মিশর শাসক হযরত ইউসুফ (আ.)

 

মো.আলতাফ হোসেন ঃঃ
আল্লাহ তা’য়ালা যুগে যুগে সত্য দ্বীনসহ অসংখ্য নবী-রাসুল প্রেরণ করেছেন। যাদের প্রেরণের মূল লক্ষ্যই ছিলো এ জমিনে তাঁর ইবাদাত তথা দাসত্ব মানুষ শিখানো। মানুষকে সকল প্রকার অন্যায় জুলুম অত্যাচার থেকে ফিরিয়ে সঠিক জীবন দর্শন দেখানো। তাই প্রত্যেক নবি-রাসূলই আল্লাহ তা’য়ালা এ মিশন বাস্তবায়নে নিজেদের এবং উম্মতের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণ কামণায় দোয়া করেছেন। যেভাবে দোয়া করেছেন হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম। আল্লাহ তা’য়ালা ইউসুফ আলাইহিস সালামের সাহায্য চাওয়ার ধরণ মুসলিম উম্মাহর জন্য শিক্ষণীয় হিসেবে কোরআনে উল্লেখ করেছেন। যাতে তারাও এভাবে আল্লাহ কাছে দুনিয়া আখিরাতের কল্যাণে বিনীতভাবে প্রার্থনা করতে পারে। আল্লাহ তা’য়ালা পৃথিবীর বুকে অসংখ্য নবী-রাসূল পাঠিয়েছে। কোরানে বর্ণিত ২৫ জন নবী-রাসূলের একজন হলো হযরত ইউসুফ (আ.)।

হযরত ইউসুফ ইহুদি,খ্রিস্ট এবং ইসলাম ধর্মে স্বীকৃত একজন পয়গম্বর। কোরআন এবং হিব্রু বাইবেলের বর্ণনা অনুসারে, তিনি হযরত ইয়াকুব (আ.) এর বারো ছেলের ১১তম ছেলে। তিনি স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিতে জানতেন। ইয়াকুব (আ) ছিলেন বনি ইসরাইল এবং ইহুদীদের পূর্বপুরুষ। হযরত ইয়াকুব (আ.)-এর জন্মভূমির নাম ‘কেনান’ যা বর্তমান ফিলিস্তিনের একটি অংশ। পরবর্তীতে এই অঞ্চল ‘হেবরন এবং খলিল’ নামেও পরিচিতি পায়। ফিলিস্তিন, লেবানন এবং সিরিয়াসহ পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে হযরত ইয়াকুব (আ.)-এর কর্মপরিধির ব্যাপ্তি ছিলো। তাঁর প্রথম স্ত্রী লাইয়া বিনতে লাইয়্যানের গর্ভে জন্ম নেন ১০ পুত্র। লাইয়ার মৃত্যুর পর তারই ছোটবোন রাহিলকে বিয়ে করেন হজরত ইয়াকুব (আ.)। তাদের ঘরে জন্ম নেন দুই পুত্র; হযরত ইউসুফ (আ.) এবং তার ছোটভাই বেনিয়ামিন। হযরত ইউসুফ (আ.)-এর পিতার নাম, হযরত ইয়াকুব (আ.)।তাঁর পিতার নাম ইসহাক (আ.),তাঁর পিতার নাম হযরত ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ (আ.)। তাঁরা সকলেই আল্লাহ তা’য়ালার খাছ নবী ও রাসূলের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। দেশ ও জাতিভিত্তিক তাঁরা প্রেরিত হন। একাধিক হাদিস মতে হযরত মুহাম্মদ (সা.) তৃতীয় আসমানে হযরত ইউসুফ (আ.)-এর সাক্ষাৎ লাভ করেছিলেন এবং তাঁকে অত্যন্ত সুদর্শন বলে বর্ণিত হয়েছে। ইউসুফ নামটি মুসলিম জাতি এবং মধ্যপ্রাচ্যর মধ্যে সাধারণ নামগুলোর একটি। হিব্রু বাইবেল এবং কোরআনের বিভিন্ন স্থানে ইউসুফ নাম উল্লেখ করা হয়েছে কিন্তু শুধু কোরআনের সূরা ইউসুফে তাঁর ঘটনা সম্পূর্ণ ধারাবাহিকভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।

সূরা ইউসুফ-এর ১১১টি আয়াতের মধ্যে ৩ থেকে ১০১ আয়াত পর্যন্ত ৯৯টি আয়াতে ইউসুফের কাহিনী বিবৃত হয়েছে। এ ছাড়া অন্যত্র কেবল সূরা আন‘আম ৮৪ এবং সূরা মু’মিন ৩৪ আয়াতে তাঁর নাম এসেছে। মহান আল্লাহ হযরত ইব্রাহিমের(আ:)এর মত হযরত ইউসুফের (আ:)এর নামে সুরা নাযেল করে উনাকে সম্মানিত করেছেন।

