মাদক নিরাময় কেন্দ্র যেন মৃত্যুফাঁদ

মাদক নিরাময় কেন্দ্রগুলো মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। নির্যাতনের মাধ্যমে একের পর এক মেরে ফেলার ঘটনা ঘটলেও চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে অপমৃত্যু বলে। সেবার মান বলে কিছু নেই। খোদ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তদন্তে ১০৫টি কেন্দ্রের মধ্যে সর্বোচ্চ ১০-১৫টি ছাড়া বাকিগুলো নির্ধারিত মানদণ্ডে উন্নীত হতে পারেনি। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং সার্বক্ষণিক চিকিৎসকের দেখা মেলেনি অনেক কেন্দ্রে। অস্বাস্থ্যকর এবং নোংরা পরিবেশ সবখানে। গাদাগাদি করে রাখা হয় রোগীদের। মাদক নিরাময়ের নামে চলছে অপচিকিৎসা।

সারা দেশে বেসরকারি নিরাময় কেন্দ্রের সংখ্যা ৩৫৫টি। এছাড়া সরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে ৪টি। কিন্তু বেশিরভাগ নিরাময় কেন্দ্রে মাদকাসক্তি শনাক্তে ডোপ টেস্টের ব্যবস্থা নেই। মৌখিক স্বীকারোক্তি অথবা অভিভাবকের কথার ভিত্তিতে রোগী ভর্তি করা হয়। মানসিক রোগীদেরও ভর্তি করা হয় এখানে। মাদকাসক্তি নিরাময়ের জন্য আন্তর্জাতিক চিকিৎসা প্রটোকল প্রতিপালনের বিধান থাকলেও সেগুলোর কোনো কিছুই মানা হয় না। এত অনিয়ম জেনেও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারছে না।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ আহসানুল জব্বার যুগান্তরকে বলেন, এখনও প্রয়োজনের তুলনায় নিরাময় কেন্দ্রের সংখ্যা নিতান্ত নগণ্য। এছাড়া নিরাময় কেন্দ্র স্থাপনে অনেকে আগ্রহী হচ্ছে না। ফলে অনেক সময় অনিয়ম পেলেও কেন্দ্রগুলো বন্ধ করে না দিয়ে ত্রুটি-বিচ্যুতি দূর করতে সময় দেওয়া হয়। তবে কেউ যদি নিরাময় কেন্দ্র থেকে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে থাকেন তবে অবশ্যই তদন্ত করে দেখা হবে।

জানা গেছে, ৯ নভেম্বর আদাবরে মাইন্ড এইড নামের নিরাময় কেন্দ্রে সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার আনিসুল করিমের নির্মম মৃত্যু হয়। এরপর মাদক নিরাময় কেন্দ্রের নানা অনিয়ম দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে। এর রেশ না কাটতেই রাজধানীর মালিবাগে হলি লাইফ মাদক নিরাময় কেন্দ্রে ২ মার্চ ইয়াসিন নামের এক যুবকের রহস্যজনক মৃত্যু হয়। বাথরুমে গলায় গামছা দিয়ে আত্মহত্যা করেছে দাবি করা হলেও তা নিয়ে নানা প্রশ্ন ছিল। তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন দেখা গেছে। অপমৃত্যুর মামলার পাশাপাশি যথারীতি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর থেকে ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মেহেদী হাসান মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেন, হলি লাইফ নিরাময় কেন্দ্রের বিষয়ে গঠিত তদন্ত কমিটি ইতোমধ্যে বেশকিছু অনিয়ম পেয়েছে। শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির লাইসেন্সও বাতিল করা হতে পারে। সূত্র বলছে, এএসপির মৃত্যুর পর একাধিক টিম গঠন করে রাজধানীর নিরাময় কেন্দ্রগুলো একযোগে পরিদর্শন করা হয়। এ সময় ১০৫টি কেন্দ্রের মধ্যে মাত্র ১০-১৫টির সেবার মান সন্তোষজনক পাওয়া গেছে। বাকিগুলো নির্ধারিত মানে উত্তীর্ণ হতে পারেনি। পরিদর্শন শেষে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্সও বাতিল করা হয়।

সূত্র বলছে, ১৩ নভেম্বর মিরপুর এলাকার ‘ব্রাদার্স’ নিরাময় কেন্দ্র পরিদর্শন করে প্রতিবেদন দেন অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক হামিমুর রশিদ। এতে বলা হয়, ‘ব্রাদার্স মাদকাসক্তি পরামর্শ কেন্দ্র (বাসা নং-৫৯/ক, রোড নং-৭, উত্তর বিশিল, মিরপুর-১) পরিদর্শনকালে কোনো ডাক্তারই পাওয়া যায়নি। ডাক্তার হিসাবে যাদের নাম উল্লেখ আছে, তাদের নিয়োগপত্র দেখতে চাইলে সরবরাহকৃত কাগজ ভুয়া বলে প্রতীয়মান হয়। কীভাবে তিনি নিরাময় কেন্দ্র পরিচালনা করছেন তা বোধগম্য নয়। এছাড়া জীবন রক্ষাকারী উপকরণাদি ও অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের কোনো অস্তিত্বই পাওয়া যায়নি, বরং ওষুধের কয়েকটি খালি প্যাকেট পাওয়া গেছে।’

