মিথ্যাচার মানুষের মর্যাদা ক্ষুন্ন করে অকল্যাণের পঙ্কিলতায় ডুবিয়ে দেয়

 

মো.আলতাফ হোসেন ঃঃ
মিথ্যা সকল পাপের জননী। মিথ্যা কথা বলা ও মিথ্যাচার করা জঘন্য অপরাধ। মিথ্যা বলা অশোভনীয় ও অত্যন্ত ঘৃণিত কাজ। চারিত্রিক স্খলনের কারণে অনেকে মিথ্যায় জড়িয়ে যায়। মনুষ্যত্ববোধ ও রুচিশীলতা লোপ পেলেও অনেকে মিথ্যার বেসাতি তৈরি করে। কিন্তু সুস্থ ও সঠিক মন-মস্তিষ্ক কোনোক্রমেই মিথ্যা সমর্থন দিতে পারে না।

মিথ্যা ভয়াবহ গুনাহ। মিথ্যা থেকে বেঁচে থাকতে ইসলাম দৃঢ়ভাবে সতর্ক করেছে। ইসলামে মিথ্যার সামান্যতম আশ্রয় বা সুযোগ নেই। কোরআন ও হাদিসের মাধ্যমে প্রমাণিত যে, এটা ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম ও গর্হিত। মিথ্যাবাদীর পরিণাম দুনিয়া ও আখেরাতে খুবই নিন্দনীয়। তবে নির্দিষ্ট কয়েকটি ক্ষেত্রে ও মৌলিক স্বার্থে মিথ্যা বলার অবকাশ দেওয়া হয়েছে। মিথ্যা বলার অনুমতি রয়েছে যেসব কারণে এক. যুদ্ধে মিথ্যা বলা বৈধ। দুই. দু’পক্ষের মাঝে সমঝোতা করার জন্য মিথ্যা বলা বৈধ। তিন. স্বামী-স্ত্রীর মাঝে ভালোবাসা ও মিল তৈরির করার জন্যও মিথ্যা বলা বৈধ। নির্দিষ্ট কয়েকটি ক্ষেত্র ব্যতীত মিথ্যা বলার কোন অবকাশ নেই। এ মিথ্যার মাধ্যমে কারো অধিকার হরণ করা যাবে না, কাউকে হত্যা করা যাবে না এবং কারো ইজ্জম সম্মানে আঘাত হানা যাবে না। বরং কাউকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করার জন্য কিংবা দু’জনের মধ্যে ছিন্ন সম্পর্ক পুণরায় স্থাপন করার জন্য অথবা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মিল-মহব্বত তৈরি করার জন্য এ মিথ্যার আশ্রয় নেয়া যাবে, অন্যথায় নয়।

ইসলাম আল্লাহ প্রদত্ত পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা। ইসলামে মিথ্যার কোনো আশ্রয় নেই। এটা হচ্ছে আদদীনুল হক সত্যদ্বীন, আসসিরাতুল মুস্তাকিম সহজ সরল পথ। সত্যের নিত্যরূপ সবত্র এক; সূর্য সবত্র সূর্য। আর সত্য একদিন মিথ্যাকে অপসারিত করবেই। অসত্য, অন্যায় অকল্যাণ ও মিথ্যাকে বিনাশ করে সত্য, ন্যায় ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠা করার জন্যই এই সত্য দীন আল-ইসলাম। ইসলামে অমূলক, অলীক, মিথ্যা কিংবা বানোয়াট কোনো কিছুর জায়গা নেই। আল্লাহর কালাম মজীদ আল কোরআনুল কারীম সম্পর্কে এরশাদ হয়েছে : কোরআন মানুষের দিশারী, সৎ পথের স্পষ্ট নিদর্শন এবং সত্যাসত্যের পার্থক্যকারী।

ইসলামী শরিয়তে মিথ্যাচার কবিরা গুণাহ হিসেবে বিবেচিত। এটি একটি জঘন্য অন্যায়। যারা এ অপরাধের সঙ্গে যুক্ত তারা পারিবারিক, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় জীবনে অকল্যাণ বয়ে আনে। রাসূল (সা.) বলেন,‘তোমার যে ভাই তোমাকে সত্যবাদী বলে বিশ্বাস করে অথচ তুমি তাকে কোনো মিথ্যা সংবাদ দিলে, এটা চরম বিশ্বাসঘাতকতা।’(বোখারি)।

