যাকাত আদায় করা স্বচ্ছল মুসলমানের প্রতি সৃষ্টিকর্তার অলঙ্ঘনীয় নির্দেশ

 

মো. আলতাফ হোসেনঃ
যাকাত শব্দের অর্থ পবিত্র করা, পরিশুদ্ধ করা বা প্রবৃদ্ধি দান করা। শরীয়তের ভাষায়, সুনির্ধারিত সম্পদ সুনির্ধারিত শর্তে তাঁর হকদারকে অর্পন করা।যাকাত হলো ইসলাম ধর্মের পঞ্চস্তম্ভের একটি। কুরআনের নামাজের পরেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসাবে উল্লেখ এই যাকাত। পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কুরআনে ‘যাকাত’ শব্দের উল্লেখ এসেছে ৩২ বার। প্রত্যেক স্বাধীন, পূর্ণ বয়স্ক মুসলমান নর নারীকে প্রতিবছর স্বীয় আয় ও সম্পত্তির একটি নির্দিষ্ট অংশ, যদি তা ইসলামী শরিয়ত নির্ধারিত সীমা (নিসাব পরিমাণ) অতিক্রম করে তবে, গরীব দুঃস্থদের মধ্যে বিতরণের নিয়মকে যাকাত বলা হয়। সাধারণত নির্ধারিত সীমাতিক্রমকারী সম্পত্তির ২.৫ শতাংশ (২.৫%) বা (১/৪০) অংশ বছর শেষে বিতরণ করতে হয়। উল্লেখ্য, নিসাব পরিমাণ হলেই যাকাত কোনো ব্যক্তির ওপর ওয়াজিব হয় এবং তখন তার উপর ‘যাকাত’ নামক ফরয বর্তায়; অর্থাৎ যাকাত আদায় করা ফরয। ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের মধ্যে হজ্জ্ব এবং যাকাতই শুধুমাত্র শর্তসাপেক্ষ যে, তা সম্পদশালীদের জন্য ফরয বা আবশ্যিক হয়।
স্বাধীন পূর্ণবয়স্ক মুসলিম নর-নারীর কাছে নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকলে কতিপয় শর্তসাপেক্ষে তার উপর যাকাত ফরয হয়ে থাকে। যেমন-

১। নিসাব পরিমাণ সম্পদ: যাকাত ফরয হওয়ার প্রথম শর্ত হচ্ছে শরীয়ত নির্ধারিত সীমাতিরক্ত সম্পদ থাকা। সাধারণত ৫২.৫ তোলা রূপা বা ৭.৫ তোলা স্বর্ণ বা উভয়টি ৫২.৫ তোলা রূপার সমমূল্যের সম্পদ থাকলে সে সম্পদের যাকাত দিতে হয়।
২। সম্পদের ওপর পূর্ণ মালিকানা: সম্পদের ওপর যাকাত ওয়াজিব হওয়ার জন্য সম্পদের মালিকানা সুনির্দিষ্ট হওয়া আবশ্যক। অর্থাৎ সম্পদ মালিকের অধিকারে থাকা, সম্পদের ওপর অন্যের অধিকার বা মালিকানা না থাকা এবং নিজের ইচ্ছামতো সম্পদ ভোগ ও ব্যবহার করার পূর্ণ অধিকার থাকা। যে সকল সম্পদের মালিকানা সুস্পষ্ট নয়, সে সকল সম্পদের কোনো যাকাত নেই, যেমন: সরকারী মালিকাধীন সম্পদ। অনুরূপভাবে জনকল্যাণমূলক কাজের জন্য ওয়াকফকৃত সম্পদের ওপরও যাকাত ধার্য হবে না। তবে ওয়াকফ যদি কোনো ব্যক্তি বা গোত্রের জন্য হয়, তবে তার ওপর যাকাত দিতে হবে।
৩। মৌলিক প্রয়োজনরিক্ত সম্পদ থাকা: সারা বছরের মৌলিক প্রয়োজন মিটিয়ে যে সম্পদ উদ্বৃত থাকবে, শুধুমাত্র তার ওপরই যাকাত ফরয হবে।

