রাগ বা ক্রোধ এমন একটি ঘূর্ণিঝড় যা মস্তিষ্কের বাতি নিভিয়ে দেয়

মো.আলতাফ হোসেন ঃঃ
রাগ বা ক্রোধ কখনো কোনো বয়সেই সুখের নয়। রাগ বা ক্রোধ ষড়ঋপুর মধ্যে অন্যতম। তীব্র অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশকে রাগ বা ক্রোধ বলে। এই আবেগের প্রকাশে মুখভঙ্গী বিকৃত হয়ে যায় এবং অপরের কাছে তা ভীতির সঞ্চার করে। অতিরিক্ত ক্রোধের ফলে বাড়তে পারে রক্তচাপ ও হৃদস্পন্দন। রাগ বা ক্রোধ এমন একটি ঘূর্ণিঝড় বা মস্তিষ্কের বাতি নিভিয়ে দেয়। হার্টঅ্যাটাক বা মস্তিষ্কে রক্তক্ষরনের মতো ঘটনাও ঘটতে পারে। রেগে থাকলে একজন ব্যক্তির শরীরে স্ট্রোক হরমোনের নি:সরণ বেড়ে যায়। রক্তের সুগারের তারতম্য শুরু হয়। যারা প্রায়ই রেগে যান তাদের শুভ বুদ্ধির চর্চাও কমে যায়। অতিরিক্ত ক্রোধের ফলে পাকস্থলীয় কোষ উজ্জিবিত হয়ে পরে এবং এসিড নির্গমনের পরিমাণ বেরে যায়। চিকৎসকগণ ক্রোধ নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
রাগ মানবিক আবেগের অংশ বিশেষ। তবে অনিয়ন্ত্রিত রাগ মারাত্মক ক্ষতিকারক। জ্ঞানীরা বলেন, রাগ হলো বারুদের গুদামের মতো। আগুনের স্ফূলিঙ্গের ছোঁয়ায় সব কিছু ধ্বংস করে দিতে পারে এই রাগ। এ কারণে রাগ নিয়ন্ত্রণের কোনো বিকল্প নেই।
ক্রোধ বা রাগের বলগাহীন ব্যবহার বহু অনিষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অনেক নির্দয় ও অত্যাচারমূলক কর্মকান্ড মানুষ ক্রোধ বা রাগের কারণে করে ফেলে। কিন্তু পরবর্তীতে এর কারণে অনেক ক্ষেত্রে লজ্জিত ও অবজ্ঞার পাত্রে পরিণত হতে হয়। তাই মুসলমানের জন্য উচিত ক্রোধের সময় নিজেকে সম্বরণ করা এবং অকারণে রাগ বা ক্রোধ প্রকাশ না করা।

প্রবাদ আছে, ‘রেগে গেলেন তো হেরে গেলেন’-এতো দুনিয়ার কথা। অঞ্চলভেদে রাগকে ক্রোধ বা গোস্বা হিসেবে জেনে থাকে। মানুষকে বিপদগ্রস্ত করার জন্য রাগ বা ক্রোধ হচ্ছে শয়তানের জঘন্যতম অস্ত্র। রাগের বশবর্তী হয়ে মানুষ বিপদ বা ক্ষতির দিকে ধাবিত হয়।

