যৌবন হারিয়ে মৃতপ্রায় খরস্রোতা মাহারি নদী

 

মো.আলতাফ হোসেন ঃঃ
ময়মনসিংহ জেলা বাংলাদেশের মধ্যাঞ্চলের ময়মনসিংহ বিভাগের একটি প্রশাসনিক অঞ্চল। অবস্থানগত কারণে এটি বাংলাদেশের বিশেষ শ্রেণীভুক্ত জেলা। এই জেলা ছিলো তৎকালীন ভারত উপ-মহাদেশের বৃহত্তম জেলা। এই ময়মনসিংহ জেলার আকার সময় সময় পরিবর্তিত হয়েছে। ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দে ময়মনসিংহ জেলা থেকে টাঙ্গাইল মহুকুমাকে পৃথক করে একটি জেলা উন্নীত করা হয়। ১৯৮০-এর দশকে আদি ময়মনসিংহ জেলার বিভিন্ন মহকুমা যথা জামালপুর,কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনাকে পৃথক পৃথক জেলায় উন্নীত করা হয়। এছাড়া জামালপুরের অন্তর্গত শেরপুরকেও একটি পৃথক জেলায় উন্নীত করা হয়। এর আগে ব্রিটিশ আমলে ময়মনসিংহ জেলার কিছু কিছু অংশ সিলেট, ঢাকা, রংপুর ও পাবনা জেলার অঙ্গীভূত করা হয়েছিলো। এই ভাবে ময়মনসিংহ জেলা যা কিনা ব্রিটিশ আমলে অবিভক্ত ভারতবর্ষের সর্ববৃহৎ জেলা ছিলো তার আকার ক্রমাগত সংকুচিত হয়ে আসে। সেই সাথে সংকুচিত হয়ে আসছে জেলার বহুসংখ্যক নদ-নদী। বিলীন হওয়ার পথে খরস্রোতা মাহারি নদীটি।
মাহারি নদী বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলার ময়মনসিংহ সদর ও ত্রিশাল উপজেলার একটি নদী। নদীটির দৈর্ঘ্য ৩৭ কিলোমিটার, প্রস্থ গড়ে ৬০ মিটার এবং প্রকৃতি সর্পিলাকার। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড বা “পাউবো” কর্তৃক মাহারি নদীর প্রদত্ত পরিচিতি নম্বর উত্তর-কেন্দ্রীয় অঞ্চলের নদী নং ৪৪।
মাহারি নদী ময়মনসিংহ সদর উপজেলার ঘাগড়া ইউনিয়নে সুতিয়া নদী থেকে উৎপত্তি লাভ করে একই জেলার ত্রিশাল উপজেলার মাঠাবাড়ি ইউনিয়ন অবধি প্রবাহিত হয়ে খিরু নদীতে পতিত হয়েছে। এই নদীতে সারাবছর পানিপ্রবাহ থাকে না এবং জোয়ারভাটা খেলে না। নদীটিতে শুধু বর্ষাকালে পানি প্রবাহিত হয়। পলির প্রভাবে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাচ্ছে।
ময়মনসিংহ জেলায় অনেকগুলো নদী আছে। সেগুলো হচ্ছে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদী, কাঁচামাটিয়া নদী, মঘা নদী, সোয়াইন নদী, বানার নদী,বাইলান নদী,দইনা নদী,পাগারিয়া নদী, সুতিয়া নদী, কাওরাইদ নদী, সুরিয়া নদী, আখিলা নদী, মিয়াবুয়া নদী, বাথাইল নদী, দেয়ার নদী, ভোগাই নদী,কাতামদারী নদী, সিরখালি নদী, বাড়েরা নদী, মগড়া নদী, বান্দসা নদী, খিরু নদী, বাজুয়া নদী, লালতি নদী, নরসুন্দা নদী, নিতাই নদী, কংস নদী, খাড়িয়া নদী, চোরখাই নদী, মালিজি নদী, ধলাই নদী, কাকুড়িয়া নদী, দেওর নদী, বাজান নদী,নাগেশ্বরী নদী, হিংরাজানি নদী, আয়মন নদী, দেওরা নদী, থাডোকুড়া নদী, মেদুয়ারি নদী, জলগভা নদী, মাহারী নদী।