নবী করিম (সা.) সব ধরনের মিথ্যাচারের কঠোর সমালোচনা করেছেন এবং তা থেকে অনুসারীদের দূরে থাকার তাগিদ দিয়েছেন। বোখারি শরিফের হাদিসে বলা হয়েছে, হযরত ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন,‘কোনো বান্দা নিরবচ্ছিন্নভাবে মিথ্যা বলতে বলতে তাতে চির অভ্যস্ত হয়ে পড়লে, তার অন্তরে প্রথমে একটা কালো দাগ পড়ে। অবশেষে পুরো অন্তরই কালো হয়ে যায়। তখন সে আল্লাহর কাছে মিথ্যাবাদী রূপে তালিকাভুক্ত হয়। অতএব, যাতে সুনিশ্চিত মঙ্গল ও কল্যাণ রয়েছে এমন কথা ছাড়া মুসলমানের কোনো বাহুল্য কথা বলাই উচিত নয়। কেননা, নীরবতা অবলম্বনেই রয়েছে প্রশান্তি। আর প্রশান্তিই হলো সবচেয়ে কাঙ্খিত বিষয়।

আবু হোরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূল (সা.) বলেছেন,‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস রাখে, সে যেনো ভালো কথা বলে, না হয় চুপ থাকে।’ এ হাদিসের মাধ্যমে সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়, সমাজের কাছে কল্যাণকারিতা সুস্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয় না— এমন কথা বলা যাবে না। হযরত আবু মুসা (রা.) বলেন, আমি আরজ করলাম, ইয়া রসুলুল্লাহ! ‘মুসলমানদের মধ্যে উত্তম ব্যক্তি কে?’ তিনি বললেন, ‘যে তার জিহ্বা ও হাত থেকে অপর মুসলমানকে প্রশান্তিতে (নিরাপদে) রাখে’ (বোখারি, মুসলিম, তিরমিজি ও নাসায়ি)
হাদিসে বর্ণিত আছে, ‘যে এমন স্বপ্নের কথা বর্ণনা করে যা সে দেখেনি, সে যেন দুটি চুলের মধ্যে গিঁট দিতে সচেষ্ট, কিন্তু কোনো মতেই গিঁট লাগাতে সক্ষম হচ্ছে না’ (বোখারি) ইবনে ওমর (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বড় মিথ্যা হচ্ছে, কেউ এ কথা বলে আমি স্বপ্নে এরূপ দেখেছি।’ অথচ সে কিছুই দেখেনি (বোখারি)

আল্লাহ তা’য়ালা এরশাদ করেন, ‘মিথ্যা তো তারাই বানায়, যারা আল্লাহর নিদর্শনসমূহের ওপর ঈমান রাখে না। বস্তুত তারাই মিথ্যুক। ’ (সূরা নাহাল, আয়াত: ১০৫) আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসূল (সা.) বলেন, ‘মুনাফেকদের নিদর্শন তিনটি : কথা বলার সময় মিথ্যা বলা, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা এবং আমানতের খেয়ানত করা। ’ (বুখারি, হাদিস নং : ৩৩, মুসলিম, হাদিস নং : ৫৯)

সবচেয়ে বড় মিথ্যা হলো আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা.) এর ওপর মিথ্যারোপ করা। এর শাস্তি অত্যন্ত ভয়াবহ। কেউ কেউ এ জাতীয় মিথ্যুককে কাফের পর্যন্ত বলেছেন। আল্লাহ এরশাদ করেন, ‘আর তোমাদের জিহ্বা দ্বারা বানানো মিথ্যার ওপর নির্ভর করে বলো না যে, এটা হালাল এবং এটা হারাম, আল্লাহর ওপর মিথ্যা রটানোর জন্য। নিশ্চয়ই যারা আল্লাহর নামে মিথ্যা রটায়, তারা সফল হবে না। ’ (সুরা নাহাল, আয়াত : ১১৬)

আলী (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসূল (সা.) বলেন, ‘তোমরা আমার ওপর মিথ্যা বলবে না, যে আমার ওপর মিথ্যা বলবে, সে যেন জাহান্নামে প্রবেশ করে। ’ (বুখারি, হাদিস নং : ১০৬) ইবনুল কায়্যিম (রহ.) বলেন, ‘এর অর্থ হচ্ছে যে রাসূল সা. এর ওপর মিথ্যা বলবে সে যেনো নিজ স্থায়ী ঠিকানা জাহান্নাম বানিয়ে নেয়। ’ (তারিকুল হিজরাতাইন : ১৬৯)