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, কোনো কোনো মানুষ দ্রুত রেগে যায় এবং তাদের রাগও প্রচন্ড। এমনকি মানুষ রেগে গিয়ে গালিগালাজ শুরু করতে পারে, মানুষের সঙ্গে মেলামেশাও বাদ দিতে পারে। এ ধরনের ব্যক্তিরা রাগের কারণে নানা দৈহিক রোগেও আক্রান্ত হতে পারে। আরেক ধরনের লোক হলো এরকম যে, তারা ভারসাম্যপূর্ণ। বিবেক ও নৈতিক শিক্ষার ভিত্তিতে যৌক্তিক পন্থায় নিজেদের ক্রোধ নিয়ন্ত্রণে রাখে। এ ধরনের ব্যক্তিরা সাধারণত সাহসী ও আশাবাদী হয়। এই দুই ধরনের লোকদের বাইরেও আরেক দল আছে, যারা ভয়ের কারণে রাগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করে না। বিষয় যেটাই হোক, এটা সত্য যে, নৈতিক শিক্ষা মানুষকে রাগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে ভারসাম্যপূর্ণ হতে সাহায্য করে। এ কারণে মানুষকে রাগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে ভারসাম্যপূর্ণ হতে হবে।
আল্লাহ তা’য়ালা মুত্তাকী লোকদের প্রশংসা করে বলেন, এবং যখন তারা ক্রোধান্বিত হয় তখন তারা ক্ষমা দেয়। (সূরা শূরা, ৪২ ঃ৩৭) স্বাভাবিক অবস্থায় কাউকে ক্ষমা করে দেওয়া তো সহজ ব্যাপার। কিন্তু রাগের সময় ক্ষমা করা তেমন সহজ বিষয় নয়। তারপরও একজন মু’মিনের বৈশিষ্ট্য হলো এ অবস্থায়ও নিজেকে সম্বরণ করা। রাসূলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেন, ঐ ব্যক্তি বীর পুরুষ নয় যে অন্যকে ধরাশায়ী করে। বরং সেই প্রকৃত বীর যে রাগের সময় নিজেকে সম্বরণ করতে পারে।
হযরত আবু যর গিফারী (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলে, রাসূলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেন, যদি দাঁড়ানো অবস্থায় কারো গোস্বা হয় তবে সে যেনো বসে যায়। এতও যদি তা প্রশমিত না হয় তবে সে যেনো শুয়ে পড়ে। অকারণে রাগ করাতে ঈমান নষ্ট হয়ে যায়। নবী করীম (সা.) এরশাদ করেন,‘‘গোস্বা মানুষের ঈমানকে নষ্ট করে দেয় যেমনিভাবে তিক্ত ফল মধুকে নষ্ট করে দেয়।

হযরত আবূ হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হে আল্লাহুর রাসূল (সা.) আমাকে অসিয়্যত করুন, তিনি বললেন, রাগ করবে না। লোকটি বারবার তার কথাটি বলতে থাকলে রাসূলুল্লাহ (সা.) ও একই জবাব দিলে এবং বললেন রাগ করবে না।
তিনি আরো বললেন, গোস্বা শয়তানের তরফ থেকে আসে। শয়তান আগুনের তৈরি। আর আগুনকে পানি ঠান্ডা করে। যদি কারো গোস্বা হয় তবে তার উচিত অযু করে নেয়া।

আল্লাহ তা’য়ালা রাগ দমনকারীকে ভালোবাসেন। কোরআনুল কারিমে এরশাদ হয়েছে, ‘এবং রাগ দমনকারীগণ ও মানুষকে ক্ষমাকারীগণ। আল্লাহ অনুগ্রহকারীকে ভালোবাসেন।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ১৩৪) এ কারণেই নবীজি (সা.) এটাকে বলেছেন, ‘আদম সন্তানের অন্তর একটি উত্তপ্ত কয়লা’ (তিরমিজি)। আল্লাহর ক্ষমা পেতে হলে তাঁর বান্দাকে ক্ষমা করতে হবে।

কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমরা তোমাদের পালনকর্তার ক্ষমা এবং জান্নাতের দিকে ছুটে যাও, যার সীমানা হচ্ছে আসমান ও জমিন, যা তৈরি করা হয়েছে পরহেজগারদের জন্য। যারা সচ্ছলতায় ও অভাবের সময় ব্যয় করে, যারা নিজেদের রাগকে সংবরণ করে আর মানুষকে ক্ষমা করে, বস্তুত আল্লাহ সৎকর্মশীলদিগকেই ভালোবাসেন।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৩৪)।

রাগ নিয়ন্ত্রণ আল্লাহকে সন্তুষ্ট করে। আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) প্রচুর আত্মসংযম ও ধৈর্যশীলতার পরিচয় দিয়েছেন, যখন তাঁকে অপমান, অপদস্থ ও শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছিলো। যে ব্যক্তি রাগ নিয়ন্ত্রণ করে, সে আধ্যাত্মিকভাবে এবং জাগতিকভাবেও পুরস্কৃত হয়। নবীজি (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি নিজের ক্রোধ চরিতার্থ করার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তা সংবরণ করে, আল্লাহ তাকে কিয়ামতের দিন সমগ্র সৃষ্টির সামনে ডেকে আনবেন এবং জান্নাতের যেকোনো হুর নিজের ইচ্ছামতো বেছে নেওয়ার অধিকার দান করবেন।’ (ইবনে মাজাহ: ৪১৮৬)।

