‘ভয় ও আশা’ দুটি ডানা যা দিয়ে নেক বান্দারা দুনিয়া থেকে জান্নাতে উড়ে যায়

 

মো.আলতাফ হোসেন ঃঃ
আল্লাহর ভয় অন্তরের চালকতুল্য, যা মানুষকে সকল ভালো কাজের দিকে ধাবিত করে। সকল অকল্যাণ ও বদ-আমল থেকে বিরত রাখে। আর আশা হচ্ছে সম্মুখবর্তী পরিচালক যা বান্দাকে আল্লাহর সন্তুষ্টি পর্যন্ত নিয়ে যায়। আশা বড় বড় নেক-আমল করার হিম্মত ও সাহস বাড়িয়ে দেয়। বদ-আমল থেকে মানুষকে সরিয়ে আনে।
অন্তরের আমলসমূহের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো আল্লাহ তা‘’য়ালার পাকড়াওয়ের ভয় ও মাগফিরাতের আশা করা। এ ভয় ও আশা এমন এক আমল, যা অন্যান্য নেক-আমালের প্রতি মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে। মানুষকে আখিরাতের প্রতি আগ্রহী করে তুলে। পাপাচার ও গুণাহ থেকে মানুষকে দূরে থাকতে সাহায্য করে।
অন্তরের আমলই সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ আমল। অন্তরের আমলের সাওয়াবও সর্বোচ্চ ও সুদূরপ্রসারী। আবার এ ক্ষেত্রে ত্রুটি হলে তার শাস্তিও অধিকতর মর্মন্তুদ কঠোর। পক্ষান্তরে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আমল অন্তরের আমলের অনুসারী ও তার ওপর নির্ভরশীল। এ জন্যই বলা হয়, অন্তর হলো সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের রাজা আর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ হলো তার প্রজা। রাজা যেমন তার প্রজাদেরকে পরিচালনা করেন, মানুষের অন্তরও অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে পরিচালনা করে। প্রজারা যেমনি রাজার হুকুম তামিল করে তেমনি অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও অন্তরের হুকুম তামিল করে। তাই মানুষের অন্তর যতক্ষণ পর্যন্ত বিশুদ্ধ না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত তার ঈমানও বিশুদ্ধ হতে পারে না।
হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন,মানুষের ঈমান যথার্থ হবে না যতক্ষণ না তার অন্তর যথার্থ হয় (আহমদ,সহীহ)। অন্তর যথার্থ হওয়ার অর্থ অন্তরে আল্লাহর তাওহীদ প্রতিষ্ঠিত থাকা। অন্তরে আল্লাহর মহত্ব,বড়ত্ব,আযমত- মহব্বত, ভয় ও আশা প্রতিষ্ঠিত থাকা। অন্তর দিয়ে আল্লাহর আনুগত্যকে পছন্দ করা এবং অবাধ্য হওয়াকে ঘৃণা করা।
হযরত আবূ হুরাইয়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন,‘‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের আকার-আকৃতি ও সম্পদের প্রতি নজর দেন না। বরং তিনি দেখেন তোমাদের অন্তর ও আমল (মুসলিম)।’’
একমাত্র আল্লাহ তা’য়ালাকে ভয় করার নির্দেশে আল্লাহ তা’য়ালা পবিত্র কোরআনে শুধুমাত্র তাঁকেই ভয় করার নির্দেশ দিয়েছেন। অন্য কাউকে ভয় করা থেকে বিরত থাকতে বলেছেন। এরশাদ হয়েছে, সে তো শয়তান। সে তোমাদেরকে তার বন্ধুদের ভয় দেখায়। তোমরা তাদেরকে ভয় করো না, বরং আমাকে ভয় করো, যদি তোমরা মু’মিন হও (সূরা আলে ইমরান: ১৭৫)। আল্লাহ তা’য়ালা অন্যত্র বলেছেন, অতঃপর মানুষকে ভয় করো না, বরং আমাকেই ভয় কর। আর আমার আয়াতসমূহ স্বল্পমূল্যে বিক্রি করো না (সূরা আল মায়েদা)। অন্য এক আয়াতে এরশাদ হয়েছে,আর কেবল আমাকেই ভয় করো (সূরা আল বাকারা:৪০)।