আল্লাহ তা’য়ালা এরশাদ করেন, ‘হে মু’মিনরা! তোমরা আল্লাহর জন্য ন্যায়ের সঙ্গে সাক্ষ্যদানকারী হিসেবে সদা দন্ডায়মান হও। কোনো কওমের প্রতি শত্রুতা যেনো তোমাদেরকে কোনোভাবে প্ররোচিত না করে যে, তোমরা ইনসাফ করবে না। তোমরা ইনসাফ করো, তা তাকওয়ার নিকটতর। ’ (সুরা মায়েদা, আয়াত : ৮)

ইমাম নববি (রহ.) বলেন, ‘এ সব হাদিস দ্বারা প্রমাণিত হয়, যা যা শোনা যায় তার সব কিছু বলা নিষেধ। কারণ, প্রতিনিয়ত সত্য-মিথ্যা অনেক কিছুই শোনা যায়, অতএব যে ব্যক্তি সব কিছু বলে বেড়াবে—তার দ্বারা মিথ্যা প্রচারিত হওয়াই স্বাভাবিক, যার সঙ্গে বাস্তবতার কোনো সম্পর্ক থাকবে না। আর এটাই হচ্ছে মিথ্যা, মিথ্যার জন্য ইচ্ছা-অনিচ্ছার কোনো দখল নেই। হ্যাঁ, গোনাহগার হওয়ার ইচ্ছা শর্ত। আল্লাই ভালো জানেন। ’ (শরহু মুসলিম : ১/৭৫) উম্মে কুলসুম (রা.) বলেন, আমি রাসূল (সা.) কে বলতে শুনেছি, ‘যে ব্যক্তি দুই জনের মাঝে সমঝোতা করার জন্য ভালো কথার আদান-প্রদানকালে মিথ্যা বলে সে মিথ্যুক নয়।’ (বুখারি, হাদিস নং : ২৫৪৬; মুসলিম, হাদিস নং : ২৬০৫)

আসমা বিনতে ইয়াজিদ বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘তিন জায়গা ব্যতীত মিথ্যা বলা বৈধ নয়। স্ত্রীকে সন্তুষ্ট করার জন্য মিথ্যা বলা, যুদ্ধে মিথ্যা বলা এবং দু’জনের মাঝে সমঝোতা করার জন্য মিথ্যা বলা বৈধ। (তিরমিজি, হাদিস নং : ১৯৩৯; সহিহ আল-জামে : ৭৭২৩)
ইসলাম ধর্মে এমন একটি মুহুর্ত কিংবা দিন-ক্ষণ নেই যার মধ্যে মিথ্যা বলা বৈধ বা মানুষ যা চায় তা বলার জন্য সে স্বাধীন। পক্ষান্তরে কতক সমাজে প্রচলিত রেওয়াজ যেমন পহেলা এপ্রিল বা এপ্রিল ফুল নামে যে কুসংস্কার চলে আসছে যে, তাতে মিথ্যা বলা বা কাউকে ধোঁকা দেয়া সম্পূর্ণ বৈধ, তার কোন ভিত্তি ইসলাম ধর্মেই নেই। বরং মিথ্যা সবসময়ই মিথ্যা এবং সবসময় তা হারাম।

আল্লাহ তা’য়ালা সংবাদ দিয়েছেন যে, রাসূল (সা.) মিথ্যা তৈরি করেন না এবং মিথ্যা বলেনও না। কারণ, আল্লাহ এবং তার রাসূলের নামে যারা মিথ্যা রটায় তারা নিকৃষ্ট মাখলুক। তারা আল্লাহর নিদর্শনসমূহের ওপর বিশ্বাস রাখে না, তারা কাফের, তারা বদ্দীন, তারা মানুষের নিকট মিথ্যুক হিসেবে পরিচিত। পক্ষান্তরে রাসূল সা. মানুষের মাঝে সব চেয়ে সত্যবাদী হিসেবে, সব চেয়ে সৎকর্মশীল হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিলেন। কওমের সবাই তাকে বিশ্বস্ত মু‏হাম্মদ বা আলআমীন মুহাম্মদ বলে ডাকতো।’ (ইবনে কাসির : ২/৫৮৮)
‘কেয়ামতের দিন তিন জন ব্যক্তির সঙ্গে আল্লাহ কথা বলবেন না এবং তাদের দিকে তাকাবেন না এবং সংশোধন করবেন না, আরো তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি। আবুজর বলেন, রাসূল (সা.) একথাগুলো তিনবার বললেন। আবুজর বলেন, তারা ক্ষতিগ্রস্ত, তারা ধ্বংস প্রাপ্ত, তাদের পরিচয় কি হে আল্লাহর রাসূল! তিনি বললেন, টাখনুর নিচে কাপড় পরিধানকারী, উপকার করে খোটা প্রদানকারী ব্যক্তি ও মিথ্যা কসমের মাধ্যমে বিক্রয়কারী ব্যক্তি।’ (মুসলিম : ১০৬)

সব চেয়ে ঘৃণিত হচ্ছে হাসি-মসকরাচ্ছলে মিথ্যা বলা। মিথ্যার মাধ্যমে মিথ্যার প্রসারতা লাভ করে। অনেকে ধারণা করে যে হাসি-রসিকতায় মিথ্যা বলা বৈধ। এটা ভুল ধারণা, এর কোন ভিত্তি নেই ইসলাম ধর্মে। রসিকতা কিংবা স্বাভাবিক অবস্থায় মিথ্যা সর্বাবস্থায় হারাম।
ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেন,‘আমি রসিকতা করি ঠিক, তবে সত্য ব্যতীত কখনো মিথ্যা বলি না।’ (তাবরানি ফিল মুজামুল কাবির : ১২/৩৯১, সহিহ আল-জামে : হাদিস নং ২৪৯৪) আবুহুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, সাহাবায়ে কেরাম একদা বলল, হে আল্লাহ রাসূল, আপনি তো আমাদের সঙ্গে রসিকতা করেন। তিনি বললেন,‘আমি সত্য ভিন্ন কিছু বলি না।’ (তিরমিজি : ১৯৯০)

আব্দুর রহমান ইবনে আবি লায়লা (রহ.) বলেন, রাসূল (সা.) এর সাহাবাগণ বলেছেন যে, তারা রাসূল সা. সঙ্গে কোনো সফরে ছিলো, তাদের একজন ঘুমিয়ে পড়লে অপর কেউ তার তীর নিয়ে নেয়, লোকটি ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে ভীত হয়ে যায়। এ দৃশ্য দেখে সবাই হেসে দিল। রাসূল সা. বললেন, তোমরা হাসলে কেনো? তারা বলল, কিছু হয়নি। তবে আমি তার তীরটি নিয়েছিলাম আর এতেই সে ঘাবড়ে গেছে। রাসূল (সা.) বললেন, ‘কোনো মুসলমানের জন্য অন্য কোনো মুসলমানকে ভয় দেখানো বৈধ নয়।’ (আবুদাউ : ৫০০৪, আহমদ : ২২৫৫৫, অনুবাদ আহমদ থেকে, জহিহ আল-জামে : ৭৬৫৮)

মিথ্যা চৌর্যবৃত্তি থেকেও খারাপ। বাচ্চাদের সঙ্গে খেলাধুলাতেও মিথ্যা থেকে বিরত থাকা জরুরি। কারণ, এটা বাচ্চাদের অন্তরে গেঁথে যায়। রাসূল (সা.) এর থেকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। হাদিস শরীফে বর্ণিত,বান্দা সত্য বললে সত্যবাদিতা তার একটি আলামত হয়ে যায়। পক্ষান্তরে বান্দা মিথ্যা বললে মিথ্যা বলা তার অভ্যাস ও আলামতে পরিণত হয়। সত্যবাদিতা ব্যক্তিকে জান্নাতে নিয়ে যায় আর মিথ্যা ব্যক্তিকে জাহান্নামে নিয়ে যায়। অধিকন্তু সত্যবাদির কথার প্রতি মানুষের আগ্রহ থাকে ও তা মানুষের নিকট গ্রহণযোগ্যতা পায় আর মিথ্যুকদের কথার প্রতি মানুষের আগ্রহ থাকে না এবং মানুষের নিকট তা গ্রহণযোগ্যতাও পায় না।’ (সুবুলুস্সালাম : ২/৬৮৭)

মিথ্যুকদের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয় না। ইবনুল কাইয়ূম (রহ.) বলেন, যেসব কারণে ফতোয়া, সাক্ষ্য ও বর্ণনা পরিত্যাগ করা হয় তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে মিথ্যা। মিথ্যা মানুষের মুখের কার্যকারিতাই নষ্ট করে দেয়। যেমনিভাবে অন্ধ ব্যক্তির চাঁদ দেখার সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয় এবং বধির ব্যক্তির শোনার সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, মুখ একটি অঙ্গের ন্যায় যখন তা মিথ্যা বলা আরম্ভ করবে তখন তার কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে যাবে। বরং মানুষের ক্ষতির মূল কারণই হচ্ছে মিথ্যা জবান।’ (আলামুল মুয়াক্কিঈন : ১/৯৫)
মিথ্যার কারণে দুনিয়া আখেরাত উভয় জাগতেই চেহারা বিবর্ণ ও মলিন হয়ে যায়। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, ‘আর যারা আল্লাহর প্রতি মিথ্যারোপ করে কিয়ামতের দিন তুমি তাদের চেহারাগুলো কালো দেখতে পাবে।’ ( জুমার : ৬০) হাদিস দ্বারা প্রমাণিত মিথ্যুকের চোয়াল চিরে গর্দান পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হবে। (বুখারি : ৫৭৪৫)

মিথ্যা কখনো সুফল বয়ে আনে না। মিথ্যার পরিণাম হচ্ছে ধ্বংস। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মিথ্যার বেসাতির কারণে অনেক জাতি ধ্বংস হয়ে গেছে, অনেক সভ্যতা বিলীন হয়ে গেছে। কোরআন মাজীদে এরশাদ হয়েছে : সুতরাং পৃথিবী পরিভ্রমণ করে দেখো, যারা সত্যকে মিথ্যা বলেছে তাদের পরিণাম কী হয়েছে? (সূরা নাহল : আয়াত ৩৬)।

মিথ্যা ঈমানকে ধ্বংস করে দেয় আত্মবিশ্বাস ও আত্ম অনুভূতিকে নির্মূল করে দেয় এবং মানবিক মূল্যবোধকে অপমানিত ও লাঞ্ছিত করে। একবার প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) খুতবা প্রদানকালে বললেন : হে মানুষ! মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদানকে আল্লাহর সঙ্গে শিরক করার সমপর্যায়ের হিসাবে গণ্য করা হয়েছে। এরপর নবী করিম (সা.) তিলাওয়াত করলেন,সুতরাং তোমরা বর্জন করো অপবিত্রতা এবং দূরে থাকো মিথ্যা বলা থেকে। (তিরমিযী শরীফ)।

মূলত মিথ্যাই হচ্ছে যাবতীয় পাপ কাজের উৎস। হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, মিথ্যা ধ্বংস আনয়নকারী। কোরআন মজীদে মিথ্যাচারী সম্পর্কে এরশাদ হয়েছে অভিশপ্ত হোক মিথ্যাচারীরা। (সূরা যারিয়াত : আয়াত ১০)। হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, হযরত মুহাম্মাদ (সা.) যে আচরণের জন্য সবচেয়ে বেশি রাগান্বিত হতেন তা হচ্ছে কেউ মিথ্যা কথা বললে। যতক্ষণ না সেই ব্যক্তি তওবা করতো ততক্ষণ তাঁর অন্তরে তা বিঁধতে থাকতো। (তিরমিযী শরীফ)।

সুতরাং সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট কল্যাণ নিহিত আছে এমন অবস্থা ছাড়া কোন মুসলমানের কোন অবস্থাতেই মিথ্যা বলা উচিত নয়। তার উচিত হয় সত্য বলা, নচেৎ চুপ থাকা। রাসূল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাস করে সে যেন ভালো কথা বলে নচেৎ চুপ থাকে।’ এ হাদীস থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় যে, কোনো কথার কল্যাণকারিতা সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত না হলে সে কথা বলা উচিত নয়। সত্য গভীর কূপের তলদেশে নিহিত। আমাদের অস্তিত্বের সাথে সত্য প্রতিষ্ঠিত। সকল বাঁধা দূর করে সত্য তার নিজস্ব পথে অগ্রসর হয়। আমাদের জীবনের সাথে জড়িয়ে আছে সত্য ও মিথ্যার দ্বন্দ্ব।

হযরত আবু মুসা (রা.) রাসূল (সা.) কে জিজ্ঞাসা করেন, মুসলমানদের মধ্যে কে উত্তম? উত্তরে রাসূল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি সম্পূর্ণ জেনে শুনে হারাম বাক্য উচ্চারণ করে, সে জাহান্নামের এত নিচে নিক্ষিপ্ত হবে, যা পৃথিবীর পূর্ব প্রান্ত থেকে পশ্চিম প্রান্ত অপেক্ষাও দূরে অবস্থিত।’ (বুখারী শরীফের হাদীম)

পবিত্র কোরআন ও হাদিসে মিথ্যাবাদীর অত্যন্ত ভয়ানক পরিণতির কথা বর্ণিত হয়েছে। পবিত্র কোরআন বলছে, মিথ্যাবাদীদের ওপর আল্লাহর লানত নেমে আসে (সুরা আলে ইমরান, আয়াত :৬১)।
মিথ্যা হচ্ছে অন্তরের রোগ। যারা এ রোগে আক্রান্ত হয়েছে, তাদের জন্য নির্ধারিত আছে চরম কষ্টদায়ক শাস্তি। সুরা বাকারায় বলা হয়েছে, কিছু মানুষ আছে যারা বলে বেড়ায় যে, তারা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী। অথচ তারা মুমিন নয়। তারা ভাবে যে, এই মিথ্যা বলে তারা আল্লাহ ও মু’মিনদের ধোঁঁকা দিচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে তারা নিজেদেরই ধোঁকা দিচ্ছে; তবে তারা তা অনুধাবন করতে পারে না। তাদের অন্তরে রয়েছে ব্যাধি, আল্লাহ তাদের এ ব্যাধিকে আরও বাড়িয়ে দেন এবং তাদের এ মিথ্যা বলার কারণে তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি (সুরা বাকারাহ, আয়াত :৮-১০)।

মিথ্যা বলার পরিণাম খুবই ধ্বংসাত্মক। এর জন্য দুনিয়াতে রয়েছে ধ্বংস আর আখেরাত রয়েছে অপমান ও লাঞ্ছনা। মিথ্যার কারণে অন্তরে কপটতার সৃষ্টি হয়। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, ‘সুতরাং পরিণামে তিনি তাদের অন্তরে নিফাক রেখে দিলেন সেদিন পর্যন্ত, যেদিন তারা তার সাথে সাক্ষাৎ করবে, তারা আল্লাহকে যে ওয়াদা দিয়েছে তা ভঙ্গ করার কারণে এবং তারা যে মিথ্যা বলেছিলো তার কারণে।’ (তওবা : ৭৭)

‘সত্যাবাদিতা হচ্ছে শুভ কাজ। আর শুভ কাজ জান্নাতের দিকে নিয়ে যায়। আর বান্দা যখন সত্য বলতে থাকে, একসময় আল্লাহর নিকট সে সিদ্দিক হিসেবে পরিগণিত হয়। আর মিথ্যা হচ্ছে পাপাচার, পাপাচার জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়, বান্দা যখন মিথ্যা বলতে থাকে, আল্লাহর নিকট একসময় সে মিথ্যুক হিসেবে গণ্য হয়। (বুখারি : ৫৭৪৩, মুসলিম : ২৬০৭)

সত্যের জয় অবশ্যম্ভাবী। ইসলামে মানবজাতিকে সর্বাবস্থায় মিথ্যাচারিতা পরিহার করার জন্য বিশেষভাবে জোরালো তাগিদ দেওয়া হয়েছে। মিথ্যা কথা বলা, মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া, মিথ্যা অপবাদ দেওয়া বা দোষারোপ করা, ধোঁকাবাজি, প্রতারণা, ভেজাল কারসাজিসহ মানুষকে ঠকানোর যতো রকম অপরাধ আছে, রমজান মাসে দেহ-মন থেকে তা যেন সর্বাবস্থায় নির্বাসিত হয়, সে জন্য রোজাদারদের মাসব্যাপী প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। মিথ্যাচার হচ্ছে অসত্য কথা বলা, অসত্য সংবাদ দেওয়া, অবাস্তব বর্ণনা ও অসত্য তথ্য প্রদান। মিথ্যাচার একটি ঘৃণ্য বদস্বভাব। মিথ্যাচার মানুষকে কলঙ্কিত ও মর্যাদা ক্ষুন্ন করে তার জন্য ক্ষতি বয়ে আনে। ইহকাল ও পরকালে তাকে ধ্বংস করে দেয়। এ জন্য পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তা’য়ালা মিথ্যাচার বর্জনের নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, ‘তোমরা মিথ্যা কথা থেকে দূরে থাকো।’ (সূরা আল-হজ, আয়াত: ৩০)

