উৎপত্তি হলো গৌড়ীয় বা মাগধী প্রাকৃত থেকে। বাংলা ভাষা সংস্কৃতের কন্যা নয়,তবে নিকট আত্মীয়। তিনি মনে করেন- বাংলা ভাষার উৎপত্তি কাল সপ্তম শতাব্দী। তাঁর পান্ডিত্যের মূল বিষয় ছিলো তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব।

ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ একজন প্রকৃত জ্ঞানতাপসের প্রতিকৃতি। তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। বাংলা ভাষাকে জ্ঞান সম্পদে রূপান্তরকারী এবং গৌরবদীপ্ত অধ্যয়ের সূচনাকারী হিসেবে তিনি সর্বদা মূল্যায়িতও বটে। তাঁর কৃতিত্ব বাঙালির ভাষা ও সংস্কৃতির আলোচনায়। যে বাংলা ভাষার কারণেই বাঙালি জাতির বাঙালিত্ব একটি সংজ্ঞাযোগ্য রূপ লাভ করেছে, সেই বাংলা ভাষাকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠা করতে অনেক বাধা-বিপত্তি ও লড়াই-সংগ্রামের সম্মুখীন হতে হয়েছে। বাঙালির প্রত্যয় ও পরিচয় ভাষাভিত্তিক ও আত্মরক্ষামূলক। ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলন সেই আত্মপরিচয় রক্ষায় এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সূচনা করেছে। একটি জাতির ঐক্য, সংহতি, স্থিতিশীলতা ও অস্তিত্বের পক্ষে ভাষার অস্তিত্ব একান্তই প্রয়োজন। তাই বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণ ও আত্মঅধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই হিসাবে ভাষা আন্দোলন এক মাইলফলকের ভূমিকা পালন করেছে।

ড.মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বাঙালি রাষ্ট্রসত্তার যুক্তিনিষ্ঠ বিকাশের লক্ষ্যে এবং বাঙালির জাতিসত্তার মূলে যে বাংলা ভাষা তার মযার্দা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে একনিষ্ঠ একজন রাজনৈতিক কর্মীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। ইতিহাসের কোনো কোনো পর্যায়ে শাসকশ্রেণি যে বিশেষ আদেশ বলে জনগণের ভাষার বদলে আভিজাত শ্রেণির ভাষা জোর করে চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছেন, সেই চেষ্টাকে প্রতিহত করার দ্রোহী বুদ্ধিদীপ্ত প্রত্যয়ে যাঁরা এগিয়ে আসেন ড. শহীদুল্লাহ্ তাঁদের মধ্যে একজন। বলতে গেলে অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে ভাষা আন্দোলনে দ্রোহী বুদ্ধিজীবীর ভূমিকাই পালন করেছেন তিনি। ভাষা আন্দোলনের মনোস্তাত্ত্বিক পর্বে বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক প্রচেষ্টা ও লেখনির শক্তির বিরাট প্রভাব ছিলো। বিশেষ করে তাঁর লেখায় বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্র ভাষার দাবির পক্ষে জ্ঞানগর্ভ যুক্তিসমূহ ভাষা আন্দোলনের কর্মীদের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে । রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন শুরু হওয়ার পূর্ব থেকে সমাপ্তির পরেও ভাষা আন্দোলনের চেতনা বাস্তবায়নে যাঁরা কাজ করেছেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তাঁদের অন্যতম।

ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ছিলেন একইসঙ্গে অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানুষ এবং ব্যক্তি জীবনে নিষ্ঠাবান ধার্মিক। তিনি বলেছিলেন ‘হিন্দু মুসলমান মিলিত বাঙালি জাতি গড়িয়া তুলিতে বহু অন্তরায় আছে কিন্তু তাহা যে করিতেই হইবে।’ তাঁর আশা ছিলো ভবিষ্যতে হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খিষ্টান মিলিত বাঙালি জাতি বিশ্বসভায় ফরাসি, জার্মান জাতির মতো আপন সম্মানজনক স্থান অধিকার করবে। ১৯৫০ সালের যখন পাকিস্তান সরকারের মদদে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয় তখন তিনি নিজের বাড়িতে হিন্দু সম্প্রদায়ের কযেকজন মানুষকে আশ্রয় দেন।