বিশ^ মানবতার দূত হযরত মুহাম্মাদ (সা.) মিরাজের রাতে জাহান্নামীদের কষ্ট-আযাব স্বচক্ষে দেখেছেন। উপরন্তু আল্লাহ তা’য়ালা ওহীর মাধ্যমে তাঁকে পরকালীন জীবনের খুঁটিনাঁটি সবিস্তারে জানিয়েছেন।পরকালীন জীবন ও পাপীদের জন্য সেখানে যে কঠোর শাস্তি অপেক্ষা করছে তা রাসূলুল্লাহ (সা.) যেভাবে জানতেন অন্যান্য মানুষ যদি সেভাবে জানতো তবে মানুষের আমোদ-আহলাদ, হাসি-তামাশা সব থেমে যেতো বরং সবাই উদ্বেগে, উৎকণ্ঠায়, ভয়ে, শঙ্কায় কেঁদে কেঁদে অধিক সময় পার করতো।
আল্লাহর ভয় একটি মৌলিক বিষয়। আল্লাহর ভয় থেকে যাদের হৃদয় শূন্য তারা দুনিয়াতেও বিপথগামী, পরকালেও তারা বঞ্চিত হবে জান্নাতের অবর্ণনীয় সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য থেকে। তাই আল্লাহর ভয় অন্তরে ধারণ করার অন্য কোনো বিকল্প নেই। আর এর জন্য প্রয়োজন যথার্থ জ্ঞানার্জন। কেননা আল কোরআন অনুযায়ী জ্ঞানীরাই আল্লাহকে ভয় করে। এরশাদ হয়েছে, বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই আল্লাহকে ভয় করে (সূরা আল ফাতির : ২৮)।
যারা আল্লাহকে ভয় করে তাদের জন্য আল্লাহ তা’য়ালা জান্নাতের ঘোষণা দিয়েছেন। কেননা আল্লাহকে ভয়কারী কখনো আল্লাহর নাফরমানী করতে পারে না পাপাচার করতে পারে না। পাপের দিকে পা বাড়ালেই আল্লাহর ভয় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। আল্লাহকে ভয়কারীর জীবন হয় পূণ্যময় জীবন। আর যারা এভাবে জীবনযাপন করে পরপারে যাবে তাদের জন্য তো জান্নাতের দরজা উন্মুক্ত। এরশাদ হয়েছে, আর যে স্বীয় রবের সামনে দাঁড়ানোকে ভয় করে, তার জন্য থাকবে দুটি জান্নাত। সুতরাং তোমাদের রবের কোনো নিয়ামতকে তোমরা উভয়ে অস্বীকার করবে? উভয়ই বহু ফলদার শাখাবিশিষ্ট (সূরা আর রাহমান:৪৬-৪৮)।
যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে সে নিজের খেয়াল-খুশিমতো চলতে পারে না বরং নিজের খেয়াল-খুশিকে আল্লাহর রেযামন্দীর অনুগামী করে দেয়। আর আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য নিজের খেয়াল-খুশিকে বিসর্জনের প্রতিদান তো জান্নাত ভিন্ন অন্য কিছু হতে পারে না। এরশাদ হয়েছে,আর যে স্বীয় রবের সামনে দাঁড়ানোকে ভয় করে এবং কুপ্রবৃত্তি থেকে নিজকে বিরত রাখে, নিশ্চয়ই জান্নাত হবে তার আবাসস্থল (সূরা আন-নাযিয়াত:৪০-৪১)।
দুনিয়ার জীবনে আল্লাহর ভয়ে শঙ্কিত জীবনযাপনের পর সৎকর্মশীল মু’মিনরা যখন জান্নাতে প্রবেশ করবে, পৃথিবীতে পরিবার-পরিজনবেষ্টিত থাকা অবস্থায় তারা যে আল্লাহকে ভয় করতো, সে বিষয়টি পরস্পরে আলোচনার সময় উল্লেখ করবে। এরশাদ হয়েছে ,আর তারা একে অপরের মুখোমুখী হয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করবে, তারা বলবে, পূর্বে আমরা আমাদের পরিবারের মধ্যে শঙ্কিত ছিলাম। অতঃপর আল্লাহ আমাদের প্রতি দয়া করেছেন এবং আগুনের আযাব থেকে আমাদেরকে রক্ষা করেছেন। নিশ্চয়ই পূর্বে আমরা তাঁকে ডাকতাম নিশ্চয়ই তিনি ইহসানকারী, পরম দয়ালু (সূরা আত-তূর:২৫-২৮)।
সালাফে সালেহীনদের জীবন ছিলো আল্লাহর ভয়-ভীতিপূর্ণ জীবন। তাঁদের হৃদয়রাজ্যে ছিলো আল্লাহর ভয়ের শাসন। তাঁরা ছিলেন নেককার ও আল্লাহর রহমত-প্রত্যাশী বান্দা। এ কারণেই তাঁদের পার্থিব জীবনটাও ছিলো উত্তম জীবন। আর পরকাল তো তাদের চির সুখের ঠিকানা।
হযরত ওমর (রা.) রাতের বেলায় ঘুরে বেড়াতেন সাধারণ মানুষের অবস্থা জানার জন্য। একদিন তিনি এক ব্যক্তিকে সূরায়ে তূর পড়তে শুনে তাঁর বাহন থেকে নেমে গিয়ে দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন। এরপর তিনি দীর্ঘ একমাস অসুস্থাবস্থায় ছিলেন। ওমর (রা.) এর কি রোগ হয়েছে তা কেউ জানতে পারেনি। সুফিয়ান আছ-ছাওরী (রহ.) আল্লাহর ভয়ে একবার রীতিমতো অসুস্থ হয়ে গিয়েছিলেন। সালাফে সালেহীনের জীবনে এ জাতীয় বহু উদাহরণ রয়েছে, যা এই ছোট্ট পরিসরে উল্লেখ করা সম্ভব নয়।
প্রশংসিত ভয় তো হলো তাই, যা মানুষকে সৎকাজের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে। সৎকাজের প্রেরণা যোগায়। হারাম কাজ থেকে বিরত রাখে। তবে ভয় যদি প্রশংসনীয় পর্যায় অতিক্রম করে অতিমাত্রায় প্রচন্ডতা ধারণ করে তবে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়ার পর্যায়ে পৌঁছে যায়। আর আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া কবীরা গুণাহ।
ইবনে রজব (রহ.) বলেন, যতটুকু ভয় থাকা ওয়াজিব বা আবশ্যক তা হলো, এমন ভয় যা মানুষকে ফরয ও আবশ্যক বিষয়গুলো যথাথরুপে আদায় করা এবং হারাম থেকে বেঁচে থাকার প্রতি উৎসাহিত করে। ভয় যদি এর থেকে অতিরিক্ত আকারে থাকে, যা মানুষকে নফল ও ঐচ্ছিক আমলগুলো বাস্তবায়ন এবং সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম মাকরূহ ও যা করা জায়েয এমন জিনিসের সংস্পর্শ থেকে ব্যক্তিকে বিরত রাখে, তবে তা এক প্রশংসনীয় গুণ। কিন্তু যদি ভয়ের মাত্রা এর থেকেও বেড়ে যায়, যেমন ভয়ে সন্ত্রস্ত হয়ে কেউ রোগাক্রান্ত হয়ে পড়লো, অথবা ভয়ে-শঙ্কায় মারাই গেলো অথবা সারাক্ষণ উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা নিয়ে দিনাতিপাত করতে লাগলো। এমনকি ভয় তাকে শ্রম থেকে বিমুখ করে দিলো, তাহলে এমন ভয় অপ্রসংসনীয় ভয় বলে গণ্য হবে। তাই আল্লাহ তা’য়ালাকে ভয় করার ক্ষেত্রেও আমাদেরকে ভারসাম্য রক্ষা করে চলতে হবে। এমন ভয় না করা, যা বান্দাকে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ করে দেয়। অথবা আমলের ক্ষেত্রে শ্রম ব্যয়ের মানসিকতায় ব্যত্যয় ঘটিয়ে একেবারে কর্মবিমুখ করে দেয়।