মিথ্যা দিয়ে সত্যকে ঢাকা যায় না। সত্য চিরকালই সত্য। সত্য বাণী সবসময়ই অমর এবং তা পরিপূর্ণ। সত্য হচ্ছে আলো আর মিথ্যে অন্ধকার, আল্লাহ জাল্লা শানুহু এরশাদ করেন, ‘‘তোমরা সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশ্রিত করো না এবং জেনে শুনে সত্য গোপন করো না।’’ (সূরা বাকারা : আয়াত ৪২)।

মিথ্যা সব পাপের মূল। মিথ্যাকে বর্জন করো এবং সত্যকে আঁকড়ে ধরো। মানবচরিত্রের খারাপ দিকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট হচ্ছে মিথ্যা বলা। মিথ্যা লোকাতে আরো মিথ্যার আশ্রয় নিতে হয়। একটি মিথ্যা জন্ম দেয় অনেক মিথ্যা এবং অসংখ্য পাপ কাজের। মিথ্যা একসময় খুন-খারাবির মতো ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মিথ্যা বলা বা মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার কারণে নিরপরাধ ব্যক্তি অপরাধী হয়ে শাস্তি ভোগ করে আর অপরাধী ছাড়া পেয়ে তার অপরাধ বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। এ জন্য ইসলামের অবস্থানও সুস্পষ্টভাবে মিথ্যার বিরুদ্ধে। সত্য আকাশের চেয়েও উঁচু। আর ইসলামের দৃষ্টিতে মিথ্যাবাদী হলো জঘন্য অপরাধী। তাই মিথ্যা বলে কাউকে হাসানোর চেয়ে সত্য বলে তাকে কাদানো ভালো।

সত্য পৃথিবীর স্থায়ীত্বের একটি মূল ভিত্তি। প্রশংসাযোগ্য বস্তু, নবুওয়তের অংশ ও তাকওয়ার ফল। এ সত্য না থাকলে শরিয়তের বিধানসমূহ অকেজো হয়ে যেতো। মূলত মিথ্যা বলার দোষে দুষ্ট হওয়ার অর্থ হচ্ছে মানবতা থেকে বেরিয়ে যাওয়া কারণ, কথা বলা মানুষের একটি বৈশিষ্ট্য আর কথা সত্য না হলে তার কোনো অর্থই থাকে না।’ যা সত্য তাই সুন্দর;সত্য ও সুন্দরের মিশ্রনে যে জীবন সে জীবন সকলের কাম্য।

সত্যের বিপরীত হচ্ছে মিথ্যা। সত্য সুন্দর, মিথ্যা কুৎসিত। প্রকৃতপক্ষে মিথ্যার অসারতা মানবতাকে কলুষিত ও কলঙ্কিত করে। মিথ্যে কথা, মিথ্যাচার কোনোভাবেই কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না। মিথ্যাচার মানুষকে কলঙ্কিত ও মর্যাদা ক্ষুন্ন করে অকল্যাণের পঙ্কিলতায় ডুবিয়ে দেয়। তাই যতক্ষণ আমরা বেঁচে থাকবো ততক্ষণ সত্যের ওপর অটল থাকবো এবং অসত্যকে ঘৃণা করবো। মিথ্যাচার চরম ও ভয়ানক পাপ। ইসলাম ধর্মে সর্বদা সত্যবাদী হতে এবং মিথ্যা পরিহারে সকলের প্রতি কড়া আদেশ দেয়া হয়েছে। যারা মিথ্যাচারে লিপ্ত তারা নিশ্চয়ই পরিণতিতে চরম অপমান ও অনুশোচনার শিকার হবে।

লেখকঃ গবেষক,সাবেক জাতীয় ক্রীড়াবিদ,
চেয়ারম্যান গ্রীণ ক্লাব, মানিকগঞ্জ,সাংবাদিক ও কলামিস্ট