৪। সম্পদ উৎপাদনক্ষম হওয়া: যাকাতের জন্য সম্পদকে অবশ্যই উৎপাদনক্ষম, প্রবৃদ্ধিশীল হতে হবে অর্থাৎ সম্পদ বৃদ্ধি পাবার যোগ্যতাই যথেষ্ট। যেমন: গরু, মহিষ, ব্যবসায়ের মাল, নগদ অর্থ ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে ক্রীত যন্ত্রপাতি ইত্যাদি মালামাল বর্ধনশীল। অর্থাৎ যে সকল মালামাল নিজের প্রবৃদ্ধি সাধনে সক্ষম নয়, সে সবের ওপর যাকাত ধার্য হবে না, যেমন: ব্যক্তিগত ব্যবহারের মালামাল, চলাচলের বাহন ইত্যাদি।
যাকাত ইসরামের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রোকন। ঈমানের পর সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য ইবাদত হলো নামাজ ও যাকাত। কুরআনে মজীদে বহু স্থানে নামাজ যাকাতের আদেশ করা হয়েছে এবং আল্লাহ্র অনুগত বান্দাদের জন্য অশেষ ছওয়াব, রহমত ও মাগফিরাতের পাশাপাশি আত্মশুদ্ধিরও প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। এক আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, “তোমরা সালাত আদায় কর এবং যাকাত প্রদান করো। তোমরা যে উত্তম কাজ নিজেদের জন্য অগ্রে প্রেরণ করবে তা আল্লাহ্র নিকটে পাবে। নিশ্চয়ই তোমরা যা করো আল্লাহ্ তা দেখছেন।” (সূরা বাকারা: ১১০)
অন্য আয়াতে যাকাতের গুরুত্বপূর্ণ সুফল বর্ণনা করে আল্লাহ্ তা’আলা বলেন, “তাদের সম্পদ থেকে সদকা গ্রহণ করুন, যার দ্বারা আপনি তাদেরকে পবিত্র করবেন এবং পরিশোধিত করবেন এবং আপনি তাদের জন্য দু’আ করবেন। আপনার দু’আ তো তাদের জন্য চিত্ত স্বস্তিকর। আল্লাহ্ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। (সূরা তাওবা: ১০৩)
সূরা নিসার ১৬২ নং আয়াতে আল্লাহ্ তা’আলা তার বান্দাদের জন্য ‘আজরুন আযীম’ এর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে- “এবং যারা সালাত আদায় করে, যাকাত দেয় এবং আল্লাহ্ ও পরকালে ঈমান রাখে আমি তাদেরকে মহা পুরস্কার দেবো।”
অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, “তোমরা সালাত আদায় করো, যাকাত দাও এবং রাসূলের আনুগত্য করো যাতে তোমরা অনুগ্রহভাজন হতে পারো।” (সূরা নুর-৫৬) ভূ-পৃষ্ঠে ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব লাভের পরও মুমিনদের অবস্থা কী তা জানতে চাইলে সালাত যাকাতই অগ্রগণ্য। (সূরা হাজ্জ্ব: ৪১)
“সৎ কর্মপরায়নদের বৈশিষ্ট্য ও কর্মের তালিকায় সালাত যাকাতে প্রসঙ্গ অনিবার্য।” (সূরা লুকমান: ৪)
মসজিদ আবাদকারীদের পরিচয় জানতে চাইলেও সালাত যাকাত তাদের অন্যতম বৈশিষ্ট। (সূরা তাওবা: ১৮)
কুরআনের দৃষ্টিতে প্রকৃত পুণ্যশীলদের পরিচয় যেখানে দেয়া হয়েছে সেখানে সালাত যাকাতের উল্লেখ এসেছে। (সূরা বাকারা: ১৭৭)
বিধর্মী কখন মুসলিম ভ্রাতৃত্বে শামিল হয় এ প্রশ্নের উত্তরে তাওবার সঙ্গে সালাত যাকাত ও উল্লেখিত (সূরা তাওবা: ১১)
কুরআন মাজীদ কাদের জন্য হেদায়েত ও শুভ সংবাদ দাতা এর উত্তর পেতে চাইলে সালাত যাকাত অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। (সূলা নামল:৩)
মুমিনদের বন্ধু কারা এই ডপ্রশ্নের উত্তরেও সালাত যাকাতের প্রসঙ্গ শামিল রয়েছে। (সূরা মায়েদা: ৫৫)
দ্বীনের মৌলিক পরিচয় পেতে চাইলে সালাত যাকাত ছাড়া পরিচয় দান অসম্ভব। (সূরা বাইয়েনা:৫)
কুরআন মাজীদের বিভিন্ন আয়ত থেকে পরিষ্কার জানা যায় যে, সালাত ও যাকাতের পাবন্দী ছাড়া আল্লাহ্র নৈকট্য অর্জনের প্রশ্নই অবান্তর। কুরআন মাজীদের বিভিন্ন আয়াতে যেখানে খাঁটি মুমিনের গুণ ও বৈশিষ্ট্য উল্লেখিত হয়েছে সেখানে সালাত যাকাতের কথা এসেছে অপরিহার্যভাবে। মোট কথা, এতো অধিক গুরুত্বের সঙ্গে সালাত যাকাত প্রসঙ্গে কুরআন মাজীদে এসেছে যে, এটা ছাড়া দ্বীন ও ঈমানের অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না। মুমিনের অন্তরের ঈমান সালাত যাকাতের বিশ^াসের ওপর এবং তার কর্মের ঈমান সালাত যাকাতের কর্মগত বাস্তবায়নের ওপর নির্ভরশীল। ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী (রা.) এর ভাষায়- “যাকাত শরীয়তের এমন এক অকট্য বিধান, যে সম্পর্কে দলীল প্রমানের আলোচনা নিষ্প্রেয়োজন। যাকাত সংক্রান্ত কিছু কিছু মাসআলায় ইমামদের মধ্যে মত ভিন্নতা থাকলেও মূল বিষয়ে, অর্থাৎ যাকাত ফরয হওয়া সম্পর্কে কোনো মতভেদ নেই। যাকাতের ফরযিয়তকে যে অস্বীকার করে সে ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে যায়।” (ফাতহুল বারী: ৩/৩০৯)
হাদিস শরীফে এসেছে, “যাকে আল্লাহ্ সম্পদ দিয়েছেন, কিন্তু সে তার যাকাত দেয় নি কিয়ামতের দিন ত া বিষধর সর্পরূপে উপস্থিত হবে এবং তা তার গলায় পেঁচিয়ে দেয়া হবে। সাপটি তার উভয় অধরপ্রান্তে দংশন করবে এবং বলবে আমিই তোমার ঐ ধন, আমিই তোমার পুঞ্জিভূত সম্পদ।” (সহীহ বুখারী)
যাকাতের যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়ে শরিয়তে বিশেষ বিধান রয়েছে। মূলত গরীব, দুঃখী, নিঃস্ব বা দেনায় জর্জরিত মুসলিম কিংবা অসহায় মুসাফির যাকাত পাবার যোগ্য। যারা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে যাকাত সংগ্রহ করে সত্যিকার দুঃখী মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়, তাদের কাছেও যাকাতের অর্থমূল্য দেয়া চলে। কেবলমাত্র যোগ্য ব্যক্তি ছাড়া অন্য কাউকে যাকাত দিলে তা গ্রহণ যোগ্য হবে না।
শরীয়ত মোতাবেক যারা যাকাত পাবার যোগ্য তারা হলেন,