একজন মু’মিন দুই ধরনের ভয়ের মাঝে জীবনযাপন করে। ১. এমন বিষয়ের ভয় যা বিগত হয়েছে, বান্দা জানে না সে ব্যাপারে আল্লাহ তা’য়ালা কী ফয়সালা করে রেখেছেন। ২. এমন বিষয়ের ভয় যা এখনো সংঘটিত হয়নি। বান্দা জানে না, আল্লাহ তার ভাগ্যে এ ব্যাপারে কী লিখে রেখেছেন।
নিশ্চয়ই যারা আল্লাহর কিতাব অধ্যয়ন করে, সালাত কায়েম করে এবং আল্লাহ যে রিজিক দিয়েছেন তা থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে, তারা এমন ব্যবসার আশা করতে পারে যা কখনো ধ্বংস হবে না (সূরা ফাতির:২৯)।
অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে, নিশ্চয়ই যারা ঈমান এনেছে ও যারা হিজরত করেছে এবং আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করেছে, তারা আল্লাহর রহমতের আশা করে। আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু (সূরা আল বাকারা:২১৮)।
আশা-প্রত্যাশা একটি ইবাদত। যা নিবেদিত হবে একমাত্র আল্লাহর জন্য। মুক্তি ও কল্যাণের আশা একমাত্র আল্লাহর সাথেই নির্দিষ্ট করতে হবে। আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো প্রতি আশা-প্রত্যাশার অর্থ হবে আল্লাহর সাথে শরীক করা। এরশাদ হয়েছে, সুতরাং যে তার রবের সাক্ষাৎ কামনা করে, সে যেনো সৎকর্ম করে এবং তার রবের ইবাদাতে কাউকে শরীক না করে (সূরা আল কাহ্ফ: ১১০)।
আশা-প্রত্যাশা আল্লাহর সান্নিধ্য অর্জনের একটি মাধ্যম। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন : মহান আল্লাহ এরশাদ করেন, আমি- আমার ব্যাপারে আমার বান্দার ধারণার কাছে। আর আমি তার সাথে থাকি যখন সে আমাকে স্মরণ করে (বুখারী ও মুসলিম)। তাই নেক-আমল পেশ করার পর আল্লাহর ব্যাপারে সুধারণা রাখা অতি জরুরী বিষয়। তাই আমল কবুল হচ্ছে না, অথবা আল্লাহ কোনো সাওয়াব দেবেন না এ জাতীয় ধারণা পোষণ করা কখনো উচিত নয়।
অন্তরে আল্লাহর ভয় ও আশা উভয়টাই সমানভাবে রাখতে হবে। আর বান্দার পূর্ণাঙ্গ অবস্থা তো হলো ভয় ও আশা উভয়টা ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় হৃদয়ে ধারণ করে আল্লাহকে মহব্বত করা। নবী-রাসূল ও প্রকৃত মু’মিনদের অবস্থা এরূপই ছিলো। এ ব্যাপারে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, তারা সৎকাজে প্রতিযোগিতা করতো। আর আমাকে আশা ও ভীতি সহকারে ডাকতো। আর তারা ছিলো আমার নিকট বিনয়ী (সূরা আল আম্বিয়া:৯০)। তিনি অন্যত্র এরশাদ করেন,তাদের পার্শ্বদেশ বিছানা থেকে আলাদা হয়। তারা ভয় ও আশা নিয়ে তাদের রবকে ডাকে। আর আমি তাদেরকে যে রিজিক দান করেছি, তা থেকে তারা ব্যয় করে (সূরা আস-সাজদা:১৬)।
একজন মুসলমান যখন আল্লাহর রহমতের ব্যাপকতা, তাঁর মহানুভবতা, মাগফিরাত, তাঁর জান্নাতের বিশালতা, অফুরন্ত সাওয়াব ইত্যাদি বিষয়ে জ্ঞান লাভ করে, তখন তার হৃদয় প্রশস্ত হয়ে যায়। আল্লাহর কাছে যে অফুরন্ত খায়ের-বরকত রয়েছে, যে সাওয়াব নিয়ামত রয়েছে সে ব্যাপারে আশা-প্রত্যাশায় তার বুক ভরে যায়। অপর পক্ষে যখন সে আল্লাহর কঠোর শাস্তি ও পাকড়াও, সীমাহীন আযাব, কঠিন হিসাব-নিকাশ, কিয়ামতের ভয়াবহতা, আগুনের বীভৎসতা, জাহান্নামের আযাবের নানা আকার-প্রকৃতি ইত্যাদির জ্ঞান লাভ করে তখন সে ভয়ে কম্পিত হয়ে পড়ে। তার হৃদয় তখন শঙ্কিত হয়ে যায়।
আবূ হুরায়রা (রা.) থেকে এক বর্ণনায় এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, মু’মিন যদি আল্লাহর কাছে কী আযাব রয়েছে তা জানত তাহলে কেউ তার জান্নাতের প্রত্যাশা করতো না। আর কাফির যদি জানত আল্লাহর কাছে কী রহমত রয়েছে তবে তার জান্নাত থেকে কেউ নিরাশ হত না (মুসলিম)। আল্লাহর অনুগ্রহ হতে নিরাশ হয়ো না;আল্লাহ সমুদয় পাপ ক্ষমা করে দিবেন। তিনি তো ক্ষমাশীল পরম দয়ালু। (সূরা যমার;আয়াত ৫৩)
আমরা যদি আমল না করে কেবল আশায় বুক বেঁধে বসে থাকি, তবে তা হবে নিজেদের সাথেই প্রতারণা করা এবং দম্ভগর্বের প্রকাশ। আর আল্লাহ তা’য়ালা এরূপ করতে আমাদেরকে নিষেধ করে দিয়ে বলেন, হে মানুষ, নিশ্চয়ই আল্লাহর ওয়াদা সত্য অতএব দুনিয়ার জীবন যেন তোমাদেরকে কিছুতেই প্রতারিত না করে আর বড় প্রতারক (শয়তান) যেনো তোমাদেরকে আল্লাহর ব্যাপারে প্রতারণা না করে (সূরা আল ফাতির:৫)।
আধুনিক পাশ্চাত্য বস্তুবাদী সভ্যতার বিকাশ এবং বিশ্বময় এর বিস্তারের সাথে সাথে এমনকি বিশ্বের মুসলিম দেশগুলোর অধিবাসীদের মধ্যেও আল্লাহ ভীতি ও তার করুণার আশা সীমিত সংখ্যক লোকের মধ্যেই দেখা যায়। বাহ্যিকভাবে দৃশ্যমান এই যে, অনেকেই আল্লাহর আনুষ্ঠানিক ইবাদত করেন তবে তা বহুলাংশেই পার্থিব লাভালাভের জন্য; পরকালের মঙ্গলের জন্য কদাচিৎ। এটি কেবল সাধারণ লোকের মধ্যেই প্রচলিত নয়, বরং কথিত ধার্মিকদের অনেকের মধ্যেও বিদ্যমান। এর প্র্রধান কারণ হলো- মুখে যা-ই বলুন না কেনো, তাদের অন্তরে আল্লাহ ভীতি নেই। সুতরাং এরা আল্লাহর করুণা লাভ করতে পারেন না। এরূপ লোকের সংখ্যা অন্য ধর্মাবলম্বীদের মতো মুসলমানদের মধ্যেও ব্যাপক হারে বেড়েছে। এ কারণে বিশ্বময় সব মানুষের তো বটেই এবং মুসলমানদেরও আজ দুর্দিন।
প্রকৃতপক্ষে মানুষের মনে আল্লাহ ভীতি এবং রহমতের আশা সমভাবে থাকা উচিত। আল্লাহর শেষ নবী মুহাম্মদ (সা.) ও তাঁর সহচরদের মতো পুণ্যাত্মা মহাপুরুষদের মনে ভয় ও আশা সমভাবে উপস্থিত ছিলো। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা ওমর ফারুক (রা.) বলতেন- ‘কাল কিয়ামতের মাঠে যদি অদৃশ্য জগৎ থেকে আওয়াজ দেয়া হয় : একজন মানুষ ব্যতীত অপর কেউ বেহেশতে যেতে পারবে না, তখন আমি ধারণা করি এবং প্রবল আশা রাখি যে, সে ব্যক্তি আমিই হবো। আর যদি অদৃশ্য জগতের বাণী এই হয় যে, কেবল একটি মাত্র লোক দোজখে যাবে, তবে আশঙ্কা করছি যে, না জানি সেই লোক আমিই হই’ (ইমাম গাজ্জালি, কিমিয়ায়ে সা’আদত, ১৯৭৭, চতুর্থ জিলদ, পৃষ্ঠা ১০৮)। অধুনা আমাদের এরূপ আল্লাহ ভীতি বিরল।