রাসূলুল্লাহ (সা.) আরো বলেন, ‘আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য বান্দার ক্রোধ সংবরণে যে মহান প্রতিদান রয়েছে, তা অন্য কিছুতে নেই।’ (ইবনে মাজাহ: ৪১৮৯)।ইসলাম রাগকে একটি মানবীয় ক্রুটি হিসেবে উল্লেখ করে তাকে দমন করতে বলেছে। রাগ দমনের কিছু পদ্ধতিও ইসলামী শরিয়তে বর্ণিত হয়েছে। যেমন-আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা দুই ব্যক্তি নবী করিম (সা.)-এর কাছে বসে পরস্পর গালাগাল করছিলো। তাদের একজনের চোখ লাল হয়ে উঠলো ও গলার শিরা ফুলে গেলো। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘আমি একটি বাক্য জানি, যদি সে তা পড়ে তবে তার এ অবস্থা কেটে যাবে। সে বাক্যটি হলো, আমি আল্লাহর কাছে অভিশপ্ত শয়তান থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৬৮১২)

চুপ থাকা আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমরা শিক্ষা দাও এবং সহজ করো। কঠিন কোরো না। যখন তুমি রাগান্বিত হও তখন চুপ থাকো; যখন তুমি রাগান্বিত হও তখন চুপ থাকো; যখন তুমি রাগান্বিত হও তখন চুপ থাকো।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ৪৭৮৬) হযরত আলী (রা.) বলেন, ঝগড়া বিবাদের নেমে পড়া খুব সহজ, কিন্তু তা হতে বের হয়ে আসা খুবই কঠিন।

সব রাগ নিন্দনীয় নয় আবার কিছু রাগ নিন্দনীয়, তবে সব রাগ দোষের নয়। কিছু রাগ এমন রয়েছে, যা প্রশংসনীয়। মূলত রাগ দুই প্রকার। নিন্দনীয় রাগ : নিন্দনীয় রাগ হচ্ছে সেসব জাগতিক রাগ, যার ব্যাপারে আল্লাহর রাসূল (সা.) উম্মতকে সতর্ক করেছেন। যেমনটি আলোচ্য হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। প্রশংসনীয় রাগ : সেসব রাগ প্রশংসনীয়, যা আল্লাহ, রাসূল (সা.) ও দ্বিনের স্বার্থে করা হয়। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আল্লাহর রাসূলুল্লাহ (সা.) কখনো নিজের কোনো ব্যাপারে কারোর কাছ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি। তবে মহান আল্লাহর নিষিদ্ধ কোনো কাজ করে ফেললে তার জন্য যথাবিহিত শাস্তির ব্যবস্থা করতেন।’ (আল জামে বাইনাস সাহিহাইন, হাদিস : ৩১৮৪)

বর্তমান পৃথিবীতে বসবাসকারী মানুষের সিংহভাগই অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে অপেক্ষাকৃত শান্তিপূর্ণ জীবনযাপন করে থাকে। সাধারণত, যারা রাগের অভিজ্ঞতা পান তারা “তাদের কী হয়েছে” এর ফলস্বরূপ এর উত্তেজনাপূর্ণ ব্যাখ্যা করে এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বর্ণিত উস্কানিগুলি রাগের অভিজ্ঞতার সাথে সাথেই ঘটে। এই জাতীয় ব্যাখ্যা মায়াজালকে নিশ্চিত করে যে রাগের একটি পৃথক বহিরাগত কারণ রয়েছে। রাগী ব্যক্তি সাধারণত তাদের ক্রোধের কারণটি অন্য ব্যক্তির আচরণের ইচ্ছাকৃত, ব্যক্তিগত এবং নিয়ন্ত্রণযোগ্য দিকটিতে খুঁজে পান। এই ব্যাখ্যাটি তবে রাগান্বিত ব্যক্তির অন্তর্নিহিতের ওপর ভিত্তি করে যারা তাদের আবেগের ফলে স্ব-পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা এবং উদ্দেশ্য পর্যবেক্ষণে ক্ষতি অনুভব করে। রাগ বহুবিধ উৎস হতে পারে, এর মধ্যে কয়েকটি দূরবর্তী ঘটনাও হতে পারে তবে লোকেরা খুব কমই তাদের ক্রোধের জন্য একাধিক কারণ খুঁজে পায়। নোভাকোর মতে, “ক্রোধের অভিজ্ঞতাগুলি পরিবেশগত-সাময়িক প্রেক্ষাপটে এম্বেড করা বা বাসা বেঁধে দেওয়া হয়। ” এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার মতে, একটি অভ্যন্তরীণ সংক্রমণ ব্যথার কারণ হতে পারে যা ক্রোধ ক্রোধকে সক্রিয় করতে পারে।