হযরত ইয়াকুব (আ.) তাঁর ১২ পুত্রের মধ্যে হযরত ইউসুফ (আ.)-কে বেশি স্নেহ করতেন। মূলত সৌন্দর্যের কারণে শিশুকালে তিনি সবারই প্রিয়পাত্র ছিলেন, যা তাঁর সৎ ভাইয়েরা সহ্য করতে পারতেন না। এই ভাইযেরা হযরত ইউসুফ (আ.)-কে শিশু অবস্থায় তাদের পিতার কাছ থেকে দূরে সরানোর ঘৃণ্য চক্রান্ত করেন। তারা বাবা হযরত ইয়াকুব (আ.)-এর কাছে হযরত ইউসুফ (আ.)-কে তাদের সঙ্গে বাইরে খেলতে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি চান। হযরত ইয়াকুব (আ.) কখনো পুত্র হযরত ইউসুফ (আ.)-কে চোখের আড়াল করতেন না। তাই তাকে নেকড়ে বাঘ খেয়ে ফেলতে পারে উল্লেখ করে নিষেধ করেন তবে উপর্যুপরি অনুরোধ এবং নিরাপত্তার নিশ্চয়তার কথা বলে সৎ ভাইয়েরা বাবাকে রাজি করান এবং হযরত ইউসুফ (আ.)-কে খেলতে নিয়ে যান। এরপর তাকে প্রথমে হত্যা করার পরিকল্পনা করলেও বড় ভাইয়ের পরামর্শে হত্যার বদলে কূপে ফেলে দেওয়া হয়ে। আর তার কাপড়ে রক্ত মাখিয়ে তা বাড়িতে বাবাকে দেখান এবং ইউসুফ (আ.)-কে নেকড়ে বাঘ খেড়ে ফেলেছে বলে উল্লেখ করেন। বাবা হযরত ইয়াকুব (আ.) এ ঘটনায় শোকে মুষড়ে পড়েন এবং পুত্রশোকে কাঁদতে কাঁদতে চোখ সাদা এবং অন্ধ হয়ে যান। পবিত্র কোরআনের সূরা ইউসুফের ৮ থেকে ১৮ নম্বর আয়াতে এ ঘটনার বর্ণনা রয়েছে।

যখন মিশরের দাস-দাসী বিক্রির হাটে সুদর্শন ইউসুফ (আ.)-এর আগমনে সাড়া ফেলে দেয় এবং তার মূল্য ক্রমেই বৃদ্ধি পেতে থাকে। সবশেষে ইউসুফ (আ.)-এর ওজনের সমপরিমাণ সোনা,মৃগনাভী এবং রেশমি বস্ত্রের বিনিময়ে তাকে কিনে নেন ‘অজিজে মিসর’ অর্থাৎ মিসরের অর্থ ও খাদ্যমন্ত্রীতুল্য রাজসভার একজন সদস্য। কোনো কোনো বর্ণনায় তাকে মিসরের তৎকালীন আমালেকা জাতীয় সম্রাট বায়য়াদ ইবনে ওয়াসাদের অর্থমন্ত্রী ‘কিতফি’ কিংবা ‘ইতফি’ বলে উল্লেখ করা হয়। তিনি তাকে তার স্ত্রী জুলায়খার হাতে সমর্পণ করেন। সে তার স্ত্রীকে ইউসুফ (আ.)-এর প্রতি বিশেষ যত্নবান হওয়ার নির্দেশ দেন এবং এই ইউসুফ (আ.) তাদের বিশেষ উপকারে আসবেন বলে প্রত্যাশা করেন। এভাবেই ইউসুফ (আ.) এবং জুলেখার পরিচয় হয়।
বিশ্বে যিনি জোসেফ নামে খ্যাত, মুসলিম আর ইহুদীদের কাছেই তিনি নবী হযরত ইউসুফ (আ)- অনিন্দ্য সুন্দর যে পুরুষ তিন ধর্মের মানুষের কাছেই সম্মানিত। এ তিন ধর্মের পবিত্র গ্রন্থ মোতাবেক, হযরত ইউসুফ (আ) হলেন সেই ব্যক্তি যার মাধ্যমে ইসরাইল জাতি স্থান লাভ করে মিসরে কিন্তু তাঁর আজ ফকির তো কাল রাজা হবার যে নাটকীয় ঘটনা-সেটি জনবিদিত। আর সেই সাথে জননন্দিত হলো ইউসুফ-জুলেখার কাহিনী।

পবিত্র কোরআনে হযরত ইউসুফ (আ.)-কে নিয়ে সর্বাধিক আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর ঘটনার নেপথ্যে থাকা প্রধান দুই চরিত্রের নাম সরাসরি উল্লিখিত হয়নি। সূরা ইউসুফে হযরত ইউসুফ (আ.)-কে ক্রয়কারীকে ‘আজিজ’ বা মন্ত্রী হিসেবে এবং তার স্ত্রীকে ‘আজিজের স্ত্রী’ বা ‘তার স্ত্রী’ হিসেবে সম্বোধন করা হয়েছে। তবে তাফসির এবং ঐতিহাসিক বর্ণনা মতে,এই আজিজের স্ত্রীই হলেন ইতিহাস-খ্যাত ‘জুলেখা’। আবার অনেকের মতে,তাঁর প্রকৃত নাম রঙ্গিল আর উপাধি হলো জুলেখা।
জুলেখার ঘরেই কৈশোর পেরিয়ে যুবক হয়ে ওঠেন ইউসুফ (আ.)। জুলেখা ক্রমেই যুবক ইউসুফ (আ.)-এর প্রতি আসক্ত হযে পড়েন। মূর্তি উপাসক জুলেখা তার ঘরে থাকা মূর্তির সামনে অন্যায় আবদার করতে ভয় পেতেন বলে কাপড় দিয়ে মূর্তির চোখ ঢেকে দিয়ে ইউসুফ (আ.)-কে নানাভাবে প্রলুব্ধ করতে সচেষ্ট ছিলেন। অন্যদিকে আল্লাহর একাত্ববাদে বিশ্বাসী ইউসুফ (আ.) আল্লাহ প্রদত্ত ইমানের শক্তিতে সব ধোঁকা ও প্রলোভনের ঊর্ধ্বে ছিলেন এবং সব সময় জুলেখাকে এ পথ ছাড়ার অনুরোধ জানান। কিন্তু ইউসুফ (আ.)-এর প্রেমে পাগল জুলেখা ছিলেন একরোখা।

বৈমাত্রেয় ভাইদের চক্রান্তে কূপে নিক্ষিপ্ত হওয়ার পর মিশরগামী ব্যবসায়ী কাফেলার মাধ্যমে কূপ থেকে উদ্ধার পান। অতঃপর ভাইয়েরা কাফেলার নিকট গোলাম হিসেবে ১৮ দিরহামের বিনিময়ে বিক্রি করে দেন। উক্ত কাফেলা ইউসুফ (আ)কে মিশরের উজিরের নিকট বিক্রয় করে দেয়। মিশরের উজিরের নিকট লালিতপালিত হন তিনি। যখন ইউসুফ (আ) যৌবনে পদার্পণ করেন, তখন তার স্ত্রী জুলেখা তাকে ফুসলাইতে থাকেন। একদিন জুলেখা ঘরের সাতটি দরজা বন্ধ করে কুপ্রস্তাব দেন। হযরত ইউসুফ (আ) জুলেখার কুপ্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে দৌড় দিলে এক এক করে সাতটি বন্ধ দরজা খুলে যায়। সর্বশেষ দরজা খোলার পূর্বে জুলেখা ইউসুফ (আ)-এর পিছন থেকে তার জামা টেনে ধরলে সেই জামা ছিঁড়ে যায়।

সূরা ইউসুফের ২৩ নং আয়াত অনুসারে একদা জুলেখা ইউসুফ (আ.)-কে ঘরে পেয়ে দরজা বন্ধ করে দেন এবং তার প্রতি আহ্বান জানান কিন্তু ইউসুফ (আ.) মহান আল্লাহ প্রদত্ত জ্ঞান, ধৈর্য, ইমান এবং ভীতির কারণে তা প্রত্যাখ্যান করেন। তাফসির ও আরবি সাহিত্যমতে, এ সময় হজরত ইউসুফ (আ.) আসন্ন বিপদ থেকে বাঁচতে ঘরের ছাদের দিকে দৃষ্টি দিলে অলৌকিকভাবে আরবি লেখা দেখতে পান। এ ছাড়াও ঘরে মূর্তির দিকে তাকিয়ে তিনি ‘আজিজ’-এর প্রতিচ্ছবি দেখতে পান এবং ঘরের দরজায় আজিজের উপস্থিতি অনুভব করেন। এরপর হজরত ইউসুফ (আ.) নিজেকে পবিত্র রাখার জন্য বন্ধ দরজার দিকে দৌড়ে যান। এ সময় জুলেখা পেছন থেকে ইউসুফ (আ.)-কে জাপটে ধরলে তার পরিধেয় জামা পেছন থেকে ছিঁড়ে যায়। অলৌকিকভাবে এ সময় ঘরের বন্ধ দরজা (কারও মতে বাইরে থেকে বন্ধ দরজা) খুলে যায় এবং ইউসুফ (আ.) ও জুলেখা দরজার বাইরে জুলেখার স্বামী আজিজকে দেখতে পান। ঠিক তখনই চতুর জুলেখা তার ভোল পাল্টে ফেলেন এবং সূরা ইউসুফের ২৫ নং আয়াত অনুসারে এ সময় ইউসুফ (আ.)-এর বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ দিযে তাকে কারাগারে পাঠানো বা অন্য কোনো কঠিন শাস্তির দাবি করেন। ২৬ নং আয়াতে বর্ণিত, এ সময় ইউসুফ (আ.) প্রকৃত সত্য তুলে ধরেন এবং জুলেখার পরিবারের একজন সঠিক সাক্ষ্য প্রদান করেন। পবিত্র কোরআনে এই সাক্ষ্য প্রদানকারীর বিস্তারিত পরিচয় নেই। তবে তাফসির এবং প্রচলিত বর্ণনা অনুসারে এই সাক্ষী ছিলো একটি নিতান্ত কন্যাশিশু, যার মুখে তখনো স্পষ্ট করে কথা ফোটেনি।

বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়,যে ঘর থেকে ইউসুফ (আ.) বাইরে চলে আসতে চাচ্ছিলেন,সেই ঘরের দরজাগুলো তালাবদ্ধ ছিলো। তিনি দৌড়ে দরজায় পৌঁছলে নিজ থেকেই দরজাগুলো খুলে নিচে পড়ে গেলো। তাঁরা দুজনই ঘর থেকে বের হতেই সেখানে মনিব আজিজকে দাঁড়ানো দেখতে পান। এমন অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতিতে তড়িঘড়ি স্ত্রী জুলায়খা গল্প বানিয়ে স্বামীকে বলতে শুরু করেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত ধুরন্ধর নারী। তিনি নিজের অপরাধের দায়ভার ইউসুফ (আ.)-এর কাঁধে চাপিয়ে দিলেন। তিনি বললেন,‘তোমার কেনা গোলাম হয়েও সে আমার ইজ্জত হরণের চেষ্টা করেছে।এর বিরুদ্ধে কঠিন ব্যবস্থা নিতে হবে। তাকে জেলবন্দি করো অথবা কঠোর শাস্তির মুখোমুখি করো।’