খুব বেশি আগের কথা নয়, এই নদীতে সারা বছর নৌকা চলতো, মাছ পাওয়া যেতো, পানি টলটল করতো। কিন্তু এখন বর্ষাকালে দুইতিন মাস পানি থাকে। আর বাকি মাসগুলোতে পানি শুকিয়ে যায়। স্থানীয় লোকজন ধানের চাষ করেন, নয়তো কচুরিপানায় ভরা থাকে। শুধু মাহারি নদীর অবস্থাই যে এমন তা নয়, ময়মনসিংহ জেলার কাঁচামাটিয়া, খীরু, কংস, নরসুন্দাসহ ছোটবড় ৩৮টি নদীরই একই দশা। কোনোটা নাব্যতা হারিয়ে অস্তিত্ব সংকটে, কোনোটা দূষণের কবলে বাঁচার আকুতি জানাচ্ছে, আবার কোনোটা দখলের কবলে সৌন্দর্য হারিয়েছে। বছরের পর বছর পলি জমে নদীগুলো প্রায় ভরাট হয়ে গেছে। নদীগুলোর এমন রুগ্ন দশায় সাধারণ জনগণের জীবনমানেও বিরূপ প্রভাব পড়ছে। কৃষিক্ষেত্রে ফসল চাষে ব্যাপক ভূমিকা রাখত এই নদীগুলো। কিন্তু নদীতে পানি না থাকায় ভূগর্ভস্থ কল স্থাপন করে পানির চাহিদা মেটাতে হচ্ছে কৃষকদের। মাছও দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে পানির অভাবে। অথচ এই নদীগুলোতে মাছ ধরার মাধ্যমে অনেকে জীবিকা নির্বাহ করতেন। পাশাপাশি দৈনন্দিন আমিষের চাহিদা পূরণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত নদীগুলো। আর স্বল্প খরচে পণ্য পরিবহন ও যাত্রী চলাচলেও অনেক সুবিধা ছিলো। কিন্তু এখন আর সে উপায় নেই।
মৃতপ্রায় নদীগুলোর মধ্যে মাহারি নদীর অবস্থা সবচেয়ে করুণ। পানি দূষণের কারণে কালচে হয়ে গেছে। দুর্গন্ধ ছড়ানোয় নদীর পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া দুষ্কর। মাছসহ অন্যান্য জলজ প্রাণী মরে ভেসে উঠে। এই পানি এতটাই বিষাক্ত যে এখন আর স্থানীয় লোকজনও এই নদীতে নামার সাহস করেন না।
মাহারি নদী বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ময়মনসিংহ জেলার একটি নদী। এই নদীতে জোয়ারভাটা খেলে না। নদীটিতে সাধারণত বন্যা হয় না। নদী মাতৃক বাংলাদেশের মধ্য ময়মনসিংহ জেলা অন্যতম। এ জেলায় অনেক নদী ছিল। ব্যবসা বাণিজ্যের যাতায়াত ও যোগাযোগ হতো নদী পথ দিয়ে। হাজারও মানুষের জীবিকার অন্যতম মাধ্যম ছিলো নদী। জেলার সেই নদীগুলো আজ অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। সংকটে পড়েছে খরস্রোতা মাহারি নদীটি। নাব্যতা হারিয়ে বিলীন হয়ে গেছে ময়মনসিংহের অনেক নদী, খাল-বিল। নদীর বুক চিরে চলছে আবাদ ফসল। নির্মাণ করা হয়েছে ঘর বাড়িসহ নানা প্রতিষ্ঠান।
ময়মনসিংহের প্রধান নদ পুরাতন ব্রহ্মপুত্র। ব্রহ্মপুত্র নদ ঘিরেই ময়মনসিংহ শহরের পত্তন। একদা নদ ছিলো উত্তাল। বাংলাদেশের নদ-নদীর মধ্যে দৈর্ঘ্যে সর্ববৃহৎ এবং বিশ্বের ২২তম (২ হাজার ৮৫০ কিমি) এই ব্রহ্মপুত্রের অবস্থা এখন খুবই রুগ্ন। ভরা মৌসুমেও থাকে না যৌবন। শুষ্ক মৌসুমে ধু-ধু বালুচর জেগে উঠে স্থানে স্থানে নাব্য হারিয়ে এখন চরম সংকটে।
নদী সভ্যতার ধারক-বাহক। নদীর সাথে জড়িয়ে আছে একটি দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট। নদী ছাড়া আধুনিক সভ্যতা কোন দেশে গড়ে উঠেনি, ইতিহাস তাই বলে। ইউরোপের টেমস নদী না থাকলে লন্ডন শহর গড়ে উঠতো না। আর যমুনা নদী না থাকলে দিল্লি শহর গড়ে উঠত না। হুগলী নদীর দান হচ্ছে কলকাতা শহর। মিশরকে বলা নীল নদের দান। সর্বপরি বুড়ি গঙ্গা না থাকলে ঢাকা শহর গড়ে উঠত না কোনো দিন। আধুনিক যুগে ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে নদী বন্দরের গুরুত্ব এতটুকু কমেনি। যে বাণিজ্য কর থেকে রাষ্ট্র পরিচালিত হয় যুদ্ধ পরিচালনা করতে নৌ বন্দরের গুরুত্ব সর্বাধিক। আদিকাল থেকে অদ্যাবধি। যে দেশের নদী নালা যতো বেশি সেসব দেশে অর্থনীতি মজবুদ ও টেকসই। যে দেশে নদী নালা নেই সে