জগতে আল্লাহ ভীতি মানবহৃদয়ে আধ্যাত্মিক উন্নতি লাভের একটি উন্নত অবস্থা। এর মর্যাদা অতি উচ্চ। এর ফল ও উৎপত্তির কারণগুলোও তেমনি উন্নত ও উৎকৃষ্ট বিষয়। ভয় হাসিল হওয়ার মূল কারণ শরিয়াহর জ্ঞান এবং আধ্যাত্মিক দর্শন-জ্ঞান উভয়ই। ভয় এবং সাবধানতা হলো নিরাপত্তার সূতিকাগার। ভয়ের মাধ্যমেই সৃষ্টিকর্তার ধারণা লাভ হয়েছে। আমরা যদি সৃষ্টিকর্তাকে ভয় করি, তবে অপর কাউকে ভয় পাবো না। সূতরাং মানুষকে ভয় করো না, এবং যদি তোমরা মু’মিন হও তবে আমাকেই ভয় করো। (সূরা আল মায়িদা;আয়াত ৪৪-৫৭)
আল্লাহ তা’য়ালা বলেন : ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই আল্লাহকে ভয় করে থাকে’ (সূরা ফাতের : আয়াত ২৮)।
রাসূলে করিম (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ তা’য়ালাকে ভয় করা সব হিকমতের শিরোমণি’। আল্লাহ ভীতি, পরহেজগারি ও নিষ্কলঙ্ক অবস্থা- এই তিনটি গুণ আল্লাহর ভয়ের ফল। এই গুণগুলো যাবতীয় সৌভাগ্য বা ইহকাল পরকালের সৌভাগ্যের ও মঙ্গলের বীজ। কারণ প্রবৃত্তির কামনা ও আকাক্সক্ষাকে সংযত ও দমন না করতে পারলে এবং সেই লক্ষ্যে যাবতীয় কষ্ট সহ্য করতে না পারলে মানুষ পরলোকের পথে অগ্রসর হতে পারে না, তেমনি ইহকালেও মঙ্গল লাভ করতে পারে না। আল্লাহ ভীতির আগুনে পুড়ে মানুষ যেমন প্রবৃত্তি ও কামনাকে ভস্মে পরিণত করতে পারে, তেমন আর কোনোভাবেই পারে না। এ কারণেই আল্লাহ ভীরু মানুষের জন্য আল্লাহ তা’য়ালা ‘অনুগ্রহ’, ‘জ্ঞান’, ‘পথপ্রাপ্তি’ ও ‘সন্তোষ’- এই চার অমূল্য বস্তু নির্ধারণ করে রেখেছেন।
নবী করিম (সা.) বলেন : ‘কিয়ামতের ময়দানে জগতের সব মানুষকে একত্র করে এমন গুরুগম্ভীর ও উচ্চরবে ঘোষণা করা হবে যে, নিকটবর্তী ও দূরবর্তী সবাই তা সমভাবে শুনতে পাবে। বলা হবে : হে মানবগণ! তোমাদের সৃষ্টিকাল হতে অদ্যাবধি আমি তোমাদের কথা শুনে আসছি। আজ তোমরা আমার কথাগুলো মনোযোগসহকারে কান পেতে শোনো। এখন আমি তোমাদের কৃতকার্যগুলো তোমাদের সামনে উপস্থাপন করব। তোমরা তোমাদের সম্মান ও মর্যাদা কুলীন বংশের ওপর স্থাপন করেছিলে, আমিও তোমাদের মর্যাদা এবং কৌলীন্য কিসে, তা নির্ধারণ করে দিয়েছিলাম; কিন্তু তোমাদেরই স্থাপিত মর্যাদা ও কৌলীন্যকে তোমরা উন্নত রেখেছ এবং আমার নির্ধারিত সম্মান ও কৌলীন্যকে তুচ্ছজ্ঞানে দমিয়ে রেখেছ, আমি তোমাদের কৌলীন্য ও মর্যাদা সম্পর্কে বলেছিলাম : ‘নিশ্চয়ই সেই ব্যক্তিই তোমাদের মধ্যে মর্যাদায় ও গৌরবে সর্বশ্রেষ্ঠ, যে তোমাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা অধিক পরহেজগার’ (সূরা হুজুরাত : আয়াত ১৩)।
কোরআনের আলোকে যদি পৃথিবীর জনগোষ্ঠী এবং তাদের শাসকরা নিজেদের পরিচালিত করতেন তবে তারা আল্লাহ তা’য়ালার রহমতশূন্য হতেন না। এর প্রতিকারস্বরূপ আল্লাহ তা’য়ালা মানুষকে বিভিন্নভাবে পরীক্ষা করে থাকেন। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, ‘আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা, ধনসম্পদ, জীবন ও ফল-ফসলের ক্ষয়ক্ষতির মাধ্যমে। তবে সুসংবাদ দাও ধৈর্যশীলদের, যারা তাদের ওপর যখন কোনো বিপদ আপতিত হয় তখন বলে : আমরা তো আল্লাহরই জন্য এবং আমরা সবাই তাঁরই কাছে ফিরে যাবো। এরাই তারা যাদের প্রতি রয়েছে তাদের পালনকর্তার তরফ থেকে অশেষ অনুগ্রহ ও করুণা আর এরাই হেদায়াতপ্রাপ্ত।’ (সূরা বাকারা : আয়াত ১৫৫-১৫৭)।