১। ফকির যার নিসাব পরিমাণ সম্পদ নেই, ২। মিসকিন বা নিঃস্ব ব্যক্তি (যার কাছে একবেলা খাবারও নেই), ৩। ঋণগ্রস্ত মুসলিম, ৪। অসহায় মুসাফির, ৫। যাকাত উত্তোলন, সংরক্ষণ ও বন্টনের কার্যে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ, ৬। ইসলাম গ্রহণ করতে ইচ্ছুক অমুসলিম, ৭। নতুন মুসলিম যার ঈমান এখনো পরিপক্ক হয় নি, ৮। ক্রীতদাস/বন্দী মুক্তি
লক্ষ্য রাখতে হবে, ফকির বা মিসকিন যেনো মুসলমান হয় এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক না হয়।
যাকাত দিয়ে আপনি বাঁচাতে পারেন কারো জীবন; ফোটাতে পারেন তার প্রিয়জনের মুখে হাসি। হতে পারেন কারো বিপদের বন্ধু একই সাথে লাভ করতে পারেন স্রষ্টার সানিধ্য। তবে সবচেয়ে বড় বিষয় যেটি যাকাত আপনাকে এনে দেবে এক অসাধারণ তৃপ্তি। একজন মানবতাবাদী হিসেবে আরেকজন অসহায় মানুষের দুঃসময়ের বন্ধু হয়ে নিজের কাছে নিজে যে প্রশান্তি পাবেন- তার কোনো বিকল্প আছে কি? যাকাত বান্দাকে স্রষ্টার নিকটে আসতে সহায়তা করে। ইসলামকে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুকন বা স্তম্ভ হিসেবে যাকাত অত্যন্ত জরুরি। শুধুমাত্র স্রষ্টার সানিধ্য লাভই নয়, একে অপরের প্রতি সহানুভূতি বৃদ্ধি ও সমাজে ভ্রাতৃত্ব রোধ গঠনে অনন্য সাধারণ ভূমিকা পালন করে।
যাকাত আদায় করা স্বচ্ছল মুসলমানের প্রতি সৃষ্টিকর্তার অলঙ্ঘনীয় নির্দেশ। কোনো মুসলমানের স্বেচ্ছায় ও সজ্ঞানে এ নির্দেশ অমান্য করার অর্থই হলো আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের সাথে মুনাফেকী করা।

লেখকঃ সাবেক জাতীয় ক্রীড়াবিদ(কারাতে ব্লাক বেল্ট ১ম ড্যান),সভাপতি শারীরিক শিক্ষাবিদ সমিতি,চেয়ারম্যান গ্রিন ক্লাব, গবেষক,শিক্ষক,সাংবাদিক ও কলামিস্ট