‘পরিবর্তন’ নামের অপর একটি কেন্দ্র পরিদর্শনে দেখা যায়, ‘ঘুটঘুটে পরিবেশে আলো-বাতাস প্রবেশের সুযোগ কম। অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রগুলো মেয়াদোত্তীর্ণ। পরিবেশ পরিস্থিতি সার্বিকভাবে পর্যবেক্ষণ করে এখানে চিকিৎসার মান অত্যন্ত নিম্নমানের বলে প্রতীয়মান হয়েছে। ১০ বেডের নিরাময় কেন্দ্র পরিচালনার অনুমোদন থাকলেও পরিদর্শনকালে ১৯ জন রোগী পাওয়া গেছে। এছাড়া নিরাময় কেন্দ্র পরিচালনা ও লাইসেন্সের প্রায় সব শর্তই সেখানে অনুপস্থিত ছিল। মাদকাসক্ত না হওয়া সত্ত্বেও রাসেল ও রাকিব নামে দুই অল্পবয়স্ক ছেলেকে এখানে ভর্তি করা হয়েছে।

এছাড়া নিউ ফিউচার লাইফ নামের আরেকটি কেন্দ্র সম্পর্কে বলা হয়- ‘এটি ১০ বেডের হলেও পরিদর্শনকালে কমপক্ষে ৪০ জন রোগীর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। প্রত্যেকটি বেডের নিচে ছড়ানো-ছিটানো বিছানাপত্র। বিল্ডিংয়ের ছাদেও অনেক রোগীকে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে নিরাময় কেন্দ্রটির চেয়ারম্যান কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। যখন তাকে বিভিন্ন বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হয় তখন নিরাময় কেন্দ্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নন এমন অনেক ব্যক্তি এসে জড়ো হন। এতে প্রতীয়মান হয় যে, মাদকাসক্ত চিকিৎসার নামে স্থানীয় গুন্ডা-পান্ডার সহযোগিতায় এখানে অনৈতিক কাজ সংঘটিত হয়।’ এ ধরনের প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স দেয়ার ক্ষেত্রে আরও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা উচিত ছিল। অনিয়মের সঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলোর লাইসেন্স বাতিলের সুপারিশ করেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা।

সূত্র বলছে, সেবার মান সন্তোষজনক না হলেও নিরাময় কেন্দ্রের মালিকরা বিশেষ ব্যবস্থায় নারকোটিক্স কর্মকর্তাদের মুখ বন্ধ রাখেন। মাসিক পরিদর্শন বইতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কোনোমতে দায়সারা মন্তব্য লিখে দেন। ফলে নিরাময় কেন্দ্রগুলোর সেবার মানে উন্নয়ন ঘটেনি। উল্টো অনিয়ম দীর্ঘস্থায়ী রূপ পেয়েছে। তবে মাঝে মাঝে লোক দেখানো অভিযান চালায় নারকোটিক্স। এ সময় অনিয়মের অভিযোগে লাইসেন্স বাতিল করা হলেও পরে সেগুলো বিশেষ ব্যবস্থায় ফের খুলে যায়।

রাজধানীর মিরপুর এলাকার একটি নিরাময় কেন্দ্রের মালিক যুগান্তরকে বলেন, ‘নারকোটিক্সের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা প্রতি মাসে একবার কেন্দ্র পরিদর্শনে যান। এ সময় তাদের সম্মানে ভালো খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন করা হয়। পরিদর্শন শেষে উপহারসামগ্রী দিয়ে বিশেষভাবে সম্মানিত করার ব্যবস্থা দীর্ঘদিনের রেওয়াজ।

তবে নারকোটিক্সের উচ্চপদস্থ কয়েকজন কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, নিরাময় কেন্দ্র থেকে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ ঢালাওভাবে সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। অনেকেই নিরাময় কেন্দ্র সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য দিকনির্দেশনা দেন। কিন্তু কেন্দ্র স্থাপনের গোড়াতেই গলদ রয়েছে। লাইসেন্স দেয়ার শর্তের মধ্যে রয়েছে শুভঙ্করের ফাঁকি। ফলে নিরাময় কেন্দ্রগুলো মাদকাসক্তির পেশাদার চিকিৎসা কেন্দ্রে পরিণত হতে পারছে না।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মানজুরুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, অনেকেই মাদকাসক্তির প্রথম দিকে চিকিৎসা নিতে আসেন না। আবার অনেকে চিকিৎসা শেষ হওয়ার আগেই নিরাময় কেন্দ্র থেকে চলে যান। ফলে চিকিৎসা কার্যকর এবং দীর্ঘস্থায়ী হয় না। অথচ মাদকাসক্তি সম্পূর্ণ নিরাময়ের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক চিকিৎসা শেষে কমিউনিটি চিকিৎসা এবং পুনর্বাসনের বেশ কয়েকটি ধাপ অতিক্রম করতে হয়।

নিরাময় কেন্দ্র পরিদর্শনের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তাদের কয়েকজন যুগান্তরকে বলেন, মাদকাসক্তির জন্য চিকিৎসাধীন রোগীর ৯০ শতাংশই ইয়াবা আসক্ত। বাকিরা হেরোইন, ফেনসিডিল ও গাঁজাসহ অন্য মাদক গ্রহণ করেন। মাদক গ্রহণ না করলেও মানসিক রোগে আক্রান্ত হওয়ায় পরিবার নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তি করেছেন এমন নজিরও পাওয়া গেছে। নিরাময় কেন্দ্রগুলোকে অনেকেই মানসিক হাসপাতাল বলে মনে করেন। এ কারণে কেন্দ্রগুলোতে মানসিক রোগী ভর্তি হতে দেখা যায়। অথচ নিরাময় কেন্দ্রে মানসিক রোগের চিকিৎসা বা রোগী ভর্তির সুযোগ নেই। মাদকাসক্তি এবং মানসিক রোগ দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস।