মানব আত্মা বা নফস মহান আল্লাহ্র এক বিস্ময়কর ও রহস্যময় সৃষ্টি

মো. আলতাফ হোসেনঃ
কোনো বস্তুর অস্তিত্বের প্রকৃত সত্তাকে নফস বলে। নফস শব্দের অর্থ প্রবৃত্তি, মন রিপু, কামনা ভোগ প্রাপ্য অহংকার ইত্যাদি। নফস হলো সকল খারাপ কর্মের বহিঃপ্রকাশ এই নফসের কারণেই হয়ে থাকে। মানব আত্মা বা নফস মহান আল্লাহ্র এক বিস্ময়কর ও রহস্যময় সৃষ্টি। মানব জন্মের সাথে তার রূহ বা আত্মা কিভাবে দেহে সংযুক্ত হয় বা প্রবেশ করে তা অদ্যাপি অজ্ঞাত। আত্মা দেহকে সঞ্জীবিত করে তোলে এবং দেহে গতি সঞ্চার করে। অন্য দিকে দেহ ছাড়া আত্মার স্বরূপ অনুভূত হয় না বা জানা যায় না, দেহ মন একীভূত হয়ে থাকলেও এদের মধ্যে কোনো অনিবার্য সম্পর্ক নেই আত্মা মুক্ত স্বাধীন স্বতন্ত্র এবং স্বীয় বৈশিষ্ট্য মহীয়ান। দেহ ছাড়াও আত্ম থাকতে পারে; তবে আত্মা ছাড়া দেহ অচল নির্জীব এবং নিরেট জড় পদার্থ মাত্র। মানুষের সব ক্রিয়া কান্ডের মূলে রয়েছে মন বা আহার সক্রিয় ভূমিকা। শরীর বা দেহ আত্মার নির্দেশ পালনের হাতিয়ার স্বরূপ-আত্মার হুকুম তামিল করার জন্য সে সদা প্রস্তুত। আত্মার মূলত দু’টি প্রবৃত্তি রয়েছে, সু-প্রবৃত্তি এবং কু-প্রবৃত্তি অথবা বলা চলে বৃদ্ধিবৃত্তি ও জীববৃত্তি। সুপ্রবৃত্তি মানুষকে ন্যায়, সৎ ও সঠিক পথ নির্দেশ করে অন্যদিকে কুপ্রবৃত্তি মানুষকে অন্যায় অসৎ ও বিপথে পরিচালিত করে।
স্রষ্টার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি আদম জাতের শরীরের মধ্যে কয়েকটি মোকাশ আছে যা আল্লাহ্ তা’আলার রহমত; বরকত, ফায়েজ ও নূর দ্বারা পরিপূর্ণ। উক্ত মোকাম সমূহের মধ্যে নফস একটি যা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। যে ব্যক্তি তার নফসে পরিশুদ্ধ করেছে সেই রহমত বরকত লাভ করেছে।
মূলত নফস এটাই। পবিত্র কুরআনে যার ৩টি রূপ উল্লেখ করা হয়েছে বিভিন্ন সময়ে তা বিভিন্ন রঙে রঙ্গীন হয়। আর এটাকেই বলা হয় নফস ৩ প্রকার। যথাক্রমে:
১। নফসে আম্মারা: যে ‘নফস’ মানুষকে মন্দ কাজে প্ররোচিত করে এটির নাম ‘নফসে আম্মারা’। আল্লাহ্ তা’আলা বলেন- “নিশ্চয়ই মানুষের ‘নফস’ মন্দ কর্মপ্রবণ কিন্তু সে নয় আমার পালনকর্তা কবে প্রতি অনুগ্রহ করেন। নিশ্চয়ই আমার পালনকর্তা ক্ষমাশীল, দয়ালু। (সূরা ইউসুফ)
২। নফসে লাউয়ামাহ: যে নফস ভুল বা অন্যায় কাজ করলে অথবা ভুল বা অন্যায় বিষয়ে চিন্তা করলে কিংবা খারাপ নিয়ত রাখলে লজ্জিত হয় এবং সেজন্য মানুষকে তিরস্কার ও ভৎর্সণা করে এটির নাম নফসে ‘লাউয়ামাহ’। আল্লাহ্ তা’আলা বলেন- আরো শপথ করি সেই ‘নফসের’, যে নিজেকে ধিস্কার দেয়। (সূরা কিয়ামাহ: ২)
৩। নফসে মুতমাইণ্নাহ: যে ‘নফস’ সঠিক পথে চললে এবং ভুল ও অন্যায়ের পথ পরিত্যাগ করলে তৃপ্তি ও প্রশান্তি অনুভব করে তাকে বলে নফসে মুতমাইণ্নাহ। আল্লাহ্ তা’আলা বলেন, হে প্রশান্ত রূহ; তুমি তোমার পালন কর্তার নিকট ফিরে যাও সন্তুষ্ট ও সন্তোষজনক হয়ে। (সূরা ফাজর:আয়াত- ২৭,২৮)
আল্লাহ্ তা’আলা আমাদেরকে বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গ দিয়েছেন। প্রত্যেকটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গের রয়েছে নির্দিষ্ট করণীয় কাজ। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, অন্তর শরীরের আর দশখানা অঙ্গের মতো নিছক একটি অঙ্গই নয়, এটি হচ্ছে সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের রাজা এবং তাদের সকল কল্যাণ ও অক্যালের মূল উৎস। এ সম্পর্কে রাসূলে কারীম (সা.) এরশাদ করেছেন, “জেনে রেখো- শরীরের মধ্যে এমন এক টুকরা গোশত পিন্ড রয়েছে যে, সেটা যদি ঠিক থাকে, তখন সমস্ত শরীর ঠিক থাকে। আর যদি সেটা নষ্ট হয়ে যায়, তখন সমস্ত শরীর নষ্ট হয়ে যায়। জেনে রেখে। সেটা হচ্ছে কলব বা অন্তর। (বুখারী ও মুসলিম) তাই অন্তরের রোগসমূরে উপযুক্ত চিকিৎসা করে তার পরিশুদ্ধি অর্জন করা খুবই জরুরি বিষয়। তাই পরকালীন নাজাতের পথ। আল্লাহ্ তা’আলা এরশাদ করেন,-“সেদিন (হাশরের দিন অর্থ, সন্তান, সন্ততি কোনো কাজে আসবেনা। শুধু পরিশুদ্ধ অন্তর নিয়ে যে আসবে আল্লাহ্র কাছে তার জন্যই রয়েছে ‘নাজাত’ (সূরা শুআরা: ৮৯)
হাদিস শরীফে বলা হয়েছে, “যে ব্যক্তি নিজের নফসকে চিনেছে, সে তাঁর প্রভুকে চিনেছে।” নফসই হলো মানব দেহের সমস্ত কিছুর মূল।
আল্লাহ্ পাক রাব্বুল আলামিন সূরায় আন নাযিয়াত ৪০-৪১ নং আয়াতে কামিায় ইরশাদ করেন, “আর সে ব্যক্তি, যে স্বীয় রবের সামনে দাঁড়াবার ভয় করছে এবং আপন নফসকে কু-প্রবৃত্তি হতে বিরত রেখেছে, নিশ্চয় সে জান্নাতী।”
উক্ত আয়াতে কামিায়, আল্লাহ্ তা’আলা আপন নফসের বিরুদ্ধাচারণ করতে নির্দেশ করেছেন এবং নফসের বিরুদ্ধাচারণ কারীগণের শুভ পরিণতির সুসংবাদ দান করেছেন। অলীকূলের সম্রাট মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমি (র.) “মহা নবী শরীফে” উল্লেখ করেন-
“যদি তুমি সত্য পথের সন্ধ্যান না পাও; তবে নফস রুপি গর্দভ যা চায়, তুমি তার বিপরীত কাজ করো, ইহাই তোমার জন্য মরণ পথ। এই রেওয়াতে মাওলানা রুমী (র.) ইঙ্গিত করেছেন, নফসে আম্মারা যাহা চায় ইহা সবই বর্জণীয়।
আল্লাহ্ পাক রাব্বুল আলামিন কুরআনুল কারিমে সূরায় যাারিয়াত এর ২১নং আয়াতে কারিমায় এরশাদ করেন, “হে মানবজাতি! আমি তোমাদের আত্মা বা নফসের সাথে মিশে রয়েছি বা বিরাজমান, তুমি কি তা দেখ না?
এখানে আল্লাহ্ পাক সমস্ত মানব জাতিকে ডাক দিয়ে বলেন, হে মানুষগণ, তোমরা আমাকে কোথায় তালাশ করো? পৃথিবীর আনাচে কানাচে সকল জায়গায় এবং মসজিদে মন্দিরে গির্জায় কোথায় তালাশ করো? পৃথিবীর সমস্ত জায়গায় খুঁজলেও আমাকে পাবে না। যদি তোমার নিজের দিকে বা নিজের ভেতে রতালাশ করে দেখো স্বয়ং আল্লাহ্ রব রূপে তোমার আত্মার সাথে মিশে রয়েছে। একটু নিজের দিকে নজর করে দেখো। স্বয়ং আল্লাহ্ পাকা তোমার সাথেই আছেন। অথচ তুমি তাকে দেখতে পাও না।
“কুরআনুল কারিমে সূরায় হাদিদ ৪নং আয়াতে কারিমায় এরশাদ করেন, “তুমি যেখানে তিনিও (আল্লাহ্) সেখানে আছেন। আল্লাহ্ পৃথিবীর প্রতিটি মানব আত্মার বিরাজমান থাকিয়া তাঁর দিদারের পথকে সহজ করে কুরআনে পাকে ঘোষণা করেন, “ হে মানব গণ! তোমরা ইবাদত করো তোমাদের প্রতিপালকের তবেই তার দর্শন পাবে।
মনে রাখার বিষয় যে, যাবতীয় ইবাদতের রহস্য নফসের বিরেধিতার মধ্যে রয়েছে এবং কামালে মুজাহাদাহ সাধনার পূর্ণতার এই নফসের বিরুদ্ধে আচরণের মধ্যেই বিদ্যাযান। নফসের সঙ্গে যুদ্ধ করে আল্লাহ্র সানিধ্য লাভ কর াযায় অন্যথায় বান্দার পক্ষে কখনো সমভব নয়। কারণ- নফসের বিরুদ্ধাচরণকারী নাজাত প্রাপ্ত হয়। অর্থ মর্মে আল্লাহ্ তা’আলা কুরআনুল কারীমে সূরায় আশ-শাসন এর ৯ নয় আয়াতে কারিমায় এরশাদ করেন। “যে ব্যক্তি নফসকে পবিত্র করেছে, সে সফলকাম হয়েছে এবং সে ব্যর্থ হয়েছে যে স্বয়াং নফসকে অপবিত্র করেছে।
হযরত মুহাম্মদ (স.) এরশাদ করেন, “প্রকৃত মুজাহিদ সে ব্যক্তি, যে আল্লাহ্ পাকের এবাদতের মাধ্যমে স্বয়ং নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ করে। (মুসনাদে আহমদ, সহীহ ইবনে হিব্বান শরীফ)
এখন নফসের সাথে জিহাদ করা এই বিষয়গুলো বুঝতে হলে মোরাকাবা মোশাহাদা তথা ধ্যান সাধনার মাধ্যম ছাড়া বোঝা সম্ভব নয়।
নফস যতই পরিশুদ্ধ হোক না কেনো, যতই পরিতৃপ্ত হোক না কেনো, জন্মাতে আসার সু-সংবাদটি এই জন্যেই দেয়া হয়েছে যে, নফসের ধর্মই হলো ভোগ। সেই ভোগটি যতোই মর্জিত হোক না কেনো, তবুও নফসের তকদির। নফসে আম্মারার ভোগটি দুঃখের। সুতরাং জাহান্নামে গিয়ে অকল্পনীয় দুঃখ ভোগ করতেই হবে। নফসে লাউয়াম্মার ভোগটি হলো মিশ্রিত। মুখ ও দুঃখ দু’টোই ভোগ করতে হবে। তবে প্রথমে এক বোঝা দুঃখ ভোগ করার পর সুখ সাগরে ভোগ করবে। ভোগের জন্যই কনানো হয়েছে নফস।
রূহ তথা পরমাত্মা ভোগ করে না। ভোগ না করাটাই রুহের তথা পরমাত্মার তকদির। রুহ তথা পরমাত্মাটি এক ও অখন্ড। রুহু তথা পরমাত্মার কোলে বহু বচন নাই। কুরআন পাকে রুহ শব্দটি সর্ব স্থানে এক বচনে ব্যবহার করা হয়েছে। রুহ বিষয়টি কুরআনে ১৭ বার উল্লেখ করা হয়েছে এবং সর্বস্থানেই এক বচনে রূহকেই দেখতে পাই। বহু বচনের প্রশ্ন উঠে না। পক্ষান্তরে, নফসকে অর্থাৎ জীবাত্মাকে এক বচনে পাওয়া যায় না। বহু বচনে পাওয়া যায়। যেমন- প্রতিটি নফসকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতেই হবে কিন্তু রূহের মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করার কথা কুরআন তাকে নাই। একমাত্র নফসই হলো জন্ম মৃত্যুর অধীন।
নফস বহুরূপী। নফস রঙ্গিলা, নফসের কার্যকলাপ একেক স্থানে একেক রকম কোথাও ত্যাগী, আবার কোথাও ভোগী। কোথায়ও শক্তির পূজায় নিভোর আবার কোথাও প্রেমের পূজায় মশগুল। কোথায় পাকায় আবার কোথায়ও সিংহাসন ফেলে সেচ্ছায় ফকিরির মলিনবসন বা বিধান করে।
নফসের এই রকম উল্টাপাল্টা চরিত্রটি না থাকলে দুনিয়ার খেলাটি শেষ হয়ে যায়। পরমাত্মার প্রত্যক্ষ অবস্থানটি কেবলমাত্র দুটি স্থানে অবস্থান করে। একটি হলো মানুষের অন্তর এবং অপরটি হলো জ¦ীনের অন্তর। আর রূহ তথা পরমাত্মাটি কোথায় সৃষ্টির মাপে নেই।
তাই মানুষকে আমরা মুনি ঋষি অলি আউলিয়া আবদাল-আরিফ, গাউসকুতুব রাসূল এবং নবী রূপে দেখতে পাই। রূহ তথা পরমাআটি যখন জীবাত্মার খোলস নামের ডিম হতে বেরিয়ে আসে, তখন জীবাত্মার খোলসটি কেবলই বাহনের ভূমিকা পালন করে। বাহন দেহটি সঙ্গে না থাকলে রূহ তথা পরমাত্মার পরিচয় পাওয়া যায় না। কারণ রূহ পরমাত্মার পরিচয় পাওয়া যায় না। কারণ রূহ নিরাকার। আকার যার আছে সে নিরাকারটিকে বুঝতে পারে না। তাই রূহ মানব আকারের মধ্যে প্রকাশিত হয়।
প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (স.) এরশাদ করেন, “আমরা ছোট জিহাদ হতে বড় জিহাদের দিকে এসেছি। আরজ করা হলো ইয়া রাসূলুল্লাহ্। বড় জিহাদ কি? হুজুর ফরমান বড় জিহাদ হলো আপন নফসের সাথে জিহাদ করা।
”আত্মজয়ের চেষ্টাই সর্বশ্রেষ্ঠ জেহাদ।” (হেদায়া)
“নফসকে দমন করাই সর্বপ্রথম জিহাদ।” (বায়যাকী)
রাসূলে পাক (সা.) নফসের মোকাবেলা করাকে জিহাদের উপর মর্যাদা দিয়েছেন। আর তা এজন্য যে, ছোট জিহাদ তথা ময়দানে শত্রুর মোকাবেলা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সীমাবদ্ধ। আর নফসের মোকাবেলা সদা সর্বদায়, যা ময়দানে যুদ্ধের চেয়েও অধিকতর কঠিন।
রাসূল পাক (সা.) এরশাদ করেন, “যে বিষয়গুলোর ব্যাপারে আমার উম্মতের জন্য বেশি ভয় করছি, তা হলো নফসের পায়রুবি ভঙ্গ কু-প্রবৃত্তির আনুগাণিত্য ও দীর্ঘ আশা পোষণ করা।
উপরোক্ত আয়াত ও ইবারত সমূহে আত্মশুদ্ধি ও খোদা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে নফস আমাদের প্রধান শত্রু হিসেবেই প্রমাণিত হয়েছে। তাই প্রতি মূহুর্তে এই নফসের সাথে যুদ্ধ করা ঈমানদারদের ঈমানি কর্ম।
সুফিয়ান কেরামের মতে, “মানব গঠন পূর্ণতা লাভ করেছে তিন বস্তুর সমন্বয়ে। যথাঃ রুহ নফস ও জিনিস বা দেহ। এদের প্রত্যেকটির আলাদা আলাদা গুণ রয়েছে। যা এইগুলোর সাথেই সম্পূক্ত। যেমন- রূহ হর গুণ হলো জ্ঞান, নফসের গুণ হলো প্রবৃত্তি এব জিনিস এর গুম হলো অনুভূর্তি। হযরত জুননুন মিসরী (র.) বলেন, “বান্দা ও আল্লাহ্র মধ্যে অতিশক্ত পর্দা হলে ানফসের আনুগামী হওয়া এবং তদনুযায়ী চলা।
আল্লাহ্ রূহকে নিজের সাথে সম্বনধযুক্ত করেছেন। কোনো উপকরণ ছাড়া মানবাত্ম আল্লাহ্র জ্ঞাতি বা নূর গ্রহণ করার যোগ্যতা রয়েছে যা মানুষের ছাড়া অন্য কোনো জীবাত্মার নেই। মানব সৃষ্টির উপরণ- দশটি। পাঁচটি সৃষ্ট জগতের ও পাঁচটি আদেশ জগতের সৃষ্ট জগতের উপন্যাস হচ্ছে- অগ্নি, পানি, মৃত্তিকা, বায়ু এবং পঞ্চতি হচ্ছে এদের থেকে সৃষ্ট সূক্ষ্ম বাষ্প থাকে জগতে রূহ বা নফস বলা হয়।
আদেশ জগতের ৫ উপকরণ হচ্ছে- কলব, রূহ, সিয়, খফি ও আখফ। এতো সব ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের পরও আত্মার স্বরূপ উদ্ঘটন সহজসাধ্য নয়। এ প্রকৃতই এক রহস্যময় বিষয়। পবিত্র কুরআনে এই রহস্যকে ইঙ্গিত করেই আল্লাহ্ রাসূল (সা.) কে উদ্দেশ্যে করে বলেন, “তারা আপনাকে রূহ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। বলে দিন: “রূহ আমার পালন কর্তার আদেশে গঠিত। এ বিষয়ে তোমাদের সামান্য জ্ঞান দান করা হয়েছে। (১৭:৮৫) আসলে মানুষকে আত্মা সম্বন্ধে অতি অল্প জ্ঞান দান করা হয়েছে।
সূরা ফজরে এ নফসে মুত মায়িন্না কুরআনে বলা হয়েছে, হে প্রশান্ত রূহ
তাই পৃথিবীতে যারা আল্লাহ্ প্রিয় বান্দাদের সাহচর্য ঠিক রেখেছে। তারাই সে আল্লাহ্ প্রিয় বান্দাদের সঙ্গে সদল বলে জান্নাতে যাবে। সে মতে আত্মাকে প্রশান্ত করতে হলে আল্লাহ্ ওলিদের সাহচর্য ছাড়া গত্যন্তর নেই।
পবিত্র কুরআনের অন্যত্র এসেছে, নফসে লাওয়ামা বা কৃত অপরাধে অনুতপ্ত আত্মার ব্যাপারে। সেখানে বলা হয়েছে, আমি কছম করছি কেয়ামত দিবসের। আরো কছম করছি (সেই আত্মার যে নিজেকে তিরস্কার করে থাকে) নফসে লাওয়ামার। (সূরা কেয়ামত: ১-২) অর্থাৎ তিরস্কারকারীদের আত্ম হলো নফসে লাওয়ামা।
নফসে লাওয়ামা মূলত নফসে আম্মারার পতন অর্থাৎ হঠাৎ গোনাহর কাজ করেও ফেলে। তখন সেই আত্মার অনুতাপের অন্ত থাকে না। সুতরাং এ আত্মার এ ধরনের অনুতাপের নাম হলো প্রবৃত্তির সঙ্গে অভ্যন্তরিণ লড়াই। আর নফসের এ স্তর অতিক্রম করতে পারলেই পরবর্তী স্তরে পেীঁছা যায়। যাকে বলা হয় নফসে মুত মায়িণ্না।
নফসে আম্মারা বা প্রেতাত্মার ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, “নিশ্চয়ই নফসে আম্মারা বদ কাজ করায়, তবে আল্লাহ্ যাদের ওপর রহমত বর্ষণ করেন। আল্লাহ্ অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও দয়ালু। (সূরা ইউসুফ: ৫৩)
নফসে আম্মারাই মানুষকে কুকাজের প্রতি প্রলুব্ধ করে, কুমন্ত্রণা জোগায়। তাই নফসে আম্মারা থেকে পরিশ্রম পাওয়া ইবাদতকারী ব্যক্তির জন্য একান্ত প্রয়োজন। কেননা এটা সবচেয়ে ভয়াবহ ও মারাত্মকশত্রু। এ শত্রু থেকে যে বিপদের সম্মুখীন হতে হয়। তা খুবই মারাত্মক। এর প্রতিরোধ করা খুবই কঠিন।
তাই এ প্রেতাত্মা বা নফসে আম্মারার স্তরকে দমন করে নফসের প্রথম উন্মান ঘটে নফসে লাওয়ানা বা কৃত অপরাদ অনুতপ্ত আত্মার। আর এ লাওয়ামার স্তরকে অতিক্রম মারাত্মক সবচেয়ে বড় উত্তোরণ ঘটে নফসে মুতসায়িণ্না বা প্রশান্ত আত্মার। আমাদের উচিত নিজেদের নফসকে নফসে মুতমায়িণ্নার স্তরে উণ্নীত করা। আল্লাহ্ সবার সহায় হোন।
নফস ও রূহ আরবি শব্দ। নফস (জীবাত্মা, মন, ইগো, জীবনীশক্তি) আর রুহ (পরমাত্মা) একই বস্তু নয়। মানুষ মরে, কী মরে? মানুষের নফস (জীবন, মন) মরে যায়। নফসের জীবনীশক্তি দেহের সব খানেই থাকে। এজন্য কুরআনে কাছে প্রত্যেক নফসই (জীবন) জীবন মাত্রই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে।” (সূরা আল ইমরান: ১৮৫ সুতরাং নফস মরে যায় কিন্তু মানুষের রূহ (আত্মা) মরে না। মৃত্যুর স্বাদ বলতে শাস্তিই বুঝায়। সুতরাং সকল শাস্তি নফসকে ভোগ করতে হয়। সেটা দেহ ধারণের আগেই হোক, আর দেহ ধারণের পরেই হোক আর দেহ ত্যাগের পরেই হোক। এই তিন অবস্থায়ই নফস (জীবাত্ম) শাস্তি ভোগ করে। রুহু কখনোই শাস্তি ভোগ করে না। রুহ নফসের শাস্তির ভাব প্রকাশ করে মাত্র।
অধিকাংশ মানুষেরই ধারণা মৃত্যুর পর তো দেহ থাকে না। তাহলে রুহকেই দুনিয়ার অপকর্মের শাস্তি ভোগ করতে হয়। নিতিকার অর্থে ব্যাপারটা কিন্তু তা নয়। কারণ হে ধারণ ছাড়া রুহকে অনুভব করা সম্ভব নয়। রুহকে বাধ্য করা সম্ভব নয়। মানবদেহ না থাকলে রুহ কখনোই তাতে বসত করতো না। এজন্য মায়ের গর্ভে শিশুর দেহ (জীবনীশক্তিসহ) আগে তৈরী করা হয় এবং ৪ মাসের সময় দেহের মাঝে আল্লাহ্ পাকের তরফ হতে রুহ নাযিল হয়। দেহের এই জীবনশক্তি (নফস) এবং রুহ (আত্মা) একে অপরের সাথে পরিপূরক ও অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। দেহ না থাকলে রুহ থাকবে না। আবার রুহ চলে গেলে দেহ আমার। এটা অত্যন্ত নিখুঁত ও সূক্ষ্ম ব্যাপার। মানবদেহে এই লিলাযেনা মহান আল্লাহ্ পাকের দেয়া” দেহ ও আত্মার মিলন সত্ত্বাকে নফস বলা হয়। রূহ ও নফসের মধ্যে প্রকৃত অর্থে কোনো পার্থক্য না থাকলেও পারিভাষিক অর্থে পার্থক্য আছে। যেমন- প্রাণীকে নফস বলা হয়। কিন্তু রূহ বা আত্মা বলা হয় না। আল্লাহ্ বলেন- প্রত্যেক জীবন.
আর নফস সেটাই যা আল্লাহ্ মানব দেহে ফুঁকে দিয়েছেন। মৃত্যুর সময় যা দেহ থেকে বেরিয়ে যায়। রাসূল (সা.) বলেন, নিশ্চয়ই যখন রূহ ফরজ করা হয়, তখন তার চোখ তা দেখতে থাকে (মুসলিম: মিশকাত)। অন্য হাদিসে এসেছে। রাসূল (সা.) বলেন, “তোমরা কি দেখনি যে, মৃত্যুর সময় মানুষের চোখ তাকিয়ে থাকে? সাহাবায়েকেরাম বললেন, হ্যাঁ, হে আল্লাহ্র রাসূল! তখন তিনি বললেন, ‘তা তো ঐ সময় যখন তার চোখ তার নফসকে দেখতে থাকে।

লেখকঃ সাবেক জাতীয় ক্রীড়াবিদ(কারাতে ব্লাক বেল্ট ১ম ড্যান),সভাপতি শারীরিক শিক্ষাবিদ সমিতি,চেয়ারম্যান গ্রিন ক্লাব, গবেষক,শিক্ষক,সাংবাদিক ও কলামিস্ট