দেশের মানুষ হতভাগা। নাব্য সংকট, কৃত্রিম বাধার সৃষ্টি, পলি জমা, অবৈধ দখলসহ নানা কারণে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে ময়মনসিংহের অর্ধশত নদ-নদী। ইতোমধ্যে বিলীন হয়ে গেছে অনেক নদী। বেশিরভাগ নদীর বুকজুড়ে এখন ফসলের ক্ষেত। মাছ পাওয়া যায় না। ত্রিশালের সুতিয়া, শিলা ও খিরু দক্ষিণ ময়মনসিংহের বড় নদী। এগুলো এখন ছোট খাল। ভালুকার সুতিয়া, খিরু ও শিমুলিয়ার দখলের কারণে অস্তিত্ব সংকটে। চোখের সামনে মরতে বসেছে একসময়ের খরস্রোতা মাহারি নদীটি। জানা গেছে, যৌবনের জলতরঙ্গে এক সময় উচ্ছ্বল ছিলো এসব নদী। সেই কারণে নদীর সঙ্গে এ অঞ্চলের মানুষের গভীর মিতালীও পুরনো। কিন্তুসময়ের স্রোতে নদীমাতৃক পরিচয়টাও যেন এখন বিলীন হবার পথে। এসব নদী মরে যেতে বসায় এ অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রাও বদলে যাচ্ছে। সৃষ্টি হচ্ছে পরিবেশ বিপর্যয়।
আমাদের জীবন, জীবিকা, সংস্কৃতি, শিল্প-সাহিত্য সবকিছুর সঙ্গে আমাদের নদীগুলো সম্পর্কযুক্ত। হাজার বছর ধরেই এসব নদ-নদী আমাদের কৃষি, প্রকৃতি ও অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করেছে। নদী রক্ষা না করলে তাই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রক্ষা পাবে না। এ জন্য নদী রক্ষাকে অগ্রাধিকার বিবেচনা করে সেই অনুযায়ী কাজ করতে হবে। এ জন্য সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। সরকারকে নদ-নদী বাঁচাতে খুব দ্রুত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। সরকারি-বেসরকারি প্রকল্পগুলোর কাজের গতি যেমন ত্বরান্বিত করতে হবে, তেমনি এসব কাজের জবাবদিহি বাড়াতে হবে। নদী দখল-দূষণের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের কঠোর শাস্তি দিতে হবে। দেশের স্বার্থে নদী রক্ষা করতে হবে। বাঁচাতে হবে দেশের সব নদী। সঠিক পরিচর্যা করতে হবে। ড্রেজিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।নদীর পানিপ্রবাহ ঠিক রাখা এবং ভাঙন প্রতিরোধে বড় নদীতে ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের পুরো বছরের পরিকল্পনা থাকতে হবে। নদীমাতৃক বাংলাদেশের প্রকৃতি,জনজীবন, চাষাবাদ প্রায় সবই নদীনির্ভর। তাই বলা হয়, নদী না বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে না, অর্থাৎ বাংলাদেশের জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে। অথচ বাংলাদেশ সে পথেই এগিয়ে চলেছে। বহু নদী এরই মধ্যে মরে গেছে। বহু নদী মৃত্যুর পথে। নদীগুলোর গভীরতা কমে যাওয়ায় তখন বন্যা ও জলাবদ্ধতা অবধারিত হয়ে পড়ে। হাজার হাজার কোটি টাকার ফসল নষ্ট হয়। প্রধানমন্ত্রী বছরব্যাপী নদী খননের নির্দেশনা দিয়েছেন। তার এই নির্দেশনাকে গুরুত্ব দিয়ে প্রকল্প নিতে হবে। নদী বাঁচাতে হবে। নদী বাঁচলেই বাংলাদেশ বাঁচবে। নদী বাংলাদেশের প্রাণ। কাজেই দেশের প্রাণশক্তি রক্ষা করতে হলে নদী দখল বন্ধ ও নদী দূষণরোধ করতেই হবে। অর্থাৎ দেশে মধ্যে প্রবহমান অন্যান্য নদীর মতো খরস্রোতা মাহারি নদীকে বাঁচানোই এখন সময়ের দাবি।

লেখকঃ গবেষক,সাবেক জাতীয় ক্রীড়াবিদ,
চেয়ারম্যান গ্রীণ ক্লাব,মানিকগঞ্জ,সাংবাদিক ও কলামিস্ট