শুধু তাই নয়, তিনি চক বাজারের জামে মসজিদে জুম্মার দিন বক্তৃতায় বলেন-‘যদি কেউ কোরান শরীফ থেকে প্রমাণ করতে পারে যে, নিরাপরাধ হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষকে হত্যার বিধান রয়েছে তাহলে তিনি নিজের নাম পাল্টে ফেলবেন।’ তিনি তাঁর বাড়িতে আশ্রয় কেন্দ্র খোলার ঘোষণা দিয়ে বলেন পারলে আমাকে প্রতিরোধ কর। তাঁর এই বলিষ্ঠ বক্তব্যের পর চকবাজারে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা থেমে যায়। ধার্মিক ব্যক্তি হিসেবেও কিন্তু তিনি ছিলেন প্রবাদপ্রতীম। জীবনে নামাজ কাজা করতেন না। আমৃত্যু রোজা রেখেছেন। হজ করেছেন। অনেক ধর্মীয় সম্মেলনে বক্তব্য রাখতেন।

প্রাচীনকাল থেকেই বাংলা ভাষাকে এক বন্ধুর পথ অতিক্রম করতে হয়েছে। তখন বাংলা ভাষার নাম বাংলা হয়নি। বাংলা তখন জনগণের কথ্য ভাষা কিংবা কেবল ‘ভাষা’ নামে পরিচিত। সুকুমার সেন স্বীকার করেছেন যে, আঠারো শতকের আগ পর্যন্ত বাংলা ভাষার বিশেষ কোনো নাম ছিলো না। যাঁরা প্রগাঢ় পন্ডিত তাঁরা ছাড়া প্রাকৃত-অপভ্রংশ ভাষার নামও কেউই জানত না। সাধারণ শিক্ষিত মহলে দুটি দেশি ভাষার নাম প্রচলিত ছিলো। এক, শাস্ত্রের ও পন্ডিতদের ভাষা-সংস্কৃত। দ্বিতীয় ভাষাটিকে তখন ‘দেশি’, ‘লৌকিক’, প্রাকৃত (বা পরাকৃত) ভাষা, অথবা শুধু ‘ভাষা’ বলা হতো, যা অপভ্রংশের মাতৃজঠর থেকে ভূমিষ্ঠার পথে ‘দেশি ভাষা’ হিসেবে চিহ্নিত। ঐতিহাসিক প্রয়োজনের খাতিরেই সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিক জ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে এর সূত্রপাত।

ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রচেষ্টা করে গেছেন আজীবন। ১৯৫০ সালে ঢাকায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হলে তা প্রতিরোধ করার আহ্বান জানিয়ে সুধীজনের যে বিবৃতি দিয়েছিলেন, তাঁর খসড়া ছিলো তাঁরই রচনা। শিক্ষক হিসেবে তিনি ছিলেন আদর্শ স্থানীয়। ছাত্রদের প্রতি তাঁর যে স্নেহশীলতা ছিলো, তার তুলনা হয় না। বাঙলায় কলেজ প্রতিষ্ঠায় তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য।

বৌদ্ধ যুগে এর সূচনা হলেও রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং শাসক গোষ্ঠীর পরিবর্তনের সাথে সাথে এর ভাগ্য বিপর্যয় ঘটে। বাংলায় সেন রাজাদের শাসনকর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পর বাংলা ভাষারও ভাগ্য বিপর্যয় চূড়ান্ত হয়ে ওঠে। সেন রাজারা রাষ্ট্রীয় আদেশ বলে জনসাধারণের ভাষা বাংলা চর্চা নিষিদ্ধ করেন। আধ্যাত্মিক সূচিতা ও কৌলিণ্য রক্ষার অজুহাতে হিন্দু শাস্ত্রবেত্তা ও সংস্কৃত প-িতগণ এমন ফতোয়াও জারি করেন- ‘অষ্টাদশ পুরাণানি রামস্য চরিতা নিচ ভাষায়াং মানব শ্রুত্বা রৌরবং নরকং ব্রজেৎ।’ অর্থাৎ- ‘অষ্টাদশ পুরাণ ও রামায়ন যে মানব বাংলা ভাষায় শুনবে, তাঁর ঠাঁয় হবে ভয়াবহ রৌরব নরকে।’ এই কৌলিণ্যবোধের ধারা ব্রিটিশ আমল পর্যন্ত অব্যাহত ছিলো। শাসনকর্তারা যে ভাষা, ধর্ম, শিক্ষা-সংস্কৃতি ও সভ্যতার ঐতিহ্যবোধের উত্তরাধিকারী শাসিতের ওপর তার প্রভাব অনিবার্যভাবে বর্তায়। দেশিয় ভাষা বাংলা অতীতে কোনোভাবেই রাজসভার মর্যাদায় অধিষ্ঠিত ছিলো না, সে কারণে শিক্ষা-সং¯ৃ‹তি চর্চায় বাংলা ভাষার স্থান ছিলো না।

বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠার সঙ্গে বাংলাদেশের সমগ্র জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব কতখানি ওতপ্রোতভাবে জড়িত এই সত্যটি অনুধাবন করার ক্ষেত্রে যাদের কৃতিত্ব সর্বাগ্রে তার মধ্যে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ অন্যতম। প্রকৃতপক্ষে একটি আধুুনিক জাতিরাষ্ট্রের উপযুক্ত বিকাশের জন্য মাতৃভাষায় জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা ও শিক্ষার বাহন হিসেবে মাতৃভাষার প্রয়োজনীয়তা অবশম্ভাবী। বাংলা ভাষার বিকাশ পর্বের প্রতিবন্ধতাগুলো সমাজ-কাল-পাত্রভেদে গভীর অর্ন্তদৃষ্টির সাথে পর্যবেক্ষণ করেন ড.মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। সমাজ, সংস্কৃতি ও ভাষা নানাদিক থেকে সম্পর্কযুক্ত, সেটিও তাঁর দৃষ্টিতে এড়িয়ে যায়নি।

১৯৬৭ সালে ফরাসী সরকার তাঁকে নাইট অব দি অর্ডারস অব আর্টস এন্ড লেটারস পদক প্রদান করেন। আদমজী, দাউদ প্রভৃতি সাহিত্য পুরস্কার কমিটির স্থায়ী সভাপতিরূপে দীর্ঘদিন তিনি দায়িত্ব পালন করেন। তার গবেষণামূলক গ্রন্থ ও প্রবন্ধের সংখ্যা প্রায় ৪০টি। এছাড়া তিনি ৪১টি পাঠ্য বইও লিখেছেন। ২০টি বই সম্পাদনা করেছেন। বাংলা সাহিত্যের ওপর তাঁর লিখিত প্রবন্ধের সংখ্যা ৬০টিরও বেশি। ভাষাতত্ত্বের ওপর রয়েছে তার ৩৭টি রচনা। এছাড়া তিনি ৩টি ছোটগল্প এবং ২৯টি কবিতা লিখেছিলেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনা কর্ম হলো :গবেষণা সিদ্ধা কানুপার গীত ও দোহা (১৯২৬), বাংলা সাহিত্যের কথা ১ম খন্ড, (১৯৫৩) দ্বিতীয় খন্ড (১৯৬৫) বৌদ্ধ মর্মবাদীর গান (১৯৬০) ভাষাতত্ত্ব ভাষা ও সাহিত্য (১৯৩১), বাংলা ব্যাকরণ (১৯৩৫), বাংলা ভাষার ইতিবৃত্ত (১৯৫৮)।

আমাদের জীবনকে সুন্দর করে সাজাতে স্মরণীয় বরণীয় আলোকিত বড় মাপের মানুষদের জীবন অনুকরণীয় আদর্শ। ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ তেমন একজন বড়মাপের মানুষ। ভাষাবিজ্ঞানের প্রায় সব ক্ষেত্রেই স্বচ্ছন্দে বিচরণ করেছেন তিনি। বহু ভাষাবিদ, গবেষক, লোকবিজ্ঞানী, অনুবাদক, পাঠক সমালোচক, সৃষ্টিধর্মী সাহিত্যিক, কবি, ভাষাসংগ্রামী এবং দেশপ্রেমিক ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ। জাতিসত্তা সম্পর্কে মুহাম্মদ শহিদুল্লাহর স্মরণীয় উক্তি ছিলো “আমরা হিন্দু বা মুসলমান যেমন সত্য, তার চেয়ে বেশি সত্য আমরা বাঙ্গালি।” তাঁর এই ভূমিকার ফলে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের পথ অনেক প্রশস্ত হয়েছিলো।