জাতিসংঘ,বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা এবং বিভিন্ন দেশের সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, অনেক দেশেই দারিদ্রের হার কমছে এবং মানুষের সম্ভাব্য আয়ুষ্কাল বাড়ছে। যদি তাই হয়ে থাকে, তাহলে আমাদের আশেপাশের এতো মানুষকে কেন সবসময় ক্রুদ্ধ, রাগান্বিত মনে হয়? রাস্তায় চলাচল করার সময়, সামাজিক মাধ্যমে বা কোনো রাজনীতিবিদের সমালোচনা করার সময় মানুষের ক্ষোভ যেভাবে প্রকাশিত হয় তা দেখে কেউ যদি ধারণা পোষণ করে যে পৃথিবীর মানুষ আসলে চিরস্থায়ী ক্রোধের মধ্যে ডুবে আছে – তাহলে তাকে খুব একটা দোষ দেয়া যায় না। আমরা কেনো রেগে যাই? কোনো বিষয়গুলো রাগ চড়িয়ে দেয়? অথবা, রাগ করা কি আসলে খারাপ? রাগ নেই, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া মুশকিল। এক সাহাবি হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমাকে অল্প কথায় কিছু নসিহত করুন।

রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, রাগ বর্জন করো। সাহাবি কয়েকবার বললেন, আরও নসিহত করুন। প্রত্যেকবারই রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, রাগ বর্জন করো। -বোখারি শরীফ

সাধারণত কোনো কারণ ছাড়া মানুষ ক্রুদ্ধ হয় না। এর মধ্যে কোনো কোনো কারণ গ্রহণযোগ্য, আবার কোনো কোনোটি অগ্রহণযোগ্য ও অযৌক্তিক। ব্যর্থতা, অযৌক্তিক প্রত্যাশা, হিংসা-বিদ্বেষ ও অন্যের দোষ খুঁজে বেড়ানোর মতো কিছু অভ্যাস ও ঘটনার পাশাপাশি অবিচার, জুলুম ও দারিদ্রের মতো সামাজিক অসঙ্গতিগুলো মানুষের রাগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তবে রাগ প্রকাশের ধরনের ক্ষেত্রে ব্যক্তিভেদে পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। কিছু লোক আছে, একজনের ওপর রাগ পুষে রেখে অন্যের ওপর তার প্রকাশ ঘটায়। যেমন ‘‘বিড়ালের রাগ বেড়ার সাথে’’। অনেকে আবার সরাসরি প্রতিক্রিয়া দেখায়। কেউ কেউ আছেন, শত অন্যায়ের পরও কোনো প্রতিক্রিয়া দেখান না। এ ধরনের প্রতিক্রিয়াহীন অবস্থা শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্য ভালো নয়। তবে যারা রাগকে কৌশলে সংবরণ করে সেই শক্তিকে ভালো কাজে লাগাতে পারেন, তারাই প্রকৃত সফলকাম।

ইসলাম মানুষকে রাগ নিয়ন্ত্রণ করার নির্দেশ দিয়েছে। ইসলাম মনে করে, রাগ মানুষকে জ্ঞান, বিবেক ও ধর্মের পথ থেকে বিচ্যুত করে দেয়। রাগের কারণে মানুষের আচার-আচরণ ও চিন্তায়া খারাপ প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। তাই রাগান্বিত অবস্থায় ক্ষমা করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে ইসলাম। বিশেষ করে কোনো ব্যক্তি যদি প্রতিশোধ নেওয়ার ক্ষমতা থাকার পরও প্রতিশোধ না নেয় এবং ক্ষমা করে দেয়, তাহলে তার এ কাজটি ইসলামের দৃষ্টিতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত।
ইসলামের ইতিহাসে দেখা যায়, বড় বড় মনীষীরা ক্ষমা করার ক্ষেত্রে ছিলেন অগ্রগামী। তারা রাগান্বিত হলে সূরা আল ইমরানের ১৩৪ নম্বর আয়াতটি তেলাওয়াত করতেন। এ আয়াতে বলা হয়েছে, ‘যারা সচ্ছল ও অসচ্ছল সব অবস্থায়ই অর্থ-সম্পদ ব্যয় করে এবং যারা ক্রোধ দমন করে ও অন্যের দোষ-ক্রটি মাফ করে দেয়। এ ধরনের সৎলোকদের আল্লাহ অত্যন্ত ভালোবাসেন।’

রাগ নিয়ে ইসলামের এমন অবস্থানের পরও কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে ক্ষোভকে সঠিক বলে রায় দিয়েছে। সমাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, জুলুম ও বৈষম্য দূর করা এবং মানুষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য অপরাধী ও জুলুমবাজদের মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে রাগ বৈধ। জাতীয়, ধর্মীয় ও মানবিক আদর্শ ও মূল্যবোধ রক্ষা করার জন্য প্রয়োজনে রাগকে কাজে লাগাতে হবে। তবে অন্যায় দমন করতে যেয়ে অন্যায়কে যাতে প্রশ্রয় না দেওয়া না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

যে লোক রাগতে জানে না সে মূর্খ কিন্তু যে করেন না সে বুদ্ধিমান। ক্রোধ হলো আত্মার পাপ; যে এ কবলে পড়ে সেই মানসিকভাবে ধ্বংস হয়। রাগের একমুহুর্তের ধর্যধারণ শত দিনের দুঃখ থেকে মুক্তি দিতে পারে। রাগান্বিত হওয়া হলো অন্যের ক্রুতির কারণে নিজের ওপর প্রতিশোধ নেওয়া। বস্তুত রাগ মানুষের জীবনকে সহজেই বিষাক্ত করে তুলতে পারে। রাগের মাথায় এমন সব কাজ ঘটে যেতে পারে- যা ব্যক্তি, সমাজ তথা গোটা বিশ্বের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ। তাই রাগ হলে আলেমরা ‘আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইত্বনির রাজীম’ পড়ার পরামর্শ দিয়েছেন। রাগান্বিত হলেও পাপ থেকে বিরত হও কারণ পাপ পতনের মূল। ধ্বংসের কারণ অহংকার আর উত্তেজনা মানুষকে পতনের ধিকে ধাবিত করে।

রাগ হলো মৃত্যুর সমতুল্য। আর রাগ হলো আত্মার একটি রোগ। মাত্রাতিরিক্ত রাগ কখনোই ভালো নয়। সবকিছুর মধ্যে ভারসাম্য জরুরি। রাগ নেই, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া মুশকিল। জ্ঞানীরা বলেন, রাগ হলো বারুদের গুদামের মতো, যা মানুষের স্বাভাবিক অর্জনকে মুহূর্তে ধ্বংস করে দেয়। তাই রাগ নিয়ন্ত্রণের কোনো বিকল্প নেই। এক সাহাবি হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) কাছে এসে বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ। আমাকে অল্প কথায় কিছু নসিহত করুন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, রাগ বর্জন করো। সাহাবি কয়েকবার বললেন, আরও নসিহত করুন। প্রত্যেকবারই রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, রাগ বর্জন করো। -(বোখারি)

রাগ মানবিক আবেগেরই অংশমাত্র। ক্রোধ বা রাগ একধরণের পাগলামী। মানুষের জীবনের একটি মন্দ দিক হলো রাগ বা ক্রোধ। কারো রাগ যখন মাত্রা ছাড়িয়ে যায় তখন সেটা ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। রাগান্বিত মানুষ বেসামাল হয়ে যায়। তখন অন্যের ওপর অবলীলায় অত্যাচার করে। তবে অনিয়ন্ত্রিত রাগ ক্ষতিকারক, যা মানুষের জন্য নানা সমস্যা সৃষ্টি করে। যে ব্যক্তি রাগকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে, সে সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রসহ সব অঙ্গনে সফল।

জ্ঞানী আলেমরা বলেন, যখন রাগ হয় তখন মনে করবে, আমার সৃষ্টিকর্তা আমার চেয়ে অনেক অনেক বড়। তিনি আমার প্রতি রাগ হলে আমার কী উপায় হবে? অতএব, আমি তাকে ক্ষমা করতে না পারলে সৃষ্টিকর্তা আল্লাহও আমাকে ক্ষমা করবেন না। আমার রাগ হজম করে তাকে ক্ষমা করে দিলে আল্লাহও আমাকে ক্ষমা করে দেবেন। এভাবে রাগ নিয়ন্ত্রণে এসে যায়। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, ‘মনে রাখবে অবশ্যই আল্লাহ সুমহান, সমুচ্চ অনেক বড়।’ -সূরা আন নিসা :৩৪