চাকচিক্যময় দুনিয়ার চোখ ধাঁধানো জৌলুসে আমরা বিমোহিত। তার নিত্যনতুন পরিবর্তনশীল রূপ-সৌন্দর্যে মুগ্ধ। আমাদের খেয়াল নেই যে, পৃথিবী ক্ষণস্থায়ী। আখেরাত চিরস্থায়ী। আজকের বাড়ি আমার আসল বাড়ি নয়। এ জগৎ সংসার আমার আসল ঠিকানা নয়। যেদিন চোখ দুটো চিরদিনের জন্য বন্ধ হবে সেদিন খালি হাতে যেতে হবে মাটির পিঠ থেকে মাটির বুকে। কবরের বুকে গেলে আমাদের জানা নেই যে, কার সঙ্গে কি আচরণ করা হবে। কারে মাফ করে দেওয়া হবে, আর কাকে শাস্তি দেওয়া হবে। তাই আল্লাহর দরবারে সব সময় ক্ষমার আশা রাখতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে শাস্তি ও ভয় রাখতে হবে। আল্লাহ তা’য়ালা এরশাদ করেন, ‘‘যে ভয় করে সে উপদেশ গ্রহণ করে।’’(সূরা আল-আলা;আয়াত-১০) আল্লাহ তা’য়ালা আরো এরশাদ করেন, তোমরা সেই দিনকে ভয় করো যেদিন কেউ কারো কোনো কাজে আসবে না, কারোও সুপারিশ গ্রহণ করা হবে না,কারো নিকট হতে বিনিময় গৃহীত হবে না এবং তারা কোনো প্রকার সাহায্যপ্রাপ্তও হবে না। সূরা আল –বাকারাও আয়াত-৪৮)
আল্লাহর ভয় মানবপ্রবৃত্তিকে কামনা-বাসনার ফাঁদ থেকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে রাখে। প্রবৃত্তির বিপথগামিতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। প্রবৃত্তিকে এমন পথে পরিচালিত করে যাতে রয়েছে মানবকুলের কল্যাণ ও সাফল্য। আল্লাহর ভয় তাওহীদের একটি শাখা। তাই ভয় একমাত্র আল্লাহকেই করতে হবে অন্য কাউকে করা যাবে না। কেননা আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ভয় করলে তা হবে শিরকের শামিল।
ইমাম গাজ্জালি (র.) বলেন,‘ভয় ও আশা’ দুটি ডানা যা দিয়ে নেক বান্দারা দুনিয়া থেকে জান্নাতে উড়ে যায়। পাখি যেভাবে তার ডানায় ভর করে উড়ে যায় ঠিক সেভাবে। কোরানে এই দুটি জিনিস অর্জনের তাগিদ দিয়ে বলা হয়েছে, ‘যারা আল্লাহর নেক বান্দা, তাদের পিঠ রাতের বেলা বিছানা থেকে পৃথক থাকে এবং নিজ প্রভুকে ওই অবস্থাতেই ডাকতে থাকে যে, সে আল্লাহকে যেমন ভয় করে তেমনি তার থেকে আশাও রাখে।’ ভয় ও আশা উভয়টির ক্ষেত্রে ভারসাম্য থাকতে হবে। ভয় করা মানে সবকিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে দুনিয়ার সবকিছু ছেড়ে দেয়া নয়। আবার প্রত্যাশাও এই পরিমাণ থাকা উচিত নয় যা তাকে নেক কাজ থেকে বিরত থাকতে উদ্বুদ্ধ করে। মূলত ইসলাম হলো একটি ভারসাম্যপূর্ণ ধর্ম। এ জন্য মু’মিন বান্দাদের ভয় ও আশার মাঝখানে যে পথ তা ধরে ইসলামের দিকে এগিয়ে চলা।

লেখকঃ সাবেক জাতীয় ক্রীড়াবিদ,সভাপতি শারীরিক শিক্ষাবিদ সমিতি,
চেয়ারম্যান গ্রিন ক্লাব,গবেষক,সাংবাদিক ও কলামিস্ট