প্রকৃত জ্ঞানী কখনোই নিজেকে কোনো গোষ্ঠী বা গন্ডিতে সীমিত রাখেন না। পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো না থাকলেও স্বীয় চেষ্টার তিনি জ্ঞানের অন্বেষণ করে গেছেন সারা জীবন। ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছিলেন – “যে জাতি তার ভাষাকে শ্রদ্ধা করে না সে জাতির উন্নয়ন সম্ভব নয়”। তিনি যে গভীর জ্ঞানের সন্ধান লাভ করেছিলেন তারই দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিভিন্ন অঙ্গনে। বহু ভাষাবিদ পন্ডিত ও প্রাচ্যে অন্যতম সেরা ভাষাবিজ্ঞানী ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ ছিলেন একজন খাঁটি বাঙালি।
আন্তর্জাতিক দুনিয়ায় ভাষাতত্ত্ব চর্চার ইতিহাসে আচার্য ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এক প্রাতঃস্মরণীয় নাম। ১৯ শতকের বাংলা নিয়ে যেসব চর্চা হয়েছে তাঁর বেশিরভাগই আধুনিক শিক্ষার প্রসারের ক্ষেত্রে মুসলমান সমাজের পশ্চাৎপদতাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখানো হয়েছে।বাংলা ভাষার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও অস্তিত্ব রক্ষায় যে মহৎ প্রাণের অধিকারী ব্যক্তিরা জীবনের অধিকাংশ সময়ই ব্যয় করেছেন এবং অসামান্য অবদান রেখেছেন,ড.মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ তাঁদের মধ্যে অন্যতম।বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে ড.মুহম্মদ শহীদুল্লাহর অবদান এবং কর্মপরিধি গণনা করে শেষ করা যাবে না। একাধারে শিক্ষাবিদ, ভাষাবিজ্ঞানী, গবেষক,আইনজীবী, অনুবাদক,কবি, সাহিত্যিক, লোকবিজ্ঞানী, দার্শনিক, জ্ঞানতাপস ও ভাষাসৈনিক হিসেবে সর্বস্তরের মানুষের মনের মণিকোঠায় জায়গা করে নিয়েছেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। বিশেষ করে, তাঁর উদার মনোভাবের জন্য সব ধর্মের মানুষের হৃদয়ে নাড়া দিতে সক্ষম হয়েছেন।

পৃথিবীর বুকে বিধাতার আর্শীবাদে যেসব মহাপুরুষের আর্বিভাব ঘটেছে তাদের মধ্যে অন্যতম ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। ব্যক্তিত্ব, চেতনা, ধর্মসাধনা, সর্বোপরি জ্ঞান তপস্যায় তিনি পৃথিবীর ইতিহাসে একে উজ্জ্বল নক্ষত্র। ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ ১৯৬৯ সালে ১৩ জুলাই ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলের কাছে মুসা খান মসজিদ সংলগ্ন প্রাঙ্গণে তাঁর অন্তিম শয্যার স্থান। এর পাশের ছাত্রাবাসটির নামকরণও হয় তাঁর নামে। যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল তাঁর প্রিয় কর্মস্থল, যেখানে ছিলেন তাঁর প্রাণপ্রিয় শিক্ষার্থীরা, যার অদূরে রয়েছে তাঁর মানস প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি এবং যার কাছেই রয়েছে ভাষা আন্দোলনের প্রতীক শহীদ মিনার সেই প্রিয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণেই পরম শান্তিতে ঘুমিয়ে আছেন বাঙালি জাতির এই কৃতি সন্তান।

লেখক, গবেষক,সাবেক জাতীয় ক্রীড়াবিদ,
চেয়ারম্যান গ্রীণ ক্লাব, মানিকগঞ্জ,সাংবাদিক ও কলামিস্ট