আলোচ্য আয়াত থেকে কয়েকটি বিষয় জানা যায়। প্রথমত,যে জায়গায় গুনাহের কাজে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে, সেই জায়গা পরিত্যাগ করা উচিত। ইউসুফ (আ.) ওই কক্ষ থেকে পালিয়ে গিয়ে সেই নজির স্থাপন করেছেন। দ্বিতীয়ত, সর্বাবস্থায় আল্লাহর আনুগত্য প্রকাশ করা মানুষের আবশ্যকীয় কর্তব্য। কখনো কখনো এর ফলাফল বাহ্যিকভাবে দেখা যায় না। তাতে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। ফলাফল দেওয়ার মালিক আল্লাহ। বান্দার কাজ হলো, নিজের শ্রম ও সাধনাকে আল্লাহর পথে পরিচালিত করা। ইউসুফ (আ.) আলোচিত কক্ষের সব দরজা-জানালা বন্ধ জেনেও সেখান থেকে বের হওয়ার উদ্দেশ্যে দৌড় দিয়েছেন। আল্লাহ তা’য়ালা দরজাগুলো খুলে দিয়ে তাঁকে সাহায্য করেছেন। এতে বোঝা যায়,বান্দার পক্ষ থেকে আগে উদ্যোগ ও সর্বোচ্চ সাধনা পাওয়া গেলে আল্লাহর সাহায্য তাৎক্ষণিকই মেলে। পবিত্র কোরআনে এসেছে, ‘আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় আসন্ন। মু’মিনদের (সে বিষয়ে) সুসংবাদ দাও।’ (সূরা : সাফ্ফ,আয়াত-১৩)

হযরত মুহাম্মদ (সা.) হাদিসে কুদসীতে বলেন,আল্লাহ তা‘য়ালা স্বীয় ফেরেশতামন্ডলীকে বলেন, আমার বান্দা যখন কোনো সৎকর্মের আকাংখা করে,তখন তার ইচ্ছার কারণে তার আমলনামায় একটা নেকী লিখে দাও। যদি সে সৎকাজটি সম্পন্ন করে, তবে দশটি নেকী লিপিবদ্ধ কর।পক্ষান্তরে যদি কোনো পাপকাজের ইচ্ছা করে, অতঃপর আল্লাহর ভয়ে তা পরিত্যাগ করে,তখন পাপের পরিবর্তে তার আমলনামায় একটি নেকী লিখে দাও। আর যদি পাপকাজটি সে করেই ফেলে, তবে একটির বদলে একটি গোনাহ লিপিবদ্ধ কর’। অতএব ইউসুফ-এর অন্তরে অনিচ্ছাকৃত অপরাধ প্রবণতা সৃষ্টির আশংকাটি কেবল ধারণার পর্যায়ে ছিলো। সেটা ছগীরা বা কবীরা কোনরূপ গোনাহের অন্তর্ভুক্ত ছিলো না। নিঃসন্দেহে ইউসুফ ছিলেন নির্দোষ ও নিষ্পাপ এবং পূত চরিত্রের যুবক।

(১) ইউসুফের কাহিনীতে একথা পূর্ণভাবে প্রতিভাত হয়েছে যে, আল্লাহ পাক তাঁর প্রিয় বান্দাদেরকেই পরিণামে বিজয়ী করেন। এই বিজয় তো আখেরাতে অবশ্যই। তবে দুনিয়াতেও হ’তে পারে। (২) আল্লাহর কৌশল বান্দা বুঝতে পারে না। যদিও অবশেষে আল্লাহর কৌশলই বিজয়ী হয়। যেমন অন্ধকূপে নিক্ষেপ করে অতঃপর বিদেশী কাফেলার কাছে ক্রীতদাস হিসাবে বিক্রি করে দিয়ে ইউসুফের ভাইয়েরা নিশ্চিন্ত হয়ে ভেবেছিলো যে,আপদ গেলো কিন্তু আল্লাহ তাঁর নিজস্ব কৌশলে ইউসুফকে দেশের সর্বোচ্চ পদে আসীন করলেন এবং ভাইদেরকে ইউসুফের কাছে আনিয়ে অপরাধ স্বীকারে বাধ্য করলেন’ (ইউসুফ ৯১)। যেটা ইউসুফ নিজে কখনোই পারতেন না। (৩) সর্বাবস্থায় আল্লাহর ওপরে ভরসা করা ও সুন্দরভাবে ধৈর্য ধারণ করাই হলো আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের বৈশিষ্ট্য। সেজন্যেই দেখা গেছে যে, ইউসুফ (আ.) জেলে গিয়েও সর্বদা আল্লাহর ওপরে ভরসা করেছেন ও সুন্দরভাবে ধৈর্য ধারণ করেছেন। অন্যদিকে পিতা ইয়াকূব (আঃ) সন্তান হারিয়ে পাগলপরা হলেও তাঁর যাবতীয় দুঃখ ও অস্থিরতা আল্লাহর নিকটে পেশ করে ধৈর্য ধারণ করেছেন’ (ইউসুফ ৮৬)। (৪) নবীগণ মানুষ ছিলেন। তাই মনুষ্যসূলভ প্রবণতা ইয়াকূব ও ইউসুফের মধ্যেও ছিলো। ইউসুফের শোকে ইয়াকূবের বিরহ-বেদনা এবং আযীযের গৃহে চরিত্র বাঁচানো কঠিন হবে বিবেচনায় ইউসুফের কারাগারকে বেছে নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশের মধ্যে উপরোক্ত দুর্বলতার প্রমাণ ফুটে ওঠে। কিন্তু তাঁরা সর্বাবস্থায় আল্লাহর প্রতি নিবিষ্টচিত্ত থাকার কারণে আল্লাহর অনুগ্রহে নিষ্পাপ থাকেন। বস্তুতঃ আল্লাহ তাঁর প্রত্যেক তাক্বওয়াশীল বান্দার প্রতি একইরূপ অনুগ্রহ করে থাকেন। (৫) ইউসুফের কাহিনী কেবল তিক্ত বাস্তবতার এক অনন্য জীবন কাহিনী নয়। বরং বিপদে ও সম্পদে সর্বাবস্থায় আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা ও তাঁর উপরে একান্ত নির্ভরতার এক বাস্তব দলীল। (৬) ইউসুফের কাহিনীর সার-নির্যাস হলো ‘তাওহীদ’ অর্থাৎ ‘তাওহীদে ইবাদত’। কারণ এখানে বাস্তব ঘটনাবলী দিয়ে প্রমাণ করে দেওয়া হয়েছে যে, কেবল আল্লাহর স্বীকৃতিই যথেষ্ট নয়,বরং জীবনের সকল ক্ষেত্রে তাঁর দাসত্ব করা ও তাঁর বিধান মেনে চলার মধ্যেই বান্দার প্রকৃত মঙ্গল ও সার্বিক কল্যাণ নির্ভর করে। যেমন ইউসুফের সৎ ভাইয়েরা আল্লাহকে মানতো কিন্তু তাঁর বিধান মানেনি বলেই তারা চূড়ান্তভাবে পরাজিত ও লজ্জিত হয়েছিলো। অথচ ইউসুফ অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্টের মধ্যেও আল্লাহর দাসত্বে ও তাঁর বিধান মানায় অটল থাকায় আল্লাহ তাঁকে অনন্য পুরস্কারে ভূষিত করেন ও মহা সম্মানে সম্মানিত করেন। হযরত ইউসুফ (আ.) যেমন ছিলেন মহান নবীদের সন্তান, তেমনি ছিলেন উন্নত চরিত্র, সুদর্শন ও পবিত্র জীবনের অধিকারী একজন নবী।

হযরত ইউসুফ (আ.)এর প্রশংসায় আল্লাহ তা‘য়ালা সূরা আল-আন‘আমের ৮৩ হ’তে ৮৬ আয়াতে আল্লাহ পাক একই স্থানে পরপর ১৮ জন নবীর নাম উল্লেখ পূর্বক তাঁদের প্রশংসা করে বলেন, আমি তাদের প্রত্যেককে সুপথ প্রদর্শন করেছি,সৎকর্মশীল হিসাবে তাদের প্রতিদান দিয়েছি এবং তাদের প্রত্যেককে আমরা সারা বিশ্বের উপরে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি -(৮৬)। তারা প্রত্যেকে ছিলো পুণ্যবানদের অন্তর্ভুক্ত -(৮৫)। বস্তুতঃ ঐ ১৮ জন প্রশংসিত নবীর মধ্যে হযরত ইউসুফও রয়েছেন (আন‘আম ৬/৮৪)।

বালাখানা থেকে জেলখানায় নিক্ষিপ্ত হওয়ার পর এক করুণ অভিজ্ঞতা শুরু হলো ইউসুফের জীবনে। মনোকষ্ট ও দৈহিক কষ্ট, সাথে সাথে স্নেহান্ধ ফুফু ও সন্তানহারা পাগলপরা বৃদ্ধ পিতাকে কেন‘আনে ফেলে আসার মানসিক কষ্ট সব মিলিয়ে ইউসুফের জীবন হয়ে ওঠে দুর্বিষহ। কেন‘আনে ভাইয়েরা শত্রু,মিশরে যুলায়খা শত্রু। নিরাপদ আশ্রয় কোথাও নেই। অতএব জেলখানাকেই আপাতত: জীবনসাথী করে নিলেন এবং নিজেকে আল্লাহর আশ্রয়ে সমর্পণ করে কয়েদী সাথীদের মধ্যে দ্বীনের দাওয়াতে মনোনিবেশ করলেন। ইউসুফকে(আ:) আল্লাহ স্বপ্ন ব্যাখ্যা দানের বিশেষ জ্ঞান দান করেছিলেন। মিশরের বাদশাহ একটি স্বপ্ন দেখলেন এবং এটিই ছিলো আল্লাহর পক্ষ হতে ইউসুফের কারামুক্তির অসীলা। অতঃপর বাদশাহ তার সভাসদগণকে ডেকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা জিজ্ঞেস করেন। কিন্তু কেউ জবাব দিতে পারল না। অবশেষে তারা বাদশাহকে সান্ত¦না দেবার জন্য বলল,এগুলি ‘কল্পনা প্রসূত স্বপ্ন’ মাত্র। এগুলির কোন বাস্তবতা নেই। কিন্তু বাদশাহ তাতে স্বস্তি পান না। এমন সময় কারামুক্ত সেই খাদেম বাদশাহর কাছে তার কারাসঙ্গী ও বন্ধু ইউসুফের কথা বলল। তখন বাদশাহ ইউসুফের কাছে স্বপ্ন ব্যাখ্যা জানার জন্য উক্ত খাদেমকে কারাগারে পাঠালেন। সে স্বপ্নব্যাখ্যা শুনে এসে বাদশাহকে সব বৃত্তান্ত বললো। ইউসুফ-৪৩-৪৪ বাদশাহ বলল,আমি স্বপ্নে দেখলাম, সাতটি মোটা-তাজা গাভী,এদেরকে সাতটি শীর্ণ গাভী খেয়ে ফেলছে এবং সাতটি সবুজ শিষ ও অন্যগুলো শুষ্ক। হে সভাসদবর্গ! তোমরা আমাকে আমার স্বপ্নের ব্যাখ্যা বলে দাও, যদি তোমরা স্বপ্ন ব্যাখ্যায় পারদর্শী হয়ে থাক। ‘তারা বলল, এটি কল্পনা প্রসূত স্বপ্ন মাত্র। এরূপ স্বপ্নের ব্যাখ্যা আমাদের জানা নেই’ ইউসুফ ১২/৪৫-৪৬ -‘তখন দুজন কারাবন্দীর মধ্যে যে ব্যক্তি মুক্তি পেয়েছিল, দীর্ঘকাল পরে তার (ইউসুফের কথা) স্মরণ হল এবং বলল,আমি আপনাদেরকে এ স্বপ্নের ব্যাখ্যা বলে দেব,আপনারা আমাকে (জেলখানায়) পাঠিয়ে দিন। ‘অতঃপর সে জেলখানায় পৌঁছে বললো,ইউসুফ হে আমার সত্যবাদী বন্ধু! (বাদশাহ স্বপ্ন দেখেছেন যে,) সাতটি মোটাতাজা গাভী, তাদেরকে খেয়ে ফেলছে সাতটি শীর্ণ গাভী এবং সাতটি সবুজ শিষ ও অন্যগুলি শুষ্ক। আপনি আমাদেরকে এ স্বপ্নের ব্যাখ্যা বলে দিন, যাতে আমি তাদের কাছে ফিরে গিয়ে তা জানাতে পারি’। জবাবে ইউসুফ বললো,ইউসুফ ৪৭-৪৯ ‘তোমরা সাত বছর উত্তমরূপে চাষাবাদ করবে। অতঃপর যখন ফসল কাটবে, তখন খোরাকি বাদে বাকী ফসল শিষ সমেত রেখে দিবে। ‘এরপর আসবে দুর্ভিক্ষের সাত বছর। তখন তোমরা খাবে ইতিপূর্বে যা রেখে দিয়েছিলে, তবে কিছু পরিমাণ ব্যতীত যা তোমরা (বীজ বা সঞ্চয় হিসাবে) তুলে রাখবে। ‘এরপরে আসবে এক বছর,যাতে লোকদের উপরে বৃষ্টি বর্ষিত হবে এবং তখন তারা (আঙ্গুরের) রস নিঙড়াবে (অর্থাৎ উদ্বৃত্ত ফসল হবে)’ ঐ খাদেমটি ফিরে এসে স্বপ্ন ব্যাখ্যা বর্ণনা করলে বাদশাহ তাকে বললেন,‘তুমি পুনরায় কারাগারে ফিরে যাও এবং তাকে (অর্থাৎ ইউসুফকে) আমার কাছে নিয়ে এস। অতঃপর যখন বাদশাহর দূত তার কাছে পৌঁছলো। তখন ইউসুফ তাকে বলল, তুমি তোমার মনিবের (অর্থাৎ বাদশাহর) কাছে ফিরে যাও এবং তাঁকে জিজ্ঞেস কর যে,নগরীর সেই মহিলাদের খবর কি? যারা নিজেদের হাত কেটে ফেলেছিলো। আমার পালনকর্তা তো তাদের ছলনা সবই জানেন’।

হযরত ইউসুফ (আ.)-এর কাহিনী কোরআনে বর্ণিত হয়েছে। তিনি যখন মিশরের বাদশাহ্ তখন একবার ভীষণ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। এই সময় তার অন্যান্য ভ্রাতাগণ খাদ্যদ্রব্য ক্রয় করবার জন্য তার নিকট আগমন করে। হযরত ইউসুফ(আ.) তাদেরকে চিনতে পেরে স্বীয় পরিচয় প্রদান করেন। ইহার পর পিতা হযরত ইয়াকুব(আ.)-এর অন্ধচোখের ওপর ঢেলে দিবার জন্য তার একখানা জামা ভ্রাতাগণের নিকট অর্পণ করেন।(উল্লেখযোগ্য যে,পিতা হযরত ইয়াকুব (আ.) পুত্র হযরত ইউসুফ (আ.)-কে হারিয়ে কাঁদতে কাঁদতে চক্ষু অন্ধ করে ফেলেছিলেন)। আরও বল্লেন,তাদের সপরিবারে তার নিকট চলে আসতে। ইউসুফ (আ.) ভ্রাতাগণকে বিদায় করলেন। উক্ত জামার বরকতে পিতা ইয়াকুবের অন্ধ চোখ ভালো হয়ে গেলো। অতঃপর তারা সকলেই সপরিবারে মিসরে পৌঁছিয়া হযরত ইউসুফের সহিত মিলিত হলেন। হযরত ইউসুফ (আ.)পিতা ইয়াকুব (আ.)ও তার খালাকে সম্মার্থে রাজসিংহাসনে উপবেশন করলেন। ভ্রাতাগণ তাঁর সম্মানার্থে সেজদা করলো।সেই জমানায় সালামের পরিবর্তে সেজদার প্রচলিত ছিলো।

তিনি জানতেন যে, এ দুর্ভিক্ষ সাত বছর স্থায়ী হবে এবং আশপাশের রাজ্যসমূহে বিস্তৃত হবে। তাই সংরক্ষিত খাদ্যশস্য খুব সতর্কতার সাথে ব্যয় করা শুরু করলেন। তিনি ফ্রি বিতরণ না করে স্বল্পমূল্যে খাদ্য বিতরণের সিদ্ধান্ত নেন। সেই সাথে মাথাপ্রতি খাদ্য বিতরণের একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ নির্ধারণ করে দেন। তাঁর আগাম হুঁশিয়ারি মোতাবেক মিসরীয় জনগণের অধিকাংশের বাড়ীতে সঞ্চিত খাদ্যশস্য মওজূদ ছিলো। ফলে পার্শ্ববর্তী দুর্ভিক্ষপীড়িত রাজ্যসমূহ থেকে দলে দলে লোকেরা মিসরে আসতে শুরু করে। ইউসুফ (আ.) তাদের প্রত্যেককে বছরে এক উট বোঝাই খাদ্য-শস্য স্বল্প মূল্যের বিনিময়ে প্রদানের নির্দেশ দেন। অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হওয়ার কারণে খাদ্য বিতরণের তদারকি ইউসুফ (আ.) নিজেই করতেন। এতে ধরে নেওয়া যায় যে,খাদ্য-শস্যের সরকারী রেশনের প্রথা বিশ্বে প্রথম ইউসুফ (আ.)-এর হাতেই শুরু হয়।
হযরত ইয়াকূব (আ.) মিশরে পুত্র ইউসুফের সাথে ১৭ বছর মতান্তরে ২০ বছরের অধিককাল অতিবাহিত করেন। অতঃপর ১৪৭ বছর বয়সে সেখানেই ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে অছিয়ত করে যান যেনো তাঁকে বায়তুল মুক্বাদ্দাসের নিকটবর্তী হেবরন মহল্লায় পিতা ইসহাক ও দাদা ইবরাহীম (আ.)-এর পাশে সমাহিত করা হয় এবং তিনি সেখানেই সমাধিস্থ হন। যা এখন ‘খলীল’ মহল্লা বলে খ্যাত। হযরত ইউসুফ (আ.) ১১০ বছর বয়সে মিসরে ইন্তেকাল করেন এবং তিনিও হেবরনের একই স্থানে সমাধিস্থ হওয়ার জন্য সন্তানদের নিকটে অছিয়ত করে যান। এর দ্বারা বায়তুল মুক্বাদ্দাস অঞ্চলের বরকত ও উচ্চ মর্যাদা প্রমাণিত হয়। হযরত ইয়াকূব-এর বংশধরগণ সকলে ‘বনু ইসরাঈল’ নামে খ্যাত হয়। তাঁর বারো পুত্রের মধ্যে মাত্র ইউসুফ নবী হয়েছিলেন। তাঁর রূপ-লাবণ্য ছিলো অতুলনীয়।

মিশরের প্রতিটি মানুষ,বাচ্চা থেকে শুরু করে বৃদ্ধ পর্যন্ত সবাই ইউসুফ (আ.)-কে আল্লাহ তা’য়ালার রহমত মনে করতেন। যখন ইউসুফ (আ.) মারা যান, তখন সবাই চাইছিলেন তার কবর মোবারক যেনো তাদের মহল্লায় বানানো হয়। যাতে তাদের উপর আল্লাহর তরফ থেকে রহমত এবং বরকত বর্ষিত হয়। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হলো যে, ইউসুফ (আ.) এর দেহকে কফিনে ভরে নীল নদে দাফন করা হবে। যাতে নীল নদের পানি তার দেহ মোবারক ছুঁয়ে সে পানি সমস্ত ঘরে ঘরে পৌঁছায়। যেনো সবার উপরে তার জন্য আল্লাহ তা’য়ালার পক্ষ থেকে রহমত বর্ষিত হয়। তারপর ইউসুফ(আ.) এর দেহ মোবারক সেই অনুযায়ী নীল নদে দাফন করা হলো। হযরত ইউসুফ (আ.) মৃত্যুর আগে বলেছিলেন যে,আমি হযরত জিবরাইল (আ.) এর কাছ থেকে শুনেছি যে, এমন এক সময় আসবে যখন আমার পরিবার এখান থেকে হিজরত করে অন্য জায়গায় চলে যাবে। তখন তোমরা আমার শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী আমার কবরকে সঙ্গে নিয়ে যাবে এবং আমার বাবা, দাদা এবং বড় দাদার পাশে দাফন করে দিও। এভাবেই দিন কাটতে লাগলো এবং সময় বদলাতে লাগলো। এরপর মিশরের নতুন বাদশাহ বনি ইসরাইলের ওপর অমানবিক নির্যাতন শুরু করলো। তখন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সেই অত্যাচার শেষ করার জন্য কয়েক শত বছর পর তার নবী মুসা (আ.)-কে প্রেরণ করলেন। মুসা (আ.) যখন ফেরাউনের শাসন ব্যবস্থা ধ্বংস করে দেয় এবং মিশর থেকে তার সম্প্রদায়কে নিয়ে চলে যাচ্ছিলেন, তখন জিবরাইল (আ.) নাজিল হলেন এবং বললেন, আল্লাহ তা’য়ালার আদেশ ইউসুফ (আ.) এর ইচ্ছা পূরণ করো। ইউসুফ (আ.) মারা যাওয়ার আগে বলে গিয়েছিলেন যে, আমার সম্প্রদায় যখন এখান থেকে হিজরত করবে তখন যেন আমার দেহ সঙ্গে করে নিয়ে আমার বাপ, দাদার কবরের পাশে দাফন করা হয়। তখন মুসা (আ.) তার সঙ্গীদের জিজ্ঞেস করলেন যে, কে এমন আছে যিনি জানেন যে,ইউসুফ (আ.) এর কবর কোথায় দাফন করা রয়েছে? তখন এক বৃদ্ধা নারী বললেন, আমি জানি ইউসুফ (আ.) এর কবর কোথায় রয়েছে। তারপর সেই বৃদ্ধা মুসা (আ.)-কে নীল নদের তীরে নিয়ে গেলেন। এবং তখনই ইউসুফ (আ.) এর কফিনে ভরা দেহ নীল নদ থেকে বের করে তাদের সঙ্গে ফিলিস্তিনি নিয়ে পৌঁছে গেলেন। প্রায় চারশত বছর পর হজরত ইউসুফ (আ.) ইচ্ছা পূরণ হয়ে তাঁকে তার বাবা, দাদা ও বড় দাদার পাশেই দাফন করা হয়।

ইউসুফকে আল্লাহ সম্ভবতঃ ছহীফা সমূহ প্রদান করেছিলেন, যেমন ইতিপূর্বে ইবরাহীম (আ.)-কে প্রদান করা হয়েছিলো (আ‘লা ৮৭/১৯)। আল্লাহ তাঁকে নবুয়ত ও হুকূমত উভয় মর্যাদায় ভূষিত করেছিলেন। মানুষ তাঁর প্রশংসায় পঞ্চমুখ থাকলেও মিসরবাসী সকলে তাঁর দ্বীন কবুল করেনি। উক্ত প্রসঙ্গে আল্লাহ ইউসুফের প্রশংসা করেন এবং মানুষের সন্দেহবাদের নিন্দা করে বলেন, ‘ইতিপূর্বে তোমাদের কাছে ইউসুফ সুস্পষ্ট প্রমাণাদিসহ আগমন করেছিল। অতঃপর তোমরা তার আনীত বিষয়ে সর্বদা সন্দেহ পোষণ করতে থাক। অবশেষে যখন সে মারা গেলো,তখন তোমরা বললে, আল্লাহ ইউসুফের পরে কখনো আর কাউকে রাসূল রূপে পাঠাবেন না (অথচ রিসালাতের ধারা অব্যাহত ছিল)। আল্লাহ এমনিভাবে সীমালংঘনকারী ও সন্দেহবাদীদের পথভ্রষ্ট করে থাকেন’ (মু’মিন ৪০/৩৪)।
হযরত ইউসুফ (আ.) অত্যন্ত সৎকর্মশীল ও ন্যায়বান ব্যক্তি ছিলেন। আল্লামা ওহাবা জুহাইলি (রহ.) লিখেছেন,পূর্ণ যৌবন থাকে ৩০ থেকে ৪০ বছরের মাঝামাঝি সময়ে। তাই ইউসুফ (আ.)-এর নবী হওয়ার সময়ের বয়স নিয়ে মতভেদ দেখা যায়। ইবনে আব্বাস ও মুজাহিদ (রহ.) বলেছেন, ৩৩ বছর বয়সে ইউসুফ (আ.) নবী হয়েছেন। হাসান বসরি (রহ.)-এর মতে, তিনি ৪০ বছর বয়সে নবী হয়েছেন।

হযরত ইউসুফ (আ.) প্রথম জীবনে ক্রীতদাস,পরবর্তীতে জেলের আসামি এবং শেষ জীবনে মিসরের ক্ষমতাধর রাজকর্মচারী বা মন্ত্রী ছিলেন বলে তথ্য পাওয়া যায়। এর বাইরে তিনি ছিলেন আল্লাহ প্রদত্ত বিশেষ জ্ঞানের অধিকারী। স্বপ্নের ব্যাখ্যা প্রদানের দুর্লভ ক্ষমতা বা দক্ষতা তাকে প্রসিদ্ধ করে তোলে। তিনি নবী হিসেবে তৎকালে মূর্তি উপাসকদের মাঝে এক আল্লাহর একাত্ববাদ প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট ছিলেন।

হযরত ইউসুফ তার জীবনের বেশীর ভাগ সময়ই মিসরে কাটায়েছেন। ১১০ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন। তার বংশের লোকদের থেকে তিনি প্রতিশ্রুতি নিয়েছিলেন,তাকে যেনো ফিলিস্তীনে দাফন করা হয়। বনী-ঈসরাইলীরা যেনো তাদের পবিত্র ভূমি ফিলিস্তীনে ফিরে যায়। উনার মৃত্যু হলে তার শরীর সিন্ধুকে মমী করে রাখা হয়।হযরত মুসার জমানায় বনী-ঈসরাইলীরা যখন মিসর হতে বের হয়, তখন সিন্ধুকটিকে নিয়ে ফিলিস্তীনে দাফন করে। হামারী বলেন,হযরত ইউসুফের কবর ফিলিস্তীনের নাবলুসের অন্তর্গত ‘বালাতা’ গ্রামে। কবরটা একটা গাছের নিচে বিদ্যমান আছে।

লেখকঃ গবেষক,সাবেক জাতীয় ক্রীড়াবিদ,
চেয়ারম্যান গ্রিন ক্লাব,মানিকগঞ্জ,সাংবাদিক ও কলামিস্ট