সুস্বাস্থ্য ও শান্তিময় জীবনের জন্য রাগ বা ক্রোধ দমন করা জরুরি। রাগের ফলেই মানুষের স্বাভাবিক বুদ্ধি ও বিবেক-বিবেচনা লোপ পায়। সুতরাং মু’মিন বান্দার অন্যতম গুণ হলো রাগ বা ক্রোধ থেকে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা। রাগ বা ক্রোধ দমনে কোরআন-সুন্নাহ মোতাবেক যেসব কাজ করা জরুরি অন্যায় কাজ ছেড়ে দেয়া। এ কারণেই আল্লাহ তা’য়ালা মানুষকে রাগ দমনে সতর্কতা অবলম্বনের উপদেশ প্রদান করেছেন। রাগ দমনকে মুত্তাকিদের গুণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন-‘‘এবং যারা অন্যায় ও পাপকর্ম থেকে নিজেদেরকে বিরত রাখে এবং যখন তারা রাগান্বিত হয় তখন তারা আত্মসংবরণ (ক্ষমা) করে।’’ (সুরা আশ-শুরা : আয়াত ৩৭) সুতরাং প্রবল রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার অন্যতম উপায় হলো তাকওয়া ও পরহেজগারিতা অবলম্বন করা। কেননা আল্লাহ তা’য়ালাই কোরআন পাকে তাকওয়া ও পরহেজগারিকে রাগ দমনের অন্যতম উপায় হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন-‘আর তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে মাগফেরাত ও জান্নাতের দিকে দ্রুত অগ্রসর হও এবং সেই জান্নাতের দিকে অগ্রসর হও, যার পিরিধি আসমানসমূহ ও জমিনে বিস্তৃত।

অভিশপ্ত শয়তানই মানুষের অন্তরে ক্রোধের আগুন জালিয়ে দেয়। কাজেই ক্রোধের আগুন থেকে বাঁচার অন্যতম কার্যকর পন্থা হচ্ছে আল্লাহর জিকির করা। যাতে শয়তানের প্ররোচনা হতে নিরাপদ থাকা যায় । তাই বেশি বেশি ইসতেগফার করা- ‘লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহিল আলিয়িল আজিম।’

রাগান্বিত অবস্থায় কোনো মানুষের জবাব দিতে নেই। রাগের সব চেয়ে বড় প্রতিকার হলো বিলম্ব করা। রাগ বোকামী থেকে উদ্ভুত হয় এবং অনুতাপে শেষ হয়। রাগ মানব প্রকৃতিরই একটি অংশ । রাগ আসাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু রাগ কন্ট্রোল করাটাই সবচেয়ে বড় বিষয়। সবচেয়ে বড় বীরত্ব রাগ সম্বরণ বা নিয়ন্ত্রণ করা; ঝাড়াটা বীরত্ব নয়। কেননা রাগের মাথায় হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। তখন সে যা ইচ্ছে তাই করে বসতে পারে। রাগের কারণে অন্তর হতে পবিত্র ঈমান দূরীভূত হয়ে যায়। অকারণে রাগ মানুষের ঈমানকে নষ্ট করে দেয়। রাগের সময় মানুষ এমন কথা বলে ও এমন কাজ করে যার কারণে তার অন্তরে পরবর্তীতে অশান্তি সৃষ্টি হয় এবং সে লজ্জিত হয়।

কোরআন ও হাদিসে রাগ দমনের একাধিক উপকারিতা বর্ণনায় এসেছে। রাগ দমনকারীর জন্য জান্নাতের ঘোষণা দিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তুমি রাগ করবে না, তাহলে তোমার জন্য জান্নাত।’ (সুনানে তিবরানি, হাদিস : ২১) আল্লাহ্র সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য আত্মসংযম বা রাগ নিয়ন্ত্রণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা গুণ। এটা আমাদের ক্রোধ বা রাগের নানারকম শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি থেকে বাঁচিয়ে রাখে। কেনোনা- রাগ’ ধ্বংস করে দিতে পারে জীবন, সম্পদ, সম্মান,পারিবারিক এবং সামাজিক সম্পর্ক। জীবনে নেমে আসতে পারে বিপর্যয়। পক্ষান্তরে, যারা রাগ বা ক্রোধকে কৌশলে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে তারাই সব অঙ্গনে সফল।

লেখকঃ গবেষক,সাবেক জাতীয় ক্রীড়াবিদ,
চেয়ারম্যান গ্রীণ ক্লাব, মানিকগঞ্জ,সাংবাদিক ও কলামিস্ট